সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
হয় কী, একজন সাংবাদিক যখন ভ্রমণকাহিনি লেখেন, তখন তাকে তথ্যের জাল থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে হয়। আর আশ্চর্য হল এই, যে এক কলমচির সফরনামা-য় লেখক অগ্নি রায় সে কাজে অনেকটাই সফল হয়েছেন, সম্ভবত এই কারণেই যে তাঁর অন্যতম প্রেমিকা হল কাব্য। বিষ্ণু দে লিখেছিলেন সংবাদ মূলত কাব্য। তবে কাশ্মির উপত্যকায় বা পাপুয়া নিউ গিনিতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সফরে যতটা বাস্তব থাকে, কাব্য ততটা থাকে না; যতটা প্রতিবেদনের গূঢ় বাসনা স্বপ্নকে আড়াল করে রাখে, ভ্রমণের নিজস্ব রহস্য ততখানি ধরা দেয় না। অথচ বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনি চিরকাল সেই কবিচিহ্নিত শিশিরবিন্দুটিকে চোখ মেলে দেখার তাগিদেই রচিত হয়েছে। আমরা ছোটবেলায় পালামৌ পড়ে এতটা মোহিত হয়েছিলাম, সঞ্জীবচন্দ্রের সেই ভ্রমণও ছিল একটি কর্মোপলক্ষ্যে ভ্রমণ। বস্তুত, সঞ্জীবচন্দ্র একখানি যোগদানপত্র পেশ করতে যাওয়ার আগে পালামৌ সফরের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। অগ্নিও এই বইয়ের চোদ্দটি লেখায় মূলত সাংবাদিক হিসেবে নানা দেশ ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা লিখেছেন। তাতে বাংলাদেশ, নেপাল, সিংহল, ইরান, নিউ গিনি, ইথিওপিয়া ইত্যাদি দেশের কথা আছে। উন্নত দেশ বলতে বেলজিয়াম আর রাশিয়া ছাড়া অন্য কোনও পরিসর এখানে ঠাঁই পায়নি। লেখাগুলি পড়তে পড়তে মনে হয় যেন একজন অপরিচিতা রমণী লেখকের সামনে নিজ সৌন্দর্য উন্মোচন করেছেন এবং লেখক বিনীতভাবে তা লিপিবদ্ধ করছেন।

যদি আমরা আলেকজান্ডার দুমার গল্পটি স্মরণ করি, যে তাঁকে করশিকা ভ্রমণের জন্য একটি বড় সংবাদপত্র বরাত দেয়, অবশ্য সেই ভ্রমণটি আদৌ সম্পন্ন হয়নি। তবে দুমা এত বড় লেখক ছিলেন যে তিনি ধারাবাহিকভাবে সেই ভ্রমণকাহিনি লিখে ফেলেন শুধুমাত্র নিজের পঠিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং তা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। অগ্নিকে আমরা এতটা দায়িত্ব দিতে পারব না। তবে অগ্নি, ইংরেজিতে যাকে বলে দুটি পংক্তির অভ্যন্তরস্থ সত্য, তা আবিষ্কার করেছেন। তিনি খবরের কাগজের জন্য খবরের কাগজের লেখা নিশ্চয়ই লিখেছেন, কিন্তু আমাদের জন্য থেকে গেছে কী করে শ্রীলঙ্কায় ডেলিপ্যাসেঞ্জারি সম্পন্ন হয়, কীভাবে ইথিওপিয়া মানুষ প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যামের সঙ্গে দরদাম করে দিনযাপন করে৷ দৈনন্দিনতাকে লেখক প্রত্যক্ষ করেন, আর এই দেখাগুলি এক সহজ আন্তরিকতা নিয়ে পাঠকের দরজায় কড়া নাড়ে। কারণ এই দেখার অধিকাংশ দেখাই আমরা দেখিনি।
সাধারণত বাঙালি কার্যোপলক্ষে বা উচ্চশিক্ষার তাগিদে উন্নত বিশ্বে যায়, ইংল্যান্ড আমেরিকা ফ্রান্স বা জার্মানি— এখানে তার গল্প নেই। এখানে যে শায়িত লেনিনের গল্প আছে, তাঁকে আমরা পাশ কাটিয়েও যেতে পারি, কিন্তু পাপুয়া নিউ গিনিতে রাষ্ট্রপতির সফরের অভিজ্ঞতা আমরা ভুলতে পারি না। বাংলাভাষায় এই ধরনের লেখা বাড়ন্ত। লেখক অগ্নি এটা সম্ভব করতে পেরেছেন তার কারণ ঘটনার অন্তরালে থাকা সৌন্দর্যের আঁচলগুলিকে তিনি দেখতে পেয়েছেন৷ আবার পাক-অধিকৃত কাশ্মিরে সন্ত্রাসবাদ দমন করার যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, লেখক তার মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন এক অদৃষ্টের পরিহাস৷ সাধারণ নাগরিকের বেড়ানোর আয়োজনে এত জটিলতা থাকে না। সেখানে ঝিলম নদী থাকে, সেখানে পাহাড়-সমতল থাকে, সুদৃশ্য স্থানের রোমান্টিক বর্ণনাও থাকে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘদিন নিছক বেড়ানোর গল্প আর নেই। তার একটা অন্যতম কারণ এই ডিজিটাল সভ্যতা। আমাদের হাতের মধ্যে এখন যে যন্ত্রটি রয়েছে, তার মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর যে-কোনও গন্তব্যে ভার্চুয়াল ভ্রমণ আজ আর অসম্ভব নয়। বস্তুত, পৃথিবীর কোনও শহরে আজ আমরা আর একা একা ঘুরে বেড়াতে পারি না। ডিজিটাল ফোনে লোকেশন আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী এবং এক হিসেবে অভিশাপ। পায়ে হেঁটে পৃথিবীর কোনও অচেনা শহরের অন্ত্র প্রথমবার আবিষ্কার করার অভিজ্ঞতা ও রোমাঞ্চ আজ আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। পৃথিবীর আর কোনও পর্বতশিখর, কোনও অরণ্য আর আমাদের অজানা নয়। তাই নতুন কোনও অজানাকে খুঁজে বার করতে গেলে আজ এমন লেখকের দরকার যিনি ভ্রমণের নিজস্ব প্রদেশ নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন।
অগ্নি সেই বিরল গোত্রের লেখক। তিনি তিনদিনের মধ্যে পাসপোর্ট তৈরি করে ফেলতে পারেন, তাঁর ভিসা ‘সাংবাদিক’ প্রকৃতির হওয়ায় তিনি দেশের রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হতে পারেন। কিন্তু শুধু যে তিনি সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করেন তা নয়, বিধিবিদ্ধ কাজের ফাঁকে কোন এক রহস্যে তিনি দেখে নেন জঙ্গল, পাহাড় অথবা সমুদ্রসৈকত, অথবা শহরের মধ্যে দিয়ে নদীর মতো বয়ে যাওয়া জনারণ্য, শহরের দারিদ্র্য এবং অভিনবত্ব। এই দেখা তাঁর মনের কুঠুরিতে জমা থাকে আমাদের জন্য৷ তাঁর বিনয় পরিস্ফুট হয় যখন তিনি নিজেকে কলমচি বলেন। আসলে তিনি কোনও সাধারণ কলমচি নয়, তিনি এক অনন্য দর্শক যিনি কাব্যাক্রান্ত। আমাদের সহসা মনে পড়ে, মেঘদূত আমাদের দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রেমের কাব্য, আসলে মহাকবি কালিদাসও তো এক অর্থে এক ভ্রমণকাহিনিই পেশ করেছিলেন, উজ্জয়িনী থেকে কৈলাস পর্যন্ত। অগ্নিও আমাদের সামনে এক সফরনামা উপস্থিত করেন, যেখানে অনেকগুলি দেশ তাঁদের গোপনীয়তার বাতাবরণ খুলে নিষিদ্ধ ঘুমের থেকে উঠে এসে আমাদের কাছে ধরা দেয়। শ্রীলঙ্কার প্রান্তিক শহরের আড্ডার গন্ধের সঙ্গে মিশে যায় ইথিওপিয়ার বনাঞ্চল। ঠিক যেমন, খাবার টেবিলে শামুকের সঙ্গে মেশে শ্বেত দ্রাক্ষারস। আমরা অবাক হয়ে দেখি, পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই মানুষ প্রায় একইরকম। তাদের কান্না, তাদের উল্লাস, তাদের প্রণয় ও তাদের উদ্বেগ, আশঙ্কা ও তাদের প্রত্যাশা, সব একইরকমের। ভাগ্যিস অগ্নির মতো লেখকেরা আছেন, তাই আমরা খবরের কাগজের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজস্ব মানসিক শান্তির তাঁবু খুলতে পারি।
রচিষ্ণু সান্যালের প্রচ্ছদ দৃষ্টিনন্দন ও কার্যোপযোগী। তিনি ভ্রমণের উড়ানের সঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছেন সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বীর কথা।

