সত্যপাল মালিকের অভিযোগ নিয়ে বিজেপি কর্তাব্যক্তিরা নীরব কেন?

প্রদীপ দত্ত

 


ছাত্র-রাজনীতি থেকে উঠে আসা জাঠ নেতা সত্যপাল উত্তরপ্রদেশের চৌধুরি চরণ সিংহের ভারতীয় ক্রান্তি দলের হয়ে ভোটে জিতে বিধানসভায় এসেছিলেন। রাজ্যসভার সদস্য, লোকসভা সদস্য হয়েছেন। ভারতীয় লোকদল, জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি-সহ সহ নানা দল ঘুরে বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। লোকসভা সদস্য হয়েছেন, কেন্দ্রের মন্ত্রীও ছিলেন। পরে মোদি সরকার তাঁকে বিহার, জম্মু-কাশ্মির, গোয়া ও মেঘালয়ের রাজ্যপাল নিযুক্ত করে। গত বছরই মেঘালয়ের রাজ্যপাল হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়েছে। এহেন সত্যপালের অভিযোগকে তো গুরুত্ব দিতেই হয়

 

চার বছর আগে কাশ্মিরের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসবাদী হামলা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিসের দুর্নীতি, কৃষক আন্দোলন, অগ্নিবীর প্রকল্প, আদানি গোষ্ঠীকে নিয়ে সত্যপাল মুখ খুলেছেন। কেন্দ্র ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র অভিযোগের পরও বিজেপি তা নিয়ে টুঁ শব্দ করেনি। মানুষ যেন অভিযোগগুলি সম্বন্ধে বেশি জানতে না পারে সেই উদ্দেশ্যেই ওই কৌশল। ‘দ্য ওয়ার’-এ সাংবাদিক করণ থাপার, ইউটিউবে রভিশ কুমার এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধি সত্যপাল মালিকের তিনটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন (১৪ এপ্রিল, ১৫ এপ্রিল এবং ১৪ অক্টোবর, ২০২৩)। ৭৭ বছরের সত্যপাল আগে জম্মু-কাশ্মির সহ চার রাজ্যের রাজ্যপালের দায়িত্ব পালন করেছেন। টেলিগ্রাফ পত্রিকা ছাড়া শাসকের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে দেশের কোনও সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল সত্যপালের অমন বিস্ফোরক কথাবার্তা নিয়ে খবর, সম্পাদকীয়, নিবন্ধ প্রকাশ বা আলোচনা করেনি। রভিশের বক্তব্য, গোদি মিডিয়ার এমনই হাল যে রাহুলকে সাংবাদিকের ভূমিকায় নামতে হয়েছে।

ছাত্র-রাজনীতি থেকে উঠে আসা জাঠ নেতা সত্যপাল উত্তরপ্রদেশের চৌধুরি চরণ সিংহের ভারতীয় ক্রান্তি দলের হয়ে ভোটে জিতে বিধানসভায় এসেছিলেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত তিনি ওই রাজ্য থেকে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত জনতা দলের লোকসভা সদস্য ছিলেন। ভারতীয় লোকদল, জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি-সহ সহ নানা দল ঘুরে ২০০৪ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১২ সালে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে তিনি বাঘপথ থেকে ভোটে জিতে লোকসভা সদস্য হয়েছিলেন, কেন্দ্রের মন্ত্রীও ছিলেন। পরে মোদি সরকার তাঁকে বিহার, জম্মু-কাশ্মির, গোয়া ও মেঘালয়ের রাজ্যপাল নিযুক্ত করে। গত বছরই মেঘালয়ের রাজ্যপাল হিসাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়েছে। এহেন সত্যপালের অভিযোগকে তাই গুরুত্ব দিতেই হয়।

২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীনগর-জম্মু জাতীয় সড়কে সামরিক কনভয়ে ২০০ কেজি বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি নিয়ে আত্মঘাতী হানায় চল্লিশজন জওয়ানের মৃত্যু হয়, পঁয়ত্রিশজন আহত হন। কাশ্মিরে ভারী তুষারপাত ও ধসের জন্য জম্মুতে আটকে থাকা চার হাজার সিআরপিএফ জওয়ানের বড় অংশকে বিমানে চড়িয়ে কাশ্মিরে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে জওয়ানদের নিরাপত্তা বজায় থাকবে, সময় কম লাগবে, খরচ কম হবে। সেই আবেদন চার মাস ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে পড়ে ছিল। মন্ত্রক শেষ পর্যন্ত বিমানের আবেদন খারিজ করে দেয়। বাধ্য হয়ে ২৫৪৭ জন সিআরপিএফ জওয়ানকে নিয়ে ৭৮টি সামরিক গাড়ির কনভয় সড়কপথ ধরেছিল। এত বড় কনভয় বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কখনও রাস্তা দিয়ে যায় না। কনভয়ে সাধারণত ৪০-৫০টি গাড়িতে ৩০০-৪০০ জন জওয়ান থাকে।

সত্যপাল বলেন, আমার কাছে বিষয়টা আসেনি, এলে আমি কিছু করতাম, পাঁচটা বিমান আমিই ঠিক করে দিতাম। এর আগে বিরূপ আবহাওয়ার জন্য ছাত্রছাত্রীরা জম্মুতে আটকে থাকলে আমি দিল্লি থেকে বিমান আনার ব্যবস্থা করেছি। দিল্লিতে বিমান ভাড়া পাওয়া যায়।

শ্রীনগর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পুলওয়ামা জেলার লেথপোরার কাছে জাতীয় সড়কে জইশ-ই-মোহম্মদের সুইসাইড বম্বার গাড়িভর্তি বিস্ফোরক নিয়ে কনভয়ের ৫ নম্বর বাসে ধাক্কা মারে। গাড়িটি লিঙ্ক রোড থেকে জাতীয় সড়কে উঠেছিল। এইরকম আত্মঘাতী হানার কোনও নজির ছিল না। তাই কনভয় চলার সময় যানচলাচল স্বাভাবিকই থাকত, নাগরিক যান প্রয়োজনে কনভয়কে ওভারটেক করত, কনভয়ে ঢুকেও পড়ত।

বিস্ফোরণের পর অনেকে বলেছিলেন যে, কাশ্মিরে জারি থাকা নজরদারি ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক নিয়ে গাড়িটির চলাচল গোয়েন্দাদের বা নিরাপত্তা সংস্থার নজরে আসেনি এমন হতে পারে না। পরে জানা যায়, দুর্ঘটনার ছ-দিন আগে আইবি (ইন্ট্যালিজেন্স ব্যুরো) সিআরপিএফ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল, “প্লিজ স্যানিটাইজ দ্য এরিয়া প্রপারলি, অ্যাজ দেয়ার আর ইনপুটস অফ ইউজ অফ আইইডি।” তবে কী ধরনের আক্রমণ হতে পারে, তার স্থান, তারিখ বলা হয়নি। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা খোঁজ নিয়ে এক বছর পরে জানিয়েছিল, ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা চলছে জানিয়ে ওই বছর ২ জানুয়ারির থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অন্তত ১১ বার গোয়েন্দারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে সতর্ক করেছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অবহেলাতেই সামরিক বাহিনির উপর ওই ভয়াবহ আক্রমণ হয়েছিল।

ওদিকে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনি হাইওয়ে স্যানিটাইজড করেনি, লিঙ্ক রোডও না। কনভয় যাওয়ার সময় রেওয়াজই হল, দাঁড়িয়ে থাকা জিপসি গাড়ির পুলিশ লিঙ্ক রোডের গাড়ি আটকে রেখে আগে কনভয়কে যেতে দেবে। সেদিন তা করা হয়নি। হামলার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যপাল দেখেছিলেন দশ কিলোমিটারের মধ্যে আট-দশটা লিঙ্ক রোড রয়েছে।

মোদি সেদিন করবেট ন্যাশনাল পার্কে শুটিং-এ ব্যস্ত ছিলেন। হামলার পর তিন-চার বার চেষ্টা করেও সত্যপাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। বিকেল পাঁচটা কি ছটা নাগাদ তিনি সত্যপালকে ফোন করেন। সত্যপাল তাঁকে বলেন, এখানে অনেক জওয়ান মারা গেছে, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতিতেই মরেছে। আমরা যদি সিআরপিএফকে বিমান দিতাম তাহলে এটা হত না। মোদি তাঁকে বলেন, নেহি নেহি, তুম আভি চুপ রহো, ইয়ে কুছ অউর চিজ হ্যায়, এ নিয়ে কিছু বোলো না। এক ঘন্টা পরে তাঁর মিরাটে আইন পড়ার সহপাঠী, তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালও তাঁকে মুখ বন্ধ রাখতে বলেন। বলেন, না না, এ নিয়ে কিছুই বোলো না। এরই মধ্যে তিনি দুটো চ্যানেলে এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। সত্যপাল ভেবেছিলেন তদন্তে প্রভাব পড়বে ভেবেই এসব বলছে। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর শুনলেন এরা বলছে পুলওয়ামার শহিদদের মনে রেখো, আমরা এই করব সেই করব। আজ পর্যন্ত ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তি হয়নি।

জঙ্গি হামলা নিয়ে প্রথম থেকেই সত্যপালের মনে সংশয় ছিল। গোয়েন্দাসূত্রে বিপদের আশঙ্কা সত্ত্বেও ২০০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে একটা গাড়ি দশ দিন ধরে পুলওয়ামাতে ঘুরে বেড়াল কী করে? তিনি রাহুল গান্ধির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি বলব না যে এরাই করেছে, কিন্তু গোয়েন্দাদের খবরকে এরা অবজ্ঞা করেছে এবং জঙ্গি হামলার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। সত্যপালের মনে হয়েছিল, পাকিস্তানের দিকে আঙুল উঠতে চলেছে, ঘটনার দায় পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে সামনের লোকসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী ফায়দা তুলতে চান। হলও তাই, মোদি প্রতিশোধ হিসাবে পাকিস্তানে সামরিক হানার কথা বললেন। ভারতীয় যুদ্ধবিমান খাইবার পাখতুনখোয়ার বালাকোটে ঢুকে জঙ্গি প্রশিক্ষণের ঘাঁটি ধ্বংস করেছে— এই আখ্যান সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়াল। একের পর এক লোকসভার নির্বাচনী জনসভায় মোদি সবিস্তারে পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিতে সফল হানার কথা বললেন। বললেন, ভোট দেওয়ার সময় পুলওয়ামার ঘটনা, বালাকোটের বদলার কথা মনে রেখো। তাই জাতীয়তাবাদের হাওয়া তুলে ভোটে জিততে বিজেপির কোনওই অসুবিধা হয়নি।

অথচ পৃথিবীর সেরা সংবাদমাধ্যমগুলিতে জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংসের কথা বলা হয়নি, উপগ্রহ চিত্রে লক্ষ্যস্থলে বোমা পড়তে দেখা যায়নি। বরং একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল ভারতীয় বিমান হানায় কয়েকটি গাছ ভেঙে পড়েছিল মাত্র। অঞ্চলের বাসিন্দারা রাতে বোমার আওয়াজ শুনে সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাই দেখেছিলেন। ওদিকে পাকিস্তানি বায়ুসেনাও দিনেরবেলা প্রতি-আক্রমণ করে বসতিহীন অঞ্চলে বোমা ফেলে, এবং আকাশসীমা পেরোনো ভারতীয় মিগ-২১ যুদ্ধবিমান মাটিতে নামিয়ে উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্থমানকে আটক করে। পুলওয়ামা বা বালাকোট— দুটোই ছিল ভারতীয় প্রতিরক্ষার ব্যর্থতা। অথচ ব্যর্থতাকেই ভোটের আগে গোদি মিডিয়া ভারতের যোগ্য জবাব বলে তুমুলভাবে প্রচার করে।

ঘটনার প্রায় দু-মাস পরে, ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে, এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিদেশি সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্যদের ভারতীয় বিমানহানার অকুস্থল দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। ভারত দাবি করেছিল মাদ্রাসায় জইশ-ই-মোহম্মদের জঙ্গি ঘাঁটি বিমানহানায় ধ্বংস হয়েছে, বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে। সাংবাদিকরা বলেছেন, সেখানে কোনও জঙ্গি ক্যাম্প ছিল না। তারা মাদ্রাসা বিল্ডিং অক্ষতই দেখেছেন। মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২৫০০ হলেও সেদিন উপস্থিত ছিল ১৫০-২০০ জন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই অঞ্চলে বোমা পড়ার পর মাদ্রাসা অনেকদিন বন্ধ ছিল। বিস্ফোরণে একটি বাড়ির সামান্য ক্ষতি হয়েছে, একজন আহত হয়েছেন। সাংবাদিকরা মাটি থেকে উপড়ে যাওয়া গাছ এবং মাঝারি মাপের গর্ত দেখেছেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ভারতের বোমা বিস্ফোরণের ফলেই ওইসব হয়েছে। এই হল ভারতের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার প্রতিশোধের চরিত্র।

 

সাক্ষাৎকারে করণ থাপারকে সত্যপাল বলেন, একথা বলাই যায় যে দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রীর ঘেন্না নেই। তিনি বলেন, কাশ্মিরের রাজ্যপাল থাকার সময় প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আরএসএস নেতা রামমাধব এবং জম্মু-কাশ্মিরের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী হাসিব দ্রাবু দুটি প্রকল্প নিয়ে তাঁর কাছে দরবার করতে এসেছিলেন। রামমাধব এসেছিলেন মুকেশ আম্বানির সংস্থা রিলায়েন্সের বিমা প্রকল্প নিয়ে। অথচ জম্মু-কাশ্মিরের সরকারি কর্মচারীদের জন্য চালু বিমা প্রকল্প ছিল যথেষ্ট ভাল। হাসিব দ্রাবু এসেছিলেন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দরবার করতে। প্রকল্প দুটিতে সায় দিলে সত্যপাল তা পাশের জন্য দেড়শো দেড়শো তিনশো কোটি টাকা ঘুষ পেতেন। দুটিই তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন।

এই কথা বলার পর রামমাধব তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন। সত্যপাল বলেন, ওসব হুমকিতে আমি ভয় পাই না, রামমাধব বলুন রাজভবনে তিনি কেন গিয়েছিলেন? কাশ্মিরের রাজ্যপাল থাকার সময় তিনি জানতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহের সঙ্গে বিভিন্নজনকে যোগাযোগ করতে বলা হয়। জিতেন্দ্র সিংহ এবং রামমাধবের ওইসব কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহকে জানিয়েছিলেন। কোনও লাভই হয়নি, জিতেন্দ্র তারপরেও সেই পদে বহাল ছিলেন।

গোয়ায় রাজ্যপাল থাকার সময় তিনি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বলেন, তিনি খবর নিয়ে জেনেছেন সত্যপালের ধারণা ভুল। সত্যপাল বলেন, মোদি যার কাছ থেকে খবর নিয়েছিলেন তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বসে টাকা তুলতেন। সে-কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলার পরের সপ্তাহে তাঁকে গোয়া থেকে মেঘালয়ে বদলি করা হয়। ঠিকঠাক বিমান না পেয়েও তড়িঘড়ি বায়ুসেনার লড়ঝড়ে বিমানে তাঁকে মেঘালয়ে পাঠানো হয়েছিল।

করণ সত্যপালকে প্রশ্ন করেন, হাসিব দ্রাবু, রামমাধব, মুকেশ আম্বানি— সবাই কি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ? সত্যপাল বলেন, অবশ্যই।

করণ থাপার তাঁকে বলেন, আজ আপনি যা বললেন তাতে প্রধানমন্ত্রী অখুশি হবেন। তিনি বলেন, যতই নারাজ হোক, ঘটনা যা তা ঘটনাই। নরেন্দ্র মোদির ব্যাপারে সবার যে ধারণা আমার সেই ধারণা নেই। আমি যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি, দেখেছি কাশ্মির সম্বন্ধে তিনি অজ্ঞ, নিজের ধারণা নিয়েই সুখে থাকেন, বাকি সব উচ্ছন্নে যাক।

কথা প্রসঙ্গে সত্যপাল বলেন, আমি যখন কাশ্মিরের গভর্নর ছিলাম একবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, রাস্তায় রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফোন এল। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়েছে, কারণ রাষ্ট্রপতি ব্যস্ত রয়েছেন। এরপর বলেন, ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লিস্টও পিএমও-তে (প্রাইম মিনিস্টার্স অফিস) যায়। সেখান থেকে ক্লিয়ার হলে তবেই তাঁর সঙ্গে দেখা করা যায়।

করণ বলেন, প্রেসিডেন্ট মুর্মুর কথা বলছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ। করণ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তাঁর ইচ্ছেমতো মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না? তার মানে কি তিনি প্রধানমন্ত্রীর পাপেট? সত্যপাল বলেন, অবশ্যই। বিস্মিত করণ বলেন, এটা তো দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তির প্রতি অশ্রদ্ধা!

করণ ফের বলেন, এই কথাবার্তা কিছু লোক শুনবে, সরকার শুনবে, হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর কানেও যাবে। আপনার কি এ-ব্যাপারে কোনও দুশ্চিন্তাই নেই? সত্যপাল বলেন, আমার আর কী ক্ষতি করবে? জেলে পাঠাবে? অনেকবার জেলে গেছি। শেষে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে কাশ্মিরের ব্যাপারে কোনও কথা বলতে মানা করেছিলেন। একদিন তিনি বললেন, তুমি আবার কাশ্মির নিয়ে কথা বলেছ? বললাম, আমি নিজে কিছু বলিনি সে ইনফারেন্স টেনেছিল তাই। বললেন, ফের যদি কাশ্মির নিয়ে কথা বলো তাহলে তোমার সঙ্গে আর কখনওই দেখা করব না।

 

ইউটিউবের ভিডিওতে রাহুল গান্ধি সত্যপালকে বলেন, পুলওয়ামার ঘটনা শোনার পর জানলাম, শহিদদের দিল্লি বিমানবন্দরে আনা হচ্ছে। তাঁর নিরাপত্তা বাহিনি বলেছিল, আপনি যাবেন না। তিনি বলেন, যাব। শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে গিয়ে শুনলাম, প্রধানমন্ত্রী আসছেন। সেখানে শহিদদের মৃতদেহ রাখা ছিল, সামরিক বাহিনির লোকেরা ছিল। এরপর একটি ঘরে তাঁকে বন্ধ করে রাখা হয়। সেখানকার নিরাপত্তা রক্ষীরা বলেন, আপনি ঘর থেকে বেরতে পারবেন না। তিনি তাঁদের বলেন, আপনারা কী করে এরকম করছেন? পরে অনেক লড়াই করে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর মনে হয়েছিল যেন শো চলছে।

সত্যপাল বলেন, ঠিক তাই, প্রধানমন্ত্রীর শ্রীনগর যাওয়া উচিত ছিল। সেখানে রাজনাথ সিং এসেছেন, আমিও ছিলাম। আমরা শহিদদের শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েছি। দিল্লিতে নয়, প্রধানমন্ত্রীর সেইদিনই শ্রীনগর যাওয়া উচিত ছিল। তাঁর সবটাই ছিল দেখানেপনা। রাহুল বলেন, আমার মনে ধাক্কা লেগেছিল, যেন বড় কোনও ইভেন্ট হচ্ছে। গোটা দেশকে ঘটা করে দেখানো হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। ব্যাপারটা তাঁর খুব কুরুচিকর লেগেছিল।

সত্যপাল এবং রাহুল— দুজনের মতই, সত্যপাল পুলওয়ামা নিয়ে মুখ খোলার পরের দিনই বিষয়টা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের নজর ঘোরাতে পুলিশের হাতে উত্তরপ্রদেশের মাফিয়া আতিক আহমেদের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় (১৫ এপ্রিল), যেন সংবাদমাধ্যম সেই খবর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সত্যপাল যা বলেছেন তা লোকে বেশি জানতে না পারে। কয়েকদিন ধরে মাফিয়া হত্যাকাণ্ডটিই ছিল দেশের প্রধান খবর। একমাত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা সত্যপালের সঙ্গে করণ থাপারের সাক্ষাৎকারটি নিয়ে খবর করেছিল।

‘দ্য ওয়ার’-এর সাক্ষাৎকারের এক সপ্তাহের মধ্যে সত্যপালের কাছে সিবিআই-এর সমন গিয়েছিল। ঠিক যেমন আদানিকে নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুললেই এজেন্সি লাগিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। মহুয়া মৈত্র, সঞ্জয় সিংহ, নিউজক্লিক— সর্বত্রই একই ঘটনা ঘটছে। সত্যপাল বলেন, আমি সিবিআইকে বলেছি, যাদের নামে অভিযোগ করেছি সেই রামমাধব, হাসিব দ্রাবু, জিতেন্দ্র সিংহদের কাছে যান।

এর কিছুদিন পর তিনি হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ ও পঞ্জাবের খাপ পঞ্চায়েত নেতাদের বাড়িতে ডেকেছিলেন। তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল দিল্লির আর কে পুরমে তাঁর বাড়ি সংলগ্ন পার্কে। দিল্লি পুলিশের বিরাট বাহিনি খাপ নেতাদের আটক করে তারা থানায় নিয়ে যায়। সত্যপালও সেখানে পৌঁছে যান। পুলিশ জানায়, ওই পার্কে সভার অনুমতি নেই। তিনি জানান, সেখানে সভার আয়োজন করা হয়নি। বাড়িতে জায়গা কম বলে সেখানে অতিথিদের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়েছিল মাত্র। কিছু পরে সবাই ছাড়া পান।

সত্যপাল রাহুলের কাছে আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও মুখ খুলেছেন। আদানির কুড়ি হাজার কোটি টাকার লগ্নি জোগাড় করা নিয়ে রাহুলের মতই তাঁর মত বলে জানিয়েছেন।[1] সত্যপাল বলেন, আদানির স্বার্থরক্ষার জন্যই সরকার কৃষক আন্দোলনের পর ফসলের ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও আজও তা করেনি। কারণ, আদানিরা বড় বড় গুদাম তৈরি করে সস্তায় ফসল কিনে সেখানে রেখে পরে বেশি দামে তা বিক্রি করার পরিকল্পনা করে রেখেছে। কৃষি আইন প্রত্যাহার করা হলেও কেন আদানিকে সুবিধা দিয়ে ওই আইন তৈরি করা হয়েছিল সরকার তার উত্তর দেয়নি।

রাহুল তাঁকে বলেন, আপনি যখন জম্মু-কাশ্মিরে ছিলেন তখন সময় বড় কঠিন ছিল। তিনি বলেন, আমার মতে কেউ ফৌজিদের দিয়ে কাশ্মিরকে জোর করে দাবিয়ে রাখতে পারে না। ওখানকার মানুষের মন জয় করে যা খুশি করতে পারে।

জম্মু-কাশ্মিরকে কেন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বানানো হল— রাহুলের এই প্রশ্নের উত্তরে সত্যপাল বলেন, এটাই কাশ্মিরিদের সবচেয়ে বড় দুঃখ। ইদের সময় হলেও কাশ্মিরি পুলিশ কিন্তু ফুলটাইম ডিউটি করত। ইদের মাসেও কেউ ছুটি চাইত না, লাইনেই থাকত। তারা এতটাই সরকারের অনুগত এবং বিশ্বস্ত। কাশ্মিরের মানুষ আর্টিকেল ৩৭০ বাতিলের জন্য যত না আহত হয়েছে, রাজ্যের মর্যাদা খুইয়ে তার চেয়ে ঢের বেশি আঘাত পেয়েছে। তাঁর মতে, পুলিশ বিদ্রোহের ভয়েই রাজ্যটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়েছে। অমিত শাহ কিন্তু কথা দিয়েছিলেন, রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেবেন। এখনই তা করা দরকার, তারপর দরকার নির্বাচন করা। তবু তা করছে না। বলে, অধিকার ফিরিয়ে দেব বলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু কী দরকার, সব তো ঠিকই চলছে!

তিনি বলেন, কোথায় ঠিক চলছে? সন্ত্রাসবাদ ফিরে এসেছে, জায়গায় জায়গায় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ ঘটছে। রাজৌরি, আপার কাশ্মির ভ্যালিতে রোজই কিছু না কিছু ঘটছে। রাহুল বলেন, আমি জম্মুতে গিয়েছিলাম, জম্মুর লোকেরও সেটাই আক্ষেপ, কাশ্মিরের রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে।

সত্যপালের মতে, সামরিক ক্ষেত্রে অগ্নিবীর প্রকল্প প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিপদ ডেকে আনবে, চার বছরের চাকরি নিয়ে কে আর সীমান্তে প্রাণ দিতে যাবে! ওদিকে প্রতিটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাথায় সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠদের বসানো হচ্ছে। যে মানুষ কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার যোগ্য নয়, আরএসএসের দৌলতে সে এখন ভাইস-চ্যান্সেলর হচ্ছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাকেন্দ্রে আরএসএস এইভাবে প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে।

ওদিকে গত বছর মে মাসের ৩ তারিখ থেকে অশান্ত হওয়া মণিপুরে আজও শান্তি ফেরেনি। কুকি ও মেইতেইদের চরম বিভাজন এতটুকু কমেনি। এই অচলাবস্থা কেন্দ্রের ব্যর্থতা বলেই মনে করেন সত্যপাল। আজও মোদি সেখানে যাননি, মণিপুর নিয়ে কোনও সদর্থক বার্তা দেননি।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার সময় রাজনীতি একরকম কর্তব্যই ছিল, পরে তা পেশা হল, এখন ব্যবসা হয়ে গেছে।

এভাবেই দেশ চলছে।

 

তথ্যসূত্র:

 


[1] রাহুলের প্রশ্ন ছিল, “কী করে হঠাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা আদানির সাজানো কোম্পানিতে (কয়েকটি সামরিক কোম্পানি) এল? এ কার টাকা?” রাহুলের বক্তব্য এ টাকা নরেন্দ্র মোদির।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...