লোকে কী বলবে?

সাদিয়া সুলতানা

 

লোকে কী বলবে? এই কথা ভেবে ভেবেই দুজনের জীবন কেটে গেল। শুধু আজকের দিনে কলেজ থেকে স্টাডি ট্যুরের পারমিশন চেয়েছি বলে না, এই আঠারো বছরের জীবনে যতবার যত কিছুর জন্য বাবা-মায়ের কাছে আবদার করেছি ততবারই শুনেছি, এটা কেন করবি! ওটা কেন করবি! লোকে কী বলবে?

লোকে কী বলবে ভেবে অনেক কিছু করা হয়নি আমাদের মানে আমার, মিলিআপার, মায়ের আর বাবার। আবার লোকে কী বলবে ভেবে অনেক কিছুই করে যাচ্ছি আমরা। এই যে বাবার দেওয়া পাঁচ আঙুলের দাগ নিত্যদিন গালে নিয়েও মা দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে। আমার বড় বোন মিলিআপাও মায়ের মতো কপাল পেয়েছে। মুখ বুজে মিলিআপা মদ্যপ স্বামীর সংসার করছে। তিন বছর ধরে মার খেয়ে খেয়ে শরীরের সর্বত্র দাগ হয়ে গেলেও ও সংসার ছাড়েনি। ছাড়লে লোকে কী বলবে?

দুলাভাইয়ের মার খেয়ে মাঝেমধ্যে মিলিআপা আমাদের বাড়িতে আসে। বাবা ওর কথা শুনেও শোনে না। মা চোখে-মুখে শীতলতার ভারি একটা পর্দা ঝুলিয়ে জানতে চায়, কী খাবি? মিলিআপা খানিকক্ষণ প্রেতাত্মার মতো হো হো করে হাসে, তারপর টাকিমাছের ভর্তা আর পাঁচমিশালি ডালের ফরমায়েশ জানিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কলেজ বন্ধ হলে আমাদের ওখানে গিয়ে কদিন থেকে আসিস ঝিলি। টাকিমাছের ভর্তা আর পাঁচমিশালি ডাল দিয়ে ভাত খাওয়া হলে মিলিআপা আর দেরি করে না, বলে, তোমাদের জামাই বাড়ি ফিরে আমাকে দেখতে না পেলে রাগ হবে। আমি যাই। মিলিআপার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমি বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিই। ওড়নার দুপাশে মোটা মোটা সেফটিপিন আটকাই। এরপর শুধু মুখের পাতাটুকু বের করে রেখে মাথার চারদিকে মুড়িয়ে হিজাব পরি।

লোকের কথা এড়াতে একদিন আমার ফ্রকের বুকজুড়ে ঘন কুচি উঠেছিল। এরপর ফ্রক সরে সালোয়ার কামিজ বরাদ্দ হয়েছিল, শরীরে উঠেছিল ওড়না, মাথায় উঠেছিল হিজাব। হিজাব, ওড়না পরেও কী রক্ষা আছে! চারদিকে রাশি রাশি সেফটিপিন গুঁজতে হয় নইলে যে এদিক-ওদিকের ওড়না সরে যখের ধন বেরিয়ে আসবে আর লোকে লা লা লা করে ছুটবে। মাকে, বাবাকে বলি, ওসব হিজাব, ওড়না-টোড়না ভাল লাগে না আমার, এসব ঝামেলার। এই তো গেল সপ্তাহে পত্রিকার প্রথম পাতাতেই সংবাদ বেরিয়েছে, মোটরসাইকেলের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে আরোহীর মর্মান্তিক মৃত্যু। মা-বাবাকে এমন আট-দশটা উদাহরণ দিলে মা-বাবা একেবারে তেড়ে-ফুঁড়ে আসে, অত কথা বোঝাতে আসবি না। বেশি বুঝিস, না? তোর আর কী! আমাদের তো সমাজ নিয়ে চলতে হয়।

মা-বাবাই শুধু সমাজ নিয়ে চলে না। তাদের কারণে মিলিআপাকে, আমাকেও সমাজ নিয়ে চলতে হয়। অঙ্কের মাস্টার অঙ্ক শেখাতে এসে বুক, উরু টিপে দিলেও দুলে দুলে বীজগণিতের সূত্র আওড়াতে হয়। লোকের কথার ভয়ে অঙ্কমাস্টারকে বাদ দিলেও ঘটনা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা যায় না। তবু বুলুকে ঘটনাটা বলেছিলাম আমি। বিনিময়ে বুলু ওর জীবনের সবচেয়ে গোপন ঘটনাটা আমাকে বলেছিল। ক্লাস সিক্সে বুলু যেই কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল সেই সেন্টারের ইংরেজি স্যার ট্রান্সলেশন ভুল করায় সব ছাত্রের সামনে বুলুর পেনিস মুচড়ে দিয়ে হা হা করে হেসেছিল। বাড়িতে গিয়ে বুলু ওর মাকে বলেছিল সব, খুব কেঁদেছিল। বুলুর মা বুলুর মুখ চেপে ধরে বলেছিল, কাউকে বলিস না। শুনলে লোকে কী বলবে। বুলুর ধারণা ঘটনাটা বুলুর মা ওর বাবাকেও বলেনি। বুলু মায়ের কারণে ওই বয়সে কোচিং সেন্টারের ইংরেজি স্যারকে শায়েস্তা করতে না পারলেও আমার অঙ্কের মাস্টারকে শায়েস্তা করেছিল।

এই সময়ে কাউকে শায়েস্তা করার মোক্ষম প্লাটফর্ম হল ফেসবুক। ফেসবুকে ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’, ‘যে কথা বলতে চাই’, ‘হারুনস্যারের শাস্তি চাই’, ‘নির্যাতিত আমি’ এসব ভিন্ন ভিন্ন নামে ফেক আইডি খুলে বুলু হারুনস্যারের কেচ্ছা-কাহিনি লিখেছিল। হারুনস্যার আমাদের শহরের অঙ্কের নামকরা স্যার। স্যার ব্যাচ করে করে ছাত্র-ছাত্রী পড়ালেও বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের অঙ্ক শেখাতে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে হারুনস্যারকে বাড়িতে নিয়ে যেত। কিন্তু বুলুর কারণে চার-পাঁচ মাসের মধ্যে হারুনস্যারের টিউশনগুলো সব চলে গিয়েছিল। পরে স্যারের বাসায় একদিন পুলিশ এল। লোকলজ্জা আর পুলিশি হাঙ্গামার ভয়ে থানায় একটা এজাহারও জমা পড়ল না। দেখতে দেখতে স্যারের ব্যাচগুলোও আবার জমজমাট হয়ে উঠল। একটা-দুটো বাড়িতে স্যারের ডাক পড়তেও শুরু হল।

বুলু এখন বড় হয়েছে। হারুনস্যারকে দেওয়া শাস্তিটা ওর কাছে এখন আর জুতসই লাগে না। মাঝেমধ্যে বুলু বলে, ঝিলি তুই দেখিস, পারভার্টটাকে আমি একদিন এমন শায়েস্তা করব না… ওর বাসার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওর সব কীর্তি-কাহিনি ফাঁস করে দিব। আমি বুলুর কথা শুনে আঁতকে উঠে বলি, লোকে কী বলবে! বুলুকে সাবধানবাণীটা শুনিয়েই আমার ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি হয়।

লোকের কথা ভুলে তো আমরা দুজন দিব্যি এখানে প্রেম করতে চলে এসেছি। আমরা এখানে প্রায়দিনই আসি। আমাদের ছোট মফস্বল শহরের মধ্যে এই জায়গাটা নিরাপদ। এখানে সব ডিস্ট্রিক্ট কোর অফিসারদের বাসা। জায়গাটা নিরিবিলি, গাছ-গাছালি ঘেরা। অনেকটা জায়গা জুড়ে আম আর লিচুবাগান আছে। বাগানের শেষ প্রান্তে সার্কিট হাউজ। পুরো এলাকায় জিকজাক করা পাকা রাস্তা। এদিকটার কোথাও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসার উপায় নেই ঠিকই তবে এখানে ঘন্টা পার করে নিরুপদ্রবে হাঁটা যায়। কেউ কিছু বলতে আসে না। স্থানীয় পার্কে গেলে বিপত্তি অনেক। চেনা-পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হল তৃতীয় লিঙ্গের কারও সামনে পড়া। এরা এমনভাবে টাকা তোলে, রীতিমতো চাঁদাবাজি শুরু করে। এছাড়া সন্ধ্যার আগেআগে নানারকম সুযোগসন্ধানী নারীপুরুষের আনাগোনা শুরু হয়। মাঝেমধ্যে পুলিশি হাঙ্গামাও হয়।

বুলু জানে এখানে বিপদ নেই। ও আমার ডানপাশে ধীরপায়ে হাঁটছে। মাঝেমধ্যে আমার ডানহাতের আঙুলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ অনুভব করি, আমার বামচোখটা লাফাচ্ছে। অমন করে বামচোখ লাফালে বিপদ আসে— বলতেই বুলু হা হা করে হেসে ওঠে। ওর হাসির শব্দে বুকে জমে থাকা ভয়ের পাথর টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। আমরা এলোমেলো সব গল্প করতে করতে এলোমেলো পায়ে হাঁটি, দশটাকার বাদাম, পাঁচটাকার ছোলাভাজা ভাগাভাগি করে খাই। বিকালের সূর্যটা নিভতে শুরু করলে দুজন বাড়ির পথ ধরি।

বাড়ি ফেরার আগেই খবরটা জানতে পারি, লোকমুখেই। আমাদের বাড়ির বামপাশের চারতলা বাড়ির মালিক গফুরকাকা মোড়ের দোকানেই বসা ছিল। আমাকে দেখে চায়ের কাপ রেখে লুঙ্গি খানিক উঁচু করে দ্রুতপায়ে দৌড়ে আসে কাকা, ঝিলি, শুনেছিস নাকি খবর?

আমি শুনব না, শোনার আগ্রহও নেই— হাবেভাবে বুঝিয়ে তরতরিয়ে পা চালাই। ঘাড় না ঘুরিয়েও বুঝি গফুরকাকা পিছু পিছু আসছে। আমাকে ধরে ফেলে কানের প্রায় কাছাকাছি এসে কাকা বলেন—

—তোর বাবা নাকি একটা কচি মেয়েকে বিয়ে করেছে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমি বিয়ের ছবি দেখেছি, তোর কাকি দেখেছে। তোর মিজানভাইই তো দেখাল। আমি তো বাপু ফেসবুক-টেসবুক বুঝি না। এই বয়সে ওইসব বুঝলে কী আর চলে। তার ওপর আবার এই বছরই হজে যাওয়ার নিয়ত করেছি। লোকে কী বলবে!

কাকা বলতেই থাকে। আমি শুনতেই থাকি। আমার সামনে লটকে থাকা বিমূঢ় সন্ধ্যাটা সাঁইসাঁই করে রাত হয়ে যায়। আলোর পার্থক্যে চেনা পথ বদলে যায়। আমার হাত কাঁপে, পা কাঁপে, সর্বাঙ্গ কাঁপে। বুলুর সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়ার সময় আমাদের শর্ত ঠিক করা থাকে, দুজনের কেউই মোবাইল ধরব না। নিজেদের সময়টুকু উপভোগ করব। হাতব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে ঢোকার সাহস পাই না। বাড়ির সামনের চিলতে পথটুকু প্রেতনগরীর রাস্তা বলে মনে হয়। কী করে ওই দিঘল পথ পাড়ি দিব, উপায় খুঁজে পাই না। পার হয়েই বা কী দেখব।

আমি না চাইলেও আঁধারের নির্জনতা এক হাঁ-তে আমাকে গিলে ফেলে। ছটফট করতে করতে তিনতলার সিঁড়ি টপকাই। কলিংবেল চাপতে হয় না। ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়। রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে দেখি পাথরের মূর্তির মতো সোফায় বসে আছে আমার মা। লোকে কী বলবে ভেবে ভেবে চিরকাল জবুথবু হয়ে থাকা আমার মায়ের মাথায় ঘোমটা নেই। মায়ের শাড়ির আঁচল মেঝেতে লুটাচ্ছে, পায়ের কাছে একটা পেটমোটা ব্যাগ। ব্যাগটা দেখে চিনতে পারি, বিয়ের সময় মায়ের বাবার বাড়ি থেকে এই ব্যাগ ভর্তি করে নিজের সর্বস্ব নিয়ে এসেছিল মা। কত শত ছুটির দিনে ব্যাগটা বের করে মাকে অযথাই পুরনো জিনিসপত্র গুছাতে দেখেছি।

আমার মস্তিষ্কের ভেতরে অহেতুক সব প্রশ্ন ধাক্কা খেতে থাকে। কী করবে মা? কোথায় যাবে? এতকাল পড়ে পড়ে মার খেয়েও লোকে কী বলবে ভেবে যেই মানুষটা এই বাড়ির চৌকাঠ ডিঙায়নি সেই মানুষটা আজ কী করবে?

কলজে খামচে উঠছে বারবার। মানসিক অবসাদ শরীরটাকে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে, মায়ের কাছে এগোনোর শক্তি পাচ্ছি না। তবু টলমল হাঁটি, মায়ের মুখোমুখি দাঁড়াই। অনেকক্ষণ ধরে সাহস গুছিয়ে মায়ের চোখের দিকে তাকাই। ওই চোখজোড়া আমি চিনি না। অদ্ভুত এক দৃষ্টি ভাসছে ওখানে, স্বচ্ছ আর পরিষ্কার দৃষ্টি। আমি একবার দেখেই বুঝে যাই, ‘লোকে কী বলবে’ রেখাচিত্রটা মায়ের দৃষ্টি থেকে একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4658 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...