সের্গেই আইজেনস্টাইন
ব্যাটলশিপ পোটেমকিন-এর শতবর্ষ হল। ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। ব্যাটলশিপ পোটেমকিন সম্পর্কে আলাদা করে কিছু বলা, আমাদের পাঠকদের এই ছবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বাহুল্য এবং নিষ্প্রয়োজন। আমরা সে চেষ্টা করব না। পাঠক বরং পোটেমকিন-এর নির্মাণ সম্পর্কে এর স্রষ্টা সের্গেই আইজেনস্টাইনের কথা পড়ে দেখুন। আইজেনস্টাইনের নোটস অফ আ ফিল্ম ডিরেক্টর-এর একটি অধ্যায় অরগানিক ইউনিটি অ্যান্ড প্যাথস: ইন দ্য কম্পোজিশন অফ পোটেমকিন-এর বঙ্গানুবাদ রইল আমাদের এই সংখ্যার স্টিম ইঞ্জিনে।

পোটেমকিন সম্পর্কে আলোচনায় সাধারণত দুটি দিক বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়— এক, সামগ্রিক নির্মাণের জৈবনিক ঐক্য। আর দুই, ছবিটির প্যাথস[1]।
পোটেমকিন-এর এই দুটি সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিককে সামনে রেখে, আসুন দেখি— বিশেষত নির্মাণের ক্ষেত্রে— কোন কোন উপায়ে এগুলি অর্জিত হয়েছে। প্রথম বৈশিষ্ট্যটি আমরা ছবিটির সামগ্রিক নির্মাণের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করব। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে, আমরা ওডেসা সিঁড়ির পর্বটি নেব— যেখানে ছবিটির প্যাথস চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়— এবং তারপর সেই বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলো পুরো ছবিটির ওপর প্রয়োগ করব।

এই গুণাবলিগুলি নিশ্চিত করতে যে নির্মাণগত উপায়গুলি ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলির দিকেই আমরা আমাদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করব। একইভাবে আমরা আরও নানা উপাদান নিয়েও আলোচনা করতে পারতাম; যেমন— অভিনেতাদের অভিনয়, কাহিনির ট্রিটমেন্ট, আলোকচিত্রে আলোর ও রঙের স্কেল, প্রাকৃতিক পটভূমি, গণদৃশ্য ইত্যাদি কীভাবে জৈবনিক ঐক্য ও প্যাথস নির্মাণে অবদান রেখেছে তা খতিয়ে দেখা যেত। কিন্তু এখানে আমরা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব— তা হল কাঠামোর প্রশ্ন— এবং ছবিটির সমস্ত দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের চেষ্টা করব না।
তবু, একটি সুসংবদ্ধ শিল্পকর্মে যে উপাদানগুলি সমগ্র কাজটিকে পুষ্ট করে, সেগুলি সেই কাজটি নির্মাণকারী সমস্ত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই পরিব্যাপ্ত থাকে। একটি একীভূত ক্যানন কেবল সমগ্র রচনাটিকে ও তার প্রতিটি অংশকে ভেদ করে চলে না, বরং নির্মাণপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আহ্বান করা প্রতিটি উপাদানের মধ্যেও তা প্রবেশ করে। এক ও অভিন্ন নীতি সমস্ত উপাদানকেই পুষ্ট করে, যদিও প্রতিটির ক্ষেত্রে তা গুণগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়। কেবল এই অবস্থাতেই আমরা কোনও শিল্পকর্মকে সুসংবদ্ধ বলে বিবেচনা করতে পারি— এখানে “অর্গানিজম” ধারণাটি সেই অর্থেই ব্যবহৃত, যেভাবে এঙ্গেলস তাঁর Dialectics of Nature-এ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন:
অর্গানিজম নিঃসন্দেহে একটি উচ্চতর ঐক্য।
এতেই আমরা আমাদের বিশ্লেষণের প্রথম বিষয়ে এসে পৌঁছই— পোটেমকিন নির্মাণের জৈবনিক ঐক্য।
এই সমস্যাটির দিকে আমরা এই প্রস্তাবনা থেকে এগোই যে, কোনও শিল্পকর্মের জৈবনিক ঐক্য এবং ঐক্যের অনুভূতি তখনই অর্জিত হতে পারে, যখন সেই শিল্পকর্ম নির্মাণের বিধান প্রাকৃতিক সুসংবদ্ধ ঘটনাবলির কাঠামোগত বিধানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হয়। এই প্রসঙ্গেই লেনিন বলেছিলেন—
সাধারণের দিকে নিয়ে যায় এমন সম্পর্কের বাইরে বিশেষের কোনও অস্তিত্ব নেই। সাধারণ কেবলমাত্র বিশেষের মধ্যেই, বিশেষের মাধ্যমেই অস্তিত্বশীল।
প্রথম বিশ্লেষণটি আমাদের স্থিতিশীল অবস্থায় ঐক্য নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মসমূহের অধ্যয়নের জন্য উপাদান জোগাবে; দ্বিতীয়টি সেই নিয়মগুলির গতিশীল কার্যকারিতা অনুধাবন করতে আমাদের সাহায্য করবে। সুতরাং, প্রথম পর্যায়ে আমরা শিল্পকর্মের কাঠামোর অন্তর্গত অংশ ও অনুপাত নিয়ে আলোচনা করব। দ্বিতীয় পর্যায়ে— শিল্পকর্মের কাঠামোর গতির সঙ্গে।
বাহ্যিকভাবে পোটেমকিন ঘটনাবলির একটি ক্রনিকল হলেও, দর্শকের কাছে তা একটি নাটক হিসেবেই প্রতিভাত হয়।
এই প্রভাবের রহস্য নিহিত রয়েছে কাহিনির নির্মাণে, যা ঐতিহ্যগত পাঁচ অঙ্কের ট্র্যাজেডির কঠোর নির্মাণবিধি অনুসারে গড়ে তোলা হয়েছে।

ঘটনাগুলি, প্রথমে যেমন সরল তথ্য হিসেবে ধরা হয়, সেগুলোকে পাঁচটি ট্র্যাজেডি অঙ্কে বিভক্ত করা হয়েছে। তথ্যগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যাতে একটি ধারাবাহিক সমগ্র গঠিত হয়, যা ক্লাসিক্যাল ট্র্যাজেডির প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ: দ্বিতীয় অঙ্ক থেকে পৃথক একটি তৃতীয় অঙ্ক, প্রথম অঙ্ক থেকে পৃথক একটি পঞ্চম অঙ্ক, এবং এভাবেই অন্যান্য।
ট্র্যাজেডির এই চিরাচরিত কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে প্রতিটি “অঙ্ক”-এর আগে থাকা উপশিরোনামের মাধ্যমে।
এখানে পাঁচটি অঙ্ক:
১. মানুষ ও পোকামাকড়: কাহিনির পরিচিতি। যুদ্ধজাহাজের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি। মাংস পোকামাকড়ে ভরা। নাবিকদের মধ্যে অশান্তি।
২. কোয়ার্টার-ডেকে নাটক: “সকলকে ডেকে আনা হোক!” নাবিকরা পোকামাকড়পূর্ণ স্যুপ খেতে অস্বীকার করে। টারপলিন দৃশ্য। “ভাইরা!” অগ্নিসংযোগ করতে অস্বীকার। বিদ্রোহ। অফিসারদের ওপর প্রতিশোধ।
৩. মৃতের আহ্বান: কুয়াশা। ওডেসা বন্দরে ভাকুলিনচুকের দেহ। মৃতদেহের প্রতি শোকপ্রকাশ। সভা। লাল পতাকা উত্তোলন।
৪. ওডেসা সিঁড়ি: তটরেখা এবং যুদ্ধজাহাজের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ। সরবরাহবাহী নৌকা। ওডেসা সিঁড়িতে গোলাবর্ষণ।
৫. স্কোয়াড্রনের সঙ্গে সাক্ষাৎ: প্রত্যাশার রাত্রি। স্কোয়াড্রনের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ইঞ্জিন। “ভাইরা!” স্কোয়াড্রন অগ্নিসংযোগ করতে অস্বীকার করে।
প্রতিটি অংশের ঘটনাপ্রবাহ আলাদা হলেও, সেগুলো যেন দ্বিগুণ পুনরাবৃত্তির পদ্ধতিতে ভরা এবং সংহত করা হয়েছে।
“কোয়ার্টার-ডেকে নাটক” অঙ্কে, বিদ্রোহী নাবিকদের একটা অংশ যুদ্ধজাহাজের কর্মীদের গোলাবর্ষণ দলের উদ্দেশে চিৎকার করে, “ভাইরা!” রাইফেল নামানো হয়। পুরো ক্রু বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত হয়।
“স্কোয়াড্রনের সঙ্গে সাক্ষাৎ” অঙ্কে, বিদ্রোহী জাহাজ— নৌবাহিনীর একটি অংশ— অ্যাডমিরালের স্কোয়াড্রনের ক্রুদের উদ্দেশে চিৎকার করে, “ভাইরা!” এবং পোটেমকিনের দিকে তোলা সব বন্দুক নামানো হয়। পুরো নৌবহর পোটেমকিনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
যুদ্ধজাহাজের অর্গানিজমের একটি উপাদান থেকে পুরো অর্গানিজম পর্যন্ত; নৌবাহিনীর অর্গানিজমের একটি উপাদান— যুদ্ধজাহাজ— থেকে নৌবাহিনীর পুরো অর্গানিজম পর্যন্ত। এভাবেই বিপ্লবী ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি বিষয়ভিত্তিকভাবে বিকশিত হয়; এবং শ্রমিক ও বিপ্লবের ভ্রাতৃত্বের বিষয়কে কেন্দ্র করে শিল্পকর্মের নির্মাণও এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়।
সেন্সরের চোখরাঙানি সত্ত্বেও, পোটেমকিন ছবিটি পুঁজিবাদী দেশগুলোতে শ্রমিক-ভ্রাতৃত্বের ধারণা ছড়িয়ে দেয়, তাদের কাছে পৌঁছে দেয় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ “হুররে!”— ঠিক যেমন ছবির ভেতর বিপ্লবী ভ্রাতৃত্বের ধারণা বিদ্রোহী জাহাজ থেকে তটরেখায় ছড়িয়ে পড়ে।
ভাবগত ও আবেগগত প্রভাবের বিচারে এটুকুই ছবিটিকে একটি সুসংবদ্ধ-সমগ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত; তবু আমরা ফর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে এর কাঠামোটি পরীক্ষা করে দেখতে চাই।
একটি সাধারণ বিষয়সূত্রে আবদ্ধ এটির পাঁচটি অংশে বাহ্যিক দিক থেকে খুব কম মিল রয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত দিক থেকে এগুলি সম্পূর্ণ অভিন্ন— এই অর্থে যে প্রতিটি অঙ্ক স্পষ্টভাবে প্রায় সমান দুটি ভাগে বিভক্ত, এবং এই বিভাজন দ্বিতীয় অঙ্কে আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।
টারপলিন দৃশ্য — বিদ্রোহ।
ভাকুলিনচুকের জন্য শোক — ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের সভা।
ভ্রাতৃত্ব — গোলাবর্ষণ।
স্কোয়াড্রনের জন্য উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা — বিজয়।
তদুপরি, প্রতিটি “রূপান্তর” মুহূর্তেই একটি বিরতি দ্বারা জোর দেওয়া হয়েছে— একটি সিজুরা।
তৃতীয় অঙ্কে এই রূপান্তরটি প্রকাশ পায় কয়েকটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের শটে— যা নিহত সহযোদ্ধার জন্য শোক থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদের দিকে উত্তরণকে নির্দেশ করে।
চতুর্থ অঙ্কে এই ভূমিকা পালন করে “হঠাৎ” শিরোনামটি— যা ভ্রাতৃত্বের দৃশ্যকে আকস্মিকভাবে ছেদ করে গোলাবর্ষণের দৃশ্যের সূচনা করে।
দ্বিতীয় অঙ্কে এটি স্থির হয়ে থাকা রাইফেলের নল; আর পঞ্চম অঙ্কে— বন্দুকের হা করা মুখ এবং “ভাইরা!” সেই উদ্গার, যা প্রত্যাশার নিস্তব্ধ নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে ভ্রাতৃত্বের অনুভূতির এক প্রবল ঢল জাগিয়ে তোলে।
এই বিভাজন-বিন্দুগুলির লক্ষণীয় দিক হল, এগুলি কেবলমাত্র কোনও ভিন্ন আবহে, ভিন্ন ছন্দে বা ভিন্ন ঘটনার দিকে রূপান্তর নির্দেশ করে না; বরং প্রতিবারই দেখায় যে রূপান্তরটি ঘটছে একেবারে বিপরীত গুণগত স্তরে। একে শুধু ‘বৈপরীত্য’ বলা যথেষ্ট নয়: একই বিষয়ের চিত্র প্রতিবারই উপস্থাপিত হয় সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে— যদিও সেই উপস্থাপনাটি বিষয়ের ভেতর থেকেই স্বাভাবিকভাবে উদ্ভূত।
এইভাবে, রাইফেলের মুখের নিচে অপেক্ষার অসহনীয় টানাপোড়েনের পরেই বিদ্রোহের বিস্ফোরণ ঘটে (দ্বিতীয় অঙ্ক)।
নিহত সহযোদ্ধার জন্য গণশোকের পর আসে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ (তৃতীয় অঙ্ক)।
ওডেসা সিঁড়িতে গোলাবর্ষণ ঘটে পোটেমকিনের বিদ্রোহী নাবিকদের সঙ্গে ওডেসার জনগণের ভ্রাতৃসুলভ আলিঙ্গনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির স্বাভাবিক জবাব হিসেবে (চতুর্থ অঙ্ক)।
নাটকের প্রতিটি অঙ্কে পুনরাবৃত্ত এই ধরনের ক্যাননের ঐক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই ঐক্যই পোটেমকিন ছবিটির সামগ্রিক কাঠামোর বৈশিষ্ট্য।

ছবিটি সম্পূর্ণতাতেও প্রায় মধ্যবিন্দুতে একটি আকস্মিক স্থবিরতা— একটি সিজুরা— দ্বারা বিভক্ত, যেখানে প্রথম অর্ধের প্রবল গতিশীল ক্রিয়া সাময়িকভাবে থেমে যায় এবং দ্বিতীয় অর্ধ ধীরে ধীরে গতি সঞ্চয় করতে শুরু করে।
ভাকুলিনচুকের দেহ এবং ওডেসার কুয়াশা-সংবলিত পর্বটি পুরো ছবির জন্যও তেমনই একটি সিজুরা হিসেবে কাজ করে।
এই মুহূর্তে বিপ্লবের বিষয়টি একটি বিদ্রোহী যুদ্ধজাহাজ থেকে ওডেসায় বিস্তৃত হয়— যে শহরটি ভৌগোলিকভাবে জাহাজের বিপরীতে অবস্থান করলেও আবেগগতভাবে তার সঙ্গে একাত্ম। কিন্তু বিষয়টি যখন আবার সমুদ্রের দিকে ফিরে আসে, তখন শহরটিকে সৈন্যরা তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় (সিঁড়ির পর্ব)।
আমরা দেখতে পাই যে বিষয়টির বিকাশ সুসংবদ্ধ, এবং এই বিষয়গত বিকাশ থেকেই যে ছবির কাঠামোর জন্ম, তা সমগ্রে যেমন, তেমনি তার বড় ও ছোট সমস্ত অংশেও অভিন্ন।
সার্বিকভাবে ঐক্যের নিয়ম সর্বত্র অনুসৃত হয়েছে।
অনুপাতের বিচারে, জৈবনিক ঐক্য প্রকাশ পায় সেই ধারণায়, যাকে নন্দনতত্ত্বে বলা হয় “স্বর্ণ বিভাজন” (গোল্ডেন সেকশন)।
স্বর্ণ-বিভাজনের নীতিতে নির্মিত কোনও শিল্পকর্ম সাধারণত সর্বাধিক কার্যকর হয়ে ওঠে।
এই নীতিটি প্লাস্টিক আর্টস-এ বিস্তৃত ও পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে।
সঙ্গীত ও কবিতার মতো শিল্পকলায় এই নীতির প্রয়োগ তুলনামূলকভাবে কম, যদিও নির্ভয়ে বলা যায় যে এসব ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগের এক বিশাল সম্ভাবনাক্ষেত্র রয়েছে।
আমার মনে হয় না যে কোনও চলচ্চিত্রকে কখনও স্বর্ণ-বিভাজনের নীতিতে যাচাই করা হয়েছে।
সেই কারণে আরও বেশি আগ্রহজাগানিয়া এই সত্যটি যে, যার জৈবনিক ঐক্য সর্বজনবিদিত— সেই পোটেমকিন ছবিটি এই নীতির উপরই ভিত্তি করে নির্মিত।
ছবিটির প্রতিটি অংশে এবং সমগ্র ছবিটির ক্ষেত্রে যে বিভাজনের কথা আমরা বলেছি, সেখানে আমরা বলেছিলাম— “প্রায় সমান দুটি অংশ।” বাস্তবে কিন্তু এই অনুপাতটি ২:৩-এর কাছাকাছি, যা স্বর্ণ-বিভাজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাযুজ্যপূর্ণ।
ছবিটির প্রধান সিজুরা— অর্থাৎ যে “শূন্য” বিন্দুতে ক্রিয়া স্থগিত হয়— তা অবস্থিত দ্বিতীয় অঙ্কের সমাপ্তি ও তৃতীয় অঙ্কের সূচনার মধ্যবর্তী স্থানে, অর্থাৎ ২:৩ অনুপাতে।
আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এটি দ্বিতীয় অঙ্কের শেষেই অবস্থান করছে; কারণ সেখানেই মৃত ভাকুলিনচুকের বিষয়টি প্রথম উত্থাপিত হয়। একইভাবে, ছবিটির পৃথক পৃথক অংশের মধ্যকার সিজুরাগুলিও অনুরূপভাবে সরে যায়।
পোটেমকিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল— স্বর্ণ-বিভাজনের নীতি কেবল “শূন্য” বিন্দুর ক্ষেত্রেই নয়, বরং চূড়ান্ত পরিণতির বিন্দুর ক্ষেত্রেও অনুসৃত হয়েছে। এই পরিণতির বিন্দুটি হল যুদ্ধজাহাজে লালপতাকা উত্তোলনের মুহূর্ত। এই ঘটনাটিও স্বর্ণ-বিভাজনের একটি বিন্দুতেই ঘটে, তবে বিপরীত অনুপাতে (৩:২); অর্থাৎ প্রথম তিনটি অঙ্ককে শেষ দুইটি অঙ্ক থেকে বিভক্তকারী বিন্দুতে— তৃতীয় অঙ্কের শেষে। এবং সেই পতাকাটি চতুর্থ অঙ্কের শুরুতেও উপস্থিত থাকে।
এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে ছবিটির প্রতিটি পৃথক অংশ, এবং সপূর্ণ ছবিটি, তাদের চূড়ান্ত বিন্দু ও “শূন্য” বিন্দু— সবই স্বর্ণ-বিভাজনের নীতির সঙ্গে কঠোরভাবে সাযুজ্য রেখে, অর্থাৎ আনুপাতিকভাবে নির্মিত।

এখন আমরা পোটেমকিন-এর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটির দিকে নজর দেব— তার প্যাথস এবং কোন কোন নির্মাণগত উপায়ে এই প্যাথস অর্জিত হয়েছে।
আমরা এখানে প্যাথসকে স্বয়ং সংজ্ঞায়িত করার উদ্দেশ্যে এগোচ্ছি না। বরং প্যাথসে চিহ্নিত কোনও শিল্পকর্ম দর্শকের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটির অধ্যয়নের মধ্যেই আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখব।
প্যাথস গভীর আবেগ ও উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে।
এটি অর্জন করতে হলে এমন একটি শিল্পকর্মকে সর্বত্রই শক্তিশালী, বিস্ফোরক ক্রিয়ার ওপর এবং নিরন্তর গুণগত পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হতে হয়।
একই ঘটনাকে শিল্পকর্মে ভিন্ন ভিন্ন রূপে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে— নিরাবেগ বিবৃতি হিসেবে, অথবা আবেগময় স্তোত্রের আকারে। এখানে আমাদের আগ্রহ সেই উপায়গুলির প্রতি, যেগুলির মাধ্যমে কোনও ঘটনাকে প্যাথসের শিখরে উত্তোলিত করা যায়।
নিশ্চয়ই কোনও ঘটনার উপস্থাপনা প্রধানত তার বিষয়বস্তুর প্রতি স্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারাই নির্ধারিত হয়। কিন্তু আমরা যে অর্থে ‘নির্মাণ’কে বুঝি, তা হল সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করার এবং দর্শকের ওপর প্রভাব বিস্তার করার উপায়।
এই কারণেই এই প্রবন্ধে আমরা কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার প্যাথসের স্বভাব নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করছি না, কারণ তা নির্ভর করে ব্যক্তির সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর। একইভাবে, সেই ঘটনার প্রতি স্রষ্টার মনোভাবের প্রকৃতিতেও আমরা প্রবেশ করব না, কারণ সেটিও তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নির্ধারিত। আমাদের আগ্রহ কেন্দ্রীভূত রয়েছে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে— প্যাথসে চিহ্নিত কোনও শিল্পকর্মের ভেতরে এই মনোভাব প্রকাশ করার জন্য কোন কোন নির্মাণগত উপায় ব্যবহৃত হয়।
যদি আমরা চাই যে দর্শক সর্বাধিক আবেগীয় উত্থান অনুভব করুক, তাকে উন্মাদিত আবেগে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে আমাদের তাকে এমন একটি উপযুক্ত “সূত্র” দিতে হবে, যা শেষপর্যন্ত তার মধ্যে প্রত্যাশিত আবেগগুলিকে উদ্দীপ্ত করবে।
সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল পর্দায় এমন একজন মানুষকে উপস্থাপন করা, যিনি উন্মত্ত আবেগে আচ্ছন্ন, অর্থাৎ এমন একটি চরিত্র যিনি কোনও আবেগ দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন, যিনি “নিজের থেকে বাইরে” চলে গিয়েছেন।
আরও জটিল এবং কার্যকর পদ্ধতি হল প্যাথসের মূল শর্ত— ক্রিয়ায় ধারাবাহিক গুণগত পরিবর্তন— বাস্তবায়িত করা। শুধুমাত্র এক চরিত্রের মাধ্যমে নয়, বরং পুরো পরিবেশের মাধ্যমে। অন্য কথায়, যখন চারপাশের সবকিছুও “নিজের থেকে বাইরে” চলে যায়। এই পদ্ধতির একটি ক্লাসিক উদাহরণ হল কিং লিয়ারের বুকের মধ্যে ঝড় এবং তার চারপাশের প্রকৃতিতেও সেই ঝড়ের ছাপ।

আমাদের উদাহরণের দিকে ফিরে আসি— ওডেসা সিঁড়ি।
এই দৃশ্যে ঘটনাগুলি কীভাবে বিন্যাস এবং উপস্থাপন করা হয়েছে?
দৃশ্যে চরিত্র ও জনসাধারণের উন্মত্ত অবস্থাকে পাশেই রেখে, চলুন দেখি কীভাবে কাঠামোগত ও নির্মাণগত একটি উপকরণ— গতি— ব্যবহার করা হয়েছে ক্রমবর্ধমান আবেগি তীব্রতা প্রকাশের জন্য।
প্রথমে, বিশৃঙ্খলভাবে ছুটে চলা মানুষের ফিগারের ক্লোজ-আপ শট দেখা যায়। এরপর একই দৃশ্যের লং-শট। বিশৃঙ্খল গতির পরবর্তী ধাপে প্রদর্শিত হয় সৈন্যদের পা, যারা সিঁড়ি ধরে ছন্দময়ভাবে এগোচ্ছে।

গতি বাড়ে। ছন্দ ত্বরান্বিত হয়।
এরপর, যখন নিম্নমুখী গতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আচমকা গতি বিপরীতমুখী হয়ে যায়: ভিড়ের উচ্ছ্বল ছোটাছুটির পরিবর্তে আমরা দেখি একজন মা, তার মৃত সন্তানকে কাঁধে নিয়ে, ধীরে এবং গম্ভীরভাবে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠছেন।
ভিড়। উচ্ছ্বল ছোটাছুটি। নিম্নমুখী। এবং হঠাৎ—
একাকী একটি চরিত্র। ধীর এবং গম্ভীর। উপরে উঠছে। তবে কেবলমাত্র এক মুহূর্তের জন্য। এরপর আবার বিপরীতমুখী এক উল্লম্ফন। নিম্নমুখী গতি।

ছন্দ ত্বরান্বিত হয়। গতি বৃদ্ধি পায়।
উচ্ছ্বল ভিড়ের শটের পর হঠাৎ একটি শট দেখা যায়, যেখানে বেবি-প্র্যামটি সিঁড়ি ধরে নিচের দিকে ছুটছে। এটি কেবল ভিন্ন ভিন্ন গতির পরিবর্তন নয়। এটি উপস্থাপনার পদ্ধতিতে এক ধরনের উল্লম্ফন— বিমূর্ত থেকে মূর্ত পর্যায়ে। এটি নিম্নমুখী গতির আরেকটি দিক উদঘাটন করে।

সুতরাং, ক্লোজ-আপ শটের জায়গা নেয় লং-শট। বিশৃঙ্খল ভিড়ের ছোটাছুটির পরে দেখা যায় সৈন্যদের ছন্দময় মিছিল। গতির এক দিক (মানুষ ছুটছে, পড়ছে, সিঁড়ি ধরে গড়াচ্ছে) আরেকটি দিকের (প্র্যামের গড়ানো) জন্য স্থান ছেড়ে দেয়। অবনমন উত্তরণের দিকে স্থানান্তরিত হয়। বহু রাইফেলের একাধিক গুলি একটির জন্য স্থান ছেড়ে দেয়— যেটি যুদ্ধজাহাজের একটি বন্দুক থেকে নিক্ষিপ্ত।
প্রতিটি ধাপে একটি মাত্রা থেকে অন্য মাত্রায়, এক গুণগত অবস্থান থেকে অন্য গুণগত অবস্থানে উল্লম্ফন চলতে থাকে, যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনটি কেবল একক ঘটনার (প্র্যাম) ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পুরো উপস্থাপনার পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলে: উত্তোলিত সিংহদের চিত্র সেই বিন্দুটি চিহ্নিত করে যেখানে গল্পের বিবরণ চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপনায় রূপান্তরিত হয়।
ক্রিয়ার নিম্নমুখী অগ্রগতিকে নির্দেশকারী সিঁড়ির দৃশ্যমান ধাপগুলি গুণগত উল্লম্ফনের ধাপগুলির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ, তবে এগুলি ক্রমবর্ধমান তীব্রতার বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়।
এইভাবে, সিঁড়িতে গুলির দৃশ্যে নাটকীয় বিষয়টি তীব্রভাবে বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি কাঠামোগত লেইট-মোটিফ হিসেবেও কাজ করে, যা ঘটনাগুলির প্লাস্টিক ও ছন্দময় বিন্যাস নির্ধারণ করে।

সিঁড়ির পর্বটি কি জৈবনিক সমগ্রতার সঙ্গে মানানসই? এটি কি কাঠামোগত ধারণাকে ব্যাহত করে? না, তা করে না। এখানে প্যাথসযুক্ত কোনও শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্যগুলি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, এবং এই পর্বটি পুরো ছবির ট্র্যাজিক চূড়ান্ত বিন্দু হিসেবে কাজ করছে।
এখানে আমি আগেই যে কথাটা বলেছি— স্বর্ণচ্ছেদ নীতি-অনুসারে পাঁচটি অঙ্কের প্রত্যেকটি যে দুটি অংশে বিভক্ত— তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আমি বারবার জোর দিয়ে বলেছি যে প্রতিটি ‘সিজুরা’-য় ক্রিয়ার অবধারিতভাবেই এক নতুন গুণগত স্তরে উল্লম্ফন ঘটে; এবার আমি এই বিষয়টিতে বিশেষভাবে জোর দিতে চাই যে, যে নতুন গুণগত পরিসরে এই উল্লম্ফন ঘটে, তার ব্যাপ্তি সর্বদাই যতটা সম্ভব বৃহৎ হয়। অর্থাৎ, প্রতিবারই এই উল্লম্ফনটি ঘটে বিপরীতের দিকে— সম্পূর্ণ বিপরীত গুণের ভেতরে।
অতএব আমরা দেখি, বিন্যাসের (composition) সমস্ত নির্ণায়ক উপাদানই উন্মাদনা বা উচ্ছ্বাসময়তার (ecstatic) সূত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ক্রিয়া প্রতিবারই এক নতুন গুণগত স্তরে উল্লম্ফন ঘটায়, এবং এই নতুন উল্লম্ফনটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে সম্পূর্ণ বিপরীত গুণের অভিমুখে।
এই ক্ষেত্রেও— যেমনটি আমরা আগে স্বর্ণচ্ছেদ নীতি এবং অনুপাত নির্ধারণে তার ভূমিকার প্রসঙ্গেও আলোচনা করেছি— কাহিনির বিকাশে যে জৈবনিক ঐক্য প্রকাশ পায়, তার রহস্য নিহিত রয়েছে এখানেই। এক গুণগত স্তর থেকে আরেক গুণগত স্তরে উল্লম্ফনের মাধ্যমে যে উত্তরণ ঘটে, তা কেবল বৃদ্ধির কোনও সূত্রমাত্র নয়, বরং বিকাশের এক মৌলিক সূত্র। এই বিকাশের মধ্যে আমরা আকৃষ্ট হই শুধু প্রকৃতির বিবর্তনমূলক নিয়মের অধীন ‘উদ্ভিজ্জ’ সত্তা হিসেবে নয়, বরং সমষ্টিগত ও সামাজিক এককের অংশ হিসেবে— যেখানে আমরা সচেতনভাবে এই বিকাশে অংশগ্রহণ করি। কারণ আমরা জানি, এই ধরনের উল্লম্ফনই সামাজিক জীবনের বৈশিষ্ট্য। এগুলিই হল সেই বিপ্লব, যা সামাজিক বিকাশ ও সামাজিক গতিতে উদ্দীপনা জোগায়।
নিশ্চিতভাবেই আমরা বলতে পারি, ‘পোটেমকিন’-এর জৈবনিক ঐক্যের একটি তৃতীয় দিক রয়েছে। প্রতিটি গঠনমূলক উপাদানের কাঠামোতে এবং সমগ্র চলচ্চিত্রের বিন্যাসে যে উল্লম্ফন বৈশিষ্ট্য হিসেবে কাজ করে, তা আসলে বিষয়বস্তুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান— বিপ্লবী বিস্ফোরণের— গঠনগত প্রকাশ। আর এই বিস্ফোরণ নিজেই সেই ধারাবাহিক উল্লম্ফনগুলির একটি, যার মাধ্যমে সামাজিক বিকাশ নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলে।
প্যাথসধর্মী কোনও বহুমাত্রিক শিল্পকর্মের কাঠামোকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়: একটি প্যাথেটিক কাঠামো আমাদের তীব্রভাবে আবার সেই সব চূড়ান্ত মুহূর্ত ও প্রতিষ্ঠার পর্যায়ের মধ্যে ফিরিয়ে আনে, যা সমস্ত দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার বিধিবদ্ধ কাঠামোর অন্তর্গত।
পৃথিবীর সমস্ত জীবের মধ্যে একমাত্র আমরাই সেই বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত সত্তা, যারা সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলির প্রতিষ্ঠার মুহূর্তগুলি একের পর এক অনুভব করতে এবং পুনরনুভব করতে পারি। শুধু তা-ই নয়। আমরা সম্মিলিতভাবে এক নতুন মানব-ইতিহাস নির্মাণে অংশগ্রহণ করারও সৌভাগ্য অর্জন করেছি।
একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যে বেঁচে থাকা— এই অনুভূতিই হল সেই প্যাথসের চূড়ান্ত বিন্দু, যেখানে মানুষ নিজেকে একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুভব করে, নিজেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রামরত এক সম্মিলিত সত্তার অঙ্গ বলে উপলব্ধি করে।

এমনই হল জীবনের প্যাথস। আর প্যাথেটিক শিল্পকর্মে এমনই তার প্রতিফলন। বিষয়ের প্যাথস থেকেই জন্ম নেওয়া রচনাগত কাঠামোটি সেই মৌলিক ও একক নিয়মের প্রতিধ্বনি করে, যা জগতের গঠনের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত জৈবনিক প্রক্রিয়াকে— সামাজিক হোক বা অন্য কোনও রূপে— নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিধানে অংশগ্রহণ (যার প্রতিফলন আমাদের চেতনায়, আর যার প্রয়োগক্ষেত্র আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব) আমাদের আবেগের চরম সীমা পর্যন্ত ভরে দেয়— প্যাথসে।
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: শিল্পী বাস্তবে এই রচনাগত সূত্রগুলি কীভাবে অর্জন করবেন? এই রচনাগত সূত্রগুলি যে-কোনও পূর্ণমাত্রার প্যাথেটিক শিল্পকর্মেই বিদ্যমান থাকে। কিন্তু সেগুলি কোনও একক, পূর্বনির্ধারিত রচনাকাঠামোর সাহায্যে অর্জিত হয় না। কেবল দক্ষতা, কেবল কারিগরি নৈপুণ্য, কেবলমাত্র সৌকর্য— এগুলি একাই যথেষ্ট নয়।
কোনও শিল্পকর্ম তখনই সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠে এবং প্রকৃত প্যাথসের উচ্চতায় পৌঁছয়, যখন সেই রচনার বিষয়, বিষয়বস্তু ও ভাবনা লেখকের ভাবনা, অনুভূতি— এমনকি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গেও এক অবিচ্ছিন্ন ও জৈবনিক ঐক্যে মিলিত হয়।
তখনই— এবং কেবল তখনই— একটি রচনার প্রকৃত সুসংবদ্ধতা অর্জিত হয়, যখন তা স্বতন্ত্র এক সত্তা হিসেবে, সমান অধিকারে, প্রাকৃতিক ও সামাজিক ঘটনাবলির পরিসরের মধ্যে সহযাত্রী হয়ে প্রবেশ করে।

[1] লেখাটিতে প্যাথস শব্দটি তার মূল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

