ছোট ডাক্তার, বড় লড়াই

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 

কখনও কখনও একজন মানুষের মাটি কামড়ে দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের কথা অন্যদের কাছে খুব বড় প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর সাফল্যের পথে পা মিলিয়ে হাঁটতে চায় অনেক দূরের পথ। নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য যে মানুষটি নিজের সমস্ত শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে উঠতে পারেননিজের দৃঢ়তায়, তাঁকে কুর্নিশ জানিয়েই শুরু করি আজকের ভালো খবর।

মানুষটির নাম গণেশ বরাইয়া (Ganesh Baraiya)। ভুল করলাম একটু— ডাঃ গণেশ বরাইয়া। ভাবছেন তো, একজন এমবিবিএস ডাক্তারসাহেব সম্পর্কে কী এমন নতুন কথা বলব? একটু সবুর করুন।

এদেশে একটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথ পাড়ি দেওয়া যে খুব সহজ কাজ নয়, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। দূরের আকাশে উড়ান শুরুর আগেই ডানা ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়তে হয় কতশত মানুষকে। আমাদের এই কাহিনির নায়ক গণেশের জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল গুজরাতের ভাবনগর জেলার গোর্খি গ্রামের এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে। আমরা রূপকথার গল্পে সাতভাই চম্পার কথা পড়েছি— সাত-সাতটি ভাইয়ের একটি মাত্র আদরের বোন চম্পা। গণেশের বেলায় গল্পটা ঠিক উল্টো। অর্থাৎ সাত-সাতটি বোনের একমাত্র ভাই হল আমাদের কাহিনির নায়ক গণেশ বরাইয়া। মাথার ওপরে থাকা সাত দিদির আদরের ভাইটি সত্যিসত্যিই ছিল ছোট— জন্ম-ইস্তক গণেশের শরীর একদম ছয়ছোট্ট; পরিভাষায় আমরা যাকে বলি বামন বা ডোয়ার্ফ। গণেশ হল ঠিক তাই। চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় এমন শরীরী অবস্থাকে Locomotor Disability বলা হয়ে থাকে।

এমন ছোট চেহারার মানুষের কদর আছে সার্কাসের দলে। তাই সার্কাসদলের লোকজন গণেশকে ৫০০০০০ টাকার বিনিময়ে কিনে নিতে চেয়েছিল। মা আর দিদিরা আপত্তি জানিয়ে রুখে দিয়েছিল সেই অভিসন্ধি। আসলে এই অবস্থাকে পাশ কাটিয়েই ছোটখাটো কাঁচা গ্রামীণ বাড়িতে থাকা গণেশ খুব বড় একটা স্বপ্ন বুকে সযত্নে আগলে রাখতে শুরু করেছিল— ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে ওঠার স্বপ্ন। মাত্র তিন ফিট উচ্চতা আর ২০ কিলোগ্রাম ওজনের একজন মানুষের এমন ইচ্ছের কথা শুনে সবাই মুখ টিপে হেসে বলেছিল— “বামন হয়ে চাঁদ ধরতে চাইছে ছেলেটা!” বামনা বনিনে চান্দা পাকাড়বা মাঙ্গে ছে!

গণেশ বুঝতে পেরেছিল তাঁর লড়াইটা খুব সহজ হবে না। এ-কথা জেনেও সে নিজের সঙ্কল্প থেকে সরে আসেনি। ২০১৮ সালে NEET পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হল গণেশ। ৭২ শতাংশ বিশেষ শারীরিক ক্ষমতাসম্পন্ন একজন ছাত্রকে মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া এমবিবিএস ক্লাসে ভর্তি করার অনুমতি দেয়নি। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে এতটা শারীরিক বাধা নিয়ে গণেশের পক্ষে চিকিৎসকের কঠিন শ্রমসাধ্য কাজ করে ওঠা সম্ভব নয়।

মাথার ওপরে আকাশ ভেঙে পড়ল গণেশের। আবেদন-নিবেদনে কাজ হবে না জেনে বাড়ির সকলের পরামর্শে আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটার কথা স্থির করল গণেশ। কিন্তু লড়ব বললেই তো আর লড়াইয়ে নামা যায় না। তার জন্য চাই মানসিক ও আর্থিক সঙ্গতি। গণেশের সাধারণ কৃষক পিতার পক্ষে এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তাহলে উপায়? গণেশের লড়াই কি থেমে গেল?

কথায় বলে, সৎ, লড়াকু মানুষদের বোঝা নাকি ভগবান বয়। গণেশের পাশে ভগবান হয়ে হাজির হলেন ডাঃ দলপৎভাই কাটারিয়া— গণেশের স্কুলের প্রিন্সিপাল। তাঁর সহযোগিতায় গণেশ গুজরাত হাইকোর্টে এমসিআই-এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করল। হাইকোর্ট গণেশের আবেদন পত্রপাঠ খারিজ করে মেডিকেল কাউন্সিলের সিদ্ধান্তকেই মান্যতা দিল। মামলা গড়াল সুপ্রিম কোর্টে।

২০১৯ সালে গণেশ তখন বিএসসি পড়ছে। চার মাস ধরে সওয়াল-জবাব চলার পর ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টে বিচারের রায় প্রকাশ পেল। উচ্চতম আদালত তার রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে কেবলমাত্র বেঁটে হওয়ার কারণে কোনও মানুষকে তার অর্জিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। তা মেনে নিলে গণেশের সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হবে। অনতিবিলম্বে গণেশের ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আদালত কাউন্সিলকে নির্দেশ দেয়, এবং সেই মোতাবেক গণেশকে ভাবনগর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়।

জয়ী হল গণেশ। গণেশ বরাইয়া— দ্য ইনডমিটেবল ডোয়ার্ফ অফ ভাবনগর। কাঁচাবাড়ির বাসিন্দা পাকা লড়াইয়ের রাস্তা দেখাল অনেকের কাছে।

 

কেমন ছিল তার কলেজের দিনগুলো? হাইকোর্টের বিচারপতিরা আইনি লড়াইয়ের জটিল মারপ্যাঁচের কারণে গণেশের প্রতি বিমুখ হয়েছিলেন। তবে মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠী বন্ধুরা এবং মাননীয় চিকিৎসক-শিক্ষকেরা গণেশকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁদের আনুকূল্যে ক্লাসরুমে প্রথমদিকের বেঞ্চে তার আসন বাঁধা হয়ে যায়। অ্যানাটমির ক্লাসে প্রতিদিন গণেশকে কোলে তুলে নিয়ে অপারেশন টেবিলের খুঁটিনাটি সমস্ত কিছু দেখার সুযোগ করে দেওয়া হত।

এই প্রসঙ্গে গণেশের মন্তব্য—

আমার কলেজের সহপাঠী বন্ধু এবং অধ্যাপকদের জন্যই আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। তাঁরা আমার লড়াইয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাশে থেকে আমাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছেন। তাঁদের কাছে আমি ঋণী।

ইন্টার্নশিপের পর্ব মিটিয়ে গণেশ বরাইয়া গত ২৭ নভেম্বর, ২০২৫-এ ভাবনগরে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। কী ভাবছেন ডাঃ গণেশ বরাইয়ার রোগী-রোগিনীরা? তাঁরা কি মেনে নিয়েছেন এই ছোট্ট চেহারার মানুষটিকে তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্যের রক্ষক হিসেবে?

প্রথম প্রথম অন্য অনেকের মতো তাঁরাও খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন আমাকে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে। তবে আমার কঠিন লড়াইয়ের কথা শুনে তাঁরা সকলেই সানন্দে গ্রহণ করেন আমাকে। চিকিৎসকের শরীরী গঠনের চেয়েও চিকিৎসা যে অনেক বেশি জরুরি, তা বুঝতে পেরে তাঁরাই আমাকে এখন সাদরে গ্রহণ করেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমি তাঁদের বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছি। আমার রোগীরাও তাঁদের প্রাথমিক সঙ্কোচ বা দ্বিধাবোধ কাটিয়ে আমাকে গ্রহণ করেছেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

ডাঃ গণেশ বরাইয়া এখানেই থামতে চান না। তাঁর ইচ্ছা, এরপর পেডিয়াট্রিকস অথবা রেডিওলজিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হওয়ার। থাকতে চান তাঁর প্রিয় গ্রামেই, কেননা গ্রামের মানুষ এখনও বড় অসহায়— তাই একজন মানুষ হিসেবে তাঁদের পাশে থাকাটা খুব জরুরি।

ডাঃ গণেশের এই কাহিনি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রশংসা আর শুভেচ্ছার বন্যায় ভেসে যান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যেভাবে তিনি নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে সাফল্য ছিনিয়ে নিয়ে এসেছেন, তা এক বিরল ঘটনা। এর মধ্যেই গণেশকে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বা রোলমডেল হিসেবে মান্যতা দিয়েছে তাঁর ভক্তকুল। পাশাপাশি আমাদের আমলাতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থার সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও পিছপা হননি তাঁরা।

ডাঃ গণেশ বরাইয়া সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট চেহারার চিকিৎসক। একটি মাইলস্টোন এর মধ্যেই পেরিয়ে এসেছেন ডাঃ গণেশ। এবার আরও বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়তে হবে তাঁকে। তিনি মনেপ্রাণে প্রস্তুত রয়েছেন। আমরা তাঁর জন্য আমাদের শুভেচ্ছা পাঠিয়ে দিলাম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5245 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...