সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
শীতের এই সময়টাতে দেশজুড়ে নানান উৎসবের ঢল নামে। ফসল কাটার মরশুমকে উপলক্ষ করে কত না আয়োজন চলে দিকেদিকে। দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে এই সময় মানুষজন মেতে ওঠে পোঙ্গল উৎসবে। আর এই আয়োজন বিশেষ মাত্রা পায় জাল্লিকাট্টুকে ঘিরে। এই প্রসঙ্গে আসব, তবে তার আগে একটা খবরের কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। খবরটি গত ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫-এ দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। খবরটির শিরোনাম— “জাল্লিকাট্টুতে মৃত সাত, আহত ৪০০”। তামিলনাড়ুর বিখ্যাত জাল্লিকাট্টু প্রতিযোগিতা ১৬ জানুয়ারি কান্নুম পোঙ্গল দিবস উপলক্ষে মাদুরাইয়ে পালিত হয়। এই প্রতিযোগিতায় তামিলনাড়ুর বিভিন্ন প্রান্তে একদিনে সাত জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে খবর। আহত হয়েছিলেন ৪০০ জনেরও বেশি। শুধু তাই নয়, এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দুটি ষাঁড়েরও মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছিল। পাশাপাশি, প্রতিযোগিতা দেখতে এসে ৭০ জন দর্শকও আহত হয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছিল।
খবরটি নিশ্চয়ই আপনাদের উৎকণ্ঠিত করেছিল। সেটাই স্বাভাবিক। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে জাল্লিকাট্টু সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা বরং সেরে নেওয়া যাক। পাঠকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারছেন, আমরা এখন স্পেনের বুল ফাইট বা আমেরিকার বুল রাইডিং-এর মতো ভারতীয় বুল ফাইটের কথা বলার জন্যই আসর বসিয়েছি। ভারতীয় ষাঁড়ের লড়াই, বা জাল্লিকাট্টু, তামিল ঐতিহ্য ও পরম্পরার এক উজ্জ্বল স্মারক। এরু তালুভুতাল, জাল্লিকাট্টু, সাল্লিকাট্টু, মঞ্জু-ভিরাট্টু— এমন নানান নামে পরিচিত এই খেলাটি বহুদিন ধরেই দক্ষিণি রাজ্য তামিলনাড়ুতে প্রচলিত।
এই খেলার নিয়মকানুনের মধ্যে বিশেষ কোনও জটিলতা নেই। একটি কুঁজযুক্ত ষাঁড়কে (Bos indicus) একটি ঘেরা চৌহদ্দিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই ময়দানে নেমে পড়েন বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ— কখনও এককভাবে, কখনও দলবেঁধে। তাঁদের একটাই লক্ষ্য— ইতস্তত ছুটে বেড়ানো ষাঁড়টির উত্তুঙ্গ কুঁজ দুই হাতে ধরে ঝুলে পড়ে তাকে থামিয়ে দেওয়া। ছোটাছুটি থামিয়ে ষাঁড়টি কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেই প্রতিযোগী বিজয়ী ঘোষিত হন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ষাঁড়ের শিংয়ে বেঁধে দেওয়া হয় পতাকা। প্রতিযোগীকে সেই পতাকা খুলে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। তবেই কপালে জোটে জয়মাল্য।
নিঃসন্দেহে এই ঐতিহ্যবাহী খেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রবল ঝুঁকি আর শৌর্য–বীরত্বের সাক্ষ্য। এলাম–দেখলাম অবধি ঠিক আছে, কিন্তু জয়ের জন্য রীতিমতো কাঠখড় পোড়াতে হয় সফল প্রতিযোগীদের। এই প্রাণ বাজি রাখা ঝুঁকির খেলায় যে ব্যক্তি বা দলের মাথায় শিরোপা উঠবে, তাঁদের সামাজিক সম্মান ও প্রতিষ্ঠা যে অনেকটাই বেড়ে যায়, তা বলাই বাহুল্য। তামিল কন্যারাও বরমাল্য নিয়ে অপেক্ষা করে থাকেন সেই বীরশ্রেষ্ঠকে বর হিসেবে বরণ করে নিতে।
তামিল সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে জাল্লিকাট্টুর নিবিড় সংযোগ রয়েছে। প্রাচীন তামিল সাহিত্য সঙ্গম-এ এই ঐতিহাসিক ক্রীড়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। তামিল এরু তালুভুতাল শব্দের অর্থ ‘ষাঁড় আলিঙ্গন’। পরবর্তীকালে অবশ্য জাল্লিকাট্টু বা সাল্লিকাট্টু শব্দবন্ধটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। ষাঁড়ের শিংয়ে পুরস্কার হিসেবে মুদ্রা বেঁধে দেওয়ার রীতি যেদিন থেকে প্রচলিত হয়েছে, সেদিন থেকেই এই পরিবর্তন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা ‘জাল্লি’ বা ‘সাল্লি’ শব্দের অর্থ মুদ্রা, আর তামিল ‘কাট্টু’ শব্দের অর্থ উপঢৌকন বা পারিতোষিক— যা প্রতিযোগীদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করা হত।
আবার মানুষ ও পশুর এই দ্বৈরথকে ‘ষাঁড় তাড়া করার খেলা’ বা মঞ্জু-ভিরাট্টুও বলা হয়। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, ষাঁড় আর মানুষের এই বিপজ্জনক খেলা আজও সমানভাবে জনপ্রিয় তামিলনাড়ুতে, বিশেষ করে রাজ্যের দক্ষিণাংশে।
তামিল সমাজে জাল্লিকাট্টুর অনুপ্রবেশের ইতিহাস সুপ্রাচীন। গবেষকদের মতে, প্রাচীন তামিলনাড়ুর মুল্লাই অঞ্চলে বসবাসকারী আয়ার আদিবাসী মানুষদের মধ্যে প্রচলিত এই রোমাঞ্চকর খেলাটি তার বিপুল জনসমর্থনের কারণেই ধীরে ধীরে মূল জীবনস্রোতের অংশ হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। তামিল যুবকদের সাহস, বীরত্ব, শৌর্য ও বীর্য প্রদর্শনের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে এই লোকক্রীড়াটি। সাম্প্রতিক গবেষণার সূত্রে জানা গিয়েছে, তৃতীয় ও চতুর্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও অধুনা তামিলনাড়ুর বিশেষ কিছু অঞ্চলে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে জাল্লিকাট্টুর নিবিড় উপস্থিতি ছিল। এভাবেই বৃহত্তর জীবনচিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে এক নতুন সাংস্কৃতিক যাপনের উদ্ভব হয়।
তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরকে কেন্দ্র করেই এই সময়ের জাল্লিকাট্টু সংস্কৃতির রমরমা। মাদুরাইয়ের উত্তরে থাকা থাঞ্জাভুর ও তিরুচিরাপল্লী, এবং দক্ষিণের তিরুনেলভেল্লি ও রামানাথাপুরমে ষাঁড়–মানুষের এই খেলা সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব হয়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুক্কুলাথোর জনজাতির মানুষেরা আজও পূর্বজদের পরম্পরাকে সম্মান জানিয়ে এই বর্ণময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন। ফসল কাটার উৎসবকে কেন্দ্র করেই জাল্লিকাট্টুর এই আয়োজন।
এই রোমাঞ্চকর খেলাটির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ জড়িয়ে থাকার বিষয়ে তেমন জোরালো কোনও তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে পোঙ্গল উৎসব উদ্যাপন উপলক্ষে গ্রামদেবতার পূজা–অর্চনার পরে এই খেলার আয়োজন করার একটি রীতি তামিলনাড়ুর কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত আছে।
মূলত ষাঁড় আর মানুষের পরাক্রম যাচাইয়ের খেলা হলেও জাল্লিকাট্টুর কিছু রকমফের রয়েছে। একেবারে গোড়ার দিকে হয়তো এসবের তেমন বালাই ছিল না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রোমাঞ্চকর খেলাটির জনপ্রিয়তা যত বেড়েছে, ততই নতুন নতুন নিয়মের প্রচলন হয়েছে বলেই মনে করা যায়। এই মুহূর্তে তামিলনাড়ুতে তিনটি বিশেষ ধরনের জাল্লিকাট্টুর প্রচলন রয়েছে। এগুলো হল—
ভাদি মাঞ্জুভিরাট্টু: এটি জাল্লিকাট্টুর সবথেকে সাধারণ শ্রেণির প্রতিযোগিতা। এখানে ষাঁড়টিকে তার নির্দিষ্ট খোঁয়াড় (ভাদি ভাসাল) থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রতিযোগীরা চৌহদ্দিতে প্রবেশ করেন। ধাবমান ষাঁড়ের কুঁজ ধরে ঝুলে পড়ার জন্য তাঁরা একে একে চেষ্টা করেন। প্রত্যেকেই একবার করে সুযোগ পান। যিনি সফল হবেন, তাঁর কপালেই জুটবে জয়মাল্য। ভাদি মাঞ্জুভিরাট্টু রীতির জাল্লিকাট্টু মাদুরাই, থাঞ্জাভুর এবং সালেম জেলায় বিশেষ জনপ্রিয়।
ভেলি ভিরাট্টু: আগের রীতির সঙ্গে এই ধারার খুব বড় কোনও ফারাক নেই। এখানে ষাঁড়টিকে সরাসরি খেলার আসরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর চলতে থাকে কুঁজ ধরে ঝুলে পড়ার রোমহর্ষক প্রয়াস। মাদুরাই ও শিবগঙ্গাই জেলায় এই ধারাটি আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ভাতাম মাঞ্জুভিরাট্টু: এই রীতিতে ষাঁড়টিকে ১৫ মিটার লম্বা দড়ি দিয়ে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। ষাঁড়ের শিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় পুরস্কার। সাত থেকে নয় সদস্যের একটি দল কুঁজ ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় আধ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে পুরস্কারের পুঁটুলি খুলে নিতে পারলেই বিজয়ীর শিরোপা অর্জন করে।
সব রীতির জাল্লিকাট্টুতেই প্রতিযোগীদের সামনে ষাঁড়ের কুঁজ ধরে ঝুলে থাকার শর্ত থাকে। গলা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলে তা বাতিল বলে গণ্য করা হয়। কমপক্ষে ৩০ সেকেন্ড সময় ঝুলে থাকাটাই বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার অন্যতম শর্ত। উন্মত্ত ষাঁড় কোনও প্রতিযোগীকে ফেলে দিলে, অথবা প্রতিযোগী নিজে পড়ে গেলে, তাঁকে বাতিল করা হয়। মানুষ-পশুর এই দ্বৈরথ যে সবদিক থেকেই বিপজ্জনক, তা বুঝতে বোধহয় অসুবিধা হয় না।
এইসব মারাত্মক ঝুঁকি থাকার কারণেই এই খেলাটিকে ঘিরে বারবার বিতর্ক হয়েছে। কোর্ট-কাছাড়িও নেহাত কম হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে এক আবেদন করে পশুপ্রেমী সংগঠনগুলির তরফে এই খেলাটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। আবেদনকারী সংস্থাগুলির বক্তব্য ছিল, এই খেলায় পশুদের উপর নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়। সুতরাং জাল্লিকাট্টুর আয়োজন বন্ধ করা হোক। উচ্চতম ন্যায়ালয় তামিলনাড়ু সরকারকে এই বিপজ্জনক খেলা নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তামিলনাড়ু সরকার এই বিষয়ে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন প্রবর্তন করে, যা সাম্প্রতিককালে জাল্লিকাট্টু আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। আসলে এই রোমাঞ্চকর খেলাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তামিল পৌরুষের অস্মিতা ও গৌরব। একে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করলে জনরোষের শিকার হতে হবে সরকারকে— এ কথা তারা ভালোভাবেই জানে। তাই নতুন আইন ও নিয়মকানুনকে সামনে রেখেই চলছে জাল্লিকাট্টুর আয়োজন। পরম্পরার কাছে আইনি বিধিমালাও যে অনেক সময় অচল হয়ে পড়ে, এই খেলার বার্ষিক আয়োজন হয়তো তারই এক উদাহরণ।
জাল্লিকাট্টু বীররসের এক দক্ষিণি আখ্যান। জীবনকে বাজি রেখে প্রতিটি মুহূর্ত এভাবে উপভোগ করার মধ্যেই আছে এক পুরুষালি বীরত্ব। সেই বীররসে জারিত জাল্লিকাট্টুর প্রতিটি ক্ষণ। কী হয়, কী হয়— এই উত্তেজনাকে সঙ্গী করেই চলে মানুষ ও পশুর দ্বৈরথ। এই লড়াইয়ে কে জিতল, কে হারল, তাকে ছাপিয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি কিছু মানুষের নৈষ্ঠিক আনুগত্য। ওই অঞ্চলের মানুষজন গোটা অনুষ্ঠানটিকে ঠিক এইভাবেই দেখে।

