এক তাপদ্বীপের বাসিন্দা

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 


শহুরে তাপদ্বীপ বিষয়টি এখন শহরের নাগরিকসমাজের কাছে এক চরম বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে যে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার তীব্র মানুষী তাড়নায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপের আদানপ্রদানের স্বাভাবিক ছন্দটাই বিলকুল বদলে গেছে। আর এই কারণেই বেড়ে চলেছে তাপদ্বীপ বা শহুরে তাপদ্বীপের সংখ্যা। দীর্ঘমেয়াদি প্রবল দাবদাহের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে

 

আমরা এখন তাপদ্বীপেতেই থাকি
আজ শহর জুড়ে তাপের কোলাহল,
হেথায় থাকার সুখ গিয়েছে ঘুচে
এবার কোথা যাই গো শুধু বল!

নিশ্চয়ই নিবন্ধের শুরুতে এমন একটি ছড়া পড়ে পাঠকদের অনেকে হয়তো একটু-আধটু অবাক হচ্ছেন। তবে এই মুহূর্তে, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সবাই যখন অভূতপূর্ব দাবদাহের শিকার, তখন হয়তো ছড়ায় ছড়ানো কথাগুলোকে খুব একটা খারাপ লাগবে না। কেউ কেউ হয়তো মনে মনে ভাবছেন, একদম সত্যি কথা। শহরে আর থাকা চলে না। আসলে সুপ্রাচীন জম্বুদ্বীপের বাসিন্দারা এখন কমবেশি সবাই হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছে, তবে আমরা যারা শহরবাসীর ‌তকমা এঁটে বেশ খানিকটা গরিমায় তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে শুয়ে-বসে ছিলাম এতকাল তাঁদের‌ও প্রাণ আজ ওষ্ঠাগত। আরও যতদিন যাবে ততই বাড়বে এই শহুরে তাপদ্বীপের ক্ষেত্রীয় পরিসর। বিষয়টি যে মোটেই সুখকর হবে না তা আমরা সকলেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি সাম্প্রতিককালের এই তাপদাহের সৌজন্যে। কেন এমন পরিণতি আমাদের সেই কথা বিস্তারিত আলোচনার আগে বরং জেনে নিই তাপদ্বীপ, বিশেষ করে শহুরে তাপদ্বীপ, আসলে কী?

 

শহুরে তাপদ্বীপ কী?

দ্বীপ শব্দের অর্থ আমাদের সকলেরই জানা— যে ভূখণ্ডের চারিদিক জল দিয়ে ঘেরা, তাকেই আমরা বলি দ্বীপ। যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, শ্রীলঙ্কা। চারিদিক জল দিয়ে ঘেরা হ‌ওয়ায় একটি দ্বীপের জলবায়ু খুব আরামপ্রদ। কিন্তু একটি শহুরে তাপদ্বীপের সংজ্ঞা তাহলে কী হবে? এর উত্তরে বলা যায়— একটি শহর বা নগর জনপদ যখন তার সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো অবস্থান করে তখন তাকে আবহবিদ্যার পরিভাষায় বলা হয় ‘শহুরে তাপদ্বীপ’ বা ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’। এই যে খবরের কাগজের শিরোনামে আমরা দেখছি ব্যারাকপুরের তাপমান পুরুলিয়ার চেয়ে অনেক বেশি বা তাপমাত্রার হিসেবে কলকাতা ছাপিয়ে গেছে তার পাশের প্রতিবেশী শহরতলি এলাকাকে, এসব‌ই হল শহুরে তাপদ্বীপের প্রতিফল।

 

সুপ্রিয় পাঠক, আপনি যদি কোনও শহুরে জনপদের আবাসিক হন তাহলে আপনাকে কয়েকটি বিষয়ে একটু খেয়াল রাখতে বলব। আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে একটু যাচাই করে নিন এই সুযোগে। আপনি লক্ষ করুন—

দিনেরবেলার তুলনায় রাতে কি গরম বেশি বোধ করছেন?
বাইরে যখন বাতাস সেভাবে ব‌ইছে না তখন কি এই অনুভূতিটা বেশি মনে হচ্ছে?
তাপমাত্রার এই পার্থক্য কি গ্রীষ্ম ও শীত এই দুই সময়েই অনুভব করছেন?

এইসব প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলে জানবেন আপনি বা আপনারা এখন শহুরে তাপদ্বীপের বাসিন্দা। এই বিষয়টি এখন শহরের নাগরিকসমাজের কাছে এক চরম বিড়ম্বনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার তীব্র মানুষী তাড়নায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাপের আদানপ্রদানের স্বাভাবিক ছন্দটাই বিলকুল বদলে গেছে। আর এই কারণেই বেড়ে চলেছে তাপদ্বীপ বা শহুরে তাপদ্বীপের সংখ্যা। দীর্ঘমেয়াদি প্রবল দাবদাহের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে পৃথিবীর তাপমান বাজেটের খুঁটিনাটি হিসাব নিয়ে দুই-একটি কথা বলা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

 

পৃথিবীর তাপ বাজেট

সহজ কথায় বাজেট শব্দের অর্থ হল আয় ও ব্যয়ের খসড়া হিসাব। তাপ বাজেট‌ও সেই অর্থে পৃথিবীতে সৌরতাপের আগমন ও নির্গমনের একটা হিসাব মাত্র। এই বিষয়টি আমাদের সকলের‌ই জানা যে সূর্য থেকেই পৃথিবী আলো এবং তাপ দুইই লাভ করে। সূর্য পৃথিবীর প্রধান প্রাকৃতিক তাপীয় উৎস। সৌরতাপতরঙ্গ বায়ুমণ্ডলের সুবিস্তৃত গ্যাসীয় আবরণ ভেদ করে এলেও, তা কখনওই সরাসরি বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করতে পারে না। সূর্যের ক্ষুদ্র তাপতরঙ্গের দ্বারা পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ প্রথমে উত্তপ্ত হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ান্তরে ভূপৃষ্ঠ গৃহীত তাপ দীর্ঘ অবলোহিত রশ্মি বা অ্যালবেডোর আকারে ছেড়ে দেয়। এই গ্রহণ আর বর্জনের মাধ্যমেই পৃথিবীর তাপীয় ভারসাম্য বজায় থাকে, অন্তত এতকাল, তথাকথিত অ্যানথ্রোপসিন যুগের দৌরাত্ম্য শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত, বজায় ছিল। এই স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে বলেই পৃথিবী কখনও একেবারে খুব উষ্ণ বা শীতল হয়ে যায় না। এই আক্ষরিক ভারসাম্যের অবস্থাকেই বলা হয় পৃথিবীর তাপমান বাজেট।

পৃথিবীর কোনও এলাকার বায়ুমণ্ডল কী পরিমাণ তাপ ধরে রাখতে পারে তা নির্ভর করে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ঠিক কী পরিমাণ তাপ পুনঃবিকিরিত হচ্ছে তার ওপর। অবলোহিত রশ্মির বিকিরণকাল দীর্ঘতর, ফলে ভূপৃষ্ঠ দ্বারা গৃহীত তাপশক্তির বেশ কিছুটা পরিমাণ অংশ পার্থিব উপকরণগুলোর দ্বারা অধিশোষিত হয়। শহুরে উপাদানগুলো যেমন বাড়িঘর, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, উড়াল সেতু, ফুটপাথ সাধারণ প্রাকৃতিক ভূ-উপকরণগুলোর তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে তাপ ধারণ করে এবং তার বর্জনকাল‌ও অনেক ধীর ও দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে নগরবসতি স্থাপনের মধ্যেই তাপদ্বীপ সৃষ্টির বীজ নিহিত রয়েছে। এখন গেল গেল রব তুলে লাভ কী!

 

পাঠকদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে, যে পরিমাণ সৌরতাপ পৃথিবীতে আসছে তার সবটুকুই যদি ফিরে যায়, তাহলে পৃথিবীতে গড় তাপমাত্রা কেন এমন লাগামছাড়াভাবে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে? কেন‌ইবা শহরবাসী হিসেবে আমরা এখন তাপ-বিস্ফোরণের শিকার? কেন বলা হচ্ছে পৃথিবীর শহরকেন্দ্রিক জনপদগুলো এক একটি শহুরে তাপদ্বীপের আকারে অবস্থান করছে? অনেক অনেক প্রশ্ন উঠছে মানেই হল, আমার-আপনার নাগরিক মন প্রচণ্ড তাপদাহের শিকার হয়ে সম্ভাব্য পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে। এই বিষয়টি সকলের কাছেই খুব স্পষ্ট যে আমাদের চারপাশের একান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের যত রূপান্তর ঘটবে মানুষের হাতে, তত তার নেতিবাচক প্রভাবের ফল ভুগতে হবে আমাদের। গ্রামীণ বসতির পরিবর্তে ঝাঁ চকচকে নগরবসতির পত্তন নাগরিক পরিষেবার স্তরে যতটা সুবিধা যোগ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বিয়োগ করে শরীরী স্বস্তি ও শান্তি। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হয়— এই আপ্তবাক্যকে মাথায় রেখেই বলতে হয় শহুরে তাপদ্বীপের সৃষ্টি এমন‌ই চাওয়াপাওয়ার নিট প্রতিফল। জমির প্রাকৃতিক আচ্ছাদনের ভারসাম্য যত বিঘ্নিত হবে, যত বেশি করে নদী নালা খাল বিল বনপ্রান্তর উজাড় করে জমি জুড়ে নির্মিত হবে আধুনিক নগরবসতি তত বেশি করে বাড়বে আরবান হিট আইল্যান্ড, শহুরে তাপদ্বীপ। এখন আসুন আমরা একে একে মনের ভেতর গুমরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

 

কেন বাড়ে নগরীর তাপ?

বছর কয়েক আগের কথা। তখনও গিন্নির তৈরি ডালভাত খেয়ে, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ আর চপ্পল পায়ে গলিয়ে ইস্কুল আর বাড়ি, বাড়ি আর ইস্কুল করছি। প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে যখন প্রথম এই শহরতলির আবাসিক হয়ে এলাম তখনও গোটা অঞ্চলটি প্রশাসনিকভাবে পঞ্চায়েতের অধীনে। অনেক অনেক ফাঁকা জায়গা, সাবেক আমলের আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা গাছের শ্যামলিমা জড়ানো, কেমন যেন গেরাম-গেরাম ভাব। পল্লীর নামগুলোও যেন কেমন— পেয়ারাবাগান, বড়ুয়াবাগান, বুড়ির বাগান, শীলার বাগান, মুখার্জিবাগান, শিশিরকুঞ্জ এমনটা আর কী! বছর কয়েক যেতে না যেতেই আস্তে আস্তে তার পোশাকবদলের পর্ব শুরু হল। পঞ্চায়েতের গেঁয়ো তকমা লোপাট হল পৌরসভার কাছে। জমির চরিত্র বদলের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল সেই সাবেক ছায়াময় পল্লীতে পল্লীতে। ছায়াঘন আম জাম বট অশথেরা লোপাট হয়ে গেল সবার আগে। বাগানগুলো ভরে উঠল নতুন কিসিমের জঙ্গলে— কংক্রিটের আকাশছোঁয়া বৈচিত্র্যহীন ফ্ল্যাটবাড়িতে। নাগরিক পরিষেবার এমন দ্রুত সম্প্রসারণ টেনে আনল নতুন নতুন মানুষদের। হারিয়ে গেল সেই চেনা ছবিটা, আমার শহরতলির চেনা মুখচ্ছবি।

এসব কথা আক্ষেপ করে বলছি এমনটা নয়। সময় চাইছে তাই বদলেছে— এতে হাহাকার করে লাভ কী? কিন্তু এই রূপান্তরের বিনিময়ে কী পেলাম? এর হিসেবনিকেশও আজ অনিবার্যভাবে খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।

এ-কথা মানতেই হবে যে কোনও একটি শহরে আবাসিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয় প্রাকৃতিক হরিয়ালির বিনিময়ে। যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহর গড়ে তোলার পেছনে কোনও সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকে না বা থাকলেও তার রূপায়ণে সব পক্ষ সমান সচেষ্ট নয়, সেহেতু জমির আদর্শায়িত ব্যবহার পরিকল্পনার অভাব দেখা যায়। শহরে গাছের সংখ্যা কম হ‌ওয়ায় তার আবহিক পরিমণ্ডল পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন চরিত্রের হয়ে থাকে। গাছগাছালি কম মানে বাষ্পীয় প্রস্বেদনের মাত্রা কম, ফলে শহরের বাতাস অনেক শুকনো, অস্বস্তিকর। শহরাঞ্চলে গাছের সংখ্যা কম হ‌ওয়ায় বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে। গাছের সংখ্যা কম, বলে এই ক্ষতিকর তাপধারক গ্যাসটি গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অধিশোষিত হতে পারে না। পরিণতিতে বাড়তে থাকে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা। গাছের সংখ্যা কমে যায় বলে তাপ গ্রহণ ও বর্জনের স্বতঃস্ফূর্ত ভারসাম্য বজায় থাকে না যা স্বস্তিকর আবহাওয়ার প্রাথমিক শর্ত। শহরগুলোর তাপদ্বীপ হয়ে ওঠার পেছনে উপযুক্ত সংখ্যক গাছের অভাব একটা বড় কারণ। তাছাড়া গাছ থাকলে সূর্যতাপ গ্রহণ ও বর্জনের সমীকরণ‌ও অনেক বেশি সহনীয় পর্যায়ে থাকে।

গ্রাম ছাপিয়ে শহরায়নের ফলে ভূমির ব্যবহারিক চরিত্রে খুব বড়রকমের পরিবর্তন ঘটে। মাটির কাছাকাছির জীবন চাপা পড়ে যায় কংক্রিটের বাঁধানো মেঝের নিচে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে দিনের বেলায় যেমন এই কংক্রিটের বাঁধানো উপাদানেরা অত্যন্ত ধীরগতিতে সৌরতাপ গ্রহণ করে ঠিক সেভাবেই রাতে বা সূর্যাস্তের পর অত্যন্ত ধীর লয়ে তাপ বিমোচন করে। নগর সৌন্দর্যায়নের নামে শহরের বুকে কংক্রিটের আস্ফালন যত বাড়ছে ততই বাড়ছে শহুরে তাপমানের মাত্রা। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কংক্রিটে ঢাকা শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো বেশি হতে পারে। বিষয়টি যে খুব সুখকর অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে না তা আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে হয় না। ফুটপাথ ঢাকতে ইদানিং কংক্রিটের পেভ ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। এর ফলে শহুরে পরিমণ্ডলে একদিকে যেমন তাপমাত্রা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তেমনি কমছে ভৌমজলের সঞ্চয়। সাম্প্রতিক দুবাই বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে নগরায়ণের নামে ভূমিভাগ সম্পূর্ণভাবে কংক্রিটের চাদরে ঢেকে ফেললে বন্যা কি ভয়াবহ চেহারা নিতে পারে। শহরের তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে তথাকথিত কংক্রিটের যে বড় ভূমিকা রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

দুবাই, ২০২৪

 

শহরের অর্থনৈতিক জীবন গ্রামীণ এলাকার তুলনায় একদম আলাদা। কৃষি যদি গ্রামের অর্থনৈতিক যাপনের মূল ভিত্তি হয় তাহলে বলতে হয় শহুরে জীবনে শিল্প ও পরিষেবাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের প্রাধান্য। শিল্পাঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণার প্রাধান্য। ধূলিকণা তাপ শোষণ করে উষ্ণতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। শিল্পোৎপাদন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি করে বাড়তে থাকে শহরের পরিসর। যার অর্থ তাপদ্বীপের এলাকা ক্রমশ বেড়ে যাওয়া। শহুরে পরিবহন ব্যবস্থা কেবল বায়ুকে দূষিতই করে না বাড়ায় তাপমাত্রা। এ যেন সেই নাকের বদলে নরুণ পাওয়ার গল্প।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

আধুনিক নগরবসতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল গতানুগতিক গৃহ-স্থাপত্যশৈলীর প্রাধান্য। ব্যক্তিগত স্তরে বাড়ি তৈরি করা এখন প্রায় বন্ধ, সবাই এখন ফ্ল্যাটের আবাসিক। বাহ্যিক সৌষ্ঠবহীন শহুরে আবাসনগুলো এখন কেবলই বহুতলীয়। তাদের স্থাপত্যশৈলী মোটেই পরিবেশানুগ নয়। আগ্রাসী তাপদাহের মোকাবিলায় এগুলো মোটেই কার্যকর নয়, বরং এদের নির্মাণ শহুরে তাপদ্বীপের অন্যতম কারক। ভারতের মতো অতি জনবহুল দেশে সকলের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে এটাই নাকি একমাত্র বিকল্প। বেশি সংখ্যক মানুষের জন্য আবাসের ব্যবস্থা করতে হলে ইট সাজিয়ে ইঁটের ওপর এমন সুউচ্চ বাড়ি তৈরি করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। এর ফলে মানুষজনের যথেচ্ছ ছড়িয়ে পড়াকে নাকি ছোট পরিসরে আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে। এমন আকাশচুম্বী আবাসনের নির্মাণ শহুরে আকাশরেখায় বৈচিত্র্য আনলেও তা যে প্রকারান্তরে শহুরে তাপমাত্রা বাড়তে সহায়তা করছে তা বলা বাহুল্য। নানান উচ্চতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলো মাটির ওপরের বায়ুমণ্ডলে এক উচ্চাবচ তরঙ্গায়িত অবস্থার সৃষ্টি করে যা অ্যালবেডোর সঞ্চালন ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এছাড়া আকাশরেখার এমন পরিবর্তন বায়ু চলাচলের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে, এর ফলে বায়ুমাধ্যমে তাপ সঞ্চালন ব্যাহত হয়ে অস্বস্তিকর গুমোট আবহাওয়া আবাসিকদের ভোগান্তির কারণ হয়।

শহুরে তাপদ্বীপ সৃষ্টির পেছনে যান্ত্রিক তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এখন শহরবাসীর সামাজিক মানমর্যাদার প্রতীক। এই যন্ত্র ছাড়া গরমে বাঁচার কথা কেউই নাকি ভাবতে পারে না। অথচ আমরা জানি, যে এই যন্ত্র উপভোক্তার আরাম হলেও পরিবেশের জন্য ব্যারাম। এসি যন্ত্র থেকে নির্গত সিএফসি গ্যাস একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনহাউস গ্যাস যা বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। শহরের বাড়ি থেকে গাড়ি, বিপণি থেকে বৈঠকখানা সবকিছুতেই এখন শীতাতপ ব্যবস্থাপনার ছোঁয়া। আকাশছোঁয়া অট্টালিকার সারি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের শোভা শহুরে তাপদাহের অন্যতম শরিক হয়ে উঠেছে একালে।

 

শহর প্রকৃতির তৈরি নয়, মানুষের তৈরি এক জনপদ। গ্রামকে পেছনে ফেলে শহরের সামনে আসা। শহর হল জনবিস্ফোরণের নিউক্লিয়াস। শহরকে ঘিরেই বাড়তে থাকে নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্র পরিসর। শহর বাড়তে থাকে আপন নিয়মে, আপন ধারায়। এই বেড়ে ওঠার সঙ্গে তাল মিলিয়েই হয়তো বেড়ে ওঠে শহুরে তাপদ্বীপের এলাকা।

তবে একটা কথা এই সুযোগে বলে রাখা ভাল, যে শহরমাত্র‌ই তাপদ্বীপ হয়ে গেছে এমনটা কিন্তু নয়। প্রত্যেক শহরের একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে। সমুদ্রতীরবর্তী কোনও শহর, অথবা পাহাড়ের মাথায় গড়ে ওঠা কোনও শহুরে জনপদ আর দেশের মধ্যভাগে অবস্থিত কোনও শহর এক‌ইভাবে তাপীয় ফলের দ্বারা সংক্রামিত হয় এমন কিন্তু নয়। এদিক থেকে আঞ্চলিক আবহাওয়ার চরিত্র‌ও শহরের তাপীয় বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা পালন করে। আরও একটা কথা বলা হয়তো জরুরি। তা হল বিশ্ব-উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব হয়তো এক্ষেত্রে নেই। উষ্ণায়ন একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া, অন্যদিকে শহরের উষ্ণীভবন নিছকই একটি স্থানিক সমস্যা। যদিও এ-কথা মানতেই হবে যে বিশ্ব-উষ্ণায়নের কারণে আমাদের শহরগুলোর উষ্ণতাও বাড়ছে, আর কমছে শহরের আবাসিকদের স্বস্তি।

 

তপ্ত শহরের প্রভাবে

খুব গরম শহুরে বাতাবরণ তার আবাসিকদের স্বস্তি হরণ করে শুধু নয়, নাগরিক সমাজের ওপর রেখে যায় গভীর ছাপ। এই বিষয়ে এখন দু-একটা কথা বলা যাক।

উষ্ণতার পরিবর্তনের ফলে শহরের গড় তাপমাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়। শহরের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আবহাওয়ার প্রাথমিক উপাদানগুলোর মধ্যে উষ্ণতা অত্যন্ত প্রভাবশালী। আবহবিদদের মতে উষ্ণতা বাড়লে অন্যান্য উপাদান যেমন আর্দ্রতা, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির কার্যকারণ ভারসাম্যেও লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে। শহুরে তাপদ্বীপের প্রভাবে স্থানীয়ভাবে বায়ুচলাচলের পার্থক্য ঘটে, মেঘের গঠন ও বিন্যাসে আসে পরিবর্তন, বাড়তে পারে কুয়াশা ও ধোঁয়াশার সমস্যা, আর্দ্রতার মাত্রায় রদবদল ঘটায় পরিবর্তন হতে পারে অধক্ষেপণ তথা বৃষ্টির পরিমাণে‌। শহর মানেই হল সুউচ্চ অট্টালিকার সারি। এই কৃত্রিম উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাতাস বাড়িগুলোর খাড়া কংক্রিটের দেয়ালে বাঁধা পেয়ে সটান ওপরে উঠে যায় এবং অনেকটাই প্রাকৃতিক শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টির মতো বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত ঘটায়। দিনের বেলায় শহরের তাপমাত্রা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি থাকে তাই ওই সব এলাকার বায়ু এসে শহরের নিম্নচাপের এলাকায় ঢুকে পড়ে মেঘ সৃষ্টির মাধ্যমে বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করে। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে অনেক ক্ষেত্রেই আশপাশের এলাকার তুলনায় শহরে ৫০ থেকে ১১৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্যের কতটা পরিবর্তন ঘটায় সেই বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে। রয়েছে মতামতের ফারাক। তবে সকলেই এই শহুরে তাপদ্বীপের প্রভাবের বিষয়টিকে বিশেষ মান্যতা দিয়েছেন।

শহরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক বেশি হলে তা নাগরিকদের শরীর ও সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিজ্ঞানীদের মতে শহুরে জীবনে তাপপ্রবাহের প্রভাব অনেক সময় ধরে সক্রিয় থাকে বলে নাগরিকদের স্বস্তি হ্রাস পায়। রাতের বেলা তাপের প্রভাব বাড়ে বলে মানুষজন ঠিকঠাক ঘুমোতে পারে না। ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। গ্রামজীবনের শান্তির রাতঘুমের স্মৃতি তাদের তাড়া করে বেড়ায় দুঃস্বপ্ন হয়ে।

গরমে কাজকর্মের জন্য যারা বাইরে যেতে বাধ্য হন তাঁদের অনেকেই সান স্ট্রোক, হিট এক্সরশন, হিট ক্র্যাম্পের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। অনেক সময়ই এই উপসর্গগুলো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক বেশি। শহরের বায়ুতে ভাসমান ধূলিকণার পাশাপাশি কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, পার্টিকুলেট ম্যাটার প্রভৃতি অনেক অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। পরিস্রুত বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব থাকায় শহরের আবাসিকদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা অনেক দেখা যায় যা অনেকক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। শহরে বায়ুর স্বাভাবিক সঞ্চালন ব্যাহত হয় ফলে নাগরিকদের মধ্যে তার খারাপ প্রভাব পড়ে।

 

শহরের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে শহরে বসবাসকারী পশুপাখিদের ওপর‌ও তার প্রভাব পড়ে। এই বিষয়ে পৃথিবীর নানা দেশে গবেষণা চলছে। প্রাথমিকভাবে লক্ষ করা গেছে যেসব প্রাণী উষ্ণ আবহাওয়া পছন্দ করে, তারা বসবাস তথা প্রজননের ব্যাপারে শহুরে উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে খুব একটা অসুবিধা বোধ করে না। নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের আবাসিক প্রাণীদের কাছে এই উষ্ণতা বৃদ্ধি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে কেননা প্রবল শীতল আবহাওয়া তাদের জীবনসংগ্রামের পক্ষে মোটেই অনুকূল নয়। তবে এক্ষেত্রে প্রাণীদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় তাদের খাদ্য, বাসা তৈরির মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত-বিষয়ে। তবে শহরের স্থায়ী আবাসিক প্রাণীরা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেকটাই বাধ্য হয়।

শহুরে তাপদ্বীপের সৃষ্টি বিদ্যুৎ পরিষেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। সাম্প্রতিক তাপদাহের মোকাবিলায় শহরের সক্ষম আবাসিকদের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর ফলে এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে সুনিশ্চিত করতে উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছে। বাড়ছে এই খাতে বিনিয়োগ। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া ও ছাই, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সিএফসি বাতাসের উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। কিছু মানুষের স্বস্তির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বৃহত্তর নাগরিক সমাজের উৎকণ্ঠা।

 

বাঁচিব কেমনে! শহুরে গরমে…!

এ-ও এক মোক্ষম প্রশ্ন বটে। দিনকতক আগে কোনও এক সুজন বন্ধু প্রভাতী শুভেচ্ছা জানিয়ে অসম্ভব চিন্তার বিষয় নিয়ে একটা কার্টুন পাঠিয়েছিল। কার্টুনটি এখানে তুলে দিলাম যাতে সবাই অন্তত একবার চোখে দেখতে পায়।

 

এই কার্টুনের মধ্যে দিয়েই তাপদাহ প্রশমনের সমস্ত উপায়গুলো বলে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে। নগরায়ন বিশেষ করে শহুরে বহুতলের নির্মাণপ্রকৃতি পরিবেশের ভারসাম্য একেবারে নেড়েঘেঁটে দিয়েছে। গাছের কোনও বিকল্প নেই। আজকের শহরগুলোতে হাজারো পরিষেবা সুলভে পাওয়া গেলেও পর্যাপ্ত সংখ্যক গাছের দেখা মিলবে না। গাছ বহু উদ্দেশ্যসাধক— তাপনিরোধক‌, জীববৈচিত্র্য-সংরক্ষক, বৃষ্টির কারক, অ্যালবেডো বৃদ্ধির সহায়ক। এই কারণেই শহরের চারদিকে গাছ, বিশেষ করে পর্ণমোচী প্রজাতির গাছ, লাগানোর কথা বলছেন পরিবেশবিদরা, যারা গ্রীষ্মে দেবে অধিক ছায়া আর শীতকালে সাদরে আমন্ত্রণ জানাবে সৌরালোককে। শহরের বুকে গাছ থাকলে তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় ৫ থেকে ৭ ডিগ্রির মতো কম হয়। পাশাপাশি শহরের বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করে গাছেরা শহরের তাপীয় ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

শহর মানেই হল কংক্রিটের মলাটে মোড়া অবকাঠামো। এমন অবস্থা তাপমাত্রা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। অবকাঠামোয় সবুজের ছোঁয়া থাকলে তা উষ্ণতা কমাতে সাহায্য করে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন সবুজ অবকাঠামো নির্মাণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

সমস্যা গহীন। অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের সকলকে। খুব ইতিবাচক ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে এগোলে নিশ্চয়ই এই সমস্যার নিরসনে খানিকটা সফল হয়তো হব। মনে রাখতে হবে শহরটা আমাদের। তাই তার তাপজ্বর কমাতে কমাতে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...