ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা: পূর্ব থেকে দেখা

তানভীর মোকাম্মেল

 


আরেকটি দিক থেকেও ঋত্বিক ঘটক বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রে একজন ব্যতিক্রমী নির্মাতা হয়ে রইবেন। তা হচ্ছে এ-উপমহাদেশের চলচ্চিত্র বড় বেশি হলিউড-প্রভাবিত। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক এমন একজন বিরল চলচ্চিত্রকার যাঁর ছবি দেখলে মনে হয় না যে হলিউড বলে কিছু আছে বা ছিল। ঋত্বিকের শটগ্রহণ, লেন্সের ব্যবহার, চরিত্রদের অতিনাটকীয় অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন, এ সবকিছুই হলিউডের ঘরানা থেকে একেবারেই আলাদা। অনেক সময় পুরো বিপরীতই। তাই আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গিমার দিক থেকে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একেবারেই মৌলিক একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা, যে-রকম মৌলিক কোনও চলচ্চিত্রনির্মাতা, একজন ব্রেসঁ, একজন তারকোভস্কি, একজন ওজু, এবং একজন ঋত্বিক ঘটকও, সব যুগেই খুব কম জন্মে থাকেন

 

পূর্ব থেকে দেখার অর্থ দু-রকম হতে পারে। পূর্বাপর মানে ঋত্বিক ঘটকের শিল্পীজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা। এবং “পূর্ব” অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ থেকে দেখা। যে পূর্ববঙ্গ ছিল ঋত্বিকের সবিশেষ প্রিয় এবং যে পূর্ববঙ্গের ব্যাপারে ঋত্বিক ঘটক আজীবন ছিলেন গভীরভাবে আবেগতাড়িত।

ঋত্বিক ঘটকের প্রথম চলচ্চিত্র নাগরিক নিয়েই আলোচনাটা শুরু করা যাক। পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তু কিছু নারী-পুরুষের কলকাতা মহানগরে মানবিক মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রামকে তার সকল কারুণ্য ও কঠিন বাস্তবতা-সহ এ-ছবিতে তুলে ধরলেন ঋত্বিক ঘটক। দেখালেন দেশভাগ কীভাবে সৃষ্টি করেছে অসহনীয় বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। কতভাবেই না ঘটিয়েছিল মানবতার ক্ষয়। এবং বাস্তবতার এই নিষ্করুণ চিত্রায়ন নাগরিক ছবিটিকে এনে দিয়েছে একটা বড়রকম সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব। গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এটি এমন একজন চলচ্চিত্রনির্মাতার প্রথম ছবি যাঁর নির্মাণশৈলী ও দর্শন পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রে খুব সুগভীর এক প্রভাব ফেলবে। আর সে-প্রভাব চলতে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

নাগরিক (১৯৫২)

 

নাগরিক ছবিটি নির্মিত হয় ১৯৫২ সালে। তবে ছবিটি মুক্তি পায় বেশ কয়েক বছর পরে। সত্যজিৎ রায় এক স্মরণসভায় বলেছিলেন যে নাগরিক ছবিটি যথাসময়ে মুক্তি পেলে নতুন ধারার বাংলা ছবির পথিকৃতের সম্মানটা হয়তো ঋত্বিক ঘটকই পেতেন। তবে আমার ধারণা সত্যজিৎ রায় হয়তো কিছুটা বিনয়ের অবস্থান থেকেই কথাটি বলেছিলেন। নাগরিক ছবিটির অনেক শক্তিশালী দিক ছিল। প্রথমেই বলব এর বিষয়বস্তু। দেশভাগ নিয়ে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল ছবিটি অবশ্য ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। তারপরও নাগরিক ছবিটিতে পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তু-জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে যে গভীর আন্তরিকতা দিয়ে ঋত্বিক তুলে ধরেছিলেন তার সামাজিক ও শৈল্পিক মূল্য অপরিসীম। তবে সে সময়ের টালিগঞ্জে তৈরি বাংলা চলচ্চিত্রগুলির যেসব দুর্বলতা ছিল তার অনেক কিছুই অবশ্য নাগরিক-এও ছিল। যেমন স্টুডিওর ভেতরে কৃত্রিম আলোয় অধিকাংশ শুটিং করা বা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয়ে অতিনাটকীয়তা। অবশ্য আমরা পরে জানব উচ্চকিত অভিনয়ের এই ব্যাপারটা ঋত্বিক ঘটক ওঁর ছবির একটা নিজস্ব ঘরানা বা রীতি হিসেবেই বিশ্বাস ও চর্চা করেছিলেন। ঋত্বিক বলতেন “Melodrama is also an art form.” এবং বিশ্বাস করতেন অভিনেতাদের অতিনাটকীয়ভাবে ভাবপ্রকাশের এই উপাদানটা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিরই একটা অংশ। তাছাড়া মনে রাখতে হবে ঋত্বিক ঘটক মঞ্চ-নাটকের জগৎ থেকে চলচ্চিত্রনির্মাণে এসেছিলেন। ফলে ওঁর ওপর মঞ্চ-নাটকের উচ্চকিত অভিনয়রীতির একটা প্রভাব যে রয়ে যাবে সেটা হয়তো অস্বাভাবিক ছিল না। তবে উদ্বাস্তুজীবনের কঠোর জীবনসংগ্রাম অত্যন্ত সফলভাবে দেখাতে পারা এবং ঋত্বিক ঘটকের মতো সত্যিকারের উঁচুমানের এক চলচ্চিত্রকারের প্রথম ছবি হিসেবে নাগরিক ছবিটির একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকালই রয়েই যাবে।

 

ঋত্বিক ঘটকের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র অযান্ত্রিক (১৯৫৮) এক মুক্তাসম সৃষ্টি। যুগে যুগেই যন্ত্র ও মানুষের আন্তঃসম্পর্ক শিল্প ও শিল্পীদের এক বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে রয়েছে। ফ্রিজ ল্যাঙ্কের মেট্রোপলিস (১৯২৬) বা চ্যাপলিনের মডার্ন টাইম (১৯৩৬)-এর কথা স্মরণ করুন। তবে ছোটনাগপুরের আপাত রুক্ষ ল্যান্ডস্কেপের মাঝে কিছুটা ক্ষ্যাপাটে ড্রাইভার বিমল ও তার পুরনো জবরজং “জগদ্দল” গাড়িটার মধ্যে দিয়ে মানুষ ও যন্ত্রের যে গভীর আন্তঃসম্পর্ক ঋত্বিক এ ছবিটিতে আঁকলেন তা এককথায় অনবদ্য এবং তা অযান্ত্রিক চলচ্চিত্রটিকে এক ক্লাসিকে পরিণত করেছে।

অযান্ত্রিক (১৯৫৮)

 

গোটা ছবিটা শুট করা হয়েছে আউটডোরে। যে অসামান্য নান্দনিকতায় পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ডের ল্যান্ডস্কেপকে ঋত্বিক ওঁর ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন তা সিনেমার পর্দায় ল্যান্ডস্কেপের ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটা টেক্সট ফিল্মেরই উদাহরণ হতে পারে। আর যে নানাবিধ মাত্রায় ও সূক্ষ্মতায় বিমল ও ওর জগদ্দল গাড়িটার পরস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক এবং এ দুজনের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসীদের সম্পর্কের যে বয়ান ছবিটাতে ছড়িয়ে রয়েছে তা তো মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক বিচারে হতে পারে সমাজ-বিজ্ঞানীদের কাছে রীতিমতো এক গবেষণার বিষয়। অযান্ত্রিক ছবিটার দৃশ্যের পর দৃশ্য আমরা উল্লেখ করতে পারি যেখানে চিত্রকল্পের নান্দনিকতা ও সাউন্ডট্রাকে শব্দের নানাবিধ সূক্ষ্ম ব্যবহার দর্শকদের মুগ্ধ না করে পারে না। তবে ছবিটার একটা দৃশ্যের কথা একটু আলাদা করেই বলতে চাই। তা হচ্ছে ছবিটার শেষ দৃশ্যটা। বিমলের এত প্রিয় জগদ্দল গাড়িটাকে ভেঙে স্ক্র্যাপ হিসেবে কিনে নিয়ে যাচ্ছে এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী। আমরা দেখছি ফ্রেমের পাশে গির্জার একটা ক্রশ। অসহায় ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বিমল। যিশুর মতোই যেন ক্রুশবিদ্ধ সে। ধনতন্ত্র ও লোভের হাতে নিহত এ-যুগের এক যিশুই যেন হয়ে ওঠে আমাদের ক্ষ্যাপাটে ড্রাইভার বিমল। অযান্ত্রিক ছবিটার এই শেষ শটটা ছবিটাকে এক অনন্য গভীরতায় পৌঁছে দিয়েছে যা ভারতবর্ষের খুব কম চলচ্চিত্রই পৌঁছতে পেরেছে।

তবে অযান্ত্রিক চলচ্চিত্রটির একটি বিষয় কিছুটা আলাদাভাবেই উল্লেখের দাবি রাখে। আর তা হচ্ছে চলচ্চিত্রটিতে শব্দের অসামান্য কিছু ব্যবহার। ছবিটির সাউন্ডট্রাকে যত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তা “জগদ্দল” গাড়িটার হর্ন বা পুরনো গাড়িটার বিচিত্র নানা শব্দ, দ্রুতগামী ট্রেনের শব্দ, বুলাকি পাগলার টিনের থালার আওয়াজ, এ সব কিছুরই এত সূক্ষ্ম ও নান্দনিক সব ব্যবহার গোটা ছবিটিতে ছড়িয়ে রয়েছে যে তা কান এড়াতে পারে না। ছবিটির সাউন্ডট্রাকে শব্দের সৃজনশীল ব্যবহারে ঋত্বিকের অসামান্য দক্ষতার একটা উদাহরণ দিই। মেয়েটি ট্রেনে করে চলে যাচ্ছে। হাতে ট্রেনের টিকিট নিয়ে বিমল “টিকিট টিকিট” বলে ট্রেনটার পাশে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ছুটে চলেছে। মেয়েটিও যেন ওকে কিছু বলে। কিন্তু চলন্ত ট্রেনের চাকার শব্দে আমরা পরিষ্কারভাবে শুনতে পাই না যে মেয়েটি বিমলকে ঠিক কী বলতে চাইছিল। ট্রেনের গতিবেগ বাড়তে থাকে এবং এক সময়ে মেয়েটির ক্ষীণ কন্ঠ হারিয়ে যায় ট্রেনের তীব্র যান্ত্রিক আওয়াজে। একই সঙ্গে যেন বিমলের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় কোনও নারীর প্রেম, বিবাহ ও গৃহী হওয়ার সকল সম্ভাবনা। কেবলমাত্র শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমেই কাহিনি ও এ দুই চরিত্রের সম্পর্কে খুবই নিগূঢ় কিছু কথা যেন ঋত্বিক ঘটক বলে ফেললেন অত্যন্ত সিনেমাটিক এই দৃশ্যটিতে।

 

ঋত্বিকের এর পরের ছবি বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৯) কিছুটা ভিন্ন ঘরানার ছবি। বালক কাঞ্চনের বাড়ি থেকে পলায়ন ও বিশাল কলকাতা মহানগরে ঘোরাফেরা, নিম্নবর্গের নানা ধরনের মানুষদের সঙ্গে পরিচয় ও বিচরণের মধ্যে দিয়ে অন্য এক জগতের, এবং অন্য এক ঋত্বিকেরও, যেন পরিচয় আমরা পাই। তবে বাড়ির বাইরের হাতছানি, ও বাঁধন ছেড়ে পলায়ন, অপার স্বাধীনতার অন্বেষা, নতুন বাড়ির সন্ধান, এসব কিছুই অবশ্য ঋত্বিকের জীবনদর্শনেরই অংশ। এবং আমরা ক্রমশ জানব যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ।

বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৯)

 

বাড়ী থেকে পালিয়ে ছবিটিতে প্রচুর শিশুতোষ উপাদান রয়েছে। কিন্তু ঋত্বিক এ-ছবির মধ্যে দিয়ে বালক কাঞ্চনের মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছেন তা যেন তার স্রষ্টারও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। হয়তো আমাদেরও আকাঙ্ক্ষা। বাড়ী থেকে পালিয়ে ছবিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কলকাতার নিচুতলার সাব-অলটার্ন মানুষদের কিছু চরিত্র ও জীবনযাপনকে ঋত্বিক যেভাবে এ-ছবিটিতে তুলে ধরেছেন তাতে আপাত-শিশুতোষ একটা চলচ্চিত্রও যেন হয়ে ওঠে গভীর সমাজ-বাস্তবতার এক দর্পণ। বাস্তব জীবনের সে দর্পণ দেখে বালক কাঞ্চনও এক সময় উপলব্ধি করে যে এই কলকাতা মহানগর কোনও কল্পলোকের স্বর্গ নয়। এ এক কঠিক জীবনসংগ্রামের জায়গা। বাড়ী থেকে পালিয়ে ছবিটির একটা সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাই সব সময়েই রয়ে যাবে।

 

ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি হয়তো মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)। পূর্ববঙ্গের এক উদ্বাস্তু পরিবারের অত্যন্ত দারিদ্রপীড়িত জীবনেও মানবতার টিকে থাকার সংগ্রামের যে করুণ চিত্র ঋত্বিক এ ছবিটাতে এঁকেছেন তা যুগ যুগ ধরেই দর্শকদের এক গভীর করুণরসে আপ্লুত করেছে। কী চরিত্রনির্মাণে, কী অভিনয়ে, কী আবহসঙ্গীতে, অথবা সাউন্ডট্রাকে শব্দের নানাবিধ শৈল্পিক ব্যবহারে, সিনেমাশিল্পের এই সব দিকগুলোর বিবেচনাতেই মেঘে ঢাকা তারা ঋত্বিক ঘটকের এক অনবদ্য সৃষ্টি।

মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)

 

ঋত্বিক ঘটকের শৈল্পিক যন্ত্রণার যে মূল নির্যাসটা, বাংলাভাগের ক্ষত, তা এ ছবিটিতেও ফুটে উঠেছে গভীরভাবে। মেঘে ঢাকা তারা-র নির্মাণশৈলী উঁচুমাপের এবং অত্যন্ত দক্ষ ও বিদগ্ধ এক শিল্পীর কাজ। কী সাদা-কালো সিনেমাটোগ্রাফিতে, কী আলো-ছায়ার ব্যবহারে, অসামান্য কিছু ক্লোজ আপে ও কম্পোজিশনে, অর্থবহ নানা সংলাপ কিংবা সাউন্ডট্রাকে আবহসঙ্গীতের প্রয়োগে এবং নানারকম এফেক্ট সাউন্ডের খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ও সফল ব্যবহার মেঘে ঢাকা তারা ছবিটিকে করে রেখেছে চিরআকর্ষণীয়। শিল্পের বড় এক কাজ যদি হয়ে থাকে দুঃখবোধ সৃষ্টি করা, তাহলে মেঘে ঢাকা তারা-র মূল প্রটাগনিস্ট নীতার মাধ্যমে বেদনার যে গভীর আর্তি ঋত্বিক এ-ছবিটিতে পর্দায় এতটা সফলভাবে তুলে ধরেছেন যে যুগ যুগ ধরেই তা বাঙালি দর্শককে বেদনার্ত করে যাবে। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয়ও করেছেন চরিত্রোপযোগী। যদিও কারও কারও অভিনয় হয়তো কিছুটা অতি-অভিনয় দোষে দুষ্ট। তবে আমরা এতদিনে জেনে গেছি যে এই মেলোড্রামাটিক অভিনয়ের ব্যাপারটা ঋত্বিকের সচেতন এক প্রয়োগ এবং ওঁর শিল্পচেতনারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিনেমার অতি-অভিনয়কে ঋত্বিক নিজে কোনও দুর্বলতা বলে মনে করেননি। বরং এ-বিষয়ে ওঁর দৃষ্টিভঙ্গি বেশ মৌলিকই এবং তা হলিউডের বা স্তানিস্লাভস্কির অভিনয়রীতির থেকে একেবারেই আলাদা।

আমি মনে করি যে-কোনও ভালো শিল্পকর্মের এক বড় উপাদান হচ্ছে বহুস্তরীয় হওয়া। মেঘে ঢাকা তারা সর্ব অর্থেই এক বহুস্তরীয় শিল্প। আপাতদৃষ্টিতে এ-ছবি পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত এক দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারের চরিত্রদের জীবনে পাওয়া না-পাওয়ার এক করুণ কাহিনি। কিন্তু আপাত এ-কাহিনির পেছনে ঋত্বিক ঘটক গভীর অর্থবহ কিছু পৌরাণিক ইঙ্গিতও যেন রেখে যান। বিশেষ করে হতভাগিনী নীতা চরিত্রটার মধ্যে। নীতা, যার জন্মদিন ছিল জগদ্ধাত্রী পূজার দিন ও যে পাহাড়ে যেতে চেয়েছিল, এবং একদিন সে পাহাড়েই ফিরে গেল! একালের এক পার্বতীই যেন ছিল এই দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারের নারী। ঋত্বিক খুব অর্থবহভাবেই নীতার কিছু দৃশ্যে সাউন্ডট্রাকে “আয়রে উমা ফিরে আয়” গানটা ব্যবহার করে বাঙালির শত শত বছরের গৌরীদানের বেদনা এবং মা দুর্গার আসা ও ফিরে যাওয়ার প্রতীকী রূপটাকেই যেন তুলে ধরলেন। পৌরাণিক মিথের এসব ইঙ্গিতবহ ব্যবহার মেঘে ঢাকা তারা ছবিটির অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক দিক যা এ-ছবিটিকে সুগভীর ও বহুস্তরীয় করেছে।

মেঘে ঢাকা তারা ছবিটির ক্যামেরার কাজও উচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে। সিনেমাটোগ্রাফির ব্যাপারে নীতার আলো-ছায়ার কিছু শট, অসাধারণ কিছু ক্লোজ-আপ এবং লেন্সিং ও কম্পোজিশনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ঋত্বিক ঘটক এ-ছবিটিতে খুবই মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন। একটা বিশেষ শটের কথা বলি। পরিবারটির ব্যর্থ অসহায় পিতা যখন উঠোনে দাঁড়িয়ে বলে “I accuse”। কাকে? এ প্রশ্নের জবাবে কিছু বলেন না। কেবল চুপ করে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। ঋত্বিকের ক্যামেরা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সে প্রৌঢ় পিতার সামনের দিকে বাড়ানো তর্জনীটিকে এমনভাবে ধরে যা ক্যামেরার সামনে প্রায় একটা নরম লিঙ্গের মতো অসহায়ভাবে ঝুলতে থাকে। এক ব্যর্থ পিতার ব্যর্থ ক্ষোভেরই যেন বহিঃপ্রকাশ। কেবল সঠিক লেন্সের ব্যবহারে শটটি পেয়ে যায় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক প্রতীকী অর্থ। চমৎকার সিনেমাটিক একটি শট।

 

ঋত্বিকের পরের ছবি কোমল গান্ধার-এ আমরা পাই একটা থিয়েটার গ্রুপের দুঃখজনক ভাঙনের গল্প। ছবিটির ইমেজে ও সংলাপে, প্রতীকে বাংলাভাগের প্রসঙ্গটাই দর্শকের মনে আসতে বাধ্য। মেঘে ঢাকা তারা-র মতো এ-ছবির প্রধান প্রটাগনিস্টও এক নারী— অনসূয়া। ভাঙনরত দুই গ্রুপের মাঝে মিলন ঘটানোর অনসূয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টার মাঝে যেন মূর্ত হয়ে ওঠে ছবিটির নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকেরই দুই বাংলার মাঝে মিলনের আকুতি। অনসূয়ার পুরুষসঙ্গী ভৃগু পদ্মার পারে দাঁড়িয়ে একদিন ওকে বলেছিল তার দেশ এ নদীর ওপারে— পূর্ববঙ্গে। এবং আমরা দেখি খুবই প্রতীকী একটা চিত্রকল্প। বন্ধ রেল-লাইনের উপরে বাফারের সেই অনন্য শটটা। এ পথে ট্রেন আর পূর্ববঙ্গে যায় না! ওই একটা শটই দেশভাগের বুকচেরা বেদনার ট্র্যাজেডিটাকে, সুগভীর আর্তিটাকে, যেন যথার্থভাবে মেলে ধরে এ ছবিটার বয়ানে— দৃশ্যে ও সাউন্ডট্রাকে। আমরা বুঝতে পারি এক থিয়েটার গ্রুপের ভাঙনের মধ্যে দিয়ে ঋত্বিক আসলে কোন্ ভাঙনের কথা বলতে চেয়েছেন!

কোমল গান্ধার (১৯৬১)

 

বিষয়বস্তুতে, ক্যামেরার কাজে ও অভিনয়ে কোমল গান্ধার ছবিটা ঋত্বিকের ছবিমালার উল্লেখযোগ্য এক সৃষ্টি হলেও এ-ছবিটির কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেমন দীর্ঘ সব সংলাপ। চরিত্রদের সংলাপ বিনিময়ে ছবির নির্মাতা নিজেও যেন কখনও কখনও জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে কোনও কোনও জায়গায় সংলাপ চরিত্রানুগ না হয়ে হয়ে পড়েছে লেখকানুগ। চিত্রনাট্যের এই সাবজেক্টিভ প্রবণতা ছবিটিকে সমৃদ্ধ করেনি। তাছাড়া নিজের শিল্পকর্মে শিল্পীর নিজের পক্ষ নিয়ে ফেলাটা কোনও বড় গুণ নয়। কোমল গান্ধার-এর আরেকটি দুর্বলতা হচ্ছে ছবিটার সম্পাদনা। চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে আরও সুসম্পাদিত হতে পারত। কয়েকটা দৃশ্য তো খুবই দীর্ঘ। দর্শক হয়তো মনে মনে ভাবতে পারেন ছবিটা কখন শেষ হবে! তারপরও একটা থিয়েটার গ্রুপের ভাঙনের প্রতীকে বাংলাভাগের স্বরূপ ও বেদনাকে তুলে ধরার ঋত্বিকের দক্ষতা নিঃসন্দেহে উচ্চ প্রশংসা পাবে। আর মঞ্চনাটক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যে আবহ ঋত্বিক এ-ছবিতে খুব সহজ সাবলীলতায় সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তা থেকে বোঝা যায় ঋত্বিক ঘটকের মতো মঞ্চজগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এমন একজন নির্মাতার পক্ষেই কেবল সম্ভব ছিল কোমল গান্ধার-এর মতো একটা চলচ্চিত্রনির্মাণ।

 

ঋত্বিকের এর পরের ছবি ১৯৬২ সালে তৈরি সুবর্ণরেখা যেন এক মানবিক বেদনার চিত্রকাব্য। বিষণ্নতার এক করুণ সুর এ-ছবিটির শুরু থেকেই খুব সূক্ষ্ম তারে বাঁধা থাকে এবং সে বিষণ্নতার রেশ ছবি শেষ হওয়ার পরেও দর্শকমনে অনুরণিত হতে থাকে। সুবর্ণরেখা-কে আমি ঋত্বিক ঘটকের অন্যতম সেরা ছবি বলে মনে করি। বাংলাভাষী চলচ্চিত্রেরও। এরিস্টটল শিল্পের সংজ্ঞায় ওই যে করুণার কথা বলেছিলেন, সুবর্ণরেখা ছবিতে করুণার সেই বেদনার্ত রসটা, ঋত্বিক ঘটক খুব গভীর নান্দনিকতায় সৃষ্টি ও দর্শকদের মাঝে তা জারিত করতে পেরেছিলেন।

মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার-সহ ঋত্বিকের যে দেশভাগ-ট্রিলজি, সুবর্ণরেখা সে ট্রিলজির তৃতীয় ছবি। দেশভাগ এমন এক বিষয় যার সব কিছুই যেন বিষণ্নতার এক আঁধার চাদরে ঢাকা। তবে সুবর্ণরেখা-র বিষণ্নতার কারণ কেবল হয়তো দেশভাগ নয়, এ-ছবির চরিত্রদের নৈতিক পরাজয়ও। ছবিটির প্রধান প্রটাগনিস্ট ঈশ্বর বরাবরই ছিল এক মধ্যবিত্ত পলাতক চরিত্রের সুবিধাবাদী মানুষ। ফলে তার নৈতিক অধঃপতন হয়তো আমাদেরকে ততটা ব্যথিত করে না। কিন্তু গভীরভাবে আদর্শনিষ্ঠ হরপ্রসাদও যখন জীবনে সব হারিয়ে টাকার বিনিময়ে কলকাতার ধনী সমাজের “বীভৎস মজা”-র আস্বাদ পেতে চায়, তখন মানুষ, মানুষের মূল্যবোধ, তথা মানবপ্রজাতির প্রতিই যেন আমরা আস্থা হারিয়ে ফেলি।

শেষজীবনে হরপ্রসাদের এই তিক্ত উপলব্ধি যে “আমরা সব বায়ুভূত নিরালম্ব” হয়ে যাব তখন মৃত্যুচিহ্নিত এ মানবজীবনের গভীর বিষাদটা যেন একটা মহাজাগতিক (Cosmic) রূপ পেয়ে যায়, যে বিষাদ থেকে সমগ্র মানবজাতিরই যেন কোনও মুক্তি নেই। তারপরও ঋত্বিককে একজন নৈরাশ্যবাদী শিল্পী বলা কঠিন। কারণ ছবির পর ছবিতে মানবিক পতনের অতলান্ত গভীরতা দেখালেও মানুষের প্রতি উনি শেষ পর্যন্তও যেন আশাবাদী থাকতে চেয়েছেন। যেমন অযান্ত্রিক-এর শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি ভাঙা জগদ্দল গাড়িটার পাশে গাড়ির হর্নটা বাজাচ্ছে এক শিশু। তিতাস একটি নদীর নাম-এর শেষ দৃশ্যে উন্মুক্ত ধানক্ষেতে ভেঁপু বাজিয়ে ছুটে যায় আরেক মানবশিশু। মানুষের জীবনচক্র, সাইকেল অব লাইফ তো, চিরপ্রবহমানই। অসংবেদনশীল মানুষকে বড়রকম ধাক্কা দিতে, তার ভেতরে মানবিক করুণা জাগিয়ে তুলতে, সুবর্ণরেখা ছবিটিতে বেদনার রসটা ঋত্বিক হয়তো সবচেয়ে প্রগাঢ়ভাবে ছড়িয়ে রেখেছেন সেটা সত্য, তবে শেষদৃশ্যে মাতৃহারা ও গৃহহারা এক বালকের “নতুন বাড়ি”-র সন্ধানও তো এক আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকেই ঈঙ্গিত করে।

তবে আমি বলব একজন প্রগতিশীল শিল্পী হিসেবে ঋত্বিক ঘটক যেন কিছুটা সচেতনভাবেই আশাবাদী থাকতে চেয়েছেন। বস্তুত মানবতার যে দুর্ভোগ ও সার্বিক অবক্ষয় নিজের চারপাশে তিনি দেখেছিলেন, তাতে তাঁর পক্ষে সত্যিকারভাবে আশাবাদী হওয়াটা কতটা সম্ভব ছিল? বিশেষ করে পঞ্চাশ-ষাট দশকগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের জনজীবনে দাঁড়িয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে বিতাড়িত উদ্বাস্তুদের অমানবিক জীবনযাত্রাকে দেখার পর? না কি কোনও কোনও ছবির শেষ দৃশ্যে ওরকম আশাবাদী একটা শট রেখে নিজেকে নৈরাশ্যবাদী না বোঝানোর ঋত্বিকের এ এক আরোপিত প্রয়াস? তাই হয়তো কিছুটা কৃত্রিমও!

সুবর্ণরেখা (১৯৬২)

 

আর দেশভাগ-প্রসঙ্গে বলি, ঋত্বিক সাতচল্লিশের দেশভাগের করুণ ফলাফলটা যতটা দেখিয়েছেন, দেশভাগের কার্যকারণগুলো তেমনভাবে দেখাননি। কেন তাদের পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল? কী বলে ইতিহাস? ওদিকগুলো অনালোচিত থাকার ফলে দেশভাগের মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির একটা চিত্রই কেবল, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের বেদনার চিত্রটাই শুধু, আমরা পাই ঋত্বিকের ছবিতে। আর সে-বেদনাও একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের মাত্র।

ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য, কেউ দুর্বলতাও বলতে পারেন, ওঁর কোনও কোনও ছবিতে অতিরিক্ত সমাপতনিক (Coincidence) ঘটনার উপস্থিতি। সুবর্ণরেখা ছবিটিতে যে বিষয়টি খুবই দৃষ্টিগ্রাহ্য। তবে মনে রাখতে হবে ঋত্বিক সেই ঘরানার একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা যাঁর কাছে গল্পের প্লটটা জরুরি নয়, এমনকি গল্পটাও গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গল্পের থিমটা। ওঁর থিসিসটা। গল্পটাতে উনি ঠিক কী বলতে চেয়েছেন সেটা বুঝতে পারাটাই মূল। গল্পটা, বা গল্পের প্লটটা এসেছে কেবল, ওঁর মূল বক্তব্যটাকে তুলে ধরার বাহন হিসেবে মাত্র। ফলে গল্পটার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ালে ঋত্বিকের মতো একজন দার্শনিক চলচ্চিত্রকারের শিল্প-এষণার প্রতি অবিচারই করা হবে।

আসলে ঋত্বিক ঘটককে বুঝতে হলে ওঁর জীবনবীক্ষার দর্শনগত দিকটা বুঝতে হবে। ঋত্বিক জীবন শুরু করেছিলেন একজন মার্কসবাদী হিসেবে। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে ইয়ুঙের অবচেতন মনের তত্ত্বের প্রভাব ওঁর মনোজগতে বেশ বড়ভাবেই পড়ে। ওঁর ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় ইয়ুঙের “Primordial Archetype” হিসেবে “Mother Image”-এর ধারণাটা ওঁকে কত গভীরভাবেই না আকর্ষণ করেছিল। এই মাদার ইমেজের আবার দুটো রূপ— একটা ধ্বংসাত্মক রূপ, যেমন সুবর্ণরেখা-তে পরিত্যক্ত এক বিমানবন্দরে বালিকা সীতার সামনে বহুরূপীর ওরকম মাকালীর রূপ নিয়ে উপস্থিত হওয়ার দৃশ্যটা। আর দ্বিতীয় রূপটা হচ্ছে চিরস্নেহময়ী মাতৃত্বের স্বরূপ। সন্তান লালন-পালনের মাতৃত্বের যে পবিত্র দিকটা, সেটাও ওই সুবর্ণরেখা ছবিটিতেই রয়েছে। আমরা দেখি তরুণী সীতা ওর দাদা ঈশ্বরকে এক সময় বলেও “আমি তো তোমার মা-ই।” পবিত্র মাতৃত্বের প্রতি এই আকাঙ্ক্ষা যেন ঋত্বিকের অবচেতনের এক গভীর শৈল্পিক আকাঙ্ক্ষা।

তবে এ মা কেবল এক নারী মাত্র নয়, ঋত্বিকের শিল্পীসত্তায় বাংলা নামের মাতৃভূমিটাই যেন একটা মাদার ইমেজ হিসেবে ওঁর ছবিতে বারবার এসেছে। কখনও পর্দায় ইমেজ হিসেবে কখনও সাউন্ডট্রাকে সংলাপ হিসেবে। একটা Leit Motif-এর মতোই যেন বারবার ফিরে আসে দেশমাতৃকাকে মাদার ইমেজে দেখবার এই ধারণাটা। পূর্ববঙ্গের যে মাতৃভূমিকে তিনি ফেলে এসেছিলেন, সেই হারানো মায়ের প্রতি এ যেন ওঁর এক সুগভীর আর্তি ও হাহাকার। স্বদেশকে বাংলা মা হিসেবে দেখার, মাদার ইমেজের এই ধারণাটা যে-ছবিটিতে সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যক্ষভাবে চোখে পড়বে সেটা হচ্ছে ঋত্বিকের শেষ ছবি যুক্তি-তক্কো-গপ্পো-তে, বিশেষ করে এ-ছবিটির বঙ্গবালা চরিত্রটির মাঝে। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু নারী বঙ্গবালার নামটাই তো ইঙ্গিতবহ ও প্রতীকী। তবে কোমল গান্ধার-এর অনসূয়া বা মেঘে ঢাকা তারা-র নীতার মাঝেও মাতৃত্বের এই বিশেষ রূপটা দুর্নীরিক্ষ ছিল না। আর তিতাস-এ বালক অনন্তর চোখে তো তার মা সাক্ষাৎ ভগবতীই। সে যখন মায়ের কথা ভাবে তখন জগদ্ধাত্রী মা দুর্গার মূর্তিটাই তো তার চোখের সামনে ভেসে আসে। এমনকি অনেক ভিন্ন বিষয়ের একটি ছবি হলেও, অযান্ত্রিক-এ বিমলের ভাঙাচোরা পুরনো “জগদ্দল” গাড়িটিও কখনও কখনও হয়ে ওঠে যেন সর্বংসহা কোনও এক মায়েরই প্রতীক।

 

ঋত্বিকের বহু-আলোচিত ছবি তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)। ছবিটি ঋত্বিক ঘটক ওঁর প্রিয় পূর্ববঙ্গে এসে শুট করেছিলেন। সমালোচকেরা সকলেই একবাক্যে ছবিটিকে একটি এপিক চলচ্চিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিতাসপারের মালো সম্প্রদায়ের জীবনের বর্ণনায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাসটিতে এপিক উপাদানটি ছিল। তবে গ্রিক ধ্রুপদ এপিকের মতো কোনও আটোসাঁটো এপিক নয়, একধরনের এলায়িত লোকজ এপিক। তাই ঋত্বিকের চলচ্চিত্রটির কাহিনির বয়ানটিও ঠিক গ্রিক এপিক নাটকগুলির মতো দৃঢ়সংবদ্ধ নয়, বরং কিছুটা ছাড়া-ছাড়াভাবে বর্ণিত হয়েছে কাহিনির বয়ানটা। নান্দনিক সব চিত্রকল্পের পর চিত্রকল্প দিয়ে ঋত্বিক ছবিটি সাজালেও কাহিনিটির এলায়িত ও ঢিলেঢালা ভাবটা যেন ছবিটির শরীরে রয়েই গেছে। একটা কারণ হতে পারে ছবিটি সম্পাদনার সময় ঋত্বিক খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং সম্পাদনার পুরো কাজটা নিজে সশরীরে তদারক করতে পারেননি।

তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)

 

আমার কাছে তিতাস একটি নদীর নাম ছবিটির এক বড় সম্পদ হচ্ছে ছবিটার অসামান্য সিনেমাটোগ্রাফি। পূর্ববঙ্গের তিতাস নদী, তার দু-পারের জনজীবন, প্রকৃতি ও মানুষের জলজ অস্তিত্বের অপার সৌন্দর্যকে ঋত্বিক ঘটকের হয়ে ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন পূর্ববঙ্গেরই এক সিনেমাটোগ্রাফার বেবী ইসলাম। এ ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও চরিত্রানুগ ও প্রশংসনীয় অভিনয় করেছেন এবং এরা সবাই-ই পূর্ববঙ্গের— রোজী সামাদ, কবরী সারোয়ার, রওশন জামিল, প্রবীর মিত্র। আর অন্যতম চরিত্র তিলকচাঁদের চরিত্রে অভিনেতা হিসেবে পর্দায় ঋত্বিক ঘটককে দেখতে পাওয়া তো এ ছবিটার একটা বাড়তি সুখকর অনুভূতি!

 

ঋত্বিকের শেষ ছবি যুক্তি-তক্কো-গপ্পো (১৯৭৪) নিঃসন্দেহে ঋত্বিক ঘটকের সবচেয়ে বেশি আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র। এটা স্বাভাবিকই যে কোনও অথর-চলচ্চিত্রনির্মাতার ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ছাপ তাঁর সৃষ্ট চলচ্চিত্রে ফুটে উঠবে। কিন্তু যুক্তি-তক্কো-গপ্পো-তে ঋত্বিক নিজে পর্দায় সশরীরে উপস্থিত থেকে এবং কিছুমাত্র রাখঢাক না করেই ওঁর বলবার কথাগুলো যেভাবে দর্শকদেরকে সরাসরি বলেছেন তা ঋত্বিকের এই শেষ ছবিটিকে খুবই ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি করে তুলেছে। তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি ঋত্বিকীয় তীব্র ক্ষোভ, মাওবাদী নকশাল আন্দোলনের প্রতি ওঁর সবিশেষ আগ্রহ, নিজের অ্যালকোহল-আসক্তি, এসবই ছবিটিতে এসেছে খুবই প্রত্যক্ষ ও সরাসরি। যুক্তি-তক্কো-গপ্পো ঋত্বিক ঘটকের তেমনই এক সৃষ্টি যে চলচ্চিত্রটি দেখলে মানুষ ও শিল্পী ঋত্বিক ঘটককে বোঝা যাবে সবচেয়ে বেশি।

যুক্তি-তক্কো-গপ্পো (১৯৭৪)

 

যুক্তি-তক্কো-গপ্পো ছবিটিতে ছেড়ে আসা পূর্ববঙ্গ বা খণ্ডিত বাংলার প্রতি ঋত্বিকের ভালোবাসা ও সুগভীর আর্তিটি আবারও প্রকাশ পেল খুবই তীব্রভাবে। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু নারী বঙ্গবালা হয়ে ওঠে যেন সেই হারানো ভাঙা বাংলামায়েরই এক প্রতীকে। খুব সচেতন ও অব্যর্থভাবেই ঋত্বিক বঙ্গবালাকে পর্দায় দেখানোর শটে রাখেন ওই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি— “কেন চেয়ে আছ গো মা”। দৃশ্যকল্প ও সাউন্ডট্রাকের এক অনন্য সংযোগে। আর শুধু বঙ্গবালা নয়, আমরা একাধিকবারই পর্দায় ইমেজে দেখি বঙ্গবালার সঙ্গে নীলকণ্ঠরূপী ঋত্বিক ঘটককে। মাতা ও সন্তানের যুগল টু-শট যেন। আর নীলকণ্ঠ নামটাও কতই না প্রতীকী! দেশভাগের সকল যন্ত্রণা, পূর্ববঙ্গকে হারানোর সব বেদনা নিয়ে, ঋত্বিক ঘটকও কি বাস্তবের এক নীলকণ্ঠ শিল্পী নন?

 

ঋত্বিক আরও দুটো কাহিনিচিত্র শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করেননি। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের নাগিনী কন্যার কাহিনী ও শংকরের কত অজানারে। বাংলা সাহিত্যের চমৎকার এ দুটি উপন্যাস ঋত্বিকের ক্যামেরায় কীরকম নান্দনিক রূপ পেত, দুঃখের বিষয় যে, বাঙালি দর্শক তা আর কখনওই দেখতে পারল না!

বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক— আদিবাসীও কা জীবন, ওঁরাও, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান, পুরুলিয়ার ছৌ, আমার লেনিন, দুর্বার পদ্মারামকিঙ্কর বেইজফিয়াররঁদেভু নামে দুটো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও। বিষয়বস্তুতে এসব প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলি যেমন বৈচিত্র্যময়, নির্মাণশৈলীতেও তেমনি ব্যতিক্রমী। তবে কি-না, ভালো প্রামাণ্যচিত্রের মূল বিষয়ই হচ্ছে নির্মাতার নৈর্ব্যক্তিকতা। ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতির ঊর্ধ্বে উঠে বিষয়বস্তুটাকে নিরপেক্ষভাবে পর্দায় তুলে ধরা। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক ছিলেন প্রচণ্ড আবেগী এক মানুষ। আর সে আবেগকে ওঁর ছবিতে জায়গা দিতে, বা কোনও পক্ষ নিয়ে ফেলতে, দ্বিধা করতেন না মোটেই। ফলে ওঁর নিজের আবেগের এই অনুপ্রবেশ আমার ধারণা ঋত্বিকের প্রামাণ্যচিত্রগুলিকে খর্বিতই করেছে। ওঁর কাহিনিচিত্রগুলির মতো সেগুলিকে কালজয়ী হতে দেয়নি।

 

ঋত্বিক ঘটক ছিলেন খুবই প্রথাবিরোধী ও আইকনোক্লাস্ট এক চলচ্চিত্রকার। সাহসী এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী। তাই এটা বিস্ময়ের কিছু নয় যে ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় সিনেমার Enfant de Terrible আখ্যাটা পেয়ে যান। এক দুরন্ত শিশু যেন যাকে পোষ মানানো যায় না! আর এই প্রথাবিরোধিতার কারণেই ঋত্বিক ঘটক নিয়ে ভারতে এবং ভারতবর্ষের বাইরে আজও আগ্রহের সীমা নেই।

একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে ঋত্বিক ঘটকের বেশ কিছু মৌলিকত্ব রয়েছে। যেমন ওঁর ক্যামেরার কাজ। মিড শট তেমন ব্যবহার করতেন না। প্রকৃতি বা নগরজীবনের মাঝে চরিত্রদের লং শট বা এক্সট্রিম লং শট বেশি নিয়েছেন। অথবা শট নিয়েছেন ক্লোজ-আপে। এবং অনেক সময়ই বিগ ক্লোজ আপে। মেঘে ঢাকা তারা-র নীতার অসামান্য কিছু ক্লোজ-আপের কথা বলা যেতে পারে যা একই সঙ্গে গভীর অর্থবহ এবং নান্দনিকও।

 

লেন্সিংয়ের ব্যবহারেও ঋত্বিক মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ওঁর ছবিগুলোতে প্রচুর ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের ব্যবহার করেছেন। বলা চলে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঋত্বিক ঘটক আলাদা একটা ঘরানাই যেন প্রায় সৃষ্টি করে গেছেন। আমার জানা-মতে ভারতবর্ষের আর কোনও চলচ্চিত্রনির্মাতা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলের এত বিবিধ ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহার করেননি। এক বিকৃত সময়কাল ও বিকৃত সমাজব্যবস্থায় ওঁর চরিত্রদের ভেঙে যাওয়া আবেগ-অনুভূতি ও স্বপ্নগুলোকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঋত্বিক খুব সচেতনভাবেই ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের এত বেশি ব্যবহার করেছিলেন। অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত ও পৌন:পুনিক ব্যবহারের মাধ্যমে ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্বে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের একটা ভিন্ন দর্শনই যেন সৃষ্টি করে গেছেন।

তিতাস একটি নদীর নাম ছবিটার চিত্রগ্রাহক বেবী ইসলাম ঋত্বিকের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ব্যবহার প্রসঙ্গে আমাকে একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন। তিতাস-এ একটা বৃষ্টির দৃশ্য আছে। বেবী ইসলাম ভাই বৃষ্টির দৃশ্যটা শুট করার জন্যে একটা ৫০ মিমি লেন্স লাগিয়েছিলেন যাতে বৃষ্টির দৃশ্যটা বেশ শিল্পিত লাগে। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক ওঁকে বললেন; “হটাও ওই লেন্স। ওরকম পুতুপুতু সুন্দর বৃষ্টি আমি চাই না। ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লাগাও।” বেবীভাই নিজেও একজন অভিজ্ঞ ক্যামেরাম্যান এবং জীবনে অনেক বৃষ্টির দৃশ্য উনি শুট করেছেন। কিন্তু কোনওদিনই ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সে বৃষ্টির কোনও শট নেননি কখনও। তাই কিছুটা বিস্মিতই হয়েছিলেন। কিন্তু শটটা নেওয়ার পর উনি বুঝতে পারলেন যে ঋত্বিক ঘটক ওঁকে আসলে ঠিক কী শেখাতে চেয়েছিলেন। কারণ রাশ প্রিন্টে দেখলেন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ছে যেন প্রায় একেকটা টাকার মতো বড় বড়। ফলে তিতাস-এর বৃষ্টির দৃশ্যটা একটা আলাদা মাত্রা পেয়ে যায়।

 

ঋত্বিক ঘটকের ক্যামেরার কাজ সম্পর্কে আরেকটা কথাও বেবীভাই আমাকে বলেছিলেন। বিষয়টা আমি অন্য উৎস থেকেও শুনেছি। তা হচ্ছে ঋত্বিক ঘটক ক্যামেরার লেন্সের সামনে কোনও ফিল্টার লাগানো পছন্দ করতেন না। বেবীভাইকে বলতেন: “খবরদার, কাঁচ লাগাবি না।” কাঁচ বা ফিল্টার ছাড়াই ওঁর শটগুলো নেওয়া হত। ফলে ঋত্বিক ঘটকের ছবিগুলির সিনেমাটোগ্রাফিও হয়েছে মানুষটার মতোই তীক্ষ্ণ, স্বচ্ছ ও অকৃত্রিম।

ঋত্বিক ঘটকের ছবিগুলির এক বড় সম্পদ হচ্ছে ওঁর ছবিগুলোর অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাউন্ডট্রাক। ওঁর প্রতিটি ছবিই সঙ্গীত প্রয়োগ বা সাউন্ডট্রাকে আবহসঙ্গীত ব্যবহারের ক্ষেত্রে গভীরভাবে শিল্পগুণ-সমৃদ্ধ। ঋত্বিক ঘটকের সাঙ্গীতিক প্রজ্ঞা ছিল সূক্ষ্ম ও উঁচু মাপের। যে সাবলীল দক্ষতায় ছবির পর ছবিতে উনি ভারতীয় ধ্রুপদ বা মার্গসঙ্গীতের রাগ-রাগিণীর নানা সুর বা সঙ্গীতাংশ ব্যবহার করেছেন তা আমাদেরকে মুগ্ধ না করে পারে না। বাঙালির এক বড় সম্পদ রবীন্দ্রসঙ্গীত। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি চলচ্চিত্রনির্মাতাই তাঁদের ছবিতে নানাভাবেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ঋত্বিক ওঁর ছবিগুলোতে রবীন্দ্রনাথের গান ও সুরকে যে অনাবিল দক্ষতা ও সূক্ষ্মতায় ব্যবহার করেছেন তা খুবই লাগসই ও শিল্পসমৃদ্ধ হয়েছে। যেমন মেঘে ঢাকা তারা-য় “যে রাতে মোর দুয়ারগুলো ভাঙল ঝড়ে” কিংবা যুক্তি-তক্কো-গপ্পো-তে “কেন চেয়ে আছ গো মা” গান দুটি। এছাড়া বাংলার লোকজ গানের ব্যবহারেও ঋত্বিক এগিয়ে রইবেন। ওঁর তিতাস একটি নদীর নাম ছবির একাধিক লোকজ গানের সফল ব্যবহার, যেমন “লীলাবালি লীলাবালি ওলো যুবতী সই গো/কী দিয়া সাজামু তোরে” একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। আর কেবল গান কেন? ছবিগুলোর সাউন্ডট্রাকে এফেক্ট মিউজিক হিসেবে যে অসংখ্য ছোট ছোট মিউজিক পিস ঋত্বিক ব্যবহার করেছিলেন সেসবও তো খুবই নান্দনিক। আসলে ঋত্বিকের ছবিগুলোর সাউন্ডট্রাক এতই শিল্পগুণসমৃদ্ধ যে ওঁর যে-কোনও ছবির সাউন্ডট্রাকই সিনেমার ছাত্রদের জন্যে একটা টেক্সটফিল্ম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

 

আর কেবল আবহসঙ্গীত বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকই নয়, চলচ্চিত্রের ভাষায় যাকে বলে এফেক্ট সাউন্ড, ফলি শিল্পীরা ছবির ঘটনা ও চরিত্রদের মেজাজ অনুযায়ী সাউন্ডট্রাকে যেসব শব্দ সৃষ্টি করেন, ঋত্বিক ঘটক ওঁর ছবিগুলোতে সে-সব শব্দেরও খুবই সৃজনশীল ব্যবহার করে গেছেন। মেঘে ঢাকা তারা ছবিটি থেকে দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক। যে দৃশ্যে নীতা বুঝতে পারল যে ওর প্রেমিক সনৎ, যাকে নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল, ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত নীতা এক দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। এ সময়ে সাউন্ডট্রাকে আমরা ভেসে আসতে শুনি চাবুকের সপাং সপাং শব্দ। কেউ যেন নীতার বিধ্বস্ত হৃদয়টাকেই নিষ্ঠুরের মতো চাবুক মারছে। চলচ্চিত্রে এফেক্ট সাউন্ড ব্যবহারের খুবই খুব নাটকীয় ও কার্যকর এক উদাহরণ। তবে ওই মেঘে ঢাকা তারা-তেই আরেকটা এফেক্ট সাউন্ড আছে যা আমার কাছে অনেক বেশি নান্দনিক ও সূক্ষ্ম মনে হয়েছে। আমরা জানি নীতা হচ্ছে ওই দরিদ্র উদ্বাস্তু পরিবারটার একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি যার টাকায় এ সংসারটা চলে। ফ্রেমের পেছনে নীতা আর ওর প্রেমিক সনৎ গল্প করছে আর ফ্রেমের সামনে মা উঠোনে ভাত রাঁধছেন। মায়ের আশঙ্কা ওরা তো প্রেম করছে। তার মানে মেয়েটা এক সময় বিয়ে করে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। তার অর্থ এ বাড়িতে আর হাঁড়ি চড়বে না। ঋত্বিক ঘটক মায়ের মনের এই টেনশনটা বোঝাতে হাঁড়িতে ভাত ফোটার বলকের যে শব্দ স্বাভাবিকভাবে হত সে শব্দটাকে সাউন্ডট্রাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিলেন। অতিরিক্ত জোরে এ শব্দটা দেওয়ার উদ্দেশ্যটাই ছিল কেবল শব্দের মাধ্যমে মায়ের মনের অস্থিরতাকে দর্শকদের কাছে তুলে ধরা। ভাতের বলকের এ শব্দটা তো ওঁকে দিতেই হত। তবে সাউন্ডট্রাকে শব্দের ফিডারটা বুদ্ধিদীপ্তভাবে বাড়িয়ে দিয়ে ঋত্বিক ওঁর বক্তব্যটা যেন আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তুললেন। সিনেমায় এফেক্ট সাউন্ড আপনি যেখান থেকে খুশি এনে লাগাতে পারেন। কিন্তু সেই এফেক্ট সাউন্ডই সেরা যা পরিপার্শ্বের মধ্যে রয়েছে বা দর্শক স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। মেঘে ঢাকা তারা-য় চাবুকের শব্দ আর এই ভাতের বলকের শব্দ, এ দুটোর মাঝে তুলনা করতে হলে বলব, শব্দের দ্বিতীয় ব্যবহারটাই বেশি শিল্পসার্থক হয়েছে। কারণ চাবুকের ব্যাপারে আরোপিত বা কৃত্রিমতার অভিযোগ উঠলেও ভাতের বলকের ক্ষেত্রে সেটা উঠবে না। কারণ সে শব্দের উৎসটা দর্শক নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে। সাউন্ডট্রাকে শব্দের এমন নান্দনিক ও সৃজনশীল ব্যবহার ঋত্বিকের প্রায় প্রতিটি ছবিতেই রয়েছে।

খুবই সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ একজন মানুষ ও শিল্পী ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সাতচল্লিশের দেশভাগ ওঁর মনোজগতের স্থৈর্যটাকেই যেন ভেঙে প্রায় চুরমার করে দিয়েছিল। যে গভীর বেদনাবোধ ও হাহাকার থেকে ঋত্বিক ঘটক কখনওই যেন আর মুক্ত হতে পারেননি। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের দুঃখ-দারিদ্র্য ও অমানবিক মানসিক বেদনা, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রজগতের স্থূল ফিলিস্টাইনিজম এবং ভারতবর্ষের তৎকালীন শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও মূল্যবোধহীন এক সমাজ ওকে আজীবন তাড়িত ও রাগী করে রেখেছিল। ওঁর ছবি তৈরি, লেখালেখি, নাট্যচর্চা সব ক্ষেত্রেই আমরা সেই রাগেরই প্রকাশটা দেখি। নজরুলের ওই কবিতার মতোই যেন “দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি”। মননে ও চেতনায় বৃদ্ধ বয়সেও তাই ঋত্বিক ঘটক হয়ে রইলেন যেন এক “রাগী তরুণ”। অ্যালকোহলের মাঝে হয়তো কিছুটা শান্তি খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা যে পাননি সেটা তো ওঁর গোটা জীবনটাই প্রমাণ। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিপার্শ্বের প্রতি ক্ষোভ ঋত্বিকের প্রায় সব ছবিতেই রয়েছে, তবে সেটা সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠতে দেখি ওঁর প্রায় আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র যুক্তি-তক্কো-গপ্পো-তে। এ-প্রসঙ্গে এ-ছবির শেষ দৃশ্যটি তো খুবই অর্থবহ যখন নীলকণ্ঠরূপী ঋত্বিক ক্যামেরার সামনে এগিয়ে এসে ক্যামেরার লেন্সে মদ ঢেলে দিলেন! খুবই, খুবই প্রতীকী এক সমাপ্তি!!

 

তবে ঋত্বিকের চলচ্চিত্রগুলোর এমন কিছু শাশ্বত দিক রয়েছে যা ওঁর শিল্পসম্ভারকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। যেমন পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পরিবারের জীবনে ঘটে যাওয়া ১৯৪৭-এর দেশভাগের যন্ত্রণা ও সব কিছু হারানোর যে আর্তি, তা ওঁর দেশভাগ-ট্রিলজি মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা-য় ঋত্বিক অমর করে রেখে গেছেন। আর বাঙালি জাতির কাছে দেশভাগের তাৎপর্য তো কখনওই হারিয়ে যাবে না। ফলে ঋত্বিকের ছবির গুরুত্ব আগামীতেও রয়েই যাবে। তাছাড়া ঋত্বিক ঘটকের একটা মাহাত্ম্য এখানেই যে দেশভাগের বেদনাকে উনি কেবল সাতচল্লিশের এক বিশেষ সময়কালে বা কেবল পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের দুঃখ-কষ্টের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। সে বেদনাকে খুবই সফলভাবে চিরন্তন এক মহাজাগতিক (Cosmic) রূপ দিতে পেরেছিলেন। ওঁর চরিত্রগুলি এমন একটা আত্মিক সংকটে ভোগে যা প্রায় বিশ্বজনীন। “উদ্বাস্তু, কে নয়?” উন্মুল লক্ষণাক্রান্ত এই আস্তিত্বিক সংকট তো পৃথিবীর দেশে দেশেই। যুগে যুগেই তো উদ্বাস্তু হওয়া মানবজাতির এক বিশেষ ভবিতব্য। শারীরিকভাবে, কিংবা মনোজগতে। এছাড়া রয়েছে নকশাল আন্দোলন যা পশ্চিমবঙ্গের সমাজে ও রাজনৈতিক ইতিহাসে রেখেছিল এক সুগভীর ছাপ― যুক্তি-তক্কো-গপ্পো; কিংবা যন্ত্রের সঙ্গে মানুষর আন্তঃসম্পর্কের মতো চিরন্তন একটা বিষয়― অযান্ত্রিক; মৃত্যুপথযাত্রী এক বিষণ্ন নদীর কান্না— তিতাস একটি নদীর নাম। ঋত্বিক ঘটকের ছবিগুলি তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সচেতন দর্শকদের দেখে যেতেই হবে। আগামী দিনের দর্শকেরা যত শিক্ষিত ও সচেতন হবে, হবে ইমেজ-স্বাক্ষর, ঋত্বিকের ছবিগুলোর আকর্ষণও ততই বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। তাই ঋত্বিককে “চলচ্চিত্রকারদের চলচ্চিত্রকার” বলে সীমিত করে রাখার কোনও সুযোগ নেই। সীমাবদ্ধতা যদি কিছু থাকে তা দর্শকদের বোধের ও উপলব্ধির। ঋত্বিক ঘটকের শিল্প-দুর্বলতা নয়।

আর ঋত্বিক ঘটকের কাছ থেকে আগামীদিনের নির্মাতারা শিখতে পারবেন যে সিনেমা একটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম মননশীল শিল্প। ছবি তৈরির ক্ষেত্রে হতে হবে তাই শতকরা একশো ভাগ আন্তরিক ও সৎ। সবরকম বাণিজ্যিক বিবেচনার বাইরে থেকে ছবি তৈরি করা, ছবির বিষয়বস্তু নির্বাচনে মৌলিক ও দুঃসাহসী হওয়া— ঋত্বিকের মতো। একজন ঋত্বিক ঘটকের পক্ষেই সম্ভব ছিল অযান্ত্রিক-এর মতো ওরকম প্রথাবিরুদ্ধ বিষয় নিয়ে একটা গোটা চলচ্চিত্র তৈরি করা। কিংবা তৈরি করা যুক্তি-তক্কো-গপ্পো-র মতো প্রত্যক্ষ প্রকাশের অমন সাহসী এক সিনেমা সৃষ্টি করা।

 

আরেকটি দিক থেকেও ঋত্বিক ঘটক বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রে একজন ব্যতিক্রমী নির্মাতা হয়ে রইবেন। তা হচ্ছে এ-উপমহাদেশের চলচ্চিত্র বড় বেশি হলিউড-প্রভাবিত। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক এমন একজন বিরল চলচ্চিত্রকার যাঁর ছবি দেখলে মনে হয় না যে হলিউড বলে কিছু আছে বা ছিল। ঋত্বিকের শটগ্রহণ, লেন্সের ব্যবহার, চরিত্রদের অতিনাটকীয় অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন, এ সবকিছুই হলিউডের ঘরানা থেকে একেবারেই আলাদা। অনেক সময় পুরো বিপরীতই। তাই আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গিমার দিক থেকে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একেবারেই মৌলিক একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা, যে-রকম মৌলিক কোনও চলচ্চিত্রনির্মাতা, একজন ব্রেসঁ, একজন তারকোভস্কি, একজন ওজু, এবং একজন ঋত্বিক ঘটকও, সব যুগেই খুব কম জন্মে থাকেন।

ঋত্বিক ঘটকের কাছ থেকে আরেকটা বিষয়ও আগামী দিনের নির্মাতারা শিখতে পারবেন। তা হচ্ছে শিল্পকে বহুস্তরীয় করার ওঁর অনায়াসলব্ধ দক্ষতা। আর সেটা করার ক্ষেত্রে মিথ বা পুরাণের নানারকম সৃজনশীল ও শৈল্পিক ব্যবহার। যে সাবলীল দক্ষতায় ঋত্বিক ঘটক সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন ও চরিত্রদের সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় বা বাংলার লোকজ মিথগুলোকে মিলিয়েছেন, তা ঋত্বিকের শিল্পবোধের গভীরতাকেই তুলে ধরে।

শুরু থেকেই ঋত্বিক ঘটক ছিলেন একজন রেবেল বা এস্টাব্লিশমেন্টবিরোধী ফিল্মমেকার যিনি সিনেমার প্রচলিত নর্মগুলোকে ভাঙতে চেয়েছিলেন। একটা চরম প্রতিষ্ঠানবিরোধী ঝোঁক ছিল ওঁর এবং এস্টাব্লিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করতে অনেক দূর পর্যন্তই যেতে উনি প্রস্তুত ছিলেন। এবং গিয়েওছিলেন। জনপ্রিয়তা বা বাজারের কিছুমাত্র তোয়াক্কা না করেই একটার পর একটা চলচ্চিত্র তৈরি করে গেছেন। কীভাবে সিনেমা নামের এই দৃশ্যশ্রাব্যগত মাধ্যমটার নির্মাণে ঋত্বিক ঘটক প্রচলিত ধারাকে ভেঙেছেন বা তার সীমান্তকে প্রসারিত করেছেন তার একটা উদাহরণ হিসেবে তো আগেই বলেছি ইমেজ সৃষ্টিতে পর্দায় ওঁর ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময় ব্যবহার। আর সিনেমায় শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাউন্ডট্রাকে এফেক্ট সাউন্ড নিয়ে কত বিচিত্র ও সফল সব নিরীক্ষাই না করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক।

ব্যক্তিজীবনে ঋত্বিক ঘটক পুরো বোহেমিয়ান হলেও ওঁর শিল্পশৃঙ্খলাটাকে কিন্তু কখনওই হারাননি। ওঁর খুব কম ছবির শরীরেই ওঁর চরম অগোছালো জীবনের কোনও ছাপ রয়েছে। কেবলমাত্র অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান ও শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হওয়ার ফলে ওঁর শেষজীবনের দু-একটি ছবিতেই কেবল শিল্পসৃষ্টির সেই গোছানো দিকটির অভাব হয়তো কিছুটা চোখে পড়বে। তবু বলব চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তৈরি করা হলেও ঋত্বিক ওঁর ছবিগুলিতে, শিল্পসৃষ্টির প্রশ্নে ছিলেন, আর দশজন শিল্পসচেতন চলচ্চিত্রকারের মতোই গভীরভাবে দায়িত্বশীল। তবে ঋত্বিক যদি শেষজীবনে অ্যালকোহলে অত বেশি আসক্ত না হতেন, তাহলে নিঃসন্দেহে আরও কিছুদিন বেঁচে রইতেন, এবং আমরা হয়তো পেতাম আরও কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্র। ঋত্বিককে সময়ের কিছুটা আগে হারানোর এই বেদনাটা তো আমাদের সব চলচ্চিত্রপ্রেমীরই রয়েছে। আজ কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন একজন আদর্শ বাঙালি চলচ্চিত্রকারের মানসিক গড়ন কেমন হলে ভালো হয়, বলব, যদি কারও মাঝে ঋত্বিকের আবেগ আর সত্যজিৎ রায়ের নিখুঁততার কোনও আদর্শ সম্মিলন ঘটানো যেত! কিন্তু সেটা কি কখনওই সম্ভব!?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5245 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...