রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত: এক পুথিনির্ভর আখ্যান, ইতিহাসও

সরফরাজ মল্লিক

 

খ্রিস্টীয় উনিশ শতকে মুসলিম বিশ্বে সংস্কার আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে— যাকে ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন বলা হয়। স্বাভাবিকভাবে ভারতবর্ষেও এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লাগে। এই আন্দোলন বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য-সহ পরিচালিত হয়। ভারতবর্ষের মধ্যে বিশেষত বাংলায় এই আন্দোলনের কৃষক চরিত্রটি ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলায় তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন জাঁকিয়ে বসেছে; প্রজাশোষণ চূড়ান্ত; কৃষকদের নাভিশ্বাস উঠছে— এমত অবস্থায় এই আন্দোলন মূলত ধর্মীয় আন্দোলন হলেও তা চরিত্র বদলে হয়ে ওঠে কোম্পানি-নীলকর-মহাজন-জমিদার বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন। বাংলায় এরকম দুটি মুখ্য আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ওয়াহাবি আন্দোলন ও ফরাজি আন্দোলন নামে; বঙ্গ-পশ্চিমে তিতুমীরের নেতৃত্বে চব্বিশ পরগনার বারাসাতকে কেন্দ্র করে ওয়াহাবি আন্দোলন এবং পূর্ব-বাংলায় ফরিদপুরকে কেন্দ্র করে হাজি শরিয়তউল্লাহ ও তাঁর পুত্র দুদু মিঞার নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন। দুঃখের বিষয় এই যে, তিতুমীরকে কেন্দ্র করে উভয় বাংলায় কিছু সাহিত্য রচনার প্রয়াস হলেও ফরাজি আন্দোলন বা তার কোনও চরিত্রকে কেন্দ্র করে সাহিত্যরচনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। সম্প্রতি (আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা, ২০২৫) ইসমাইল দরবেশ রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত লিখে সে অভাব পূর্ণ করেছেন বলা যায়। লেখকের প্রথম উপন্যাস তালাশনামা প্রখ্যাত অনুবাদক ভি রামাস্বামী কর্তৃক অনূদিত (Talashnama: The Quest) হয়ে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা হার্পার কলিন্স থেকে প্রকাশিত হওয়ায় ইসমাইল ইতোমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় একটি নাম। এটি তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস।

 

এক.

অভিযান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত উপন্যাসের সাব-টাইটেলে লেখা হয়েছে: ‘উনিশ শতকের ফরাজি আন্দোলনের পটভূমিতে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস।’ তবে ফরিদপুরকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে ফরাজি আন্দোলনের যে মূল ভূখণ্ড তাকে পরিহার করে এই আখ্যানকে লেখক স্থাপিত করেছেন বঙ্গ-পশ্চিমের হুগলি এবং তৎসংলগ্ন এলাকায়; সুন্দরবনের কথাও আছে একটা বড় অংশ জুড়ে। মনে রাখতে হবে এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়; ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস মাত্র। লেখক এই স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন সম্ভবত তাঁর পাঠকদের ভৌগোলিকতা বিচার করে; তাছাড়া ভূ-প্রাকৃতিক আবহ তৈরি করার ক্ষেত্রে চেনা অঞ্চল অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, লেখক সম্ভবত সে পথ গ্রহণ করেছেন। সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, পূর্বকথিত ওই সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে তিনটি প্রধান আন্দোলন, অর্থাৎ ওয়াহাবি আন্দোলন, ফরাজি আন্দোলন ও তরিকা-ই মোহাম্মদিয়া আন্দোলনের মধ্যে তফাত ছিল কার্যত খুবই কম। এই তিন পক্ষবাদীরাই আত্মশুদ্ধি তথা ধর্মসংস্কার এবং নীলকর-মহাজন-জমিদারদের অত্যাচার থেকে আর্থ-সামাজিক মুক্তির কথা বলেছেন; ফলে বাংলার নিচুতলার অত্যাচারিত মুসলমান কৃষক কে যে কোন্ মত মেনে চলত অনেক সময়ই তা বোঝার উপায় ছিল না।

বিশুদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে সাহিত্যের পার্থক্য আছে। সাহিত্য শুধু সাল, মাস, তারিখের বর্ণনা ও গণনা নয়। তার কাঠামোর গায়ে থাকে অনেক কাদামাটি, পোশাক, প্রসাধন। তবুও সাধারণ পাঠক অনেক সময়ই সাহিত্যের মাধ্যমে ইতিহাসপাঠে আগ্রহী হয়। কারণ ইতিহাসের তথ্যের ভার তাকে ক্লান্ত করে, সাহিত্য দেয় আরাম। শুধু তাই নয়, সাহিত্য সমাজিক কাঠামো ভেদ করে যতটা তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, ইতিহাস তা পারে না। আমাদের মনে পড়ে সমালোচক কথিত সেই বিখ্যাত উক্তি— “রাজা বিজয় কেতন উড়িয়ে বিজয়যাত্রায় বেরিয়েছেন, তাঁর লোকলস্কর, হাতি-ঘোড়া, সৈন্য-সামন্ত এসবের তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যাবে; কিন্তু তাঁর রথের চাকার তলায় পিষ্ট কৃষকের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে সাহিত্যে।” সাহিত্যিককেও তেমন সৎ থাকতে হয় হয় তথ্য ও উপাত্তের ব্যবহারে; তাঁকে হতে হয় সত্যদর্শী। তথ্য, তত্ত্ব ও কল্পনার মিশেলে তাঁকে গড়ে নিতে হয় পুরনো সময়কে। পাঠক তখন চোখের সামনেই দেখতে পান ব্যক্তি ছাড়িয়ে সমষ্টির অতীতকে। সেই কারণেই হয়তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ কিংবা ওপার বাংলার ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে লেখা কথাসাহিত্যগুলির এমন তুমুল জনপ্রিয়তা। ‘রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত’ উপন্যাসে আমরা কোম্পানিশাসনের অন্যতম ফল হিসেবে নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা, বিভিন্ন বন্দোবস্ত নীতির ফলস্বরূপ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া কৃষক, যারা মূলত মুসলমান— সেই নিম্নবর্গীয় কৃষিজীবী সমাজের এক মর্মন্তুদ অথচ বাস্তব অতীত চিত্র আমরা দেখতে পাই। অর্থাৎ ‘রথের চাকার তলায় পৃষ্ট কৃষকের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শোনা’ যায়। বলাবাহুল্য এই উপন্যাসটিরও পূর্বকথিত কথাসাহিত্যগুলির মতো জনপ্রিয়তা ও মান্যতাপ্রাপ্ত হওয়ার প্রায় সমস্ত গুণ আছে।

 

দুই.

উপন্যাসের গঠন-কাঠামোটি বেশ আকর্ষণীয়। মূল আখ্যানটি অতীতে স্থাপিত। হুগলি জেলার এক বড় জমিদার মিহিরচন্দ্র কুণ্ডুর এক ছোট তালুকদার ছিলেন ধর্মে মুসলমান। সেই সরকার ফয়জুদ্দিন তালুকদার ছিলেন কাব্যপ্রিয়। ওরশের মেলায় বসাতেন তিনি কবিগানের আসর। স্বপ্ন দেখতেন তাঁর নির্দেশে এমন এক মহাকাব্য রচিত হবে যা হয়ে উঠবে তাঁর বংশ আশরাফনামার স্মারক। পুতুলনাচ শিল্পী যুবক শের আলির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তিনি তাকে সেই মহার্ঘ্য পুথি লেখার দায়িত্ব দেন; নিয়োগ করেন তাঁর গোমস্তা হিসেবে। শের আলি বিভিন্ন ঘটনাপরম্পরায় যুক্ত হতে থাকে, তার বিরুদ্ধে ওঠে খুনের অভিযোগ, তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় উপন্যাসের মূল মহিলা চরিত্র মেহেরজানের জীবন বা বলা ভালো সে-ই জড়িয়ে যায় মেহেরজানের সঙ্গে; শের আলি হয়ে ওঠে বিদ্রোহী— জমিদারের বিরুদ্ধে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে, সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে। ফয়জুদ্দিন তালুকদারের মহিমাকীর্তনকারী, প্রায় দুশো বছর পুরনো, শের আলি লিখিত সেই পুথি থেকেই আবিষ্কৃত হয় উপন্যাসের এই মূল কাহিনি। আর, প্রায় দুশো বছর পুরনো, খণ্ডিত পুথি থেকে যে কথক (লেখক নিজেই) এই পূর্বোক্ত কাহিনিটি নির্মাণ করছেন সেই তিনিই আবার জড়িয়ে পড়েন ফয়জুদ্দিন তালুকদারের বর্তমান বংশধর নুরুদ্দিন তালুকদারের পারিবারিক আবর্তের বর্তমান স্রোতে— এই সমান্তরাল দ্বিতীয় কাহিনিটি যেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনীতির এক সটীক ধারাভাষ্য। এই যে আখ্যান বর্ণনার দ্বৈত-কথনরীতি, লেখক খুব সাফল্যের সঙ্গে তা প্রয়োগ করতে সফল হয়েছেন।

উপন্যাসের মূল অর্থাৎ প্রথম আখ্যানটিকে প্রত্যক্ষ রীতির (direct method) উপন্যাস বললে লঘু করা হয়। খণ্ডিত পুথির মধ্যে দিয়ে আখ্যান নির্মাণের আঙ্গিক উপন্যাসটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনা-ধারার মধ্যে ‘সালামত ফরাজি-ললিতা’ উপকাহিনির কথা আলাদা করে বলতেই হয়; কারণ উপকাহিনিটি শুধু আখ্যানটিকে গতি ও বিস্তার দিয়েছে তা-ই নয়; শের আলি ও মেহেরজানকে পরিণতি অভিমুখী করেছে। উপন্যাসের দ্বিতীয় অর্থাৎ সমসাময়িক আখ্যানটিতে কিছুটা আত্মকথনমূলক রীতির প্রয়োগ আছে। এই অংশটি তালাশনামা-র মতোই সমসাময়িক সময়ের সঠিক মুসলিম মানস।

 

তিন.

ঔপনিবেশিক বাংলায় ১৮৩৫ সালটি (খ্রিস্টাব্দ) খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দেরই ৭ মার্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফারসি-কে রাজভাষা থেকে সরিয়ে ইংরেজি-কে রাজভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য বিচারকার্যে তা কার্যকর হয় ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর। উপন্যাসের মূল কাহিনিটি অর্থাৎ পুথির কাহিনিটি এই পর্বে স্থাপিত। শের আলি তাঁর পুথির একবারে প্রথমে একটি অংশে লিখছেন:

বারোশও বেয়ালিশ সন আখেরি হিসেবে
দশমাস দশদিন হিসাবে ধরিবে।।
ঐ দিন লিখিলাম পুঁথির প্রথম
খোদায় মালুম কবে হইবে খতম।।

অর্থাৎ পুথিটি ১২৪২ বঙ্গাব্দে (বা ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ) লেখা শুরু হয় এবং শেষ হতে আরও দশ মাস, দশ দিন সময় লাগতে পারে। এই সময় পর্বে যদি আমরা ইতিহাসে ফিরে যাই, দেখতে পাব: ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশীর যুদ্ধ পেরিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন তখন বাংলায়; ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দের দুর্ভিক্ষ যাকে আমরা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলে চিনি তা আমরা পেরিয়ে এসেছি; বাংলার রাজধানী ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়েছে; এবং সর্বোপরি একেবারে গ্রামে-গঞ্জে কোম্পানির রাশ সর্বব্যাপী না-হলেও মোটামুটি কোম্পানির শাসন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে বলা যায়। এই সময় একদিকে হিন্দু ধর্ম-সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি কাজে অংশগ্রহণ করছিলেন; ইংরেজি শিখে, ব্যবসা করে, চাকরি করে বাবু সম্প্রদায়ে পরিগণিত হচ্ছিলেন। অন্যদিকে, প্রতিবেশী মুসলমান ধর্ম-সম্প্রদায়ের বড় অংশই ইংরেজ শাসন তখনও মানতে পারছিলেন না; ইংরেজদের শিক্ষা অর্থাৎ ইংরেজি ভাষার প্রতি তৈরি হয়েছিল চূড়ান্ত অবজ্ঞা ও অনীহা; তখনও তাঁরা খোয়াব দেখছিলেন ইংরেজ-শাসনমুক্ত মুসলমান দেশের। ফলত তাঁরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছিলেন এক অসম লড়াইয়ের। ওয়াহাবি আন্দোলন, ফরাজি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের এই রাজনৈতিক বাতাবরণ, যুগমানস এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়গত সংকটের চিত্র ঔপন্যাসিক খুবই সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা কিছু উদাহরণের আশ্রয় নিতে পারি।

যেমন— উপন্যাসের একটি অংশে ফরাজি মৌলবি ইবাদুল্লা সাহেবের সঙ্গে ইংরেজিশিক্ষিত উকিল বারি সাহেবের কথোপকথনের সময় যখন ইবাদুল্লা হিন্দু সম্প্রদায়ের ইংরেজদের শাসন সয়ে নেওয়ার কথা বলেন, তখন বারি সাহেবের মুখ থেকে ঔপন্যাসিক বলিয়ে নেন— “আমি কী চাইছি, এটা বড় কথা না। অনেক ভেবে দেখেছি, এইসব ছোটখাটো বিদ্রোহ দিয়ে হবে না। কিছুতেই না। আমাদের সম্মিলিত হতে হবে।… না, মেনে নিচ্ছে (ইংরেজ শাসন) না। মানতে বাধ্য হচ্ছে। আমার ধারণা তারা প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতি ভিতর থেকে শুরু হয়েছে। রামমোহনবাবুদের মতো মানুষেরা শুরুটা করে দিয়েছেন।” ইবাদুল্লা সাহেব আরও কঠোর শব্দে প্রতিবাদ করে কোম্পানির চাটুকারিতার প্রসঙ্গ তুললে লেখক আবারও তাঁর মুখ থেকে বলিয়ে নেন— “এখানেই তো দেখার প্রার্থক্য। আপনি দেখছেন চাটুকারিতা, আমি উপলব্ধি করছি সংগ্রামের পূর্বপ্রস্তুতি। তারা আপনাদের মতো করে ভাবছে না। তারা শক্তি সঞ্চয় করছে। যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি। শিক্ষা-দীক্ষায়, শাসনে-প্রশাসনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সব কিছুতেই নিজেদের আধিপত্য তৈরি করে চলেছে।” এ শুধু বারি সাহেবের বক্তব্যই নয়, লেখকের সার্থক ইতিহাসপাঠ ও যুগমানস পড়তে পারারও নজির।

আমাদের মনে রাখতে হবে, উপন্যাসের যে সময়পট তা কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণেরও কাল। ডিরোজিও-র নেতৃত্বে ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলন শুরু হয়েছে, রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, জমিদার দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং ব্রাহ্মসমাজের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেছেন, কিছুটা পরে একই কাজ করবেন তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও। উপন্যাসে জমিদার মিহিরচন্দ্র কুণ্ডুর উত্তরাধিকারী ভ্রাতুষ্পুত্র আবিরচন্দ্র এবং তার বন্ধু বিনোদবিহারীর কথোপকথনের একটা বড় অংশ জুড়ে আমরা হিন্দু-ব্রাহ্ম দ্বন্দ্বের একটা বিশ্বাসযোগ্য চিত্র দেখতে পাই। একটি অংশে বিনোদবিহারী বলে— “আবির, হয়তো আমি ইয়ংবেঙ্গলদের মতো খ্রিস্টান হয়ে যেতে পারতাম। সেটা যে হইনি— তার কারণ রামমোহনবাবুদের যুক্তি। আমি এখনও মনেপ্রাণে হিন্দু। তোমাদের জেদ, তোমাদের গোঁড়ামি, আর অযৌক্তিক নীতি-নৈতিকতা থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্যই ব্রাহ্মসমাজের জন্ম।” এদের দুজনের কথোপকথনের বিভিন্ন অংশ থেকে এরকম বহু উদ্ধৃতিই আমরা আমাদের বক্তব্যের সমর্থনে ব্যবহার করতে পারি।

আবার মুসলমান সমাজের আশরাফ-আতরফ দ্বন্দ্বেরও সঠিক চিত্রায়ণও দেখি উপন্যাসে যখন লেখক লেখেন— “নিমতাডাঙার মানুষেরা অভিজাত।… নিমতাডাঙার অধিকাংশ অধিবাসী হলেন আয়মাদার। তাদের ভাষায় থাকে ভদ্রতা, ব্যবহারে থাকে শিষ্টতা। মেয়েরা থাকে পর্দার অন্তরালে। বাকি কয়েকঘর মুসলমান বটে, তবে তারা চাষাভুষো। আতরাফ মানুষ। নিম্নবর্গের হিন্দু অথবা বৌদ্ধ থেকে কোনও এককালে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। ছোটলোক তারা। বাংলার প্রান্ত-প্রান্তরে তারাই অবশ্য মূলনিবাসী। বাংলার বুকে মুসলমানের সংখ্যাধিক্য তৈরি করেছে এরাই। বিশুদ্ধ ইসলাম নয়, এ দেশের মাটিতে নানান আচার, বিশ্বাস, সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে ওঠা অনন্য এক ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই শ্রেণির মধ্যে। একটি অলিখিত বৈষম্য দেখা দিয়েছিল সমাজে। এই শ্রেণিভেদ ইসলামে নেই, কিন্তু সমাজের কলেবরে ফল্গুধারার মতো মানুষের মনে মনে প্রবাহিত হয়ে আসছে বহুকাল যাবৎ। আতরফ থেকে আশরফ হয়ে ওঠা খুব কঠিন ছিল না অবশ্য।” কঠিন কথাকে সহজ করে বলতে পারার এরকম সহজাত প্রবণতা আমরা উপন্যাস জুড়েই অবশ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখি। তাই আরও বিভিন্ন বিষয়ের উপর এরকম উদাহরণ দিয়ে বিষয়টিকে ক্লান্তিকর না-করে আমরা বরং অন্য আলোচনায় যাব।

 

চার.

‘পুথি সাহিত্য’ প্রাচীন ও বিশেষত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এগুলো হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি আকারে তালপাতা বা কাপড়ে সংরক্ষিত হত এবং সাধারণত পুঁথি আকারে পাঠ করা হত। যারা পাঠ করত তাদের বলা হত গায়েন বা পাঠক। ঐতিহাসিক কাহিনি, ধর্মীয় উপাখ্যান, প্রণয়োপাখ্যান ইত্যাদি বিভিন্ন কাহিনি নিয়ে রচিত হত পুথি সাহিত্য। রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত উপন্যাসের মূল কাহিনিটিকে লেখক এরকম একটি আদলের মধ্যে দিয়ে বর্ণনা করেছেন। পুথিটি নুরুদ্দিন তালুকদারের বাড়ির ‘বেশ পুরানো মজবুত আবলুসকাঠের তৈরি সিন্দুক’ থেকে আবিষ্কৃত হয়। পুথিটির লেখক নুরুদ্দিনের পূর্বপুরুষ ফয়জুদ্দিন তালুকদারের গোমস্তা শের আলি। তুলট কাগজে ভুসোকালি দিয়ে হাতে লেখা পুথি। দ্বিপদী ও ত্রিপদী পঁয়ারে লেখা। প্রায় দুশো বছর পর উদ্ধার হওয়া পুথির কিছু পাতা এলোমেলো, অবিন্যস্ত, কখনও-বা কিছু পাতা ছেঁড়া, অর্থাৎ পুথিটি খণ্ডিত বলা যায়— এইরকম একটি পুথি থেকে আখ্যানের কথককে (লেখক নিজেই) তাঁর অনুমান ও কল্পনার উপর ভিত্তি করে পুরো কাহিনিটি নির্মাণ করতে করতে পাঠককে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হয়। কিন্তু যেহেতু সূত্রধরের কাজটি করছে পুথি, ফলত লেখককে পুথিটির ভাষানির্মাণে বেশ সচেতন থাকতে হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই সময়কাল ছিল পুথি সাহিত্য রচনার অন্তিম যুগ।

ওয়াজির আলি লিখিত মুসলিম রত্নহার ফরাজিদের জীবনী-সম্বলিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পুথি। দুদু মিঞার অনুগামীদের দ্বারা পূর্ববঙ্গের অত্যাচারী নীলকর ইংরেজ ডানলপের কুঠি ও তার গোমস্তা কাঞ্জিলালকে আক্রমণ করার ব্যাপারে উক্ত পুথিতে লেখা হয়েছে—

ফরিদপুর জিলাধীন পাঁচচর পর।
***
উৎপীড়ন করিত বর মোসলমান পর।।
একদিন মিয়ার শিষ্য কাদের বক্স জান।
দুদু মিয়ার এসারায় লিয়া সুবিদান।
বেইমানের তরে সবে মারিয়া ফেলিল।

অন্যদিকে বর্তমান উপন্যাসেও আমরা একজন কৃষক-উৎপীড়ক ইংরেজ নীলকরের সন্ধান পাই, যার নাম ড্যানিয়েল। সে মেহেরজানের সর্বনাশের মূল হোতা, তার পিতার হত্যাকারী। সালামত ফরাজি, শের আলি কর্তৃক নীলকুঠি আক্রমণের বর্ণনাটি এরকম—

সালামত মিয়াঁ ভাই ভুলিব না তায়
তামাম কৃষককুল রাখিনু মাথায়।।
পুনরায় দেখিনু এক রণাঙ্গনী খেল
নিপাত হইল হাতে সাহেব দানিয়েল।।

উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে লেখক বেশ সচেতন থেকেছেন বলা চলে; এবং চরিত্রের উপযুক্ত মুখের ভাষা ব্যবহার করেছেন। এ ব্যাপারে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় উপন্যাসের নায়িকা চরিত্র মেহেরজানের কথা। মেহেরজান আশরাফ বংশের মুসলমান এবং মনে রাখতে হবে তার বাবার আদি বাস উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে। ফলত লেখক উর্দুকে করেছেন তার (মেহেরজানের) মুখের ভাষা। যদিও দীর্ঘদিন বাংলায় থাকার ফলে সে (তাঁরা) বাংলা ভালো বোঝে। মেহেরজানের মুখে মাঝে মাঝে উর্দু শের-এর ব্যবহার চরিত্রটিকে মর্যাদাসম্পন্ন করেছে।

উপন্যাসের ভাষার ব্যাপারে বলতে গেলে অপর আর একটি বিষয়ের কথা অবশ্যই বলতে হয়, সেটি হল ফকির কাছেম শাহ-র মুখে যে গানগুলি লেখক ব্যবহার করেছেন। বাউল ফকিরদের গানে যে দর্শন, আত্মানুসন্ধান, মানবতাবাদের গভীর প্রকাশ আমরা লক্ষ করি সেই একই স্বাদ আমরা পাই ইসমাইলের লেখা, কাছেম শাহ-র মুখে বসানো গানে—

কোন রশিরে ধরিলে রে মন
দ্যাখবো খোদার সিংহাসন
ও মন সেই রশিটি দেখায়ে দে আমারে—
ছয় প্যাঁচেতে জড়ায়ে আছি
রশি হইল কঠিন কাছি
ও মন ছিন্ন হবে ক্যামনে বলো আমারে—

কিংবা যখন শের আলি কাছেম শাহ নাম ধারণ করে কলকাতায় আত্মগোপন করে অবস্থান করছিল তখন তাঁর মুখে বসানো গানেও এই গভীর দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সন্ধান আমরা পাই—

তুমি এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মস্বরূপ
আল্লা বলে ডাকি—
তোমার গুণেই গুণান্বিত
কেমনে দেব ফাঁকি— গো
আমার বুকেই আল্লা থাকে
আমার বুকেই আরশ— গো

এরকম অনেকগুলো গানের ব্যবহার এই উপন্যাসে আছে। এই গানগুলি থেকে ঔপন্যাসিক ইসমাইলের একটি সৃজনশীল কবি-মনের হদিস আমরা পাই।

 

পাঁচ.

আমরা এই আলোচনার প্রায় অন্তিম পর্যায়ে চলে এসেছি। ইসমাইলের প্রথম উপন্যাস যেহেতু জনপ্রিয় হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই উপন্যাসে কি লেখক তার প্রথম উপন্যাসকে ছাপিয়ে গেছেন? এক কথায় এর উত্তর হল— হ্যাঁ, রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত তালাশনামা-র চেয়ে উৎকৃষ্ট রচনা। তার একটা বড় কারণ হল, তালাশনামা মোটেও ত্রুটিমুক্ত উপন্যাস নয়। একটি বড় ত্রুটির বিষয় হল, রাজনৈতিক প্রসঙ্গের তথ্যগত অসঙ্গতি। তালাশনামা সমসাময়িক আখ্যান; সময়কাল মোটামুটি এ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের (২০১১) আগের এক দশক। উক্ত সময়ে রাজ্যে পঞ্চায়েত ভোট হয়েছে ২০০৩ ও ২০০৮ সালে এবং লোকসভা ভোট হয়েছে ২০০৪ ও ২০০৯ সালে। পালাবদল পরবর্তীতে পঞ্চায়েত ভোট ২০১৩ সালে এবং লোকসভা ভোট ২০১৪ সালে। এবং স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক সমীকরণ বিভিন্ন ভোটের সময় বিভিন্ন থেকেছে। কিন্তু সমস্যা হল উপন্যাসে রাজনৈতিক পালাবদলের আগের পঞ্চায়েত নির্বাচনের (স্বাভাবিকভাবেই ২০০৮) যে আবহ ও সমীকরণ দেখানো হয়েছে তা বাস্তবে ২০১৩ সালের। আবার পালাবদলের আগেই এ-রাজ্যে বিজেপির উত্থান ইত্যাদি দেখানো হচ্ছে, উপন্যাস অনুযায়ী তা ২০০৯ লোকসভা নির্বাচন হলেও বাস্তবে তা ২০১৪। ফলত উপন্যাসে ভোট-রাজনীতির প্রসঙ্গ থাকা জায়গাগুলোতে ঔপন্যাসিক যে আবহ তৈরি করেছেন, যে বর্ণনা দিয়েছেন সেখানেও অনেক গণ্ডগোল থেকে গেছে। জনপ্রিয় একটি উপন্যাস, যার একাধিক প্রিন্ট হয়েছে, অনুবাদ হয়েছে তারপরও তাতে কীভাবে এত ভুল রয়ে গেল এবং তা কারও চোখেও পড়ল না, তা আমাকে বেশ অবাকই করেছে বলব। তাছাড়া উক্ত উপন্যাসে লেখকের বর্ণনা যতটা সাবলীল, তাঁর দর্শন তত স্পষ্ট কিনা সে প্রশ্নও থেকে যায়।

বর্তমান উপন্যাস কিন্তু অনেক সফল উপন্যাস, প্রায় ত্রুটিমুক্ত। শুধুমাত্র একটি বিষয় নিয়েই বলার জায়গা আছে: ৫৬ পর্বে যখন শের আলি খাজনা আদায়ের গচ্ছিত অর্থ ও পুথি ফেরত দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে শেষবারের মতো ফয়জুদ্দিন তালুকদারের সঙ্গে দেখা করবে ঠিক করল। শের আলি প্রথমে সুলেমানের সঙ্গে দেখা করে মেহেরজানকে হাওয়ামহলে রেখে তালুকদার বাড়িতে প্রবেশ করে— ফয়জুদ্দিন না-থাকায় আম্মাজি হামিদাবানোর সঙ্গে কথা বলবে ঠিক করে— হামিদাবানো শের আলিকে দেখে মূর্ছা গেলেও বেশি সময় লাগে না স্বাভাবিক হতে। উল্টোদিকে সুলেমান পৌঁছে যায় আবিরচন্দ্রের কাছে— কাকা মিহিরচন্দ্রের হত্যাকারীর খবর পেয়ে আবিরচন্দ্র পেয়াদা, লাঠিয়াল নিয়ে সুফিপুরের তালুকদার বাড়ি আক্রমণ করে— এবং শের আলি শেষ পর্যন্ত বাঁচলেও, মেহেরজান ধরা পড়ে যায়। কিন্তু আমরা যদি একটু যুক্তির আশ্রয় নিই, দেখব, তালুকদারবাড়ি থেকে জমিদারবাড়ি যতই কম হোক কমপক্ষে পাঁচ-সাত মাইল হবে; তাছাড়া সুলেমানের কাছে ঘোড়াও ছিল না— এমতাবস্থায় পায়ে হেঁটে এত তাড়াতাড়ি জমিদার বাড়ি পৌঁছানো এবং দলবল নিয়ে ফিরে আসা কার্যত সম্ভব নয়। নাটকীয়তা ও আবহ তৈরি করা লেখকের এই উপন্যাসের অন্যতম ইউএসপি হলেও স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, এ পর্বে লেখক উপযুক্ত নাটকীয়তা ও আবহ তৈরিতে পারেননি। আবার একটু পরেই ৫৮ পর্বে হাওয়াখানায় অবস্থিত মেহেরজান ধরা পড়ে যাচ্ছে এবং তার চিৎকার ও সাবধানবাণী তালুকদারবাড়ি থেকে শের আলি শুনতে পাচ্ছে— বিষয়টি অতিনাটকীয় মনে হয়। আখ্যান পরণতিতে পরিপক্কতার অভাব এবং তাড়াহুড়োর ছাপ বেশ স্পষ্ট। লেখকের প্রথম উপন্যাসের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি প্রকট।

এই সামান্য ত্রুটি ব্যতিরেকে রাঁড়িদিঘির বৃত্তান্ত-কে একটি অসাধারণ উপন্যাস বলে গণ্য করা যায়। ঊনষাট পর্বে বিভক্ত, ৩৫২ পাতার এই আখ্যানটির স্থান ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস হিসেবে বাংলা সাহিত্যে পাকাই বলতে হয়!

 

গ্রন্থ ঋণ:

  1. সাহিত্যকোষ : কথাসাহিত্য, সম্পা— অলোক রায়; সাহিত্যলোক।
  2. বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস— মুঈন উদ-দীন আহমদ খান; অনুবাদ— গোলাম কিবরিয়া ভুঁইয়া; বাংলা একাডেমী ঢাকা।
  3. তালাশনামা— ইসমাইল দরবেশ; অভিযান।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5245 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...