টু হুম ইট মে কনসার্ন

অনির্বাণ বসু

 

 

আমার আদাব জানবেন। আমি, মেহ্‌ফুজ আলম, ফিলহাল যে-হালতের মধ্যে দিয়ে দিন গুজরান করে চলেছি, আপনার/আপনাদের কাছে অত্যন্ত সখেদে তা পেশ করছি। আমি বিশ্বাস করি যে, সবটা শুনে আপনি/আপনারা নারাজ হবেন না এবং এই মস্‌লার একটা কিছু সুরাহা নিশ্চয় করবেন।

সমস্যার শুরুয়াত হয় বছর কয়েক আগে। তখন সবেমাত্র শাদি হয়েছে আমার, চার সাল বেপনা মোহাব্বতের পর নিকাহ্‌ হয়ে গেলে ওর আব্বুর ঘর ছেড়ে এসেছে ও, পাকাপাকিভাবে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেছি আমরা— আমারই কামকাজের জন্য অন্য শহরে; নয়তো খানদানি ঘর ছেড়ে, আম্মি-আব্বুকে প্রৌঢ়ত্বে আকেলা রেখে আসতে কারই-বা মন চায়— একদিন সন্ধেয়, মাগ্‌রিবের নমাজ শেষ হয়ে গেছে, কলেজ থেকে ফিরে বাসাবাড়ির তালা খুলেছি সবে, সেই আওয়াজ শুনেই হয়তো, অন্যদিনের মতো গ্লাসে জল নিয়ে ঠিক বাইরের ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে আফরিন। যেদিন একটু বেশি ক্লান্ত থাকি, কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে আফরিনের হাত থেকে গ্লাসটা নিই, কোনওদিকে না-তাকিয়ে এক নিশ্বাসে খেয়ে ফেলি পুরো জলটাই। তা না-হলে, থকাওয়াত সেভাবে গ্রাস করে না যেদিন, আফরিনের হাত থেকে গ্লাস নেওয়ার আগেই চোখ তুলে দেখি ওকে, আমার ঈষৎ হাস্যে ওর মুখেও খেলে যায় ইজহার-এ-মুসকান।

কলেজের বিরক্তিকর মিটিং, প্রিন্সিপালের একঘেয়ে বক্তব্য এবং তৎসহ বিরোধিতা, অ্যাকাডেমিক কমিটির অসহযোগিতা, রুটিন কমিটির রোজকার খেই হারানো, সহকর্মীদের বিবিধ অথচ নাদান কথা-চালাচালির অবসন্ন প্রহর পেরিয়ে বিধ্বস্ত শরীরটাকে টানতে-টানতে বাসাবাড়িতে ফিরে সেদিন আর জলগ্রহণের সময় খেয়াল হয়নি আফরিনের দিকে সেভাবে নজর দেওয়ার কথা; ক্লান্তিকর দিনগুলোয় যেমনটা স্বাভাবিক বলে ততদিনে জেনে ফেলেছে আফরিন। ঘেমো শরীর যত-না কারণ, মানসিক ক্লান্তি তার বেশি, ফলত সেদিন জলের গ্লাস নিতে গিয়ে ঘুণাক্ষরেও বুঝিনি আঁধার নেমেছে আফরিনের মুখে; এটাও এমনকি মালুম হয়নি যে, ওর যে-হাত উন্মুখ হয়েছিল আমার পেয়াস নিবারণে, কোন-এক কারণে কাঁপুনি লেগেছিল তাতে।

জল খাওয়া শেষ করে বরাবরের মতো ফাঁকা গ্লাস আফরিনের হাতে ফেরত দিতে গিয়ে দেখি, চোখের চাহনি ঘিরে আছে অন্ধকার আর মুখ পিলা— পাণ্ডুর। রক্তশূন্য মুখের আফরিনকে দেখে, খোদার কসম, বুকের গেহ্‌রাই তক্‌ কেঁপে উঠেছিল আমার; বারে-বারে জানতে চাইছিলাম, কী হয়েছে, আমার বেমজুদ্‌গিতে কী এমন ঘটে গেছে যাতে বেজান হয়ে পড়েছে সে? সেই মুহূর্তে না-কাবিল-এ-জবাব আফরিন, যে-কোনও ফিকিরেই হোক, এড়িয়ে গিয়েছিল আমার যাবতীয় পুছতাছ। সেই সকল প্রশ্ন এবং জমাট খামোশির মধ্যেই আমি দেখেছিলাম, আহিস্তা-আহিস্তা রং ফিরে আসছে ওর মুখে, যে-কারণে ওই মুহূর্তে আর বেশি পীড়াপীড়ি করিনি; বরং কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয়েই ঘেমো শার্ট খুলে বারান্দার দড়িতে মেলে দিয়েছিলাম আর তোয়ালে নিয়ে ঢুকে গিয়েছিলাম বাথরুমে।

তারপর তো সেই সন্ধেবেলা, বড়জোর ওই আটটা নাগাদ, ঝিলপাড়ের দিকটায় হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আমরা। ঝিলের পাশের বাঁধানো ফুটপাথ ধরে বেখেয়াল হেঁটে যেতে বেশ ভালো লাগে আমাদের; কখনও সন্ধেয়, কখনও-বা রাতের খাওয়া সেরে— অবশ্য যেদিন পেট আইঢাই করে, খানা জবরদস্ত্‌ হয়ে যায়— হাঁটতে চলে যাই দু-জনে। ঝিলটাকে বাঁহাতে রেখে সিধে নাক-বরাবর হাঁটতে শুরু করলে প্রথমেই মাথা ঝুঁকিয়ে আমাদের সালাম জানায় রানি হেতাফেরাস, ওয়াপ্‌সির সময় সে-ই হয়ে যায় নেফারতিতি: আমাদের যুগলচলন পেরিয়ে যায় সঙ্গহীন শতাধিক বছর। মিশরসম্রাজ্ঞীর সামনে এসে দাঁড়ালে প্রতিদিনকার ঝিলকে— ইতিউতি কচুরিপানার ফলে সেভাবে আন্দোলন দেখা যায় না যার জলে— নীলনদ বলে মনে হয় আমাদের। ইতিহাসের মিশর ছেড়ে অন্যান্য দিনের মতোই আমরা এগিয়ে গিয়েছিলাম, শূন্যে ভাসমান দুই ফুটবলারকে পেরিয়ে, দুর্গাপুজোর ভিড়ে। উচ্ছল ছেলে-মেয়েরা সেই মূর্তিকে পিছনে রেখে— কেউ হাসিমাখা, কেউ-বা ব্যাঁকামুখ— দেদার সেল্‌ফি তুলে চলেছিল। দুর্গাঠাকুরের পিছন দিয়ে, ঝিলের উপর, এপার থেকে ওপার, ঈষৎ বেঁকে, বসে গেছে হাওড়া ব্রিজের মিনিয়েচার— আলো ঝলমল। আরও খানিক এগোলে মাদার টেরিজা বলে মনে হয় মূর্তির গায়ে মাটির কাপড়ে সাদা জমির উপর নীল পাড় দেখে; হুবহু না-হলেও চেনা যায়, অসুবিধা হয় না তেমন। মাদারের সামনে সেদিন বলে শুধু নয়, কখনওই খুব-একটা ভিড় থাকে না; ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে নেমে এসে সন্ধেবেলা সামান্য হাঁটার পর ফুটপাথের বেঞ্চিতে বসে জিরিয়ে নেন এলাকার বুজুর্গরা: বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে তবিয়ত বিগড়োয়, তন্‌হাই বাড়ে, মায়েরা সব আকেলা হয়ে পড়ে— বাবারাও, এমনকি।

নীলনদের ধার দিয়ে, গঙ্গার পাশ দিয়ে, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু সরণি বেয়ে এরপর আমরা এসে পড়তে চলেছিলাম ত্রিশঙ্কু এক রথের সামনে। জন্নত থেকে এই দীনদুনিয়ায় যেভাবে নেমে আসেন পরীরা, বুঝি-বা সেইভাবেই রথের সামনে জুতে-দেওয়া ঘোড়ারা ঢালপথে ছুটে নামার বিভঙ্গে স্থির আর তাদের লাগাম ধরে রেখেছেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ; ওঁর ঠিক পিছনেই, রথের মূল আসনে উপবিষ্ট সারদামণি ও শ্রীরামকৃষ্ণ। হর সাল রথের দিন কলেজ বন্ধ থাকে। আমার অন্য কলিগদের কাছে তা নিছকই একটা ছুটির দিন; আমার কাছে নয়। এই রথেরই বদৌলত, ওয়াতন ছেড়ে রাত-ও-রাত চলে আসতে হয়েছিল আমার খানদানকে, বেঘর হয়েছিল কত-না রিস্তেদার; খওফনাক সেই রাতে, তখনও পর্যন্ত, আম্মির কোল রশন করে পয়দাইশি হয়নি আমার। সেই থেকে জগন্নাথদেব থাকুন আর আপনাদের শ্রীরামকৃষ্ণ বসুন, রথ দেখলেই ডর লাগে আমার, দুনিয়ার যত খওফ সব এসে যেন গেঁড়ে বসে মাথায়, এই মুল্‌ক্‌ থেকেও অনিকেত হওয়ার খয়ালাত কুঁকড়ে দেয় অন্দর তক্‌। ঠিক এইখানে এসেই আর এগোতে চাই না আমি, বিলক্ষণ জানে আফরিন। যদিও সেই রথের ঠিক পিছনদিকেই, আরও খানিক উপরে, শূন্যে, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ; তবু ভরসা করতে পারি না, বিশেষত যখন দেখি দেবী ভবতারিণীকে দেবালয় থেকে বের করে এনে রাখা হয়েছে সিঁড়িতে— বেহুঁশ মানুষের ধুলোয় আবিল ঈশ্বর।

আফরিন তাই রথের কাছে পৌঁছনোর আগেই থামিয়ে দেয় আমায়। ওখান থেকে ফিরতিপথ ধরি দু-জন। সেদিনও তার অন্যথা হয়নি। আরও কিছুটা সময় উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির পর ফিরে এসেছিলাম বাসায়।

বাসায় ফিরে রাতের খাওয়াদাওয়া সেরেছিলাম রোজের মাফিক। তারপর খানিক গুফ্‌তুগুর পর চলে গিয়েছিলাম পরিপাটি বিছানায়; অগোছালো যে-কোনও চিজই আফরিনের না-পসন্দ্‌। একটা সময় পর আঁখ লেগে গিয়েছিল, সুনেহ্‌রা ঘুমে ডুবে গিয়েছিলাম আমরা।

তার আগে, আমার কলেজ থেকে ফেরার পর থেকে শুরু করে বিস্‌তরে মাখামাখি হওয়ার আগে পর্যন্ত, কিংবা তার পরে, আরও অনেক তার পরেও এই আমার, মেহ্‌ফুজ আলমের, কিছুমাত্র মনে পড়েনি আফরিনের পরেশানি সম্পর্কে পুনরায় জিজ্ঞাসার। আফরিনও, কেন কে জানে, সেই যে তখন এড়িয়ে গিয়েছিল, কোনও উচ্চবাচ্য করেনি আর।

আপনি/আপনারা যদি-বা মনে করেন, বিষয়টা আদতেও তেমন সন্‌জিদা কিছু ছিল না, তাহলে অবধারিত ধোঁকা খাবেন।

ওই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন— বছর খানেক মতো হবে— নিরুপদ্রব কেটে গিয়েছিল যেহেতু, ফলে বিষয়টি একরকম বেরিয়েই গিয়েছিল আমার মাথা থেকে। বাড়ি থেকে, উভয়ের আম্মি-আব্বুর তরফে, এর মধ্যে বহুবার তাগাদা এসেছে; অবশ্য পুরোটাই প্রায় একতরফা শুনতে হচ্ছিল আফরিনকে: শাদির দু-বছর হতে চলল, এবার অন্তত বাচ্চা নিয়ে নেওয়া উচিত তোমাদের, নিজেদের ওয়ারিশের কথা তো ভাবতে হবে নাকি— বগেরা-বগেরা। ছুটির দিনেই মূলত, দুই বাড়ির থেকে ভাসিয়ে দেওয়া প্রস্তাব, আমার কানে তুলেছিল আফরিন। এমনিতেই শাদির বেকায়দা খরচ, নতুন চাকরি বলে গচ্ছিত আমানতও তদ্রূপ, তায় বাসাবাড়িতে দু-জনের নতুন সংসার— সন্তানগ্রহণের কথা ভাববারও অবসর ছিল না আমাদের। ও যখন আলতো করে ভাসিয়ে দিয়েছিল প্রসঙ্গটি, রবিবাসরীয় সেই আধিরাতেও, আর্থিকভাবে তখনও ততটা আরামের জায়গায় আমরা পৌঁছতে পারিনি যে নতুন একজনকে নিয়ে আসব আমাদের জিন্দেগিতে; তবু, ইনকার করব না যে, সেই সময় থেকেই প্রধানত, আগামীর খোয়াব দেখতে শুরু করেছিলাম আমরা।

এর ঠিক কিছুদিন পর, কলেজে ক্লাসের ফাঁকে, টিচার্স্‌রুমে— দুটো পিরিয়ড পরপর ক্লাস ছিল না যেহেতু, যেহেতু কলেজ ঘিরে সহকর্মীদের বিবিধ বাতচিতের মধ্যে ঢুকতে ভালো লাগছিল না— টেবিলের উপর মাথা নামিয়ে চোখ বন্ধ করেছিলাম যখন, সেই সময়ই আমার সঙ্গে প্রথম হাদসাটা ঘটে।

আমাদের ছোট্ট ঘরে এসে পড়েছে সকালবেলার মিঠে রোদ্দুর। জানলার পাশে একটা দোলনা— শিশুদের উপযোগী। উপরের পলকা অ্যালুমিনিয়ামের রড থেকে ঝুলে আছে রংবিরঙ্গি ঘূর্ণি। কিছু আগেও সেটার ঘূর্ণনে খিলখিলিয়ে উঠছিল দোলনায় শুয়ে-থাকা শিশুটি। ঘুমিয়ে পড়েছে তারপর। রসুই থেকে আফরিনের গলা কানে আসে, সে-শিশু ছেলে না মেয়ে— কী যে বলে সম্বোধনে, বোঝা যায় না ঠিক। শুধু এটুকু বুঝি, একবার অন্তত নজর করতে বলছে শিশুটিকে। দোলনায় ঘুমন্ত শিশুটি, বুঝতে পারি, আমার সন্তান— আমাদের অওলাদ। হিংস্র শ্বাপদের মতো খামোশি ধরে নিই পায়ের পাতায়। ধীর পায়ে হেঁটে আসি দোলনার সামনে। মুখ দেখি সন্তানের। দু-হাত তুলে হিফাজতের দোয়া করি আল্লাহ্‌র কাছে: উয়িজুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত্‌ তাম্মাতি, মিন কুল্লি শয়তানিয়োঁ ওয়া হাম্মা্তি, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতি—। দোয়া করে হাত নামিয়ে আনি চোখে, ঠোঁটে, কানে। চোখ খুলি তারপর; দেখি, সফেদ কাপড়ে জড়ানো একটি হ্যান্ড-গ্রেনেড পড়ে আছে দোলনায়। শিশুর মুখ দিয়ে লালা গড়ানোর মতো করে খুলে যাচ্ছে স্‌প্লিট পিন। খোলামুখে, বেদাঁত, হেসে উঠছে বারুদ— ঠিক এরপরই ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছিলাম আমি। বাতানুকূল ঘর কখন যে অনুঘটক হয়ে তন্দ্রা পেরিয়ে ডেকে এনেছিল নিশ্চিন্তির ঘুম, বুঝিনি।

সেদিনের মতো ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর আরও কিছুটা সময় কলেজচত্বরেই বেকার বসেছিলাম। ঘণ্টায় একটাই ট্রেন, তবু স্টেশনে পৌঁছে বেফিকর ছেড়ে দিয়েছিলাম সেটা এবং সোয়া-ঘণ্টা পর বেখাপ্পা হর্ন বাজিয়ে এসে ঢুকেছিল যেটা, তাতে চড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম দরজার পাশে। স্টেশন থেকে ঘরে ফেরার পথটুকু হেঁটে ফিরলেও অন্যদিনের থেকে হাঁটার গতি ছিল অনেকটাই শ্লথ। মোদ্দা কথা, যেভাবে এবং যতভাবে সম্ভব, সময় নষ্ট করছিলাম আমি; ঘরের চার দিওয়ারের মধ্যে ঢোকার বিন্দুমাত্র খোয়াইশ ছিল না আমার।

সেই দুঃস্বপ্নের ভনক পর্যন্ত আফরিনকে বুঝতে দিতে চাইছিলাম না আমি। ঘরে ফেরার আগে তাই চেয়েছিলাম যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক করে তুলতে। যে-কারণে এমনকি ঘরে ঢুকে রোজকার আদতমাফিক জলের গ্লাস পর্যন্ত নিইনি আমি; পায়খানার অজুহাতে ওই বাইরের জামাকাপড়েই ঢুকে গিয়েছিলাম বাথরুমে। বেরিয়েছিলাম যখন, আফরিন তখন রান্নাঘরে রুটি বেলছিল, ঢিমে আঁচে প্রস্তুত হচ্ছিল গোবির তরকারি। সেদিন বলে নয়, ওই ডরাওনা স্বপ্নের ন্যূনতম আভাসও ততদিন পর্যন্ত পায়নি আফরিন, যতদিন-না দোবারা আমার সঙ্গে প্রায় অনুরূপ হাদসা ঘটেছিল। প্রথমের সঙ্গে দ্বিতীয়টির ফারাক ছিল এই যে, পরেরবার আমি ঘুমে ছিলাম না।

দোবারা এমনটা হওয়ার আগে, চারপাশের কারণেই, মানসিকভাবে খানিক বিপর্যস্ত ছিলাম আমি। সোশাল মিডিয়া স্ক্রোল করলেই তখন হেট-স্পিচের আস্ফালন, কথায়-কথায় বদসুলুকি, মনগড়ন ইতিহাস আর যদি-বা দু-চার কথা লিখে ফেলি কদাচ, রিপোর্ট অওর রেস্ট্রিকশন। অ্যান্টি-ন্যাশনালের মতো লব্‌জ্‌ কিংবা পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার ধমকি তো আগে থেকেই ছিল, খানদানের প্রসঙ্গ তুলে আমাদের নাজায়েজ প্রতিপন্ন করার কাজও শুরু হয়েছিল ওই সময়। কলেজে বড়দিনের ছুটি চলছিল সেই সময়। নতুন বছর কড়া নাড়ছিল দরজায়। ক-দিন পরই বদলে যাবে দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার। রাতে, বিছানায়, একটা সময় গা থেকে লিহাফ সরে গিয়েছিল; আমাদের জিস্‌ম গরম হয়ে উঠেছিল যখন— তখন, অথবা তার কিছু আগে-পরে। বেপনা মোহাব্বতে একে অপরকে ভরিয়ে দিচ্ছিলাম আমরা, সোহাগে-আদরে পরস্পরকে করে তুলছিলাম অস্থির। আমি উঠে এসেছিলাম আফরিনের উপর, তারপর যেমন হয়ে থাকে, যেমন হওয়াটাই সুস্থ-স্বাভাবিক দাম্পত্যে আম বাত, ঠিক তাই-তাই হয়ে চলেছিল উভয় তরফে। ক্রমে উত্তেজিত আফরিনের নখের খারোচ আমার আন্দোলিত পিঠের উপর, গড়িয়ে-নামা পসিনায় হালকা জ্বলন অতএব, তবু আমার রফতার বেড়েই চলেছিল। আমার চাহনিও— সেই দুলুনির সঙ্গে তাল রেখেই— কখনও ঘরের ছাদে, কখনও-বা পেলব বুকের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল। শীৎকারে বুঁদ আফরিনের দিকে, ঠিক সেই মুহূর্তে, মাত্র একবারই, তাকিয়ে ফেলেছিলাম আমি। শিরহীন এক মুর্দা শিশু সবুজ কাফনে মোড়া; খুন শুকিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি, চাঁদ আর সিতারার আলো সেই শোণিতধারার উপর আছড়ে পড়ছিল আর ঠিকরে বেরোচ্ছিল এক অনির্বচনীয় দ্যুতি।

ছিটকে সরে গিয়েছিলাম আফরিনের শরীরের উপর থেকে। পলকে স্তিমিত হয়ে এসেছিল ওর সকল আধো উচ্চারণ। আমি, আমার আজু তানাস্যুল— শান-এ-মর্দ, মায় সম্পূর্ণ শরীর এক লহমায় নিস্তেজ— নেতিয়ে পড়েছিল। আফরিন, স্বভাবতই বিমূঢ়, বারবার জানতে চেয়েছিল আমার তন্দুরস্তি সম্পর্কে। কোনও জবাব না-দিয়ে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গিয়েছিলাম আমি, মুখে-চোখে জল দিয়ে ফিরেও এসেছিলাম ফের; ঘুমোনোর ভান করেছিলাম তারপর।

যদিও পরদিন সকালে আফরিনকে সবটাই বলি; বলতে বাধ্য হই। আমার কথা শুনে, নতমুখে, শুধু হাতের উপর হাত রেখেছিল ও, তারপর বয়ান করেছিল বছর খানেক আগে— মাগ্‌রিবের নমাজ শেষ হয়ে-যাওয়ার পরের সেই সন্ধেয়— ওর বেরং মুখের পিছনের কিস্‌সা: দ্বিপ্রাহরিক ঘুমের ভিতর, স্বপ্নে, সে আসলে দেখেছিল, সন্তানের জন্ম দিচ্ছে এক মা যার মুখ হুবহু তার প্রতিরূপ। দু-পায়ের ফাঁক দিয়ে ত্রিশূলের ফলায় রক্তমাখা অপক্ক একটি ভ্রূণ তুলে আনছেন— কপালে তিলক, ঊর্ধ্বাঙ্গে নামাবলি— ডাক্তার। কমণ্ডলুর জলে রক্ত ধুয়ে তারপর সেই অগঠিত গড়ন তিনি নিয়ে চলতে শুরু করেছেন মাশ্‌রিফের দিকে; নিঃসঙ্গ একটি হাঁড়িকাঠ যেখানে একাকী, অপেক্ষমান। এরপর ঘুম ভেঙে গেলে আফরিন দেখেছিল, পরনের কাপড় শুধু নয়, ঘামে ভিজে গেছে বিস্‌তরও।

আমার মধ্যে ভয় বাসা বাঁধছিল। আপনি/আপনারা জানুন, ডরপোক আমি, গুটিয়ে যাচ্ছিলাম ভিতর-ভিতর। পিতৃত্বকে ভয়ে-ভয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম। মন সায় দিচ্ছিল না, শরীর জাগছিল না আর। হাদিসে হারাম এমন তরিকাও ইস্তেমাল করতে চেয়েছিল আফরিন; আমি চাইনি আর। বাড়ির বুজুর্গদের কথায় অওলাদের প্রসঙ্গ এলে এটা-সেটা বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলাম কোনওমতে। একটা সময় পর রিস্তেদারদের তরফে— কেউ সামনে না-বললেও কানে আসছিল— নতুন এক পরিচয় হল আমাদের: বান্‌ঝ্‌ আর না-মর্দ্‌।

এইভাবেই আরও কিছু বছর কেটে যায়। আমাদের শাদি একঘেয়ে, অস্বস্তিকর ঠেকতে শুরু করে। তবু একে অপরকে আঁকড়ে কোনওরকমে বেঁচে ছিলাম, বাঁচতে চাইছিলাম আমরা। দীর্ঘদিন হরেক রসম থেকে শুরু করে যাবতীয় ইন্তেজামে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমি আর আফরিন। আব্বু আগেই গিয়েছিল, আম্মির এন্তেকালের পর আমাদের মাথার উপর কেউ থাকল না আর আমরাও পারলাম না রোদে-জলে কারও ছাদ হয়ে উঠতে। সন্তানের আকাঙ্ক্ষা, বস্তুত, দুর্নিবার— মালুম হয়েছিল ফের। ছাদ হয়ে উঠতে চেয়ে যত-না ব্যাকুল ছিলাম আমরা, ঢের বেশি ছিল সন্তানসুখের জন্য আকুলতা।

আফরিন আর আমি, আমরা দু-জন ফয়স্‌লা করি, সিদ্ধান্ত নিই যে, নিজেদের না-হোক— দুনিয়ায় কতজনই তো অওলাদের জন্য কাঙাল, মাথা খুঁড়ে মরে, কত-না ঘর বেচিরাগ ডুবে থাকে আঁধারে— অভিভাবকহীন কোনও শিশুকে দত্তক নেব। এইমতো স্থির করে সরকারি হোমগুলোয় যোগাযোগও শুরু করেছিলাম। হেন কোনও মুলাজিম নেই, যার মুখে নিজেদের তারিফ শুনিনি আমরা, এমন হয়নি একবারও; কিন্তু গোদ নেওয়ার বেলাতেই যত সমস্যা এসে হাজির হতে শুরু করে। শুরুতে নিজেদের বদকিস্‌মত ভাবতাম, পরে কানাঘুষোয় জেনেছিলাম, আমাদের কারণে নয়, আসলে মজহাবের জন্যই নাকি আমাদের নিয়তে খোট; আমাদের পরভরিশেই নাকি ঠাসা আছে গলদ! ধাক্কা খেতে-খেতে আমরা বুঝে ফেলেছিলাম, যে-শহর আমাদের ঘরভাড়া দিতে চায় না, যে-দেশ আমাদের কওমের কোনও ইতিহাস পড়াতে চায় না আর, কোনও কিমতেই সে সন্তান দেবে না।

বেইনতেহা ইন্তেজারের পর আজও আমরা সন্তান চাই। তবে সেই কামনায় বদল ঘটেছে হালে। যে-কোনও অনাথ শিশুকে আমরা আর চাইছি না, খাস করে এক হিন্দু অনাথকে চাইছি এবার। সেই শিশুকে যত্নে, ভালোবাসায় বড় করে তুলতে চায় আফরিন, ভালো পরভরিশ দিতে চাই আমি; আপনাকে/আপনাদের এও বলতে চাই আমরা, যে, সেই সন্তানের মজহাবের উপর আমাদের কোনও হক আমরা রাখব না: মুসলমানের ঘরে এক হিন্দুর সন্তান বেড়ে উঠবে হিন্দুর মতোই। শুধু যখন আমরা থাকব না, আমাদের মৃতশরীর সাদা কাফনে দাফন হয়ে যাবে, আমাদের রুহ্‌ পর্যন্ত আর শরমিন্দা করবে না আপনাকে/আপনাদের, ইস্রাফিল যেদিন বাজাবে তার বিশাল শিঙা, কেয়ামতের দিনে, আজকের সেই শিশুর থেকে ওই দিন জেনে নেবেন আমাদের আস্‌লি কিস্‌সা— অতীতের আফসানা— চেপে-রাখা ইতিহাস; অথবা ইতিহাসের হাড়গোড়।

আদাব।

আবেদনান্তে—

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5253 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...