আজকাল খবরের কাগজ পড়লে একটা বিবমিষা তৈরি হয়

সত্যব্রত ঘোষ

 


আমার রাজ্য ও দেশ এমনভাবে চলছে যে কোথাও একটুও ভাল কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দলমতনির্বিশেষে বেশিরভাগ রাজনীতিকের ক্ষমতার লোভ আকাশস্পর্শী; ক্ষমতাভোগীদের নিরাপত্তাহীনতা মাত্রাহীন হওয়ায় ন্যায়বোধ বলে তাঁদের কিছু নেই। ক্ষমতায় থাকার তাগিদে তাঁরা অনবরত মিথ্যাচার করে চলেন। হয়তো কোনওকালেই তাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বিশেষ অনুভব করেননি, তবে সম্প্রতি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে

 

আমার বাড়ি কলকাতা। পেশা লেখালেখি করা। যদিও সাধারণভাবে, লেখালেখিকে পেশা হিসেবে অবলম্বন করে আমাদের দেশে জীবনধারণ এবং সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা কষ্টকর, তবুও অতীতে নানা কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এই মুহূর্তে আমি লেখাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার মতো কঠিন কাজটাই করে চলেছি। হ্যাঁ, স্বেচ্ছায় লেখালেখি ছাড়া কিছু চুক্তিভিক্তিক কাজ করে থাকি, সেগুলোও কিছুটা লেখালেখি সংক্রান্তই, যেমন পত্রপত্রিকার জন্য অনুবাদের কাজ, ইত্যাদি। এছাড়াও আমার স্ত্রী টিউশনি পড়ান। সেই থেকে কিছু আয় হয়। আমার ও আমার স্ত্রীর এই মুহূর্তে যৌথভাবে মাসিক আয় ২৪ হাজার টাকা। আমার মা রয়েছেন, তিনি আমাদের ওপরেই নির্ভরশীল।

আমার ঘরে রান্নার গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। সরকারি প্রমাণপত্র হিসেবে আমার পরিবারে সকলের আধার কার্ড আছে। রেশন কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড এবং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কার্ডের থেকে সরকারি সুবিধাগুলি পেয়ে থাকি। এছাড়াও আমার ঘরে টিভি রয়েছে, আমার কাছে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন এবং একটি বোতাম টেপা ফোন রয়েছে। আমি চেষ্টা করি আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বজার রেখে চলার, কিন্তু সংসার চালাতে আমাকে কখনও-সখনও মাসের শেষে ধার করতে হয় বইকি। দু-বছর আগে আমাদের আয় ছিল মাসিক ২৭ হাজার টাকা, অর্থাৎ দু-বছরে আমাদের আয় কমেছে। অথচ জিনিসপত্রের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। ফলে আমাদের অবস্থার প্রভূত অবনতি ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের উপার্জনের সবচেয়ে বড় অংশটি খরচ হয় মাসিক বিদ্যুতের বিল মেটাতে। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থাটি গত কয়েক বছর বিদ্যুতের ইউনিটের দাম অনেকবার বাড়িয়ে বাড়িয়ে আকাশচুম্বী করেছে, অথচ বিদ্যুতের সংযোগ ছিন্ন করে বাঁচার কথা তো এখন আর ভাবা যায় না, ফলে বিল পেমেন্ট করতেই হয়।

আমি অনেক ভেবেচিন্তে একটি তালিকা তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে আমি এই মুহূর্তে আমাদের সমাজজীবনের মূল সমস্যাগুলি চিহ্নিত করতে পারি। সেগুলি হল, ১. সামাজিক আস্থাহীনতা; ২. বেকারত্ব এবং কর্মঠ হয়েও আর্থিক উন্নতির পথে বাধা; ৩. অনবরত মূল্যবৃদ্ধি; ৪. সমাজে ধর্ম-জাতি-দল-মতামতে মেরুকরণ (পুরনো বন্ধুদের ক্ষেত্রেও বিরোধী মত প্রকাশ করলে এমন অধৈর্য হয়ে ওঠা এবং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা, এমনভাবে আগে কখনও দেখিনি); ৫. কোভিড-পরবর্তী সময়ে প্রকৃত অর্থে যা জনস্বাস্থ্যনীতি, তার প্রকট অভাব; এবং ৬. শিক্ষা পরিকাঠামো পুরোপুরিভাবে পুঁজির হাতে বিলগ্নিকৃত করে ফেলা।

সৎপথে পরিশ্রম করে আয় বাড়ানোর যে-কটি রাস্তা আমার জানা আছে, সবগুলি চেষ্টা করেও মাসিক আয় বাড়াতে পারিনি। মাঝে মাঝে মরিয়া হয়ে দুর্নীতির পথে হাঁটার ইচ্ছে যে হয় না, সে-কথা বলতে পারি না। তবে ন্যায়বোধ ও যেটুকু শিক্ষাদীক্ষা রয়েছে, তাতে শেষমেশ অসৎ পথে হাঁটার ইচ্ছেটা এখনও অবধি সংবরণ করতে পেরেছি। কিন্তু যখন রোজগারের উপায় ক্রমশ সঙ্কুচিত, আর মূল্যবৃদ্ধি ক্রমশ দানবের আকার ধারণ করছে, তখন কতদিন এইভাবে চালিয়ে যেতে পারব, সত্যিই জানি না। আমাদের নিজস্ব সন্তান নেই, কিন্তু আমার ভাইঝি আমার সন্তানের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়, সেও তাঁর জেঠু ও জেঠিমা বলতে অজ্ঞান, তাকে ঘিরেই আমাদের সংসার, তাকে কাছে পেলে সমস্ত সমস্যা ও অনটনের মধ্যেও আমাদের জীবন যেন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

আমি নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ি। সকালে উঠে খবরের কাগজটা টেনে নেওয়া আমার বহু বছরের অভ্যেস। কিন্তু এখন প্রতিদিন খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে মনে হয় কাল থেকে খবরের কাগজ পড়াটা বন্ধ করে দেব। কিন্তু অভ্যেসের বশেই পরদিন সকালে আবার কাগজে হাত চলে যায়। যেসব খবর পড়ি, তার ফলে মনের মধ্যে এক প্রচণ্ড বিবমিষা তৈরি হয়। আমার রাজ্য ও দেশ এমনভাবে চলছে যে কোথাও একটুও ভাল কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দলমতনির্বিশেষে বেশিরভাগ রাজনীতিকের ক্ষমতার লোভ আকাশস্পর্শী; ক্ষমতাভোগীদের নিরাপত্তাহীনতা মাত্রাহীন হওয়ায় ন্যায়বোধ বলে তাঁদের কিছু নেই। ক্ষমতায় থাকার তাগিদে তাঁরা অনবরত মিথ্যাচার করে চলেন, বিশেষত প্রচারমাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই মিথ্যাচার আমাদের দেশে এখনও কাজে দেয়। হয়তো কোনওকালেই তাঁরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক দায়বদ্ধতা বিশেষ অনুভব করেননি, তবে সম্প্রতি মানুষের কাজে আসার চেয়ে মানুষদেরকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে কাজে লাগানোর প্রবণতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। নতুন প্রজন্মের যারা রাজনীতি বিষয়ে আগ্রহী, দুর্নীতির এক সে বড়কর এক নিদর্শনে তাদের মনে রাজনীতি বিষয়ে ঘৃণা বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, নয়তো শুধুমাত্র নীতিহীন পেশা হিসেবে রাজনীতিকে গ্রহণ করবার জন্যে অন্যায়, দুর্নীতি, মিথ্যাচার এবং আধিপত্য বিস্তারের কলাকৌশলগুলি রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে শেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মানুষের উপকার করা, তাদের ভরসা জোগানো, তাদের সক্ষম হয়ে উঠতে সাহায্য করবার চিন্তা মূর্খের আবেগ ছাড়া আর কিছু নয়, বহিরঙ্গে এইসব ভড়ং রাখতে হবে বটে, তবে আসল কাজ হল প্রয়োজনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতা দখল, ও যেনতেনপ্রকারে সেই ক্ষমতা আঁকড়ে পড়ে থাকা, এবং সামান্যতম বিরুদ্ধ মতকে পায়ের তলায় টিপে হত্যা করা। আমাদের দেশনির্মাতাদের স্বপ্নের গণতন্ত্র সত্যি কোনওদিন তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে কিনা, তা নিয়ে আমার মনে এক ঘোরতর সন্দেহ দানা বেঁধেছে।

যাঁরা আপাতত আমাদের দেশের মাথায় বসে ক্ষমতা ভোগ করছেন, তাঁরা সংসদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে এই সুযোগ-সুবিধাগুলি আরও বহুদিন উপভোগ করবার ব্যবস্থাটি পুরোমাত্রায় পাকা করে ফেলতে চান৷ আন্তর্জাতিক সূচকে আমাদের দেশকে ইতিমধ্যেই গণতন্ত্র থেকে জনসাধারণ নির্বাচিত একনায়কতন্ত্রের ধাপে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি চাই, বর্তমান শাসকের মাথা থেকে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ছাতাটি নির্বাচকরা অবিলম্বে টেনে সরিয়ে দিন৷ তবে পাশাপাশি এটাও সত্যি যে এবারের ভোটে সরকার-বদলের প্রতি যথেষ্ট জনমত তৈরি হবে, তা মনে করছি না। বর্তমান রাজনীতিতে বিরোধীদের ভূমিকা এতখানি নগণ্য হয়ে গেছে, যার ফলে সরকারের জনবিরোধী হওয়াটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ৷ সাধারণ নির্বাচন ২০২৪-এ এই ক্ষতিকর স্থিতাবস্থা নস্যাৎ হোক— এটুকুই চাই৷ বিরোধী রাজনীতি মজবুত হলে সরকারকে জনহিতের জন্যে পদক্ষেপ নিতেই হবে, আপাতত যার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে এবং আমাদের দেশ, গণতন্ত্র ও সংবিধানের পক্ষে এক চূড়ান্ত হানিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে৷ এতদসত্ত্বেও আমি ভোট দেব, প্রয়োজনে NOTA-র বোতামে দেব৷ আমার তো আজকাল খুব বেশি করে মনে হয় ইলেকট্রিক ব্যালটবক্সের এই শেষ বোতামটি আরও বেশি করে টিপে ভোটারদের অন্তত এই বার্তা দেওয়া উচিত জনপ্রতিনিধিদের— Enough is enough!

 


*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...