ওয়েন জনসনের পতাকা

সোহম দাস

 

সংবৃতর মনে ভয়। সময়বিশেষে সে ভয়ের রং পাল্টে যায়।

পাঁচবছরের জন্মদিনে কেউ একজন তাকে মাছধরার খেলনা উপহার দিয়েছিল। একটা প্লাস্টিকের ট্রে, সেটা আসলে পুকুর, তাতে গর্ত করা, গর্তে খেলনা মাছগুলো, প্রতিটার মাথায় চুম্বক। মাছ ধরার জন্য দুখানা ছিপ, সে ছিপদুটোর মুখেও চুম্বক আটকানো থাকত। একবার সেই দুখানা ছিপকে মুখোমুখি চুম্বকে-চুম্বকে জুড়ে, খেলনা রাইফেল দিয়ে ওই জোড়া অংশ তাক করে গুলি ছুঁড়েছিল। এমন বিটকেল বুদ্ধি কেন যে তার মাথায় চেপেছিল জানে না, কিন্তু ওই কাণ্ডের ফলে একটা ছিপের চুম্বক কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অন্যটা যাতে আর না হারায়, তাই ওই পুকুর আর ছিপগুলো নিয়ে কোনওদিন খেলেনি সে। কেবল আলমারি থেকে বার করে দেখত, চুম্বকটা আছে কিনা। ওটা হারিয়ে যেতে পারে, এই ভয় ছিল অনেকদিন পর্যন্ত। সে ভয়টা তার সামনে কালচে ধূসর চেহারা নিয়ে এসে দাঁড়াত, ঠিক ওই চুম্বকের রংটার মতো।

অমন একটা খেলনা সে ছোটবেলায় আর কোনও সমবয়সি বন্ধু বা ভাই-বোনের বাড়িতে দেখেনি। সেজন্য নিজেকে দারুণ ভাগ্যবান বলে মনে করত। এসব বছর বাইশ আগেকার কথা। তারপর, এক দূর-আত্মীয়ের বাড়িতে সেই বাড়ির বাচ্চা ছেলেটার হাতে দেখেছিল, সংবৃত কৌতুহলী হয়ে খেলনাটা ধরতে গেলে ছেলেটা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারপর দেখল এই কদিন আগে, একটা ভিডিওতে, এক ফিলিস্তিনি বাচ্চার হাতে। অবশ্য, গোটা খেলনা নয়, বোমার ঘায়ে বাচ্চাটার বাড়ি, বাগান, ওই খেলনার অর্ধেকটা, ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ভাঙা পুকুরটা হাতে নিয়ে বাচ্চা মেয়েটা কাঁদছিল।

ছোটবেলায় অবশ্য আরও অনেক ভয় ছিল। যেমন, দুবলা চেহারার জন্য যখন স্কুলের কোনও ছেলে তাকে মারের হুমকি দিত, তখন যে ভয়টা সে পেত, তার রং হত নীল। গোলগাল চেহারায় আঠেরো বছর বয়স অবধি দাড়িগোঁফ না ওঠা আর চিকণ গলার কারণে পাড়ার পুরুষ বন্ধুরা তার বুকে হাত দেওয়া বা সিগারেটের গন্ধ মাখা ঠোঁট দিয়ে গালে জোর করে চুমু খাওয়ার যে অভ্যাস তৈরি করেছিল, সে অভ্যাসকেও সে ভয় পেত। ওই বন্ধুর দলের কাউকে কাছেপিঠে দেখলেই তার ভয়টার রং বদলে লাল হয়ে যেত। তারপর, দিন বদলাল, সেও একদিন পুরুষ হয়ে উঠল, জিমন্যাসিয়ামে গিয়ে পেশি ফোলাল, চাপদাড়ি রাখা শুরু করল, রাস্তায় ঢ্যাঁটা লোকজন দেখলেই উত্তম-মধ্যম দেওয়াকে প্রায় অভ্যাসে পরিণত করল। ওই পুরুষ বন্ধুদের দু-তিনজনের শরীর থেকে কয়েক সেন্টিলিটার রক্ত বার করে দিয়েছে সুযোগ পেয়ে। তখন আর সে কাউকে ভয় পায় না, এক পুলিশ ছাড়া। ফিজিক্যাল অ্যাসল্টের চার্জ থেকে দু-দুবার বেঁচে ফিরে এসেছিল, তারপর থেকে পুলিশকে ভয় পাওয়া শুরু। সে ভয়টারও একটা রং দেখতে পেল সংবৃত, সেটা ঘন কালো।

এগুলো ছাড়াও আরও কিছু ছিটেফোঁটা ভয় তার বরাবর ছিল। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের হেরে যাওয়ার ভয়, পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার ভয়, খালপাড় দিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফেরার সময় মজে যাওয়া আদিগঙ্গায় পড়ে যাওয়ার ভয়।

সে ভয়গুলোর রং তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

আগেকার ভয়গুলো এখন আর নেই। মাঝে ফুটবলে মজেছিল সে, সেখানে প্রিয় ক্লাবের খেলা থাকলে হেরে যাওয়ার ভয় পেত, ভয় হত ফেসবুকের ট্রোল নিয়েও। এক-দুবছর হল, সে মোহও কেটে গিয়েছে। ইদানীং অন্য সব ভয়ের ভিড়, অনেকক্ষণ কাজ করলে ঘাড়-পিঠ টনটন করতে থাকে, তার ভয়, সেবার ট্রেক করতে গিয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছিল, মুড়লেই ব্যথা করে ওঠে, সেটার ভয়, বিভিন্ন খাতে আজেবাজে খরচের ভয়।

তবে এসব ভয় ছাপিয়ে অন্য আরেকটা ভয় বেশি করে জাঁকিয়ে বসে। সে ভয়ে মিশে থাকে বিভিন্ন আকারের একাধিক উপ-ভীতি। গোলগাল চেহারার কারণে যে মন্টুকাকু অনেক বড় বয়স অবধি তার গাল টিপে আদর করত, ষোলো বছরেও তাকে বারো বছরের ভাবত, যা আদৌ সে কখনও পছন্দ করত না, সেই মন্টুকাকুর দোকানে সে ইদানীং যায় না, গাল টেপার কারণে নয়, ‘মুসলমান মানেই শালা জঙ্গি’ বলার পর থেকে। বাড়ি থেকে কিছুদূরে যেখানে এই সেদিন অবধিও অবহেলায় পড়েছিল আগাছার ঢিবি, ছ-বছর বয়সে প্রথম যে ঢিবি দেখে টিভিতে দেখা আফ্রিকার জঙ্গলের কোপি (kopje) বলে মনে হয়েছিল, তার সেই ছেলেবেলার কোপি আর নেই, সেখানে রাতারাতি উঠে গিয়েছে ঝাঁ চকচকে ভারতমাতার মন্দির, দেখলে অস্বস্তি হয়, এই অস্বস্তিটাও ওই উপ-ভীতিগুলোর একটা।

সে খেয়াল করে দেখেছে, এই সঙ্কর ভয়টার কোনও রং সে আজ অবধি চিনতে পারেনি।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে দেখেছে, ওই মাছধরা খেলনা বা ওই লজ্জা-ভয়, যা ছিল তার একান্ত নিজস্ব, তা অনেকের হয়ে গিয়েছে। বড় হলে এমন সমব্যথার সঙ্গী জুটে যায়, এ-কথা সে আগে জানত না।

ছোটবেলার ওই ভয়গুলো তাকে একলা করে দিত বড্ড, একলাটি বসেই সে খুঁজে বেড়াত আরও কে দুবলা চেহারার জন্য নিয়মিত মুখের ভূগোল বদলে যাওয়ার হুমকি পায়, কারই বা দাড়ি-গোঁফহীন মুখে এসে ঝাপটা মারে ক্লেদাক্ত চুম্বন। খুঁজতে খুঁজতে সর্বদা ব্যর্থ হত সে। এখন আর ব্যর্থতা নেই, এখন আর সে একা নয়, এখন একসঙ্গে ভয় পাওয়া যায়। তার চারপাশে সে দেখতে পায় কোটি কোটি লোককে, সবাই ভয় পাচ্ছে।

সংবৃত মাঝেমধ্যে ভাবে, ভয় পেতে পেতে সকলে একদিন একই সময়ে চিৎকার করে উঠবে, সে চিৎকারটারও কোনও নির্দিষ্ট রং থাকবে না। চিৎকারটা মিলিয়ে যাওয়ার পরে সকলে আবিষ্কার করবে, ভয়টা আর নেই।

পুরনো ভাবনাগুলোর মধ্যে গুঁড়ো গুঁড়ো টিকে আছে কেবল খালপাড়ের সাইকেল-পাক আর ভারতীয় ক্রিকেট টিম।

১৯ নভেম্বরের সন্ধেটায়, যেদিন বিশ্বকাপ ফাইনাল হচ্ছিল, সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল।

ছোটবেলার সংবৃত হলে এসব কল্পনাই করা যেত না। ত্রৈরাশিক কিংবা ঐকিক নিয়মের অঙ্ক কষতে কষতে ডে-নাইট ম্যাচগুলো দেখতে বসত সে, খাতা পড়ে থাকত ফাঁকা। চোখের সামনে একটু একটু করে ম্যাচের রাশ বেরিয়ে যাচ্ছে ভারতের হাত থেকে, দার্জিলিং থেকে দর্জিপাড়ার সকলের চোখের মণি বাঙালি ক্যাপ্টেন অনেক চেষ্টা করেও সেরকম কিছু করে উঠতে পারছেন না। একসময়ে চোখের পর্দা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইত অন্তঃপুরবাসী, লবণাক্ত জল। ম্যাচটা শেষ হলে অঙ্ক খাতার দিকে চেয়ে দেখত, ত্রৈরাশিকের মান বার করার চেয়ে কত ওভারে কত রান খরচ করলে ভারতের ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা আছে, সেসব অঙ্ক আবোলতাবোল কষে রেখেছে সে। মা এসব কোনওদিন জানতে পারেনি, খাতার পাতাগুলো সে তখুনি ছিঁড়ে ফেলে দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে বাড়ির পাশের রাস্তায়। পরদিন কোনও কাগজ-কুড়ানি এসে তুলে নিয়ে গিয়েছে সেসব বিশ্লেষণী হিসেব।

অমন ছেলেমানুষি এখন আর নেই।

ফাইনাল ম্যাচের সন্ধেয় পাড়ার ভেতরের রাস্তা প্রত্যাশামতোই শুনশান। ক্রিকেট-অজ্ঞ কোনও ভিনগ্রহীর স্পেসশিপ যদি এখন হঠাৎ এখানে নেমে আসে, সে এসে ভাববে, হয়তো যুদ্ধ লেগেছে।

বীভৎস চিৎকার উঠল তিনবার। খুব কম সময়ের ব্যবধানেই চিৎকারগুলো শুনল সংবৃত। উইকেট পড়ছে নিশ্চিত। তৃতীয় চিৎকারের সময়ে সংবৃত বড় রাস্তার মোড়ে যেখানে বাজার বসে, সেখানে। কয়েকটা দোকানপাট খোলা আছে এখানে, শুনশান ভাবটা নেই। নগরাজ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বাবরি চুলওয়ালা মালিকটা দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কিছুদূরের মুদির দোকানের ছেলেটার দিকে চেয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত নেড়ে ‘হবে-এ-এ-এ-এ’ বলে চিৎকার করে উঠল। ছেলেটাও পাল্টা দিল— ‘ইয়ে-এ-এ-এ-এ’। হাজি উল্লাহের দোকানে একটা মুরগিও ‘কঁক-কঁক’ করে ডেকে উঠল।

ওই কয়েকটা মিনিটের জন্য ছোটবেলার অঙ্ক কষা সংবৃত ফিরে আসতে চাইছিল, সাইকেলের মুখ ঘোরাবে কিনা সে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিল। ব্রয়লার মুরগির ডাকটা তাকে আরও বেশি রোমাঞ্চিত করে তুলল, ভাবতে ইচ্ছে হল— আহা, আজ মুরগিটারও কী আনন্দ! কিন্তু, সংবৃত এখন আর আগের মতো নেই। ভাবের ঘরের সঙ্গে তার আড়ি হয়ে গিয়েছে বহুদিন। হাজির দোকানের সামনে ক্লাবের চারজন ছেলেকে দেখেই ম্যাচ-পরবর্তী ফিস্টির পরিকল্পনাটা দিব্যি বুঝে ফেলল সে।

সাইকেল ঘোরানোর ইচ্ছা আর তার চাগাড় দেয়নি। চিৎকারও আর ওঠেনি।

সটান সাইকেল চালিয়ে সে এসে পৌঁছয় নিজস্ব ঠেকে। এতক্ষণ যে ‘আমি’টা উন্মুক্ত ছিল, সেটা আর থাকে না। এই ঠেকের চার দেওয়ালে সংবৃত সবচেয়ে নিরাপদ।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন কাপ ফাইনালের দু-একদিন আগে বলেছে, দেড় লাখ লোককে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেয়ে আনন্দ আর নেই! এসব খবর সংবৃত জানত না, শোনেনি। সে শুধু শুনেছিল, ‘পবিত্রতম এত ঘৃণা।’ আর জেনেছিল, অবদুলিও ভারেলার কথা, কয়েকবছর আগে, যখন ফুটবল নিয়ে মজেছিল, সেই সময়ে।

১৯৫০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ বসেছিল ব্রাজিলে, সেই যেবার, প্রথম ও শেষবারের মতো, ভারতের ফুটবল দল ডাক পেয়েছিল, তারপর যেতে পারেনি। ভারত ছাড়া সেবার দল সরিয়ে নিয়েছিল স্কটল্যান্ড আর ফ্রান্সও, ষোলো দলের জায়গায় তেরো দল নিয়ে হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম বিশ্বকাপ। কোনও ফাইনাল ম্যাচ ছিল না, চারটে দলকে নিয়ে একটা ফাইনাল রাউন্ড হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত আয়োজক ব্রাজিল আর ’৩০-এর বিজয়ী উরুগুয়ের মধ্যে ম্যাচটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফাইনাল ম্যাচ। ফাইনাল রাউন্ডে ব্রাজিল সুইডেনকে হারায় ৭-১ ফলাফলে, স্পেনকে ৬-১। উরুগুয়ের রেকর্ড সেখানে স্পেনের সঙ্গে ২-২ ড্র, সুইডেনকে কোনওক্রমে ৩-২ ফলাফলে হারানো। তাছাড়াও, আগের বছরের কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল জিতেছিল সবসুদ্ধ ৪৬ গোল করে, উরুগুয়েকে সেবার হারায় ৫-১-এ।

নতুন একখানা স্টেডিয়াম তৈরি করা হয়েছে রিও দে জেনেইরো শহরে, নাম দেওয়া হয়েছে মারাকানা নদীর নামে। সেখানেই হবে শেষ ম্যাচ। ম্যাচের আগে রিও দে জেনেইরো আর সাও পাওলোর বড় বড় কাগজগুলো ব্রাজিলকে বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়। খেলোয়াড়, কোচদের নাম খোদাই করা বাইশখানা সোনার পদক তৈরি করা হয়। রিও দে জেনেইরোর মেয়র অ্যাঞ্জেলো মেন্দেস মাঠে এসে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে গরম-গরম বক্তৃতা ঝাড়েন। গানও বেঁধে ফেলা হয়। সাও পাওলোর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পাওলো মাচাদো দে কার্ভালহো কেবল একবার এসবের বিরোধিতা করার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁকে পাত্তা দেয়নি কেউ।

অবদুলিও ভারেলা ছিলেন ওই উরুগুয়ে দলের ক্যাপ্টেন। মোচ্ছব-আয়োজন দেখছিলেন নিঃশব্দে। ফাইনালের দিন সকালে ‘ও মুন্দো’ কাগজের ‘বিশ্বজয়ী ব্রাজিল’-মার্কা শিরোনাম দেখে আর স্থির থাকেননি। খান কুড়ি কপি মেঝেতে সাজিয়ে দিয়ে টিমমেটদের বলেন, এর ওপর পেচ্ছাপ করো। তারপর, সংবৃত পড়েছিল, কোচ হুয়ান লোপেজ ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলে অবদুলিও টিমমেটদের বলেন, হুয়ানিতোর কথা শুনে রক্ষণাত্মক খেললে স্পেন-সুইডেনের মতোই অবস্থা হবে আমাদের। মাঠে নামার মুহূর্তে আরও বলেন— বাইরের লোক শুধু বাক্যি ঝাড়বে, খেলব আমরাই।

ক্যাপ্টেনের কথাতেই তেড়েফুঁড়ে খেলার দিকে জোর দিয়েছিল উরুগুয়ে। এতদিন অবধি প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া ফুটবল খেলে আসা ব্রাজিলের রক্ষণবিভাগের ফাঁকফোকর বেরিয়ে আসে, শেষ পর্যন্ত ১-২ ফলাফলে ম্যাচ, সঙ্গে বিশ্বকাপটাও হাতছাড়া করে অপরাজেয় ব্রাজিল। সাজানো মোচ্ছবে জল ঢেলে দিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বজয়ী হয় উরুগুয়ে। দুটো গোল করেছিলেন হুয়ান আলবের্তো শিয়াফিনো আর আলচেইদেস ঘিগিয়া।

ব্রাজিলের কালো চামড়ার গোলকিপার মোয়াশির বারবোসাকে সারাজীবন বাঁচতে হয়েছিল অপরাধী হয়ে। মৃত্যুর আগে বলে যাওয়া ‘পঞ্চাশ বছরের কারাবাসের জীবন’-এর বিলাপটা সম্পর্কেও সংবৃত জেনেছিল ওই সময়ে।

ফুটবল-চর্চাটা যখন থেকে শুরু হয়েছে, তখনই এই বহুরঙা ভয়টার জন্ম। এখন ব্যাপারটা যে পর্যায়ে এসেছে, তাতে অতি সামান্য আলোর রেখা দেখলেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

ফাইনালের সন্ধে ক্রমশ চুপচাপ হয়ে আসছিল, ১৯৫০-এ ঘিগিয়ার গোলের পর মারাকানা স্টেডিয়ামও অমন চুপ করে গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে দুএকটা কেবল পটকা ফাটার শব্দ। শব্দে ভয় কাটে, আবার শব্দে অস্থির হয় মন। শেষ অবধি অবশ্য শব্দ জিতে যায়, মারণ অসুখের মতো করে। সংবৃত ভাবছিল, যারা পটকা ফাটাচ্ছে, তারা কারা? এই মুহূর্তে ফেসবুকে তাদের ঠিক কী নামে দাগানো হচ্ছে? অস্ট্রেলিয়া-সমর্থক নাকি দেশদ্রোহী?

ওর মতো আরও যারা এখন ভয় পাচ্ছে, সকলে মিলে একসঙ্গে যদি অমন বাজি ফাটানো যায়? প্রচুর বাজি, তাতে থাকবে চকলেট বোম, কালি-পটকা, দোদোমা, আরও যা যা পাওয়া যায়। সে বাজিতে ধোঁয়া হবে অনেক, ওই ধোঁয়া দিয়ে ঢেকে দেওয়া যাবে যারা ভয় দেখাচ্ছে, তাদের। খেলা ঘুরে যাবে তখন। ওরা জিতে যাবে ঠিক, ভারেলার উরুগুয়ের মতো।

ছোটবেলায় অঙ্ক কষার সময়ে খেলা দেখতে বসলে এমন আবোলতাবোল ভাবনাগুলোই অঙ্ক হয়ে উঠত সাদা খাতার পাতায়, পাশে নিষ্প্রাণ পড়ে থাকত কেশবচন্দ্র নাগ কিংবা অমল ভৌমিকের বই।

এখন আর অঙ্ক আসে না মনে, বরং যেটা আসে, সেটা পটকা ফাটার শব্দের মতো হঠাৎ কোনও অকারণ স্বস্তি, কোনও একদিন জিতে যাওয়ার অদূর কল্পনা। কল্পনায় কী না হয়!

সেদিন সে যখন বাড়ি ফিরেছে রাতে, তখন পটকা ফাটার গতি হয়েছে মন্থর, ভারত হেরে গিয়েছে। সাইকেলে আসতে আসতেই সে আবিষ্কার করল, এর মধ্যেই অনেক কিছু করে ফেলেছে।

কখন যেন চলে গিয়েছিল চম্পাহাটির বাজারে, প্রচুর প্রচুর পটকা বাজি কিনে এনে বিলিয়ে দিয়ে এসেছে ভয়-পাওয়াদের ঘরে ঘরে। একবার বুঝি আমেদাবাদেও চলে গিয়েছিল, ওয়েন জনসন বলে যে ছেলেটা ঢুকে পড়েছিল স্টেডিয়ামের মাঠে, তাকে সংবৃত দেখেছে, মুখে দাড়িগোঁফ নেই, লম্বা চুল ওড়ে হাওয়ায়, ওকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে এসেছে— “তোমাকেও কি ছোটবেলায় জোর করে চুমু খেত পাড়ার দাদারা?” ওয়েন কিছু বলেনি, শুধু হেসেছে। এমনকি, এক ফাঁকে পুরনো আলমারির ধুলো-পড়া কোণ থেকে ওই মাছধরা খেলনাটা বার করে এনেছিল, তারপর সেটা দিয়ে এসেছে ওই ভিডিওর বাচ্চাটাকে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ওয়েনের সঙ্গে একদিন দেখা করিয়ে দেবে তার। মেয়েটা আর কাঁদেনি।

বাড়ির বাইরের দেওয়ালে সাইকেলটাকে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার পর সংবৃত অনুভব করল, সে সাহস ফিরে পাচ্ছে। লাল সাহস, নীল সাহস, বেগুনি সাহস, সবুজ সাহস, আরও কত রং।

ঠিক যেন রামধনু, ঠিক যেন ওয়েন জনসনের হাতে ধরা পতাকাটা।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...