বাল্মীকি

অভিষেক ঝা

 

এর চেয়ে সন্ধ্যাবেলা বন পার করে চা-বাগানের পুরনো বাংলোয় আসা আর গল্প বলে মদটদ খেয়ে রাতের বেলা সেই বন দিয়ে দাঁতালের ভয় বুকে করে নিজের বাড়ি ফিরে আসা ঢের সোজা একখান কাজ। এইরকম ভারী কাজ আগে কি সে কোনওদিন করেছে? কী করবে, কোনদিকে যাবে, গেলেই যে বাঁচার রাস্তা পেয়ে যাবে এমন তো কথা নেই— এইসব ভাবতে ভাবতেই তার হাতে, পায়ে, চোখে সেই সময় এসে হাজির হয়ে গেল। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই যেখানে একমাত্র সত্য।

—ঘটনাটা কবে ঘটেছিল তাই তুমি এক্স্যাক্টলি জানো না! একবার বলো ওই বড় বন্যার আগে, একবার বলো পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের বছর, তারপর বললে যে-বছর বনে অনেক গাছ কাটল ডিপার্টমেন্ট— কাটিয়ে দিতে না পেরে তাকে এই সমস্ত কথা বলছিলেন বড়বাবু আধঘন্টা আগে।
—যে বছরই ঘটুক না কেন দুর্গাপূজার সময় ছিল— শক্ত চোয়ালে জবাব দেয় সে।
—দাঁড়াও, বড়বাবু চেয়ার থেকে উঠে পড়ে।

এদের এইসব ফিকির খুব ভাল করেই জানে সে। একটু পরেই বলবে বন্যার আগের সবকিছু ভেসে গেছে। এমন মুখ করে বলবে মনে হবে যেন আপিসের পাশের ওই শুকনা ঝোরাটা দিয়ে আটষট্টি সালে তিস্তা বইত। আর দু-চারদিন এভাবে ঘোরাতে পারলে সে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেবে, এই আশা তাদের আছে। সে কি মুখ দেখতে সঙ্ঘ করে! নাকি শুধু মুখ দেখাতে এত বছর ধরে সঙ্ঘের শিবিরে গেছে! নাকি সঙ্ঘের লোকজনকে এমনি এমনি সাহুরাম বনছায়ায় রাতের পর রাত কাটাবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে! বাইরের বেঞ্চে বসে সে বড়বাবুকে চাপ দিতে এরপর কী কী বলবে তার ছক কষছিল। খানিক দূরে জঙ্গল সাফারি করতে আসা টুরিস্টদের একজন কী একটা পাখির ডাক শুনতে শুনতে তার দিকে এগোল।

—কী মিষ্টি ডাক! দাদা আপনি তো লোকাল? এই স্কারলেট মিনিভেটের, মানে এই পাখিটার লোকাল নামটা যদি বলেন…।
—জানি  না।

পিছনে বাঁশ ঢুকে আছে আর এই মাল এখন লোকাল মারাতে এসেছে! অন্য সময় হলে বানিয়ে বানিয়ে বলে  দিত কিছু একটা। এই লাইনে বিশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানে এই টাইপের লোকজন ‘থিতুং’, ‘ঙাচ্চি’ এই গোছের নাম শুনলে খুব খুশি হয়। এইরকম চাপ না থাকলে এই মালটাকে পাখির নাম বলে, পাখিটা নিয়ে একটা বানিয়ে বানিয়ে গল্পও শুনিয়ে দিত, সঙ্গে বসে দু-এক পেগ অ্যাবসলিউট বা টির্চাস জুটেও যেতে পারত। সঙ্ঘ তাকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার আগে অফসিজনে গল্প বলেই টাকা কামাত বেশ খানিক। আর তার মালের অভিধানে হাঁড়িয়া, জোশ, ওসি, ম্যাজিক মোমেন্ট এইসব নাম ছাড়িয়ে নতুন নতুন এন্ট্রি হত। তবে এই মদলাভের জন্য সে আগাপাশতলা কৃতজ্ঞ গ্যব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কাছে। মূলত অফবিটওয়ালারাই ছিল তার কাস্টমার। এদের পকেটে থাকে একাধিক ক্রেডিট কার্ড। জঙ্গলে ডিজে বাজানেওয়ালা বড়লোকদের চেয়ে এরা নিজেদের আলাদা ভাবতে ও ভাবাতে ভালবাসে। এদের লোকাল মেয়েদের সঙ্গে টাকা ফেলে শোওয়ার ইচ্ছা হলেও, মুখে রা কাটবে না। কেডস পরে লোকালদের নাচে এদের রুচি নেই কারণ তা অথেন্টিক আদিবাসী নাচ নয়। এবং এদের কাঁধে থাকে গোটা দুনিয়ার ভার। মালগুলার সঙ্গে উঠবস করতে করতে এইগুলো সে শিখে নিয়েছিল অতি দ্রুত।

—ম্যাডাম, স্যার ডেন্স ফরেস্ট ক্রস করে আমাদের ইন্ডিজেনাস দ্য ওল্ড ওরাল ন্যারেটর চলে এসেছেন। আপনাদের বনফায়ারের প্যাকেজে ইনক্লুডেড এই অঞ্চলের অথেন্টিক লিভড এক্সপিরিয়ন্সের গল্প শোনাতে। কোনও রেকর্ডিং অ্যালাউড নয়।

যতটা গম্ভীর হয়ে বলা সম্ভব তার চেয়েও বেশি গম্ভীর হয়ে কথাটা বলতে হত এই কলোনিয়াল টি রেসিডেন্সির ম্যানেজারকে। এক রাউন্ড গাঁজা টেনেই আসে সে বরাবর। কাঠ জ্বলতে সময় নিত একটু। না বেঁচে থাকলে কীভাবে বলা যায় গল্প? চেয়ার পাতা হচ্ছে। কেউ যদি নাই বেঁচে থাকে তাহলে সে গল্পটা বলবে কী করে!  মদের গ্লাসের ব্যবস্থা করেছিল যে সে জানত না ওয়াইনও খাবে কেউ কেউ। গল্প বলতে গেলে তো বেঁচে থাকতেই হবে। স্কচের গ্লাসে ওয়াইন খেলে গল্প শোনা আর মদের মজা পুরোটাই মাটি হতে পারে কেউ কেউ এই আশঙ্কা প্রকাশ করায় ওয়াইন গ্লাসের ব্যবস্থা হচ্ছে। বাঁচা শেষ হয়ে গেলে কি গল্প বলা যায়? লম্বাটে ওয়াইন গ্লাস নিয়ে আসছিল রেসিডেন্সির এক কর্মী। লিভড কথাটা ম্যানেজার ভুল বলেছে, লিভিং হবে ওইটা। হোয়াইট ওয়াইন নয় তো। সে লিভিং তাই সে গল্প বলছে। ডার্ক রেড ওয়াইন জোর দিয়ে বলেছিল একজন। লিভড হয়ে গেলে সে নিজেই তো গল্প। এই তো পার্ফেক্ট গ্লাস আনা হল। গল্প কখনও নিজেই গল্প বলতে পারে নাকি?

—নিন, শুরু করুন। ওয়ান্স আপন এ টাইম…

গল্প বলতে গেলে লিভিং হতে হবেই।

—এই তুমি ফাজলামি মেরো না প্লিজ।

সে গল্প শুরু করে।

ঘটনাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই নয়। আকছার ঘটে থাকে। ফি-বছরই এখানকার দু-একটা লোক হাতির পায়ে মারা না গেলেই সেইটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন অস্বাভাবিক হত সাহুরামের খগেনের মাকে নিয়ম করে না পেটানো। হাটবারের দিন জুয়ায় টাকা খুইয়ে হাঁড়িয়া খেয়ে ফেরার সন্ধ্যায় সাহুরাম দু-চারটা চড় বেশি মারত বউকে, সেদিন ছেলেকেও লাথি মারত— একদম টিপিক্যাল গল্পের মতো। কিন্তু খগেন অসুরের কেসটা একটু আলাদা। প্রথমত সাহুরামের ছেলে বাকিদের মতো কপাল মেনে চলা বান্দা নয়। পলিটিক্সের গুরুত্ব সে বোঝে। তবে খগেন সরাসরি রাজনীতি করে না। ও সঙ্ঘের লোক। সঙ্ঘের অন্যতম মুখ এই এলাকায়। ক্লাস সিক্স অব্দি মিশনারি ইস্কুলে পড়েছে।  ইংরেজি লিখতে, পড়তে, বলতে পারে ঝরঝরে। জলপাইগুড়ির বড় চার্চে ঘন ঘন আট বছরের খগেনকে নিয়ে যাচ্ছে এখানকার পাদ্রিঠাকুর। খগেনের মাকে পুরো বাড়ি-সহ খ্রিস্টান হওয়ার প্রস্তাবও দিলেন পাদ্রিঠাকুর। বছর দশেক আগে হলে দোনোমোনা করে রাজিও হয়ে যেত সাহুরামের বিধবা। কিন্ত এখন শিবের পূজা ধরে নিয়েছে বছর পাঁচেক। তাই দোনামোনা বাড়ে দিন দিন। ছেলের সকাল সন্ধ্যা খালি বাইবেল পড়ার ঝোঁক দেখে ভয়ের চোটে খগেনের মা তাকে ইস্কুল ছাড়িয়ে দেয়। তখনও খগেন মাঝে মাঝে বনে শুরু হওয়ার ঠিক আগে শিমুলগাছের নিচে বসে বাইবেলের রকমারি গল্প শোনাত গ্রামের ছোটদের। বড় রাস্তা থেকে গাড়ি করে যেতে যেতে এসব বন দেখলে বেড়াতে আসা লোকদের মনে হয় সভ্যতার বুঝিবা  এখানেই শেষ। এই শেষের ভিতরের গ্রামগুলোয় খগেন গল্প বলে। অযোধ্যার গল্প বলে, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের হিন্দুদের গল্প বলে। কখনও কখনও একটা শিমুলগাছও জুটে যায় খগেনকে সঙ্গত দিতে। পড়লে খগেন হয় বড় চার্চের পাদ্রি হত, নইলে সরকারি অফিসার হত— এই নিয়ে গাঁয়ের তারই বয়সি বুড়াদের মনে কোনও সন্দেহ নাই। বাংলাও বলতে পারে একদম ভদ্রলোকদের মতো। কৃষ্ণনগরের একটা হোটেলে কাজ করেছে দশ-পনেরো বছর। দশ-বারো বছর হল একটা চা-বাগানের বাংলো রেসিডেন্সিতে আসা বাবুদের সন্ধ্যাবেলা ভুজুংভাজুং গল্প আর গাঁজা সাপ্লাই দিয়ে একটু-আধটু কামাতে শুরু করে। জমিয়ে গল্প বলতে পারে তিন-চারটা ভাষায়। ওটাই যোগ্যতা। সিএএ চাই, এনআরসি চাই, এনআরসি চাই, সিএএ চাই করে লাফানোর সময় বাকি অনেক লোকের মতো ওরও খেয়াল ছিল না যে ওর বাপের এক ছটাক জমিও ছিল না। ওর বাড়িতে ওর আগে ইস্কুলেও যায়নি কেউ। আর বনের ভিতরের গ্রাম হওয়ায় বসতবাড়ির পাকা পর্চাও নাই। যতই সঙ্ঘ বলুক আদিবাসীদের কোনও ভয় নাই, খগেন ভয় পেল। ও আগে মানুষ, তারপরে আদিবাসী। আর এগুলোতে ভয় মানুষমাত্রই পায়। খগেনের নিজের বেটা, বেটার বেটা, এমনকি না জন্মানো বেটার বেটার জন্য চিন্তা হতে থাকল। শুধু চিন্তা করে শুকিয়ে মরার লোক সে নয়। সাহুরামের ছেলে চালাকচতুর। মাথা খাটাতে শুরু করে দিয়েছিল শুরুর দিন থেকেই। হাতির পায়ে বাপের মরার পর বাপের স্মৃতিতে গ্রামের নাম পালটে করা হয়েছিল সাহুরাম বনছায়া। নিশ্চয় হাতির পায়ে বাপের মরার কথা ফরেস্টের কাগজপত্রে থাকবে। ঘটনা তো একাত্তরের আগেই। কোনও একটা দুর্গাপূজার সময় ঘটেছিল। খগেনের স্পষ্ট মনে আছে গল্পটা। তাহলে সেই কাগজ আর ওর ভোটার কার্ড দিয়েই অঙ্ক মিলিয়ে দেওয়া যাবে। ব্যস আর কোনও চিন্তা নাই। কিন্তু কাগজ যে জঙ্গলের চেয়েও ঘন হয়ে আসা এক পথ এই আন্দাজ তার আগাম ছিল না। তিরিশ বছর আগে হলে বড়বাবু টেবিল থেকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। মুখের উপর বলেও দিতেন হয়তো, দা, কুড়াল, পান্টি ছেড়ে নিজের কাগজও দেখবে এখন! এরপর তো আমার কাগজও দেখতে চাইবে! খগেন অসুরকে এই কথা বলার ইচ্ছা ও সাহস দুই-ই বড়বাবু এখনও রাখে। কিন্তু যখনই বৃদ্ধ এই অসুরের পেছনে শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপের মতো বিকটাকার মোহন ভাগবতের ছায়া দেখতে পায়, তার সাহস কমতে শুরু করে। তারপরেও সাহস জুটিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা হলে সেই বিশ্বরূপের বিবিধ মুখগুলো তার সামনে স্পষ্ট হতে থাকে। সত্যি বলতে কি জাতে বদ্যি বড়বাবুর জায়গা থেকে মোদি, শাহকে অতটাও ভয়ানক বিপজ্জনক লাগে না। কেজরিওয়ালের মুখকে তো তার বড় আপনই ঠেকে ওই বিশ্বরূপে। ভয় পাওয়া শুরু হয় যখন সেই বিশ্বরূপ তার কাছাকাছি মানুষদের মুখের আকার দেখাতে শুরু করে। দিদির ফোন এলে কী করবে? এই বয়সে বাঁকুড়া বা সুন্দরবনের জঙ্গলে ট্রান্সফার করে দিলে? ভয় আরও এগিয়ে আসে। দিদির আগেই তো আসবে লোকাল বিধায়ক, তারও আগে পঞ্চায়েত প্রধান। ন্যাংটো করে জুতা মাথায় নিয়ে গোটা রাস্তাও হাঁটাতে পারে। ভয়াল সেই বিশ্বরূপ বড়বাবুকে দিয়ে বলায়, দাঁড়াও। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে এই কথা বলতে বলতে। এদের এইসব ফিকির খুব ভাল করেই জানে সে। একটু পরেই বলবে বন্যার আগের সবকিছু ভেসে গেছে। এমন মুখ করে বলবে মনে হবে যেন আপিসের পাশের ওই শুকনা ঝোরাটা দিয়ে আটষট্টি সালে তিস্তা বইত।

—তুমি বড়সাহেবের আপিসের সামনের বেঞ্চটায় বসো খগেন। আমি কথা বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করছি।

কানের লতি চুলকাতে চুলকাতে বড়বাবু বড়সাহেবের অফিসে ঢুকে গেলেন। সামনের বেঞ্চে বসে আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করে সে। বিরক্তিকরভাবে একটা পাখি ডেকে চলেছে। একটা টুরিস্ট এগোচ্ছে এই অফিসের দিকে।

—চলো, কাজ হয়ে যাবে তোমার, বড়বাবুর মুখে স্বস্তি।

 

—আমরা অসুর জনজাতি। এখানে খুবই অল্প রয়েছি সংখ্যায়। আগে আমদের দুর্গাপূজায় অংশ নিতে দেওয়া হত না। এখন হয়। একদম নীরস গলায় গল্প শুরু করে খগেন অসুর।
—এখনই হুদুর দুর্গার গল্প শুনতে হবে। জনি ওয়াকার ব্ল্যাকে চুমুক দিয়ে বলে ওঠে কেউ।
—হুদুর দুর্গা পুরোটাই একটা ঢপবাজি। আমরা কোনওকালে হুদুর দুর্গার নামই শুনিনি। এখন জোর করে আমাদের উপর চাপানোর চেষ্টা চালালেই তো আর হল না। তার গলার শীতলতা সামনের জন্যের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। যাই হোক এই গল্প না হুদুর দুর্গার, না অসুর জনজাতির। গল্পটা আমার পাপের। আর বাবার স্যাক্রিফাইসের। আর মহাকালের। সেই গা শিউরানো ভয়াবহ দৃশ্য এই জন্মেই কি দেখেছিলাম? যাই হোক যা বলছিলাম… আমার বাবা ছিলেন ট্রু জেন্টলম্যান। আমার মাকে খুবই যত্নে রাখতেন, ডমেস্টিক কাজে হেল্প করতেন প্রচুর। আমায় কোনওদিন মারেননি। খুবই রেয়ার মানুষ। সেই সময় দুর্গাপূজার সময় বাড়ি থেকে বেরোতাম না আমরা। মেলায় যাওয়ারও নিষেধ ছিল। কিন্তু আপনারা তো জানেনই নিষিদ্ধ মানেই মানুষের অদ্ভুত একটা চোরাটান থাকবেই। জাস্ট লাইক দ্য ফরবিডেন ফ্রুট অফ ইডেন। জানলে হাসবেন হয়তো, আমার ক্ষেত্রে সেই ফ্রুট অফ ইডেন ছিল লটকা। বুবিও বলে থাকে। বুবির জন্য আমি সব করতে পারতাম, সব। হলদে সবুজ অল্প শক্ত খোসা। হাতের ইষৎ চাপ দিলে ফট করে ফেটে বেরিয়ে আসে সেই সাদা তুলতুল। লটকা মুখে দিলেই চোখ বুজে আসত আমার…।

তার বাক্যের মাঝেই তাকে থামিয়ে একবার কেউ বলেছিল যে মার্কেজ নামে কারও একটা কী একটা হোরস বলে বইয়ে ফলের বাগানের রাতের ইরোটিক বর্ণনা আছে। পরদিনই মোবাইল খুলে পড়াশুনা করে নিয়েছিল ফেলে না রেখে।

—জানলে হাসবেন হয়তো, আমার ক্ষেত্রে সেই ফ্রুট অফ ইডেন ছিল লটকা। বুবিও বলে থাকে কেউ কেউ। বুবির জন্য আমি সব করতে পারতাম, সব। আপনারা শিক্ষিত মানুষ তাই আপনাদের জানাই বুবির সাদা তুলতুল মুখে দিলেই আমার অবস্থা হত মার্কেজের ‘মেমরিস অফ মাই মেলানকলিক হোরস’ বইটিতে যে নকটার্নাল বাগানের ইরোটিক বর্ণনা আপনারা পড়েছেন অনেকটা তারই কাছাকাছি। সাত বছরের বালক আর নব্বই বছরের বুড়োয় ফারাক থাকে না এইসব জায়গায়…

গল্পের এই অংশে মার্কেজের নাম জোড়ার পর থেকেই তার দিকে গ্লাসে ঢেলে মদ এগিয়ে দিত কোনও না কোনও ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা।

—সেই লোভেই দুর্গাপূজার মেলায় গিয়েছিলাম বন পেরিয়ে। নবমীর দিন সেইটা। কাউকে না জানিয়ে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়েছিলাম। বাপের পকেট থেকে দুটো দশ পয়সা নিয়ে। জিলাপি, পাঁপড় খেয়ে লটকা কিনলাম প্রচুর। আলো কমে আসছিল দ্রুত। ডাহুকডাকার দিকে তো কেউ ফিরবে না। ভাবতেই ভয় জড়িয়ে ধরল শীতের কামড়ের মতো। গামছায় লটকা বেঁধে রওনা দিলাম। খানিক এগোতেই বন যেন গিলতে আসছিল আমায়। চারপাশে অজস্র টগরগাছ জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে। একহারা টগর এমনভাবে ফুটে আছে মনে হচ্ছে তারারাই যেন নেমে এসেছে মাটিতে। টগরকে আমরা মরে যাওয়া অসুরদের বারবার ফিরে আসা বলে মনে করি। আমরা তো এই মাটিরই। স্বাভাবিকভাবে মরলে ফুল হয়ে ফেরত আসি। আর অপঘাতে মরলে রাতজাগা পাখি হয়ে জঙ্গল থেকে ডাক দিয়ে চলি ঘুমিয়ে থাকা নিজেদের রক্তের সম্পর্কদের। সেই সন্ধ্যায় ফুটে থাকা দুইধারের অজস্র টগরের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে ভয় কমে আসছিল আমার। মনে হচ্ছিল এই যে আমার মরে যাওয়া গ্র্যান্ডফাদার তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমার এক মাসি মরে গিয়েছিল কিছুদিন আগেই। একটা টগরের গাছকে দেখে মাসিই মনে হল। ফুল হয়ে ফেরত আসা স্বজনদের ভিতর হাঁটতে হাঁটতে বুঝিনি, সামনেই মহাকাল। এমন স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে যেন বা কালও থেমে আছে ওখানে কুচকুচে কালো হয়ে। বাঁচব না বুঝি। হঠাৎ সাদা টগরের বন থেকে একটা আলো দুলতে দুলতে বেরিয়ে আসে। যেন টগরের ভিতর থেকে মরে যাওয়া অসুরদের কেউ আলো হয়ে ভেসে এল। আলোটা মহাকালের দিকে এগোতেই চিনতে পারলাম। আলোটা আমায় খালি বলতে পেরেছিল, পালা। বাবা। আমাকে বাঁচাতে এসেছে আমার বাবা। কেন ছুট দিয়েছিলাম আজ আর মনে পড়ে না। শুধু পিছন ঘুরে পড়ে থাকা হ্যারিকেনের আলোয় যা দেখেছিলাম তা শুধু লুসিফারের দুনিয়াতেই সম্ভব। ওটা কি আদৌ মহাকাল ছিল? নাকি অন্য কেউ…

কাশির দমকে গল্পে একটু বিরতি নেয় সে। প্রতিবার কাসটমারদের সামনে গল্পের এই অংশে এসে তার কাশি ওঠে। একটু দূরের জঙ্গল থেকে কখন রাতচরা পাখির ডাক শুরু হবে তার ঠিক মাপা আছে। এই সময় জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে এলে সেইটা গল্পেরই অংশ হয়ে যেত।

 

ধুলোর পরতের পর পরত জমে থাকা একটা ঘরে তাকে হাজির করাল বড়বাবু। যা কিছু রেকর্ড এখানেই আছে। সাতটা কাঠের আলমারি দেখিয়ে বললো,

—১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ এখানেই আছে। কোন পাকিস্তান যুদ্ধের কথা তোমার মনে আছে, তা তো তোমারই মনে নাই, তাই এই সাত বছরেই খুঁজতে হবে। দুর্গাপূজা মানে সেপ্টেম্বর আর অক্টোবরেই হবে। ওই দুই মাসের ডকুমেন্ট ঘাঁটলেই পেয়ে যাবে। ইংরেজি তো তুমি পড়তে পারোই। এই ধূলায় আমি হাঁচির চোটেই মরে যাব। তুমি প্লিজ নিজে একটু খুঁজে নাও।

এর চেয়ে সন্ধ্যাবেলা বন পার করে চা-বাগানের পুরানো বাংলোয় আসা আর গল্প বলে মদটদ খেয়ে রাতের বেলা সেই বন দিয়ে দাঁতালের ভয় বুকে করে নিজের বাড়ি ফিরে আসা ঢের সোজা একখান কাজ। এইরকম ভারী কাজ আগে কি সে কোনওদিন করেছে? কী করবে, কোনদিকে যাবে, গেলেই যে বাঁচার রাস্তা পেয়ে যাবে এমন তো কথা নেই— এইসব ভাবতে ভাবতেই তার হাতে, পায়ে, চোখে সেই সময় এসে হাজির হয়ে গেল। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই যেখানে একমাত্র সত্য। মুখে গামছা পেঁচিয়ে খুঁজতে লেগে গেল সে নিজের বাপের মৃত্যুকে। ১৯৬৫-র ১৭ই সেপ্টেম্বর ডাহুকডাকায় পাঁচটি পুরানো শালগাছ কাটা হয়েছে। ১৯৬৫-র ১৮ই সেপ্টেম্বর ৫০টি নতুন শালগাছ লাগানো হয়েছে। ১৯৬৬-র ১৫ই অক্টোবর ১৭টি পুরানো সেগুনগাছ কাটা হয়েছে, ২২শে অক্টোবর ১০০টি নতুন সেগুনগাছ লাগানো হয়েছে। ১৯৬৮-র ৭ই অক্টোবর ৪ঠা অক্টোবরে বনের একটা বিটে বন্যার কথা আছে। ১৯৬৯-এর ২৩শে অক্টোবর একটা চিতাবাঘের মৃতদেহ পাওয়া গেছে ডাহুকডাকার কাছে। ১৯৭০-এর ২২শে সেপ্টেম্বর সাহুরাম বনছায়ায় ২৩টি পুরানো শালগাছ কাটা হয়েছে, ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৪৩টি নতুন শালগাছ লাগানো হয়েছে। ১৯৬৯-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর আর ১৯৭০-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সব রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখল সে। কোথাও সাহুরাম অসুরের মৃত্যুর উল্লেখ নেই। অথচ সে, তার গ্রামে তার বয়সি, তার চেয়ে বেশি বয়সি, সবার মনে আছে এই ঘটনা। দম বন্ধ হয়ে আসে তার। রাতে হাঁসফাঁস লাগে। ঘুম হয় না। একশো মিটার দূরের জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসে রাতের বুক চিরে। এতদিন ধরে সে এই ঘটনা গল্প বলে বলে তার ভিতর থেকে মরতে দেয়নি, তাইলে তার স্মৃতির একটুও মূল্য নাই? তার গল্প শালা শিক্ষিত ভদ্রলোকরা শুনে বাহবা দেয়, সেই গল্পের আসল ঘটনাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এই গল্পকেই সে ত্যাগ দেবে। দুপুর দুপুর হাটে চলে আসে। অনেকদিন পর হাঁড়িয়া খায় প্রাণ ভরে। এমনিতেই সঙ্ঘের কথাকার হওয়ায় হরেক গল্প শুনতে তাকে ঘিরে লোক জুটে যায় এইসব জায়গায়। আজ সে নিজের গল্প শুরু করে—

—বুঝলি বে আমি তো সেবার দুর্গাপূজার মেলা থেকে ফিরছি। চার নং বিটের কাছ থেকে শর্টকাট নিয়েছি। খানিক দূর যেতে দেখি শালা বাপও হাঁড়িয়া খেয়ে টলতে টলতে ফিরছে। হাঁটতেই পারছে না। আজ মায়ের কপালে খুবই মার আছে। আমাকেও লাথাবে। হঠাৎ শালা সামনে দেখি ভোঁদকা এক দাঁতাল। বাপের মায়া ত্যাগ করে ভাগান দিলাম। গামছা থেকে লটকাগুলাও সব পড়ে গিয়েছিল…
—অসুরদা তোমার হেভি নেশা হয়ে গেছে। শালা দুর্গাপূজার মেলায় লটকা কোথায় পাইলা শুনি? রথের মেলা গিয়েছিলা বলো, সিদ্ধ ছোলা মুখে চালান করতে করতে বলল নরেশ কুজুর।
—তুই কী জানিস বে ছোটলোক! এত ভদ্রলোকদের গল্প শুনালাম কেউ শালা ভুল ধরেনি, তুই এসেছিস পোদ্দারি মারতে!

খেঁকিয়ে উঠেই মিইয়ে গেল খগেন। নরেশকে বাইক নিতে বলল। সোজা ফরেস্ট অফিস। বড়বাবুকে ধরে রেকর্ড সেকশনে। ১৯৭০-এর জুন-জুলাই-অগস্ট দেখতে হবে। নেশালাগা চোখে খোঁজা খুব কষ্ট। ১০টা পুরানো গাছ কাটল, ৭১টা নতুন লাগাল। একটা গউরের বাচ্চা জন্মেই মরে গেল, এই তো তার বাপ। ২৭শে জুন, ১৯৭০। হাতির শুঁড়ের আর পায়ের আঘাতে মৃত্যু। ১৪ই অগস্ট, ১৯৭০— ডাহুকডাকার নতুন নাম হল সাহুরাম বনছায়া। সেইখানে তার না-জন্মানো বেটার বেটার বেটাও নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে এইবার, নিশ্চিত।

—এই বড়বাবু, একটা কোশ্চেন আছে, জড়িয়ে আসা গলায় বলে খগেন, রেকর্ডে দেখছি গাছ কাটা হয়েছে কম, লাগানো হয়েছে অনেক অনেক বেশি। আমাদের গাঁয়ের আশেপাশ থেকে বন তাহলে হাপিস হল কী করে!

এইসব প্রশ্নের উত্তর হয় না জেনেই আবার নরেশের বাইকে বসে হাটে ফেরা। সবাইকে জিলাপি খাওয়াতে হবে। বিকালের মুখে খগেন অসুর “জয় বাবা মহাকাল!” হাঁক দেয়। পাঙাসমাছ কিনতে এসেছে এক হাফপাগলা। হাঁক শুনে সে খুব চমকায়। শেষ আলোয় মাছের চোখ স্থির এক নেশা হয়ে আছে। যা রগড় হয়েছে না ল্যাওড়া!— বঁটিতে পাঙাসকে ফালি করতে করতে বলে চলে মাছওয়ালা। দিনে ধরা পাঙাসের রক্ত এখন কালচে লাল হয়ে গড়াচ্ছে। হলুদ ভুলে লাল হচ্ছে সূর্য। বঁটি দিয়ে শরীর চিরতে চিরতে মাছওয়ালা রগুড়েভাবে বলতে থাকে, শালা এনার্ছির ভয়ে অসুরদার বিচি যখন শুকায়ে গুয়া হয়ে গেছে। নরেশ কুজুর গল্পের ভুল ধরে শিবের মতো বাঁচায়ে দিল। সত্তর সালে ফরেস্টের দেওয়া সার্টিফিকেট খুঁজে পাওয়া গেছে আজ। ওটায় লেখা আছে নাকি সাহুরাম অসুর এই ফরেস্টরই আদি বাসিন্দা। হাতি তাকে শুঁড়ে প্যাঁচায়ে পা দিয়ে থেঁতলে দেওয়ার জন্য ফ্যামিলি টাকা পাবে।

এত আনন্দের মাঝে গত ছয় মাস ধরে ফিরে ফিরে আসা বুকে চিরিক মারা ব্যথাটা আবার ছড়িয়ে পড়ছে।

 

—বোকাচোদা! এই গল্পের জন্য রেকর্ডিং অ্যালাউড নয়! মানে সিরিয়াসলি! সত্যিই সিরিয়াসলি! নিজেদের  এতক্ষণের ভদ্রতার মুখোশ ছেড়ে বলে বসে কেউ কেউ। পাখির ডাকও থিতু হয়ে  আসে। খগেন অসুর মৃদু হেসে গল্পটা আবার ধরে নেয়।
—পিছনে ঘুরে লম্ফের আলোয় এখনো দেখতে পাই মহাকাল আমার বাবাকে খেয়ে নিল। দাঁত দুটোয় রক্ত লেগে আছে।
—জাস্ট এ মিনিট, জাস্ট এ মিনিট। ম্যাজিক রিয়াল চোদাচ্ছ! মানে ম্যানইটিং এলিফ্যান্ট! গাঁজারও একটা লিমিট থাকে বস! তোমাকে গাঁজার জন্য পে করেছি তাতে কোনও আফশোস নেই, কিন্তু ম্যানইটিং এলিফ্যান্টের গল্প বিশ্বাস করার জন্যও যে পেমেন্ট করতে হবে এইটা আগে বলা উচিত ছিল। স্কচের গ্লাস নাড়তে নাড়তে বহু লোক তাকে এই কথা বলে।

এরা কী ভেবেছে তাকে? গল্পদাদু? “গুগল করুন সবাই”, প্রতিবার এইটা বলার সময় তার নিজেকে আদিম ঠেকে। গল্পের মতো আদিম। “আবে সত্যি সত্যিই টাইমস অফ ইন্ডিয়া ছেপেছিল এইরকম খবর!”— গলায় হেরে যাওয়ার ভয় জমতে শুরু করেছে এদের। “কিন্তু প্রতিটা কেসই এদেরই মতো কারও না কারও মুখে শোনা, তাই এতটাও কনভিন্সড হওয়ার কিছু নেই। বি রিজনেবল”— গলায় দ্বিধা আসে কারও কারও। “এইটা হতে পারে কখনও! অথরিটিভ ডকুমেন্টেড কিছু না থাকলে বিশ্বাস কেন করব?”— গল্পের সামনে প্রতিরোধে চেষ্টা তখনও চলে। “আপনাদের মতন কত লোক ওইখানে রামলালার জন্মের কথাও তো বিশ্বাস করতেন না। এখন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে দিয়েছে। ডকুমেন্ট,”— বিড়ি বের করে ধরায় সে। “হাতি মানুষ খেয়েছে আর সেইটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট জানবে না হতে পারে!”— শেষ প্রতিরোধ হিসাবে উঠে আসে। সে এইটারই অপেক্ষায় থাকে। ঝোলা থেকে জেরক্স করা একটা বই বার করে। দ্য ম্যানইটিং এলিফ্যান্ট। লেখকের নাম এনসি বহুগুনা। সে জানে বেশিরভাগই এই বই পাতা ধরে ধরে পড়বে না। তারা পড়বে এনসি বহুগুনা, আইএফএস, প্রিন্সিপাল চিফ কনজার্ভেটর অফ ফরেস্টস অ্যান্ড হেড অফ ফরেস্ট ফোর্স, ওয়েস্ট বেঙ্গল। এটাই যথেষ্ট তার গল্পের পরবর্তী কাস্টমার জোটাতে। লোকে ডকুমেন্ট বোঝে। ডকুমেন্টে থাকলে সে আছে। ডকুমেন্ট থাকলে সে আছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4658 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অনেকগুলো স্তরে কাজ করে চলে এই গল্প। দারুণ!

আপনার মতামত...