ইলেকটোরাল বন্ডের মহাকেলেঙ্কারি

প্রসেনজিৎ বসু, সমীরণ সেনগুপ্ত, সৌম্যদীপ বিশ্বাস

 


ইলেকটোরাল বন্ডের বিষয়টা শুধুমাত্র একটা স্বতন্ত্র কেলেঙ্কারি নয়। এই বন্ডের মাধ্যমে বড় কোম্পানি আর শাসকদলগুলির বিভিন্ন লেনদেনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনেকগুলি কেলেঙ্কারি। এক রাশ আর্থিক দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি আর কালো টাকা সাদা করার ঘটনার সমাহার ঘটেছে ৫ বছর ধরে। তাই এটা একটা "মেগা স্ক্যাম" বা মহা-কেলেঙ্কারি।  এর গভীরে ঢুকতে গেলে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকটি বড় লেনদেনের আলাদা করে তদন্ত করতে হবে

 

ভারতে বড় রাজনৈতিক দলগুলির বেনামী উৎস থেকে নগদ টাকায় চাঁদা সংগ্রহ করার অভ্যেস অনেক পুরনো। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বেশিরভাগ দলই এই ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ধরে কাজ করে এসেছে। কালো টাকা উদ্ধারের নামে ২০১৬-র নভেম্বরে পাঁচশো আর হাজার টাকার নোট বাতিল করার পর ২০১৭ সালের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি রাজনৈতিক দলের চাঁদা তোলার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার কথা বলে একগুচ্ছ প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।

নগদ টাকায় কোনও রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা কুড়ি হাজার টাকা থেকে কমিয়ে দুই হাজার টাকা করা হয়। ব্যাঙ্কের চেক বা ডিজিটাল মাধ্যমে কোনও রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিলে তার উপর আয়করে ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। রাজনৈতিক দলগুলিকে এই সমস্ত চাঁদার উৎস এবং পরিমাণ তাদের বার্ষিক আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিলে তাদেরও আয়কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নিয়ম চালু রাখা হয়।

এর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী একটি নতুন চাঁদা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করার কথাও ঘোষণা করেন, যেক্ষেত্রে কোনও কোম্পানি বা ব্যক্তি, সরকার-নির্ধারিত ব্যাঙ্কের থেকে ইলেকটোরাল বন্ড বা কর্জপত্র কিনে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই বন্ড কোনও রাজনৈতিক দলকে চাঁদা হিসেবে দিতে পারবে। বন্ডের প্রাপক রাজনৈতিক দলটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে সেই বন্ডটি ব্যাঙ্কে জমা করে সেটাকে নগদে বদলে নিতে পারবে।

এ-ক্ষেত্রে কোনও কোম্পানি বা ব্যক্তি সর্বসাকুল্যে ইলেকটোরাল বন্ডে কত চাঁদা দিচ্ছে সেটা জানা যাবে, একটি রাজনৈতিক দল সর্বসাকুল্যে ইলেকটোরাল বন্ডে কত চাঁদা পাচ্ছে তাও জানা যাবে, কিন্তু একেকটি কোম্পানি বা ব্যক্তি কোন রাজনৈতিক দলকে কত চাঁদা দিচ্ছে, সেটা জনসমক্ষে আসবে না। সেই তথ্য সরকার-নির্ধারিত ব্যাঙ্কের কাছে গোপনীয়তার আড়ালেই থেকে যাবে।

 

প্রথম থেকেই দুর্নীতির আশঙ্কা ছিল

২০১৭ সালের বাজেটে এই ইলেকটোরাল বন্ড স্কিম ঘোষণা হওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে বিরোধিতা উঠে আসে। কেবল বিরোধী দলগুলিই নয়, সরকারের অভ্যন্তরেও সমালোচকরা বলেন যে অস্বচ্ছতা দূর করার বদলে এটা বেনামী লেনদেন এবং ঘুষ দেওয়াকে আইনি বৈধতা দেবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে এই স্কিম চালু হলে অর্থনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। ইলেকটোরাল বন্ড স্কিম চালু করার জন্য যে আইনি সংশোধনীগুলি সংসদে পাশ করানো হয়, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও সেগুলির বিরোধিতা করা হয়েছিল।

জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত সমস্ত রাজনৈতিক দলকে প্রতি বছর কমিশনের কাছে কোনও কোম্পানি বা ব্যক্তির থেকে কুড়ি হাজার টাকার বেশি প্রাপ্ত চাঁদার একটি রিপোর্ট জমা করতে হয়। ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে আসা চাঁদা এই রিপোর্টের বাইরে রাখার জন্য জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে সংশোধনী পাশ করানো হয়। ২০১৭ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রককে চিঠি লিখে নির্বাচন কমিশন জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের এই সংশোধনী প্রত্যাহার করার দাবি জানায়।

কোম্পানি আইনের ১৮২ নম্বর ধারায় কোনও কোম্পানির রাজনৈতিক দলগুলিকে দেওয়া মোট বার্ষিক চাঁদা সেই কোম্পানির বিগত তিন বছরের নিট মুনাফার ৭.৫ শতাংশের বেশি হতে না পারার যে নিয়ম ছিল, আইন সংশোধন করে সেই নিয়ম তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানায় যে এর ফলে ব্যাঙের ছাতার মতন ভুয়ো কোম্পানি (শেল কোম্পানি) গড়ে উঠবে, যাদের মাধ্যমে রাজনীতিতে কালো টাকার স্রোত বৃদ্ধি পাবে।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তৎকালীন গভর্নর উর্জিত প্যাটেল ২০১৭-র সেপ্টেম্বর মাসে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে চিঠি লিখে জানান যে বেনামী ইলেকটোরাল বন্ড চালু হলে মানি লন্ডারিং-এর ঝুঁকি বেড়ে যাবে। মানি লন্ডারিং অর্থাৎ অর্থশোধন— অবৈধ আয় বা সম্পদকে বৈধ করা; সোজা কথায় কালো টাকা সাদা করা। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর বেনামী বিয়ারার বন্ড চালু না করে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে ডিম্যাট বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে ইলেকটোরাল বন্ড চালু করার পরামর্শও দিয়েছিলেন।

সরকারের ভিতর এবং বাইরের এই সমস্ত আশঙ্কা এবং আপত্তিকে অগ্রাহ্য করেই ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মোদি সরকার ইলেকটোরাল বন্ড স্কিম চালু করে দেয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছিলেন যে বেনামী চাঁদা দেওয়ার সুযোগ না রাখলে কোম্পানিরা কোনও রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে অনিচ্ছুক হবে এবং ক্যাশ টাকার লেনদেন চলতেই থাকবে। ইলেকটোরাল বন্ড চালু হলে সম্পূর্ণ না হলেও রাজনৈতিক দলের চাঁদার ক্ষেত্রে আংশিক স্বচ্ছতা আসবে বলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছিলেন।

 

সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পরিপন্থী

ইলেকটোরাল বন্ড স্কিম চালু হওয়ার মুখেই এটিকে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম এবং কমন কজ নামক দুটি অ-সরকারি সংস্থা (এনজিও)। সিপিআইএম দলও মামলা করে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে সেই মামলার কোনও নিষ্পত্তি হয়নি, কিন্তু এপ্রিল ২০১৯-এ সুপ্রিম কোর্ট ইলেকটোরাল বন্ড জারি করার জন্য নির্ধারিত স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-কে এই সংক্রান্ত সমস্ত হিসেবনিকেশ রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয়।

অবশেষে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ইলেকটোরাল বন্ড স্কিমকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে এবং ২০১৭-র বাজেট অধিবেশনে সংসদে পাশ হওয়া জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং কোম্পানি আইনের সংশোধনীগুলিকে বাতিল করে দেয়। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-কে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৪-এর জানুয়ারি পর্যন্ত ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে চাঁদা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য নির্বাচন কমিশন মারফৎ প্রকাশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের চাপে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কয়েক সপ্তাহ ধরে ধানাই-পানাই করে শেষমেশ ২১ মার্চ সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে। লেনদেনের তথ্য-পরিসংখ্যান জনসমক্ষে আসতেই ইলেকটোরাল বন্ডের ঝুলি থেকে একের পর এক বেড়াল বেরোতে থাকে।

প্রথমেই যেটা দেখা যায় যে (সারণী ১) মার্চ ২০১৮ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত, ছয় বছরে ইলেকটোরাল বন্ডে সব রাজনৈতিক দলগুলির মোট প্রাপ্ত চাঁদার অঙ্ক ১৬৪৪৬ কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি, ৮২৫৩ কোটি টাকার চাঁদা গেছে কেবলমাত্র ভারতীয় জনতা পার্টি-র কাছে।

সারণী ১ (কোটি টাকা এককে)
রাজনৈতিক দলের নাম ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত মোট চাঁদার পরিমাণ ১২.০৪.২০১৯ থেকে ২৪.০১.২০২৪-এর মধ্যে প্রাপ্ত চাঁদার পরিমাণ ০৫.০৩.২০১৮ থেকে ১১.০৪.২০১৯ পর্যন্ত প্রাপ্ত চাঁদার পরিমাণ
ভারতীয় জনতা পার্টি ৮২৫২.৬ ৬০৬০.৫ ২১৯২.১
প্রেসিডেন্ট, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি ১৯৫১.৭ ১৪২১.৯ ৫২৯.৮
অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস ১৭০৭.৮ ১৬০৯.৫ ৯৮.৩
ভারত রাষ্ট্র সমিতি ১৪০৮.২ ১২১৪.৭ ১৯৩.৫
বিজু জনতা দল ১০১৯.৫ ৭৭৫.৫ ২৪৪
দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজহাগম (ডিএমকে) ৬৩৯ ৬৩৯
ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি ৫০২.৮ ৩৩৭ ১৬৫.৮
তেলেগু দেশম পার্টি ৩৩০.৭ ২১৮.৯ ১১১.৮
শিবসেনা ২২৭.৪ ১৫৯.৪ ৬৮
জনতা দল (সেকুলার) ৮৯.৮ ৪৩.৫ ৪৬.৩
রাষ্ট্রীয় জনতা দল ৭৩.৫ ৭৩.৫
আম আদমি পার্টি ৬৯.১ ৬৫.৫ ৩.৬
নাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি মহারাষ্ট্র প্রদেশ ৫৪.৫ ৩১ ২৩.৫
অন্যান্য রাজনৈতিক দল ১১৯.৫ ১১৯.৫
মোট চাঁদার পরিমাণ ১৬৪৪৫.৭ ১২৭৬৯.১ ৩৬৭৬.৬
তথ্যসূত্র: জাতীয় নির্বাচন কমিশন

 

জাতীয় কংগ্রেস সর্বসাকুল্যে পেয়েছে ১৯৫২ কোটি টাকা, পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ১৭০৮ কোটি, তেলেঙ্গানার পূর্বতন শাসকদল ভারত রাষ্ট্র সমিতি পেয়েছে ১৪০৮ কোটি, ওড়িশার শাসকদল বিজু জনতা দল পেয়েছে ১০১৯ কোটি, তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে পেয়েছে ৬৩৯ কোটি আর অন্ধ্রপ্রদেশের শাসকদল ওয়াইএসআর কংগ্রেস পেয়েছে ৫০৩ কোটি। এই সাতটি দল মিলেই ১৫৪৮২ কোটি টাকা, অর্থাৎ ছয় বছরে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত মোট চাঁদার ৯৪ শতাংশ পেয়েছে। বাকিটা যারা পেয়েছে তারাও কোনও-না-কোনও রাজ্যে হয় বর্তমান নয় প্রাক্তন শাসক দল।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

এই তথ্য থেকেই পরিষ্কার যে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে টাকা মূলত কেন্দ্রের এবং রাজ্যগুলির শাসকদলগুলির কাছেই পৌঁছেছে, রাজ্যগুলিতে যারা বিরোধী দল তারা যৎসামান্য পেয়েছে আর বেশ কিছু দল কিছুই পায়নি অথবা তারা এই মাধ্যমে টাকা নেয়নি। কেন্দ্রে বা রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে শাসক দলগুলি যদি বিরোধী দলগুলির তুলনায় অনেক বেশি টাকা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সুষম প্রতিদ্বন্দ্বিতার আর কোনও সম্ভাবনা থাকে কি? বহুদলীয় গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়াটাই তো এতে ব্যহত হয়। ইলেকটোরাল বন্ড স্কিম অসাংবিধানিক ধার্য হওয়ার পিছনে এটাই ছিল প্রধান কারণ।

 

চাঁদা না ঘুষ

কেবলমাত্র ক্ষমতাসীন দলগুলিকেই যদি মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়ে থাকে তাকে কি আর ‘চাঁদা’ বলা চলে? ইলেকটোরাল বন্ডের ক্ষেত্রে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যে কোম্পানিগুলি বড় অঙ্কের ‘চাঁদা’ দেওয়ার তালিকার উপরের দিকে আছে, তাদের সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংবাদমাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। ইডি, সিবিআই বা আয়কর দপ্তরের তদন্ত চলছে বা তারা হানা দিয়েছে এইরকম ২২টি কোম্পানি সর্বসাকুল্যে ৪৮০০ কোটি টাকা ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলিকে দিয়েছে, যার ৪০ শতাংশ বা ১৯১৯ কোটি টাকা একাই পেয়েছে বিজেপি।

তদন্তাধীন কর্পোরেট গ্রুপ বা সংস্থাগুলির মধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছে হায়দ্রাবাদের পিপি রেড্ডি এবং কৃষ্ণ রেড্ডির সংস্থা মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি, কলকাতার মহেন্দ্র কুমার জালান এন্টারপ্রাইজেস বা কেভেন্টার্স গ্রুপ, অনিল আগরওয়ালের বেদান্ত গ্রুপ, দিল্লির কুশলপাল সিংহের ডিএলএফ গ্রুপ, ‘লটারি বাদশা’ সান্তিয়াগো মার্টিনের ফিউচার গেমিং প্রাইভেট লিমিটেড আর সঞ্জীব গোয়েঙ্কার হলদিয়া এনার্জি লিমিটেড। কেবল বিজেপি নয়, জাতীয় কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে এবং ভারত রাষ্ট্র সমিতির মতন দলগুলিও এই তদন্তাধীন সংস্থার থেকে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে টাকা পেয়েছে, যদিও তার অঙ্ক বিজেপি-র তুলনায় অনেক কম।

আসলে চাঁদা নয়, কেন্দ্রীয় এজেন্সিদের তদন্ত থেকে বাঁচানোর বিনিময়ে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলেই বিজেপি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিকে লেলিয়ে দিয়ে ব্যবসায়ীদের থেকে তোলাবাজির অভিযোগও করেছেন। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে বিজেপি-কে ঘুষ দিয়ে বিদ্যুৎ, সড়ক বা আবাসন নির্মাণ ইত্যাদি পরিকাঠামো প্রকল্পে বেশ কয়েক হাজার কোটি টাকার বরাত বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ সহ অভিযোগ উঠেছে— বিশেষত মহারাষ্ট্রের বিজি শিরকে গ্রুপ, হায়দ্রাবাদের মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গ্রিনকো গ্রুপ, আহমেদাবাদের টরেন্ট গ্রুপ এবং দীনেশচন্দ্র আর আগরওয়াল ইনফ্রাকন প্রাইভেট লিমিটেড, লখনউ-এর অ্যাপকো ইনফ্রাটেক এবং সুনীল মিত্তলের ভারতী গ্রুপের বিরুদ্ধে।

 

কালো টাকার ওয়াশিং মেশিন

ঘুষ দিয়ে ব্যবসায়িক ফায়দা আদায় করে নেওয়া ছাড়াও ইলেকটোরাল বন্ডে দেওয়া ‘চাঁদা’-র ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আশঙ্কা অনুযায়ী ভুয়ো কোম্পানি মারফত কালো টাকা সাদা করার প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে। কোম্পানি আইনের ১৮২ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনও নতুন কোম্পানি তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগে রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে পারে না। অথচ এমন অন্তত ২০টি কোম্পানির হদিশ পাওয়া গেছে যারা তিন বছর পূর্ণ হওয়ার অনেক আগেই ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে সবমিলিয়ে ১০০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা দিয়েছে, যার মধ্যে ৩১ কোটি টাকা পেয়েছে ভারত রাষ্ট্র সমিতি আর ২৬ কোটি টাকা গেছে বিজেপি-র কাছে।

কোম্পানি আইনের ১৮২ নম্বর ধারায় কোনও কোম্পানির রাজনৈতিক দলগুলিকে দেওয়া মোট বার্ষিক চাঁদার ক্ষেত্রে বিগত তিন বছরের নিট মুনাফার ৭.৫ শতাংশের বেশি হতে না পারার যে সীমারেখা রাখা হয়েছিল, তা ২০১৭ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে মোদি সরকার তুলে দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এই সীমানহীন চাঁদা দেওয়ার ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়ে তিন বছরের নিট মুনাফার ৭.৫ শতাংশের সীমাকে পুনর্বহাল করেছে।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগের দুই বছরে, অর্থাৎ ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে, অন্তত ৫৫টি কোম্পানি এই ৭.৫ শতাংশের সীমা উল্লঙ্ঘন করে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলিকে চাঁদা দিয়েছে। দুই অর্থবর্ষে দেওয়া মোট চাঁদার পরিমাণ ১৯৯৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৩৭৮ কোটি টাকা ওই ৭.৫ শতাংশের সীমা বহির্ভূত চাঁদা। এই ৫৫টি কোম্পানির দুই বছরে বিজেপি-কে দেওয়া চাঁদার পরিমাণ ১৪১৪ কোটি টাকা। সারণী ২-এ ২০২৩-২৪ এবং ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ৭.৫ শতাংশ সীমার অতিরিক্ত চাঁদা প্রদানের হিসেবে প্রথম ১০টি কোম্পানির নিট মুনাফা এবং ইলেকটোরাল বন্ডের তথ্য দেওয়া হল।

 

সারণী ২ (কোটি টাকা এককে)
কোম্পানির নাম ৩ বছরের গড় নিট মুনাফা (অর্থবর্ষ ২১-২৩) বিগত তিন বছরের গড় নিট মুনাফার ৭.৫% ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে মোট ইলেকটোরাল বন্ড ক্রয়ের পরিমাণ ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিজেপি-কে প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ ৭.৫% সীমার অতিরিক্ত চাঁদার পরিমাণ
অর্থবর্ষ ২০২৩-২৪
ওয়েস্টার্ন ইউপি পাওয়ার ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড ১৬৭.৯ ১২.৬ ২২০ ৮০ ২০৭.৪
মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচারস লিমিটেড ২৫৭৬.৫ ১৯৩.২ ৩৭৫ ২৬৫ ১৮১.৮
ভারতি এয়ারটেল লিমিটেড -৯৭১৭ ১৪৩ ১৪৩ ১৪৩
এমকেজে এন্টারপ্রাইসেস লিমিটেড ৫৩.৪ ১১১.১ ১২.৫ ১০৭.১
কুইক সাপ্লাই চেন প্রাইভেট লিমিটেড ২৬.৫ ৫০ ৫০ ৪৮
এসইপিসি পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড -৩৩.১ ৪০ ৪০
লক্সমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড ১১৬.৮ ৮.৮ ৪০ ৪০ ৩১.২
এলসিসি প্রোজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেড ৩৭.৬ ২.৮ ৩১.৫ ৩১.৫ ২৮.৭
জিনাস পাওয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচারস লিমিটেড ৩৭.৩ ২.৮ ২৮ ২৫ ২৫.২
বিড়লা কার্বন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড ৩৪৮.৮ ২৬.৮ ৫০ ৫০ ২৩.২
অর্থবর্ষ ২০২২-২৩
কুইক সাপ্লাই চেন প্রাইভেট লিমিটেড ২৫ ১.৯ ১২৫ ১২৫ ১২৩.১
হলদিয়া এনার্জি লিমিটেড ৩৩৭.৫ ২৫.৩ ৯৫ ৩০ ৬৯.৭
ধারিওয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ৭৭.৫ ৫.৮ ৫০ ২৫ ৪৪.২
ডিএলএফ কমার্সিয়াল ডেভেলপারস লিমিটেড -৪০.৮ ৪০ ৪০ ৪০
বিড়লা কার্বন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড ৩১০ ২৩.৩ ৫৫ ৫৫ ৩১.৭
ভারতি এয়ারটেল লিমিটেড -২১৭১৬.৫ ২০ ২০ ২০
ডিএলএফ গার্ডেন সিটি ইন্দোর প্রাইভেট লিমিটেড ৫.৩ ০.৪ ১৫ ১৫ ১৪.৬
এনইএক্সজি ডিভাইসেস প্রাইভেট লিমিটেড ৫.৪ ০.৪ ১৫ ১৫ ১৪.৬
এনসিসি লিমিটেড ৩৭৭.৯ ২৮.৩ ৪০ ৪০ ১১.৭
এবিএনএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ১.৭ ০.১ ১০ ১০ ৯.৯
তথ্যসূত্র: সিএমআইই প্রাউএস ডেটাবেস এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন

 

রাজনৈতিক দলের চাঁদার ক্ষেত্রে তিন বছরের নিট মুনাফার ৭.৫ শতাংশের সীমা তুলে দেওয়ার পরিণতি আরও দেখা যায় ছয়টি কোম্পানির ক্ষেত্রে যারা ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে ৬৪৬ কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছে, কিন্তু তাদের গত সাত অর্থবর্ষের (২০১৬-১৭ থেকে ২০২২-২৩) নিট মুনাফার যোগফল দাঁড়ায় মাত্র ১৮৪ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে মুনাফার অতিরিক্ত চাঁদা দেওয়ার টাকা এই কোম্পানিগুলির কাছে এল কোথা থেকে?

এই ছয় কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৪১০ কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছে কুইক সাপ্লাই চেন প্রাইভেট লিমিটেড, যার মধ্যে ৩৭৫ কোটি টাকাই গেছে বিজেপি-র কাছে। অথচ বিগত সাত বছরে কুইক সাপ্লাই চেন-এর মোট নিট মুনাফা মাত্র ১৪৪ কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত তথ্যে এটা প্রমাণিত যে কুইক সাপ্লাই চেন কোম্পানির ডিরেক্টরদের অনেকেই রিলায়েন্স গোষ্ঠীর বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। অর্থাৎ কুইক সাপ্লাই চেনের মাধ্যমে সম্ভবত রিলায়েন্স গোষ্ঠীই ইলেকটোরাল বন্ড কিনে চাঁদা দিয়েছে। এই ছয় কোম্পানির মধ্যে আরও দুটো হল মদনলাল লিমিটেড, যেটা  আদতে মহেন্দ্র কুমার জালান গ্রুপের কোম্পানি এবং এবিএনএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, যেটা আদিত্য বিড়লা গ্রুপের কোম্পানি।

 

পড়ুন, গুজরাত গণহত্যার বিচার হয়নি

 

কেবল মুনাফার অতিরিক্ত চাঁদাই নয়, এমন ৩৩টি কোম্পানির হদিশ পাওয়া গেছে যারা গত সাত অর্থবর্ষে বড় অঙ্কের নিট লোকসান করেছে। এর মধ্যে ভারতী এয়ারটেল, পিরামল ক্যাপিটাল অ্যান্ড হাউসিং ফাইনান্স, ওঙ্কার রিয়েলটরস অ্যান্ড ডেভেলপারস, পিআরএল ডেভেলপারস, ধারিওয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদির মতন কোম্পানিরা আছে। এরা সব মিলিয়ে ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৫৮২ কোটি টাকা ইলেকটোরাল বন্ডে চাঁদা দিয়েছে, যার মধ্যে ৪৩৪ কোটি টাকা বিজেপি-র কাছে গেছে।

লাগাতার লোকসানে চলা কোম্পানি থেকে আসা এই চাঁদার সবটাই সম্ভবত কালো টাকা। ব্যক্তি হিসেবে ইলেকটোরাল বন্ড কিনেছে যারা, তাদের মধ্যেও অনেকে কোনও-না-কোনও কোম্পানির হয়ে বকলমে চাঁদা দিয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলের অর্থসংগ্রহে স্বচ্ছতা আনার নামে চালু হলেও, আদতে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে ছয় বছরে বিশাল অঙ্কের কালো টাকা সাদা করা হয়েছে, আর এই কালো টাকার সিংহভাগ গেছে বিজেপি-র তহবিলে। এই প্রেক্ষিতেই বিরোধীরা আজ বিজেপি-কে কালো টাকার ওয়াশিং মেশিন বলে বিদ্রূপ করছে।

ইলেকটোরাল বন্ডের এই দুর্নীতি কেবল ১৬৫০০ কোটি টাকাতেই আটকে নেই। যেমন, মেঘা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ২০২৩-এর এপ্রিল মাসে মোট ১৪০ কোটি টাকার বন্ড কিনে বিজেপি-কেই ১১৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এই ‘চাঁদা’ দেওয়ার পরের মাসেই মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকার তাদেরকে ১৪০০০ কোটি টাকার একটি প্রোজেক্ট পাইয়ে দেয়। এইরকমভাবে প্রতি ১০০০ কোটি টাকা চাঁদার বিনিময়ে, কোম্পানিগুলোকে প্রায় তার ১০০ গুণ মূল্যের সরকারি কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

সুপ্রিম কোর্টে ভরসা রাখতে হবে

ইলেকটোরাল বন্ডের তথ্য-পরিসংখ্যান সামনে আসার পর থেকে ঘুষ নিয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্ত প্রভাবিত করা বা প্রকল্পের বরাত পাইয়ে দেওয়া বা বড় অঙ্কের কালো টাকা সাদা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মোদি সরকারের সদিচ্ছা থাকলে ইতিমধ্যেই এর তদন্ত শুরু করে দিত। এইরকম কোনও তদন্ত যে আদতে বিজেপি-কে আরও বিপাকে ফেলবে সেটা বুঝেই ইলেকটোরাল বন্ডের তথ্যের প্রকাশ আটকানোর জন্য সরকার শেষ পর্যন্ত মরিয়া প্রয়াস চালিয়ে যায়।

রাফাল চুক্তি থেকে আদানি-হিন্ডেনবার্গ কাণ্ড, আজ অবধি সরকারি বা বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগেরই যথাযথ তদন্ত মোদি সরকারের আমলে হয়নি। বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগকারী বা হুইসেল ব্লোয়ারদের কণ্ঠরোধ করার ক্ষেত্রেই সরকার সক্রিয়তা দেখিয়েছে। অগত্যা, একমাত্র প্রত্যাশার জায়গা সুপ্রিম কোর্ট।

আসলে ইলেকটোরাল বন্ডের বিষয়টা শুধুমাত্র একটা স্বতন্ত্র কেলেঙ্কারি নয়। এই বন্ডের মাধ্যমে বড় কোম্পানি আর শাসকদলগুলির বিভিন্ন লেনদেনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনেকগুলি কেলেঙ্কারি। এক রাশ আর্থিক দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি আর কালো টাকা সাদা করার ঘটনার সমাহার ঘটেছে ৫ বছর ধরে। তাই এটা একটা “মেগা স্ক্যাম” বা মহা-কেলেঙ্কারি।

এর গভীরে ঢুকতে গেলে ইলেকটোরাল বন্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকটি বড় লেনদেনের আলাদা করে তদন্ত করতে হবে। জটিল এবং বেআইনি লেনদেনের তদন্তে বিভিন্ন তদন্তারী সংস্থাদের সম্মিলিতভাবে টিম হিসেবে কাজ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে একটা বিশেষ তদন্তকারী দল বা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম গঠন করেই ইলেকটোরাল বন্ড স্কিমের মতন মহা-কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে ন্যায় এবং সুবিচার সুনিশ্চিত করা যেতে পারে।


*লেখাটির অংশবিশেষ এপ্রিল ২০, ২০১৪ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...