স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলা গান: বিবর্তনের ধারা ও পরম্পরা— ৮

অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়

 




লেখক ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতে মগ্ন, কথা ও সুরে সঙ্গীতস্রষ্টা, একটি বাংলা ব্যান্ডের ভোকালিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও পিয়ানিস্ট। সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় ও টেকনিকাল বিষয়ে যেহেতু সকলে সমানভাবে অবগত নন, অবগত থাকার কথাও নয়, তাই সকল পাঠকের সুবিধার্থে গত পর্বগুলির মতো এই পর্বে আবারও লেখক নিজে পিয়ানো বাজিয়ে এবং গেয়ে কয়েকটি অডিও ক্লিপের মাধ্যমে বিভিন্ন সঙ্গীতকারদের গানগুলিকে বিশ্লেষণ করেছেন। আগ্রহী পাঠক সেই অডিও ক্লিপগুলি শুনে নিতে পারেন।

 

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

বাংলা গানের শ্রেষ্ঠতম সুরকারদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুধীন দাশগুপ্ত। তাঁর সঙ্গীত ছিল বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন জ্যঁরের সঙ্গীতকে ব্যবহার করেছেন বাংলা গানের মধ্যে। লন্ডন স্কুল অফ মিউজিকের এই প্রাক্তনী বাংলার সঙ্গীতজগতে পা রাখেন কমল দাশগুপ্তর সহকারী হিসাবে। তারপর গণনাট্য আন্দোলনের সংস্পর্শে আসেন। “ওই উজ্জ্বল দিন”, “স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে” বা “এই ছায়াঘেরা কালো রাতে”-র মতো অসংখ্য গান তিনি তৈরি করেছেন গণনাট্য সংঘের জন্য। এই গানগুলিতে তাঁর সুর-সৃজনের অসামান্য পরিচয় পাওয়া যায়। “ওই উজ্জ্বল দিন” গানটি ইওরোপীয় লোকসঙ্গীতের আদলে তৈরি। “স্বর্ণঝরা সূর্যরঙে” নির্মিত হয়েছে তাঞ্জানিয়ার একটি লোকগীতির সুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মিশ্রণে এবং সেখানে থার্ড এবং ফিফথ্ হার্মোনি প্রযুক্ত হয়েছে, এবং উক্ত সুরের প্রভাবেই তিনি সৃষ্টি করেন “কী নামে ডেকে” (যা শ্যামল মিত্র কণ্ঠস্বরে প্রকাশিত হয়ে কালজয়ী হয়ে উঠেছে) এবং “তোমার হাসি লুকিয়ে হাসে” (যা রেকর্ড করেছিলেন সুবীর সেন)। এছাড়াও “এই ছায়াঘেরা কালো রাতে” গানটির সুরের মধ্যে পাশ্চাত্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব প্রকট হয়েছে। চাইকভস্কির ‘Nutcracker Suite’-এর অন্তর্গত ‘Chinese Dance’-এর অনুপ্রেরণায় তিনি কম্পোজ় করেছেন “মোর গান শিশিরের ঝরা সুরে গো” গানটা। বিশিষ্ট অস্ট্রিয়ান কম্পোজ়ার ফ্রিৎজ়্ ক্রাইসলারের বিখ্যাত ওয়ালৎজ় কম্পোজ়িশন “Liebeslied” (জার্মান থেকে ইংরেজি ভাষায় তর্জমা করলে এই “লিবেসলিড” শব্দের অর্থ হয় “Love Song”) থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ‘তিন ভুবনের পারে’ সিনেমার জন্য নির্মাণ করেছিলেন ‘হয়ত তোমারই জন্য’ গানের সুর। লক্ষ করলে বোঝা যাবে যে, মূল কম্পোজ়িশন ছিল মাইনর স্কেলে, কিন্তু সুধীনবাবু যখন তার ওপরে কাজ করেছেন, তখন সেখানে মেলোডিকে প্রায় অক্ষুণ্ন রেখে কর্ড স্ট্রাকচারে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তিনি; অর্থাৎ, সবকটা মাইনর কর্ডকে মেজর কর্ড দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছেন। আবার, ওই একই সিনেমাতে “জীবনে কী পাব না” গানটাকে সম্পূর্ণভাবে রক অ্যান্ড রোলের আঙ্গিকে গড়ে তুলেছেন সুধীনবাবু। ‘বসন্ত বিলাপ’ সিনেমার সাউন্ডট্র্যাক কম্পোজ় করার সময়েও একজন বৈচিত্র্যপূর্ণ সুরকার হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন সুধীন দাশগুপ্ত। “আমি মিস ক্যালকাটা” গানটা রয়েছে রক অ্যান্ড রোলের শৈলীকে আশ্রয় করে। আবার, “আগুন, লেগেছে লেগেছে আগুন” গানটায় পরস্পরের সঙ্গে একাত্মভাবে মিশে গেছে খেয়ালের আঙ্গিক এবং রক অ্যান্ড রোল। মেলোডির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যে রাগ মালকোষ আর মাইনর ব্লুজ়ের স্কেল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে একে অপরের সঙ্গে। সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে এই গানটা একটা সার্থক ফিউশন। অনুরূপভাবে “এবার তোকে কে বাঁচাবে” গানটায় রাগ বাগেশ্রী মিশে গেছে রক অ্যান্ড রোলের ছন্দে এবং অর্কেস্ট্রেশনে। “এলোমেলো হাওয়ায় হারিয়ে যেতে চায়” গানটার সুরের মধ্যে প্রকট হয়েছে মধ্য ও পূর্ব ইওরোপের লোকসঙ্গীত— বিশেষত, পোল্কা (Polka)-র ধরণ। ওই একই জ্যঁরের উপাদান ব্যবহার তিনি কম্পোজ় করেছেন “আজ মন চেয়েছে, আমি হারিয়ে যাব”, “এল বরষা যে সহসা মনে তাই” বা “ঝিরিঝিরি চৈতালি বাতাসে”-র মতো গান। “এক যে ছিল বাঘ” গানটার মধ্যে স্কটিশ লোকসঙ্গীতের সুরের প্রভাব পাওয়া যায়। বোসা-নোভা (Bossa Nova)-র ছন্দ ব্যবহার করে তিনি সৃষ্টি করেছেন “এই শহর থেকে আরও অনেক দূরে”। “এত সুর আর এত গান” গানটা বিশুদ্ধ পাশ্চাত্য শৈলীর গান।

বিভিন্ন রাগ থেকে তাদের সুরকে অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কার থেকে মুক্ত করে তাদের অধিশীলিত, সাবলীল এবং সর্বজনীন করে তোলার অসামান্য দক্ষতার অধিকারী ছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করে নেওয়া যেতে পারে, “তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা” গানটায় মালকোষ রাগের সঙ্গে কীভাবে স্বল্প মুহূর্তের জন্য সুধীনবাবু ভৈরবী রাগ প্রয়োগ করেছেন, অথবা “তুমি কি এমনি করেই থাকবে দূরে”-তে কীভাবে রাগ দেশী, রাগ ভীমপলশ্রী, রাগ আশাবরী আর রাগ নায়কী কানাড়ার খণ্ডাংশ জুড়ে জুড়ে তিনি গানটার মেলোডিটা নির্মাণ করেছেন। “কে প্রথম কাছে এসেছি” গানটা মূলত পাশ্চাত্য শৈলীর গান হলেও খুব সূক্ষ্মভাবে স্থায়ীতে তিলক কামোদ রাগ এবং অন্তরায় ছায়ানট আর খাম্বাজ রাগের প্রয়োগ রয়েছে। “তোমারে পেয়েছি বলে” গানটা পুরোপুরি বাগেশ্রী রাগকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। “কেন তুমি ফিরে এলে”-র সুরেও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আঙ্গিকের মধ্যে আশাবরী ঠাটের বিভিন্ন রাগের প্রগ্রেশনের সূক্ষ্ম আভাস পাওয়া যায়।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আবহে বেড়ে উঠলেও সুধীন দাশগুপ্ত বাংলার লোকসঙ্গীতের পরিসরে বেশ স্বচ্ছন্দেই যাতায়াত করেছেন। রীতিমতো বাউলদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বাউল গান সহ পল্লীগীতির বিভিন্ন ধারার সুরবৈচিত্র্য সফলভাবে আয়ত্ত করে নিজের গানের মেলোডিতে প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন তিনি। “শহরটার এই গোলকধাঁধায় আঁধার হল মন”, “ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়” বা “কোকিল কাঁদে কেন ফাগুনে”-র মতো গানই এর উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। “চোখের নজর কম হলে” গানটায় লোকসঙ্গীতের সুরের পাশাপাশি তিনি ব্যবহার করেছেন কর্ণাটী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বহুল ব্যবহৃত মরসিং নামক বাদ্যযন্ত্র।

অস্কার ওয়াইল্ডের ‘The Selfish Giant’ অবলম্বনে ভাস্কর বসু একটা অডিও গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন, নাম ছিল ‘হিংসুটে দৈত্য’। সেই গীতিনাট্যের সুরকার হিসাবে সুধীন দাশগুপ্ত যথেষ্ট উৎকৃষ্ট শৈল্পিক ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। এই গীতিনাট্যে রয়েছে তাল এবং সুরের বৈচিত্র্য। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিউজিকাল ন্যারেশনে মান্না দের গানের অংশে কখনও মধ্য এশিয়া এবং ককেশীয় অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের সঙ্গে ভৈরবী, পিলু এবং বসন্ত মুখারী রাগ মিশে গেছে, কখনও বা ন্যারেশনের সুর বদলে যাচ্ছে মেজর স্কেলে; তাল এবং ছন্দেরও পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। অংশুমান রায়ের ব্যারিটোন ভয়েস সার্থকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে দৈত্যের চরিত্রে। অংশুমানবাবুর গানের অংশেও সুর ছন্দ এবং তালের পরিবর্তন হয়েছে সিচুয়েশন অনুসারে। শিশুদের গানেও বদলে যাচ্ছে রাগ, স্কেল ছন্দ এবং তাল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, শিশুশিল্পীদের দিয়ে হার্মোনি গাওয়ানো হয়েছে। এই গীতিনাট্যের কম্পোজ়িশনের উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হল ভোকোডার (Vocoder)-এর নিপুণ ব্যবহার। কাঠবেড়ালি, হাঁস, সিংহ, শীতকাল এবং উত্তুরে হাওয়াকে যেহেতু পার্সোনিফাই করা হয়েছে, তাই এই চরিত্রদের ন্যারেশনের ক্ষেত্রে অ্যানালগ ভোকোডার ব্যবহার করা হয়েছে তাদের ডাকের সঙ্গে কণ্ঠশিল্পীদের স্বরকে মেশানোর জন্য। এই পদ্ধতিতে, কল্পচিত্রগুলোকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন সুধীন দাশগুপ্ত।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...