ইউরোপীয় রেনেসাঁস, মানবতাবাদ এবং ধর্মকে কিছু প্রশ্ন

মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


জ্ঞান ও মেধা বহু পাদ্রিকেও সত্যসন্ধান থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। সম্ভবত এটিও একটি কারণ ইউরোপ-এ আধুনিক যুক্তিবাদের বিস্তার হওয়ার। চিন ও রাশিয়ার বাইরে পৃথিবীর অজ্ঞেয়বাদী এবং নাস্তিকদের এক বৃহদংশ থাকেন ইউরোপে। অথচ ভারতের হাজার বছরের পুরনো ধর্মকে প্রশ্ন করার আন্দোলনের ইতিহাস সত্ত্বেও, বেশিরভাগ নাস্তিক এবং যুক্তিবাদীরা তাঁদের বিশ্বাস সম্পর্কে নীরব থাকেন— বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় দেশে জনসমক্ষে ধর্মহীনতার কথা বলার চেয়ে এটি সহজ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ। উপমহাদেশে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি সঙ্কুচিত হচ্ছে

 

ইউরোপীয় রেনেসাঁস

১৪শ শতকের প্রথম দিকে, পৃথিবীর আর পাঁচটা দেশের মতোই, ধর্মীয় বিশ্বাস ইউরোপীয়দের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। রাজনৈতিক আধিপত্য, শিল্প এবং শিক্ষা থেকে ধর্মকে আলাদা করা ছিল অসম্ভব। ইউরোপীয় রেনেসাঁস ধর্ম এবং শিক্ষার মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তুলেছিল— এর প্রভাব পড়েছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও। এই সেই সময়ে শেক্সপিয়ার, গ্যালিলিও, দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, পেট্রার্ক এবং ম্যাকিয়াভেলিরা তাঁদের যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন— সময়টা ছিল মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মের কঠোর নিয়ম-কানুন থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি পাওয়ার কাল। তখন মানবজীবনের প্রতি নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। রেনেসাঁস-এর মানবতাবাদ ছিল এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা সমষ্টি থেকে ব্যক্তির দিকে নজর দিল।

তবে রেনেসাঁস এবং ধর্মের মধ্যে এক বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াও ছিল৷ আসলে তাদের সম্পর্কটা ছিল জটিল। মুদ্রণব্যবস্থার আগে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হত হাতে লিখে। পাণ্ডুলিপি তৈরি করা ছিল শ্রমসাধ্য কাজ এবং প্রায়ই তাতে ভুল হত। সেই সময়ে মনে করা হত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট পাণ্ডুলিপি আছে— তবে এর মোট সংখ্যা ছিল ৩০০। তখন এমন বহু মানুষ পৃথিবীতে ছিলেন যারা জীবনে একটি বইও দেখেননি। পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, জার্মান উদ্ভাবক জোহানেস গুটেনবার্গ আগে পরিচিত কিছু যন্ত্রের উপর ভিত্তি করে প্রথম যান্ত্রিকভাবে চালানো মুদ্রণযন্ত্র তৈরি করেছিলেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে ৪১ পাতার ‘গুটেনবার্গ বাইবেল’-এর ইউরোপ জুড়ে ব্যাপক প্রসার হয়; অবশেষে ব্রিটিশদের মার্কিন উপনিবেশেগুলিতে তা ছড়িয়ে পরে।

গুটেনবার্গ বাইবেল

 

১৫ শতকে মুদ্রিত বইগুলি দ্রুত, নির্ভুলভাবে অকল্পনীয় পরিমাণে শিক্ষার প্রসারে কাজে লাগানো হতে লাগল। অবশ্য একই সঙ্গে কিছু বই ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্নগুলি ধর্মের অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগকেও উস্কে দেয়। ফলে শিল্পী এবং চিন্তাবিদদের ধর্ম নিয়ে আরও প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। জ্ঞানের অর্জন ও বিস্তার এবং এর ফলে সৃষ্ট উদ্বেগের মধ্যে সম্পর্কটি জটিল এবং এটাই রেনেসাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য৷

তাই বলা যায়, ছাপাখানার প্রভাব, ধর্মের উত্থান এবং তার বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ এক দ্বিমুখী উত্তরাধিকার রেখে গেছে। খেয়াল রাখতে হবে, কিছুটা পরবর্তীকালে এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ে পৃথিবীর আদিবাসী সংস্কৃতি ও তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের উপরে। সেই আদিবাসীরা ইউরোপীয় বিশ্বাস এবং জীবনযাত্রার পদ্ধতি গ্রহণের জন্য মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। আবার ইউরোপীয়রাও তাঁদের কোনও ধর্ম আছে বলে মানতে চাইতেন না— আদিবাসী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে ইউরোপীয়রা ইউরোপের বাইরের বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করে। তাই সেই সময়ের সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে এসেছিল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, দাসপ্রথা এবং সম্পদ ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য— যাকে ‘রেনেসাঁর অন্ধকার দিক’ বলা যায়।

নবজাগরণের বিভিন্ন দিক আছে— একদিকে আছে মুদ্রণ, বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য, ধর্মের বিস্তার এবং প্রাচ্যের সম্পদের উপরে স্থায়ী অধিকার লাভ। অপরদিকে মুদ্রিত বইয়ের ব্যাপক প্রসারের ফলে জ্ঞান ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটে যা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সমাজকে প্রভাবিত করে। বই বিতরণের গতি এবং পরিমাণ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে মুদ্রিত বইগুলি এক বিরাট পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল যারা ছাপাখানা থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে আগ্রহী। মুদ্রিত বইয়ের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচের ফলে আগের চেয়ে বহু গুণ বেশি মানুষ বই হাতে পেয়েছিল।

 

মানবতাবাদ

রেনেসাঁসের চিন্তাবিদরা নিজেরা মানবতাবাদ শব্দটি ব্যবহার করেননি— অনেক পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে, রেনেসাঁসের ধারণাকে বর্ণনা করার জন্য মানবতাবাদ শব্দটি উদ্ভাবন করা হয়।

আজকে অবশ্য, ‘মানবতাবাদ’ শব্দটির এক ভিন্ন অর্থ (যুক্তিবাদী, অ-ধর্মীয় জীবনধারা) অর্জন করেছে; তাই এর মূল উদ্দেশ্য রক্ষার জন্য, যখন ১৩৫০-১৬০০ সালের প্রেক্ষাপটে এই শব্দের প্রয়োগ হয়, তখন একে অনেক সময়ে ‘রেনেসাঁসের সময়ের মানবতাবাদ’ বলা হয়। রেনেসাঁসের চিন্তাবিদরা আজকের সংজ্ঞার সঙ্গে সকল বিষয়ে সহমত ছিলেন না। এই মানবতাবাদ আসলে ধর্মীয় বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করার পরিবর্তে, জীবনের দিকে মুখ ফেরায়৷ চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে, একজন ব্যক্তি কীভাবে জনজীবনে সম্পূর্ণরূপে অংশগ্রহণ করতে পারে। তাদের অনুসন্ধান চলে মানুষ হওয়ার অর্থ খুঁজতে।

এই ধারণার মুখ্য বিষয় হল ধর্মীয় বিষয়গুলির বিপরীতে মানবতার চর্চাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তখনকার মানবতাবাদীদের আদর্শের মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত সদগুণ, ধর্মশাস্ত্র বাদেও অধ্যয়নে উৎসাহ, জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা এবং নৈতিক দর্শনের গুরুত্ব। বেশিরভাগ ইউরোপীয় রাষ্ট্রে এগুলি আইনি, রাজনৈতিক এবং সাহিত্যিক যোগাযোগের প্রাথমিক মাধ্যম হয়ে ওঠে। নিজেদের ভাষায় মুদ্রিত বইয়ের পরিমাণ তাদের মধ্যে একটি জাতীয় ভাবমূর্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। তারা একটি সাধারণ আঞ্চলিক ভাষায় বিষয়গুলির চর্চা করতে পারে। এর ফলে একজন ব্যক্তি নিজের ধর্ম বা অঞ্চলের শাসকের পরিবর্তে একটি জাতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের ফলে নতুন রাজনৈতিক কাঠামো সংগঠিত করার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে গির্জার কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার নতুন বৌদ্ধিক এবং প্রশাসনিক দক্ষতার ভাবনাও উদ্ভাবিত হয়।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি ধর্মীয় কর্তৃত্বের উপর গভীর প্রভাব ফেলে, ক্যাথলিক চার্চের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের ক্ষয় হয় এবং প্রোটেস্ট্যান্টিজমের ধর্মনিরপেক্ষ রূপের উত্থান হয়। মনে রাখা দরকার, মানবতাবাদীরা একজন ক্যাথলিক বা প্রোটেস্ট্যান্ট হতে পারেন, এবং এঁদের অনেকেই ধর্মতত্ত্ব, আইন বা চিকিৎসার মতো চিন্তার বিভিন্ন শাখা অধ্যয়ন করেছিলেন। দার্শনিক বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও, মানবতাবাদীরা বিশ্বে মানবতার অবস্থান সম্পর্কে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন।

 

ধর্মকে প্রশ্ন এবং পরাক্রমশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভাঙন

গির্জার কাজে ঘুষ দেওয়া এবং অন্যান্য দুর্নীতি দেখে, যেমন, ‘অর্থ দিয়ে নাগরিকদের পাপ থেকে মুক্তি’, জার্মান সন্ন্যাসী মার্টিন লুথারের মোহভঙ্গ হয়। ১৫১৭ সালে মার্টিন লুথার উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যাপেলের দরজায় পেরেক দিয়ে তাঁর ৯৫টি থিসিস আটকে দিয়েছিলেন। লুথার পরবর্তীতে লুথেরান চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিউ টেস্টামেন্ট জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অনুবাদ ক্যাথলিক চার্চকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল। একদিকে ছিল পোপের প্রতি অনুগত ক্যাথলিকরা এবং অন্যদিকে প্রোটেস্ট্যান্টরা ছিল ক্যাথলিক চার্চের নিয়মের প্রতিবাদকারী।

প্রায় একই সময়ে, ১৫৩৩-৩৪ সালে, রাজা অষ্টম হেনরি ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে আরও বিভাজন সৃষ্টি করেছিলেন।

পোপ ও ইংল্যান্ড-এর রাজা অষ্টম হেনরির মধ্যে দ্বন্দ্ব অবশ্য বিশেষ কোনও আধ্যাত্মিক কারণে হয়নি। অষ্টম হেনরির সঙ্গে পোপের দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল তার প্রথম স্ত্রী ক্যাথরিন অফ আরাগন-এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ, যা তিনি অ্যান বোলিনকে বিয়ে করার জন্য চেয়েছিলেন। পোপ ক্লিমেন্ট সপ্তম ‘আরাগনের ক্যাথরিন-এর’ সঙ্গে বিবাহ বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ক্যাথরিনের ভাগ্নে ছিলেন স্পেনের শক্তিশালী রাজা চার্লস পঞ্চম, চার্লস-এর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পোপ কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। এই অস্বীকৃতির ফলে হেনরি ইংল্যান্ডের চার্চের উপর পোপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন, তিনি নিজেকে ইংল্যান্ড-এর চার্চের প্রধান নিযুক্ত করলেন— হেনরি পার্লামেন্টের মাধ্যমে আইন পাস করিয়ে ইংল্যান্ডে পোপের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত করেন। শেষমেশ রোমান ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে অষ্টম হেনরির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়— এবং ১৫৩৩ সালে তিনি ‘অ্যান বোলিন’-কে বিয়ে করেন। অবশ্য আরেকটি বিয়ে করবার জন্য রাজা অষ্টম হেনরি-র আদেশে লন্ডনের টাওয়ারে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যান্য অভিযোগে ১৫৩৬ সালের ১৯ মে অ্যান বোলিনের শিরচ্ছেদ করা হয়।

এখানে, আরও অনেক উদাহরণের মতো, ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। পুরোহিত ও রাজার মধ্যে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেলে রাজা নিজের মতো ধর্ম তৈরি করে নিতে পারেন।

স্টিফেন জে গ্রিনব্ল্যাট ছিলেন একজন মার্কিন সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ এবং লেখক। তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁস এবং ধর্মের উপরে তার প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। একজন মার্কিন হিসেবে লেখালেখি করার সময় গ্রিনব্ল্যাট রেনেসাঁসের অর্জনের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রেখেছেন, আবার একই সঙ্গে এর অন্ধকার দিক, বিশেষ করে ষোড়শ শতাব্দী জুড়ে নতুন বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন এবং ইহুদি-বিদ্বেষের প্রতি তাঁর চিন্তাকে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর বইতে ইংল্যান্ডে অষ্টম হেনরির সময়কে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন। রেনেসাঁসের নতুন যুগে ব্যক্তির পরিচয় এবং তার জটিলতা বর্ণনা করেছেন, যা ‘ব্যক্তির’ জন্য একটি নতুন যুগ। একদিকে, ব্যক্তি সমাজের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই করে, অন্যদিকে তার এখনও শৈল্পিক উপায়ে পরিচয় বেছে নেওয়ার এবং গঠন করার ক্ষমতা রয়েছে। এই দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে বিরোধ থেকে ‘ব্যক্তিগত পরিচয়ের’ উন্মেষ হয়।

স্টিফেন জে গ্রিনব্ল্যাট

 

তবে সার্বিকভাবে নবজাগরণের বৌদ্ধিক আন্দোলন ধীরে ধীরে ধর্মের সংস্কারের দিকে পরিচালিত হয়েছিল। এই আন্দোলন বইয়ের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং মানুষকে আরও বেশি করে পড়তে এবং বর্তমানকে কীভাবে সংস্কার করা যায় সে সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে উৎসাহিত করেছিল।

 

ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান

১৯২৭ সালের কোনও এক সন্ধ্যায় চার্চে প্রার্থনা করবার সময়ে বেলজিয়ামের ক্যাথলিক পাদ্রি জর্জ লেমাইত্রে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন, বাইবেলের আদিপুস্তকের প্রথম অধ্যায় অনুযায়ী সাত দিনে পৃথিবী সৃষ্টি হয়নি। হয়তো মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল— অর্থাৎ মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে।

কিছুটা পরীক্ষাচ্ছলে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের প্রস্তাব প্রথম উত্থাপন করেছিলেন লেমাইত্রে। পাদ্রি হয়েও তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন-এ পূর্ণ-সময়ের অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। লেমাইত্রে বললেন, মহাবিশ্ব একটি প্রাথমিক বিন্দু থেকে শুরু হয়েছিল যা কোটি কোটি বছর ধরে প্রসারিত হয়েছে। এই তত্ত্বে ‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরির’ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করল। বেলজিয়ামের ক্যাথলিক পাদ্রি জর্জ লেমাইত্রে নিজে ক্যাথলিক পাদ্রি, তবু বিজ্ঞানকে মেনে নিতে, বাইবেল থেকে বিচ্যুত হতে তাঁর আটকায়নি।

জর্জ লেমাইত্রে

 

অবশ্য মধ্যযুগ থেকেই পাদ্রিদের বিজ্ঞানী হওয়া কোনও বিশেষ ঘটনা ছিল না— রজার বেকন, নিকোলাস কোপার্নিকাস, মেন্ডেল ইত্যাদি পাদ্রি-বিজ্ঞানীর নামের তালিকা দীর্ঘ। ইতিহাসের দীর্ঘ সময় জুড়ে বিদ্যাচর্চার সুযোগ সাধারণ মানুষের থেকে ক্যাথলিক পাদ্রিদের বেশিই ছিল। যেমন বৌদ্ধদের মধ্যেও সন্ন্যাসীরা বিদ্যাচর্চায় এগিয়ে ছিলেন।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের অন্যতম প্রণেতা ডারউইন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ডিভিনিটি’ নিয়ে কোনওক্রমে এক ডিগ্রি করে ফেলছিলেন। তখন তস্য ব্রহ্মাণ্ড জানে, তাঁর ভাগ্যে আছে ইংল্যান্ডের কোনও অজগ্রামের পুরুতগিরি করা। দীর্ঘ পাঁচ বছরের অধ্যাবসায়, ডারউইনের পাণ্ডুলিপি, বাক্সবন্দি হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে ছিল। একটা জড়তা ছিল— জানতেন তাঁর তত্ত্ব প্রকাশিত হলে বাইবেল প্রকাশক, চার্চ, ধর্মপ্রাণা স্ত্রী ও অন্যান্যরা খুশি হবেন না। শেষে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালাস-এর চাপে বাধ্য হলেন ১৮৫৯ সালে অন দ্য অরিজিন অফ স্পেসিস বইটি প্রকাশ করতে। এতে প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনের সপক্ষে অকাট্য তথ্য ও যুক্তি পেশ করেন।

মনে দ্বিধা ছিল, ধর্মমনস্ক ছিলেন, স্নেহাস্পদদের আঘাত দিতে চাননি— তবু সত্যের সঙ্গে মোলাকাত একদিন করলেন।

চার্লস ডারউইন

 

ডারউইন বিবর্তনতত্ত্বের মূল কথাগুলো বলেছেন, কিন্তু সেই তত্ত্বকে তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। তাঁর প্রায় সমসাময়িক প্রকৃতিবিদ গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল। অঙ্ক ও ফিজিক্সের ডিগ্রিধারী, ছিলেন আজকের চেক রিপাবলিক-এর এক ছোট্ট শহরের এক মঠের যাজক ও সন্ন্যাসী। সেই সময়ে মঠের জমিতে ফসল ফলিয়ে বিক্রি করা হত। মঠের পরিচালকরা মেন্ডেলকে অনুরোধ করলেন চার্চের লাভের জন্য উচ্চফলনশীল কড়াইশুঁটির প্রজনন করতে। বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণধারী মেন্ডেল মঠের বাগানে কয়েক হাজার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যযুক্ত কড়াইশুঁটি গাছের সংকরায়ন করে সেই উপাত্ত (ডেটা) যত্ন করে রাখলেন। জিন শব্দের আবিষ্কারের অনেক আগে মেন্ডেল বুঝতে পেরেছিলেন যৌন জননের সময় পুরুষ ও স্ত্রী জননকোষের মিলনের ফলে একটি নতুন জীব উৎপন্ন হয়, তার কোষে মা ও বাবার দুজনের বৈশিষ্ট্যই থাকে— ডমিন্যান্ট বা রিসেসিভ হিসেবে।

গ্রেগর ইয়োহান মেন্ডেল

 

খ্রিস্টান যাজক যখন ধর্মভীরু বিজ্ঞানী; যখন তাঁরা সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন তখন বিজ্ঞানকে মেনে নিয়েছেন। কোপার্নিকাসও মেনেছেন। শিক্ষিত মানুষ যাজক হয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের অন্বেষণ করেছেন, সঙ্গে বিজ্ঞানেরও গবেষণা ও অনুসন্ধান করেছেন।

আবার এর ব্যত্যয় আছে। আজকেও আমেরিকা বা ইউরোপে অনেকেই বিশ্বাস করেন সাতদিনে ব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান ও মেধা বহু পাদ্রিকেও সত্যসন্ধান থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। সম্ভবত এটিও একটি কারণ ইউরোপ-এ আধুনিক যুক্তিবাদের বিস্তার হওয়ার। চিন ও রাশিয়ার বাইরে পৃথিবীর অজ্ঞেয়বাদী এবং নাস্তিকদের এক বৃহদংশ থাকেন ইউরোপে।

এই চিত্র দেখি না দক্ষিণ এবং পশ্চিম এশিয়াতে।

ভারতের হাজার বছরের পুরনো ধর্মকে প্রশ্ন করার আন্দোলনের ইতিহাস সত্ত্বেও, বেশিরভাগ নাস্তিক এবং যুক্তিবাদীরা তাঁদের বিশ্বাস সম্পর্কে নীরব থাকেন— বিশ্বের অন্যতম ধর্মীয় দেশে জনসমক্ষে ধর্মহীনতার কথা বলার চেয়ে এটি সহজ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ। উপমহাদেশে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি সঙ্কুচিত হচ্ছে।

শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, তার সঙ্গে প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করবার সাহস জোগানো। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তোতাকাহিনী স্মরণ করা যেতে পারে।

রাজা বলিলেন, ‘একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।’

পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হু করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্ গজ্‌গজ্ করিতে লাগিল।

বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5247 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...