পূজারিণী প্রধান এবং আমাদের সামাজিক অস্বস্তি

অনুক্তা মজুমদার

 


আমরা এখনও জ্ঞানচর্চাকে পোশাক, উচ্চারণ, ঠিকানা এবং সামাজিক পরিচয়ের ছকে ফেলে দেখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আমরা বিশ্বাস করি, বই পড়ার আলাদা শ্রেণিচরিত্র আছে, সিনেমা বোঝার নির্দিষ্ট পিনকোড আছে, নারীবাদ নিয়ে বলার আলাদা উচ্চারণরীতি আছে, রাজনীতি নিয়ে ভাবারও বিশেষ ড্রেসকোড আছে। আর এই বিশ্বাসে আঁচড় লাগলেই তৈরি হয় অস্বস্তি, যা গড়ে তোলে অবিশ্বাস

 

বেশ কিছু মাস ধরে সমাজমাধ্যম পূজারিণী প্রধানকে নিয়ে সরগরম। কেউ তাঁর প্রশংসা করছেন, কেউ সমালোচনা করছেন, কেউবা সরাসরি সন্দেহ প্রকাশ করছেন। প্রগতিশীলতার ঘোমটার আড়ালে থাকা গোঁড়ামির মুখগুলো এখানে নানাভাবে বেরিয়ে পড়েছে। নানান কিসিমের শ্রেণিবিভাজনের কারুকাজ পূজারিণীর সোশাল মিডিয়ার সাফল্যকে ঘিরে জমে উঠেছে। শ্রেণি, বর্ণ, ভাষা, উচ্চারণ, পোশাকবিধি ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে বাঙালির যাবতীয় গোপন সীমারেখা সবটুকু আড়াল ঘুঁচিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নারীর, বলা ভালো প্রান্তবাসী নারীর, লক্ষণরেখা, যা হয়তো সে অত ভেবেচিন্তে পার করেনি। যা হয়তো নেহাতই এক কাকতাল।

পূজারিণীর সমর্থকরা তাঁর কঠিন বিষয় সহজ করে বলার ক্ষমতা, বই-সিনেমা-সমাজ-রাজনীতি-নারীবাদ নিয়ে নিজস্ব মতামত, নিজের গ্রামীণ জীবনকে সাবলীলভাবে তুলে ধরা এবং নিজস্ব উচ্চারণে অনায়াস ইংরেজিতে ভিডিও করা— এইগুলিকে পছন্দ করেছেন, গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র এইটুকুই হয়তো নয়। সম্ভবত তারা এক বৃহত্তর সামাজিক অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চা যে কোনও বিশেষ প্রতিষ্ঠান, শ্রেণি বা শহরের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, এই বোধ আজ সমাজমাধ্যমের মধ্যে দিয়ে নতুন করে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। আর এই ঘটনাকে অস্বীকার করা আসলে এক ধরনের অভিজাততান্ত্রিকতা— যাকে ‘নিপাত যাক’ বলাটা জরুরি।

তাঁর সমালোচকেরা মূলত তাঁর ভিডিওর নান্দনিকতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর পোশাক, সাজসজ্জা, বাড়িঘর, উচ্চারণ, ফোনের ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল— সবকিছুই তাঁদের বিচারের বিষয় হয়েছে। তাঁদের আপত্তির মধ্যে অবশ্যই একধরনের রুচিগত অবস্থান আছে, যা নিতান্তই তাঁদের ব্যক্তিগত।

কিন্তু তৃতীয় যে দলটি তাঁকে ‘নকল’ বলে বাতিল করতে চাইছে, তাঁদের নিয়েই একটু ‘ভাবা প্র্যাকটিস’ করতে হচ্ছে। কারণ, তাঁদের প্রতিক্রিয়াই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে একজন গ্রামবাসী নারী ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন, এত বই পড়তে পারেন, বিশ্বসিনেমা দেখতে পারেন, সেইসব নিয়ে ভাবতে পারেন, এবং ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের মতামত জানাতে পারেন। যেন অপ্রচলিত বই, বিশ্বসিনেমা, ইংরেজি ভাষা, নারীবাদ, রাজনৈতিক সচেতনতা— এসব কেবল সমাজের এক নির্দিষ্ট শ্রেণির উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। এই প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই মোক্ষম সামাজিক ব্যাধি, যার উপাচার আজও অধরা রয়ে গেছে।

এই অবিশ্বাস আদতে এক দীর্ঘ সামাজিক অভ্যাসের ফসল। আমরা এতদিন জ্ঞানকে নানাবিধ ‘চিহ্ন’ দিয়ে মাপতে শিখেছি। কোন ভাষা, কেমন উচ্চারণ, কীরকম পোশাক, কোথাকার বাসিন্দা, কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, ইত্যাদি ছিল আমাদের কাছে জ্ঞান আর সংস্কৃতির অভিজ্ঞান।

পূজারিণী তাঁর অবস্থান, পোশাক, উচ্চারণ ইত্যাদি সবকিছু দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তিনি ওই নির্ধারিত চিহ্নব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করেন। ফলে, শ্রেণিভাগের এই অঙ্কে শূন্য পেয়ে তিনি একদলের কাছে “অবাস্তব চরিত্র” হয়ে গেছেন। আর তাতেই আমাদের সামাজিক মানসিকতা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আমরা এখনও জ্ঞানচর্চাকে পোশাক, উচ্চারণ, ঠিকানা এবং সামাজিক পরিচয়ের ছকে ফেলে দেখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আমরা বিশ্বাস করি, বই পড়ার আলাদা শ্রেণিচরিত্র আছে, সিনেমা বোঝার নির্দিষ্ট পিনকোড আছে, নারীবাদ নিয়ে বলার আলাদা উচ্চারণরীতি আছে, রাজনীতি নিয়ে ভাবারও বিশেষ ড্রেসকোড আছে। আর এই বিশ্বাসে আঁচড় লাগলেই তৈরি হয় অস্বস্তি, যা গড়ে তোলে অবিশ্বাস।

‘পূজারিণী’কে বাদ দিলে, ‘ইংরেজি ভাষা’ও এই পুরো বিতর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। স্বাধীনতার প্রায় ঊনআশি বছর পরেও, ইংরেজি আজও আমাদের কাছে শুধুমাত্র একটা ভাষা নয়, এটা আজও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে। তাই আটপৌরে শাড়ি পরে, উঠোন বা রান্নাঘরের পটভূমিতে, গ্রামীণ টানে কেউ ইংরেজি বললে আমরা অস্বস্তিতে পড়ি। কারণ, ভাষার সঙ্গে জুড়ে থাকা ক্ষমতার মানচিত্রে তখন ফাটল ধরে। সেটা তখন আর শ্রেণি চিহ্নিত করার নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার থাকে না।

এই বিতর্ককে লিঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা জরুরি। আসুন, আমরা কল্পনা করি, পূজারিণী নয়, একজন গ্রামীণ শ্রমজীবী পুরুষ এই ভিডিওগুলো করছেন। সেক্ষেত্রে তাকেও অভিজাততন্ত্রের সমালোচনা রেহাই দিত না, আমরা জানি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে কি এই প্রশ্নগুলো উঠত— “সময় পায় কী করে?”, “এত জানল কোথা থেকে?” সম্ভবত না। কারণ, আরও অনেক কিছুর মতো, নারীর শ্রম এবং নারীর জ্ঞান— এই দুটোকেই সমাজ আজও সন্দেহের চোখে দেখে।

ঘরের কাজকে আমরা ‘কাজ’-এর মর্যাদা দিই না, আবার সেই কাজের ফাঁকে পড়াশোনার সময় পাওয়াকে প্রশ্ন করতেও ছাড়ি না। নারীর সময় আর শ্রম দুটোই আজও সমাজের কাছে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ হয়েই রয়ে গেছে। তাই সেই সময়ের মধ্যে, বৌদ্ধিক চর্চা দেখলে, আমাদের চোখ অজান্তেই কুঁচকে যায়, বেরিয়ে আসে অবিশ্বাসের রক্তচোখ। সোচ্চারে, নির্দ্বিধায় ঘোষণা করে দেই অনাস্থা। ‘সুবর্ণলতা’ কবে যে অপ্রাসঙ্গিক হবেন!

পূজারিণীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বিতর্ক ডিজিটাল মাধ্যমের এক নতুন গণতন্ত্রের ছবিও দেখায়, যা এই পুরো পর্বটার সম্ভবত একমাত্র ইতিবাচক দিক। সংবাদপত্র, টিভি, বিশ্ববিদ্যালয়, সেমিনার ইত্যাদি প্রথাগত মতপ্রকাশের মঞ্চে সবার প্রবেশাধিকার থাকে না। কিন্তু একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েই মানুষ এখন নিজস্ব পরিসর তৈরি করতে পারছেন। এই ডিজিটাল পরিসর অবশ্যই নিখুঁত নয়। এখানে ট্রোলিং আছে, অবিশ্বাস আছে। তবুও এটা এমন এক ক্ষেত্র তৈরি করেছে যেখানে প্রান্তের কন্ঠস্বরও শোনা সম্ভব।

মোটকথা পূজারিণী তথাকথিত সমাজপ্রহরীদের ক্ষমতার দেওয়ালে ফাটল ধরিয়েছেন।

এখন ধরা যাক, সন্দেহবাদীরাই ঠিক। পূজারিণীর সবটুকুই পরিকল্পিত নির্মাণ। কিন্তু তাতেই বা সমস্যা কোথায়? শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, নাটক— সবই তো নির্মাণ। সমাজমাধ্যমের কনটেন্টও তাই।

সত্যি বলতে ‘অথেন্টিসিটি’র ধারণাটা নিজেও এক সামাজিক নির্মাণই তো বটে। যদি কোনও নির্মাণ মানুষকে বই পড়তে উৎসাহ দেয়, ভালো সিনেমার সঙ্গে পরিচয় করায়, প্রগতিশীল ভাবনার দিকে ঠেলে দেয়, তবে তাকে ‘প্রতারণা’ বলে বাতিল করার তাড়না কেন? ‘কবির সিং’ বা ‘অ্যানিম্যাল’-এর মতো কনটেন্ট দেখে রিগ্রেসিভ ধারণার খপ্পরে পড়ার থেকে পূজারিণীর কনটেন্ট দেখে প্রগ্রেসিভ ভাবনায় জড়িত হওয়া কি বেশি কাঙ্ক্ষিত নয় কি? এই প্রশ্নটা আমাদের প্রত্যেকের ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

আসলে পূজারিণী প্রধান এমন এক উপস্থিতি— আসল হোক বা নির্মিত— যিনি আমাদের চেনা স্টিরিওটাইপ ভেঙে দিচ্ছেন। সংস্কৃতি বা জ্ঞানের চর্চা যে কোনও একটা শ্রেণির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, এ-কথা সুস্পষ্ট করে দিচ্ছেন। সম্ভবত এই কারণেই তাঁকে ঘিরে এত অস্বস্তি। আর এই অস্বস্তির কারণেই পূজারিণী একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর থেকে উত্তীর্ণ হচ্ছেন বাঙালির সামাজিক সীমাবদ্ধতার দৃষ্টান্তে।

আর সেই কারণেই তাঁর উপস্থিতি আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কে জানে, এটাই হয়তো নতুন রকম ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার’ শুরু। যেখানে কেন্দ্র আর প্রান্তের বিভাজন ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাবে। আর জ্ঞান, নান্দনিকতা প্রভৃতি তাদের প্রাচীন প্রহরীদের হাত ছেড়ে ছড়িয়ে পড়বে আমজনতার মধ্যে, গড়ে তুলবে নতুন ‘মুক্তাঞ্চল’।

 


*মতামত ব্যক্তিগত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5364 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...