২০২০-২১ কৃষক আন্দোলন: প্রতিবাদের নতুন সূর্যোদয়

জিনাত রেহেনা ইসলাম

 



নারী-অধিকার কর্মী, শিক্ষিকা

 

 

 

 

 

গান্ধিজি ভারতবাসীর রক্তে প্রতিবাদ শব্দটি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। শিরায় শিরায় দেশবাসী একে বহন করে স্বাধীনতার দিকে গুটিপায়ে এগিয়েছে। প্রকাণ্ড শক্তি ও আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে শুধু ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়ার সৎসাহস। ভারতীয়রা এতেই বুক বেঁধেছিল। অবিশ্বাস্য হলেও ব্রিটিশ তাড়ানোর স্বপ্ন সত্যি হয়ে দরজায় কড়া নেড়েছিল একদিন। প্রতিবাদের ভাষা মানে সচেতনতার ভাষা। অধিকার আদায়ের ভাষা। অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়ার ভাষা। পরে এই শব্দের অন্যায় রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রতিবাদ শব্দটিকে আজ দেশদ্রোহিতার সমার্থক বলে ভাবতে শেখানো হচ্ছে। এই অসময়ে ঘটে গেল ‘অঘটন’। কৃষকরা কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দল বাঁধল। রাজধানী না যেতে পেরে পথেই বসে রইল। ইতিহাসের এ এক অনন্য অধ্যায়। এক দিশাহীন দমবন্ধ করা গণতান্ত্রিক কালকুঠুরিতে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছিল। নিরুপায় হয়ে মেনে নেওয়াকেই বেঁচে থাকার বিকল্প ভাবতে শুরু করেছিল। তখন একটু আশার আলো জ্বেলে দিল মাটির মানুষগুলো। ক্ষমতাকে ভয় নয়। ক্ষমতার শক্তিকে পরখ করে দেখার সাহসও জীবনই শেখায়। সেই পথ ধরে জন্ম নেয় আরও বৃহত্তর ক্ষমতার আধার। যা আসলে ক্ষমতার অপব্যবহারের স্তম্ভে আঘাত হানে। কোনও ক্ষমতাই অপ্রতিরোধ্য নয়। তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারাটাই শেষ কথা। ওরা বলে দিল— আমরা পারি।

সংসদ বিল পাশ করবে জনগণের জন্য। জনগণের প্রয়োজনে। জনগণের সার্বিক মঙ্গলের জন্য। কিন্তু মুশকিল এই— ডেমোক্রেটিক পাওয়ার ষ্ট্রাকচারের যে জঘন্য দাঁত বের করা চেহারা দেখছে আমাদের প্রজন্ম তা অনভিপ্রেত। একদম নিজের পাড়া থেকে পার্লামেন্ট। একঝলকে কোথাও ক্ষমতার ব্যবহার মানুষের জন্য নেই। পাড়ায় নেতাদের জন্য। পার্লামেন্টে মন্ত্রীদের জন্য। জনগণের সরকার থেকে জনগণরাই বাতিল। এবং এই গণতান্ত্রিক দুর্ভাগ্যকে মানুষ যখন জন্মদাগ মানছে, তখনই বিস্ময়ে দেখে, শীতের মধ্যে একদল মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় পড়ে রয়েছে অধিকার আদায়ের জন্য। তাদের একটিই অহঙ্কার। সরকারটি তাদের। তবে তাদের কথা না শুনে তাদেরই জন্য কী করে আইন করতে পারে? যদি করে তবে সে সরকার তাদের নয়। তবে সরকার কার? সেটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন ভারতে! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাটি কামড়ে পড়ে রয়েছে আমাদের কৃষক। এরপরও যদি মানুষ প্রশ্ন করতে না শেখে তবে দুর্ভাগ্য এই সমাজের!

প্রতিবাদের ভাষাকে শুধু নিজের সীমিত চাহিদায় বেধে রাখেনি কৃষকরা। ব্র্যান্ডকে আক্রমণ করার সাহস দেখিয়েছে। অন্যায় সুবিধাভোগকারীদের চিহ্নিত করেছে। রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। সত্য জানলে শুধু হয় না। জানার পর তাকে প্রতিষ্ঠা করার এক দায় থাকে। মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার প্রশ্ন থাকে। এবং এই দায়িত্ব কৃষকরা মাথায় তুলে নিয়েছে। দেশকে ডোবায় যারা পরিকল্পিতভাবে তাদের সম্মান পাওয়ার অধিকার নেই। জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যারা, তাদের অসম্মান করায় কোনও সাংবিধানিক অপরাধ নেই। কৃষকরা রুখে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। ঘুরে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। না শিখলে আগামীতে হাত পুড়বে আমাদের।

গণতন্ত্রের দুর্দিনে তার চতুর্থ স্তম্ভেও ঘুণ ধরেছে। কৃষকরা সেখানেও প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছে। তীব্র ভাষায় মিডিয়ার বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়াকে আক্রমণ করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা করে দরবারি মিডিয়া হয়ে ওঠা দলকে প্রশ্ন করেছে কেন? যখন শিক্ষিত মানুষরা মিডিয়ার ভূমিকায় হতাশ হয়ে প্রশ্ন করাটাই এড়িয়েছে তখনও কৃষকরা প্রতিবাদ জারি রেখেছে। মিডিয়া সত্যের আয়না। কৃষকদের প্রতিবাদে সহমর্মিতার বদলে তাদেরই চরিত্র হননে একাংশ লিপ্ত হয়েছে। এদের নিন্দা করার জন্য সম্মিলিত কণ্ঠস্বর গায়েব হলে চলবে না। কৃষকরা সেই বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে। শাসকের প্রতি ঘৃণা উগড়ে দিচ্ছে কারণ জনগণের কথা না শোনার অধিকার কোনও নির্বাচিত সরকারের নেই। তাই নাছোড় কৃষকরা আইন বাতিলের দাবিতে অনড়। দফায় দফায় আলোচনা করেও সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল হচ্ছে। কেননা হ্যাঁ আর না-এর জবাব ফাইলবন্দি করা যায় না। পাতায় পাতায় ভরতে হয় না এই সামান্য শব্দটি। আইন বাতিল করবে, না কি করবে না— সরকারের কাছে এই গোঁ ধরে রয়েছে কৃষকরা। সরকার যতই আবদার করুক, বায়না ধরুক স্পষ্ট জবাব নিয়েই তারা ছাড়বে! এই সাহসের ঘুঁটি নিয়ে খেলে কার সাধ্য!

কৃষকদের অনবদ্য সাহসের সঙ্গে তাদের একাত্মতা মুগ্ধ করেছে। মেয়েরা রান্নাঘর তুলে এনে পথে পেতেছে। সুখের ঘরবাড়ি ফেলে এসেছে পেশাগত জীবিকার কারণে। জীবিকাও কী গর্বের! কী দায়িত্বের! মানুষদের মুখে অন্ন জোগানো! তাদের অধিকারের লড়াই করতে এতদিন ধরে রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়েছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কিই বা আছে! একদিকে পুরো সরকার। অন্যদিকে খাদ্যের জোগান দেওয়া অজস্র হাত। একদিকে ক্ষমতা। অন্যদিকে অধিকার আদায়ের আকুতি। দিনে রোদে পুড়ছে, রাতে শীতে কাঁপছে! তবুও হার মেনে নেওয়ার পথে হাঁটছে না। আদর্শ হয়ত একেই বলে। ন্যায়ের দাবি হয়ত এইরকমই হয়।

কৃষক পরিবারের মেয়ে আমেরিকায় চাকুরিরত। দেশে ফিরছে আন্দোলনে সামিল হতে। কোয়ারেন্টাইন কাটিয়ে এসে হাজির লঙ্গরখানায়। আত্মজকে এমন করেই ছায়াসঙ্গী করতে হয়! শাসকের কৃষকদের প্রতি অনুদান ও প্রচার নিয়ে প্রশ্ন রাখছে মেয়ে। তিন পুরুষ ধরে মাটির সেবা করে চলেছে। এমন পরিবারের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করারই কথা। অন্য এক মেয়ে ট্রাক্টর চালিয়ে ২৬শে জানুয়ারি ইন্ডিয়া গেট যাওয়ার কথা ঘোষণা করছে। প্রতিবাদের পারদ চড়ছে দিনে দিনে। কৃষকরা প্রতিদিন বুঝিয়ে দিচ্ছে ক্ষমতার হিসেব অহঙ্কার দিয়ে নয়, মানুষের অধিকার দিয়েই সম্পন্ন হবে। সেটা বুঝেও অস্বীকার করলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। সেখানে ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ আসবেই। পটপরিবর্তনের প্রহরী অপেক্ষায় থাকবে।

কৃষকদের এই ক্ষোভ ও অবস্থানের নানা মাত্রা। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলে গোটা সমাজটা এই শীতের রাতে কৃষকদের বানানো তাঁবুগুলোতে লুকিয়ে পড়ে। কী চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা! দলীয় রাজনীতি এমন এক পচনশীল জায়গায় এসে পড়েছে যেখানে অনায়াসেই নেতা দাবি করে ফেলছে ‘সুপ্রিম কোর্ট আমাদের’। এতদিন ‘সরকার আমাদের’ শুনে এসেছে মানুষ। দেশের শীর্ষ  আদালতও দলের হয়ে গেলে কী সাংঘাতিক অবস্থায় এসে পড়ে সমাজ! ভেবে ঘুম ছুটে যাওয়ার কথা মানুষের। আখেরে মানুষের জন্য সরকার। দলের জন্য নয়। কিন্তু দল যদি নিরন্তর মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে। মানুষকে দুর্বল ও শক্তিহীন করার জন্য ফন্দি করে তবে মানুষকে বেঁচে থাকার বিকল্প খুঁজে বের করতেই হবে! হ্যাঁ আর না এর মধ্যে একটিকে বাছতেই হবে। যেমন কৃষকরা বেছে নিতে চাইছে। গোটা সমাজের কণ্ঠস্বর এরা হয়ে উঠেছে। সবার কথা একাই বলে যাচ্ছে! এরা আজ জিতলেই ভারতবর্ষ জিতবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...