দেবর্ষি সারগীর গল্প ‘রূপান্তর’: দলিত জীবনের একটি আখ্যান

শতানীক রায় 

 



কবি, গদ্যকার, সম্পাদক ও অনুবাদক 

 

 

 

আসলে আমরা কাকে দলিত বলি? যে-মানুষ দলনের শিকার হয় সে-ই দলিত। প্রচলিত মতে একমাত্র সমাজের নিচু জাতির মানুষেরাই দলিত হিসেবে স্বীকৃত। সরাসরি চলে আসি প্রবন্ধের মুখ্য বিষয়ে। দেবর্ষি সারগীর ‘রূপান্তর’ গল্পের প্রধান চরিত্র গল্পের কথককে আমি দলিত হিসেবে চিহ্নিত করব। তার বাড়ির লোকজনও দলিত। সেই গ্রামের মানুষজনও দলিত। যদিও গল্পে কোথাও তাদের জাতের কোনও উল্লেখ নেই। আর এই দলিত অবস্থান ততক্ষণ থাকবে যতক্ষণ গল্পের আর-এক চরিত্র পুরোহিতের অবস্থান থাকবে। তার ক্ষমতা এবং উচ্চতর অবস্থা কথক এবং তার গ্রামের মানুষদের ওপর প্রভাব ফেলবে, শোষণ করবে, ভীত দমিত করে রাখবে তাদের।

প্রচলিত মত অনুযায়ী একজন দলিত লেখকই যথাযথভাবে দলিতদের কথা লিখতে পারবেন। দলিতদের ব্যথা অনুভব করতে পারবেন। তাঁদের চিৎকার লেখায় লিপিবদ্ধ করতে পারবেন। আমার এখানে খানিকটা ভিন্ন মত আছে। একজন মানুষ দলিত না হয়েও দলিতের আখ্যান লিখতে পারেন। তাঁকে মনের গভীরে গিয়ে একজন দলিতের ব্যথা আর্তনাদ অনুভব করতে হবে। ঠিক এখানে লেখক উচ্চবর্ণের হয়েও দলিতের গল্প লিখতে পারেন। পারবেন ফুটিয়ে তুলতে দলিত জীবনের আর্তনাদ। শরণকুমার লিম্বালে মনে করেন উচ্চবর্ণদেরও দলিতদের নিয়ে লেখার অধিকার আছে। তিনি বলেছেন—

উচ্চবর্ণরা দলিতদের নিয়ে আগেও লিখেছে, যেমন— প্রেমচন্দ প্রমুখ। আর আজ কমলেশ্বর ও রাজেন্দ্র যাদবের মতো ব্যক্তিরা লিখছেন। আপত্তি যদি থাকে তাহলে তার পিছনে মূলত দুটো কারণ আছে। প্রথমত, প্রগতিশীল মতাদর্শের লেখকরা উপদেষ্টার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দ্বিতীয়ত, তাঁদের লেখায় দয়াভাব, অনুকম্পা থাকে। আমাদের কারও সহানুভূতির প্রয়োজন নেই, হক ও অধিকার চাই। কলাকৈবল্যবাদী লেখকদের ক্ষেত্রে তারা যেভাবে দলিতদের দুনিয়াকে দেখে সেই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভুল। তাদের দলিত মহিলাদের চিত্রণে যৌন আবেদন মিশে থাকে। দলিত চরিত্রগুলোকে অপরাধী হিসাবে তুলে ধরা হয়। তৃতীয়ত, উচ্চবর্ণ সাহিত্যে কোনও দলিত চরিত্রকে নায়ক করা হয় না। দলিত লেখকগণ প্রথমবার দলিত চরিত্রকে নায়কের ভূমিকায় জন্ম দিলেন এবং দলিত চরিত্রকে কেন্দ্র করেই আখ্যান, কবিতা লিখলেন। উচ্চবর্ণ লেখকদের লেখায় দলিত চেতনা পাওয়া যায় না। কেউ যদি জন্মগত দলিত হয়ও, কিন্তু তার লেখায় যদি দলিত চেতনা না থাকে, সে প্রেমের গল্প লিখছে, গোয়েন্দা গল্পের মতো কিছু লিখছে তাহলে সে কিন্তু দলিত লেখক নয়।

দেবর্ষি সারগীর গল্পে ফিরে আসি। যে-কোনও লেখার সঠিক মনন এবং অবস্থান বিচার করতে গেলে লেখকের রাজনৈতিক সামাজিক অবস্থানের দিকে তাকাতে হবে। লেখক দেবর্ষি এখানে তথাকথিত উচ্চবর্ণের না হলেও জাতিগত অবস্থানে নিচুবর্ণের নন। লিম্বালে কথিত বক্তব্যের কয়েকটা যুক্তি দেবর্ষি সারগীর এই গল্পের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ এবং রাজনীতির অনুষঙ্গে প্রযোজ্য হয়।

ক। দেবর্ষি তাঁর গল্প ‘রূপান্তর’-এ কোথাও উপদেশ দেওয়ার প্রচেষ্টা করেননি। সেটা গল্পের ন্যারেশন নিবিড়ভাবে লক্ষ করলে বুঝতে পারব আমরা। গল্পে উপদেশমূলক কিছু নেই। গল্পটা এগোয়। গল্পে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রকটভাবে দেখানো হয়েছে। এবং সেখানে প্রতিবাদ আছে ‘না’-এর মাধ্যমে। আর এই ‘না’-এর মধ্যে দিয়ে একজন দলিতের মুক্তির উপায় দেখানো হয়েছে। আর এখানে কোথাও কোনও উপদেশ নেই। লেখক শুধুমাত্র ঘটনার বিবরণ দিয়ে এগিয়ে চলেছেন পরিণতির দিকে। দলিতমুক্তি। ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে জন্ম নেওয়া আরোপ অভিশাপ কলঙ্ক যে মানুষের মধ্যে নানাভাবে প্রসারিত হয় তাকেও লেখক তাঁর একদম স্বতন্ত্র দর্শনের উপায়ে মুক্ত করছেন।

খ। গল্পে দলিত চরিত্রটির প্রতি কোথাও সহানুভূতি প্রদর্শন করা হয়নি। উলটো দিকে দলিতমুক্তি ও ব্রাহ্মণ্যবাদী চেতনা শৃঙ্খল থেকে মুক্তির দিগন্তও খুলে দিয়েছেন লেখক।

গ। এখানে দলিত চরিত্রটিকেই নায়ক করা হয়েছে। এখানে একটি পশুকেও দলিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেও নয়ক। তার ভূমিকা অপরিসীম। তার কার্যকলাপেই দলিতমুক্তি এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের পরাজয় সম্ভব হয়েছে।

আর-একটা দিক হল সবসময় যে আমাদের প্রমাণ করতেই হবে দলিত জীবনের লেখা সবসময় এই কিছু ধারণার ভেতর সীমিত থাকবে এমন নয়। মানুষী চেতনার আরও অনেক দমিত দলিত অবস্থাও থাকে সে-সব নিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। সে-কারণে হতেই পারে একজন লেখক দলিত না হয়েও দলিত জীবনের গল্প লিখছেন তাতে কোনওরকমভাবে দলিতকে অসম্মান বা অবিচার না করে উচ্চবর্ণের অত্যাচার অবিচারের ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরছেন। এ দিক দিয়ে দেবর্ষি সারগীর গল্প ‘রূপান্তর’ এর যথাযথ উদাহরণ।

এই গল্প শুরুই হচ্ছে গল্পের কথক যে কিনা গল্পের প্রধান চরিত্র, ধু-ধু মরুভূমিতে পড়ে আছে। তার গ্রাম তার বাড়ি আত্মীয়স্বজন থেকে অনেক দূরে। সবার প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে কেন একজন মানুষ ধু-ধু মরুতে গিয়ে পড়ে আছে। আমরা শুরুতে আন্দাজ করতে পারি না যে, এটা তারই গল্প, তার দলিত জীবনের আখ্যান। একজন মানুষ প্রখর দাবদাহে মরুভূমিতে পড়ে আছে সেটা বড়ই আশ্চর্যজনক! পরবর্তীতে গল্পের গতিপ্রকৃতি এবং সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ার পর টের পাওয়া যায়। আর কথক তার গ্রামের পুরোহিতকে দেখতে পায় ভরদুপুরে। এখানে ‘ভরদুপুর’-এর প্রাসঙ্গিকতা ভীষণ। সময়টা যে কত প্রতিকূল এখানে, প্রতিকূলতা এখানে অবস্থান এবং পরিস্থিতিকে পরিষ্কার করে। পুরোহিত একটা ঘোড়ায় চেপে চলেছেন। আর হঠাৎই ঘোড়াটা আর চলতে চাইছে না। অনেক টানাহেঁচড়া, চাবুক বর্ষণ, ভাষার আক্রমণ সত্ত্বেও সেই ঘোড়া চলতে রাজি হয় না। শেষপর্যন্ত যখন কথকের চেষ্টায় ঘোড়া দৌড়াতে থাকে, ঘোড়ার প্রতিবাদ চমকে দেওয়ার মতো। এই প্রতিবাদের জন্য পরিষ্কার হল যে, ঘোড়াটাও এই গল্পে দলিত। পুরোহিতের কাছে অত্যাচারিত।

এ-গল্পে কয়েকটা দিক নিয়ে আলোচনার ভীষণ প্রয়োজন। গল্পের কথককে কেন আমি দলিত বলছি? কথকের মুখেই তার ছেলেবেলার কথা জেনে মনে হয়েছে যে, এই পুরোহিত তাদের পরিবার শুধু নয় সারা গ্রামের মানুষদের দমিত করে রাখত। নানারকম বুদ্ধি করে গ্রামবাসীদের থেকে সুবিধা আদায় করত। কথকের বাড়িতেও করেছিল। আতঙ্কিত করে রাখত। “বাবা মুখ তুলে তাকানোর পর বললেন, আমার মনে হচ্ছে পরের জন্মে ও কোনও বানরের কানের লতিতে একটা উকুন হয়ে ঝুলে থাকবে।” এমনভাবে ভয় দেখিয়ে ছোটবেলায় তাদের থেকে অনেক খাদ্য আদায় করে নিয়ে যায়। যার জন্য কথক ও তার ভাইবোনেরা দেড়দিন ভালো করে খেতে পায়নি। এও তো একধরনের শোষণ, অত্যাচার! পুরোহিততন্ত্রের জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। আসলে এই গল্প শুধুমাত্র পুরোহিততন্ত্রের উদাহরণ নয় আমার মনের মধ্যে যুগ যুগ ধরে সৃষ্টি হওয়া বদ্ধমূল চেতনার নিমেষে বিনাশও বটে যেটা নিয়ে আলোচনা করব এই প্রবন্ধে। কথকের আবার পায়ের একটা সমস্যা আছে। যেটা তাকে আরও কোণঠাসা করে দেয় সমাজে। সে এতটাই পীড়িত যে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে তাকে মরুভূমিতে থাকতে হচ্ছে। আর সে প্রতিদিন আহার গ্রহণ করে না, প্রায় দিন খায়। এবং তাদের দারিদ্র্যেরও উল্লেখ আছে গল্পে।

ঘোড়াকে হাজার চেষ্টা করেও যখন পুরোহিত পারলেন না নড়াতে। পুরোহিত তখন কথককে বললেন দেখার জন্য। যদি সে পারে তাকে নড়াতে। আর কথকের অল্প চেষ্টাতেই ঘোড়া চলতে শুরু করল। আর পুরোহিতকে ঘিড়ে ঘোড়াটা কথককে নিয়ে পাক খেতে লাগল। এই গল্প খুব মন দিয়ে পাঠ করলে বোঝা যাবে যে কত সহজ ভাষা প্রয়োগে এই গল্প অনেকটাই রূপকথার মতো। রূপকথায় যেমন রোমাঞ্চ আছে। একটা সুখপ্রদ শেষ আছে। রূপকথায় খারাপ কিছু ঘটলেও শেষটা ভালোই হয়। ভাষাপ্রয়োগ দেখলে বোঝা যাবে যে গল্পের চলনে রূপকথার মতো ছবিটা ফুটে ওঠে। আর এই রূপকথার শৈলী ভেদ করে যখন পুরোহিততন্ত্র পরাস্ত হয় তার আনন্দ আমার পাঠকে ফুল্লরিত করে।

আমি চেপে বসলাম। লাগাম ও চাবুক ধরে টান দিতেই ঘোড়াটার পিঠের দুপাশে হঠাৎ একজোড়া ডানা গজিয়ে গেল, কারণ সে তীরবেগে ছুটতে লাগল। আমিও খুব জোরে ছোটাতে লাগলাম ঘোড়াটাকে। বেশ খানিকটা দূরত্ব রেখে পুরোহিতকে কেন্দ্রবিন্দু করে সে বৃত্তের মতো পাক দিয়ে ছুটতে লাগল।

যা কিছু ঘটছে তার চলনটা রূপকথায় হয়। আর বাস্তবের কঠোর দিকটা এভাবে লেখক তুলে ধরছেন যেন বাস্তবটা ঠিকঠাক ধরার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে কল্পনা। লেখক নিজের কল্পনার মাধ্যমে পাঠককে কল্পনা করাচ্ছেন আর নিয়ে যাচ্ছেন সেই শূন্যস্থানে যেখানে গল্পের বাইরে অনেক বাস্তব উন্মুক্ত আছে।

আসলে এখানে পুরোহিতকে আমরা তিনভাবে দেখতে পারি। এক, পুরোহিততন্ত্রের একটা উদাহরণ হিসেবে যে কিনা গ্রামবাসীদের (শিষ্যদের) শোষণ করে নিজের জীবন জীবিকা রক্ষা করে চলেছে। দুই, এই মরুভূমির মধ্যে একটা ঘোড়া নিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তারে চলেছিলেন পুরোহিত। এমনিতে আবার ভরদুপুর। দুপুর হল মানুষের কর্মের সময়। পুরোহিত আবার এখানে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতীক। নিজের শক্তির বিস্তারে নতুন শিষ্যদের খোঁজে চলেছিলেন। তিন, মানুষের বহু বছরের সঞ্চিত অভ্যাস বা চেতনার ভেতরে গ্রথিত হওয়া কুসংস্কার অপচিন্তা ভ্রান্তি এবং আবরণের প্রতীক।

গল্পের শেষের দিকে ঘোড়া যে কথককে নিয়ে ছুটছে আনন্দে, আর কথক মুক্তির আস্বাদ পাচ্ছে সেটা একদম গল্পের রাজনীতির সঙ্গে যথাযথ। এর মধ্যে কথক ও ঘোড়া দু-জনেই প্রতিবাদ জানাচ্ছে পুরোহিতকে। যদিও কথক নিজের ইচ্ছায় এই পদক্ষেপ নেয়নি। ঘোড়ার এই চালচলনের অংশীদার হয়ে তার একরকম মুক্তিই ঘটল যেন। কথক এখানে প্রতিবাদ নিজে থেকে করেনি সেটাও একধরনের ব্রাহ্মণ্যবাদের গ্রাস থেকে মুক্ত না-হওয়া মানুষদের কথা মনে করিয়ে দেয়। অথচ তারা মুক্ত হতে চায়। ভারতে কীভাবে প্রবল ব্রাহ্মণ্যবাদ ছড়িয়ে আছে সেটাও এখানে দেখার উল্লেখ রাখে। আর পুরোহিতের মরুভূমি প্রদেশে যাত্রা— এর ভেতরেও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিস্তারকেই বোঝায়।

আর শেষমেষ গল্পটা সবকিছু ভেঙে দিয়ে কোথায় যে বিলুপ্ত হয়। জীবনের গল্প জীবনের কষ্ট এমনভাবেও প্রকাশ করা যায় সেটা দেবর্ষি সারগীর গল্প উপন্যাস না পড়লে বোঝা মুশকিল। ঘোড়া যখন থামছে না। যখন থামার কথা অনেকবার বলার পরও কথক ঘোড়াটাকে থামিয়ে আনছে না পুরোহিতের কাছে তখন পুরোহিত অভিশাপ দিতে শুরু করে কথককে। আর তখনই হঠাৎ কথকের মনে এমন এক চেতনার উদয় হয় যেখান থেকে ভাঙন শুরু হয়। কথক ঘোড়ার পিঠে চেপে ছুটতে ছুটতে ভাবল— “অভিশাপের ভয়ঙ্কর পাখিটা আমার মাথার উপর দিয়ে তখনও একটা দুঃস্বপ্নের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু ভয় পাচ্ছিলাম না আমি। কারণ জগতে বাদুড়, পায়খানার পোকা, উকুন বা যক্ষ্মার জীবাণুদের জীবনেরও একটা তাৎপর্য আছে, একটা মায়া ও নিমগ্নতা আছে, সুখদুঃখের রহস্যময় খেলাটা আছে। উকুন হয়ে জন্মেছে বলে একটা উকুন কখনওই নিজেকে ধিক্কার দেয় না।” কথক মনে মনে উকুন বা পোকা বা বীজাণু হয়ে জন্মানোর প্রার্থনা করতে লাগল ঈশ্বরের কাছে। এখানে তার ঈশ্বর ‘মা’। হয়তো কোনও দেবী। এখানেও লেখক গল্পের প্রবাহে খানিক স্নেহ এনে দিলেন এই মায়ের প্রসঙ্গ এনে। এই অনুভব গল্পের বাইরে চলে গিয়ে জীবন স্পর্শ করতে চায়। মানুষের ধ্বংসাত্মক চেতনার বিপরীতে এই গল্প। কথক কাঁদছে শেষে— মুক্তির সুখ ও আচ্ছন্নতায়।

 

২.

সবসময় খেয়াল রাখতে হবে দেবর্ষি সারগীর অন্য লেখার মতো এই গল্পেও একটা বিকল্প বাস্তব আছে। তাঁর লেখায় বিকল্প চেতনার খোঁজ থাকে। সে আমরা ‘ভ্রমণসঙ্গী ঈশ্বর’ পড়ি বা ‘হাজার সূর্যের আলো’ বা ‘নরহত্যা’ বা অন্যান্য লেখা। এখানে যখন অসহায় কথক জীবনে কিছুই করতে না পেরে সুদূর মরুভূমিতে পড়ে আছে আমার একটা প্রশ্ন বার বার মনে হয়েছে যে, একজন মানুষ কেনই-বা ধু ধু মরুভূমিতে একা পড়ে থাকবে? পুরোহিতের অত অভিশাপ বর্ষণের পরও ঘোড়াকে থামাল না। কারণ, তাঁর জীবনের এত অপ্রাপ্তি যে, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোড়ার পিঠে সে এমন মুক্তির আস্বাদ পাচ্ছে যা আজীবন কোথাও সে পায়নি। আসলে এই প্রবন্ধে আমি এতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়ের গভীরে গিয়ে মীমাংসা করার চেষ্টা করিনি। শুধু বিবরণ দিয়েছি, কারণ, বিবরণেরও প্রয়োজন আছে। কারণগুলিকে চিহ্নিত করা আগে দরকার। যাঁরা গল্পটা পড়েননি তাঁদের কাছে গল্পের রূপরেখা এবং তার গতিপ্রকৃতি জানানো প্রয়োজন। মাঝে মাঝে আমি বলে গেছি কী এবং কেন হতে পারে। এবং এই সবটাই ছোট ছোট মন্তব্যে। আর এখন আমার ভীষণ মনে হচ্ছে, যে, আমার যেন গভীরে তলিয়ে ভাবতে হবে আসলে কেন গল্পকার এমন গল্প লিখলেন। একজন পাঠকের কাছে নিজের পাঠের উদ্দেশ্য ঠিক থাকা দরকার। কেন আমি একটা গল্প পড়ছি। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হল একটি গল্প বা উপন্যাসকে পাঠক কীভাবে পড়ছেন। যখন একটা লেখা মননের অনেকটাই দাবি করে। আর নিজের ব্যক্তিগত বোধের পরিসর থেকে প্রত্যেক পাঠকই সাহিত্যপাঠ করেন। এখানে দাঁড়িয়ে কতটুকু গল্পের যথাযথ উদ্দেশ্য এবং লেখার দার্শনিক অভিঘাতে পৌঁছাতে পারছেন পাঠক— এখান থেকে প্রতিটা মহৎ লেখার নতুন নতুন পাঠ তৈরি হয়।

প্রশ্ন যখন উঠলই তাহলে এই পাঠের মধ্যে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করা যাক। আমি এই গল্পকে দলিতজীবনের আখ্যান বলতেই পারি কিন্তু দেবর্ষির লেখার সঙ্গে পরিচিত হলে অনেকসময়ই মনে হবে এই ধরে নেওয়ার ভেতরে অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। তবুও কোনও সময় কোনও একটা দিকে ঝুঁকতে হয়। ‘রূপান্তর’ পড়তে গিয়ে খুব ভালো করে অনুভব করলে দেখা যাবে এর স্রোত অনেকটাই রূপকথার মতো। আমি আগেও এর কথা বলেছি, উল্লেখ করেছি কিছু প্রসঙ্গ প্রয়োগের দিক থেকে। এখন শুধু এটুকুই বলব যে, গল্পে শেষপর্যন্ত একটা শুভর ইঙ্গিত থাকছে। আর বিকল্প বাস্তবের গতি অন্যরকম। জীবনের ভীষণ কাছাকাছি পৌঁছে দেখা এই গল্প কেন আবার বিকল্পের পথ বেছে নিচ্ছে। হতে পারে বিকল্প বাস্তব প্রয়োজন হয়ে পড়ে বাস্তবের অবস্থান আরও বেশি বুঝতে। বাস্তব নিয়ে ততক্ষণ আমরা ভাবতে চাই না যতক্ষণ না বাস্তবের সহজতা আমাদের কাছে অস্বচ্ছ। বা বর্তমান-অতীতের অবস্থান পরিষ্কার অনুভব করব তখনই যে-মুহূর্তে বাস্তবের প্রতিটা ধাপে ধীরে ধীরে বাস্তবের অবস্থানটাই বদলাতে থাকবে। আর সেখান থেকে পূর্ণতা অসম্পূর্ণতা বুঝে নেব। আর সেই লেখা যদি পাঠকের জন্য যথেষ্ট শূন্যতার অবকাশ রাখে। ভাবায় সেখান থেকে।

আমি সবসময় বিশ্বাস করি, আমি একজন পাঠক। আমার সবরকম সীমাবদ্ধতা এবং সীমিত অভিজ্ঞতা নিয়েই একটা লেখা পড়ব। আমি ‘রূপান্তর’ পাঠের মধ্যে বেশি করে লক্ষ করেছি পুরোহিতের শরীরী ভাষা-ভঙ্গিমা। ক্রোধে আর অপমানে পুরোহিতের মুখের রং তার বস্ত্রের মতো লাল হয়ে উঠল। লেখক এখানে শরীর আর পরিধানের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা না দিলেও কল্পনা করতে পারতাম। অদ্ভুত পরিহাস— লেখক সঠিকভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে গল্পে রূপায়ণ করেছেন, পুরোহিতের এই তীব্র ক্রোধ দেখেও কথকের কিন্তু ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে ইচ্ছে করেনি।

এই গল্পকে দলিত-আখ্যান বলেছি তার আরও একটা কারণ, এই গল্পের প্রধান চরিত্র (যাকে দলিত বলছি), গল্পকার তার মুখেই গল্পটা বলিয়েছেন। আর কোনও এক অতীতের ঘটনামালার স্মৃতিচারণই হল এই গল্প। এখানে কোথাও কি গল্পের লেখকের দিকেও আমাদের তাকাতে হবে, যে, কেন তিনি উত্তম পুরুষে এমন একজন দলিতের গল্প লিখতে গেলেন? প্রশ্ন উঠবেই। গভীরভাবে ভাবলে বুঝতে পারব, পুরোহিততন্ত্র থেকে মুক্তির আস্বাদ কতটা আমাদের মধ্যে বিকল্প জীবনের আলোড়ন ফেলছে। যেখানে উঠে আসছে— মানুষই একমাত্র নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সন্তুষ্ট হয় না, আপন অস্তিত্বকে প্রশ্নে জর্জরিত করে। সেটা অন্য জীবের মধ্যে ঘটে না। এই গল্পই যদি উত্তম পুরুষে লেখা না হত তাহলে আমাদের পড়তে ভালো লাগত না। এই গল্পের চলনে যেহেতু রূপকথার সহজতা এবং বিকল্প জগৎ আছে, সেটা উত্তম পুরুষে লেখা না হলে এতটা ঘটত না।

গল্পের একেবারে শেষ অংশটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। সেটা একটু পড়া যাক—

আমার ঘোড়াটা তার শরীরের পাশ দিয়ে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল, এবং আর তার দিকে ফিরে এল না। ঘোড়াটা আমাকে নিয়ে ছুটে চলেছে একেবারে সামনের দিকে, নিজেরই খেয়ালে, কারণ আমি ওকে কোনওরকম নিয়ন্ত্রণ করছিলাম না। বাতাসে আমার তেলহীন, রূপহীন, তামাটে চুলগুলো পেছনে উলটে সোঁ সোঁ করে উড়ছিল। আমার আধবোজা দু-চোখে অদ্ভুত সুখ, তৃপ্তি। অভিশাপের ভয়ঙ্কর পাখিটা আমার মাথার উপর দিয়ে তখনও একটা দুঃস্বপ্নের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু ভয় পাচ্ছিলাম না আমি। কারণ জগতে বাদুড়, পায়খানার পোকা, উকুন বা যক্ষ্মার বীজাণুদের জীবনেরও একটা তাৎপর্য আছে, একটা মায়া ও নিমগ্নতা আছে, সুখদুঃখের রহস্যময় খেলাটা আছে। উকুন হয়ে জন্মেছে বলে একটা উকুন কখনওই নিজেকে ধিক্কার দেয় না। সুখের অনুভবে আমি তখন এমন আচ্ছন্ন যে ইচ্ছে করছিল একবার একটু উকুন হয়ে জন্মাই। একবার উকুন করে জন্ম দিস মা, একবার বাদুড় করে বা পোকা ও বীজাণু করে!

খুব কাঁদছিলাম। আর ঝোড়ো বাতাস আমার ভেজা চোখদুটোয় আছাড় খেয়ে খেয়ে আমার সুখ ও আচ্ছন্নতাকে আরও গাঢ়, নিবিড় করে তুলছিল।

ঘোড়াটা প্রথমে পুরোহিতকে ঘিরে বা আশপাশে দৌড়াচ্ছিল। একেবারে শেষে এসে দেখছি সে ক্রুদ্ধ পুরোহিতকে শেষমেষ সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে। তাকে অতিক্রম করে দূরে পাড়ি দিল। ঘোড়াটা যে কথককে নিয়ে এগোচ্ছিল সেখানে কথক কোনওরকম নিয়ন্ত্রণ করেনি। এরই মাঝে “বাতাসে আমার তেলহীন, রূপহীন, তামাটে চুলগুলো পেছনে উলটে সোঁ সোঁ করে উড়ছিল।” এমন ছবির মতো দৃশ্য এবং গল্প যেভাবে বলা হয়েছে তার ভেতর আমরা আবার রূপকথার আঁচ পাচ্ছি। গল্পের ঘটনা এবং পর পর যেভাবে গল্প এগিয়েছে— গল্পের মধ্যে একের পর এক ঘটনা যেভাবে সাজানো হয়েছে এখান থেকে স্পষ্ট এটার গঠন রূপকথার আঙ্গিক থেকেই গৃহীত। রূপকথাকে গল্পে ব্যবহার না করে নিজে একটা রূপকথা লিখেছেন লেখক। আর এর মধ্যে দিয়ে সমাজের এই বর্ণবৈষম্য ও পুরোহিততন্ত্রকে দেখানো হয়েছে। লেখক দেবর্ষি এখানেই থেমে থাকেননি। আর-একটা বিভ্রান্তির জায়গা থেকে যায়, দেবর্ষির অন্য গদ্যের মতো এ-লেখাতেও ভাষা এত সাবলীল সেখানে মনেই হতে পারে আমাদের এই বর্তমান বহুরৈখিক সময়ে এই লেখার চলন কীভাবে মিলবে। আমি বলব এই চলনই বয়ে নিয়ে চলে গল্পকে। বৃহৎ জীবনপথের থেকে কিছু টুকরো কিছু ঘটনা ভেঙে আনেন লেখক আর তাতে চেতনার নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। কী ঘটতে পারে একটা নির্দিষ্ট পদক্ষেপের পর সেটা আমরা জীবনের পথ চলতে গিয়ে আগে থেকেই আঁচ করতে পারি। অথবা এই আঁচ করার ভেতরেও নানারকম ভাঙনের খেলা কাজ করে। দেবর্ষি এটাকেই সহজভাবে মীমাংসা করেন। চলন একটা আয়না, আবার নিহিত মনস্তত্ত্ব আর-এক আয়না। আরও একটা বিকল্প চেতনার আয়না আর মাঝখানে পাঠক। তাঁর চেতনায় কিছু হলেও প্রভাব ফেলে লেখার দর্শন। এখানে “অভিশাপের ভয়ঙ্কর পাখিটা আমার মাথার উপর দিয়ে তখনও একটা দুঃস্বপ্নের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল, কিন্তু ভয় পাচ্ছিলাম না আমি। কারণ জগতে বাদুড়, পায়খানার পোকা, উকুন বা যক্ষ্মার বীজাণুদের জীবনেরও একটা তাৎপর্য আছে, একটা মায়া ও নিমগ্নতা আছে, সুখদুঃখের রহস্যময় খেলাটা আছে। উকুন হয়ে জন্মেছে বলে একটা উকুন কখনওই নিজেকে ধিক্কার দেয় না।” এটা পড়লেই বুঝতে পারব যে, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে নিজের জন্মকে ধিক্কার জানায়। হা-হুতাশ করে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে। আর এখান থেকে আরও স্পষ্ট যে, পুরোহিত অভিশাপ দিয়েছিল কথককে, আগামী জন্মে সে বাদুড়, পায়খানার পোকা, উকুন বা যক্ষ্মার বীজাণু হবে। এটা মানুষ তার ক্ষমতা এবং মনুষ্যত্বের আত্মগরিমা থেকেই বলতে পারে। কারণ, সে ভাবে অন্য জীব হয়ে জন্মানো অভিশাপের তুল্য। অথচ, লেখক এক বিকল্প চেতনার উন্মেষ ঘটাচ্ছেন, এসব জীব হয়ে জন্মানো কোনও অভিশাপই নয়, কারণ, সেইসব জীবেরা আমাদের মতো নিজেদের অস্তিত্বকে সন্দেহের চোখে দেখে না। তার অর্থ একটি পোকা কখনওই নিজেকে ধিক্কার দেয় না! আমাদের প্রচলিত বদ্ধমূল চেতনা নিমেষেই বদলে গেল। আর এই অভিশাপের মধ্যেই কথক মুক্তি খুঁজে পাচ্ছে। আর শেষপর্যন্ত মুক্তির আস্বাদ পেয়েও এখানে প্রতিবাদ করে ওঠেনি কথক। প্রথাগত দলিত আখ্যানের মতো প্রতিবাদ এখানে নেই। বরং শান্তির পথে বিকল্প পথ খুঁজে নেওয়া আছে। নদী এখানে বাঁক নিয়ে দিকপরিবর্তন করল যেন। যেটা বলা হল না, শেষ দুটো অনুচ্ছেদে যা কিছু পরিবর্তন ঘটছে, তা ঘোড়ার দ্রুত ছোটার মধ্যে হচ্ছে। পাঠকও ছুটছেন। চেতনার এই আমূল পরিবর্তন আসলে এমন পরিবেশেই ঘটে, ঘটতে পারে। নিয়তির এই গতিকে বদলকে ‘রূপান্তর’ বলতেই পারি আমি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...