মোদি সরকারের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি: কিছু পর্যবেক্ষণ

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

 


শিক্ষাকে করে তোলা হচ্ছে ধর্মমুখী, তার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক তাৎপর্যকে হালকা করে দেওয়া হচ্ছে। গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুরাণ ও ইতিহাসের প্রভেদ। সায়েন্স কংগ্রেস বন্ধ হয়েছে। চিকিৎসাবিদ্যার পাঠক্রমে ঢুকছে জড়িবুটি ও জ্যোতিষ। জীববিদ্যা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিবর্তনবাদ, রসায়ন থেকে বাদ মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণি। গোমূত্র ও গোবরের উপকারিতা নিয়ে চালু হচ্ছে গবেষণা-প্রকল্প। যা চলছে তা যদি চলে আরও বেশ কিছুদিন, তাহলে ভবিষ্যৎ অতিশয় স্পষ্ট

 

উইকিপিডিয়া-তে একটা মস্ত বড় এন্ট্রি আছে, নামটি হচ্ছে, “প্রিমিয়ারশিপ অফ নরেন্দ্র মোদি”।[1] পিডিএফ করলে প্রায় পঞ্চাশ পাতা, সমানুপাতিক আয়তনের তথ্যসূত্র-সহ। মোদিজি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে গুরুত্বপূর্ণ কী কী করেছেন, এবং যা করেছেন তার ফলে গুরুত্বপূর্ণ কী কী ঘটেছে, সেই নিয়েই এই প্রবন্ধ। মোদিজি মস্ত মানুষ, এবং তাঁর সম্পর্কে লোকে আর যাই বলুক, এটা কেউ বলতে পারবে না যে তিনি ‘কিছুই করেননি’। বস্তুত, তিনি প্রায় প্রতি মুহূর্তেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু না কিছু ঘটিয়ে থাকেন, যদিও তার ভালমন্দ নিয়ে সবাই সব সময়ে একমত হতে পারে না। ফলত, তাঁকে নিয়ে মস্ত মস্ত লেখা হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, এই লেখাটিতে এমন এক ব্যাপার আছে, যা তত স্বাভাবিক নয়।

লেখাটিতে সবই আছে। মোদিজির আমলে অর্থনীতি, গৃহ ও স্বাস্থ্য প্রকল্প, বিমুদ্রাকরণ, কোভিড প্যান্ডেমিক, হিন্দুত্ব, বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা, এবং আর যা যা হতে পারে তার সবই। অথচ, লেখাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জন্য কোনও পরিসর বরাদ্দ হয়নি! বলা উচিত, লেখাটির সবটাই কিন্তু মোদিজির প্রশংসা নয়। অর্থাৎ, মোদির সমর্থক ও সমালোচক উভয়ে মিলেই সম্ভবত লেখাটি লিখেছেন, উইকিপিডিয়া-তে যেমনটি দস্তুর। সেখানে এই অনুপস্থিতির অর্থটি, কাজেই, চমকপ্রদ— বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে তিনি যা করেছেন, সেটা তাঁর সমর্থক ও সমালোচক উভয়পক্ষই আলোচনার যোগ্য বিষয় বলে মনে করে না! এবং, আমরা পৃথিবীর বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটির কথা বলছি। এবং, তার অতিশয় খ্যাতিমান প্রধানমন্ত্রীর কাজকর্মের কথা বলছি। এই একুশ শতকে বসে। অভাবনীয়, তাই না?

অবশ্য, এতে সবাই খুব বেশি অবাক নাও হতে পারেন। যাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচালনার মূলনীতিটি এক হিন্দু পৌরাণিক চরিত্রের সম্মানরক্ষাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, তাদের কাছে বিজ্ঞান যুক্তি মুক্তচিন্তা গোছের বস্তু খুব একটা আকর্ষণীয় বলে মনে হওয়ার কথা না, এই কথাটা অনেকেই সহজভাবে বুঝতে পারেন। কিন্তু, তবু তো আধুনিক এক রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বিজ্ঞানকে পুরো বাদ দিলেও চলে না। আর কিছু না হোক, প্রযুক্তির সাহায্য তো লাগেই, সব কিছুতেই! তাই, তাঁরা বিজ্ঞানকে পুরো বাদ দেন না। আমাদের মনে পড়ে, বিগত শতকের একেবারে শেষের দিকে মোদিজির পূর্বসূরি বাজপেয়িজি রাজস্থানের মরুভূমিতে সফলভাবে পরমাণু বোমা ফাটাবার পরে দুই হস্ত ঊর্ধ্বে তুলে বলেছিলেন, ‘জয় জওয়ান, জয় কিষাণ, জয় বিজ্ঞান’! তাঁর তরফে বিজ্ঞান সম্পর্কে এহেন উচ্ছ্বাস প্রকাশের দৃষ্টান্ত বোধহয় ওই একটিই। বলা বাহুল্য, বিজ্ঞান নিয়ে এমন উৎসাহের দৃষ্টান্ত মোদিজি এবং তাঁর সাথীরাও বেশ কিছু পেশ করেছেন। প্লাস্টিক সার্জারি করে গণেশের গলায় হাতির মুণ্ডু বসানো, স্টেম সেল প্রযুক্তির মাধ্যমে গান্ধারির শতপুত্রলাভ, ঔপনিষদিক কোয়ান্টামতত্ত্ব রবীন্দ্রনাথ হয়ে হাইজেনবার্গের হাতে পড়ে অনির্দেশ্যবাদের জন্মকথা, গোদুগ্ধে মহার্ঘ্য স্বর্ণ আবিষ্কার। ভারতবর্ষের সরকারি বিজ্ঞান-ভাবনার ইতিহাসে এতদিনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে এইসব আশ্চর্য বৃত্তান্ত।

এইসব উদ্ভট কথাবার্তা নিয়ে নিন্দা আর বিদ্রূপ ধ্বনিত হওয়ার কথা, এবং হয়েওছে। মোদিজি জানেন, এইসব দিয়ে শুধু তাঁর ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভক্তদেরকে সন্তুষ্ট করা যায়, ওয়াকিবহাল লোকজনকে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াকিবহাল লোকদের জন্য তবে তাঁরা কী বলছেন? এবং, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণা আর শিক্ষার জন্য যে সরকারি ব্যবস্থা, সেখানেই বা কী করছেন? সে-ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের তরফে, এবং নানা সরকারি মঞ্চে, নানা বিশেষ উপলক্ষ্যে। তেমনই সাম্প্রতিকতম উপলক্ষ্যটি গিয়েছে গত আঠাশে ফেব্রুয়ারিতে, অর্থাৎ, আমাদের ‘বিজ্ঞান দিবস’-এ। সকলেই জানেন, এই দিনটি পালনের উদ্দেশ্য হল, বিজ্ঞানী সিভি রামন-এর নোবেলজয়ী আবিষ্কারের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা। সে দিন দিল্লির ‘বিজ্ঞান ভবন’-এ ‘জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৪’ পালনের অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী ডক্টর জিতেন্দ্র সিং কী বলেছেন, একটু দেখে নেওয়া যাক— গণমাধ্যম থেকে নয়— কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে।[2]

ওইদিন বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীপ্রবর স্মরণ করেছেন সিভি রামন-এর বিখ্যাত উক্তি— ‘আমাদের দেশের উন্নতির জন্য চাই বিজ্ঞান, আরও বিজ্ঞান, এবং আরও আরও বিজ্ঞান।’ এবং তারপরই দাবি করেছেন, দেশের উন্নতির প্রসঙ্গে এই ‘রামন এফেক্ট’ নাকি প্রবলভাবে ঘটে চলেছে মোদিজির নেতৃত্বে। ঠিক কীভাবে, তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি, অতি অবশ্যই।

ব্যাখ্যা মানে, পরিসংখ্যান ততটা নয়, যতটা দৃষ্টান্তের সমাহার। এবং দৃষ্টান্ত মানে, সাফল্যের বিশেষ বিশেষ দৃষ্টান্ত। যেমন? প্রথমত, নামি বিদেশি গবেষণা-সংস্থার সাথে হাত মিলিয়ে ভেলোরের ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজে ‘হিমোফিলিয়া’ রোগের জন্য জিন থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (ফলাফল অঘোষিত)— ভারতে প্রথম। দ্বিতীয়ত, বিগত দশ বছরে জৈবপ্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতির তেরো গুণ বৃদ্ধি, এবং ওই ক্ষেত্রে সফল ‘স্টার্ট-আপ’-এর সংখ্যাবৃদ্ধি। তৃতীয়ত, কৃষিক্ষেত্রে মস্ত উন্নতি, গন্ধদ্রব্য চাষের মধ্য দিয়ে (‘অ্যারোমা মিশন’, এবং ‘পার্পল রিভোল্যুশন’)। চতুর্থত, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মাপকাঠির সমান হওয়া বা তার চেয়ে এগিয়ে থাকা (ঠিক কীভাবে, ব্যাখ্যা করা নেই)। পঞ্চমত, গবেষণাকর্মে মহিলাদের এগিয়ে আসা (পরিসংখ্যান দেওয়া নেই)। ষষ্ঠত, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক মাপকাঠি ‘গ্লোবাল ইনোভেশন ইন্ডেক্স’-এ ২০১৫ সালের একাশিতম অবস্থান থেকে ২০২৩ সালে একচল্লিশতম অবস্থানে উঠে আসা (এটা একটু আলাদা করে খেয়ালে রাখবেন)। এবং শেষত, অতি অবশ্যই, তৃতীয় চন্দ্রযানকে চাঁদে নামানো। এখানে উল্লেখ থাকুক, ঠিক একইভাবে মোদিজির বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বের দাবি উঠে এসেছিল বছরখানেক আগেও, আরএসএস-এর মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এ।[3]

মোদিজির বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব আরও অনেক কিছু থাকতে পারে। কিন্তু কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মন্ত্রী যখন ওই ধরনের একটি অনুষ্ঠানে এগুলোর কথাই বিশেষভাবে বললেন, তখন ধরে নেওয়া যায় যে, এগুলোই সেরা দৃষ্টান্ত বলে তাঁরা মনে করছেন। কাজেই, এগুলো ধরা যাক এক এক করে।

প্রথমত, ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজে সংঘটিত জিন থেরাপি-র ট্রায়াল যতই সাড়া জাগানো উচ্চমার্গের গবেষণা হোক, ইতিবাচক ফলাফল আসা অবধি সাফল্যের দাবি করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, একুশ শতকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির নিজস্ব প্রবণতা অনুযায়ী জৈবপ্রযুক্তির ব্যবসা বাণিজ্য বাড়তেই পারে, কিন্তু সেখানে মোদি সরকারের নিজস্ব প্রচেষ্টার ভূমিকা কী? তৃতীয়ত, গন্ধদ্রব্যের চাষ তো দেশের সমগ্র কৃষির এক ক্ষুদ্র অংশমাত্র, এবং তার প্রয়োজনটাও বিলাস-উদ্দিষ্ট। তাহলে, কৃষিতে যে ধরনের গবেষণা পরিবেশের ক্ষতি না করে দেশের মানুষের জন্য যথেষ্ট খাদ্যের ব্যবস্থা করবে এবং কৃষকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে, সে-গবেষণার কী খবর? চতুর্থত, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি ব্যাপারে আমরা আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে ঠিক কতটা এগিয়েছি, সেটা জানার উপায় কী? পঞ্চমত, গবেষণায় মহিলারা সত্যিই ঠিক কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, সে ব্যাপারে বোধহয় যথাযথ ও সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন। চন্দ্রপৃষ্ঠে চন্দ্রযান নামাবার পরে ইসরো-র মহিলা-বিজ্ঞানীদের উল্লাসের চিত্র অবশ্যই সুখকর, কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। আগামী বছরে গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মোদি সরকার কী ধরনের খরচ বরাদ্দ করেছেন, সে বিষয়ে কিছু তথ্য গণমাধ্যম থেকে পাওয়া যায়।[4] সেদিকে তাকালে এ ব্যাপারে মোদি সরকারের আগ্রহের বহরটি হয়ত বা খানিক আঁচ করা সম্ভব। নিচের চিত্রটি দেখুন।

ওপরের সারণিটাকে ভাল করে দেখুন। যে জৈব-প্রযুক্তি সংক্রান্ত বাণিজ্য মোদিজির রাজত্বে তেরো গুণ বেড়েছে এবং অসংখ্য ‘স্টার্ট আপ’ তৈরি হয়েছে বলে মন্ত্রীপ্রবর দাবি করেছিলেন, সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটিতে আগামী বছরের জন্য মোদিজি বরাদ্দ ছাঁটাই করেছেন অবিশ্বাস্য আকারে— প্রায় সাতাশ শতাংশ! ওর চেয়েও বিকট আকারের ছাঁটাই হয়েছে ‘আর্থ সায়েন্স’-এ। অস্যার্থ, আবহাওয়া, পরিবেশ, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি সংক্রান্ত গবেষণার বারোটা বেজে যাবে। অন্য সব ক্ষেত্রেও অবস্থা তথৈবচ। বরাদ্দ বৃদ্ধির বহর কোথাও দুই, কোথাও তিন, কোথাও সাড়ে চার, কোথাও প্রায় এক শতাংশ। ফলত, মহাকাশ গবেষণা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং ইত্যাদি ব্যাপারে যথেষ্ট অগ্রগতির জন্য অর্থনৈতিক পরিসরটা এখানে ঠিক কোথায়, সেটা বুঝে ওঠা খুবই কঠিন। এটাও লক্ষণীয় যে, ভারতের অর্থনীতির বার্ষিক বৃদ্ধি যদি বাস্তবিকই সরকারি দাবিমতো সাত শতাংশের কাছাকাছি হয়, তাহলে আমাদের জাতীয় আয়বৃদ্ধির তুলনায় যাবতীয় গবেষণা-বরাদ্দ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে শোচনীয়ভাবে। গবেষণা-ব্যয়ের সাধারণ নিয়মটা হচ্ছে, জাতীয় আয়ের মোটামুটি দুই-আড়াই শতাংশ গবেষণায় ব্যয়িত হওয়া উচিত। আমাদের দেশে তা এক শতাংশের সীমার মধ্যে অতি ধীরে বামনসুলভ হারে বাড়ছিল, কিন্তু মোদিজি ক্ষমতায় আসার কিছু আগে থেকে তা স্থায়ীভাবে অধোগতি লাভ করেছে, এবং মোদিজি তার কোনও উন্নতি ঘটাননি। তার চেহারাখানি এইরকম।[5]

বিজ্ঞানমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং-এর যে বক্তৃতাটি নিয়ে আমরা কথা বলছি, তার ষষ্ঠ বিষয়টি ছিল প্রযুক্তি উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে বিগত আট বছরে সারা বিশ্বের মধ্যে আশিতম ধাপ থেকে বিরাট লাফ দিয়ে চল্লিশতম ধাপে গিয়ে পৌঁছনো। এটা একটা সত্যিকারের আন্তর্জাতিক মাপকাঠিই বটে, এবং অগ্রগতিটিও চোখে পড়ার মতো। কিন্তু, দুটি জরুরি প্রশ্ন আছে এখানেও।

প্রথমত, ঠিক যে-ধরনের প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়ে এই উল্লম্ফনটি ঘটল, তার চরিত্রটা ঠিক করে বোঝা দরকার। তাকে বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন, ‘জুগাড় ইনোভেশন’।[6] এই ভারতীয় শব্দ ‘জুগাড়’ এখন উদ্ভাবনের অভিধানে জায়গা করে নিয়েছে, সারা পৃথিবীর বিশেষজ্ঞদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। জুগাড় উদ্ভাবন মানে হচ্ছে, ব্যয়সাপেক্ষ উচ্চমার্গের প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে প্রথাবিরোধী পথে হেঁটে হাতের কাছে যা সহজে এবং সস্তায় পাওয়া যায় তাই দিয়ে এমন উদ্ভাবন ঘটানো, যাতে তা ব্যবহারিক কাজে আসবে, অথচ তার দাম স্বল্পবিত্তের নাগালের মধ্যেই থাকবে। ‘জুগাড়’ শব্দটির উদ্ভব ভারত থেকে হলেও, এই ফেনোমেনন-টি কিন্তু নিছক ভারতীয় নয়, বরং গোটা তৃতীয় বিশ্বের। প্রতিভাবান দেশীয় উদ্ভাবকেরা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছেন ভারতে, চিনে এবং আফ্রিকাতেও। ফলত, পশ্চিমি বিশ্বেও অনেক বিশেষজ্ঞ নাকি ভাবতে শুরু করেছেন, ওই পথে গিয়ে উদ্ভাবনের খরচ কমানো যায় কিনা। এখন, এই পর্যন্ত জেনে আনন্দ ও গর্বে যতটা ডগমগ হয়ে উঠতে হয়, ভাবনাটা আরেকটু এগিয়ে গেলে কিন্তু ব্যাপারটা আর যেন ঠিক ততটা সে-রকম থাকে না। এই ‘জুগাড়’ উদ্ভাবন যতই কেজো জিনিস হোক, আধুনিক বিশ্বের ‘হাইটেক’ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমকক্ষ নয়, এবং তার বিকল্পও নয়। হাজার প্রতিভাবান জুগাড়-উদ্ভাবকও কম্পিউটার-বিজ্ঞান, বায়োটেকনোলজি, ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, মহাকাশ বিজ্ঞান, ন্যানো টেকনোলজি— এইসবের প্রয়োজন মেটাতে পারবে না, বড়জোর হয়তো তার কিছু ফাঁক পূরণ করতে পারবে, তার পরিপূরক হয়ে উঠতে পারবে। ফলত, নিছক জুগাড় উদ্ভাবন দিয়ে খুব বেশি এগোনো যাবে না, এবং উন্নত দেশের সমকক্ষও হওয়া যাবে না মোটেই।

এবং, দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরওই গুরুত্বপূর্ণ। এই অতি-সীমাবদ্ধ জুগাড় উদ্ভাবনের কৃতিত্বটাও কি মোদি সরকার দাবি করতে পারে আদৌ? বস্তুত, ২০১৪ সালে মোদিজি ক্ষমতায় আসার বহু আগে থেকেই ভারত ও অন্যত্র প্রতিভাবান উদ্ভাবকেরা এই কাণ্ডটি ঘটাচ্ছেন। এবং, এই ফেনোমেনন-টিকে চিহ্নিত করে তাকে ‘জুগাড়’ নাম দিয়ে সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক বহু-পঠিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে ২০১২ সালেই। আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে উল্লম্ফন তো তার ফলমাত্র! মোদি সরকার সে কৃতিত্ব আত্মসাৎ করবে কোন যুক্তিতে?

এই প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনের প্রসঙ্গেই এসে পড়ে মোদিজির বহুঢক্কানিনাদিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের কথা, যা চালু হয়েছিল ২০১৪ সালে, কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ায় মোদিভক্তেরা আজকাল সে নিয়ে আর খুব বেশি কথা বলেন না। বলা হয়েছিল, দক্ষ বিদেশি সংস্থারা ভারতে এসে পণ্য বানাক, সরকার পুঁজির জোগান দেবে। এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল কয়েকটি। দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং-এর বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় আয় বাড়ানো এবং পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া, পণ্য রফতানি করে বিদেশি মুদ্রা আয় এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, দশ কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি করা। সবকটিই ব্যর্থ হয়েছে।[7] জিএসটি-বিমুদ্রাকরণ-লকডাউন ইত্যাদি পর্বের পরে পাঁচ ট্রিলিয়ন অতি দূরের স্বপ্ন, বাণিজ্য-ঘাটতি এবং বিদেশি ঋণ উর্ধ্বমুখী, বেকারি রেকর্ড পরিমাণ। এবং সেই সঙ্গে, প্রবলভাবে বাড়ছে অর্থনৈতিক অসাম্য আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মস্ত অগ্রগতির যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন মন্ত্রীপ্রবর এবং যে গল্প শুনিয়েছে ‘অর্গানাইজার’ পত্রিকা, তার সঙ্গে এ-চিত্র মেলে না একেবারেই।

 

বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নতিসাধনের প্রশ্নটাকে হয়তো বা ধরা যায় আরেকটু নিচের থেকেও। গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ তো প্রাথমিক একটি ধাপ মাত্র, যা অর্থনৈতিক পরিসরটি জুগিয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চর্চাকে সম্ভব করে তোলে। কিন্তু সে-সম্ভাবনাকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত করে উচ্চমানের শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তর পেরিয়ে আসা উজ্জ্বল ছাত্র ও গবেষকেরা, বিচক্ষণ স্বপ্নদ্রষ্টা প্রশাসকবর্গ, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানে চালু থাকা সৎ প্রশ্নশীল যুক্তিবাদী অনুসন্ধিৎসার সংস্কৃতি। দুঃখের বিষয়, সে-সবের কিছুই আমাদের হাতে নেই। শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ছয় শতাংশ খরচের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদি সরকার আজ ওই খাতে খরচ করে দশমিক চার শতাংশ মত (আগের সরকারের তুলনায় দশমিক দুই কম)![8] প্রশাসকেরা নিবেদিত ধর্মান্ধতা, ঘৃণা, মিথ্যা, অযুক্তি আর হিংসা ছড়ানোর কাজে, এবং, প্রশ্নশীলদের কারারুদ্ধ করার কাজেও। আর গোটা ভারতীয় সমাজের এক বৃহদংশকে আজ চালিত করছে অন্ধত্ব, বিভাজন, বিদ্বেষ।

শিক্ষাকে ক্রমশ করে তোলা হচ্ছে ধর্মমুখী, এবং তার অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক তাৎপর্যকে ক্রমাগত হালকা করে দেওয়া হচ্ছে। গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুরাণ ও ইতিহাসের প্রভেদ। সায়েন্স কংগ্রেস বন্ধ হয়েছে। মূলস্রোতের চিকিৎসাবিদ্যার পাঠক্রমে ঢুকছে জড়িবুটি ও জ্যোতিষ। প্রাচীন ভারতের জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য, যোগ ও ধ্যানের উপকারিতা ইত্যাদি পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে সব বিদ্যার ছাত্রদের। জীববিদ্যা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিবর্তনবাদ, রসায়ন থেকে বাদ মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরামিষ আহার চালু করা হচ্ছে, জাতপাত ধর্মের ভিত্তিতে ছাত্রদেরকে নির্যাতন করা হচ্ছে, গোমূত্র ও গোবরের উপকারিতা নিয়ে চালু হচ্ছে গবেষণা-প্রকল্প।

সঙ্কট ঘনিয়ে আসছে বৃহত্তর সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও। এনআরসি এবং সিএএ-র মতো বিভেদাত্মক আইনি হাতিয়ার তৈরি হচ্ছে, সমাজে ধর্মীয় বিভাজন আরও গভীরে নিয়ে যাবার জন্য। ইলেক্টোরাল বন্ড-এর মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাবানদের মধ্যেকার গোপন বোঝাপড়ার চক্র। প্রশান্ত মনে জ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা ও যুক্তিবাদিতা অনুশীলনের পরিসর কোথায়, সেখানে?

অতএব, যা চলছে তা যদি চলে আরও বেশ কিছুদিন, তাহলে ভবিষ্যৎ অতিশয় স্পষ্ট। রাষ্ট্রের আস্ফালন জারি রাখার জন্য সামরিক গবেষণা থাকবে। হিন্দু ভারতের ইজ্জত ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্যে খানিক মহাকাশ গবেষণা। দু-চারটি অতি উজ্জ্বল ছাত্র দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদে নক্ষত্র হয়ে বসবে। আর, দেশের সর্বসাধারণের বিজ্ঞান-শিক্ষিত হয়ে এক মুক্ত, জ্ঞানদীপ্ত, যুক্তিশীল, সহিষ্ণু, সুসমৃদ্ধ ভারতীয় সমাজ নির্মাণ করবার সুখস্বপ্ন ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকবে ভারত মহাসাগরের তলায়।


[1] Premiership of Narendra Modi. Wikipedia
[2] Under Prime Minister Shri Narendra Modi, India is in an era of truly showing the Raman effect i.e. India will progress only through science: Dr. Jitendra Singh. Department Of Science & Technology.
[3] Jayswal, Pankaj Jagannath. How Modi Government’s push for R&D influencing growth. Organizer. Feb 10, 2023.
[4] Sinha, Amitabh. Why the Union Budget’s plans for deep tech and research funding are significant. The Indian Express. Feb 8, 2024.
[5] India: Research and development expenditure. The Global Economy.com.
[6] Radjou, Navi. et al. Use Jugaad to innovate faster, cheaper, better. Harvard Business Review. Dec 8, 2011.
[7] Satyawali, Akash. As ‘Make in India’ enters 10th year, what does the government’s silence mean? The Wire. Sep 26, 2023.
[8] Deeksha, Johanna. A decade under Modi: Education spending declines, universities struggle with loans. Scroll.in. Feb 8, 2024.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4658 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. সময়োপযোগী অত্যন্ত প্রয়োজনীয় লেখা।
    শেষে একটি প্যারার পুনরাবৃত্তি হয়েছে মনে হল।

  2. গুরুত্বপূর্ণ লেখা । এ লেখা যাঁরা পড়বেন তাঁরা মোটামুটি এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। বিজেপির শয়তানি সম্পর্কেও। তাঁরাও লেখকের আশঙ্কার শরিক হবেন নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু ধর্মনেশা আর ঘৃণায় বুঁদ আজকের বাঙালি তথা বঙ্গভাষী পাঠকদের ক’জনের কাছে পৌঁছোবে এর বার্তা যে আমরা কোন ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি!

আপনার মতামত...