কৃষি অর্থনীতি ও কৃষক আন্দোলন

শংকর

 

 



গণ আন্দোলনের কর্মী, ভূমিরক্ষা অধিকার আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

 

কেন্দ্রীয় সরকারের তিনটি কৃষি আইন দেশজুড়ে কৃষক জনতার মধ্যে লড়াইয়ের আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির গৈরিক কর্পোরেট ফ্যাসিবাদী সরকার এই প্রথম এক দেশজোড়া শক্তিশালী গণ-আন্দোলনের সামনে পড়েছে। আজ তেরোদিন হল রাজধানী অবরুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ কৃষকদের অবরোধ-অবস্থান চলছে। কৃষি-আইনে সংশোধনী এনে কিছুটা আপস মীমাংসার যে প্রস্তাব সরকার দিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে সমগ্র আইনগুলিকেই খারিজ করার দাবিতে অনড় আছে। ইতিমধ্যে তাঁরা দেশজুড়ে রিলায়েন্স, আদানি প্রভৃতি বহুজাতিকদের এবং এই মুহূর্তে তাদের প্রধান রাজনৈতিক দল বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ।

লক্ষ করার মত বিষয় হল সম্ভবত এই প্রথম পর্দার আড়ালে থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলি, যাদের হাতেই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির সুতো ধরা থাকে, তারা একটা দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়েছে। এবং আরও কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হল এই আন্দোলন বহুজাতিকদের প্রধান শত্রু শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে থেকে উঠে আসেনি। বরং উঠে এসেছে শ্রমিকশ্রেণির মিত্র অংশ থেকে, কৃষক সাধারণের মধ্যে থেকে। এই ঘটনা এটাও দেখিয়ে দেয়, দেশের কৃষিক্ষেত্রে বহুজাতিকদের দাপট এবং কব্জা কতটা দৃঢ় এবং শক্তিশালী চেহারা নিয়ে নিয়েছে। সামন্ততন্ত্র যে আর প্রধান দ্বন্দ্ব হিসাবে উপস্থিত নেই, তা এই ঘটনা আরও পরিষ্কার করে সামনে তুলে ধরেছে।

এর পাশাপাশি, এটাও লক্ষ করার মত বিষয় যে, বর্তমানে চলা কৃষক আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছেন পাঞ্জাব, হরিয়ানা প্রভৃতি রাজ্যের কৃষকরা, যেখানে ধনী ও মধ্য কৃষকদের এবং বড় জোতের আধিপত্য রয়েছে। সাধারণভাবে লোকের চোখে পড়ছে এটাই। কিন্তু যে সত্য অলক্ষ্যে থাকছে তা হল, প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিচ্ছে “সবুজ বিপ্লব”-এর এলাকা। কৃষিতে বহুজাতিকদের যারা সামনা করছেন গত ছয় দশক। এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্য অঞ্চলের কৃষকদের নেই। এবার বোধহয় সেই অভিজ্ঞতাকে সারসংক্ষেপ করার সময় সমাগত। তাই বোধহয় এই প্রথম এত স্পষ্ট করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সঙ্গে কৃষকদের দ্বন্দ্ব প্রধান আকার ধারণ করেছে।

মোদি-শাহের ফ্যাসিবাদী সরকার কৃষক আন্দোলনের অভিঘাতে স্পষ্টতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে এই অভিঘাতকে যতটা সম্ভব তীব্র করা যায় তা নিশ্চিত করাই দেশের সমস্ত বিপ্লবী শক্তি এবং গণতান্ত্রিক মানুষজনের কর্তব্য। কিন্তু একথাও সমান সত্য যে, যে সমস্ত মূলধারার বিরোধী দলগুলি আজ কৃষক আন্দোলনের পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে তারা কেউই বহুজাতিকদের বিরোধী নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ এনেছে। অভিযোগটি ভুল নয়। কিন্তু বিজেপির জানা উচিত যে, তারা সকলেই দ্বিচারী। সরকারে না থাকলে তারা সবাই কর্পোরেট বিরোধী। কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় ছিল এবং একের পর এক আইনে তারা যখন কৃষিক্ষেত্রে কর্পোরেটদের ঢোকার রাস্তা পরিষ্কার করেছে তখন বিজেপিও আজকের কংগ্রেসের মতই কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়েছে।

১৯৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশে খাদ্যসঙ্কট চরম আকার ধারণ করে। ক্ষমতায় আসীন কংগ্রেস সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কিন্তু কৃষিসমস্যার মূলে হাত দেননি। কৃষকের হাতে জমি না থাকার সমস্যা নেহেরুর কাছে খুব একটা পাত্তা পায়নি। গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণে “অনুপস্থিত জমিদার”দের উপস্থিতি তাঁর কাছে গুরুত্ব পায়নি৷ আমূল ভূমিসংস্কারকে তিনি সিরিয়াসলি নেননি। এ সবই সামন্তশ্রেণির স্বার্থেই। তিনি বরং আমেরিকার দ্বারস্থ হয়েছিলেন। পৃথিবীতে কৃষিকাজের উদ্ভব হয়েছিল যে প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে তার মধ্যে একটা ভারত। কয়েক হাজার বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভারতীয়দের কৃষিকাজ শেখাতে আবির্ভাব হয়েছিল আমেরিকান বহুজাতিকদের। সূচনা হয়েছিল “সবুজ বিপ্লব”-এর।

“সবুজ বিপ্লব”-এর ফলাফল হিসাবে দেশের কৃষিক্ষেত্রে জমিদারি এবং সামন্ততন্ত্রের কব্জাকে অটুট রেখেই ফলন বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু এর ফলে আমাদের দেশের কৃষিব্যবস্থারই একটা আমূল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। ফলে খুব সহজেই আন্তর্জাতিক বীজ কোম্পানিগুলির অনুপ্রবেশ ঘটে। পাশাপাশি, এই বীজগুলি যেহেতু অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, এবং জল ব্যবহার ছাড়া অচল তাই বীজ কোম্পানিগুলির সঙ্গে সঙ্গেই বহুজাতিক রাসায়নিক কোম্পানিগুলিও ভারতের কৃষিক্ষেত্রে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে। এই ব্যবস্থার প্রধানত তিনটি কুফল দেখা দেয়।

প্রথমত, সাময়িকভাবে ফলন বৃদ্ধি পেলেও বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে দীর্ঘমেয়াদের জমির উর্বরতা কমতে শুরু করে। একে ট্যাকল করার জন্য ক্রমাগত বীজ পরিবর্তন এবং আরও বেশি সার প্রয়োগ চলতে থাকে। দ্বিতীয়ত, ফলে গোটা কৃষিকাজটাই বহুজাতিকদের বীজ, সার কীটনাশক-এর উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে চাষের খরচ গগনচুম্বী হতে শুরু করে। চাষের খরচ আকাশছোঁয়া হওয়াটা কৃষকদের কাঁধে আজ যে বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা চেপেছে, যার ফলে দেশে আজ কৃষক আত্মহত্যা প্রতি পনেরো মিনিটে একজনে এসে দাঁড়িয়েছে, তার অন্যতম একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর সূচনা করেছিল কিন্তু “সবুজ বিপ্লব”। তৃতীয় কুফল হল, কৃষক ও কৃষিমজুরদের একটা বড় অংশ ক্ষতিকর রাসায়নিক ক্রমবর্ধিত হারে ব্যবহার করার ফলে ক্যানসারের মত দুরারোগ্য এবং প্রাণঘাতী রোগ “সবুজ বিপ্লব”-এর এলাকায় প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, সাধারণ জনগণও প্রতিদিন খাদ্যের সঙ্গে ক্রমবর্ধিত হারে বিষ গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে পরিবেশ ও প্রকৃতি আক্রান্ত। চরম বিপদে মানবজাতিও।

১৯৯১-এর পর থেকে কংগ্রেসের লাগু করা বিশ্বায়নের কর্মসূচি দেশের কৃষিক্ষেত্রে আরও জোরেসোরে কর্পোরেট প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করে। ২০০০ সাল থেকে একের পর এক বীজ আইন লাগু হতে থাকে। ২০০৪ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার আসামাত্র কর্পোরেটদের তৈরি করা বীজ যাতে স্বচ্ছন্দে ভারতীয় কৃষিবাজারে রাজত্ব করতে পারে তার জন্য নতুন বীজ আইন প্রণয়ন করা হয়। এর পরে বারে বারে এই বীজ আইন ক্রমে ক্রমে আরও কর্পোরেটমুখী করে গড়ে তোলা হয়। বিজেপি আজ সেটাই বল্গাহীন গতিতে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

পাঞ্জাব, হরিয়ানার মতো “সবুজ বিপ্লব”-এর এলাকাগুলো যেভাবে কর্পোরেট চিনেছে, ভারতের অন্য কোনও অঞ্চলের কৃষকরা বোধকরি ততটা এখনও উপলব্ধি করে ওঠেননি। ফলে আজকের লড়াইতে এই অঞ্চলের কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ততা ব্যাপক আকারে লক্ষ করা যাচ্ছে। সার, বীজ, কীটনাশকের বাজার দখল করেই এই কর্পোরেটগুলো কৃষকদের লাইফ হেল করে ছেড়েছে। এখন অনুকূল পরিস্থিতিতে তারা কৃষি উৎপাদনের কাঁচামালের (agricultural inputs) পাশাপাশি কৃষি উৎপন্নের (agricultural outputs) ওপরও দখলদারি কায়েম করতে চাইছে। ২০০০ সাল পরবর্তী পর্যায়ে ধীরে ধীরে এই গত কুড়ি বছরে বহুজাতিক কোম্পানিগুলি কংগ্রেস, বিজেপি সমস্ত সরকারগুলোর সহায়তায় খুচরো বিক্রির বাজারে প্রবেশ করেছে, আর অন্যদিকে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিপণ্য কিনে গুদামজাত করার অবাধ লাইসেন্স হস্তগত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। কৃষিপণ্যের সঙ্গে যেহেতু খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত তাই ইচ্ছামত কৃষিপণ্য লেনদেন করার ওপর যে সমস্ত বিধিনিষেধগুলো আমাদের আইনব্যবস্থায় ছিল তা গত কুড়ি বছরে একে একে অপসারিত করতে করতে এসে আজ নরেন্দ্র মোদি শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। ফড়েদের অজুহাত খাড়া করে তারা কর্পোরেট ঢোকাচ্ছে এবং তাদের অবাধ ছাড়পত্র দিচ্ছে। বহুজাতিকরা কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কিনলে কৃষকরা নাকি লাভবান হবে, এই তাদের যুক্তি।

পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রে সারা দুনিয়ার অভিজ্ঞতা কিন্তু উলটো কথাই বলে। বেচাকেনা করে লাভ হয় কেন? সকলেই জানেন, কেনার দামের থেকে বেচার দাম বেশি বলে। এখন, এই ব্যবধান যত বাড়বে লাভ ততই বাড়বে। এই ব্যবধানটা বাড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ ফড়েদের যতটা আছে বহুজাতিকদের আছে তার বহুগুণ। মান্ডি ব্যবস্থা একবার খতম করে দেওয়া গেলে চাষিদের পণ্য বেচার জন্য সামনে থাকবে শুধু কর্পোরেট। বিক্রেতা বহু কিন্তু ক্রেতা একজন। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলে মনোপসনি। তখন ক্রেতাই দাম ঠিক করে। তারা যা দাম দেবে বিক্রেতা তা নিতে বাধ্য। অন্যদিকে এরা যখন প্রায় সমস্ত পণ্য নিজেদের গুদামে তুলে নিতে পারে তখন বাজারে বিক্রেতা হিসাবে এরা একলাই থাকে। সুতরাং, সেখানে ঘটে উলটো ঘটনা। বিক্রেতা এক, কিন্তু ক্রেতা বহু। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলে মনোপলি। পৃথিবীজুড়ে দেখা গেছে সরবরাহ শৃঙ্খলের এক প্রান্তে মনোপসনি এবং অন্যপ্রান্তে মনোপলি গড়ে তুলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিপুল ফায়দা লুটে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। সুতরাং, বহুজাতিকরা কৃষকদের অধিক দাম দেবে— এই গল্প একেবারেই হাস্যকর। সেই সঙ্গে বোঝাই যাচ্ছে কীভাবে এই ব্যবস্থা খাদ্যদ্রব্যের দাম গগনচুম্বী করার ক্ষমতা রাখে। এই দৈত্যের লেজের ছোটখাট ঝাপটাতেই দেশে বর্তমানে খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। পিকচার তো এখনও বাকি। তাই, এই লড়াই শুধু কৃষকদের একলার নয়, গোটা জাতির।

কর্পোরেটদের এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিনে নেওয়া কৃষকরা তাই স্বাভাবিকভাবেই মরিয়া লড়াইয়ে নেমেছেন। বিজেপি ছাড়া প্রায় সমস্ত দলই এই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ঠিকই আছে। যারা সমর্থন দিচ্ছে তাদের সমর্থন নেওয়াই উচিত। কিন্তু এ সত্যও ভোলার নয় যে, কর্পোরেট উন্নয়ন-দিশাকে পুরোপুরি খারিজ না করে কৃষক আন্দোলনের পক্ষে প্রকৃত অর্থে দাঁড়ানো যায় না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...