এবার বাঙালিকে পরীক্ষায় বসতে হবে

রেজাউল করীম

 



চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

ভারতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এক নব্য জমিদারশ্রেণির জন্ম দিয়েছিল যাকে Zamindar in absentia বলা হত। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর জীবনীতে সেই জমিদারির বর্ণনা দিয়েছেন। কীভাবে চাষি শোষিত হত তার মর্মস্পর্শী বিবরণ তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে চয়ন করেছিলেন। সুদূর কোন শহরে শিকড়হীন একদল ব্যবসায়ী, অর্থ আছে বলেই তারা জমির উপর দখলদারি কায়েম করেছে, কৃষকের ও কৃষির সমস্যা নিয়ে তাদের কোনও ধারণা ছিল না, মাথাব্যথাও ছিল না। জমি ছিল তাদের কাছে ব্যবসার অস্ত্র, অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। এ দেশের চাষির কাছে জমি হল মা জননী যিনি গর্ভধারিণীর মত শষ্য সম্পদের দ্বারা দেশের মানুষের মুখে অন্ন জোগান। যুগান্তরের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় না, চাষি দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয় অথচ মাকে সে ত্যাগ করতে পারে না। বরং তাকে আরও শস্যশ্যামলা করতে না পারার যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়।

জমি-ব্যবসার ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে অবিভক্ত বাংলার কৃষক সব সময় তৎপর থেকেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে স্বাধীনতার কাল পর্যন্ত বিস্তৃত সেই আন্দোলন ছিল অভূতপূর্ব, যা বাংলার কৃষিব্যবস্থার একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা যায়। গানে, নাটকে, চাষির স্মৃতিতে বার বার ফিরে ফিরে আসে সেই আন্দোলনের ইতিহাস।

সত্তরের দশকে মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও তামিলনাড়ুর কৃষক বিদ্রোহ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই কৃষক আন্দোলন ও চরিত্রগত দিক থেকে কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়াই। এই লড়াই সরকারি ক্ষমতার অলিন্দে কৃষকের পদচিহ্ন আঁকতে সাহায্য করেছে। যদিও শিল্প-পুঁজির রমরমার ফলে কৃষকের ভাগ্যে দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার শিঁকে ছেড়েনি ও কৃষিব্যবস্থা শিল্পের মর্যাদা লাভ করতে সমর্থ হয়নি, কিন্তু দেশের কয়েকটি বৃহৎ রাজ্যে এই আন্দোলনের ফলে “কৃষক নেতার” আবির্ভাব হয়েছে, তাদের কেউ কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কৃষকের কান্না, ঘাম, রক্তের ইতিহাস তবু পার্লামেন্টের চরিত্রগত পরিবর্তন করতে পারেনি। ব্যতিক্রম বোধহয় বাংলা ও পাঞ্জাব— সবুজ বিপ্লবের সুযোগ নিয়ে পাঞ্জাব কৃষকদের মধ্যে উচ্চবিত্তশ্রেণির জন্ম দিয়েছে, বাংলায় কৃষকের আন্দোলনের রেশ ধরে শাসকের পরিবর্তন হয়েছে।

কংগ্রেস সরকার মুক্ত অর্থনীতির নাম করে দেশে কর্পোরেট পুঁজির যে অবাধ আনাগোনা শুরু করিয়েছিল, মোদি জমানায় তাই বিকশিত বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। একসময় কেবল শিল্প-পুঁজির একচেটিয়া কারবার ছিল, এখন তা কৃষিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। কৃষকের সামনে এক অভূতপূর্ব সমস্যা তৈরি হয়েছে কারণ  সে জমি ও উৎপাদনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রাকলগ্নে উপস্থিত হয়েছে।

উৎপাদন-পছন্দ কোনওদিন ক্ষুদ্র ও মধ্যচাষির হাতে ছিল না। বাজারের কৃত্রিম চাহিদা কৃষির নিয়ন্ত্রক। দেশের ঐতিহ্যবাহী চাষের প্রণালী ও খাদ্যের চাহিদা এবং কৃষকের উৎপাদনের অভিমুখ সরকারের শ্রেণিচরিত্রের উপর নির্ভরশীল। ছোটচাষি তার প্রয়োজন অনুসারে চাষ করে ও উদ্বৃত্ত প্রায় থাকে না কিন্তু মধ্যচাষির কাছে তার উদ্বৃত্ত উৎপাদন বাজারজাত করার উপযুক্ত পরিকাঠামো দরকার। সেই পরিকাঠামো তৈরি করার সরকারি উদ্যোগ একদিকে যেমন অনুপস্থিত, অন্যদিকে মধ্যসত্ত্বভোগীরা চাষিদের তুলনায় ক্ষমতাবান। তাই, উৎপাদন ক্ষমতা চাষির হাতে থাকে না, বরং বাজারের পছন্দ তার উপর আরোপিত হয়। এই প্রসঙ্গে, বিটি-কটন চাষের কথা বলা যেতে পারে। বিটি তুলো পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর ও এর ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য শুধু নয়, কৃত্রিম উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের তুলো চাষের ভিত্তি ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। অথচ, ২০১৯ সালে সরকার রীতিমতো সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানায় যে, উৎপাদন বেড়ে ৩৪.৮৯ মিলিয়ন টন উৎপাদন করে তুলো চাষে বিপ্লব এনেছে। অথচ, তুলোচাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসতে চলেছে। পার্লামেন্টের ৩০১তম রিপোর্টে তুলোচাষিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরা হলেও তা মোদি সরকার মানতে চায়নি।

বিটি বেগুন সম্পর্কে একই কথা বলা চলে। বর্তমানে ভারত পৃথিবীর মোট উৎপাদনের 36 শতাংশ সরবরাহ করে ও প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ চাষির রুজিরোজগারের প্রাথমিক উপাদান। কিন্তু, বীজের উচ্চদাম, রাসায়নিকের প্রয়োগ ইত্যাদি কারণে চাষির লাভের বদলে ক্ষতি বেশি হয়েছে। পরিবেশগত ভারসাম্য ও নষ্ট হয়েছে।

এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, চাষি তার উৎপাদনের নিয়ন্ত্রক নয়, নিয়ন্ত্রণা করে দেশের সরকার। অথচ তাঁরা  চাষিদের সুরক্ষা, সম্পদ ও জীবনযাত্রা নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়। এর ফলে দেশের কৃষকের সামনে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

দেশের চাষিদের একটা বড় অংশ ঋণগ্রস্ত। উৎপাদনের জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হন। দক্ষিণ ভারতে উনবিংশ শতকে জমি বন্ধক দিয়ে চাষি তার উৎপাদনের খরচ জোগাত। এক চিরন্তন ঋণের ফাঁদে তার সারাজীবন কাটত কারণ উচ্চ চক্রবৃদ্ধি সুদ শোধ করা সম্ভবপর ছিল না। ক্ষুদ্র চাষিদের ঋণ, সমবায় ব্যাঙ্কের উদ্ভব ও চক্রবৃদ্ধি সুদের বিলোপ করলেও দেশের বৃহত্তর অংশের চাষি এখনও ঋণগ্রস্ত। ঋণের দায়ে চাষির আত্মহত্যা একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যথারীতি এই সমস্যা লঘু করে দেখালেও কেবলমাত্র ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ঘোষিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ, যদিও ডাঃ অশোক ধাওয়ালে উল্লেখ করেছেন যে, আসল মৃত্যু অন্তত এর পাঁচগুণ।

কৃষকের দুর্দশার জন্য ঋণ অন্যতম প্রধান কারণ, তার সঙ্গে যুক্ত হয় যন্ত্রপাতির অভাব, গুদাম ও সরবরাহ  ব্যবস্থার ঘাটতি ও সরকারের নিস্পৃহতা। ২০০৬ সালে সরকার চাষিদের ঋণ আংশিকভাবে মকুবের জন্য ১১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। মৃত চাষির পরিবার পিছু এক লক্ষ টাকার আর্থিক প্যাকেজও দেওয়া হয়। কিন্তু, কৃষি ঋণ মকুবের কার্যকরী কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেবলমাত্র আংশিক ঋণ শোধ করার জন্য সরকারের প্রয়োজন ছিল ৬৫৩০০ কোটি টাকা যা তারা কখনও বরাদ্দ করেনি। কমলনাথ সরকার ৪৮ লক্ষ চাষির কৃষিঋণ মকুবের শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসে। তার স্বল্পকালীন মুখ্যমন্ত্রিত্ব সময়ের মধ্যে কিছু চাষির ঋণ মকুব হলেও ৩৩ লক্ষ চাষি তা থেকে বঞ্চিত হয়। বিজেপি সরকার আসার ফলে যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ও আশার আলোক দেখা গিয়েছিল তাও অস্তমিত হয়। এই ব্যাপারে যোগী সরকার ও শিবরাজ সিং সরকারের নিস্পৃহতার উদাহরণ ভারতের ইতিহাসে বিরল। এমনও দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাত্র এক টাকা সরকারি অনুদান পেয়েছেন।

শস্যবিমার প্রসঙ্গেও একই কথা খাটে। বিদর্ভ এলাকার শুধু একটি জেলার হিসাব ডাঃ ধাওয়ালে দিয়েছেন। চাষি শস্যবিমা থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ৩০০ কোটি টাকা যেখানে সরকার বেসরকারি বীমা কোম্পানির জন্য  প্রিমিয়াম দিয়েছে পনেরো শত কোটি টাকা। বস্তুত সর ধরনের বিমার সরকারি টাকা হাত বদলে বৃহৎ পুঁজির কাছে যাওয়ার একটি সহজ পথ বললে অত্যুক্তি হয় না। সরকার সরাসরি কৃষকের কাছে অর্থ পৌছে দিলে এই ক্ষতি এড়ানো যেত। এরকম যে কোন পরিস্থিতিতে সরকার বলে থাকে যে কৃষি ঋণ মকুবের জন্য তাদের অর্থ নেই, আইনও নেই। অথচ, যে সরকার ৭০,০০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ মকুবের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খায় তারা বৃহৎ পুঁজির ঋণ মকুব করতে ১০ লক্ষ কোটি খরচ করতে পারে। সরকার অপরিমিত অর্থ ব্যয় করে মূর্তি, মন্দির, ভাস্কর্য বানাতে পারে। ভারতের বহির্দেশীয় ঋণও লাফিয়ে বেড়ে সর্বকালীন রেকর্ড ভেঙে ফেলে। কর্পোরেট পুঁজির বাড়বাড়ন্ত অথচ চাষি যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরে।

সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্রোতে সরকার বদল হয়েছে। বিদর্ভে ৫০,০০০ কৃষকের মিছিল গেছে মুম্বাইয়ে। পশ্চিমবঙ্গে কৃষি আন্দোলনের ঐতিহ্য আছে, অনেকটা ভূমিসংস্কার হয়েছে। কৃষকের সমস্যার রূপান্তর হয়েছে মাত্র, কিন্তু পুরোপুরি অবসান হয়নি। খাজনা মকুব করা হয়েছে, শস্যবিমা রয়েছে কিন্তু চাষি পুরোপুরি স্বনির্ভর হতে পারেনি। ঋণের জাল থেকেও পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কে ও চাষির ঋণ পেতে অসুবিধা হয়। কিন্তু তবু, এই রাজ্যের কৃষকের সমস্যা সমাধানে অন্তত সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, কর্নাটক ও মহারাষ্ট্র সরকার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে অনীহা দেখায়। কর্নাটকে ভোক্কালিগা ও লিঙ্গায়েত দুটিই শক্তিশালী কৃষক সম্প্রদায়। ক্ষমতা তাদের হাতে। অথচ, সরকারি মতে ৩৫০০ কৃষক আত্মহত্যা করেছে গত কয়েক বছরে। কৃষিক্ষেত্রে যন্ত্রের প্রয়োগ হয়নি, পণ্য বাজারজাত করার ব্যবস্থা নেই, গুদামের অভাব আছে, যথাযথ যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই ও সবচেয়ে বড় কথা হল কৃষিক্ষেত্রে সরকারি পুঁজি বিনিয়োগ হয়নি। কৃষক মূলত ঋণের উপর নির্ভরশীল। দেশের অন্যত্র এই সব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় বন্যা ও খরা। মহারাষ্ট্রে খরার কবলে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হচ্ছে অথচ সেখানে কৃষক নেতারা রাজ্যের কর্ণধার।

মোদি সরকারের নীতি অবশ্য সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। সরকার চলছে বৃহৎ পুঁজির অঙ্গুলিহেলনে। একের পর এক আইন সংশোধন করে মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে এই সরকার সিদ্ধহস্ত। অসমে ১৯ লক্ষ মানুষকে দেশছাড়া করার চক্রান্ত, এনআরসির মত অনাবশ্যক আইন প্রণয়ন, দেশে অপবৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি আমদানি, একের পর এক সরকারি মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া— এই সরকারের সীমাহীন নির্বুদ্ধিতার তালিকা অন্তহীন। কৃষিক্ষেত্রকে বৃহৎ পুঁজির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য বর্তমান আইন তাই তেমন বিস্ময়কর নয়।

কৃষিক্ষেত্রে ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ তুলে দেওয়ার আগে জমির ঊধ্বর্সীমা আইনের পরিবর্তন করা হয়েছে বেশিরভাগ রাজ্যে। গোদি মিডিয়া লিখছে দেশের জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন আরও ‘যুগোপযোগী’ করতে হবে। কারণ, ছোট ছোট জমি চাষের জন্য যথেষ্ট অনুকূল নয়।

চাষির হাত থেকে কর্পোরেট পুঁজির কাছে জমি হস্তান্তর সরাসরি সম্ভব নয় বুঝে এমন আইন বানানো হয়েছে যে, চাষি তার পণ্য বৃহৎ পুঁজির কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হবে। চাষি তার পণ্যের দাম নির্ধারণ, এমনকি পণ্য উৎপাদনের স্বাধীনতা হারাবে। পণ্য ঘরে তোলার মরসুমে অল্প দামে সে বিক্রি করে প্রয়োজনের সময় বেশি দামে কিনতে বাধ্য হবে। সব্জি মণ্ডি গুলি শ্মশানে পরিণত হবে, তার জায়গায় গড়ে উঠবে দেশের আসল মালিক আম্বানি-আদানিদের গুদাম। সেগুলি উপচে পড়বে স্বল্পমূল্যের শস্যে। এই আইন পাশ করতে সরকার যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল তার প্রমাণ শুধু কয়েকটি মারক আইন পাশ করার জন্য পার্লামেন্টের স্বল্পকালীন অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। যে সরকার মহামারির ভয় দেখিয়ে পার্লামেন্ট ডাকার সাহস দেখায়নি তারা অধিবেশন ডাকল ও রাজ্যসভায় গায়ের জোরে আইন পাশ হলো। বিরোধী নেতার ডিভিশনের দাবী অগ্রাহ্য করে সংখ্যালঘুর ধ্বনিভোটে আইন পাশ হয়ে গেল।

সংসদীয় সংস্কৃতি অনুসারে এই বিল সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো উচিত ছিল, উচিত ছিল সব পক্ষের, বিশেষত কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে এইরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা। অথচ, সংসদীয় রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আইন পাশ করিয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলছেন: এই আইন চাষিদের সমৃদ্ধি আনবে চাষিরা সেটা বুঝতে পারছে না। ভণ্ড রাজনৈতিক নেতা গুজরাটে চলে গেলেন চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করতে যখন প্রায় ২২ দিন ধরে আড়াই লক্ষ চাষি দিল্লিতে ধরনা দিচ্ছে।

এই আইন চাষিদের বৃহৎ পুঁজির দালালে পরিণত করবে, চাষিরা চুক্তিচাষের মাধ্যমে নিজের জমির অধিকার পরোক্ষে বৃহৎ পুঁজির কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য হবে। তার প্রমাণও মিলছে সর্বত্র। আইন পাশ হওয়ার আগেই দেশজুড়ে আম্বানি ও আদানিদের গুদাম তৈরি হয়েছে। এফসিআই-এর পরিচালন ব্যবস্থাও অনেক জায়গায় এমনকি আদানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চাষিদের সংগ্রাম আর নেহাত ক্ষুদ্র প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন গণ আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। যে সরকার হিন্দু-মুসলিম লড়াই লাগিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায় তারা তাদের মনগড়া তত্ত্ব দিয়ে বিভাজন করতে সমর্থ হয়নি। খালিস্তানি, পাকিস্তানি নানা বিশেষণে তাদের ভূষিত করার প্রক্রিয়া জারি আছে। তবু পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ুর পথে প্রান্তরে সেই আন্দোলনের আঁচ পৌছেছে। কমল হাসান কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, মহেন্দ্র সিং টিকায়েত এই আইনের বিরুদ্ধে ধর্নায় যোগ দিয়েছেন আর পাঞ্জাবে গায়ক থেকে খেলোয়াড় সবাই এই আইনের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াই করছেন। মোদি সরকারের ধ্বংসাত্মক নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ইতিমধ্যে ২০ জন কৃষকের প্রাণ গেছে। অবশ্য সেটা নিয়ে অমিত শাহদের হেলদোল নেই। ডিমনিটাইজেশনের সময় একশো সাত জনের মৃত্যু হয়েছে, এনআরসি-বিরোধী আন্দোলনে একশো পঞ্চাশ জন মারা গেছেন, লক ডাউনে ৭০০ জন মারা গেছেন। মোদি সরকারের কাছে এই মৃত্যু কোল্যাটারাল ড্যামেজ ছাড়া কিছু নয়। যেনতেনপ্রকারেণ দেশকে কালা-রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া তারা অব্যাহত রেখেছে।

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনে বিভেদকামী শক্তি একরকম সক্রিয়। বিগত নির্বাচনে বামশক্তির ক্ষয়ে সেই শক্তির সক্রিয়তা আরও বেড়েছে। শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার চাহিদার বিষয়গুলিকে সামনে রেখে ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য তৈরি করা প্রয়োজন। বাঙালি সারা ভারতকে পথ দেখায়। আজ বাঙালির সামনে এসেছে চরম পরীক্ষার দিন। ক্ষুদ্র রাজনীতি বনাম মানবতার জয়গান— এক পক্ষে দাঁড়াতে হবে। ঘোষিত বামপন্থা ক্রমে ক্রমে সাম্প্রদায়িক শক্তির দোসরে যেন পরিণত না হয়, সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার নিঃশব্দ কলরোলে কোনও কোনও বাম দলের অধঃপতন ঠেকানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বিহারের নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিরোধী ঐক্যের যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার। সিপিআই (এম-এল) দল ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সাফল্য সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরও মরিয়া করে তুলেছে। সেই শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্য সুদৃঢ় না করতে পারলে সারা দেশ জুড়ে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী শক্তি ঘাঁটি গেড়ে বসবে।

সব প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের এখন আত্মসমালোচনার সময়, সময় হল মানুষের ঐক্য সুদৃঢ় করার। পাঞ্জাব পথ দেখিয়েছে, বিহার পথ দেখিয়েছে, বাঙালি কি শিখবে?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...