কৃষিক্ষেত্রে উদারীকরণ: উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির শিক্ষা

শিঞ্জনি জৈন

 



নিউজক্লিক-এর লেখক এবং গবেষণা সহায়ক শিঞ্জনি জৈন-এর এই নিবন্ধটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউজক্লিক-এ প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষান্তর: সত্যব্রত ঘোষ।

 

 

 

 

তিন মাস হয়ে গেল ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কৃষক ও কৃষি শ্রমিকেরা দিল্লির সীমান্তে অবস্থান বিক্ষোভের মাধ্যমে দাবি তুলছেন নতুন তিনটি কৃষি আইন রদ করতে হবে। কৃষকদের বক্তব্য, এই আইনগুলি কার্যকর হলে তাঁদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম কমবে, কৃষিকার্যে ব্যয় বাড়বে এবং সেই সঙ্গে তাঁদের ঋণও বাড়বে। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন যে এই আর্থিক পরিস্থিতিতে তাঁদের জমিগুলি বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

নতুন আইনগুলির বিরুদ্ধে কৃষকদের আরেকটি বক্তব্য— সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কৃষকদের থেকে পূর্বনির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে সরকার ফসল কিনেছে, খাদ্যসুরক্ষা নিশ্চয়তা এবং দেশের খাদ্যবিষয়ক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিবেদিত গণবণ্টন ব্যবস্থার সঙ্গে যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এই নতুন আইনের ফলে তা শেষ অবধি ভেঙে পড়বে। তাঁরা এই ভয়ও পাচ্ছেন যে বৃহৎ কৃষিব্যবসায়ী এবং সংস্থাগুলি দেশের কৃষিক্ষেত্রগুলি দখল করে নিয়ে নিজেদের জমিগুলিতেই তাঁদের দিনমজুরে পরিণত করবে। এও বলা হচ্ছে যে দানবীয় এই কর্পোরেশনগুলির দাপটে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা আরও প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষিশ্রমিকদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে।

কৃষক সম্প্রদায়ের এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার এই আইনগুলির পক্ষে সওয়াল চালিয়ে যাচ্ছেন এই বলে যে এগুলির দ্বারা কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলি সাধিত হবে, যা একদিন কৃষকদেরই উপকারে আসবে। রেডিওয় সম্প্রচারিত ‘মন কি বাত’-এর একটি পর্বে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, “সংসদ সম্প্রতি অনেক মাথা ঘামিয়ে কৃষি সংস্কার আইনগুলি মঞ্জুর করেছে। এই সংস্কারগুলির দ্বারা শুধুমাত্র কৃষকদের বেঁধে রাখা শিকলগুলিই ভাঙবে না, তাঁদেরকে নতুন অধিকার এবং সুবিধা প্রদান করা হবে।“

কৃষি আইনগুলির প্রতি সমর্থনকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি জোর গলায় দাবি করেছেন কৃষকেরা আন্দোলন থামিয়ে একবার আইনগুলিকে কার্যকর হওয়ার সুযোগ দিয়ে দেখে নিক যে এই সংস্কারগুলির থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কতখানি উপকার হচ্ছে। ভারত সরকার যে আইনের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রের উদারীকরণের প্রবর্তন করল, তা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োগের মাধ্যমে পরীক্ষিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকে অনেক কিছু শেখা যাবে।

অথচ ভারতীয় কৃষকদের লড়াইয়েতে সংহতি জানিয়ে আমেরিকার সাতাশিটি কৃষক ইউনিয়ন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেছে যে ভারতীয় কৃষকেরা এখন যে দুর্ভোগ দশার মধ্যে আছেন, প্রায় চার দশক আগে আমেরিকা তার ভুক্তভোগী। রোনাল্ড রেগানের প্রশাসন নিয়ন্ত্রণহীনতার নীতি জবরদস্তি কার্যকর করানোর ফলে ন্যূনতম সহায়ক মুল্যের সমতুল্য ওখানকার ‘প্যারিটি প্রাইস’ (সমমূল্য) ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

এই নীতিগুলির থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে হলেও বড় কৃষকদেরই উপকার হয়েছে। এর জোরে একত্রিত হয়ে তাঁরা ভুট্টা অথবা সয়া-র মতো একফসলি উৎপাদন বৃদ্ধি করে গেছেন। প্রথাগত উৎপাদক এবং ক্ষুদ্র কৃষকেরা সামান্য কৃষি আয়ের উপর ভরসা না করে আয়ের অন্য উপায় খুঁজে কোনওমতে টিকতে পেরেছেন। আজও, আমেরিকার শহরগুলির তুলনায় গ্রামগুলিতে আত্মহত্যার হার পয়তাল্লিশ শতাংশ বেশি।

ব্রিটেনেও একই রকম নীতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছিল কৃষির দিকে না ঝুঁকে জনসাধারণ যেন শিল্পদ্যোগের দিকে গুরুত্ব দেয়। এর পরিণতিতে উনবিংশ শতাব্দীর তুলনায় আজকের ব্রিটেনে গ্রামীণ জনসংখ্যা ৬৫.২ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশে নেমে আসে। মোট জনসংখ্যা ৩.১ কোটি থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৬.৬ কোটিতে পৌঁছালেও কৃষিজমির পরিমাণ ৪.৫ লক্ষ থেকে ২.১৭ লক্ষে নেমে যায়। চারটি শীর্ষ সুপারমার্কেট যখন ব্রিটেনের ভোজ্যদ্রব্যের সত্তর শতাংশ জোগান দেয়, তখন কৃষকেরা খাদ্যের জন্য ব্যয় হওয়া অর্থের মাত্র আট শতাংশ পাচ্ছেন। এমনকি, কৃষকদের যে ভর্তুকিগুলি দেওয়া হত তা যথেষ্ট হারে কমিয়ে দেওয়ার ফলে তাঁদের পক্ষে কৃষিকার্য আর মোটেই অর্থকরী নয়।

১৯৮০-৯০-এ লাটিন আমেরিকায়, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কাঠামোগত সমন্বয় কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি বাজারের উদারীকরণ করা হয়। আফ্রিকায় অধিকাংশ দেশের তদানীন্তন সরকার (১) নিজের নিয়ন্ত্রিত দাম নির্ধারণ এবং বিতরণ ব্যবস্থা সরিয়ে দিতে এবং (২) বাজারের দ্বারা দাম নির্ধারণ এবং বিক্রি ব্যবস্থার থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে দিতে কৃষি বাজারের উদারীকরণে হাত দেয়।

ব্রিটেনের ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট-এর একটি গবেষনায় দেখা যায় সাব-সাহারান আফ্রিকায় কৃষিক্ষেত্রে উদারীকরণে আফ্রিকার মানুষদের উপকার তো মোটেই হয়নি, উল্টে তার পরিণাম দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত হতাশাজনক। সংস্কারের ফলে বাছা বাছা কয়েকটি শস্যের উৎপাদক এবং উপভোক্তাদের উপকার হলেও শস্য উৎপাদকদের এবং গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের মোটের উপর যে উপকারগুলির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কোনওটাই পূরণ হয়নি। গবেষণাটিতে এই কথাটিও বলা হয় যে দারিদ্র হ্রাসের জন্য বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে যে ব্যাপক রূপান্তরের কথা বলে সংস্কারগুলি কার্যকর হয়, তার কিছুই পূরণ হয়নি।

কেনিয়াতে শস্যবাজারে কৃষিব্যবসার অংশগ্রহণকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যে কুড়িটি আইনবিধি বাতিল করা হয়। লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখানো হয় যে এই আইনবিধিগুলি পরিবর্তনের ফলে খামারজাত পণ্যের ক্রেতাদের নিয়ে কৃষিব্যবসার মার্কেট শেয়ার দ্বিগুণ হয়ে ২০১০ সালে ৩৮ শতাংশে পৌঁছায় এবং তাদের মুনাফা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। অথচ কৃষি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলিতে শস্য বিক্রি করে কৃষকেরা নিজেদের রোজগার গড়ে ৬ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছেন।

যেসব কৃষকেরা কৃষিব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলিতে শস্য বিক্রি করছিলেন, তাঁরা কয়েক বছরের মধ্যে বিক্রি বন্ধ করে দেন। এতে বাজারে একচেটিয়া পরিস্থিতির জন্ম হয়, কৃষকেরা দেখেন সেখানে শুধুমাত্র কয়েকজন বড় খরিদ্দার বাদে আর কেউ নেই। গবেষণাটিতে এও দেখা যায় যে কৃষকেরা কিছু বড় কৃষিব্যবসায়ীদেরই ফসল বিক্রি করছেন যাদের রোজগার যথেষ্ট, অথচ ক্ষুদ্র কৃষকদের রোজগার ক্রমশ কমছে।

ঘানার রিপোর্টগুলিতে দেখা যায় আমদানি নীতির উদারীকরণের ফলে চাল, টম্যাটো এবং পোল্ট্রি-জাত পণ্যের আমদানিতে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা চলার কারণে ক্ষুদ্র কৃষকেরা নিজেদের স্থানীয় বাজারগুলি থেকেই উৎপাটিত হয়েছেন। এর ফলে তিন ধরণের শস্যের ফলন এবং মোট জাতীয় ব্যয়ে (national consumption) স্থানীয় উৎপাদনগুলির অংশ কমে যায়।

এছাড়াও আমদানি উদারীকরণের কারণে যে প্রতিযোগিতা শুরু হল তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উন্নত দেশ থেকে দেওয়া ভারি ভর্তুকির ফলে কৃত্রিমভাবে সস্তা মূল্যে অন্যায্যভাবে স্থানীয় বাজার দখল করে। অন্য দিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলির ক্ষুদ্র কৃষকদের কেউই খুব বেশি ভর্তুকি দেয় না। এমনকি সরকারগুলির থেকে তাঁদের যে সহায়তা পাওয়ার কথা, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের প্রভাবে কাঠামোগত সমন্বয় নীতি বানিয়ে তাও যথেষ্ট পরিমাণে কমিয়ে দেওয়া হয়। ভারি ভর্তুকি দিয়ে উন্নত দেশগুলি থেকে আমদানি করা পণ্য বাজারে আসবার ফলে ঘানার স্থানীয় কৃষকেরা যৎসামান্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় টিকতে না পেরে আরও প্রান্তিক হয়ে যেতে থাকেন।

কৃষি বাজারগুলির উদারীকরণের ফলে আরও দেখা গেল যে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের সরকার খাদ্যশস্যের থেকে সরে গিয়ে নগদ শস্যের (cash crop) দিকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু করল। জমি সম্পদকে শস্য রপ্তানির জন্যে অনেক বেশি ব্যবহার করা শুরু হল, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের জন্যে তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

বেনিন-এ সরকারি প্রোৎসাহনে রপ্তানির জন্যে তুলা চাষ করতে জমির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। উগান্ডা থেকে পাওয়া প্রমাণাদিতে দেখা গেল যে প্রথাগত এবং অপ্রথাগত নগদ শস্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থানীয় মানুষদের জন্য খাদ্যশস্যের ফলন কমে গেছে। আফ্রিকার দেশগুলিতে কৃষি ব্যবস্থার উদারীকরণের অভিজ্ঞতার সারাংশ তুলে ধরতে হলে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ কেনিয়া-র প্রাক্তন ডেপুটি গভর্নর হরজন নিয়ানগিটো-র বক্তব্যটিই বলতে হয়: “WTO-র বাণিজ্য চুক্তি সমেত উদারীকৃত বাণিজ্য দ্বারা শুধু ধনীদেরই উপকার হয়নি, দরিদ্ররা উপকার পাওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি খাদ্য সুরক্ষার অনিশ্চয়তার শিকার হয়েছে।“

পরিশেষে, কৃষিব্যবস্থার উদারীকরণের পরে আফ্রিকায় যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটির কথা বলতে হয়। আফ্রিকার সম্প্রদায়ের অধিকারে যে জমিগুলি ছিল, প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সেগুলি হল ব্যক্তিগত মালিকানার অধীন। আগে যে বিস্তীর্ণ জমি দেশের দরিদ্র জনসংখ্যার দখলে ছিল, তা বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা অথবা ব্যক্তি কিনে নেয় অথবা ইজারায় নিয়ে নেয়। ইথিয়োপিয়া, কেনিয়া, মালাওয়ি, মালি, মোজাম্বিক, সুদান, তানজানিয়া, জাম্বিয়া, ক্যামেরুন, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, মাদাগাস্কার, সোমালিয়া ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। ২০০৪ থেকে ২০০৯ অবধি অন্তত আড়াই মিলিয়ন হেক্টর জমির হস্তান্তর হয়। যে বিশাল বিনিয়োগকারীরা আফ্রিকায় জমি নেয় তাদের মধ্যে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েইত এবং আবু ধাবির মতো মধ্য-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি আছে।

উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কৃষিনীতির উদারীকরণ বিষয়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের অভিজ্ঞতা এবং অভিঘাত থেকে বোঝা যায় নতুন কৃষি আইনগুলি নিয়ে ভারতীয় কৃষকদের বিক্ষোভ আন্দোলন মোটেই অযৌক্তিক নয়, অভূতপূর্বও নয়। ভারতের কৃষক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে যে বিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে বার্তা আসছে, তাতে প্রমাণ হয় যে কৃষি উন্নয়নের যে মডেলটিকে উন্নত বিশ্ব সমর্থন জানিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে তা ভারতের মতো উন্নতিকামী দেশে পাইকারি একটি প্যাকেজ হিসেবে কাজে লাগানোর আগে আন্তরিকভাবে তা যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3608 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...