ব্রতীন্দ্র ভট্টাচার্য
ভারতে বাধ্যতামূলক পরিযানের এই ভয়াবহ চিত্র কোনও অনিবার্যতা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্তদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বর্জন করার প্রতিফলন। বিরসা মুন্ডা কেবল স্কুল বা মিউজিয়ামের জন্য বিদ্রোহ করেননি। তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন ‘খুঁটকাট্টি’ জমির অধিকার, অরণ্যের সার্বভৌমত্ব এবং স্ব-শাসনের জন্য। সেই দাবি আজও উন্নয়নের নামে চাপা পড়ে আছে। তাই অসমাপ্ত উলগুলান আজও বেঁচে আছে হাসদেও আরান্দে, নাগরহোলে, সিমিলিপালে। এই চলমান লড়াইগুলো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়; এগুলো হল এক শতাব্দী আগে তোলা সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সমকালীন উচ্চারণ
বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বিরসা মুন্ডার ‘উলগুলান’-এর ডাক ছিল রূঢ় এক ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। ১৮৯৯-১৯০০ সালের সেই বিদ্রোহ কেবল স্বতঃস্ফূর্ত যে-কোনও প্রতিবাদ ছিল না; এর মূলে ছিল এক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন— ‘আবুয়া রাজ’: অর্থাৎ নিজের জমি, বন এবং সামাজিক জীবনের ওপর আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিরঙ্কুশ শাসনের অধিকার। বিরসা ও তাঁর অনুগামীদের এই লড়াই কেবল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল বহিরাগত (দিকু) শোষক এবং ঔপনিবেশিক ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া এক আমূল পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
সোয়াশো বছর পরে, ভারত যখন বিরসা মুন্ডার ১৫০তম জন্মবার্ষিকী পালন করছে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক— সেই ‘আবুয়া রাজ’-এর স্বপ্ন কতটা পূর্ণ হল? হে পাঁচ-ট্রিলিয়ন জিডিপি-স্পর্ধী আমার দেশ ও তার নায়কেরা, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও আদিবাসীদের ভূমিচ্যুতি বা উচ্ছেদ থেমেছে কি? হ্যান্ডবুক অফ ট্রাইবাল পলিটিক্স ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থে অধ্যাপক ভার্জিনিয়াস খাখা ও অন্যান্য তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে উন্নয়নের যে মডেল চালু আছে, তা আদিবাসীদের জন্য নতুন এক ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ (Internal Colonialism)-এর জন্ম দিয়েছে। একদিকে সংবিধানে আদিবাসীদের সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে বটে, তবে তলে তলে অন্যদিকে উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্পের আড়ালে তাদের ভিটেমাটি থেকে সুকৌশলে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নকরণের সবচেয়ে নির্মম ও দৃশ্যমান ফলাফল হল ‘বাধ্যতামূলক পরিযান’ (Forced Migration)— যাকে রাষ্ট্রব্যবস্থা পারিপার্শ্বিক ক্ষতি (কোল্যাটেরাল ড্যামেজ) বলে গুরুত্বহীন করে পাশে সরিয়ে রাখে।
যে অধ্যাপক খাখার কথা বললাম, তাঁরই নেতৃত্বে ২০১৩ সালে ভারত সরকার একটি আদিবাসী-বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত সেই কমিটির রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, উচ্ছেদ এবং পরিযানই আদিবাসীদের দারিদ্র্যের প্রধানতম কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮.৬ থেকে ৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, স্বাধীনতার পর থেকে উন্নয়নের কারণে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৫ কোটি মানুষের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও বেশি হলেন আদিবাসী। অর্থাৎ, উন্নয়নের চাকা ঘোরানোর জন্য সবচেয়ে বেশি বলি দেওয়া হয়েছে অরণ্যচারী ও অন্যান্য আদিবাসী মানুষদের।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভারতে মোট অভিবাসী আদিবাসীর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন, কারণ অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই বিপুল জনস্রোতের কোনও রিয়েল-টাইম কেন্দ্রীয় ডেটাবেস নেই। তবুও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা এবং সরকারি কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ আদিবাসী মানুষ ‘বৃত্তীয় অভিবাসী’ (Circular Migrants) হিসেবে শ্রমবাজারে যুক্ত। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, গত এক দশকে এই সংখ্যাটি বহুগুণ বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হল, এই পরিযানের হার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালের জনশুমারির পর থেকে আদিবাসী এলাকায় ‘ভূমিহীনতা’ পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্য ইনডিজেনাস ওয়ার্ল্ড ২০২৫-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খনি এবং পরিকাঠামো প্রকল্পের কারণে আদিবাসী এলাকাগুলোতে জীবনধারণের স্বাভাবিক পথগুলো রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় যুবক ও মহিলারা দলে দলে কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। বিশেষ করে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং ছত্তিশগড় থেকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে যাওয়ার প্রবণতা এখন বার্ষিক ১০-১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান ভারতে ‘টোকেনিজম’ বা প্রতীকী প্রদর্শনীর চেহারাটা আমাদের কিছু অচেনা নয়। বিরসা মুন্ডার সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে আদরণীয় প্রধানমন্ত্রী যখন ৯,৭০০ কোটি টাকার প্রকল্পের ঘোষণা করেন এবং বিরসাকে “প্রতিরোধের প্রতীক” হিসেবে চিহ্নিত করেন, তখন বোধ করি ঝাড়খণ্ড গোন্ডুলপাড়ার সম্বর ও চিতলেরা অট্টহাস্য করে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রকল্পে একলব্য মডেল আবাসিক স্কুল বা মিউজিয়াম তৈরির কথা থাকলেও, সেখানে উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসীদের প্রকৃত পুনর্বাসনের কোনও দিকনির্দেশ থাকে না। পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৯ লক্ষ উচ্ছেদ হওয়া মানুষ আজও কোনও পুনর্বাসন ছাড়াই যাযাবর জীবন যাপন করছেন। ইতিহাসের অন্যায় সংশোধনের জন্য যে ‘বন অধিকার আইন’ (FRA) প্রণয়ন করা হয়েছিল, খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলেই সেই আইনকে সবচেয়ে বেশি পাশ কাটানো হচ্ছে। নটভাস্কর উৎপল দত্তের সূর্যশিকার’ নাটকে সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের একটি মোক্ষম উক্তি ছিল— “বিষ্ণুবিরোধী বুদ্ধকে বানিয়েছি বিষ্ণুর নবম অবতার!” বর্তমান রাজনীতিতেও আদিবাসী নায়কদের ‘অবতার’ হিসেবে পুজো করে প্রকারান্তরে তাঁদের স্বশাসনের দাবিগুলোকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নামে আদিবাসী উচ্ছেদ আজ আরও একটি বড় সংকট। ২০১৯ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কেবল ব্যাঘ্রপ্রকল্প এলাকা থেকেই ৫৬,০০০-এরও বেশি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির সাম্প্রতিক নির্দেশিকা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত ৮০০টিরও বেশি গ্রাম থেকে আরও হাজার হাজার মানুষ উচ্ছেদের মুখে। এখানে ‘সংরক্ষণ’-এর যে সংজ্ঞা রাষ্ট্র ব্যবহার করছে, তাতে বনের আদি বাসিন্দাদের জন্য কোনও জায়গা নেই। গ্রামসভার সম্মতি আইনত বাধ্যতামূলক হলেও তা নেওয়া হচ্ছে আংশিকভাবে বা ভয় দেখিয়ে। গবাদি পশু চরানো বা বনজ সম্পদ সংগ্রহের মতন মৌলিক জীবনজীবিকার কাজের ওপর ফৌজদারি মামলা দেওয়া হচ্ছে, যা আদিবাসীদের নিজভূমিতেই অপরাধী করে তুলছে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে পরিকাঠামো বা বাণিজ্যিক প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদের ধরনও প্রায় একই রকম। জমি অধিগ্রহণ বা পরিবেশগত ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামতের গুরুত্ব প্রায় শূন্য। যখনই এর প্রতিবাদ ওঠে, রাষ্ট্র তাকে ‘আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা’ হিসেবে দেগে দিয়ে পুলিশি ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়। দ্য ইনডিজেনাস ওয়ার্ল্ড ২০২৫ এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ করেছে যেখানে আদিবাসী যুবকদের প্রতিবাদের কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ বা ফৌজদারি মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এটি একটি বৃহত্তর প্যাটার্ন, যার ফলে উচ্ছেদের রাজনৈতিক দায়ভার এড়ানো সহজ হয় এবং বাধ্যতামূলক পরিযান চলতে থাকে।

স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভিটেমাটি হারানো ও জীবিকার নিরাপত্তাহীনতার এক বাধ্যতামূলক ফল হল পরিযান। শহরগুলো আদিবাসীদের স্থিতি দেয় না। ছেড়ে আসা ঘর শহরের চোরাবালিতে বাঁধা অসম্ভব হয়ে পড়ে বিরসার উত্তরপুরুষদের। অসংগঠিত ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পরিবেশে তারা কাজ করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও সামাজিক সুরক্ষা পান না। অন্যদিকে গ্রামগুলো হয়ে পড়ে যুবকশূন্য। হারিয়ে যায় ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান এবং যৌথতার স্মৃতির সঙ্গে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। আদিবাসী মিউজিয়ামে বিরসা মুন্ডার স্মৃতিকে কাঁচের ঘরে বন্দি করে রাখা হয়, আর কার্যক্ষেত্রে আদিবাসীদের পবিত্র ‘সারনা’-স্থলের শালগাছগুলিকে নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয় খনি বা রাস্তা তৈরির জন্য। আদিবাসীর মতো বাস্তুচ্যুত হন তাঁর আরাধ্য দেবতাও।
জমি, জঙ্গল এবং উন্নয়ন পরিচালনার প্রতিষ্ঠানগুলোতে আদিবাসীদের অনুপস্থিতি এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের উচ্চপদে আদিবাসীদের সংখ্যা আজও অত্যন্ত নগণ্য। এই প্রসঙ্গে বলিভিয়ার উদাহরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেখানে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস— যিনি নিজে জন্মেছিলেন আদিবাসী পরিবারে— তাঁর আমলে সংবিধানে আদিবাসীদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং প্রশাসনকে একটি ‘বহুজাতিক রাষ্ট্রে’ (Plurinational State) রূপান্তরিত করা হয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি স্তরে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভেটো বা অসম্মতি জানানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বলিভিয়া মডেলে উন্নয়ন কেবল রাষ্ট্রের একতরফা সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তা ছিল আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করে একটি যৌথ জাতীয় দরকষাকষি।

ভারতে বাধ্যতামূলক পরিযানের এই ভয়াবহ চিত্র কোনও অনিবার্যতা নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্তদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বর্জন করার প্রতিফলন। বিরসা মুন্ডা কেবল স্কুল বা মিউজিয়ামের জন্য বিদ্রোহ করেননি। তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন ‘খুঁটকাট্টি’ জমির অধিকার, অরণ্যের সার্বভৌমত্ব এবং স্ব-শাসনের জন্য। সেই দাবি আজও উন্নয়নের নামে চাপা পড়ে আছে। তাই অসমাপ্ত উলগুলান আজও বেঁচে আছে হাসদেও আরান্দে— যেখানে অধিবাসীদের প্রতিরোধের মুখেও কর্পোরেটের খনি খনন চলছে; নাগরহোলে— যেখানে আদিবাসীরা তাদের পূর্বপুরুষের জমি পুনর্দখল করেছেন; আর সিমিলিপালে— যেখানে অধিকার রক্ষা না করেই উচ্ছেদ চলছে আদিবাসীদের। এই চলমান লড়াইগুলো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়; এগুলো হল এক শতাব্দী আগে তোলা সেই অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সমকালীন উচ্চারণ।

তথ্যসূত্র:
- Report of the High Level Committee on Socio-Economic, Health and Educational Status of Tribal Communities of India. Ministry of Tribal Affairs (Xaxa Committee Report). Government of India. 2014.
- The Indigenous World 2025: India Chapter. Copenhagen. International Work Group for Indigenous Affairs (IWGIA). 2025.
- Tribal Livelihood Migration in India: Situational Analysis, Gap Identification and Recommendations for Future Policy. Ministry of Tribal Affairs, Government of India. 2020.
- Fernandes, W. “Development-Induced Displacement in India.” Social Change, 38(4), 551-576. 2008.
- Status of Village Relocation from Tiger Reserves. Government of India. National Tiger Conservation Authority (NTCA). 2019.
- Circulars and directives on relocation from critical tiger habitats (as cited in IWGIA 2025). National Tiger Conservation Authority (NTCA). 2024.
- Order on withdrawal of petty forest offence cases. Government of Odisha. 2024.
- Chauhan, Shimali. Forced evictions in India’s tiger reserves spark outcry among Adivasi communities. Down to Earth. Sep 22, 2024.
- 2025: Dam Safety Issues in India. SANDRP. Dec 12, 2025.
- Singh, K. S. Birsa Munda and His Movement, 1874-1901: A Study of a Millenarian Movement in Chhotanagpur. Oxford University Press. 1983.
- Xaxa, V., Rodrigues, V., & Mullick, S. B. (eds.). Handbook of Tribal Politics in India. Oxford University Press. 2019.

