বিরিঞ্চিবাবার দেশ

বিরিঞ্চিবাবার দেশ | প্রবুদ্ধ বাগচী

প্রবুদ্ধ বাগচী

 

সারা দুনিয়ার সাহিত্যের শব্দভাণ্ডারে ‘ইউরেকা’ শব্দটার ঢুকে পড়ার পেছনে ছিল একটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। ঘটনাটা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি কি না জানি না। কিন্তু বস্তুর জলে ভাসবার পেছনে বিজ্ঞানকে খুঁজে বেড়ানোর যে প্রয়াস বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কোনও এক প্রসন্ন মধ্যাহ্নে তিনি বাথটবে স্নান করতে গিয়ে তাঁর মাথার ভিতর চলকিয়ে ওঠে সেই থিওরি, জনশ্রুতি এটাই। এবং নির্বসন বিজ্ঞানী দৌড়ে চলে যাচ্ছেন রাজসভায় আর রাজার দেওয়া সমস্যার সমাধান বাতলে দিচ্ছেন এরকম এক নাটকীয় দৃশ্যকল্পও জুড়ে আছে তাঁর সঙ্গে। গল্পটা সবাই জানেন, রাজা তাঁর স্বর্ণমুকুট দেখিয়ে আর্কিমিডিসকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এটাকে না গলিয়ে কীভাবে বার করা যায় তার মধ্যে খাদ আছে কি না। মূলত এই সমস্যা নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছিলেন ওই বিশ্রুত বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের ইতিহাসে যার নির্দেশিত সূত্র আজও সমান প্রাসঙ্গিক এই বাইশশো বছর পার করেও। শোনা যায়, গ্রিসে রোমান আক্রমণের সময় সৈন্যরা আর্কিমিডিসকে তার গাণিতিক গবেষণার কাগজপত্র ছেড়ে চলে যেতে বলে— তিনি আদেশ অমান্য করায় তাঁকে সেনারা হত্যা করে। ঘাতকের কাছে ক্ষমতাই ঈশ্বর, বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এইরকম সব গল্পের অভাব নেই। ঠিক যেমন নিউটনের সঙ্গে আপেলগাছের গল্প। সপ্তদশ শতাব্দীর এক গ্রীষ্মে যখন লন্ডন শহরে প্লেগের চরম প্রকোপ তখন তিনি তাঁর লিঙ্কনশায়ারের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেই আপেলগাছের তলায় অলস দ্বিপ্রহর কাটানোর সূত্রেই আপেলকে গাছ থেকে পড়তে দেখা এবং তারই ফলে মাধ্যাকর্ষণের সূত্রায়ন। অনেক বিজ্ঞানলেখক বলেছেন, না গাছের তলায় বসে নয়, নিউটন নাকি ওই পতন দেখেছিলেন সংলগ্ন খামারবাড়ির অলিন্দ থেকে। কিন্তু ওই শুভলগ্নে আপেল যদি মাটিতে না পড়ত তাহলে বুঝিবা সভ্যতা ও বিজ্ঞান থেমে যেত!

প্রায় একই আখ্যান শুনি টমাস আলভা এডিশনের ক্ষেত্রেও। এই বিজ্ঞানসাধক নাকি কোনওদিন সেইভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে যাননি, তাঁকে ছোটবেলায় যে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখানকার মাস্টারমশাই তাঁর মাকে এসে বলেছিলেন এই ছেলেকে পড়াবার যোগ্যতা তাঁদের স্কুলের কারও নেই। সেই মানুষটিই পরে একের পর এক উদ্ভাবনী ক্ষমতায় তাক লাগিয়ে দিলেন বিশ্বকে। পরিণত জীবনে নানা বিষয়ে গবেষণা করে তাঁর ঝুলিতে ছিল ১০৯৩টি আমেরিকার পেটেন্ট! আরেক খ্যাত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের বিষয়েও রয়েছে একইরকম কিংবদন্তি। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থেকেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানের, বিশেষত তড়িৎ ও তড়িচ্চুম্বকীয় নানা মৌলিক তত্ত্ব। জীবনের শেষপর্বে বিজ্ঞানসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে নাইটহুড দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, তাঁকে দুবার প্রস্তাব দেওয়া হয় রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি পদের— তাও তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। ভারতীয় সংখ্যাতাত্ত্বিক রামানুজম বিষয়ে লিখিত গ্রন্থে— দি ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি (লেখক: রবার্ট ক্যানিজেল)— রামানুজমকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার মাথায় এই ধরনের বিচিত্র সমীকরণের ভাবনা কীভাবে আসে? তিনি বলেন, মা সরস্বতী আমার জিভের ডগায় বসতি গড়েন। ভাগ্য ভালো, আমাদের দেশের আরও সব বিশ্রুত বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন বসু, মেঘনাদ সাহা, সিভি রমন বা প্রশান্তচন্দ্র  মহলানবিশ, হোমি ভাবা এঁদের নিয়ে এমন কিংবদন্তি জমাট বাঁধেনি। গুরুবাদী এদেশে বিজ্ঞানের সফল আবিষ্কারকে তাতে সহজেই গুরুকৃপা বা অলৌকিক বলে দাগিয়ে দেওয়া যেত।

এটা ঠিকই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে আকস্মিকতা একটা বড় উপাদান। এক্স-রে বা রঞ্জন রশ্মি বা রেডিয়ামের বিকিরণ কিংবা অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এমন কিছু আকস্মিক নিরীক্ষণ বিজ্ঞানীদের যেন কিছুটা ভাবনার আলো জুগিয়ে দেয়। লুই পাস্তুরের ধারাবাহিক গবেষণা বা ব্রহ্মাণ্ডবিদ (কসমোলজিস্ট) ফ্রেড হয়েলের প্রসরণশীল মহাবিশ্বের ধারণা থেকে বিগ ব্যাং থিওরি— এদের মধ্যেও কিছুটা আকস্মিকতার ব্যাপার আছে। কিন্তু তা অলৌকিক নয়। বিজ্ঞানের চর্চায় তিনটে খুব স্পষ্ট ব্যাপার আছে— নিরীক্ষণ, বিশ্লেষণ ও সূত্রায়ন— যে কোনও আবিষ্কারের মূল গতিপথ এইরকম একটা শৃঙ্খলে যুক্ত থাকে। এখন পর্যবেক্ষণ করতে গেলে পর্যবেক্ষকের একটা ধারাবাহিক চর্চার ভিত্তি থেকেই যায়। নিউটন সাহেব গাছের তলায় বসে দেখলেন আপেল মাটিতে পড়ছে আর তৈরি হয়ে গেল মাধ্যাকর্ষণের সূত্র ও গতিবিদ্যার সব নিয়মকানুন, ব্যাপারটা এমন মোটেও নয়। একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানলেখক বলেছিলেন, একটি প্রস্তুত মনের সামনে ঘটে যাওয়া আকস্মিকতাকেই উদ্ভাবন বলা যায় (A discovery is said to be an accident meeting a prepared mind.)। কথাটা একশোভাগ সত্যি।

মনে রাখতে হবে, নিউটন সাহেব যখন লিঙ্কনশায়ারের গ্রামের বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছেন (১৬৬৬)। তার আগে ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ইতিমধ্যেই গণিত ও বলবিজ্ঞান বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান আহরণ করেছেন। তিনি চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন ইউক্লিড ও দেকার্তের জ্যামিতি বিষয়ে, বীজগণিতের দ্বিঘাত সমীকরণের বিস্তার (Binomial Expansion) নিয়ে তিনি স্থায়ী উপপাদ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন এমনকি ক্যালকুলাসের কিছু বুনিয়াদি বিষয়ও তখন তার মাথায়— তাঁর প্রবর্তিত ‘ফ্লাক্সন’ পরের পর্বে পরিচিত হবে ‘ডেরিভেটিভ’ হিসেবে। তিনি নিজেই লিখছেন, ওই সময়কালে আমি চাঁদের কক্ষপথে বিস্তৃত অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি,… চাঁদকে তার নিজ কক্ষপথে ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় বল এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠতলে বিরাজমান অভিকর্ষ বলের মধ্যে তুলনা করি এবং এই দুটি বলের মান প্রায় সমান বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। এর পরেও কি আমরা নির্বোধের মতো বলতে থাকব, গাছ থেকে আপেল পড়ল আর মহাকর্ষ আবিষ্কার হয়ে গেল!

টমাস আলভা এডিসনের ক্ষেত্রেও বিষয়টা একইরকম। প্রাথমিক স্তরে তিনি তাঁর মায়ের কাছেই বুনিয়াদি শিক্ষা নেন, অল্প বয়সেই তিনি তাঁর একটি কানে শ্রবণশক্তি হারান। কার্যত আঠাশ বছর বয়সে তিনি একটি নামী প্রতিষ্ঠানে রসায়নের ক্লাসে ভর্তি হন। অবশ্য ছেলেবেলা থেকেই তিনি বিভিন্ন যন্ত্র বানানোয় দক্ষতা অর্জন করেন। কিন্তু বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে যে ধরনের উচ্চশিক্ষা লাগে তাতে এডিসনের কোনও ঘাটতি হয়নি, এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর প্রতিভা। এই যুগলসম্মিলন মার্কিন দেশের এই নাগরিককে গত শতকের বহুপ্রজ বিজ্ঞানপ্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যার মধ্যে কোনও অতিলৌকিক বিষয় নেই।

একইভাবে ধরা যায় মাইকেল ফ্যারাডের কথাও। এই ব্রিটিশ বিজ্ঞানী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছেন কম এটা সত্যি। কিন্তু এর বাইরে ছিল তাঁর নিজস্ব অনুসন্ধান ও পড়াশোনার জগৎ যাকে আমরা আজকাল বলি ‘সেলফ মেড’ ব্যক্তিত্ব যা তাঁকে চিহ্নিত করেছে অন্যতম প্রধান প্রভাবশালী বিজ্ঞানী হিসেবে। হয়তো আমাদের মনে পড়তে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠতম উত্তরাধিকার রবীন্দ্রনাথকে, যিনি মাত্র বারো বছর বয়সে ভানুসিংহের পদাবলী লিখে চমকে দিয়েছিলেন। এর পেছনে নিশ্চিত তাঁর প্রতিভা ছিল কিন্তু আরও বেশি ছিল বৈষ্ণব সাহিত্যের নিবিড় পাঠ ও পর্যবেক্ষণ যা তাঁর একেবারেই নিভৃত চর্যার বিষয়। ফ্যারাডেও তড়িৎ-রসায়ন, তড়িৎ-পদার্থবিদ্যা ও তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশ নিয়ে যে সব যুগান্তকারী ধারণা দিলেন তা শুধু প্রতিভার জোরে হওয়া সম্ভব ছিল না। পদার্থবিদ আর্নেস্ট রাদারফোর্ড বলেছেন, “যখন আমরা তাঁর আবিষ্কারের বিশালতা এবং ব্যাপ্তি এবং বিজ্ঞান ও শিল্পের অগ্রগতির উপর তাদের প্রভাব বিবেচনা করি, তখন সর্বকালের অন্যতম সেরা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারক ফ্যারাডের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর চেয়ে বড় কিছু নেই।”

সত্যিই পরিণত মনের সঙ্গে আকস্মিকতার সন্ধি ছাড়া কোনও আবিষ্কার হয় না।

কিন্তু বিষয়টা হল, আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার আবহটা এমন যে তার ভিতর ঠিক বিজ্ঞানের মানসিকতা ঢুকতে পারে খুব কম। যে কারণে এই ধরনের অতিলৌকিকতার চাষবাস হয় খুব ভাল। কার্যত যেসব আখ্যানের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করলাম সবটাই আমরা শুনেছি আমাদের বেড়ে ওঠার ভিতর। আমাদের বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানীদের জীবনকথা পড়ানো হয় খুবই কম অথচ এই সব আখ্যানের ভিতর বোঝা যায় একজন বিজ্ঞানীর বেড়ে ওঠার ও বিজ্ঞানকে তিনি কেমনভাবে দেখছেন তার খতিয়ান। বরং বিজ্ঞানভাবুক থেকে বিজ্ঞানসাধক কথাটা বেশি চলে— সাধক বললে কোথাও যেন এক আরাধ্যের ছবি আভাসে ধরা পড়ে। সেই যেন সাধক রামপ্রসাদ বাড়িতে বেড়া বাঁধছেন আর শ্যামা মা জুগিয়ে দিচ্ছেন তার কঞ্চি, ক্যালেন্ডারে এই ছবি আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। কিন্তু একজন বিজ্ঞানীকে তার পরীক্ষাগারের গবেষণার বেড়া নিজেকেই বাঁধতে হয়, বেড়া ভেঙে গেলে সারিয়েও নিতে হয় নিজেকেই। শোনা যায়, দক্ষিণেশ্বর ভবতারিণী মন্দিরে গিয়ে নরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিমার কাছে জ্ঞান, বুদ্ধি যাচ্ঞা করেছিলেন, কিন্তু একজন বিজ্ঞানীর পক্ষে ইচ্ছে থাকলেও এই যাচ্ঞা সম্ভব নয়। কারণ, বস্তুবিজ্ঞানের খুটিনাটি আরাধ্যের কাছে জোটে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা বুঝতে গেলে টেনসর নামক এক বিশেষ বিদ্যা জানতে হয়— টেনসর অ্যানালিসিস জানা কোনও দেবদেবী ভূভারতে আছেন বলে আমাদের জানা নেই। ওটা নিজেদেরই শিখে নিতে হয়। বিজ্ঞানের সৌন্দর্য ঠিক এইখানেই আর আমাদের বিজ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের ঠিক এইখানেই ভুল পথে চালিত করা হয় এদেশে। ইদানিং আরও অনেক বেশি।

কারণ, পুরাণ যেদিন থেকে ইতিহাসের ঘাড়ে চেপে বসেছে এই অধঃপাতের শুরু সেদিনই। সেই ঘাড়ে চাপা দানবটাই মহাকাব্যের নায়ককে করেছে দিব্য ইতিহাসের জ্যান্ত নায়ক আর তার আঁতুড়ঘর খুঁজতে গিয়ে ভেঙে দিয়েছে ইতিহাসের জ্বলন্ত স্থাপত্য। সেটাই শুরু। আর তারপর থেকে ইতিহাস নয় পুরাণই আমাদের চালিকাশক্তি, আমাদের সমস্ত বিজ্ঞানশিক্ষার ভিত্তি, আমাদের বৈজ্ঞানিক মননের ক্ষেতে কীটনাশকের দূষণ। বিজ্ঞান কংগ্রেসের আসরে মাথাকাটা গণেশের ‘পৌরাণিক’ প্লাস্টিক সার্জারির দুর্বিনীত গুণকীর্তন, এরোডাইনামিক্সের সঙ্গে পুষ্পকরথের চোখধাঁধানো ফিউশন-গপ্পো, এমনকি পরমাণুবোমার কৃৎ-কৌশলের সঙ্গেও জুড়ে নেওয়া প্রাচীন ভারতের জয়গাথা। আপাতত এইটেই ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম যা নাকি ইদানিং গুঁড়ো গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে সমস্ত বিজ্ঞানশিক্ষার নামী প্রতিষ্ঠানগুলিতে।

এমন নয় এটা আগে ছিল না। প্রায় উত্তর-স্বাধীনতা পর্ব থেকেই রাষ্ট্রীয় কাজেকম্মে বিজ্ঞানের চেতনা যে খুব বিকশিত হয়েছে তা নয়। কলকাতার জাহাজ কারখানায় প্রতিটি জাহাজই যখন জলে নেমেছে তার আগে ফেটেছে আস্ত নারকেল, সেতু তৈরির আগে ভিতপুজো এমনকি কোথাও কোথাও লুকিয়ে-চুরিয়ে শিশুবলিও ঘটে গেছে। তখনকার ভারতরাষ্ট্র আইআইটি-সহ নানা বিজ্ঞান গবেষণার সারস্বত কেন্দ্রের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন কিন্তু শুধু অর্থবরাদ্দে বিজ্ঞানচেতনার উদ্ভাস ঘটে না। ঘটেওনি। আর সবচেয়ে বড় কথা হল আমাদের মেনস্ট্রিম মিডিয়া, কি আগে কি পরে, বিজ্ঞান-পিপাসুদের জন্য কোনও আইডল তৈরিতে ব্যর্থ। গত সাড়ে সাত দশকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে আমরা কেউ ফিল্মের হিরো বা হিরোইন হতে চেয়েছি, হতে চেয়েছি ক্রিকেট খেলোয়াড় বা অন্য কেউ কারণ তাঁদের জীবনকাহিনী মহিমান্বিত হয়েছে নানা মাধ্যমে— কিন্তু বিজ্ঞানী, গবেষক? বিজ্ঞানের কটা পত্রিকা বেরোয় আমাদের ভাষায়? কটা টিভি চ্যানেলে বা পডকাস্টে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানীদের নিয়ে তেমন আলোচনা হয়? স্কুলের রচনাপরীক্ষায় কজন স্পষ্টাক্ষরে লেখে সে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হতে চায়? আদপে বিজ্ঞান আমাদের জীবনের স্তরে স্তরে জড়িয়ে নেই, মিশে নেই আমাদের জীবনচর্যায়।

অথচ পৌরাণিক আখ্যানকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এবং তাতে রাজনীতির পোচ লাগিয়ে আমরা প্রাচীন বিজ্ঞান নিয়ে উদ্বাহু। আমরা ‘কী ছিলাম’ এই বাগাড়ম্বর ছাপিয়ে যায় আমরা কী আছি তার বাস্তবতা। একটা অতি সহজ কথা হল, বিজ্ঞানচর্চা দেশকাল-নিরপেক্ষ একটি ধারাবাহিক ব্যাপার। অমুকের বিজ্ঞান তমুকের বিজ্ঞান বলে আদপে কিছু নেই। শ্রীধর আচার্যের দ্বিঘাত সমীকরণের বীজ নির্ণয় পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে এ-দেশে, ভাস্করাচার্যের জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ ভারতীয়, কিন্তু সারা দুনিয়া তাকে কাজে লাগিয়েছে, উত্তরণ ঘটিয়েছে বীজগণিতের বা জ্যোতির্বিদ্যার। এইটাই ধারাবাহিকতা। নিউটনের আবিষ্কৃত শব্দের গতি বিবর্ধিত হয়েছে ডপলারের গবেষণায়। আবার বীজগণিতের একটা বড় চর্চা হয়েছে আরবদেশে, আজকের দুনিয়ায় বহু প্রচলিত অ্যালগদিরমের মূল সূত্র আরব গণিতবিদের হাতে— এর মধ্যে কোনও দেশ-বিদেশ-ধর্ম নেই। তাই সত্যিই যদি প্লাস্টিক সার্জারি বা বায়ুগতিবিদ্যার বস্তুনিষ্ঠ চর্চা রামায়ণ-মহাভারতের কালে হত, তাহলে মানবসভ্যতাকে তার জন্য আরও কয়েক হাজার বছর অপেক্ষা করতে হত না। আর এই কল্পরাজ্যের প্রচার যেখানে এক বিশেষ রাজনীতির আকরসত্তা হয়ে ওঠে সেখানেই বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ঘিরে সব এলোমেলো গল্পের চাষ হয়— সবটাই নাকি দৈবী! পরিণত মন ছাড়া যে বিজ্ঞানের আবিষ্কার হয় না, এই গোদা সত্যিটা ধরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। অবিজ্ঞান আর অপবিজ্ঞানের ঊষর ভূমির ওপর পুঁজি-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির বহুতল নির্মিত হতে থাকলে এই-ই তার অনিবার্য গন্তব্য! কম্পিউটারের গায়ে স্বস্তিক চিহ্নের রক্তটিকা। মহাকাশযানের সঙ্গে তামা-তুলসি-চন্দনের ধোঁয়া। টিকি দিয়ে আকাশের বজ্রকে নামিয়ে আনার শয়তানি। বিরিঞ্চিবাবাদের দেশ।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.