ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় নতুন বাঁক: আদালতে পেশ করা নথি নিয়ে প্রশ্ন

শান্ত মিত্র

 

সমাজভাবুক; পেশায় করণিক

ভারতের আদিবাসী-মূলবাসী মানুষরা আদিকাল থেকে উচ্চবর্ণের মানুষদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছেন, উচ্ছেদ হয়েছেন, আজও হচ্ছেন তাঁদের ভিটে মাটি থেকে এবং ভারত সরকার যতদিন তাদের বর্তমান উন্নয়নের মডেল অনুসরণ করবে, ততদিন তাঁরা তাঁদের বাসস্থান থেকে নিয়মিতভাবে উচ্ছেদ হবেন। এইসব মানুষদের প্রান্তিক করে তোলার যাবতীয় আয়োজন করেছে বিশ্বায়নের এই রণহুঙ্কার। তাঁদের রুটি-রুজির ওপর হিংস্র আক্রমণের মোকাবেলা করার জন্য এই মানুষরা তীব্র সংগঠিত আন্দোলন শুরু করেন যা ধীরে ধীরে এক সর্বভারতীয় রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিক্ষোভের প্রচণ্ডতায় ভীত হয়ে এই নিখিল ভারতীয় জনজাগরণকে প্রতিহত করার জন্য সরকারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে এই আন্দোলন আসলে “দেশের পক্ষে বিপদের কারণ”, এই ধারণা জনমনে গেঁথে দেওয়ার একটি ছুতো, যার ওপর নির্ভর করে সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তার অত্যাচারের স্টিম-রোলার চালানোর প্রয়োজনীয় সামাজিক মান্যতা নির্মাণ  করবে। ২০১৮-র ভীমা-কোরেগাঁও-এ দলিতদের জমায়েত যেহেতু সরকারের কাছে এক জবরদস্ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল, তাই এই আন্দোলনকে সরকার তার বিরুদ্ধে এক নিখিল ভারতীয় চক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরে।

এই কাজ করার জন্য সরকার চেষ্টা করে এই বিষয়গুলি প্রতিষ্ঠা করতে: ১) “মাওবাদী সন্ত্রাসীরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত জনপ্রিয় সরকারকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করতে চায়”, ২) তাদের এই “অগণতান্ত্রিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য তারা একদিকে অরণ্যে বসবাসকারী দলিত-আদিবাসীদের উস্কানি দিয়ে তাদের সরকার বিরোধী আন্দোলনে সামিল করছে, অন্যদিকে সরকার উচ্ছেদের মাওবাদী প্রকল্পকে মদত দেওয়ার অভিপ্রায়ে তারা ভারতের আধুনিক শহরগুলোতে “আরবান নকশালপন্থীদের” জড়ো করছে, ৩) সরকার-পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে এই “মাওবাদীরা দেশদ্রোহী শিক্ষকদের” গবেষণা করার ছুতোয় আদিবাসীদের সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে পাঠাচ্ছে, সাংস্কৃতিক কাজের নামে “মাওবাদী নৈরাজ্যকে” সমর্থন ও মান্যতা দিচ্ছে এবং ৪) আইনি সাহায্যের নামে বিচারব্যবস্থাকে অন্তর্ঘাত করছে এবং এই সব দেশদ্রোহীদের “আইনি শাস্তির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসছে।” এই চতুর্মুখী “আক্রমণ”-এর মূল লক্ষ্য, “আমাদের সকলের প্রিয় মাননীয়” প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি-কে হত্যার “ষড়যন্ত্র”!!

ঠিক এই কারণেই ভীমা-কোরেগাঁও মামলার সূত্রে প্রথম যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁদের পুনেতে দাখিল করা জমায়েতের “হাঙ্গামা” সংক্রান্ত বিষয়ে “জিজ্ঞাসাবাদ”-এর নামে ডেকে নিয়ে গিয়ে আচমকা এই “নিখিল ভারত চক্রান্ত মামলা” খাড়া করে তাঁদের সেই মামলায় সামিল করা হয়। মনে রাখা দরকার মামলাটা ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারিতে ঘটা একটা অনুমতি নেওয়া মিছিল এবং মিলিন্দ একবোটে ও শম্ভাজি ভিদে নামক দুই হিন্দুত্ববাদী গুন্ডার হামলা সংক্রান্ত মামলা।

একের পর এক অসম্ভব সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে “সর্বভারতীয় চক্রান্ত”-র যে মামলাটি এনআইএ দায়ের করেছে, সেই আজগুবি মামলাটি নির্মাণে ভারত সরকার যে ইজরায়েলের একটি বেআইনি নজরদারি সফটওয়ারের সাহায্যে নাগরিকদের ব্যক্তিগত পরিসরে হানা দিচ্ছে, তা এখন প্রমাণিত সত্য। ইজরায়েলের যে নজরদারি কম্পিউটার প্রোগ্রামটি এখন সারা বিশ্বে নিন্দিত, সেটির নাম “পেগেসাস”। প্রযুক্তিকে যেমন মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, তেমনি আবার সেই একই প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণেও ব্যবহার করা যায়। সারা পৃথিবীর ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা একজোট হয়ে এই শয়তানি প্রোগ্রামটির কাজকর্ম বেপর্দা করেছেন, যার মধ্যে অগ্রগণ্য সংস্থা, মার্কিন দেশের আরসেনাল কনসালটিং এবং কানাডা-র টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের “সিটিজেনস ল্যাব”। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানীরা ভারত সহ সারা পৃথিবীর স্বাধীন চিন্তার মানুষদের তাঁদের ফোন, কম্পিউটার, চিঠিপত্র ও ই-মেল-এর ওপর নজরদারির বিষয়টি সর্বপ্রথম ফাঁস করে দেন। মজার কথা হল, ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অভিযুক্ত প্রত্যেকেই এই নজরদারি গোয়েন্দা কম্পিউটার প্রোগ্রামটির চাঁদমারিতে ছিলেন!

ভীমা-কোরেগাঁও মামলাটি, আইনি মতে, দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের দ্বারা বাজেয়াপ্ত করা “কয়েকটি চিঠি”-র ওপর ভিত্তি করে। এই চিঠিগুলি প্রায় একই বয়ানের, যেখানে পত্রলেখক এবং পত্রপ্রাপক, ঠিক দস্যু মোহন সিরিজের গল্পের মতো, তাঁদের নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করেছেন। চিঠি বা চিঠিগুলি কম্পিউটারে টাইপ করা, অর্থাৎ, চিঠির হাতের লেখার মাধ্যমে লেখকদের ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তকরণ অসম্ভব, শনাক্তকরণের প্রায় একমাত্র অবলম্বন ই-মেলে ব্যবহৃত ই-মেল ঠিকানাগুলি! এই চিঠির সূত্রে ২০১৮ সালে সারা দেশ থেকে এখন পর্যন্ত ১৯ জন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি অনুসারে একটি “চিঠি”-তে নাকি হায়দ্রাবাদে বসবাসকারী তেলুগু কবি ও সাহিত্যিক ভারভারা রাও, গড়চিরলি অঞ্চলের সুরজাগড়ে “নকশালপন্থী দ্বারা সফল আক্রমণের জন্য” এই মামলায় অন্য এক অভিযুক্ত, সুরেন্দ্র গাডলিং-কে “সাধুবাদ” জানিয়েছেন। পরবর্তীকালে গ্রেপ্তার হওয়া রোনা উইলসনের কম্পিউটারে নাকি এই চিঠি পাওয়া গিয়েছিল!

পুনের পুলিশ দাবি করে যে, যে পাঁচজন ব্যক্তিকে তাঁরা এই ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় গ্রেপ্তার করেছে, তাঁদের একজনের বাড়ি তল্লাশি করে আবার অন্য একটি “চিঠি” পায়, যেখানে ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি-কে হত্যার ষড়যন্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে! কম্পিউটারে ছাপা এই “চিঠি” (সরকারের পক্ষ থেকে যার এখনও ফোরেন্সিক পরীক্ষা হয়নি) “লিখেছেন” জনৈক “আর (R)”, যেখানে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধিকে যে কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল, সেই একই কায়দায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার “ব্লু-প্রিন্ট” বর্ণনা করা আছে। সেই “চিঠি”-তে নাকি শ্রী ভারভারা রাও-এর নাম রয়েছে! এই বিষয়টি অভিযুক্ত প্রত্যেকেই দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে এই “চিঠি”-টি হয়ত “চক্রান্তের গভীরতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য” আমদানি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু তথ্যের আলোকে এই সন্দেহ এখন প্রমাণের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

ঘটনা হল, ১৭ এপ্রিল, ২০১৮, পুনে পুলিশ রোনা উইলসনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করার সময় ভারতীয় ফৌজদারি আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে, কোনও নিরপেক্ষ সাক্ষী ছাড়াই বাড়ি খানাতল্লাশি করে, তাঁর কম্পিউটার, হার্ড ডিস্ক এবং পেন ড্রাইভ বাজেয়াপ্ত করে। ভারতীয় আইন অনুসারে বাজেয়াপ্ত জিনিস সিল করার কথা। আদালতের অনুমতি পেলে তবেই আদালতের তত্ত্বাবধানে সেই সিল খুলে ঐ সব বস্তুকে আদালতে নথি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এই পদ্ধতি না মেনে যদি সিল খুলে বাজেয়াপ্ত জিনিস ব্যবহার করা হয়, তবে সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে তা গ্রাহ্য হবে না। পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে রোনা উইলসনের বাড়ি থেকে খানাতল্লাশি করে প্রাপ্ত সব জিনিস দুপুর ২টো বেজে ২ মিনিটে নিয়মমাফিক সিল করা হয়। পুলিশ শ্রী উইলসনের দিল্লির মুনিরকার বসতবাড়ি থেকে দুপুর ২টো বেজে ১০ মিনিটে থানায় ফিরে যায়। কিন্তু আদালতে যখন এই সব বাজেয়াপ্ত জিনিস “অপরাধ”-এর প্রমাণ হিশেবে পেশ করা হয়, তখন দেখা যায় যে পুলিশ এই সব জিনিস বাজেয়াপ্ত করার ৩ ঘন্টা পর সেই হার্ড ডিস্ক, কম্পিউটার ও পেন ড্রাইভ খুলেছে, এবং সম্ভবত তাদের পছন্দমতো তথ্য সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সাক্ষ্য হিসেবে, ভারতীয় ফৌজদারি আইন মোতাবেক, এই বাজেয়াপ্ত জিনিসগুলি এখন অকেজো, মূল্যহীন, কিন্তু এই “সাক্ষ্য”-র ভিত্তিতেই শ্রী উইলসন ও তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা জারি আছে।

পুলিশ এবং এনআইএ-র এই সব সন্দেহজনক কাজে উদ্বিগ্ন হয়ে রোনা উইলসনের আইনজীবী মার্কিন দেশের আরসেনাল কনসালটিং সংস্থাকে উইলসনের বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত করা কম্পিউটার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বস্তু বিশ্লেষণের জন্য পাঠানর সিদ্ধান্ত নেন। আইনজীবীর আবেদনের ভিত্তিতে আদালত দ্বারা অনুমোদিত উপায়ে এই সব বস্তু রোনা উইলসনের আইনজীবীকে দেওয়া হয়, আইনি ভাষায় যাকে বলা হয় “ফোরেন্সিক কপি”।

এই আরসেনাল সংস্থা জুলাই ৩১, ২০২০ এই “ফোরেনসিক কপি” পায়। এই সংস্থার মতে, জুন ১৩, ২০২০-তে রোনা উইলসনের কম্পিউটার বেআইনিভাবে, অর্থাৎ কম্পিউটারের মালিকের অগোচরে খোলা হয়, যা ভারতের আইন মতে “সাইবার অপরাধ”-এর সমতুল্য। সেই কম্পিউটার এবং কম্পিউটারে ব্যবহৃত “পেন ড্রাইভ”-এ কবি ভারভারা রাও-এর ই-মেল বলে বর্ণিত একটি মেল-এর ঠিকানা থেকে আগে বর্ণিত চিঠিটি আসে। বস্তুত, ভারভারা রাও-এর ই-মেল অ্যাকাউন্টটি একটি সুপরিচিত হ্যাকার সংস্থা দ্বারা হ্যাক করা বা বেআইনিভাবে দখল করা হয়ে গিয়েছিল। এই মেলটির সঙ্গে এমন কতকগুলি অন্য কম্পিউটার প্রোগ্রাম ছিল, যাদের কাজ হচ্ছে অন্য কম্পিউটারে চুপিসাড়ে সেঁধিয়ে গিয়ে সেই কম্পিউটারে ইচ্ছেমতো নানারকমের কম্পিউটার ফাইল লিখে দেওয়া। ঠিক এই কায়দায় পূর্বে বর্ণিত যাবতীয় চিঠি রোনা উইলসনের কম্পিউটার ও তাঁর পেন ড্রাইভ-এ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। রোনা উইলসনের কম্পিউটারের যেখানে এইসব চিঠিপত্র ছিল, তা রোনা গ্রেপ্তার হওয়ার আগে কখনও ব্যবহার করেননি! তাই এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে ভীমা-কোরেগাঁও মামলাটিকে জনসমক্ষে “দেশের পক্ষে বিপজ্জনক এক মামলা” হিসেবে উপস্থাপিত করার জন্য পুলিশের সেই চিরাচরিত ভুয়ো দলিল আদালতে পেশ করার বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আরসেনাল সংস্থার উদ্ধার করা আরও দুটি তথ্য থেকে এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়। এক, যে দশটি চিঠির ভিত্তিতে এই “ষড়যন্ত্র মামলা” পরিচালিত হচ্ছে, সেই দশটি চিঠির বেশিভাগ যে কায়দায় কম্পিউটারের সাহায্যে লেখা হয়েছে, তা রোনা উইলসন-এর কম্পিউটারের সাহায্যে কোনওভাবেই লেখা সম্ভব নয়; এই চিঠি লেখা হয়েছে অন্য কোনও কম্পিউটার মারফৎ, যেটি খুবই উন্নত মানের, অনেক আধুনিক এবং যাতে লেখার জন্য এমন একটি প্রকরণ লেগেছে যা রোনা-র কম্পিউটারে নেই! অর্থাৎ, এই চিঠি রোনা লেখেননি, পাঠাননি এবং কোনওভাবেই এই চিঠির সঙ্গে তাঁর কম্পিউটারের যোগাযোগ নেই। দুই, প্রতিটি কম্পিউটারে যখন কোনও ফাইল তৈরি করা হয়, তখন সেই কম্পিউটার সেই সব ফাইল-এর জন্য একটি অনন্য “কোড” নির্মাণ করে নেয়, যা কেবলমাত্র ঐ কম্পিউটারের নিজস্ব কায়দাতেই তৈরি করা সম্ভব, যা পরিভাষায় “হ্যাশ কোড” নামে খ্যাত। রোনা-র কম্পিউটারে এই বাইরে থেকে পাওয়া ফাইলগুলি ছাড়া অন্যান্য যাবতীয় ফাইল-এর হ্যাশ কোড রোনা-র কম্পিউটার দ্বারা নির্মিত। ব্যাতিক্রম কেবল হ্যাকারদের দ্বারা পাচার করা ফাইলগুলি, যেগুলির হ্যাশ কোড সম্পূর্ণ আলাদা, অর্থাৎ এই ফাইলগুলি রোনা-কে ফাঁসানোর জন্য পুলিশের হেফাজতে রোনা-র কম্পিউটার থাকার সময় ঢোকানো হয়েছে। আরসেনাল সংস্থা এই সব উড়ো ফাইলগুলির হ্যাশ কোড বিশ্লেষণ করে অবাক হয়ে যান। ইজরায়েলের যে নজরদারি সংস্থার কথা আগে বলা হয়েছে, তারা যে সব সংস্থার বকলমে নজরদারি চালায়, তাদের কোনও কোনও সংস্থার ব্যবহৃত কম্পিউটারের হ্যাশ কোড নির্মাণ পদ্ধতির সঙ্গে রোনা-র কম্পিউটারের এই সব উড়ো ফাইলের হ্যাশ কোড-এর গঠনগত সাদৃশ্য আছে। তাঁরা এই নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অন্যান্য আরও গবেষণাগারের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা চালাচ্ছেন। তাই বলা যায়, এই সব ভুয়ো চিঠির ভিত্তিতে যে ৫ হাজার পাতার চার্জশিট, পরে আরও তিনটি “সাপ্লিমেন্টরি চার্জশীট”, এগুলো সবই ভুয়ো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই মামলার কোনও আইনি ভিত্তিই নেই!

পুলিশের দেওয়া মিথ্যা তথ্য কেমন বিপজ্জনক হতে পারে তার অন্তত একটি প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কর্মরত ছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক জিলানি। তাঁকে “দিল্লির সংসদ ভবন আক্রমণ” মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত করে পুলিশ তাঁর ফাঁসির রায় আদায় করে। উচ্চ আদালতে যখন এই মামলার শুনানি চলে, তখন দেখা যায় যে পুলিশ এই মামলা চলার সময় প্রতিটি ধাপে ভুয়ো এবং জাল নথি আদালতে পেশ করেছে, পুলিশের পক্ষের সাক্ষীদের কাছ থেকে অত্যাচার করে ভুয়ো বয়ান আদায় করেছে, আদালতকে বিভ্রান্ত করেছে। অধ্যাপক জিলানি এই মামলায় বেকসুর খালাস পান। এখন দেখার বিষয় ভারতের আদালত পুলিশের দেওয়া ভুয়ো দলিলের ভিত্তিতে মামলা চালিয়ে রায় দেবে, নাকি ভারতের ফৌজদারি আইন তথা “এভিডেন্স অ্যাক্ট” মোতাবেক মামলা চালাবে! তবে ভারতে আদালতের মহামান্য ন্যায়াধীশবৃন্দের কেউ কেউ ময়ূরের প্রজনন প্রক্রিয়া বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান বা পরম্পরাগত বিশ্বাসকে আইনের ঊর্ধ্বে যেভাবে স্থান দেওয়া শুরু করেছেন, তাতে আইনের মাধ্যমে কতটা ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন হয়ত থেকে যাবে।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3607 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...