আবার “সবই ব্যাদে আছে”-র আবির্ভাব: এবার কাণ্ড যাদবপুর

অশোক মুখোপাধ্যায়

 


বিজেপি-র লোকেদের পছন্দের ব্র্যান্ড ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি এখনও বজায় বা শক্তিশালী থাকলে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যভাণ্ডার কোনওদিনই সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে পারত না। ইংরেজ রাজত্বে তাদের ক্ষমতা ও দাপট অনেকটা ক্ষুণ্ণ হওয়াতেই সেই সমস্ত প্রাচীন পুঁথি একে একে উদ্ধার ও সঙ্কলিত করা সম্ভব হয়েছে। হয়েছে সেই দেশি ও বিদেশি সেকুলার মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদী পণ্ডিতদের সুবাদেই। প্রধানত তাঁদের উদ্যোগেই, সেই ১৭৮০-র দশক থেকে, প্রাচীন ভারতের হাতে লেখা পুঁথি সংগ্রহ, সংস্কার, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও মুদ্রণের ব্যবস্থা করা শুরু হয়। একটা সময় থেকে একে একে অনেক ভারতীয় পণ্ডিতও এতে যোগ দেন। তাঁদের সমবেত উদ্যোগেই আজকের এই বিশাল সংস্কৃত সাহিত্যভাণ্ডার গড়ে উঠেছে

 

পশ্চিমবঙ্গে সিভি আনন্দ বোসের শিক্ষারক্ষা প্রয়াস সাফল্যের ফুল ফোটাতে শুরু করেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে স্নাতক স্তরে Environmental philosophy in Ancient India নামক একটা পেপারের পাঠ্যবস্তু হিসাবে ছাত্রদের দেওয়া হয়েছিল শশী তেওয়ারির একটা প্রবন্ধ। আর সেই প্রবন্ধে আত্মপ্রকাশ করেছে ১৯৩০-এর দশকে অরবিন্দ-শিষ্য অনিল বরণ রায়ের লেখা “সবই ব্যাদে আছে” জাতীয় বিবৃতিপুঞ্জ। একজন ছাত্রী সেই প্রবন্ধের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফেসবুকে প্রকাশ করে দেওয়ায় অনেকেরই টনক নড়েছে। ছাত্রীটির পরীক্ষার নম্বরের ফলে নিশ্চয়ই এর একটা আধিবৈদিক প্রভাব পড়বে বলে আশা কিংবা আশঙ্কা করা যায়।

আসুন দেখে নিই, এই প্রবন্ধে তেওয়ারিজি কী কী দাবি করেছেন:

The Vedic hymns are full of statements, ideas and unusual images which contain truths of all sciences. Here, knowledge is couched in symbolic language and unless the symbols are decoded, the real purport of the mantras cannot be understood. The only point is that Vedas need to be studied and interpreted, not in a pedantic manner, but in their proper perspective and in relevant context. The tripartite model of knowledge at the basis of the hymns helps in their understanding. Generally indication of most of the principles is there in their earliest form. Often expressions of ideas are enveloped with the shade of symbolism. The approach of Vedic seers is truly comprehensive. They do not visualize in parts. They do not elaborate subjects as is done in current education. But at the same time, grandeur and brevity of the Vedas are not found in the disciplines of modern science. The Vedas and disciplines of modern science are rather complementary and not contradictory. If modern science is seen or read through Vedic eyes, the students will be much benefitted. Students of science may search the earliest of the ideas about any discipline in Vedic literature.[1]

তাহলে তেওয়ারিজির বচনে জানা গেল: এক, বেদে আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত সত্যই পাওয়া যাবে; দুই, তবে সেগুলি একটু সংক্ষেপে জমাট ভাষায় বিবৃত, অত সুন্দর বয়ান আধুনিক বিজ্ঞানের শাখাগুলিতেও নেই; তিন, বিজ্ঞানের ছাত্ররা বিজ্ঞানের যে-কোনও শাখার ভাবধারার স্ফূরণ দেখতে বেদ খুলে বসতে পারেন; এবংবিধ।

সত্যিই কি তাই? মেঘনাদ সাহা তাহলে কিছুই খুঁজে পেলেন না কেন?

সমস্যা হল, সেদিন থেকে শুরু করে আজ অবধি আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের এক বিরাট অংশের ধারণা, এবং তার মধ্যে বহু শিক্ষিত লোকও আছেন, যে বিশাল সংস্কৃত সাহিত্যভাণ্ডারের কোথায় কী আছে তা আজ পর্যন্ত ভাল করে খুঁজে দেখা হয়নি। মেকলের তাচ্ছিল্য অনুসরণ করে ভারতীয় বিদ্বানরাও সেইসব গ্রন্থের পৃষ্ঠা উলটে দেখেননি। সেকু-মাকু যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীরা না দেখেই ধরে নেন, ওতে কিছু নেই। সাহাও তাই অবজ্ঞাভরে ওসব লিখেছিলেন। এখন ভুল করে হলেও বিজেপি-র লোকেরা ক্ষমতায় এসে সেগুলি একটু নেড়েচেড়ে দেখছে এবং দেখাচ্ছে। এতে এত আপত্তি করার কী আছে?

ধারণাটা সর্বৈব ভুল। একশো শতাংশই ভ্রান্ত।

প্রথমত, বিজেপি-র লোকেদের পছন্দের ব্র্যান্ড ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি এখনও বজায় বা শক্তিশালী থাকলে এই সব গ্রন্থ কোনওদিনই সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে পারত না। ইংরেজ রাজত্বে তাদের ক্ষমতা ও দাপট অনেকটা ক্ষুণ্ণ হওয়াতেই সেই সমস্ত প্রাচীন পুঁথি একে একে উদ্ধার ও সঙ্কলিত করা সম্ভব হয়েছে। হয়েছে সেই দেশি ও বিদেশি সেকুলার মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদী পণ্ডিতদের সুবাদেই। মেকলের তাচ্ছিল্যকে ইউরোপের বিদ্বানদের অধিকাংশই পাত্তা দেননি। স্বভাবতই ভারতীয়রাও তাতে গুরুত্ব দেননি। বা দেওয়ার কথাও ছিল না। প্রধানত তাঁদের উদ্যোগেই, সেই ১৭৮০-র দশক থেকে, প্রাচীন ভারতের হাতে লেখা পুঁথি সংগ্রহ, সংস্কার, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও মুদ্রণের ব্যবস্থা করা শুরু হয়। একটা সময় থেকে একে একে অনেক ভারতীয় পণ্ডিতও এতে যোগ দেন। তাঁদের সমবেত উদ্যোগেই আজকের এই বিশাল সংস্কৃত সাহিত্য ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি তার ভিত্তিতেই অনেক ইউরোপীয় ও ভারতীয় বিদ্বান প্রাচীন ভারতে শিল্প সংস্কৃতি সাহিত্য বিজ্ঞান প্রযুক্তি দর্শন গণিত ভেষজবিদ্যা ইত্যাদির ইতিহাস রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তার মধ্যে হয়তো কিছু ভুল ত্রুটি অসম্পূর্ণতা এখনও রয়ে গেছে। ১৮৫৬ সাল থেকে প্রকাশিত এরকম বেশ কিছু গ্রন্থের একটা ছোট তালিকা আমি অনেক জায়গায় তুলে ধরেছি জনমনে প্রচলিত উপরোক্ত ভ্রান্ত ধারণাটির প্রতিষেধ কল্পে। এখানেও তালিকাটা আর একবার শেষভাগে সংযোজন করে দিলাম। এর সঙ্গে ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত অনুরূপ গ্রন্থ তালিকা যোগ করতে পারলে এটা অনেক লম্বা দৈর্ঘ্য অর্জন করে ফেলবে।

সুতরাং চারখানা বেদ এবং বিভিন্ন উপনিষদে কী কতটা আছে তা আমাদের এখন কমবেশি জানার সুযোগ আছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান ধারায় নানা গল্পকথার আড়ালে তার চর্চা না হলেও বা কম হলেও যিনি চাইবেন তিনি মুদ্রিত বইগুলি পড়ে অনেক কিছুই জেনে নিতে পারেন। এমনকি, সংস্কৃত না জানলে অনুবাদেও পড়তে পারেন। আমিও আমাদের এই আলোচনায় যতটুকু প্রাসঙ্গিক সেরকম কিছু কথা নিচে বলতে চেষ্টা করব। তাতে আধুনিক বিজ্ঞান তো অনেক দূরের কথা, আদৌ বিজ্ঞানের কোনও প্রাথমিক স্তরেরও সার কথা কিছু আছে কিনা, যে কেউ চাইলে নিজেরা যাচাই করে নিন।

 

বেদে কী আছে

প্রথমে ঋগ্বেদ সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিতে চাই। কেননা, আমাদের দেশে শুধু ধার্মিক আধ্যাত্মিক স্কুলের চিন্তাবিদদের মধ্যেই নয়, এমনকি যুক্তিবাদী মার্ক্সবাদী নাস্তিক শিবিরের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও ঋগ্বেদের সামাজিক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক অবস্থান নিয়ে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে।

আমাদের স্পষ্ট করেই বুঝে নেওয়া প্রয়োজন যে ঋগ্বেদ কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়। এর মধ্যে ধর্মীয় কোনও অনুষঙ্গই নেই। এই গ্রন্থ খোলা চোখে পাঠ করলে যে কেউ দেখতে পাবেন, এতে আত্মা পরমাত্মা স্বর্গ নরক ইহলোক পরলোক মোক্ষলাভ ইত্যাদি আধ্যাত্মিক মার্গের কোনও শব্দ বা ধারণার অস্তিত্ব নেই।

ঋগ্বেদের যুগ হচ্ছে হরপ্পার অবসানকাল (খ্রিঃপূঃ ১৮৫০) পার হয়ে মোটামুটি ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিঃপূঃ অবধি বিস্তৃত। তাতে যে সংস্কৃতির ছবি ফুটে উঠেছে, তা হচ্ছে বিভিন্ন সমগোত্রীয় পশুচারক যাযাবর যোদ্ধৃ-জনজাতি (nomadic pastoral martial tribe)-দের জীবনযাপন। তারা ঘোড়ায় চড়ে বা ঘোড়ায় টানা রথে ছোটাছুটি ও যুদ্ধসংঘর্ষ করে। ঘোড়ার পাশাপাশি তারা গরু মোষ ছাগল পালন করে এবং তার দুধ ও মাংস খুব তৃপ্তির সঙ্গে খায়। তাদের মধ্যে বিজ্ঞানের যেটুকু পরিচয় পাওয়া যায় তা হচ্ছে এইসব পশুপালনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু তাদের গাছপালার ব্যাপারে জ্ঞান প্রায় নেই বললেই চলে। কেননা, তারা নিজেরা তখন কৃষিকর্ম শেখেনি। একমাত্র মাঝেমাঝে সোমরসের যে উল্লেখ দেখা যায়, তাতে মনে হয়, এরকম একটা নেশা ধরানো বিরুতের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়েছিল।

মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও প্রাচীন ভারত বিষয়ক অন্যতম বিদ্বান গবেষক রাহুল সাংকৃত্যায়ন তাঁর একটি রচনায় বলেছেন, ঋগ্বেদের যুগে পশুপালনের পাশাপাশি কৃষিকর্মও প্রচলিত ছিল।[2] এই প্রশ্নে তিনি মনে হয় সঠিক মূল্যায়ন করেননি। কেননা, আদি বৈদিক সাহিত্য পাঠে জানা যায়, বৈদিক জনজাতির যাযাবর লোকেরা তাদের বসতির আশপাশে থাকা জনজাতিদের থেকে তাদের উৎপন্ন শস্য ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য লুটেপুটে নিত। তারা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করত সেই লুটপাটে সাহায্য করতে এবং তা সফল করতে। যারা নিজেরা চাষ করে ফসল ফলাতে পারে তারা আর লুট করতে যাবে কেন? আর খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে যে-সমস্ত জনজাতির খাদ্যশস্য তারা লুট করত, তাদেরকেই তারা আবার দস্যু বলে আখ্যায়িত করত। যার অর্থ, এই দস্যুতাকে তারা কোনও বড় অপরাধ বলে মনে করত না। করত না বলেই তাকেও কবিতায় নিশ্চিন্তে স্থান দিয়েছিল।

স্বভাবতই এই যাদের জীবনযাত্রা পদ্ধতি, তাদের পক্ষে কল্পলোকের সাধনার বিলাসিতা পোষায় না। তারা প্রকৃতির বিভিন্ন অংশ বা শক্তির পুজো নয় স্তুতি করে। সিন্ধু নদী, হিমালয় পাহাড়, সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি, বৃষ্টি, বায়ু, ঊষা, ইত্যাদি। বৈদিক লোকেরা যা রচনা করেছিল তা আসলে কবিতা। আদ্যিকালের প্রকৃতি ভজনার কাব্য। সেই জন্য ঋগ্বেদে স্বর্গ কল্পনা সুখ বা নরকের কল্পিত ভীতি নেই। ইহজীবনেই তারা খুশি এবং এখানেই তারা বেঁচেবর্তে থেকে যথাসম্ভব সুখভোগ করতে চায়। ঋগ্বেদে দেবতা বেশ কয়েকজন থাকলেও তারা স্বভাবে আচরণে প্রায় গেরস্থ মানুষেরই মতো। প্রীতি, প্রেম, রাগ, হিংসা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ, যৌনতা, খাদ্যলোভ, ইত্যাকার মানবিক দোষগুণগুলি সবই এমন যে আজকের দিনে হলে তাদের দেবতা বলে মেনে নেওয়াই মুশকিল হত।

ইংল্যান্ডের জনৈক যাজক এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গবেষক আলফ্রেড গেডেন (১৯৩০) বলেছেন, বৈদিক ধর্মের মতো “বোধহয় আর কোনও ধর্মেই “প্রাকৃতিক” উপাদানগুলি এত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়নি, বা দৈবস্ব্বরূপ গ্রহণ করেও তার বস্তুগত উৎস এতটা উজ্জ্বল হয়ে থাকেনি, … আর, একইরকমভাবে মনুষ্যরূপে নির্মিত দেবতাদের গুণাবলি এবং বৈশিষ্ট্যসমূহেও বৈচিত্র্য খুব সামান্যই, একই বিবরণ প্রায় সকলের উপরেই বর্তায় বা বর্তানো যায়।”[3] ভারতে এসে হিন্দুদের ধর্মের ভিত্তি ঋগ্বেদ শুনে শুনে এবং বিশ্বাস করে ফেলে সেই ঋগ্বেদে ধর্ম খুঁজতে গিয়ে যাজকমশাই যারপরনাই হতাশ হয়েছেন।

এই সূত্র ধরেই গেডেনকে উদ্ধৃত করে আমেরিকার গবেষক ডেল রিপ লেখেন, “বৈদিক সূক্তগুলিতে বর্ণিত দেবতারা প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনারই সামান্য উচ্চতর প্রতিনিধি মাত্র, যেখানে ‘দেখা যায় এক সরল প্রকৃতি পূজা, মহাবিশ্বের বড় বড় শক্তির সামনে মানুষের শিশুসুলভ বিস্ময় আর শ্রদ্ধা! …’.”[4]

সুতরাং সেই সমস্ত নৃসদৃশ দেবদেবীর কাছে বৈদিক জনজাতির সদস্যদের আবদারের বিষয়বস্তুও নিতান্তই বৈষয়িক, নিত্যদিনের চাহিদার তালিকা মাত্র। ঊনবিংশ শতাব্দে এক বিদেশি ভারতবিদের চোখে এটা খুবই জড়বাদী অনৈতিক ও অনাধ্যাত্মিক বলে মনে হয়েছিল: “…for abundant provisions, good pasture-grounds, robust and virile cows, splendid horses, rich harvests, gold, opulence, a large and reliable fortune, health, physical strength, beauty, a perpetually vigorous family stock, a long old-age, material security, renown and glory—these are types of requests which fill famous Rig-Veda from the first page to the last, and not those which denote a supersensitive belief—the spirituality of the soul, for example, or the pre-excellence of moral virtue.”[5]

আধ্যাত্মিকভাবে আপ্লুত স্বামী বিবেকানন্দের (১৮৬৩-১৯০২)-ও সে কী ভয়ানক আক্ষেপ: “বেদের প্রথম অংশের আদর্শ অপর অংশ উপনিষদের আদর্শ হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। প্রথম অংশের যে আদর্শ, তাহার সহিত এক বেদান্ত ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের আদর্শের মিল আছে। ইহলোকে ও পরলোকে ভোগই ইহার মূল কথা— স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা। অর্থ দাও, পুরোহিতরা তোমাকে ছাড়পত্র দিবেন— পরকালে স্বর্গে তুমি সুখে থাকিবে। সেখানেও তুমি সব আত্মীয়স্বজনকে পাইবে এবং অনন্তকাল আমোদপ্রমোদ উপভোগ করিবে। অশ্রু নাই, দুঃখ নাই— শুধু হাসি আর আনন্দ। পেটের বেদনা নাই— যত পারো খাও। মাথাব্যথা নাই, যত পারো ভোজসভায় যোগদান করো।”[6] বোঝাই যায়, এত শ্রদ্ধার পাত্র ঋগ্বেদের এই বস্তুবাদী প্রবণতা স্বামীজির একদম ভাল লাগেনি। সেইজন্য বোধহয় অখেয়ালবশত তিনি বৈদিক সাহিত্যে স্বর্গ বা পরলোক ঢুকিয়ে বসে আছেন।

আর এর বিপরীতে, অনেক কাল পরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১) খুব আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন যে বৈদিক ঋষিদের “কামনা-বাসনা এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ, ধন ধান সৌভাগ্য স্বাস্থ্য দীর্ঘজীবন, এমন সব পার্থিব জিনিস।”[7]

এই সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রবর্তিত ও সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৮৭৭ সালে বেদ সম্পর্কে বিশিষ্ট ভারতবিদ হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতামতও জেনে নেওয়া ভাল: “বেদের নাম শুনলেই আমাদের দেশে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেরই মনে ভয়ভক্তি সম্বলিত কেমন একটা প্রকাণ্ড ভাবের উদয় হয়। বেদ যে পড়ল, সে একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ— যে বেদ ব্যাখ্যা করল, সে শঙ্কর বা নারায়ণের অবতার। … যে বেদ পড়ল সে মন্ত্রবলে অসাধ্য সাধন করতে পারে। … কিন্তু বাস্তবিক বেদ কী জিনিস? ভিন্ন ভিন্ন কালের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন মহাকবি প্রণীত কতগুলি কবিতা, গান ইত্যাদির সংগ্রহ মাত্র।”

শাস্ত্রী তারপর দেখিয়েছেন, আজ থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার সেই বৈদিক জনজাতিগুলির সদস্যরা অত্যন্ত সরল দৃষ্টি নিয়ে যে প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে দেবতা কল্পনা করে কবিতা রচনা করেছিল, পরবর্তীকালের মানুষরা কীভাবে সেই দেবতাদেরই বেদরচয়িতার পদে বসিয়ে বেদকে ধর্মগ্রন্থে পরিণত করে ফেলেছে: “পরে কবির নাম লোপ পেতে লাগল, কবি যে দেবতার সাহায্য পেয়েছেন, সেই দেবতা বেদরচক বলে পরিগণিত হলেন। দেবতাই রচক, কবি দেখলেন মাত্র। এই জন্য মাধবাচার্য লিখলেন, যিনি মন্ত্র দেখলেন তিনিই ঋষি। ঋষ্‌ ধাতুর অর্থ দর্শন। এই জন্যই কালিদাসের মন্ত্রকৃতাং লেখা দেখে ভবভূতি যেন চটে উঠেই লিখলেন, মন্ত্রকৃতাং নয়, মন্ত্রদৃশাং। ঋষিরা মন্ত্র করেননি, দেখেছেন মাত্র। বেদের রচক দেবতা হলেন। শেষে যখন দেবতা ঘুচে গিয়ে একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রধান মত হয়ে দাঁড়াল, দেবতার বেদ-প্রণেতৃত্ব ঈশ্বরে অর্পিত হল। ঈশ্বর নিত্য, বেদও নিত্য হয়ে দাঁড়াল। বেদ ঈশ্বরের বাক্য। ওতে কোনও মিথ্যা নেই; ওটা সত্যময়, ধর্মময়, জ্ঞানময়; এইভাবে কতগুলি গান ধর্মপুস্তক রূপে পরিণত হল।”[8]

পশুপালনের খাতিরে সময়ের নির্দেশিকা পেতে সূর্য চন্দ্র বৃহস্পতি শুক্রই যথেষ্ট ছিল। তাই ঋগ্বেদে আর কোনও গ্রহ বা তারার সন্ধান মেলে না। তাদের আকাশবিদ্যা খুবই সীমিত। এমনকি এতে রাহু কেতু নামক দুই কাল্পনিক গ্রহেরও কোনও উল্লেখ নেই। সুতরাং সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ দেখা বোঝা ও তার ব্যাখ্যা প্রদানের কোনও চেষ্টাও সেখানে চোখে পড়ে না। গণনার কাজও তাদের বেশি ছিল না বলে এক, তিন, সাত আর বহু— এতেই তারা সন্তুষ্ট ছিল। গণনায় তাদের অপটুত্ব বোঝা যায় যখন তারা ঋগ্বেদে এক জায়গায় সিন্ধু সহ দশটি নদীর নাম লিখে তাকে সপ্তসিন্ধু বলে উল্লেখ করে। এর অর্থ হল, তখন তারা সাত আর দশের মধ্যে পার্থক্য করতে জানত না।[9] প্রায় দু-হাজার বছর পরে যখন সায়ন এর ভাষ্য লিখতে বসেন, তিনিও এই গুনতিতে গরমিলের উল্লেখ না করে “নদী সপ্তসংখ্যকা” বলে হাত ধুয়ে ফেলেন। বৈদিক ঋষিরা গুনতে ভুল করতেন— এটা বলা কি ভাল দেখায়?

ঘটনাচক্রে বৈদিক জনজাতির বংশধররা যুদ্ধে ছিল পটু আর হালকা দু-চাকার ঘোড়ায় টানা দ্রুতগামী রথ বানাতে শিখে ফেলেছিল। ফলে ৬০০ খ্রিঃপূঃ সময়কাল থেকে তারা লোহার ব্যবহার আয়ত্ত করতে শুরু করে। ততদিনে তারা পূর্ব ভারতের দামোদর উপত্যকায় লৌহ আকর-সমৃদ্ধ খনি এলাকা পর্যন্ত বসতি বিস্তার করে ফেলেছিল। যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে লোহার ব্যবহার শুরু করলেও অচিরেই তারা লোহার অন্যান্য হাতিয়ার (যেমন, কুঠার) বানাতে সক্ষম হয়। তাই শেষ-বৈদিক বা ঔপনিষদিক কালে ভারতে আবার ধীরে ধীরে কৃষিকর্মের উদ্বোধন ঘটে। তবে উপনিষদেও দানসামগ্রী মানে গরু এবং স্বর্ণ, আর কালেভদ্রে জমি। অর্থাৎ, তখনও ধান গম শস্য উৎপাদনের খবর বিশেষ পাওয়া যাচ্ছে না। উপনিষদেও ভোগের আয়োজন নিতান্ত কম নয়। তবে সে কথায় আমি পরে আসছি।

ঋগ্বেদ থেকে যেমন কৃষির অনুপস্থিতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা চতুর্থ শতাব্দের কোনও এক সময়ে নির্মিত রামায়ণে সীতার জন্মকাহিনি কিংবা অহল্যার উপাখ্যানে চাষবাস শুরু হচ্ছে বলে পরোক্ষ অনুমান করা যায়।

কৃষি মানে হল সুস্থিত জীবনযাত্রা। ধীরে ধীরে ক্রমবর্ধমান এবং নানারকম শ্রমবিভাজন। স্থায়ী পরিবারকাঠামো গঠন। খাদ্য উৎপাদন ও প্রাপ্তিতে অধিকতর নিশ্চয়তা। যাযাবর জীবনের অবসান। ফলে মনন চর্চার জন্য আরও বাড়তি সময় পাওয়া গেল। যুক্তিতর্ক, সৃষ্টিরহস্য, জগতের মূল উপাদান, বস্তুতে বস্তুতে কারণ-কার্য সম্বন্ধ, ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তাভাবনার উন্মেষ দেখা দেয়। সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, ইত্যাদি দর্শনের উদ্গম হয়। বস্তুবাদের ধারাতেই সেই সব দর্শন এগোতে থাকে। যে কোনও বস্তুগত উৎপাদন প্রক্রিয়া আসলে তত্ত্বের দিক থেকে একরকম হৈতুকীর প্রকাশ। বীজ যদি (উপাদান) কারণ হয়, চারা হচ্ছে তার পরিণাম। মাটি হচ্ছে কলসির উপাদান কারণ। কার্যকারণের ধারণা বস্তুবাদের সঙ্গেই ভাল করে মেলে। ভাববাদীদের আছে এক প্রথম বা চূড়ান্ত কারণ— ভগবান। তার জন্যই সব কিছু ঘটে বা হয়। কিংবা অনেক কিছু ঘটে না বা হয় না। বড্ড অনিশ্চিত।

এই প্রতিটি দর্শনই ঋগ্বেদকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করে যাত্রা শুরু করে। এদেরকে সেই জন্য ভারতীয় ঐতিহ্যে আস্তিক দর্শনের মর্যাদা দেওয়া হয়। এর মধ্যে কি বস্তুবাদী মতবাদের তরফে ভাববাদ তথা অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে কোনও আপসরফার বন্দোবস্ত ছিল? আমাদের দেশে বস্তুবাদী চিন্তকদের অনেকে এরকম একটা অনুমান করেন যে ব্রাহ্মণ্যবাদী বৈদান্তিক মতের কাছে কোথাও একটা নতি স্বীকার না দেখালে এই সব দর্শনের টিকে থাকা মুশকিল হত। সেইজন্যই কি এই সমস্ত দর্শনে বেদও প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য?

আমার মতে, না।

আজকে এটা উপলব্ধিতে ধারণ করা বেশ কঠিন, কেননা, দীর্ঘদিনের প্রচারের ফলে আমাদের সাধারণভাবে মনে হয় বৈদিক ঐতিহ্য থেকে আধ্যাত্মিক দর্শনেরই বেশি করে প্রেরণা পাওয়ার কথা, বস্তুবাদের উঠে আসার কথা নয়।

আসলে তা নয়।

আমার মনে হয়েছে, প্রাচীন ভারতের মাটিতে ভাববাদী অধ্যাত্মবাদী চিন্তাচেতনা উঠে আসার ঢের আগে সেদিন যে বস্তুবাদ মাথা তুলছিল, যাঁরা তার উদ্বোধক, তাঁরা ঋগ্বেদের মধ্যে পেয়েছিলেন এক কুঁড়ি-বস্তুবাদ (proto-materialism)-এর সন্ধান। কিংবা এও বলা যায়, সেই বৈদিক কুঁড়ি-বস্তুবাদেরই এক ধারা কালক্রমে বিভিন্ন দার্শনিক জিজ্ঞাসা উত্থাপনের মাধ্যমে বিকশিত হতে হতে একে একে সাংখ্য এবং বৈশেষিক দর্শনের আকার পেয়েছিল। যা আবার সমকালের বিজ্ঞান চিন্তার বিকাশেরও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। আবার সেই কুঁড়ি-বস্তুবাদেরই অন্য ধারা ধীরে ধীরে পরাজিত ও কুণ্ঠিত হয়ে একে একে পূর্ব মীমাংসার মধ্য দিয়ে উত্তর মীমাংসা তথা বেদান্তে পৌঁছেছিল। এই দিকটা এখন পর্যন্ত ভাল করে গবেষণা করে দেখা হয়নি বলেই আমার ধারণা।

উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করা যাক।

ঋগ্বেদের নাসদীয় সুক্তে জগতের সমস্ত কিছুর আদিতে কী ছিল, কোন অবস্থা থেকে এই বিশ্বজগতের সৃষ্টি হল, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থিত হতে দেখা যায়:

তৎকালে যাহা নাই, তাহাও ছিল না, যাহা আছে তাহাও ছিল না। পৃথিবীও ছিল না, অতি দূরবিস্তার আকাশও ছিল না।
আবরণ করে এমন কী ছিল? কোথায় কাহার স্থান ছিল? দুর্গম ও গম্ভীর জল কি তখন ছিল? ১।।

তখন মৃত্যুও ছিল না, অমরত্বও ছিল না, রাত্রি ও দিনের প্রভেদ ছিল না।
কেবল সেই একমাত্র বস্তু বায়ুর সহকারিতা ব্যতিরেকে আত্মামাত্র অবলম্বনে নিশ্বাসপ্রশ্বাস যুক্ত হইয়া জীবিত ছিলেন।
তিনি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না। ২।।

. . .

এই নানা সৃষ্টি যে কোথা হইতে হইল, কেহ সৃষ্টি করিয়াছেন কি করেন নাই, তাহা তিনিই জানেন,
যিনি ইহার প্রভুস্বরূপ পরমধামে আছেন। অথবা তিনিও না জানিতে পারেন। ৭।।[10]

পুরোটা পড়লে পাঠকরা দেখতে পাবেন, এখানে মূল পাঠে দ্বিতীয় মন্ত্রে আত্মাবাচক কোনও শব্দ না থাকা সত্ত্বেও অনুবাদক তা সংযুক্ত করেছেন। শেষ মন্ত্রটির মূল পাঠ ছিল এই রকম: “ইয়ং বিসৃষ্টির্যত আবভূব যদি বা দধে যদি বা ন। যো অস্যাধ্যক্ষঃ পরমে ব্যোমন্তসো অঙ্গ বেদ যদি বা ন বেদ।।” তার মধ্যে অনুবাদক যখন অধ্যক্ষ স্থানে “প্রভু” এবং ব্যোম স্থানে “ধাম” বসিয়ে দেন, তখন তিনি বোধহয় তাঁর অজ্ঞাতসারেই একটি মোটামুটি বস্তুবাদী জিজ্ঞাসাকে আধ্যাত্মিক রঙে রঞ্জিত করে তোলেন।

অর্থাৎ, আদিতে যে অবস্থা ছিল তা সৎ না অসৎ বৈদিক কবিরা জানতে চেয়েছে। দিনের বেলায় সূর্যালোকে চারদিকে সব কিছু আছে বলে দেখা যায়; আর রাতের অন্ধকারে কিছুই নেই বলে মনে হতে থাকে। এরই ভিত্তিতে মনে হয় বৈদিক জনজাতির জ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছিল, আদিতে যা ছিল তা যদি সৎ হয় তবে বস্তু থেকে বস্তুর উৎপত্তি মেনে নিতে হয়। আর যদি তাকে অসৎ বলে মনে করা হয়, তবে ধরে নিতে হবে, শূন্য থেকে বা বস্তুহীন অবস্থা থেকেও জগতের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। আরও লক্ষণীয়, এই সূক্তটির নাম নাসদীয় কেন? কারণ, নাসদীয়> ন+অসৎ+ঈয়ন প্রত্যয়। অর্থাৎ, বৈদিক কবি এতে সৃষ্টির আদিতে অসৎ (বা কিছুই ছিল না)-এর ধারণা সম্ভবত নাকচ করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সাংখ্য দর্শনের রচয়িতা কপিল এই আদি সৎ অবস্থা থেকে এই প্রশ্নের মীমাংসা খুঁজেছেন এবং অতি চমৎকারভাবে এগিয়েছেন সমাধানের দিকে।[11]

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ভূতপূর্ব অধ্যাপক কেবল কৃসান মিত্তাল বেদের সেই কুঁড়ি-বস্তুবাদকে আখ্যা দিয়েছিলেন “অগোছালো বস্তুবাদ” (unsystematic materialism) হিসাবে। তিনি বলেছিলেন: “The Vedic thought is inextricably mixed up with the Vedic ritualism and magic. Knowledge (or truth) serves, with them a magical purpose of obtaining the objects of their desires.”[12]

এই ম্যাজিক বা মন্ত্রজাল আদিকালের মানুষের এক আত্মশক্তি প্রকাশের মাধ্যম। যজ্ঞ মানে হল দেবতার কাছে প্রার্থনা নয়, প্রায় আদেশ— এটা করে দিতে হবে। অথর্ববেদে যজ্ঞকে এমনকি দেবতাদের চেয়েও শক্তিশালী বলা হয়েছে।[13] এই যজ্ঞ এত শক্তিশালী যে পূর্বমীমাংসার মতে যজ্ঞ করলে দেবতাকে ফলদান করতে হবেই। এর মধ্যে একরকমের বস্তুবাদী চিন্তার শেকড় দেখতে পাওয়া যায়। এবং সেই অর্থে নিরীশ্বরবাদ। এখান থেকে পরবর্তীকালের বস্তুবাদ কিছু-না-কিছু রসদ সংগ্রহ করতে পেরেছে।

এই সমস্ত বৈদিক প্রকরণের মধ্যে বস্তুবাদের শিকড় দেখতে পেলেও প্রাচীনকালের অর্থেও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উদ্গমের কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। তার জন্য আমাদের আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

আমাদের প্রাচীন ভারতের প্রস্ফুটিত দর্শন, ষড়দর্শন যাকে আমরা বলি, এর মধ্যে সাংখ্য এবং বৈশেষিক এই দুটো হচ্ছে অত্যন্ত প্রকটভাবে বস্তুবাদী দর্শন। আজকের অর্থে ধরলে হবে না, আজ থেকে অন্তত আড়াই হাজার বছর আগে যতটা সম্ভব সেই অনুযায়ী বস্তুবাদী। আর ন্যায় এবং মীমাংসা খুব প্রকটভাবে বস্তুবাদী দর্শন না হলেও এদের বিচার্য ক্ষেত্রটা এমন যে এদেরও কার্যত বস্তুবাদী বলেই ধরা যায়। এবং এই চারটে দর্শনই একেবারে ঘোষিতভাবে ঘোরতর নিরীশ্বরবাদী। এর বাইরে পড়ে থাকে দুটো। প্রথমত পাতঞ্জল দর্শন বা যাকে যোগ দর্শনও বলে, সেটি ঈশ্বরধারণা ঢুকিয়ে সাংখ্য দর্শনকে খানিকটা ভাববাদের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায়। যে কারণে কপিল রচিত আদি সাংখ্যকে নিরীশ্বর সাংখ্য বলে, আর পাতঞ্জল দর্শনকে বলা হয় সেশ্বর সাংখ্য। এই দুটির বক্তব্যের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই, শুধু মাত্র ঈশ্বরহীন এবং ঈশ্বর যুক্ত হওয়া ছাড়া।

তেওয়ারিজি একটা কাজের কথা বলেছেন। বেদের কথাগুলিকে রূপক অর্থে ধরতে হবে।

অবশ্য অবশ্য।

কীসের রূপক?

কেন, আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণার রূপক!

উদাহরণ হিসাবে শশীবাবুর সমচিন্তী এক দলের অনুরূপ রূপক অর্থ নিষ্কাশনের কাণ্ডকারখানা দেখে নেওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে যাঁরা রূপক নিয়ে মাথা ঘামাবেন, তাঁদের সুবিধা হবে।

তবে উদাহরণটা আমরা দেব গীতার অর্থ রূপকে ব্যাখ্যা দেওয়ার একটা কেস হিসাবে। Hinduism and Sanatan Dharma নামে একটা ওয়েবসাইটের বিদ্বানরা আইনস্টাইনের E=mc2 সূত্রের খবর “আবিষ্কার” করেছে গীতার সপ্তম অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে, যেখানে বলা হয়েছে:

ভূমিরপোহনল বায়ু খম্‌ মনো বুদ্ধিরেবচ।
অহঙ্কার ইতিয়ম মে ভিন্না প্রকৃতিরষ্টধা।।

আপনি হয়ত ভাবলেন, আ রে, আ রে, এই সব শ্লোকের মধ্যে ভর ও শক্তির তুল্যাঙ্ক সূত্রের খবর কই?

এমনিতে নেই, তেওয়ারিজির বয়ানমাফিক রূপকার্থ বিচারে অবশ্যই আছে।

যেমন, উপরোক্ত সনাতনীরা রূপক বিবেচনায় এর অর্থ বের করেছেন: “Earth, water, fire, air, ether, mind, intelligence and false ego— all together these eight constitute My separated material energies.”[14] বুঝলেন কি পাঠক? অষ্টপ্রকারের প্রকৃতির ইংরেজি অনুবাদ হয়ে গেল আটরকমের ভিন্ন ভিন্ন শক্তি। ব্যস, শক্তি যখন এসে গেল, ভর তো থাকবেই, শ্লোকে থাকুক আর না থাকুক। বিশ্বে ভরহীন কিছু আছে নাকি? যেই ভর পেয়ে গেলেন (কীভাবে পেলেন, না বুঝলে আর দু-এক হাজার বছর অপেক্ষা করুন), অমনি এতে ভর আর শক্তির তুল্যাঙ্কর খোঁজ হয়ে গেল। সমীকরণ কীভাবে হল বুঝতে পারছেন না? ওই যে ডবল দাড়ি। ভাল করে দেখুন। ওটাকেই একটু কাত করে দিলেই রূপকে সমতা চিহ্ন হয়ে যাবে। দেশদ্রোহী হতে না চাইলে, রাজ্যের পদ্মকর্তার শিক্ষার প্রতি আবেগকে মূল্য দিলে, এইভাবেই ভাবনাচিন্তা করতে হবে। রূপকের রূপে মোহিত হতে শিখতে হবে।

ওদিকে দুঃখের কথা হল, শুধু সেকু-মাকুরা নয়, VivekaVani নামক আর একটা সনাতনধর্মী ওয়েবসাইট, যাঁদের গীতার এই মন্ত্রে আইনস্টাইনের উপরোক্ত সূত্রটি চোখে পড়েনি (পড়ার কথা নয় বলেই), ফলে কোনও শক্তির ধারণা ঢোকানোর দরকার হয়নি, তাঁরা সেই একই শ্লোকের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন এইভাবে: “Earth, water, fire, air, ether, mind, reason, and also egoism— these are the eightfold divisions of My nature.[15] প্রকৃতির অর্থ এঁরা রূপকে না ধরে স্রেফ সরলার্থে ধরেছেন।

আহা! আবিষ্কারের কী ঘটা!!

এইসব জিনিস যে পুরোপুরি উদ্ভট কারবার সেটা একদিকে একই জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদের কারচুপি থেকে সহজেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। রূপকের কদাকার রূপও এর মধ্যে যথেষ্ট পরিষ্কার!

 

গ্রন্থসূত্র

  • অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৮৩), বাংলার ব্রত; বিশ্বভারতী, কলকাতা।
  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ”; রবীন্দ্র-রচনাবলী, ষোড়শ খণ্ড; বিশ্বভারতী, কলকাতা।
  • অক্ষয়কুমার দত্ত (১৯৯০), “উপক্রমণিকা”; ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, ২য় খণ্ড; করুণা প্রকাশনী, কলকাতা।
  • পূরবী পাল (১৯৮০), বেদ পরিক্রমা; চুঁচুড়া।
  • স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯ক), “কর্মযোগ”; স্বামীজির বাণী ও রচনা, ১ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
  • স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯খ), “গীতাতত্ত্ব”; স্বামীজির বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
  • স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯গ), “গীতা প্রসঙ্গ”; স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৮ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
  • স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯ঘ), “স্বামী শিষ্য সংবাদ”; স্বামীজির বাণী ও রচনা, ৯ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
  • হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৯৬৪), “বেদ ও বেদ ব্যাখ্যা”; হরপ্রসাদ গ্রন্থাবলী; বসুমতী সাহিত্য মন্দির, কলকাতা।
  • মেঘনাদ সাহা (১৯৮৬), “সমালোচনার উত্তর” এবং “উপসংহার”; শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় (সম্পাদিত), মেঘনাদ রচনা সঙ্কলন; ওরিয়েন্ট লংম্যান, কলকাতা।
  • রাহুল সাংকৃত্যায়ন (১৯৯৪), দর্শন দিগ্‌দর্শন, ২য় খণ্ড; চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা।
  • Alfred S. Geden (1953), “Nature (Hindu)”; The Encyclopaedia of Religion and Ethics, Vol. IX, 3rd Edition; Charles Scribners and Sons, New York.
  • K. Mittal (1974), Materialism in Indian Thought; Munshiram Manoharlal Publishers, New Delhi.
  • Dale Riepe (1961), The Naturalistic Tradition in Indian Thought; Washington University Press, Seattle.
  • Sanatan Dharma (2015), See: https://pparihar.com/2015/10/25/mass-and-energy-per-gita-is-e-mc2/
  • Schöbel (1852), “Le naturalisme du Rig-Véda et son influence sur la société indienne”, La Revue Orientale.
  • Sashi Tewari (2023), “Origin of Environmental Science from Vedas”; Course materials in Philosophy, 1st year Degree Course; Jadavpur University; See: https://acrobat.adobe.com/id/urn:aaid:sc:AP:459e1d24-c7c9-4a1c-9265-348d395741a3
  • VivekaVani (2021), Bhagavad Gita; see: https://vivekavani.com/b7v4/

[1] Tewari 2023; emphasis added.
[2] সাংকৃত্যায়ন ১৯৯৪, ১২।
[3] Geden 1953, 229-30.
[4] Riepe 1961, 17.
[5] Schöbel 1852, 11f.
[6] বিবেকানন্দ ১৯৮৯গ, ২৭১।
[7] ঠাকুর ১৯৮৩, ৪।
[8] শাস্ত্রী ১৯৬৪, ২৮৬ এবং ২৮৮; সাধু থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরিত।
[9] ঋগ্বেদ—১০/৭৫।
[10] ঋগ্বেদ—১০/১২৯/১-৭; অনুবাদক – রমেশচন্দ্র দত্ত; মোটা হরফ আরোপিত।
[11] কপিল প্রসঙ্গের জন্য দ্রষ্টব্য: মুখোপাধ্যায় ২০২৩ক।
[12] Mittal 1974, 67.
[13] পাল ১৯৮০, ৪০।
[14] Sanatan Dharma 2015.
[15] VivekaVani 2021; emphasis in the original.


*লেখকের প্রকাশিতব্য একটি গ্রন্থের একটি অধ্যায়ের সামান্য পরিমার্জিত আকারে এই প্রবন্ধটি সময়ের চাহিদায় পরিবেশিত হল। কৃতজ্ঞতা: শশী তেওয়ারির রচনার লিঙ্ক সংগ্রহ করে দিয়েছেন আমার স্কুলকালের সহপাঠী বন্ধু ও কমরেড ডঃ দেবাশিস চক্রবর্তী, সাংবাদিকতার প্রাক্তন অধ্যাপক

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...