সৌভিক ঘোষাল
ম্যানসফিল্ড পার্ক সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এডওয়ার্ড সইদ এই প্রশ্নগুলিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ, শ্রেণিগত দৃষ্টিকোণ ইত্যাদির পাশাপাশি এই উপন্যাসকে ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখ থেকে, উপনিবেশের শাসক-শাসিতের দৃষ্টিকোণ থেকেও পড়া দরকার বলে সইদ মনে করেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেউ বা ভারতে বসে কেউ যখন এই উপন্যাস পড়বেন, তখন সেই সমস্ত জায়গার যে সব উল্লেখ এই উপন্যাসে রয়েছে সেগুলিকে সেই পাঠক কীভাবে দেখতে পারেন, সেই প্রশ্ন সইদ তুলেছেন। সাধারণভাবে ঔপনিবেশিক শোষণ বা দাসপ্রথার অনৈতিকতা নিয়ে শাসক-দেশের লেখকেরা নীরব থাকেন। এডওয়ার্ড সইদ দেখান জেন অস্টেন কিন্তু এই বিষয়ে পুরোপুরি নীরব নন
১৮১১ সালে খানিকটা আর্থিক ঝুঁকি নিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যসমাজে তখনও অবধি একেবারেই অপরিচিত জেন অস্টেনের সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি উপন্যাসটি। এর আগে প্রকাশকদের কাছে উপন্যাসের খসড়া পাঠিয়েও একাধিকবার প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা হয়েছিল জেন অস্টেনের। ফলে উপন্যাস প্রকাশের বাস্তব রাস্তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। বইপ্রকাশের প্রচলিত চারটি উপায় ছিল তাঁর সামনে। প্রথমটি হল নিজের খরচে বই প্রকাশ করা ও বিক্রির মাধ্যমে সেই খরচ তুলে নেওয়া। দ্বিতীয়টি হল বইপ্রকাশের আগেই গ্রাহক তৈরি করা ও গ্রাহকদের থেকে পাওয়া টাকায় বই ছাপা। তৃতীয়টি হল কপিরাইট প্রকাশকের হাতে তুলে দেওয়া। চতুর্থটি হল প্রকাশকের সঙ্গে কমিশন চুক্তি প্রথায় বই বের করা। জেন এই চতুর্থ রাস্তাটি নেন। তিনিই দেন মুদ্রণ খরচ। কমিশনের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন ও বিপণনের ব্যবস্থা করেন প্রকাশক থমাস ইগার্টন। সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি উপন্যাসটি প্রকাশের পরে বেশ সাড়া ফেলে। কিছুদিনের মধ্যেই এর প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হয়ে যায়। প্রকাশকের কাছ থেকে কমিশন বাবদ জেন পান ১৪০ পাউন্ড।
জেন অস্টেনের সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি নামটির প্রথম শব্দটি এখনও আগের অর্থেই সুপরিচিত। কিন্তু সেন্সিবিলিটি কথাটি তখনকার দিনে যে ইমোশনাল অর্থে ব্যবহৃত হত, তা একালের পাঠককে আলাদা করে জেনে নিতে হয়। উপন্যাসের প্রথম খসড়ায় সরাসরি দুই বোনের নাম ব্যবহার করেই উপন্যাসের নামকরণ করেছিলেন জেন অস্টেন। কিন্তু তারপর তিনি নামকরণ বদলে সেখানে নিয়ে এলেন চরিত্র পরিচয়ের ইঙ্গিত। নয়া নামকরণের মধ্যে দিয়েই উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র, দুই বোন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে দেন লেখিকা। উপন্যাসে দুই বোনের জীবনেই প্রেম আসে, আসে প্রেমের সংকট। কিন্তু ইলিয়নর সেই সংকটের সামনে অনেকটাই স্থিতধী, ভেতরের যন্ত্রণাকে সে ভেতরেই রেখে দিতে পারে। সে বোঝে এডওয়ার্ড ফেরার যে-কোনও কারণেই হোক তাকে ভালোবেসেও সেই ভালোবাসাকে মূর্ত রূপ দিতে পারছে না। তার মনে দ্বিধা সংশয় অস্থিরতা তৈরি হয়, কিন্তু সেই দ্বিধা সংশয় অস্থিরতাকে সে তার বোন, পরিবার বা প্রেমিকের সামনে সরবে উন্মোচিত করে দেয় না। অন্যদিকে ম্যারিয়ানে উইলোবির প্রেমে একেবারে মাতোয়ারা হয়ে যায়। প্রেমের দিনগুলিতে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে সে প্রেমিককে আঁকড়ে ধরে, আর প্রেমিক অজানা কারণে শীতল হয়ে হারিয়ে গেলে ম্যারিয়ানে ভেঙে পড়ে অঝোর কান্নায়। উইলোবির প্রত্যাখ্যান তাকে এতই বিমর্ষ করে দেয় যে ম্যারিয়ানে নিজের স্বাভাবিক স্থিতিটুকুও হারিয়ে ফেলে। তার মানসিক যন্ত্রণা তীব্র শারীরিক ব্যাধির আকার নেয় এবং নিয়ে যায় মৃত্যুর কাছাকাছি। বহু আয়াস এবং দীর্ঘ সময়ের পরই কেবল সে সেই ব্যাধি এবং শরীর-মনের যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে পারে।
জেন অস্টেনের উপন্যাসে নারী চরিত্রদের ভিড় দেখা যায়। সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি-ও তার ব্যতিক্রম নয়। ইলিয়নর আর ম্যারিয়ানের মা মিসেস ফ্যানি ড্যাশউড অনেকটাই আবেগপ্রবণ। স্বামী জন ড্যাশউডের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নরল্যান্ড পার্কের নয়া সম্পত্তিতে এসে পড়া মাত্র ভবিষ্যৎভাবনা বিন্দুমাত্র না ভেবে সে বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল সে। বড় মেয়ে এলিয়নরের বিবেচক সিদ্ধান্ত অবশ্য সেবার তাকে প্রতিহত করে।
উপন্যাসে খল চরিত্র হিসেবেই ফ্যানি ড্যাশউডকে উপস্থাপন করেছেন জেন অস্টেন। স্বামী জন ড্যাশউড অনেকটাই তার হাতের পুতুল। পিতার মৃত্যুশয্যায় জন তার সৎ বোনেদের দেখভালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পিতার মৃত্যুর পর বোনেদের বাৎসরিক একটা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে যাওয়ার ভাবনাও সে প্রথমে ব্যক্ত করে। কিন্তু নিজেদের চার বছরের সন্তানের জন্য সম্পত্তি ও অর্থ রেখে যেতে হবে, বোনেদের বেশি টাকা দিলে তা নয়ছয় হবে এবং অত টাকা তাদের প্রয়োজনও নেই— এসব কথা ফ্যানি ড্যাশউড স্বামী জনকে বোঝায় এবং জন অচিরেই সেসব মেনেও নেয়। শেষমেশ মাঝেমধ্যে কিছু উপহার ছাড়া সৎ মা ও বোনেদের সে আর কিছুই দেবে না বলে স্থির করে। জন ড্যাশউডের মধ্যে একদিকে নিজস্ব দৃঢ়তার অভাব, অন্যদিকে মারাত্মক অর্থলোলুপতা ও দোদুল্যমানতার প্রকাশ রয়েছে। রয়েছে স্ত্রীর দ্বারা ভুলভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার দৃষ্টান্ত। ফ্যানি ড্যাশউড ও তার মা মিসেস ফেরার চরিত্রের নানা নেতিবাচক দিক উপন্যাসের বিভিন্ন পর্বে আত্মপ্রকাশ করেছে। এডওয়ার্ড ফেরারের বাগদত্তা লুসির প্রতি যে নির্মম ও অভব্য আচরণ তারা করে, তা তাদের চারিত্রিক নীচতাকে সবচেয়ে খোলাখুলিভাবে দেখিয়ে দেয়।

উপন্যাসের গৌণ নারী চরিত্রদের মধ্যে রয়েছে লেডি মিডলটন, তার মা মিসেস জেনিংস, মিসেস জেনিংসের ছোট মেয়ে মিসেস পালমার এবং ড্যাশউড পরিবারের ছোট মেয়ে তথা এলিয়নর ও ম্যারিয়ানের বোন মার্গারেট।
লুসি স্টিল চরিত্রটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই উপন্যাসে থাকলেও উপন্যাসের ঘটনাক্রমের ওপর তার প্রভাব যথেষ্ট। তার প্রতি এডওয়ার্ড ফেরারের প্রায় একটি কৈশোরকালীন প্রেম তৈরি হয়েছিল এবং সে সময়েই এডওয়ার্ড তাকে বাগদান করে। পরবর্তীকালে লুসি চরিত্রের সংকীর্ণতা এডওয়ার্ডকে ক্রমশ বিব্রত করতে থাকে এবং সে মানসিকভাবে তার দিক থেকে সরতে থাকে। ইলিয়নর ড্যাশউডের প্রতি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও লুসিকে করা বাগদান থেকে সে সরে আসতে পারছিল না। এই সম্পর্ক অবশ্য মিসেস ফেরার মেনে নিতে পারেনি এবং এডওয়ার্ড ফেরারকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে তার ভাই রবার্ট ফেরারকে সব সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে দেয়। সম্পত্তির উত্তরাধিকার এডওয়ার্ডের থেকে তার ভাই রবার্ট ফেরারের কাছে যাওয়ার পরেই লুসি স্টিল তার অনুরাগের পাত্রকেও বদলে ফেলে। সম্পত্তির নয়া উত্তরাধিকারী রবার্ট ফেরারকে বিয়ে করে লুসি নিজেই নিজ চরিত্রের প্রকৃত দিকটি সবার সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
লুসি যেমন নিজের খল স্বভাবকে প্রকাশ করে, তেমনি করে উইলোবি। নায়ক হিসেবে সে উপন্যাসের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু ঘটনাক্রম তার চরিত্রের নেতিবাচক ও অন্ধকার দিকগুলিকেই একের পর এক উন্মোচিত করে দিয়েছে। শঠ, অর্থলোভী, প্রবঞ্চক ও প্রতারক হিসেবেই সে এই উপন্যাসে উপস্থাপিত। দুটি ক্ষেত্রে তার প্রতারক চরিত্রটি সামনে এসেছে। ম্যারিয়ানেকে সে উপন্যাসের ঘটনাকালের মধ্যেই প্রবঞ্চনা করে। তবে এই তার প্রথম প্রবঞ্চনা নয়। এর আগে ব্রান্ডনের পালিত কিশোরী কন্যা এলিজা উইলিয়ামসেরও সে সর্বনাশ করেছিল। অর্থলোভে এক ধনী রমণী মিস গ্রেকে সে বিয়ে করে, কিন্তু পোয়েটিক জাস্টিস হিসেবেই বোধহয় তাতেও তার সুখহীন ছবিটির কথা জানিয়ে দেন আখ্যানকার। পরিশেষে নিজের কৃতকর্মের জন্য যদিও সে ম্যারিয়ানের কাছে ক্ষমা চায়, কিন্তু তাতে তার কালিমা মোচন হয় না। জেন অস্টেনের বিভিন্ন উপন্যাসে এই ধরনের বেশ কিছু প্রতারক চরিত্রকে আমরা পাই। প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এর জর্জ উইকহ্যাম, নরল্যান্ড পার্ক উপন্যাসের হেনরি ক্রফোর্ড, এমা উপন্যাসের ফ্রাঙ্ক চার্চিল, পারসুয়েশন উপন্যাসের উইলিয়াম ওয়াল্টার এলিয়ট প্রভৃতির সঙ্গেই তুলনীয় জেন অস্টেনের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের জন উইলোবি চরিত্রটি। এরা সবাই উপন্যাসে প্রবেশ করে আকর্ষণীয় উজ্জ্বলতা নিয়ে, কিন্তু পরে তাদের মুখোশ খসে যায়, বেরিয়ে পড়ে প্রবঞ্চক প্রতারক মুখটি।
সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি-র সাফল্য জেন অস্টেনকে যেমন আত্মবিশ্বাস জোগাল, তেমনি তার পরের উপন্যাস প্রকাশের পথকেও সুগম করে দিল। ১৮১১ সালের ৩০ অক্টোবর সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি প্রকাশিত হয়। তার পরেই ফার্স্ট ইম্প্রেশন–এর পুরনো পাণ্ডুলিপিটির পরিমার্জন শুরু করেন অস্টেন। পুরনো নাম বদলে নতুন নাম রাখেন প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস, আর পাঠিয়ে দেন প্রকাশকের কাছে। ১৮১২ সালে প্রকাশক থমাস ইগার্টন প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস–এর কপিরাইট কিনে এটি প্রকাশে সম্মত হন। ১৮১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস প্রকাশিত হয়।

দুই.
প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এর প্লটটি সহজ, সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এই আকর্ষণ আরও বেড়েছে চরিত-সৃজনের দক্ষতায়। নায়ক বা নায়িকার চরিত্রকে জেন অস্টেন তো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করেছেনই, এতটুকু অবহেলা করেননি গৌণ চরিত্রগুলি নির্মাণেও। ধরা যাক উইকহ্যাম বা মিস্টার কলিন্সের কথা। কলিন্স উপন্যাসের প্রথমদিকে যে একপেশে, অনুজ্জ্বল, ভোঁতা, গোঁড়া, নৈতিক বাগাড়ম্বপূর্ণ, ধনী মুরুব্বির স্তাবকতায় উচ্চকিত হাস্যকর বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়, তা-ই মূলত পরবর্তীকালেও বজায় থাকে। তবে একদা যে এলিজাবেথ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, সেই এলিজাবেথই যখন পত্নীবন্ধু হিসেবে তার অতিথি হয়ে আসে, তখন তাঁকে সে উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান দিতে কার্পণ্য করেনি। এইটা তাকে খানিকটা ইতিবাচক করেছে। অন্যদিকে উইকহ্যাম এসেছিল বেনেট পরিবারের মেয়েদের মনে আকর্ষণের ঝড় তুলে। কিন্তু ক্রমশ তার চরিত্রটি নানা ঘটনার উন্মোচনের মধ্যে দিয়ে ক্রমশ কালিমালিপ্ত হয়েছে। মিসেস বেনেট চরিত্রটি এই উপন্যাসে আগাগোড়া উপস্থিত এক কন্যাদায়গ্রস্ত উদ্বিগ্ন মাতা হিসেব। মিসেস বেনেট উচ্চকিত ও তরল প্রকৃতির। এজন্যই ডার্সির মতো ভদ্রলোকবৃত্তের অনেকে তাকে অপছন্দ করেছে তীব্রভাবে। লিডিয়াও মায়ের মতোই উচ্চকিত ও তরল। ছেলেদের দেহ-মন সমর্পণই ষোড়শী লিডিয়ার জীবনের প্রথম ও পরম উদ্দেশ্য। মিস্টার বেনেট শান্ত স্থিতধী পিতা হিসেবে অনেক কিছুকেই হাসিমুখে মেনে নেয়, কিন্তু লিডিয়ার আচার-আচরণকে সে বাবা হয়েও প্রায়শই মানতে পারেনি। জেন এবং মূলত এলিজাবেথই তার মনের সবচেয়ে কাছের।
উপন্যাসের প্রথম পর্বের অন্যতম মুখ্য চরিত্র জেন ও বিংলে। দুজনের স্বভাবই মধুর। বিংলে পুরুষ বলেই যতটা খোলামেলা হতে পারেন, জেন মহিলা বলে খানিকটা আর নিজের স্বভাবগত কারণে খানিকটা— ততটা খোলামেলা হতে পারেনি। তবে বিংলে এবং জেন, মাঝের দীর্ঘ পর্বের অদর্শন ও যোগাযোগহীনতা সত্ত্বেও আগাগোড়া পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত থেকেছে। উপন্যাসের শুরু থেকেই তাদের বিবাহ ছিল সুনির্দিষ্ট, মাঝের জটিলতা পর্ব পেরিয়ে শেষমেশ তা সুসম্পন্ন হওয়ায় পাঠকমন খুশি হয়ে ওঠে।
সে তুলনায় ডার্সি এবং এলিজাবেথের সম্পর্কের রসায়নে রয়েছে অনেক ওঠাপড়া। তাদের চরিত্রও বহুমাত্রিক। বস্তুতপক্ষে উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার চরিত্রনির্মাণের অসামান্য মুন্সিয়ানাই প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এর সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।

মিস্টার ডার্সিকে প্রথমে অহঙ্কারি, অর্থ ও সামাজিক মর্যাদার দম্ভে পরিপূর্ণ, নিম্নতর সামাজিক গোত্রে থাকা মানুষজনেদের প্রতি উপেক্ষাপ্রবণ, কখনও কখনও কটূভাষী হিসেবে আমরা দেখি, এই লোকটিই পরে বদলে গেল, যখন এলিজাবেথ বেনেটের প্রেমে সে ভেসে গেল। নায়িকার প্রেমের টানে নায়কের এই রূপান্তর প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এর অন্যতম বিশিষ্টতা।
এলিজাবেথ চরিত্রটি এই উপন্যাসের প্রধান আকর্ষণ। সে স্নেহশীল কন্যা, দিদির আদরের বোন ও পরম বন্ধু, প্রয়োজনে কলিন্সের মতো মানুষকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যানে সক্ষম, আবার মিস্টার ফিজউইলিয়মের মতো পুরুষের সঙ্গে সহজ বন্ধুত্বে দ্বিধাহীন। বোনের ভাবী বর হিসেবে মিস্টার বিংলে আগাগোড়া তার প্রশ্রয় পেয়েছে। একসময় মিস্টার ডার্সিকে সে বিপুল সম্পত্তির লোভ পাশে সরিয়ে রেখেই দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে নিজের নৈতিক মর্যাদার জায়গা থেকে। অন্যদিকে রূপান্তরিত পরিস্থিতিতে ডার্সির প্রেমের আহ্বানে সাড়া দিতেও অতীতের সংস্কার বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এরই বিপ্রতীপে একসময়ে যে উইকহ্যাম তার মনে দোলা দিয়েছিল, তার কদর্য দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তাকে শীতল প্রত্যাখ্যানে তার একটুও সমস্যা হয়নি। এলিজাবেথ চরিত্রটির দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার সর্বোৎকৃষ্ট পরিচয় আছে লেডি ক্যাথরিনের সঙ্গে তার চূড়ান্ত কথোপকথনে। বিপুল সামাজিক মর্যাদা, বৈভব ও বয়সের ভার সঙ্গে নিয়ে তাকে দুমড়ে দিতে চেয়েছিল লেডি ক্যাথরিন, ডার্সিকে তার জীবন থেকে সরিয়ে নিজের মেয়ের সঙ্গে তাকে বেঁধে দিতে চেয়েছিল। প্রেম ও আত্মমগ্নতায় দেদীপ্যমান এলিজাবেথ সেই সময়ে যে ভাষা ও ভঙ্গিতে লেডি ক্যাথরিনকে মোকাবিলা করেছে, তা অতুলনীয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদার মনোভাবই যে এলিজাবেথ চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য তা বোঝা যায় স্ত্রীর অসম্মানের কথা ভেবে লেডি ক্যাথরিনের সঙ্গে সকল সম্পর্কত্যাগে উদ্যত ডার্সিকে সে যখন আবার লেডি ক্যাথরিনের সঙ্গে আত্মীয়তাসূত্রে মিলিয়ে দিতে চায়। নায়িকা এলিজাবেথ চরিত্র চিত্রণে একইসঙ্গে দৃঢ়তা ও কমনীয়তা, হৃদয়বৃত্তি ও বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও আকুলতার আশ্চর্য সমন্বয় প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-কে অনন্য করে তুলেছে।
জেন অস্টেনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস মূলত একটি প্রেমের উপন্যাস। কিন্তু সময় ও সমাজের নিখুঁত উপস্থাপন তার মূল্য বহুগুণ বাড়িয়েছে। একালে এই উপন্যাসটিকে একটি পিরিয়ড পিস হিসেবে পড়া সম্ভব, যাতে আঠারো-উনিশ শতকের সন্ধিলগ্নের ইংল্যান্ডের সময়কালটি ধরা আছে।
জেন অস্টেন ইংল্যান্ডের যে সমাজ-পটভূমিতে তাঁর উপন্যাসগুলিকে স্থাপন করেছেন সেখানে মূলত পাঁচটি শ্রেণি রয়েছে। অভিজাত, জমিদার ভদ্রলোক, বুর্জোয়া মিলমালিক ও ধনী ব্যবসায়ী, শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকশ্রেণি। জেন অস্টেনের উপন্যাসে সমাজের ওপরের স্তরের তিন শ্রেণির মানুষদেরই মূলত দেখা যায়, শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণির তেমন প্রতিনিধিত্ব নেই। অভিজাত মানুষেরা— ডিউক, মার্কুইস, আর্ল, ভাইক্যান্ট ইত্যাদি মাঝে মাঝে উপন্যাসে দেখা দেন বটে, কিন্তু জমিদার ভদ্রলোক ও বুর্জোয়া ব্যবসায়ীরাই জেন অস্টেনের উপন্যাসের মূল চরিত্র। প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস উপন্যাসে লেডি ক্যাথরিন একজন আর্ল-এর কন্যা এবং সে অভিজাত সমাজের প্রতিনিধি। কর্নেল ফিজ উইলিয়ামও এক আর্ল পরিবারের সন্তান এবং স্যার খেতাবধারী তথা অভিজাত। কিন্তু বিরাট জমিদারি থাকলেও মিস্টার ডার্সির অভিজাত খেতাব নেই, সে জমিদার ভদ্রলোক শ্রেণির প্রতিনিধি। অন্যদিকে বেনেট পরিবারও জমিদার ভদ্রলোক শ্রেণিরই মানুষ, যদিও তাদের জমিজমা এবং আয় অনেক কম। উপন্যাসের শেষের দিকে লেডি ক্যাথরিন যখন নায়িকা এলিজাবেথকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল ডার্সির সঙ্গে তার সামাজিক বিন্যাস মেলে না, তখন এ কারণেই এলিজাবেথ লেডি ক্যাথরিনকে মুখের ওপর জানিয়ে দিয়েছিল ডার্সি যেমন একজন ভদ্রলোক জমিদার, সেও তেমনি এক ভদ্রলোক জমিদারের মেয়ে, একই সামাজিক বর্গের মানুষ তারা। বাস্তবে অবশ্য এক সামাজিক বর্গের মধ্যেও তফাত কত ব্যাপক হয়ে থাকে, সেটা এই উপন্যাসে বারবার ধরা পড়েছে। ডার্সির বন্ধু এবং এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র মিস্টার চার্লস বিংলে কিন্তু জমিদার সম্প্রদায়ের মানুষ নয়। তাদের ধনসম্পদের উৎস পারিবারিক ব্যবসা এবং তারা বুর্জোয়া ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রতিনিধি। এদের অনেকেই সে সময় জমিদারি কিনে জমিদার ভদ্রলোক শ্রেণিতে প্রবেশের জন্য ব্যগ্র ছিল। চার্লস বিংলের বোন ক্যারোলিন বিংলের মধ্যে এই সংক্রান্ত উদগ্র আকাঙ্ক্ষা আমরা দেখেছি। সমাজের ওপরতলার এই তিনটি শ্রেণির প্রতিনিধিরা নিজ নিজ সামাজিক বর্গের অহঙ্কার ও সংস্কার নিয়ে কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কের নানা জাল-জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে, বিত্ত ও চিত্তের নানামুখী দ্বন্দ্ব কীভাবে আবির্ভূত ও মীমাংসিত হয়— প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস উপন্যাসটি সেই কাহিনিকেই আকর্ষণীয় ও জীবন্তভাবে তুলে ধরেছে।

তিন.
প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস প্রকাশের পর অস্টেন তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ম্যানসফিল্ড পার্ক লেখার কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৮১৩ সালের নভেম্বরেই প্রকাশক ইগার্টন ম্যানসফিল্ড পার্ক ছাপার বিষয়ে তাঁর আগ্রহ জানিয়ে দেন। ১৮১৪ সালের ৯ মে এটি প্রকাশিত হয়।
ম্যানসফিল্ড পার্ক জেন অস্টেনের অন্যান্য উপন্যাসের থেকে স্বাদে গন্ধে বেশ খানিকটা আলাদা। পূর্ববর্তী প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-সহ নানা উপন্যাসেই নায়িকা হিসেবে উচ্ছল উজ্জ্বল যে-সব নারীদের আমরা পেয়েছি, তাদের আবেগ অনুভূতির যে অবিশ্রান্ত উদগীরণ আমরা লক্ষ করেছি, তার থেকে এই উপন্যাসের নায়িকা ফ্যানি প্রাইস একেবারেই আলাদা। ফ্যানি চুপচাপ, নির্জনতাপ্রিয়, নৈতিকতার কঠোর আবরণে ঘেরা। নৈতিক শুদ্ধতার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁকের কারণে সে নিজের আকাঙ্ক্ষা অর্জনের জন্য সচেষ্ট নয়। আশ্রিতা হিসেবে আশ্রয়দাতার বাড়িতে ভাগ্যচক্রে যে জীবন তার জন্য বরাদ্দ হয়েছে, সেটুকু নিয়েই সে চলতে চায়। আঠারো-উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ যখন মাথাচাড়া দিচ্ছে আর আয়ান আয়াটের মতো উপন্যাস-তাত্ত্বিকদের মতে সেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ থেকেই উপন্যাসের জন্ম। উপন্যাসের নায়ক বা নায়িকার মধ্যে এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ না থাকলে সে আধুনিক সাহিত্যবর্গ উপন্যাসের নায়ক বা নায়িকা হতে পারবে না, এটাই উপন্যাস পাঠক ও বিশ্লেষকদের সাধারণ অভিমত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেকে মনে করেন ফ্যানি প্রাইস নয়, এই উপন্যাসেরই আরেক উল্লেখযোগ্য চরিত্র মেরি ক্রফোর্ড বরং অনেক বেশি নায়িকাসুলভ, আকর্ষণীয় ও বর্ণময়। নিজের জীবনের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে অর্জন করার জন্য তার সচেষ্টতা তাকে বর্ণময়, আকর্ষণীয়, গতিশীল করেছে। নিস্তরঙ্গ ফ্যানিকে এখানে বানানো হয়েছে নায়িকা আর বর্ণময় মেরি ক্রফোর্ডকে পার্শ্বচরিত্র করে একপাশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে— এটা অনেকেই মেনে নিতে প্রস্তুত নন।

ফ্যানি নিঃসন্দেহে নির্জনতাপ্রিয়, চুপচাপ, নৈতিক শুদ্ধতাবোধে স্পৃষ্ট, কিন্তু তাই বলে ফ্যানির মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নেই, এই অভিযোগ কি শেষপর্যন্ত সঠিক? নৈতিকতাতে দৃঢ় থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে কি এক ধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ তার মধ্যে আসেনি? সামাজিক ও আর্থিক প্রতিপত্তিসম্পন্ন হেনরি ক্রফোর্ডের বারবার প্রেমনিবেদন ও বিবাহপ্রস্তাব ফ্যানি যে বারবার দৃঢ়তার সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়, আশেপাশের সকলের আগ্রহ, পরামর্শ ও অনুরোধকে অস্বীকার করে নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকে, তার পেছনে সক্রিয় থাকে তার কঠোর নৈতিকতাবোধ। যে হেনরি অনৈতিক সম্পর্কে এগোয় মারিয়ার সঙ্গে, প্রেমের চেয়ে ফ্লার্টিং যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে নেহাত যৌবনের স্বাভাবিক পদস্খলন ভেঙে ক্ষমা করে দিতে ফ্যানি প্রস্তুত নয়। মনে রাখতে হবে ফ্যানি শুধু হেনরি ক্রফোর্ডের প্রস্তাবকেই ফিরিয়ে দেয়নি। হেনরিকে বিয়ে করার জন্য তার আশ্রয়দাতা মেসো থমাস বার্ট্রামের পরামর্শকেও অগ্রাহ্য করে তার বিরাগভাজন হয়েছে। ম্যানসফিল্ড পার্কের সুখ-সমৃদ্ধির জীবন ছেড়ে পোর্টসমাউথের অপরিসর বাড়িতে এজন্য তাকে বেশ কিছুদিনের জন্য চলেও যেতে হয়েছিল। সেখানে সে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও পড়েছে। ফ্যানি যখন পোর্টসমাউথে নানা অস্বস্তির মধ্যে আছে, তখন সেখানে আরও একবার হেনরি ক্রফোর্ড তার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল। ফ্যানি কিন্তু সে সময়েও হেনরিকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং অনৈতিক ব্যক্তিকে বিয়ের মাধ্যমে পার্থিব সুখ কিনতে চায়নি। ফ্যানি যে ঔপনিবেশিক দুনিয়ার উন্নতিকামী অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল তা বোঝা যায় উপনিবেশ-প্রসঙ্গে, সেখানকার দাসব্যবসা-প্রসঙ্গে তার সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থেকে। ঔপনিবেশিক শোষণের বিষয়টি উপন্যাসে যে কিছুটা হলেও সামনে আসে, তা সম্ভব হয় স্যর থমাসকে করা ফ্যানির প্রশ্ন ও এডমন্ডের সঙ্গে ফ্যানির কথাবার্তার সূত্র ধরে। এটা ফ্যানি-চরিত্রের এমন একটা বৈশিষ্ট্যকে সামনে আনে, যা সেকালের ব্রিটিশ নভেলে খুবই ব্যতিক্রমী।
ম্যানসফিল্ড পার্ক সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ওরিয়েন্টালিজম নামক বিখ্যাত গ্রন্থের লেখক এডওয়ার্ড সইদ ফ্যানির এই প্রশ্নগুলিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ, শ্রেণিগত দৃষ্টিকোণ ইত্যাদির পাশাপাশি এই উপন্যাসকে ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখ থেকে, উপনিবেশের শাসক-শাসিতের দৃষ্টিকোণ থেকেও পড়া দরকার বলে সইদ মনে করেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কেউ বা ভারতে বসে কেউ যখন এই উপন্যাস পড়বেন, তখন সেই সমস্ত জায়গার যে সব উল্লেখ এই উপন্যাসে রয়েছে সেগুলিকে সেই পাঠক কীভাবে দেখতে পারেন, সেই প্রশ্ন সইদ তুলেছেন। এডওয়ার্ড সইদ দেখান এই উপন্যাসে থমাস বার্টার্ম অ্যান্টিগায় যাচ্ছে তার আখের খামার দেখভাল করতে। সেখানে আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের দিয়ে চাষাবাদ করিয়ে বিপুল মুনাফা তুলত ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষেরা। থমাস বার্ট্রামের মতো জেন অস্টেনের সময়কার নোবেলিটি ও জমিদার পরিবারগুলির অনেকেই এই মুনাফা থেকে রসেবশে থাকত। সাধারণভাবে এই ঔপনিবেশিক শোষণ বা দাসপ্রথার অনৈতিকতা নিয়ে শাসক-দেশের লেখকেরা নীরব থাকেন। এডওয়ার্ড সইদ দেখান জেন অস্টেন কিন্তু এই বিষয়ে পুরোপুরি নীরব নন। তাঁর উপন্যাসের নায়িকা তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র উপন্যাসের নায়ক এডমন্ডকে কথোপকথন-প্রসঙ্গে জানায় সে তার মেসোমশাই থমাস বার্ট্রামকে অ্যান্টিগার দাসপ্রথা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, কিন্তু নীরবতা ছাড়া উত্তরে সে আর কিছুই পায়নি। এডমন্ড নিজে যদিও বাবাকে এই বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করেনি, কিন্তু বিষয়টা নিয়ে যে তার আগ্রহ ছিল এবং নিজে এই বিষয়ে প্রশ্ন করতে না পারলেও আরও কেউ কেউ ফ্যানির মতো বিষয়টি জানতে চাক এবং একটা উত্তর বেরিয়ে আসুক, এটা সে চেয়েছিল। এডওয়ার্ড সইদ দেখান দাসপ্রথার পাশাপাশি এই উপন্যাসে ঔপনিবেশিক শাসন এবং সেই সূত্রে শাসিত দেশগুলিতে ইংল্যান্ডের নৌসেনা পাঠানোর দিকটিও কীভাবে এই উপন্যাসে এসেছে। মিসেস বার্ট্রামের সঙ্গে তার বোনপো উইলিয়ামের হালকা চালের কথোপকথনটি খেয়াল করা যাক। ইংরেজ নেভিতে কর্মরত হওয়ার সূত্রে ব্রিটিশ সেনার অংশ হিসেবে ইস্ট ইন্ডিজ অর্থাৎ ভারত, পারস্য দেশ-সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে উইলিয়াম গেছিল এবং সেখান থেকে মাসির জন্য সে যে শাল নিয়ে এসেছে তাতে লেডি বার্ট্রাম খুবই খুশি। সে এই দেশগুলি, সেখানে ইংরেজ সেনার কাজ বা শাসন সম্পর্কে, সেখানকার মানুষ সম্পর্কে কিছু জানতে আগ্রহী নয়। তার আগ্রহ কেবল সেই সব দেশের সুন্দর পণ্য সম্পর্কে। দাসপ্রথা বা ঔপনিবেশিক শাসনের প্রসঙ্গগুলি সংক্ষিপ্ত আকারে উপন্যাসে এলেও জেন অস্টেন যে বিষয়গুলিকে এড়িয়ে যাননি, সেটাকে এডওয়ার্ড সইদ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বলেই মনে করেন।

চার.
ম্যানসফিল্ড পার্ক প্রকাশের আগেই জেন অস্টেন তাঁর চতুর্থ উপন্যাস এমা লেখার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। ১৮১৪-র জানুয়ারি মাসেই এমা লেখার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল, আর তা শেষ হল ১৮১৫ সালের ২৯ মার্চ। ১৮১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এমা প্রকাশিত হল। জেন অস্টেনের প্রকাশক বদলাল এইবার। এমা প্রকাশ করলেন জন মারে।
এমা জেন অস্টেনের একমাত্র উপন্যাস যার নাম তার নায়িকার নামে। নায়িকার নামে অস্টেন প্রথমে আরও দুটি উপন্যাসের নাম রাখলেও শেষমেশ তাতে বদল আসে। এলিয়নর অ্যান্ড মারিয়ানে বদলে হয় সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি, আর সুসান বদলে হয় নর্দাঙ্গার অ্যাবে। এদিক থেকে এমা উপন্যাসটি ব্যতিক্রম। এর নামকরণ হয়েছে নায়িকার নামেই। তবে উপন্যাসের নাম নায়িকার নামে রাখলেও উপন্যাসে নায়িকা এমাকে নিয়ে জেন অস্টেন মাঝেমধ্যেই বেশ কৌতুক করেছেন। নায়িকা তার ধারাবাহিক ভুলভ্রান্তির জন্য সমালোচনাতেও বিদ্ধ হয়েছে বারবার। এই উপন্যাস যার দৃষ্টিকোণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, সে উপন্যাসের নায়ক মিস্টার জর্জ নাইটলি। জর্জ নাইটলি এমার সঙ্গে শুধু হালকা খুনসুটিই করে না, সে এমা চরিত্রের সমস্যাজনক নানাদিকের তীব্র ও তীক্ষ্ণ সমালোচক। এমার সমস্যাগুলি সে এমাকে সরাসরি জানিয়ে দেয়, তার সঙ্গে দৃষ্টিকোণগত পার্থক্য নিয়ে তীব্র বিতর্কে মাতে। মতের অমিল মনকষাকষির পরিস্থিতি তৈরি করলেও সে সত্যকথন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় না।
এই উপন্যাসে এমাকে দেখে আমাদের মনে হয় সে স্বভাবগতভাবে ম্যাচমেকার বা ঘটকালিপ্রবণ। তার মধ্যে ভালো ঘটকসত্তা রয়েছে— এটা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এবং অন্যদের তা জাঁক করে জানাতে ভালোবাসে। তবে উপন্যাসের ঘটনাবলি থেকেই বোঝা যায় এমার এই ধারণা কতটা ভুল। উপন্যাসের শুরুতে এমার গভর্নেস মিস টেলর ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বিপত্নীক মিস্টার ওয়েস্টনের বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। এমা গর্ব করে বলে তার ঘটকালিতেই এই বিয়েটা হতে পারল। তবে বাস্তবে এর পেছনে এমার তেমন কোনও ভূমিকাই ছিল না। দুজনের সম্পর্ক নিজস্ব গতিতেই এগিয়েছিল এবং তা বিবাহে পরিণতি পেয়েছিল। এমার উদ্যোগ বা ভূমিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বা বিবাহের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ ছিলই না। এই বিবাহে এমার ঘটকালির ভূমিকা রয়েছে— এমার এই আত্মপ্রচার ততটা সমস্যাজনক ছিল না কিন্তু এর সূত্র ধরে তার মাথায় আরও ঘটকালি করার যে ভূত চাপল, তার ফল হয় মারাত্মক। এমার আশেপাশের অনেকগুলি মানুষ তার ঘটকালি ক্রীড়ার দ্বারা নানাভাবে বিড়ম্বিত হয়। তৈরি হয় নানা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। এমা নিজে অন্যদের ভুল বোঝে, অন্যদের আবেগকে জোর করে ভুল পথে চালিত করতে চায় ও অনাকাঙ্ক্ষিত জটিল সব পরিস্থিতির জন্ম দেয়। উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে হ্যারিয়েট স্মিথ, রবার্ট মার্টিন ও মিস্টার এলটনকে এমার এইসব পরীক্ষানিরীক্ষা ও খেয়ালখুশির জন্য নানারকম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে এসে এই প্রবণতা নতুন ধরনের কিছু সমস্যার জন্ম দেয়। তবে ভুলবোঝাবুঝি ও জটিলতা উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ডে এসে যে আরও ব্যাপ্ত ও গভীর হবে, তার সব দায় নায়িকা এমার ভুল ভাবনাচিন্তার নয়। উপন্যাসের নানা চরিত্রই আধা-প্রকাশ্য, আধা-গোপনভাবে এখানে চলাফেরা করেছে ও তার ফলে শুধু এমা নয়, অনেকেই অনেকের সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং এইসব বিভ্রান্তি উপন্যাসে নতুন নতুন জট-জটিলতা তৈরি করেছে।
এমা উপন্যাসের গঠনশৈলী ঔপন্যাসিক জেন অস্টেনের দক্ষতা প্রমাণ করে। এই উপন্যাসের সমস্ত অধ্যায় এবং সমস্ত ঘটনাবলি একটি কেন্দ্রীয় ভাবনার চারপাশে নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত। তিন খণ্ডের এই উপন্যাসের প্রথম দু-খণ্ডে এমা হ্যারিয়েটের জন্য উপযুক্ত পাত্র সন্ধান করে যায়, শেষ খণ্ডে এসে নিজের মনকে সে বুঝতে পারে এবং পূর্বসিদ্ধান্ত ভেঙে নিজেকে আবিষ্কার করে মিস্টার নাইটলির অনুরক্তা ও পাত্রী হিসেবে। প্রথম খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে মিস্টার এলটন অন্যতম প্রধান চরিত্র থেকে সরে যায় পার্শ্বচরিত্র হিসেবে আর অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটে মিস্টার ফ্রাঙ্ক চার্চিলের। দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম দুই অধ্যায়েই গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয় জেন ফেয়ারফক্স এবং এমা ও মিস্টার জর্জ নাইটলির পাশাপাশি আর একজোড়া গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র— ফ্রাঙ্ক ও জেনকে আমরা পেয়ে যাই। দ্বিতীয় খণ্ডের শেষে এসে ফ্রাঙ্কের প্রতি এমার রোমান্টিক আকর্ষণের অল্পবিস্তর মোহমায়া কেটে যায় আর সেটা তৃতীয় তথা শেষ খণ্ডে নায়িকা এমার আত্মজগৎ আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়।
এমা উপন্যাসের সাফল্যের একটি বড় দিক এর নির্মিতি। এই উপন্যাসে যে স্থানগত ও সময়গত ঐক্য দেখা যায়, তা পরিণত ও দক্ষ উপন্যাসকল্পনার ফসল। উপন্যাসের ঘটনাগুলি ঘটেছে লন্ডন থেকে ষোলো মাইল দূরবর্তী সারের হাইবেরি অঞ্চলে। চরিত্ররা মাঝেমধ্যে লন্ডনে বা অন্যত্র নানা প্রয়োজনে গেছেন এবং ফিরে এসেছেন। এমার দিদি লন্ডননিবাসী, তবে উপন্যাসে তার ও তার স্বামী-সন্তানদের উপস্থিতি দেখা যায় তারা খ্রিস্টমাস উৎসবে হাইবেরিতে আসার পর। জেন অস্টেন তার চরিত্রদের মাঝেমধ্যে হাইবেরি থেকে এদিক ওদিক পাঠালেও বা বাইরের মানুষজনকে হাইবেরিতে নিয়ে এলেও উপন্যাসের স্থানিক প্রেক্ষাপটকে ছড়াননি, হাইবেরির চৌহদ্দির মধ্যেই রেখেছেন। উডহাউসদের হার্টফিল্ড, ওয়েস্টনদের রান্ডাল, মিস্টার নাইটলির ডনওয়েল অ্যাবে, মিসেস ও মিস বেটসের বাড়ি, রবার্ট মার্টিনের অ্যাবে মিল ফার্ম— সব এই হাইবেরির মধ্যেই অবস্থিত।
স্থানিক ঐক্যের পাশাপাশি রয়েছে কালগত ঐক্যও। এমা উপন্যাসের ঘটনাবলি সময়কালের দিক থেকে এক বছরের মধ্যেকার ব্যাপার। সেই ঘটনাসমূহকে বছরের নির্দিষ্ট মাস ধরে পরপর সাজিয়ে নেওয়া যায়। জেন অস্টেন গ্রন্থাবলির বিখ্যাত সম্পাদক আরডব্লু চ্যাপমানের মতে কোনও এক বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ থেকে উপন্যাসের ঘটনাবলির শুরু। প্রথম অধ্যায়েই আছে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের কথা। দশম অধ্যায়ের ঘটনাগুলি সবই ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের ব্যাপার। পরের বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই বিবাহ অনুষ্ঠানগুলির মাধ্যমে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে।

পাঁচ.
এমা প্রকাশের আগেই একটি পুরনো পাণ্ডুলিপির রূপান্তরের কাজ শুরু করেন জেন অস্টেন। ১৭৯৮-৯৯ সালে সুসান নামে যে আখ্যানটি তিনি লিখেছিলেন, ১৮১৫-১৬ সালের রূপান্তরে তা বর্তমানে পরিচিত নর্দাঙ্গার অ্যাবে-র চেহারা নেয়। নায়িকা কিশোরী ক্যাথারিন মোরল্যান্ড এই উপন্যাসে তার বয়ঃসন্ধির পর্বই শুধু পেরোচ্ছে না, গ্রামজীবন থেকে বেরিয়ে প্রথমবারের জন্য বৃহৎ জগৎ ও জীবনকে চিনছে, তার দ্বন্দ্ব-সংঘাতে আন্দোলিত হচ্ছে। রোমান্স-কাহিনির নায়িকা ও গথিক উপন্যাসের পাঠিকাদের মতো করেই এই উপন্যাসে তার যাত্রা শুরু, কিন্তু অভিজ্ঞতার প্রখর তাপে এই দুই মায়াবী জগতের ভাববাষ্প ক্রমশ তার মন থেকে উবে গেছে। সে অনেক ভুল করেছে ও ভুল ভেবেছে, কিন্তু তার মন কখনওই পঙ্কিল আবর্তে নেমে যায়নি। হেনরি টিনলের প্রতি তার প্রেমে সে ঐকান্তিক। বন্ধু ইসাবেলার ভাই জনের প্রেমের ছলচাতুরিপূর্ণ নানা প্রলোভনকে সে দৃঢ়তার সঙ্গে এড়িয়ে গেছে। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে স্যামুয়েল রিচার্ডসনের পামেলা-র মতো উপন্যাসে যে নৈতিক নায়িকাকে দেখা যায়, তার ছায়া ক্যাথারিন মোরল্যান্ডের মধ্যে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। অবশ্য জেন অস্টেন রিচার্ডসনের উত্তরাধিকারী নন। তিনি আদর্শ নৈতিক চরিত্রদের সামনে রেখে উপন্যাস নির্মাণ করে পাঠককে বার্তা দিতে চান না। তাই ক্যাথারিন মোরল্যান্ডের পাশেই আমরা পাই তার বন্ধু ইসাবেলাকে। ম্যানসফিল্ড পার্ক-এর মারিয়া চরিত্রের সঙ্গে এই ইসাবেলার অনেক মিল। প্রেমের ক্ষেত্রে তারা অক্লেশে নৈতিকতার সীমাকে ভেঙে ফেলে, শরীরী প্রেমের টানে জড়িয়ে পড়ে গোপন পরকীয়ায়। ইসাবেলা তার বন্ধু ক্যাথারিন মোরল্যান্ডের প্রতিও কতখানি প্রকৃত বন্ধুসুলভ আচরণ করেছে, তা ভেবে দেখার দরকার। ইসাবেলাকে ভালোবাসলেও ভাই জনের দিকে তাকিয়ে সে এই বন্ধুকে প্রায়ই বিপথে চালিত করার চেষ্টা করেছে, নানাভাবে তাকে ভুল বুঝিয়ে সমস্যাতেও ফেলেছে। অবশ্য সে নিজেও শেষপর্যন্ত পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে প্রতারিতই হয়েছে ও চেষ্টা করেছে অতীত সম্পর্কে প্রত্যাবর্তনে। ওঠাপড়া সত্ত্বেও ক্যাথারিনের সঙ্গে তার সম্পর্কসূত্রটি শেষ অবধি ছিন্ন হয়ে যায়নি।

ক্যাপ্টেন ফ্রেডরিক টিনলে একেবারেই নারীলোলুপ এক শিকারি চরিত্র। ভাইবোনেদের কাছেও এটা অস্পষ্ট ছিল না যে তাদের দাদা ইসাবেলাকে কোনও মতেই বিয়ে করবে না। ম্যানসফিল্ড পার্ক-এর হেনরি ক্রফোর্ডের মতো নর্দাঙ্গার অ্যাবে-র ফ্রেডরিক টিনলেও ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়াতে ভালোবাসে। নারীশরীরকে ব্যবহার করে সম্পর্ক থেকে সরে আসায় তারা অভ্যস্ত।
যে মাত্রায় ফ্রেডরিক টিনলে এক নেতিবাচক চরিত্র, সেই মাত্রায় না হলেও জন থর্পকে এক বিরক্তিকর যুবক হিসেবে পাঠক দেখেন। সে ক্যাথারিন মোরল্যান্ডকে ভালোবেসেছে, কিন্তু সম্মান করতে চায়নি। তার ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে বিন্দুমাত্র আমলও দিতে চায়নি। হেনরি টিনলের প্রতি ক্যাথারিন তার ভালোবাসাকে কখনও গোপন রাখেনি। কিন্তু সেই সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় ওয়াকিবহাল থেকেও যেনতেনপ্রকারেণ ক্যাথারিনকে পাওয়ার উদগ্র বাসনাকে সে আটকাতে পারেনি। নানা ছলচাতুরি ও মিথ্যার আশ্রয় অবিরত নিয়ে গেছে। ক্যাথারিন হেনরি টিনলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে সে যেভাবে জেনারেল টিনলেকে ক্যাথারিনের পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে দুবার দুই বিপ্রতীপরকম মিথ্যা বলেছে, তাতে ক্যাথারিনকে সম্পূর্ণ অকারণে জেনারেল টিনলের রোষাগ্নিতে পড়তে হয়েছে।
জেনারেল টিনলেও যেভাবে এক অপরিচিত যুবকের মিথ্যা কথায় বিভ্রান্ত হয় এবং সেই জাতক্রোধে এক কিশোরীর প্রতি নির্মম আচরণ করে, তা তাকে চরিত্র হিসেবেই অনেকটা নিচু করে দেয়। আমরা যখন জানতে পারি ক্যাথারিনের প্রতি তার সমস্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের পেছনে ছিল ক্যাথারিনের সম্পত্তিজনিত ভ্রান্ত তথ্য আর ক্যাথারিন বিত্তশালী নয় জানার পরেই যখন তার মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল— তখনই এই অর্থলোলুপ মানুষটির চরিত্র আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিজের মেয়েকেও একই কারণে সে মেয়ের ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে আটকায়, কারণ সেই ছেলেটি পরিবারের দ্বিতীয় পুরুষ বলে সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাবে না। সামন্ততান্ত্রিক মন-মানসিকতা ও অর্থলোভের জাঁতাকলে বন্দি এক নেতিবাচক চরিত্র হিসেবেই জেনারেল টিনলেকে পাঠক দেখবেন।
দন কিহোতে যেভাবে শিভালরিক রোমান্সের পরম্পরাটিকে ব্যঙ্গ করে ও সেখান থেকে তার নায়ককে বাস্তবতা নামিয়ে আনে, এখানে লেখিকা প্রায় তেমনই কাজ করেন। সেকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় গথিক উপন্যাসের ধারা ও সেন্সিবিলিটিতে ভরা রোমান্সের ধারাকে জেন অস্টেন নর্দাঙ্গার অ্যাবে-তে তীব্র বিদ্রূপ করেছেন। জেন অস্টেনের উপন্যাসে যে সাধারণ হিউমার থাকে এই উপন্যাসের তার স্যাটায়ারধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার থেকে বেশ খানিকটা আলাদা।

ছয়.
১৮১৬ সালে একটি নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিও জেন অস্টেন সম্পূর্ণ করেন, যার নাম পারসুয়েশন।
পারসুয়েশন জেন অস্টেনের পূর্ব-প্রকাশিত উপন্যাসগুলি থেকে আকারে বেশ কিছুটা ছোট। মূল কাহিনির পাশাপাশি শাখা কাহিনির এখানে নামমাত্র উপস্থিতি। সংলাপ বা চরিত্রায়নের বিস্তারও পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাসগুলির চেয়ে কম। অনেকেই মনে করেছেন যে জেন অস্টেন এই উপন্যাস যখন লিখছেন তখন তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই অসুস্থতা নিয়েই তিনি প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দাদা এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। সাধারণভাবে প্রাথমিক খসড়াকে চূড়ান্ত প্রকাশের আগে যেভাবে পরিবর্তন পরিমার্জন করতেন জেন অস্টেন, এই উপন্যাসে সেই সুযোগ তিনি পাননি। ফলে প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস বা এমা-র মতো বিস্তার ও নির্মিতি-কুশলতা এখানে দেখা যবে না। এই উপন্যাসের অনন্যতা তার নির্মিতিতে নয়, জীবনদর্শনে।

অনেকে পারসুয়েশন-কে যে জনপ্রিয়তর প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস বা নির্মাণসৌকর্যে মহত্তর এমা-র চেয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে রাখতে চান, তার কারণ এর নায়িকার গভীরতর জীবনবোধ। পারসুয়েশন-এর নায়িকা অ্যানে জেন অস্টেনের পূর্ববর্তী নায়িকাকুল— ম্যারিয়ানে, এলিজাবেথ বা এমার মতো উচ্ছ্বল বা বর্ণময় নয়— চিন্তাশীল ও গভীর। তার বয়েস জেন অস্টেনের অন্যান্য নায়িকাদের থেকে বেশি বলেই শুধু নয়, মনের গড়নের কারণেই সে অনেক বেশি পরিণত। সে কবিতার দর্শন বিষয়ে যেমন কথা বলতে পারে, তেমনি পারে বড় দুর্ঘটনার পর মাথা ঠান্ডা রেখে পরিচর্যাতে দক্ষতা দেখাতে। পরিবারের চাপে কুঁকড়ে গিয়ে কিশোরীবেলায় প্রেম-সম্পর্ককে ভেঙে দিতে হলেও সে সেই প্রেমকে গভীর বিষাদ নিয়ে মনের মধ্যে রেখে দেওয়ার মতো দৃঢ়। তাদের পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার যার কাছে যাবে, সেই মিস্টার এলিয়টের বিবাহপ্রস্তাবকে হেলায় অবহেলা করে সে বুঝিয়ে দেয় টাকাপয়সা ও জাগতিক সুখের অঙ্কে সে জীবনকে বিচার করে না।
অ্যানে এলিয়টের জীবনবোধ কি ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শনকেই ধারণ করে আছে? অ্যানে চরিত্রের মধ্যে কি আছে জেন অস্টেনের জীবনের উপাদান? এই প্রশ্নের উত্তর অস্টেন-গবেষকরা খুঁজে চলেছেন। জেন অস্টেনের জীবনীলেখকরা আমাদের জানিয়েছেন যে ১৭৯৫ সালে জেন অস্টেনের জীবনে এসেছিল প্রথম এবং সম্ভবত শেষ প্রেম। প্রেমিকের নাম ছিল টম লেফ্রয়। জেনের বয়েস তখন উনিশ, টমও তার সমবয়সি। রেভারেন্ড জর্জ অস্টেনের বন্ধু রেভারেন্ড জর্জ লেফ্রয় থাকতেন অ্যাশে রেভারেন্সিতে, তার ভাইপো ছিলেন টম। স্টিভেনটন থেকে অ্যাশের দূরত্ব ছিল কয়েক মাইল। বয়সের অনেকটা ব্যবধান সত্ত্বেও জর্জ লেফ্রয়ের স্ত্রী অ্যানে লেফ্রয়ের সঙ্গে জেনের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। জেন অনেকবার অ্যাশেতে গেছেন, সেখানে বলনাচের আসরে অংশ নিয়েছেন। এই বলনাচের আসর টম ও জেনের সম্পর্ককে নিবিড় করে। দিদি ক্যাসান্দ্রাকে লেখা একটি চিঠিতে জেন লিখেছিলেন কীভাবে জেন ও টম বলনাচের আসরে অনেকগুলো নাচ একসঙ্গে নাচায় টমের ভাইবোনেরা— সতেরোর লুসি, চোদ্দোর জর্জ, এগারোর এডওয়ার্ড তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল। ১৭৯৬ সালে হ্যাম্পশায়ার ছেড়ে টম লেফ্রয় লন্ডনে আইন পড়তে চলে যান। এরপর কোনও কারণে তাদের সম্পর্ক আর এগোয়নি। এই সময়েই জেন অস্টেন তাঁর জনপ্রিয়তম উপন্যাস প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস-এর প্রথম খসড়া ফার্স্ট ইম্প্রেশন লিখতে শুরু করেন।
স্টিভেনটনের বাড়িটি থেকে দাদা জেমসের এই আবাসটির দূরত্ব ছিল প্রায় দু-কিলোমিটার। এই বাড়িটিতে জেন ও ক্যাসান্দ্রা প্রায়ই চলে আসতেন পায়ে হেঁটে। এখানে বলনাচের আসরে তাঁরা অংশ নিতেন। জেন নাচতে ভালোবাসতেন। তাঁর নানা উপন্যাসেই বলনাচের প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে এসেছে।
১৮০০ সালে জেনের বাবা জর্জ অস্টেন রেক্টরের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্টিভেনটন চার্চের নতুন রেক্টর হন তাঁর বড় ছেলে জেমস অস্টেন। জর্জ অস্টেন ঠিক করেন স্ত্রী ও দুই কন্যা ক্যাসান্দ্রা ও জেন অস্টেনকে নিয়ে বাথ শহরে চলে যাবেন। বাথ শহরটি তখন ইংল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এর জল শরীরের পক্ষে খুব উপযোগী ও জলে নানা উপকারী খনিজদ্রব্য মিশে আছে— এই ধারণা থেকে চিকিৎসার প্রয়োজনে অনেকেই সে সময় বাথ শহরে আসতেন। এছাড়াও শহরটি ছিল হরেক পণ্যের বিকিকিনির জন্য বিখ্যাত। সেকালে পাওয়া যায় এমন সব পণ্যই নাকি বাথের রাস্তাঘাটে দোকানিদের কাছ থেকে পাওয়া যেত। শহরে থিয়েটার, বলনাচ, গানের অনুষ্ঠান, তাসের আড্ডা-সহ নানা ধরনের চিত্তবিনোদনের হরেক বন্দোবস্ত ছিল।
বাথ শহরে বাবা-মাকে রেখে জেন ও তার দিদি ক্যাসান্দ্রা মাঝেমাঝেই চলে আসতেন স্টিভেনটনের বাড়িটিতে। সেখানে তখন তাঁদের দাদা জেমস অস্টেন থাকেন। স্টিভেনটনের পুরনো প্রতিবেশীদের বাড়িতেও তাঁরা যেতেন, গল্পগুজব করে সময় কাটাতেন। এই প্রতিবেশীদের মধ্যেই ছিলেন দুই বোন ক্যাথারিন গিগ ও আলেথিয়া বিগ। একবার জেন আর ক্যাসেন্দ্রা যখন বাথ থেকে স্টিভেনটনে ফিরে বিগদের বাড়িতে গেছেন, ক্যাথারিন ও আলেথিয়ার ভাই হ্যারিস বিগ জেনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখনকার মতো জেন কোনও কারণে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু স্টিভেনটনে নিজেদের বাড়িতে ফিরে এক বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এই বিয়ে অর্থহীন হবে, এর পেছনে কোনও প্রেমের উত্তাপ নেই। জেন কেন হঠাৎ রাজি হয়েছিলেন তা বলা কঠিন, কিন্তু এক রাতের ব্যবধানেই তিনি মত বদলে ফেলেন এবং পরদিন সকালেই দিদি ক্যাসান্দ্রাকে সঙ্গে নিয়ে স্টিভেনটন ছেড়ে বাথে ফিরে যান।
১৮০৩ সালের নভেম্বরে জর্জ ও ক্যাসান্দ্রা অস্টেন তাদের দুই মেয়ে জেন ও ক্যাসান্দ্রাকে নিয়ে লাইম রেজিসে বেড়াতে যান। ডরসেট ও ডেভনের সীমান্তে অবস্থিত এই সৈকতশহরটি ততদিনে বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ছুটি কাটানোর আস্তানা হিসেবে। ব্রিঘটন, সাউথ হ্যাম্পটন বা ওয়েমাউথের মতো সমুদ্রসৈকতের মতো বিখ্যাত না হলেও লাইম রেজিসে এগুলির চেয়ে কম খরচে থাকা সম্ভব ছিল বলেই সম্ভবত অবসরপ্রাপ্ত জর্জ অস্টেন একে বেছে নিয়েছিলেন। এরপরেও একবার জেন বাবা-মায়ের সঙ্গে লাইম রেজিসে যান, তবে দিদি ক্যাসান্দ্রা সেবার যাননি। লাইম রেজিস থেকে দিদিকে জেন অস্টেন যে সব চিঠি লিখেছিলেন সেখানে তিনি লাইম রেজিস ভ্রমণের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। ১৮০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে দিদি ক্যাসান্দ্রাকে লেখা জেনের একটি চিঠিতে বলনাচের অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। আমরা জানি বাথ শহর ছাড়াও লাইম রেজিসকে জেন অস্টেন তাঁর শেষ উপন্যাস পারসুয়েশন-এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পটভূমি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এইসব জীবনতথ্যের সূত্র ধরে পারসুয়েশন-এর নায়িকা অ্যানে ও তার স্রষ্টা জেনের মধ্যে কিছু সমীকরণ তৈরির বিষয়টিকে একেবারে বাতিল করে দেওয়া যায় না। পারসুয়েশন-কে আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলাটা হয়তো অতিকথন হবে, তবে জেন অস্টেনের জীবন-অভিজ্ঞতার নানা উপাদান যে এই উপন্যাসের ঘটনা, প্রেক্ষাপট ও চরিত্রায়নে প্রভাব ফেলেছে, সে-কথা অস্বীকার করা যায় না।
নর্দাঙ্গার অ্যাবে ও পারসুয়েশন-এর প্রকাশ জেন অস্টেন দেখে যেতে পারেননি। ১৮১৭ সালের ১৮ জুলাই জেন অস্টেন মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে ১৮১৭ সালের ডিসেম্বরে জেনের দাদা হেনরি অস্টেনের ভূমিকা-সহ প্রকাশিত হয় এই দুটি উপন্যাস। এই উপন্যাস দুটিতেই লেখক হিসেবে প্রথম নাম ছাপা হল জেন অস্টেনের। সেইসঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হল তিনিই সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি, প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস ইত্যাদি উপন্যাসের লেখিকা। জীবদ্দশায় প্রকাশিত উপন্যাসসমূহের ‘এ লেডি’ নামের আড়াল ভেঙে পাঠক জানতে পারল তাদের লেখকের প্রকৃত নাম।


