নিজের দেশ, নিজের দাবি— সাড্ডা হক

রূপ বিশ্বাস

 



ছাত্র, গদ্যকার

 

 

 

ভাবনার ভেতর কাঁটাতার, কাঁটাতার দেশের ভেতর। ‘At the stroke of the midnight hour, when the world sleeps, India will awake to life and freedom’। ভারতবর্ষ। সাতচল্লিশ। রণরক্তসফলতা। ইতিহাস। রক্তক্ষরণ। যুদ্ধ। তলোয়ার। গানপয়েন্ট। আমাদের ম্যাপ রোজ ছোট হয়ে আসে। আমাদের দেশের এই চূড়ান্ত লড়াইয়ের ঈর্ষণীয় ইতিহাস আমাদের শিখিয়ে গিয়েছে শাসকের চোখে চোখ রাখতে। শিখিয়ে গিয়েছে ক্ষমতার বেয়নেটের সামনে খালি বুক রেখে কথা বলার কথা। শিখিয়ে গিয়েছে বিপ্লবের কথা। রেভলিউশন। এই ব্যাপারটা চিরকালই পীড়াদায়ক, সমস্যার— তা সামাজিক অ্যাসথেটিক্সকে ঘেঁটে দেয়, ঘেঁটে দেয় রাজনৈতিক পাওয়ার-পলিটিক্স, ঘেঁটে দেয় নিশ্চিন্ত নিরাপদ বুর্জোয়া জীবনশৈলী।

২০২০-২১এর কৃষক সংগ্রাম মনে করিয়ে দেয় সেই কথা। এমএসপি। ক্যাপিটালাইজেশন। আদানি আম্বানি। একসঙ্গে এত মানুষ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করছে। ভয়ডরহীন প্রশ্ন ছুড়ছে। আঙুল তুলছে। সদর্পে। চাইছে উত্তর। দিল্লিতে শীত নেমে আসছে রাত্রে, তাঁরা হাত রুটি খেয়ে জবুথবু বসে আছেন। বসে আছেন কোনওক্রমে। কম্বল। দুচারটে মোটা জামা। আর আছে ওম। মানুষের। সংগ্রামের। জেদের। তেতে উঠছেন। দারুণ এ শীতে যেন এঁরা সকলেই স্বয়ং আগুন। এ জীবন পুণ্য করো। রবীন্দ্রনাথ। ইতিহাস। ছোটবেলা। বহু নোটস। সিপাহী বিদ্রোহ, বিধবা বিবাহ, জালিয়ানওয়ালাবাগ, ভারত ছাড়ো, নৌবিদ্রোহ, তিয়েয়ানমেন স্কোয়ার, ভিয়েতনাম। তোমার নাম — আমার নাম। আহা, কলকাতা, প্রশ্ন করো!

ফিরে আসি। উল্টোদিকের ন্যারেটিভ চলছে দুদ্দাড়িয়ে। এঁরা কৃষক নন। এঁরা কৃষক হলেও, এঁদের অর্থাভাব নেই। এঁদের প্রচুর জমি। এবং টুইটার। তবে ভিত্তিহীন এই সমস্ত বক্তব্যের আড়ালে পাহাড়প্রমাণ অন্তঃসারশূন্যতা ঢেকে রাখা যে আর যাচ্ছে না মিত্রোঁ। বারবার বেরিয়ে পড়ছে দাঁত নখ। রাষ্ট্রের। কামড়ে ধরতে চাইছে আলগা হয়ে যাওয়া সব কিছু। যদি ধরেও নিই এই সমস্ত ন্যারেটিভ সত্য, তবুও এই দাবিগুলো যে ধূলিসাৎ হয়ে যায় না। দাবিগুলো জলজ্যান্ত বাস্তব। নয়া-সামন্তবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা যেন চলছে দারুণ। আর দাবিগুলো ধূলিসাৎ হয় না বলেই, সরকার বাধ্য হয় আলোচনায়। আলোচনার পর আলোচনায়। আলোচনার পর আলোচনায়। সমাধান মেলে না। রাষ্ট্র ভুলে যায় মানুষ, ভুলে যায় দারিদ্র্য, ভুলে যায় মানবতা। যন্ত্রসম। রাষ্ট্রদম্ভ— অনড়। অনড় এঁরাও যারা বানান রাষ্ট্র। ভুলে যাই কেমন করে, রোদ ঝড় জল এড়িয়ে ভোট দিয়ে এঁরাই বানিয়েছেন সরকার। সেই রোদ ঝড় জল শীত ব্যারিকেড সব এড়িয়ে এখন এঁরাই ছুড়ে দিচ্ছেন প্রশ্ন। জানাচ্ছেন দাবি। আইন ফেরত নেওয়ার দাবি। মনে করিয়ে দিচ্ছেন গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে মানুষ – জনমত, কোনও রাজনৈতিক দল নয়।

মজার ঘটনা হল অন্যদিকে আদালত কৃষি আইনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে স্থগিতাদেশ। কৃষি আইন সাময়িক আটকে গেলেও আন্দোলন আটকে থাকবে না। অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? আন্দোলনকারীরা সকলেই জানেন, রাষ্ট্র কী? সুযোগ পেলে কখন কোন বিল/কোন আইন কিভাবে ঘাড়ে চেপে যাবে তা নিয়ে সকলেই ওয়াকিবহাল। তাই যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ… প্রাণপণে…। বিল তুলে নেওয়া পর্যন্ত এঁরা আছেন। পাশাপাশি। হাত হাত রেখে। একের জন্য। অপরের জন্য। সকলের জন্য। ইজ্জতের জন্য। সে যতই কাঁটা বিছিয়ে রাখো। কাস্তের জোর আলাদা। সকল কাঁটা ধন্য করে, ফুল এঁরা ফুটিয়েই ছাড়বেন।

মফস্বলে বসে দেখছি। ইন্টারনেট। ভেসে আসছে ছবি। ভেসে আসছে খবর। দাঁতে দাঁত চেপে মাটি কামড়ে থাকার। তেরঙ্গা হাতে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকার। শিরদাঁড়া বেয়ে চোরা স্রোত নেমে এল এই। পাগলপারা। ভালো লাগছে মানুষ। ভালো লাগছে একসঙ্গে এত হাত। অবিন্যস্ত অথচ সংঘবদ্ধ। গাজিপুর, সিঙ্ঘু, টিকরি। রাজধানী আলোকিত। রাজধানী উদ্দাম ভেসে যাচ্ছে। আহাহা, গণতন্ত্র, ইউ বিউটি। সব পথ এসে মিলে গেল শেষে। আরও মানুষ। কাতারে কাতারে। এদেশ। অন্যদেশ। লড়াই। লড়াই। দিন থেকে রাত— রাত থেকে দিন। ইনকিলাব। নিজের দেশ, নিজের দাবি। সাড্ডা হক …

তানাশাহি নহি চলেগি… ‘Rage, rage against the dying of the light’। এই লড়াইটা প্রতীকী। এটা আমার-আপনার লড়াই। ঠিক যে দাবিগুলো মনের মাঝে, তবু মুখ ফুটে বেরোয় না, যে দাবিগুলো ইউপি-র প্রত্যন্ত গ্রামের কোন টালির চালের বাড়িতে জ্বলে থাকা একমাত্র পিদিমের সামনে ভোর হতেই নিভে গেল, যে দাবিগুলো রোজ রোজ ট্রেনের কামরায়, যে দাবিগুলো প্রতিদিন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, যে দাবিগুলো শহরের পথে পথে, যে দাবিখানি কর্মহীন শিক্ষিতের, যে দাবি শ্রমিকের, যে দাবি সাধারণের— তার প্রতীকী। তাই দূর থেকে চেয়ে থাকলে শাসকের ডর হয়।

কাস্তে। ট্র্যাক্টর। লাঙল। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কাঁধে কাঁধ, ব্যারিকেড, লড়াই। বিদ্রোহ। দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ। শাশ্বত। ঐতিহাসিক …

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...