কৃষকের আয়ের নতুন ঠিকানা কৃষি-পর্যটন: ভারতে কি সম্ভব?

দেবাশিস মিথিয়া

 


ভারতে কৃষি-পর্যটন বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হলেও, এর উদ্যোগগুলি প্রধানত অসংগঠিত এবং বিচ্ছিন্ন। বেশিরভাগ উদ্যোগই হয় কেবল শহরের কাছে একদিনের পিকনিক স্পট হিসেবে সীমাবদ্ধ, না হয় স্থানীয় কৃষকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। এর ফলে পর্যটকদের জন্য সঠিক মানের পরিষেবার অভাব এবং উদ্যোগের স্থায়িত্বের অভাব দেখা যায়

 

ঘটনা ১

সুদূর প্যারিস থেকে আনা (Anna) এসেছেন ইতালির টাস্কানিতে— এগ্রিট্যুরিজম বা কৃষিপর্যটনে। তাঁর উদ্দেশ্য— খুব কাছ থেকে গ্রামের জীবনকে অনুভব করা।

​এই টাস্কানিতেই গিউসেপ্পেদের পারিবারিক আঙুরের চাষ। কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁরা আঙুরের চাষ করছেন। ভোর হলেই সূর্যের সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ে গিউসেপ্পের শতবর্ষী আঙুরক্ষেতে। আনা বিস্মিত হয়ে দেখছিলেন সেই দৃশ্য।

​গিউসেপ্পে, আনাকে নিয়ে আঙুরক্ষেতের ভেতরে ঢুকলেন। হাঁটতে হাঁটতে আনা গিউসেপ্পের কাছে জানতে চাইলেন, “আপনাদের ওয়াইন কেন অন্যদের চেয়ে আলাদা?”

​গিউসেপ্পে হাসলেন। তিনি জানালেন, “আমরা জমিতে কোনওদিন রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করিনি। আমাদের কাছে বেশি উৎপাদনের চেয়েও মাটির স্বাস্থ্য আর পরিবেশ রক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াইনের স্বাদ আলাদা হওয়ার এটাই কারণ।”

​পরের দিন বিকেলে, গিউসেপ্পে আনাকে নিজের হাতে তৈরি ওয়াইন উপহার দিলেন। সেই ওয়াইন পান করে আনা অনুভব করলেন যেন এই পানীয়ের মধ্যে রয়েছে গিউসেপ্পের কয়েক প্রজন্মের ইতিহ্য এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এই খাঁটি পণ্যের প্রকৃত মূল্য কত হওয়া উচিত সেটাও আনা উপলব্ধি করলেন।

​গ্রামীণ জীবনের এই অভিজ্ঞতায় আনা অনেক কিছু শিখলেন। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি কিছুটা ওয়াইন কিনলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন কাজের প্রতি গিউসেপ্পের এক গভীর শ্রদ্ধা, যা গিউসেপ্পের কাছে অতিরিক্ত আয়ের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।

ইতালির টাস্কানি আঙুরক্ষেতে আনা এবং গিউসেপ্পে

 

ঘটনা ২

বার্লিনের এক ডেটা অ্যানালিস্ট, ড্যানিয়েল, পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার উপরে মারিয়াদের ছোট গ্রামে এসেছেন। তিনি শহরের প্রমিত খাদ্য— যা কারখানায় তৈরি হয় এবং সব জায়গায় একইরকম দেখতে, একইরকম স্বাদের ও একই মানের— এবং জীবনধারার বাইরে ভিন্ন কিছু অনুসন্ধান করতে চেয়েছিলেন। এই কঠিন পার্বত্যভূমিতে, মারিয়ার পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে আন্দিজ আলুর ঐতিহ্যবাহী জাত (Heirloom Potato Varieties) চাষ করে আসছে। এই আলুগুলি ভিন্ন ভিন্ন আকার, রং এবং স্বাদের হয়, যা সাধারণত বাজারে পাওয়া যায় না।

পেরুর আন্দিজ পর্বতে টেরেস ফার্মিং

 

ড্যানিয়েল যখন মারিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, “অন্যান্য আলুর চেয়ে আপনাদের এই আলুর বিশেষত্ব কোথায়?” তখন মারিয়া তাঁকে দেখালেন, তাঁরা আলুর জন্য জমি তৈরি করার সময় কীভাবে প্রাচীন ইনকাদের কৃষিপদ্ধতি (Ancient Inca farming techniques) অনুসরণ করেন। বৃষ্টির জলকে ধরে রাখার জন্য তাঁরা ঢালের ওপর তৈরি ঐতিহ্যবাহী সোপান ক্ষেত (Terraces) ব্যবহার করেন। মারিয়া বোঝালেন, এই পদ্ধতি কেবল আলুর স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি নিশ্চিত করে না, বরং এই অঞ্চলের মাটির জীববৈচিত্র্যকেও রক্ষা করে। তিনি ড্যানিয়েলকে এমন একটি আলুর জাত দেখালেন যা কেবল এই নির্দিষ্ট উচ্চতার মাটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। পাশাপাশি দেখালেন প্রতিটি আলুর রং ও নকশা ভিন্ন ভিন্ন।

এই বৈচিত্র্য দেখে ড্যানিয়েল মুগ্ধ হলেন। তিনি বুঝলেন, এই আলুগুলি শুধু খাদ্য নয়— এগুলি এক-একটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাস্তুতন্ত্রের প্রতীক। মারিয়া যখন সেই আলু দিয়ে ট্রাডিশনাল একটি পদ রান্না করে ড্যানিয়েলকে খাওয়ালেন, তখন তার স্বাদ তাঁকে খুব আনন্দ দিল; তিনি বুঝলেন খাদ্য উৎপাদনে প্রকৃতির সঙ্গে মানবিক জ্ঞানের সংযোগ কতটা মূল্যবান। বিদায় নেওয়ার সময় ড্যানিয়েল স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে এই আলু ও অন্যান্য কিছু পণ্য কিনে সঙ্গে নিলেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাচীন আলুর জাতগুলিকে তুলে ধরার জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে মারিয়াকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। এই অভিজ্ঞতা ড্যানিয়েলকে শিখিয়েছিল, খাদ্যের অভিজাত্য কেবল তার ক্যালরি বা দামের ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে তার উৎসের গল্প এবং টেকসই পদ্ধতির ওপর। এই ঘটনাটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জ্ঞানের মূল্যকে তুলে ধরে।

ড্যানিয়েল, মারিয়াকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সারা পৃথিবীতে এই আলু যাতে বিক্রি করা যায়

 

​এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কৃষি-পর্যটন কেবল ভ্রমণ নয়; এটি শহর এবং গ্রামের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করে। পর্যটকরা যেমন কৃষিজীবনের বাস্তব জ্ঞান লাভ করেন এবং খাদ্যের আসল গুণাগুণ বুঝতে শেখেন, কৃষকরাও তাঁদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য, বিশ্বস্ত গ্রাহক এবং সর্বোপরি, তাঁদের কাজ ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রাপ্য সম্মান অর্জন করেন।

এখানে, প্রতিটি আলুর রং ও নকশা ভিন্ন ভিন্ন

 

কৃষি-পর্যটন আসলে কী?

​কৃষি-পর্যটন (Agritourism) হল অবকাশযাপনের এক বিশেষ ধারা, যেখানে কৃষিকাজ এবং পর্যটনের একটি চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে। এটি মূলত কোনও কৃষিখামারে পর্যটকদের জন্য বিনোদন, শিক্ষা এবং আতিথেয়তার আয়োজন করার প্রক্রিয়া। এই পর্যটনের মূল কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান আহরণ করা, নিজ হাতে ফসল তোলা (U-pick), ফলন ও প্রাণী পর্যবেক্ষণ করা, এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে উপলব্ধি করা। এছাড়াও পর্যটকরা স্থানীয় কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্পসামগ্রী কিনতে পারে। সামগ্রিকভাবে, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হল কৃষকদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস তৈরি করা, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ ঘটানো, এবং শহুরে মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি আসার ও কৃষিকাজ সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া।

 

উদ্ভব ও জনপ্রিয়তা

​কৃষি-পর্যটনের ধারণাটি এখন আধুনিক মনে হলেও, এর শেকড় আসলে প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো। তবে বিশ্বজুড়ে নগরায়ন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, শহুরে জীবনযাত্রা থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার প্রবণতা বেড়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ এখন শুধু পাহাড় বা সমুদ্র নয়, গ্রামীণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা পেতে চাইছে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্যই কৃষকরা তাদের খামারগুলিকে পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করে কৃষি-পর্যটনের আধুনিক উদ্যোগ শুরু করেছেন। এর ফলে, আমেরিকা, ফ্রান্স, ইতালি, নিউজিল্যান্ড এবং ভারত-সহ বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এই কৃষি-পর্যটন বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং একটি উন্নত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক কৃষি-পর্যটন মডেল

​বিশ্বজুড়ে কৃষি-পর্যটন প্রধানত চারটি ভিন্ন মডেলে পরিচালিত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সম্পদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

​ফ্রান্সের বোর্দো এবং ইতালির টাস্কানির মতো অঞ্চলে কৃষি-পর্যটন শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই মডেলের ইউরোপীয় মডেলটির প্রধান আকর্ষণ হল ওয়াইন ট্যুরিজম; এখানে পর্যটকরা কেবল ওয়াইন টেস্টিং-এ সীমাবদ্ধ না থেকে, আঙুর তোলার মরসুমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং ওয়াইন তৈরির প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ পান। অন্যদিকে, টাস্কানির ঐতিহাসিক ফার্ম স্টে-গুলিতে শত শত বছরের পুরনো ফার্মহাউস ও প্রাসাদগুলিতে আধুনিক সুবিধা সহকারে থাকার ব্যবস্থা করা হয় এবং খামারের নিজস্ব তাজা খাবার (যেমন পনির, অলিভ অয়েল) পরিবেশন করা হয়। এই মডেলে কৃষকরা ফসল বিক্রির ওপর যতটা না নির্ভর করেন, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করেন আতিথেয়তা (Hospitality) এবং পরিষেবার উপর, যা নিশ্চিত আয় উপার্জনের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করার এক সফল উপায়।

কৃষি-পর্যটন, ফ্রান্স

 

​​মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কৃষি-পর্যটন সফল। এটি একটি সফল কৃষি-বিনোদন মডেল, যার মূল উদ্দেশ্য হল কৃষিকাজকে একটি শিক্ষামূলক, আনন্দদায়ক এবং পারিবারিক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা। এই মডেলের ভিত্তি হল “ইউ-পিক” (নিজে তুলে নাও) নীতি; পর্যটকরা একটি নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য দিয়ে সরাসরি ক্ষেত থেকে স্ট্রবেরি বা আপেলের মতো তাজা ফল ও সবজি তোলার সুযোগ পান। এটি কৃষকদের জন্য একটি বড় সুবিধা, কারণ এতে তাদের শ্রমখরচ (Labor Cost) উল্লেখযোগ্যভাবে সাশ্রয় হয় এবং সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে পণ্যের উচ্চ মুনাফা (Higher Margin) নিশ্চিত হয়। ইউ-পিক কার্যক্রমের বাইরেও, হেমন্তকালে বিশাল ভুট্টাক্ষেতের গোলকধাঁধা তৈরি করা এবং হ্যালোইন উৎসবকে কেন্দ্র করে কুমড়ো-প্যাচ সাজানোর মতো বিনোদনমূলক কার্যক্রমগুলিও এই মডেলের আয়ের ধারা অব্যাহত রাখে।

কৃষি-পর্যটন, আমেরিকা

 

​​দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষি-পর্যটন মডেলে কৃষিকাজ, বৃহৎ গবাদি পশুর খামার (Ranching) এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে (Wildlife Conservation) একীভূত করা হয়েছে। এই মডেলে পর্যটকরা কেবল বিশাল আকারের র‍্যাঞ্চগুলির দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন না, বরং সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী অঞ্চলে প্রকৃতিভ্রমণে যেতে পারেন। এই ওয়াইল্ডলাইফ ইন্টিগ্রেশন পর্যটকদের কাছে অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ যে একসঙ্গে সম্ভব, সেই শিক্ষামূলক বার্তা পৌঁছে দেয়। এই মডেলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর সামাজিক প্রভাব: খামারশ্রমিক এবং স্থানীয় অসহায় সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ গাইড ও আতিথেয়তা-কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আসে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস পায়।

কৃষি-পর্যটন, দক্ষিণ আফ্রিকা

 

​চিন ও জাপান তাদের কৃষি-পর্যটন মডেলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রাচীন কৃষি-ঐতিহ্যের এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়েছে, যার প্রধান লক্ষ্য হল পর্যটকদের কাছে শিক্ষা, গবেষণা এবং নতুন কৃষিপ্রযুক্তির প্রচার। জাপানে জমির স্বল্পতা কাটাতে পর্যটকদের জন্য ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ভার্টিক্যাল ফার্ম (Vertical Farm) ও রোবোটিক্স পরিচালিত গ্রিনহাউসের মতো উচ্চপ্রযুক্তির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে, চিনে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিশাল আকারের কৃষি-থিমপার্কের আদলে আধুনিক কৃষি-প্রদর্শনীকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। এই মিশ্র মডেলটি শুধুমাত্র পর্যটন রাজস্বের মাধ্যমে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ায় না, বরং পর্যটকদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই কৃষি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।

কৃষি-পর্যটন, চিন

 

কৃষি-পর্যটন: গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন

​কৃষি-পর্যটন শিল্প হিসেবে গোটা বিশ্বে অত্যন্ত দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। ২০১৯ সালে এই বাজারের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৬৯.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০৩২ সালের মধ্যে প্রায় ১৯৭.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।

 

কৃষকের আয়বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় প্রভাব

উচ্চ মুনাফা ও স্থিতিশীল রাজস্ব: কৃষকরা এখন শুধু ফসল বিক্রির উপর নির্ভর না করে, সরাসরি পর্যটন পরিষেবা, থাকার ব্যবস্থা, খাবার ও বিনোদনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ও স্থিতিশীল রাজস্ব উপার্জন করছেন। ‘ইউ-পিক’ মডেলের মাধ্যমে কৃষকের শ্রমখরচ (Labor Cost) হ্রাস পাচ্ছে, উচ্চ মুনাফা (Higher Margin) নিশ্চিত হচ্ছে।

কর্মসংস্থান ও গুণক প্রভাব: এটি গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, পর্যটকদের খরচ কেবল খামারে সীমাবদ্ধ না থেকে আশেপাশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং হস্তশিল্পের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলিকেও উৎসাহিত করে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ‘গুণক প্রভাব’ (Multiplier Effect) তৈরি করে।

প্রিমিয়াম বাজার: যখন পর্যটকরা পণ্যের গুণমান ও উৎপাদনের পদ্ধতি সরাসরি দেখেন, তখন তাঁরা পণ্যের জন্য ন্যায্যমূল্য (Fair Price) দিতে ইচ্ছুক হন এবং বিশ্বস্ত গ্রাহক হিসেবে কাজ করেন, যা স্থানীয় ব্র্যান্ডিং ও রপ্তানিকে শক্তিশালী করে।

 

ভারতের কৃষিসমস্যা ও কৃষি-পর্যটন

​বর্তমানে ভারতের কৃষকরা এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, কৃষি-উপকরণের অত্যধিক চড়া দাম এবং বৃহৎ কর্পোরেট আগ্রাসন— এই ত্রিবিধ চাপে কৃষিকাজ ক্রমশ অলাভজনক হয়ে উঠছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত ও সফল কৃষি-পর্যটন মডেল একটি শক্তিশালী সমাধান হিসেবে উঠে আসতে পারে। এটি কৃষকদের শুধুমাত্র ফসল বিক্রির উপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি পরিষেবা খাত থেকে বাড়তি আয়ের পথ দেখায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এনে প্রান্তিক কৃষকের হাতে সরাসরি মুনাফা তুলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

ভারতে কৃষি পর্যটন: অভিজ্ঞতা ও সফলতা

ভারতে কৃষি-পর্যটন বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হলেও, এর উদ্যোগগুলি প্রধানত অসংগঠিত এবং বিচ্ছিন্ন। বেশিরভাগ উদ্যোগই হয় কেবল শহরের কাছে একদিনের পিকনিক স্পট হিসেবে সীমাবদ্ধ, না হয় স্থানীয় কৃষকের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। এর ফলে পর্যটকদের জন্য সঠিক মানের পরিষেবার অভাব এবং উদ্যোগের স্থায়িত্বের অভাব দেখা যায়।

​তবে, বিভিন্ন রাজ্য তাদের নিজস্ব কৃষিসম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিক্ষিপ্ত সাফল্য অর্জন করেছে। যেমন: মহারাষ্ট্র  ভারতে কৃষি-পর্যটনের অন্যতম পথিকৃৎ (পুনে, নাসিক), যা পর্যটকদের আঙুর তোলা, দুধ দোহন ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে কৃষিকাজ দেখার সুযোগ দেয়। পাঞ্জাবের গ্রামীণ খামারগুলি আতিথেয়তা, ট্র্যাক্টর চালানো এবং খাঁটি পাঞ্জাবি রান্না তৈরি ও খাওয়ার অভিজ্ঞতার জন্য বিখ্যাত। দক্ষিণ ভারতে কেরালা মশলার বাগান এবং কর্নাটকে কফি এস্টেটগুলি সফল এগ্রিট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়, যেখানে হোম-স্টে-র ব্যবস্থা রয়েছে। পাহাড়ি রাজ্য হিমাচল প্রদেশে আপেলবাগান ও ফলের বাগানগুলি পর্যটকদের আপেল বা চেরিফল তোলার অভিজ্ঞতা দেয়।

কৃষি-পর্যটন, নাসিক

 

​ভারতের প্রতিটি অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন ভূপ্রকৃতি ও কৃষিজ সম্পদ আন্তর্জাতিক কৃষি-পর্যটন মডেলগুলিকে সফলভাবে রূপায়ণের সুযোগ রয়েছে। দার্জিলিংয়ের চা বাগানে ইউরোপীয় মডেলের ‘প্রিমিয়াম স্টে’ থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের কাছে আমেরিকান মডেলের ‘ইউ-পিক’ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদিবাসীদের যুক্ত করে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলের কর্মসংস্থান সৃষ্টি— সবই সম্ভব।

তবে, ভারতের বিশাল বৈচিত্র্যের কারণে কোনও একটিমাত্র মডেল পুরোপুরি সফল নাও হতে পারে। তাই ইউরোপীয়, আমেরিকান, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিন-জাপান— এই চারটি মডেলের ভালো দিকগুলি মিশিয়ে একটি সমন্বিত (হাইব্রিড) মডেল তৈরি করাই সবচেয়ে কার্যকরী হবে।

​এই হাইব্রিড মডেল কেবল কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের পথই দেখাবে না, বরং এটি গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করবে। স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যার ফলে গ্রামীণ যুব সমাজকে আর শহরমুখী হতে হবে না। এই সমন্বিত উদ্যোগ ভারতকে কৃষি পর্যটনের এক বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরবে এবং কৃষকদের আত্মনির্ভরশীলতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5245 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...