“পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই নেতৃত্বের কাজ”

যোগিন্দার সিং উগ্রহন

 

পাঞ্জাবের সবচেয়ে বড় কৃষক ইউনিয়ন ভারতীয় কিসান ইউনিয়ন (একতা-উগ্রহন), যাদের শ্রেণিভিত্তি মূলত ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকরা, তাদের সর্বোচ্চ নেতা যোগিন্দার সিং উগ্রহনের এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিউজক্লিকেআজাজ আশরাফ এবং প্রজ্ঞা সিংসাক্ষাৎকারটি গত ৯ মার্চ নিউজক্লিকে প্রকাশিত হয়।

 

এই ১০০ দিন ধরে দিল্লির উপকণ্ঠে বসে থাকার পর মনে হচ্ছে না আপনাদের আন্দোলন একটা স্থিতাবস্থায় পৌঁছে গেছে?

আন্দোলন শুরু করার সময়েই আমরা জানতাম যে এটা দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন হতে চলেছে। দিল্লি এলাম, আর কৃষকদের সব দাবি পূরণ হয়ে গেল— বিষয়টা এরকম হবে না।

কেন এরকম ভেবেছিলেন?

আমরা [তাঁদের ইউনিয়ন] যখন কোনও বিষয় ধরি, তখন তার শিকড়ে যেতে চেষ্টা করি— যেখান থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে, আর তারপরে ভাবি যে এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের কতদিন ধরে লড়াই করতে হতে পারে।

এই তিনটি কৃষি আইনের উৎস কোথায়?

এমন নয় যে এই তিনটি কৃষি আইন শুধুমাত্র মোদিজির মস্তিষ্কপ্রসূত। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ডব্লিউটিও-র যে বৈঠক হয় সেখানেই উন্নত দেশগুলি ভারতকে তাদের ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া-কে ভেঙে দিতে বলে এবং খাদ্যশস্যের জন্য যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ব্যবস্থা চালু রয়েছে সেটাকেও বন্ধ করতে বলে। সেই হিসেবে বলা যায় এই আইনগুলি ভারতে আরও অনেক আগেই লাগু হওয়ার কথা ছিল।

অবশেষে ২০২০-তে করোনা অতিমারির আড়ালে মোদি সরকার এই আইন তিনটি পাশ করল। সেগুলিরই আমরা আজকে বিরোধিতা করছি। এই আইনগুলো সংবিধানবহির্ভূত। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার এমন একটা বিষয় নিয়ে আইন পাশ করল যেগুলি আসলে রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে কোনওরকম সুষ্ঠু আলোচনা ছাড়াই আইনগুলি পাশ হল। এই ধরনের যে কোনও আইনগত কাজে যদি তাড়াহুড়ো করা হয়, তাতে ভুল হতে বাধ্য। এবং সরকারও আজ মেনে নিয়েছে যে আইনগুলিতে প্রচুর গলদ আছে।

সরকার আইনগুলিতে গলদ থাকার কথা মেনে নিয়েছে এ কথা কেন বলছেন?

সরকারের সঙ্গে আমাদের যখন মিটিং হয়, আমাদের বলা হয়েছিল আইনগুলিতে কি কি সমস্যা আছে দেখিয়ে দিতে। আমরা দেখিয়ে দিয়েছিলাম যে সরকারের সমস্যা হচ্ছে, তারা একটা সমান্তরলা বেসরকারি বাজার তৈরি করতে চাইছে— আর সেটাও আবার সরকারি মান্ডিতে লেনদেন হলে যে ৮.৫ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হত, সেটা মকুব করে দিয়ে। সরকারের এই সমান্তরাল বাজার তৈরির উদ্দেশ্য এটাই যে, সরকার এতদিন মান্ডি থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করার যে কাজটা করত, সেই দায়টা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। এই আইন তিনটি কার্যকর হলে স্বাভাবিকভাবেই সেটা ঘটবে।

সরকার কি স্পষ্টভাবে নিজেদের ভুলগুলি স্বীকার করেছে?

আইনগুলি কেন ভুল সেটা আমরা একদিনেই ওনাদের কাছে প্রমাণ করে দিয়েছিলাম। তারপরেই ওঁরা সংশোধনী আনার কথা বলেন। তো তুমি তখনই তো কোনও জিনিস সংশোধন করবে যখন সেটার মধ্যে গলদ আছে। তুমি বলছ এটা একটা মোবাইল (টেবিলে পড়ে থাকা মোবাইলটার দিকে দেখিয়ে)। আমি বললাম, না এটা ক্যালকুলেটর। তুমি বললে, না এটা মোবাইল। আমি তখন তোমাকে দেখিয়ে দিলাম যে মোবাইলে ক্যালকুলেটরের কাজও করা যায়। তখন তুমি মেনে নিলে। বললে, হ্যাঁ এটা দিয়ে ক্যালকুলেটরের কাজও করা যায়। তাহলে তুমি প্রথমে যে অবস্থানটা নিয়েছিলে সেটা থেকে কি এখন তোমার অবস্থানটা আলাদা হল না? ঠিক তেমনই সরকারও প্রথমে যে অবস্থান নিয়েছিল যে, আইনগুলি কৃষকদের পক্ষে খুবই উপকারী এবং এগুলিতে কোনও সমস্যাই নেই— সেই অবস্থান থেকে সরে এসে এখন সংশোধনী আনার কথা ভাবছে। কিন্তু যে আইনে গলদ আছে বলে সরকার নিজেই মেনে নিচ্ছে, আমরা সেই আইন কেন মেনে নেব?

এইজন্যই কৃষকদের সঙ্গে সরকারের আলোচনাগুলি বন্ধ হয়ে গেল?

দেখুন, সরকার আমাদের বলেছে তারা সংশোধনগুলি করবে, এবং আইনগুলি কার্যকর করা দেড় বছরের জন্য স্থগিত রাখবে।

কেউ কেউ বলছে সরকার আইনগুলি তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে?

দেড় বছর না তিন বছর— আমাদের কিছুই লিখিত দেওয়া হয়নি।

সরকার যে আইনগুলি সংশোধন করতে চায়, সেই মর্মে কি আপনাদের লিখিত কিছু দিয়েছে?

ওঁরা কোনও কিছুই লিখিত দেননি। ওঁদের অবশ্যই আমাদের এটা লিখিত দিতে হবে যে, আমাদের দাবিগুলি ওঁরা মেনে নিয়েছেন।

সরকারের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনা কবে স্থির হয়েছে?

এ কেবল সরকার আর মিডিয়াই জানে। তবে হ্যাঁ, আনঅফিসিয়াল কথাবার্তা চলছে। এই আজকেই যেমন আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল যাতে শুনলাম যে একজন বরিষ্ঠ আধিকারিক আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সপ্তাহ খানেক আগে আরেকজন আধিকারিক এসেছিলেন দেখা করতে। ওঁরা আমার সঙ্গে যখন দেখা করছেন, তার মানে অন্যদের সঙ্গেও নিশ্চয়ই দেখা করছেন। আমার মনে হয় ওঁরা আমাদের কৃষক ইউনিয়নগুলির সমস্ত নেতাদের সঙ্গে দেখা করে একটা সমাধান খুঁজতে চাইছেন।

আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা আবার কবে শুরু হবে?

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের এই আন্দোলনে অনেকগুলি গোষ্ঠী আছে। পাঞ্জাব এবং অন্যান্য জায়গার মিলিয়ে মোট ৫৫টা ইউনিয়ন এই আন্দোলনে সামিল হয়েছে। এখন এটা একটা কঠিন ব্যাপার যে এই ৫৫টি ইউনিয়ন সব সময়ে সব ব্যাপারে একমত হবে। কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি যে, সরকারকে খাতায়-কলমে না হলেও অন্তত মৌখিকভাবে আমাদেরকে এটা জানাতে হবে যে তারা সর্বোচ্চ কত দূর অব্দি যেতে রাজি আছে। যদি তারা বলে যে তারা দেড় বছরের জন্য আইনগুলিকে কার্যকর করা স্থগিত রাখবে, তাহলে আমাদের মনে হয় যে এটাকে তারা তিন বছরের জন্যেও অনায়াসে স্থগিত রাখতে পারে। অথবা তারা এরকমও বলতে পারে যে, তারা একটা বা দুটো আইন একেবারে বাতিল করে দিচ্ছে আর তৃতীয়টিকে আপাতত স্থগিত রাখছে।

যদি তারা এটা বলে, তখন আমরা আমাদের সদস্যা সমর্থকদের কাছে যাব এবং তাদেরকে বলব যে আমরা আমাদের আন্দোলন মোটেই বন্ধ করছি না। আমরা আমাদের এই দিল্লির অবস্থানটা শুধু বন্ধ করছি আর সেটা একমাত্র এই কারণে যে ভবিষ্যতে আমরা আরও বড় আন্দোলনের দিকে যাব। আন্দোলন চলবেই। সরকারের সঙ্গে ভবিষ্যতে কৃষক আন্দোলন বন্ধ করা নিয়ে কোনওরকম সমঝোতা সম্ভব নয়। আমাদের একমাত্র কথা হচ্ছে তিনটে কৃষি আইন একদম বাতিল করতে হবে। কিন্তু আপাতত আমাদের এই দিল্লিতে অবস্থানটাকে আমরা পরিবর্তন করতে পারি, তাকে একটা নতুন আকার দিতে পারি। আমরা আন্দোলনটাকে অন্যত্র ছড়িয়ে দিতে পারি। আমাদের ইউনিয়নের অবস্থান এটাই।

সমস্ত আন্দোলনেরই একটা সীমা থাকে। কখনওই একটা নির্দিষ্ট রূপের আন্দোলন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয় না। সমস্ত আন্দোলনকেই রূপ পাল্টাতে হয়। আমরা পাঞ্জাবে ছিলাম। তারপর আমরা দিল্লিতে এলাম। তারপর এই আন্দোলন একটা সর্বভারতীয় চরিত্র লাভ করল। দিল্লিতে অবস্থান করে আমরা কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। যেমন সরকার এটা মেনে নিয়েছে যে আইনগুলোর মধ্যে গলতি আছে। এবার আমাদের অন্য রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়তে হবে।

সেটাই যদি হয়, তবে ডিসেম্বরে সরকার যখন আপনাদেরই সংশোধনী দিতে বলল, আপনারা রাজি হলেন না কেন?

সংশোধনীর জন্য আমরা এখনও রাজি নই।

বেশ। তাহলে আপনারা এখন যেটা চাইছেন যে আইনগুলি স্থগিত থাকুক, আর তার সঙ্গে একটা বা দুটো আইন বাতিল হয়ে যাক— তাই তো?

হ্যাঁ। কিছু সংশোধনী এনে আইনগুলিকে সমর্তন করাটা আমাদের কাছে কোনও বিকল্প নয়।

আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এই আন্দোলন ২০২৪ পর্যন্ত চলবে। তা এর চূড়ান্ত লক্ষ্যটা কী?

আমরা কৃষিক্ষেত্রের কর্পোরেটায়ন চাই না।

এই যে তিনটি আইনকেই বাতিল নয়, অন্তত একটা আইন বাতিল হোক, আর বাকি দুটি স্থগিত থাক—আপনার সংগঠনের কর্মীরা এই পশ্চাদপসরণ মেনে নেবেন?

নেবে।

আপনার কাছে আসার আগে আমরা এখানকার লোকেদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমাদের কিন্তু মনে হল তিনটে আইনই সম্পূর্ণ বাতিল হওয়ার আগে দিল্লি ছাড়তে তাঁরা আদৌ আগ্রহী নন।

এই বিষয়টা ওদের বোঝাতে হবে। হ্যাঁ আপনি যদি ওদের জিজ্ঞাসা করেন ওরা অবশ্যই বলবে যে যতক্ষণ না তিনটে আইনই পুরোপুরি বাতিল হচ্ছে, ততক্ষণ ওরা ফিরবে না। এটা তো ওদের দোষ নয়। আমরা নেতারাই এটা মঞ্চ থেকে এতদিন বলে এসেছি। এবার ধরুন আমরা দেখলাম দুটো লাইন বাতিল করা হল এবং আরেকটাকে স্থগিত করা হল, তখন আমরা ওদের বোঝাতে পারব যে আমাদের আন্দোলনের জন্যই এটা সম্ভবপর হল। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বৈঠক হচ্ছে। সেইসব বৈঠকে আমরা আলোচনা করছি যে কোনও পরীক্ষায় পুরো ১০০ শতাংশ নম্বর পাওয়াটা বেশ কঠিন। যদি কেউ ৮৫ বা ৮০ শতাংশ নম্বর পায়, তাহলে বলতে হবে তার ফল যথেষ্টই ভালো হয়েছে। এর মানে এই নয় যে আমরা ওই বাকি ২০ শতাংশ চাইছি না। কিন্তু সেটাকে যদি পেতে হয় তাহলে অন্য এক সময়ে অন্য একটা প্রশ্নপত্র নিয়ে বসতে হবে।

এর অর্থ কি এটাই যে আপনি ভাবছেন আজকের পরিস্থিতিতে ৮০ শতাংশই যথেষ্ট হবে— আগামীকাল আর সেটাও নাও পাওয়া যেতে পারে?

আমরা ৮০ শতাংশ পেয়ে যাইনি। আমি কেবল একটা উদাহরণ দিলাম। কোনও আন্দোলনের সিদ্ধান্তগুলিকে অবশ্যই বাস্তবানুগ হতে হয়, পরিবেশ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই নেতৃত্বের কাজ।

যদি তিনটে কৃষি আইন বাতিল না করা হতেই দিল্লির এই প্রতিবাদ আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে খলিস্তানি এবং দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলি সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেবে না? তারা বলবে না, ‘দেখো তোমাদের নেতারা কেমন আপস করে নিল’?

ওরা আমাদের বলেছে ‘দুধ নাও, জল নাও, কিন্তু আইন তিনটে বাতিল না করে ফিরে এসো না।’ একজন তো একটা সাক্ষাৎকারে এমনকি এরকমও বলেছে যে আমরা যদি তিনটে আইন বাতিল হওয়ার আগে ফিরে যাই, তাহলে আমাদেরও সন্ত লঙ্গওয়াল [অকালি দল সভাপতি]-এর মতো পরিণতি হবে [কেন্দ্র সরকারের সঙ্গে পাঞ্জাব চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল]। আমরাও শিখ। আমরা কাপুরুষ নই।

আমাদের মানুষকে বোঝাতে হবে যে, আমাদের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমরা কতটা অর্জন করতে পারলাম। আমাদের আরও কি কি অর্জন করতে হবে, এবং যার জন্য আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম কখনও শেষ হয় না। শুধু তার রূপ বদলাতে পারে। যতক্ষণ আমাদের কর্মীরা আমাদের সঙ্গে আছে, ততক্ষণ অন্য কারা কী বলল আমরা সে পরোয়া করি না।

অনেকেরই সন্দেহ সরকার পাঞ্জাবে দক্ষিণপন্থী শক্তিকে উস্কানি দিচ্ছে। এই আন্দোলন যদি তিনটে আইন সম্পূর্ণ বাতিল করার আগেই থামিয়ে দেওয়া হয়, তাতে কি এই শক্তিগুলি আরও উৎসাহ পাবে না?

খলিস্তানিরা কৃষক আন্দোলনের বিরোধিতা করতে পারে সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই আন্দোলন এতটাই শক্তি সঞ্চয় করে ফেলেছে যে খলিস্তানিদের একার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। শুধু আমাদের ইউনিয়নই দিল্লির এই পাঁচটি প্রতিবাদস্থল থেকে ওদের চেয়ে অনেক বেশি লোক জড়ো করতে পারে। ফলে খলিস্তানিদের আর কোনও সুযোগ নেই।

সরকারের সঙ্গে যে কোনও বোঝপড়াই নিশ্চয়ই অন্য ইউনিয়নগুলির সম্মতিতেই হবে?

আমরা যাই পাই আর না পাই, এটা আমাদের মৌলিক বিষয়— আমরা এখানে এসেছি ঐক্যবদ্ধ হয়ে, ফিরেও যাব ঐক্যবদ্ধ হয়ে।

এই তিনটে আইনের মধ্যে আপনি প্রথম কোনটা বাতিল হল দেখতে চাইবেন?

আমি এপিএমসি-সংক্রান্ত আইনটিকেই প্রথম খারিজ হওয়া দেখতে চাইব। কারণ, এই আইনটা দিয়েই সরকার বর্তমান কৃষি-বাজারটাকে ভেঙে দিতে চাইছে।

১০০ দিন হয়ে গেল কৃষকদের আন্দোলনের। এবার আপনাদের কর্মসূচি নিয়ে কী ভাবছেন?

আমরা একটা মানবশৃঙ্খল বানাতে চাইছি। যদিও এর চূড়ান্ত আকার কী হবে তা এখনও আমরা জানি না। যদি আমরা একটা মানবশৃঙ্খলের কথা ভাবি তাহলে আমাদের অবশ্যই এখান থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত শৃঙ্খলের কথা ভাবতে হবে। সেটা আমরা পারব, না পারব না? অমৃতসর থেকে এখানে এই দিল্লি পর্যন্ত মানবশৃঙ্খল তো আমরা যখন খুশি বানাতে পারি। কিন্তু আমাদের অবশ্যই গোটা দেশকে সংযুক্ত করার কথা ভাবতে হবে। পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত। এই মানবশৃঙ্খল যেন দেশের সমস্ত দিক থেকে গড়ে ওঠে। তাহলেই এটি চূড়ান্ত কার্যকরী হতে পারে। আমার মনে হয় এইরকম একটা মানবশৃঙ্খল বানানোর লক্ষ্যেই আমাদের এখন কাজ তৈরি করতে হবে।

পাঞ্জাব এবং হরিয়ানাতে খাদ্যশস্য সংগ্রহের যে ব্যবস্থা চালু আছে, আপনি কি চান সেটা চলুক?

কোনও সমান্তরাল বাজার চলতে পারে না [নতুন আইনে যেমন করার কথা বলা হয়েছে]। চুক্তি চাষ সংক্রান্ত আইনটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে পরিষেবা সংক্রান্ত যে কথাগুলি বলা হয়েছে সেগুলি বিপজ্জনক।

কেন?

এই আইন অনুযায়ী যে কোম্পানির সঙ্গেই আমরা কৃষকরা চুক্তিবদ্ধ হই না কেন তারাই আমাদের বীজ, সার, কীটনাশকের মতন কাঁচামালগুলি সরবরাহ করবে। ফলত কাঁচামালের ক্ষেত্রটা পুরোপুরি এই কোম্পানিগুলির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, এবং বর্তমানে যে সমস্ত খুচরো দোকান থেকে আমরা এই সমস্ত কাঁচামালগুলি কিনে থাকি তাদের পুরোপুরি ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, স্বাভাবিকভাবেই কর্পোরেট দানবদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা এদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। তারপরে এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যে খাদ্যশস্য আমরা উৎপাদন করব, সেগুলিও ওই একই কোম্পানি কিনে নেবে। ফলে কার্যত তারা আমাদের উৎপাদিত ফসলেরও মালিক হয়ে বসবে।

তাহলে কোম্পানি কাঁচামালও দেবে, উৎপন্ন ফসলটাও নিয়ে নেবে। তার মানে তো দামটাও তারাই ঠিক করবে?

ঠিক তাই। ১৯৫৫ সালের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন অনুযায়ী একমাত্র সরকারেরই যত খুশি খাদ্যশস্য মজুত রাখার অধিকার ছিল। সেই অধিকারটা এখন চলে যাবে কোম্পানিদের হাতে। তারাই দেশের খাদ্যসুরক্ষার প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। গণবণ্টন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। গরিবদের দুর্দশার সীমা থাকবে না।

আচ্ছা আপনার কি মনে হয় না সরকার এই যে দরকষাকষি চালিয়েই যাচ্ছে এর কারণটাই হল কৃষক আন্দোলন শুধু পাঞ্জাব আর হরিয়ানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে? হ্যাঁ, সম্প্রতি অবশ্য আমরা পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে এর বিস্তার দেখেছি। যাই হোক, মোটের ওপর সরকার এটাই কি ভাবছে না যে এই কৃষক আন্দোলন তাদের ভোটব্যাঙ্কের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না?

আপনি কি আখড়াতে কুস্তিগিরদের লড়াই দেখেছেন? দেখলে দেখবেন কখনও দুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল যে সে তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে মাটিতে পেড়ে ফেলে তার ওপর চেপে বসে। আর তারপরই দেখা যায় বলশালীজন এক ঝটকায় ঘাড়ে চেপে বসা প্রতিপক্ষকে ছিটকে ফেলে দেয়। শান্তিপূর্ণ [অথবা অহিংস] সংগ্রাম আমাদের একমাত্র অস্ত্র। এর জন্যই এই আন্দোলন ভাঙার সরকারের যাবতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

এই সরকার একটা ফ্যাসিবাদী, আত্মম্ভরী এবং সাম্প্রদায়িক সরকার। তা সত্ত্বেও আমরা তাদের আন্দোলন দুর্বল করার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছি। কে জানত এই আইনগুলির কথা? আমাদের আন্দোলনের জন্যই মানুষ এখন এই আইনগুলির ভয়াবহতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েছে।

কিন্তু এটা তো সত্যি বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের মতো— পশ্চিমাংশ বাদ দিয়ে— নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে এই আন্দোলন সেভাবে দানা বাঁধেনি?

পূর্ব উত্তরপ্রদেশে হচ্ছে। রাজস্থানে হচ্ছে। রাজস্থানে আমিই নিজে দুটো মিটিং করে এসেছি।

আপনি সেই ১৯৮২ সাল থেকে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। আপনার কী মনে হয়— আন্দোলন ঠিক কোন স্তরে গেলে সরকার নতি স্বীকার করতে পারে?

সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার কুর্সি— ক্ষমতার গদি হারানোর ভয়। সরকার যখনই বুঝতে পারে তার গদি টলমল করছে, তখনই নতি স্বীকার করে।

কিন্তু মোদি সরকার ভয় পাবে-টা কেন? পাঞ্জাব থেকে ১৩ জন সাংসদ হয়, হরিয়ানা থেকে ১০ জন, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ ২৯ জন মতো। তা ভারতীয় জনতা পার্টি ভাবতেই পারে যে এই কজন সাংসদ না থাকলে তাদের খুব বেশি ক্ষতি হবে না? আর এর মধ্যেও কয়েকটা আসন তারা জিতে নিতে পারে কৃষকদের বিরুদ্ধে মেরুকরণের একটা প্রয়াস চালিয়ে…

পুঁজিপতিরা কি এক পয়সা ক্ষতিকেও ভালোভাবে নেয়? তাদের মানসিকতাটাই হল দিনে এক কোটি টাকা মুনাফা হলেও অন্য কোনও খাতে ১০০০ টাকা ক্ষতি হোক তা তারা বরদাস্ত করবে না। এই কথাটা রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। একটা ভোট নষ্ট হওয়াও তাদের কাছে কাম্য নয়। আপনি আমি এটা বলতে পারি যে পাঞ্জাবের মাত্র ১৩টা আসন, হরিয়ানায় ১০টা… রাজনীতিকরা কিন্তু একটা ভোটের জন্যও জীবন পণ করতে রাজি থাকেন। তাঁদের কাছে একটা আসন না পাওয়ার অর্থ নিজেদের দুর্বলতা। পাঞ্জাবের পুরসভা ভোটে বিজেপি ধুয়েমুছে গেছে। এর অর্থ এই নয় যে এর জন্য সে কেন্দ্রে গদি হারাতে চলেছে। কিন্তু এই পুরসভা ভোটের ফল বিজেপির কাছে একদমই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বিজেপির দুর্গে ফাটল ধরিয়েছি। এবং আমার মূল্যায়ন, আমাদের আন্দোলন যত দীর্ঘ দিন চলবে এই ফাটল ততই গভীরতর হবে। এমনকি যদি তারা এই আইনগুলি প্রত্যাহার নাও করে তাহলেও ক্ষতিটা আমাদের চেয়ে ওদের অনেক বেশি হবে।

কেন বলছেন এটা?

যাদের কিছু হারানোরই নেই, তাদের কী হবে? আমরা শুধু দুবেলা খাবার জন্য রুটি চাই। আমাদের ক্ষেতই সেটা সরবরাহ করে। যদি আমার রুটি না থাকে আর আপনার থাকে, আমি আপনাকে অনুরোধ করব যে আপনি এটা আমার সঙ্গে ভাগ করে খান। যদি আপনি সেটা না করেন তাহলে আমার ক্ষুধা আমাকে বাধ্য করবে আপনার কাছ থেকে সেটা কেড়ে নিতে। কেউই খিদে সহ্য করতে পারে না। সে রুটি চাইবে; সে রাস্তায় নেমে আসবে; আর তারপরও যদি তার চাহিদা না মেটে তাহলে সে চুরি করতে শুরু করবে। এইজন্যই আমি বলছি যাঁরা আজকে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন তাঁদের শুধু লাভই হতে পারে। কারণ, তাঁদের হারানোর কিছু নেই।

যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন তাঁদের সম্বন্ধে কী বলবেন?

সরকার কি সিএএ কার্যকর করেছে?

না, তা করেনি। কিন্তু প্রচুর আন্দোলনকারীদের সরকার জেলে পুরেছে। ঠিক যেমনটা দেখা গেছে এখানে ২৬ জানুয়ারি ঘটনার ক্ষেত্রে…

আন্দোলনকারীদের জেলে পাঠানো মানে এই নয় যে তাঁদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে গেছে।

আপনি কখনও জেলে গেছেন?

মনে হয় ডজন দুয়েকবার।

সবচেয়ে বেশি কতদিন ছিলেন জেলে?

দু মাস। ট্রিডেন্টদের জমি দেওয়ার বিরুদ্ধে আমরা একটা কৃষক আন্দোলন করেছিলাম।

আপনার বিরুদ্ধে কতগুলি এফআইআর আছে?

বেশি নয়। ওই ডজন দুয়েকই হবে [হেসে]।

এই যে পাঞ্জাবের কৃষকরা অন্য রাজ্যের তুলনায় বেশি বিক্ষুব্ধ, এর পেছনে কি কোনও বিশেষ কারণ আছে?

পাঞ্জাবের কৃষকরা অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। পাঞ্জাবের প্রতিরোধ আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এখন এখানকার কৃষি অর্থনীতি পুরো ভেঙে পড়েছে। যুব সম্প্রদায়ের যে অংশটা কৃষির সঙ্গে যুক্ত, তাদের সামনে ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। যখন প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে।

পাঞ্জাবে কি এটাই ঘটছে?

ঠিক এটাই ঘটছে। শহরে কোনও কাজ নেই। পাবলিক সেক্টর এবং সরকারি কাজ পুরো শেষ হয়ে গেছে। রেল, কয়লা, খনি, বন্দর, বিমানবন্দর, বাস সার্ভিস, ফোন, এলআইসি, ব্যাঙ্ক— কী আছে? কিচ্ছু না। আমার যদি দুটো বাচ্চা থাকে আর আমি তাদের লেখপড়া শেখাই, তারা আর কৃষিকাজে ফিরবে না। তারা কোনও বেসরকারি কাজ বা চুক্তিতে ঠিকা কাজ খুঁজবে, যেগুলোতে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট পয়সা পাওয়া যায় না। এই কারণেই তারা নৈরাশ্যে ডুবে যাচ্ছে। আর এই নৈরাশ্য থেকেই বিদ্রোহের জন্ম হয়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...