আইনের অভিসন্ধিমূলক ব্যবহারকারীদের শাস্তির দাবি তীব্রতর হোক

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 


কেবল সাংবাদিক প্রবীর পুরকায়স্থই নন, নিউজক্লিক দফতরে অভিযান চলাকালীন যেভাবে প্রশাসনের আধিকারিকদের তরফে সংস্থার অন্যান্য সাংবাদিক, কর্মীদেরও হেনস্থা করা হয়েছে, আটক করে রাখা হয়েছে, এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যের অবধি যে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই সবকিছুর প্রেক্ষিতে আদালত ‘অপরাধী’ প্রশাসনিক কর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থার পালটা নির্দেশ দেবে না কেন— সেই প্রশ্নই এই মুহূর্তে জনতার আদালতে উঠে আসা উচিত

 

যে কথা অগ্রজ অশোক মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, সেই বক্তব্যেরই পুনরুক্তি করতে চাইব— বিচারব্যবস্থা তথা প্রশাসনের তরফে এই যে চরম গাফিলতি অথবা অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অন্যায় প্রতিশোধ আদায় করার যে মনোভাব, এই দুইটি সম্ভাবনার মধ্যে যেইটিই প্রশাসন বা বিচারব্যবস্থার তরফে এতদিনে হয়ে এসেছে, এবারে সেই ঘটনার অভিযুক্তদেরই সনাক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা প্রয়োজন। কেবল সাংবাদিক প্রবীর পুরকায়স্থই নন, নিউজক্লিক দফতরে অভিযান চলাকালীন যেভাবে প্রশাসনের আধিকারিকদের তরফে সংস্থার অন্যান্য সাংবাদিক, কর্মীদেরও হেনস্থা করা হয়েছে, আটক করে রাখা হয়েছে, এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যের অবধি যে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই সবকিছুর প্রেক্ষিতে আদালত ‘অপরাধী’ প্রশাসনিক কর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থার পালটা নির্দেশ দেবে না কেন— সেই প্রশ্নই এই মুহূর্তে জনতার আদালতে উঠে আসা উচিত। নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে বিদেশের অর্থসাহায্য নিয়ে দেশ-বিরোধী প্রচারের যে নোংরা অভিযোগ দিল্লি পুলিশ সর্বোচ্চ আদালত তথা সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে দেশের জনতার কাছেও তুলে ধরেছিল, তার সপক্ষে কণামাত্র প্রমাণও তারা আদালতে পেশ করতে পারেনি। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, সংবাদমাধ্যমেরই একাধিক প্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ নিয়ে আসা ও তাঁদের গ্রেফতার করে হেনস্থার মতো ঘটনা ঘটানো— এরপরেও কিন্তু দিল্লি পুলিশ তথা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কর্তাব্যক্তিদের এতটুকুও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। বিপরীতে প্রবীরকে গ্রেফতারের পরবর্তীতে তাঁর ও তাঁর সংস্থার বিরুদ্ধে যে ঘৃণ্য, পরিকল্পিত প্রচার দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই প্রচারটুকুই কিন্তু যতটুকু বিষ ছড়াবার— তার সবটুকু অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজমান থাকবে। কারণ শাসকের সপক্ষে বক্তব্যই ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যম’ ও বশংবদ সমাজের কাছে এই মুহূর্তে একমাত্র ‘সত্য’ হিসেবে গ্রাহ্য হয়ে থাকে। শাসকের ভ্রান্তিগুলিকে, শাসকের পরাজয়গুলিকে, শাসকের অন্যায়গুলিকে মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়া ক্রমশই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা, ভীমা-কোরেগাঁও তথা এলগার পরিষদ-সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যতম ‘অভিযুক্ত’ সমাজকর্মী গৌতম নওলাখা অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে জামিন আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। উল্লেখ্য বেশ কিছুদিন আগেই এই মামলায় ‘অভিযুক্ত’ মহেশ রাউত ও গৌতম নওলাখার পক্ষে উচ্চ-আদালতে জামিন ঘোষণার পর, তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ তাঁদের জামিনের বিরোধিতায় সুপ্রিম কোর্টে বিস্তারিত আবেদন জানানোর জন্য আরও সময় প্রার্থনা করে। আদালতের তরফে সেই সময় দেওয়া হয়। একইসময়ে ‘অভিযুক্ত’ গৌতম নওলাখাকে গৃহবন্দি থাকার ‘অনুমতি’ দেওয়া হয়। এতদিনে সেই বিচারের নিষ্পত্তিতে, নওলাখাকে জেলবন্দি রাখার সপক্ষে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ আদালতে জমা দিতে না পারায়, আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করে। এহ বাহ্য, এই সময়ে তাঁকে ‘গৃহবন্দি’ রাখতে গিয়ে তদন্তকারী সংস্থার তরফে যে খরচ হয়েছে, আদালত সেই খরচের একাংশের ভারও নওলাখাকেই বহন করার নির্দেশ দিয়েছে। এই ভীমা-কোরেগাঁও মামলাতেই আরেক ‘অভিযুক্ত’, নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপিকা সোমা সেন সম্প্রতি আদালতের তরফে জামিন পান। সেই সময়ে ‘জনস্বার্থ বার্তা’ পত্রিকায় এই মামলার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছিলাম। গুরুত্ব বিবেচনা করে সেই প্রতিবেদনের কিয়দংশ এখানে পুনর্বার উল্লেখ করতে চাইব।

কবি ভারভারা রাও, আইআইটি খড়গপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক আনন্দ তেলতুম্বডে, আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ, সমাজসেবী ভার্নন গঞ্জালভেস ও অরুণ ফেরেইরা,  সমাজকর্মী মহেশ রাউত, গৌতম নওলাখা, এবং নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপিকা সোমা সেন— ২০১৮-১৯ সালের চাঞ্চল্যকর এলগার পরিষদ ষড়যন্ত্র মামলায় মোট যে ষোলোজনের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদ এমনকি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে অবধি হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল— তাঁদের মধ্যে একজন বিচারবিভাগীয় হেফাজতেই মৃত্যুবরণ করেছেন। আটজন বর্ষীয়ান অভিযুক্ত ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন। যদিও আইনের লালফিতেয় তাঁদের মধ্যে দুজন এখনও কারাগারে অন্তরীণ (তখনও অবধি গৌতম নওলাখার জামিন কার্যকর করা যায়নি)। ষড়যন্ত্রের একটিও অভিযোগ পুনা পুলিশ অথবা এনআইএ-র তদন্তকারীরা আদালতে যুক্তি-সাপেক্ষে প্রমাণ করতে পারেননি।

মনে রাখতে হবে, এই এলগার পরিষদ মামলাতেই ফাদার স্ট্যান স্বামীর মতো বর্ষীয়ান মানুষকে কার্যত বিনা প্রমাণে সন্ত্রাসবাদী-অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আশি-ঊর্ধ্ব সেই পাদ্রীকে তৃষ্ণার জলটুকুরও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। কারারুদ্ধ অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যুর পর, ২০২১-২২ সাল থেকে এই মামলায় একে একে ‘অভিযুক্তেরা’ জামিনে, অথবা বেকসুর খালাস হয়েও জেল থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেন। আর সেই প্রতিটি জামিনের ক্ষেত্রে বিচারপতিদের অবস্থান?

আগস্ট, ২০২২। ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে প্রথম অভিযুক্ত হিসেবে জামিন পেলেন কবি ভারভারা রাও (৮৩)। আদালত তাঁকে কারাগারে বন্দি রাখার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পেল না। ২০২২-এর ১৮ নভেম্বর, সরাসরি তদন্তের অবস্থার উপর ভিত্তি করে প্রথম অভিযুক্ত হিসেবে জামিন পেলেন আইআইটি খড়গপুরের প্রাক্তন অধ্যাপক আনন্দ তেলতুম্বডে। জামিনের নির্দেশে আদালত জানাল, ‘প্রাথমিক তদন্ত-রিপোর্টের ভিত্তিতে অভিযুক্তের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।’ জামিন পেলেন আইনজীবী সুধা ভরদ্বাজ। রায় দিতে গিয়ে হাইকোর্ট জানাল, ‘চার্জশিট ফাইল করার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের তরফে পুনা পুলিশকে যে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতের কোনও এক্তিয়ারই নেই এমন নির্দেশ দেওয়ার।’ জুলাই ২০২৩, জামিন পেলেন সমাজকর্মী ভার্নন গঞ্জালভেস ও অরুণ ফেরেইরা। রায়ের কপিতে উঠে এল আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের প্রতি অভিযুক্তদের সমর্থন রয়েছে, এনআইএ বা জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার সওয়ালে সেই দাবির সপক্ষে কোনও যুক্তিযুক্ত প্রমাণই উঠে আসেনি।’ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ডিসেম্বর ২০২৩— পরপর জামিন পেলেন মহেশ রাউত, গৌতম নওলাখা, দুইজনেই। মহেশ রাউতের জামিন দিতে গিয়ে আদালত জানাল ‘অভিযুক্ত অথবা তাঁর সঙ্গী সিপিআই (মাওবাদী) গোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন, অথবা মাওবাদী সংগঠনে নিজেদের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তাঁরা কাউকে যুক্ত করেছেন, এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি।’ গৌতম নওলাখার বিষয়ে আদালতের মন্তব্য, ‘তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলার কোনও যৌক্তিকতাই আদালতের নজরে আসেনি।’ ৫ এপ্রিল ২০২৪, জামিন পেলেন নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপিকা সোমা সেন। এনআইএ-র তরফেই তাঁর জামিনের আর কোনও বিরোধিতা করা হল না।

এছাড়াও,

সাংবাদিক সুধীর ধাওয়ালে, সমাজকর্মী রোনা উইলসন, আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হানি বাবু, শিল্পী সাগর গোর্খে, রমেশ গাইচোর ও জ্যোতি জগতাপের ক্ষেত্রে  জামিন-বিষয়ক শুনানি এখনও আদালতের ‘তারিখ পে তারিখ’-এর নীতিতে অগ্রসর হয়ে চলেছে। এঁদের মধ্যে অধ্যাপক হানি বাবুর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি অধ্যাপক জিএন সাইবাবার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তাহলে জিএন সাইবাবার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগে যে মামলাটি হয়েছিল, সেটির বর্তমান অবস্থার বিষয়ে অনুসন্ধান করা যাক।

সিপিআই(মাওবাদী) সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে শারীরিক প্রতিবন্ধী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক জিএন সাইবাবাকে গ্রেফতার করা হয়। হুইলচেয়ারবন্দি এই প্রাক্তন অধ্যাপককে জঙ্গি-নাশকতার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তদের রাখার প্রয়োজনে নির্মিত কুখ্যাত আন্ডা সেলে অন্তরীণ রাখা হয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জেলে নূন্যতম চিকিৎসার সুবিধা অবধি তাঁকে দেওয়া হয়নি। এমনকি, তাঁর মাতৃবিয়োগের পর, দলিত, প্রতিবন্ধী এই মানুষটি, যিনি আজীবন তাঁর মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ, শত বাধাবিপত্তি তুচ্ছ করে যিনি তাঁকে শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়ে অধ্যাপনার মতো এমন একজায়গায় পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, অধ্যাপক সাইবাবাকে তাঁর মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিতে অবধি আদালত অস্বীকার করে।

সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক দৃশ্যতই আবেগবিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি মনে করিয়ে দেন, কীভাবে দিনের পর দিন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে কুরুচিকর প্রচার চলেছে। কীভাবে বিনা বিচারে স্ট্যান স্বামীর মতো বর্ষীয়ান মানুষকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে। কীভাবে ‘সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত’ হুইলচেয়ার-বন্দি দলিত অধ্যাপককে তাঁর মায়ের শেষকৃত্যে অবধি উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। মার্চ ২০২৪— বম্বে হাইকোর্ট সমস্ত অভিযোগ থেকে অধ্যাপক জিএন সাইবাবাকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করে।

দমনমূলক আইনগুলির বিরুদ্ধে দেশের সমাজকর্মীদের যে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন, তা ঠিক এই কারণেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। ‘দেশদ্রোহ’ অথবা ‘দেশবিরোধী’ ষড়যন্ত্র ঠেকানোর নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই আইনগুলি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। ইউএপিএ বা এমন কালা কানুনগুলির সাহায্যে বিনা-বিচারে, বিনা-চার্জশিটে কোনও একজন ‘অভিযুক্ত’কে দিনের পর দিন কারারুদ্ধ করে রাখা চলে। ক্ষমতাবান শাসকেরা ঠিক সেই সুযোগটিরই সদ্ব্যবহার করে থাকে। হিংসার রাজনীতির সর্বতো-বিরোধী হয়েই বলছি, দেশব্যাপী, ‘দেশবিরোধী হিংসা’ ঠেকানোর নামে যেভাবে, কেবল এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক অভিসন্ধিতেই এমন একেকটি আইনের (অপ)ব্যবহার হয়ে চলেছে তাতে সরাসরি এই আইন প্রত্যাহারের দাবিতেই গণতন্ত্রপ্রিয় প্রত্যেক নাগরিকের সরব হওয়া উচিত। অন্ততপক্ষে, এই আইনের প্রতিটি অপপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যাতে সরাসরি, সময়-নষ্ট-ব্যতিরেকে যে বা যাঁরা এই আইনকে অভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও দ্রুততার সঙ্গে, পালটা আইনি ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়ে, সেই বিষয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

আমরা মনে রাখিনি ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে’— এমন কোনও উচ্চারণ কোনওদিন, কোনওসময় জেএনইউ-চত্বর থেকে উচ্চারিত হয়নি। সেই উচ্চারণ বিশেষ কিছু সংবাদমাধ্যম ও সরকারপন্থী ভক্তদের তরফেই চক্রান্ত করে প্রযুক্তির সাহায্যে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের সময় ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ‘অভিযুক্ত’ উমর খালিদ আজ অবধি বন্দি হয়ে রয়েছেন। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, দিল্লি পুলিশের তরফে উমর খালিদের বিরুদ্ধে আদালতে যে দুটি মামলা দাখিল করা হয়েছিল, তার মধ্যে একটিকে ইতিমধ্যেই দিল্লি পুলিশের তরফে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্য মামলায় ইউএপিএ-ধারায় অভিযুক্ত হওয়ার কারণে কোনওভাবেই খালিদের জামিনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। ২০২৩ সাল জুড়ে দীর্ঘ আট মাস সময়ে ১১ বার মামলাটি সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির জন্য উঠলেও, প্রতিবারেই তা নানাবিধ প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কারণ দেখিয়ে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি-দাঙ্গায় অন্যতম ‘অভিযুক্ত ও ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে দিল্লি পুলিশ তাদের চার্জশিটে উমর খালিদের নাম উল্লেখ করলেও এখনও অবধি সেই অভিযোগের সপক্ষে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ তারা আদালতে পেশ করতে পারেনি। ওয়াকিবহাল মহলের তরফে, একাধিক প্রাক্তন বিচারপতি, আমলা, ও অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক উমর খালিদের মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ে দেখে জানিয়েছেন, কোনওভাবেই ইউএপিএ ধারায় খালিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজানো চলে না। তবুও দেশের ‘আইন’ ও আদালতের অধীনে এখনও উমর খালিদ সুবিচারের আশায় অপেক্ষা করে চলেছেন।

আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা আধুনিক আইনব্যবস্থার সেই প্রথম শর্তটিকেই বোধকরি বিস্মৃত হতে বসেছি, যে শর্তে উল্লিখিত রয়েছে— “আইনের দায়িত্ব হল, অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হোক বা না হোক একজনও নিরপরাধ ব্যক্তি যেন আইনব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে শাস্তিভোগ না করে, সেদিকে নজর রাখা।” রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমরা, আমাদের প্রশাসন, তদুপরি পবিত্র বিচারব্যবস্থাকেও বারংবার বে-আইনের যূপকাষ্ঠে নিবেদন করে এসেছি। এর বিপরীতে প্রায়শ্চিত্তের আয়োজন জরুরি। তাই পুনর্বার এই লেখার মাধ্যমে, কেবল প্রত্যেক নিরপরাধের জামিন মঞ্জুর করাই নয়— রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক আইনের এমন প্রতিটি অপব্যবহারের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার তরফে সংশ্লিষ্ট আধিকারিক-আমলা-আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে যাতে দ্রুততার সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেই বিষয়েও সম্মানীয় বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি। এর পরবর্তীতে সঙ্কটমুহূর্তে শুভবুদ্ধির প্রার্থনা ভিন্ন, অথবা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ জনতার সার্বিক আন্দোলনের উপরেই ভরসা রাখা ভিন্ন আর কোনও কিছুরই অবসর থাকবে না।


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...