আমি, তুমি ও কৃষক: কৃষি আন্দোলনের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

 




প্রাবন্ধিক ও গল্পকার; পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার

 

 

 

আমজনতা কৃষি আইনের প্রতিবাদে কেন সোচ্চার হবে? আমার সঙ্গে লাঙল, ট্রাক্ট্রর বা আদিগন্ত ধানক্ষেতের যোগাযোগ ইন্টারনেটের ছবি এবং উইকেন্ড ট্যুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, অতএব কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলার যুক্তিটা কোথায়?

আমি কবিতা লিখি বা ব্যালেন্স শিট, শ্লোগান বা রোবোট প্রোগ্রামিং কোড, ছোটখাটো যন্ত্রপাতি থেকে অত্যাধুনিক সেতুনির্মাণ এসবের জন্যই আমার দরকার অফুরান শ্রমশক্তি। এই শ্রমশক্তির সরবরাহ যাতে শেষ না হয় তার জন্য প্রয়োজন জীবনধারণের অত্যাবশকীয় সামগ্রী, ডাল-রুটি-ভাত-সব্জি এবং তা উৎপাদন করেন কৃষক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে এখানেই সমাজের সকল স্তরের সকল মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ কৃষকসমাজের। এই কৃষকসমাজ আজ কনকনে শীত, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসানি ফুৎকারে উড়িয়ে কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে অটল, অবিচল। এই কৃষি আইন কী বলছে তা অল্পকথায় বুঝে নেওয়া যাক।

প্রথম আইনটি হল ‘অত্যাবশকীয় পণ্য আইন সংশোধন (Essential commodities Amendment Bill, 2020)। এই বিল অনুযায়ী চাল, ডাল, আটা, আলু, চিনি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য আর অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকায় থাকবে না। যে কোনও ব্যক্তি যতখুশি পণ্য মজুত করে রাখতে পারবে এবং বিক্রি করতে পারবে ইচ্ছেমতো দামে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পচনশীল পণ্যের দাম ৫০ শতাংশ এবং অপচনশীল পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে না। দেখার মতো বিষয় হল, কৃষি বিল সংসদে পেশ হয়েছে সেপ্টেম্বরে, তার আগেই কিন্তু আম্বানি ও আদানির সমস্ত গোডাউনের ফিতে কাটা হয়ে গিয়েছে।  সুদূরপ্রসারী অভূতপূর্ব অপকর্মের জন্য দরকারি হাজার হাজার কালচে কমলা রঙের টাকা জোগান দেয় আদানি আম্বানি নীরব মোদিরা। এই টাকার জোরেই মিডিয়ার স্ক্রিপ্টেড নাটুকেপনা, মানুষের মেরুদণ্ড টুকরো করা, ফেক নিউজ আর হেট স্পিচের আঁতুড়ঘর আইটি সেল টিকিয়ে রাখা বা ভোটের আগে সিগারেটের মতো বিধায়ক কেনা। চাল ডাল না হলেও হাতেগরম কিছু বিধায়ক তখন বিজেপির কাছে অত্যাবশকীয় পণ্য বটে!

দ্বিতীয় আইনটির নাম বেশ বড়সড়, ‘কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত রাখতে কৃষকদের সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন চুক্তি বিল (আইন)’ (The Farmers Agreement of Price Assurance and Farm Services Bill 2020) মানেটা দাঁড়াল যে কৃষকদের সুরক্ষা ও আয় নিশ্চিত করতে আম্বানি, আদানি প্রমুখ শিল্পপতি চালিত কোম্পানিগুলি তাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করতে পারবে, চুক্তি চাষের অধিকার থাকবে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর জিম্মায়। ব্যক্তি কৃষকের সঙ্গে কর্পোরেটের অসম চুক্তিতে তার যে সর্বনাশ হতে চলেছে তা অশিক্ষিত ডিগ্রিধারী বা চমৎকার অন্ধভক্তরাই অস্বীকার করতে পারেন। এইসব চুক্তিতে সরকার নাক গলাবে না। চুক্তিভঙ্গ হলে আদালতে যাওয়ার অধিকারও কৃষকের থাকবে না। কেবলমাত্র জেলাশাসকের দপ্তরে নালিশ জানাতে পারবে যার প্রত্যাশিত সুরাহা একটি অতিলৌকিক ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।

তৃতীয় আইনটির নাম ‘কৃষিপণ্য লেনদেন ও বাণিজ্য উন্নয়ন’ (The Farmers Produce Trade and Commerce Bill 2020)। এই বিল অনুযায়ী ক্রেতা ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির সঙ্গে কৃষকরা সরাসরি কেনাবেচা করতে পারবে মুক্তভাবে। বর্তমানে পাঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে যেখানে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি সেখানে চাষিরা সরকারি নিয়ন্ত্রিত বাজার বা মাণ্ডিতে যায় ফসল বেচতে। এই শস্যের দাম সরকারের ধার্য করা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য। এই মূল্যের কমে ফসল কেনা যায় না। কৃষি আইন অনুযায়ী এই সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজার বা মাণ্ডিগুলি আর থাকবে না। কৃষককেই সরাসরি খোলা বাজারে ক্রেতা খুঁজে নিতে হবে। ফসলের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে বাজার। শুনতে বেশ লাগে যে কৃষকরা এখন ইচ্ছেমতো যেকোনও জায়গায় তাদের ফসল বেচতে পারবেন, কিন্তু প্রশ্ন হল কৃষকদের ফসল কেনার অধিকার এখন কাদের এবং  বিনিময়ে কৃষক কত দাম পাবে।

বুলন্দশহরের এক ক্ষুদ্র চাষি রতনলাল বলেছেন, “যে ছোট বা মাঝারি আড়তদাররা এখন আমাদের পণ্য কিনে নেন তাদের হঠিয়ে বড় কর্পোরেটদের নিয়ে আসতেই এই বিল। ঠিক যেভাবে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে জিও আর এয়ারটেল ছাড়া আর সব প্লেয়ার বাজার থেকে আজ উধাও, ঠিক সেভাবেই শুধুমাত্র বড় পুঁজিপতিদের কাছে ফসল বেচতে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে।”

এই সুপরিকল্পিত ফাঁদ কৃষকরা দেখতে পেয়েছেন বলেই আজকের ঘটে চলা আন্দোলনে মূল দাবি, তিনটি আইন বাতিল করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (Minimum Support Price) এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত মাণ্ডিব্যবস্থাকে বজায় রাখা। মীরাটের কৃষক বলীরাম এই চক্রান্ত ধরতে পেরেছেন বলেই মনে করেন, “বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপেই সরকারের এই পদক্ষেপ। বরং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা এমএসপি দিতে সরকার পার্লামেন্টে কেন বিল আনছে না?”

এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। সরকারকে কৃষিতে ভর্তুকি দিতে হয় কেন?

পুঁজিবাদের এক অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের সমাধান হল ভর্তুকি। কৃষিতে এবং শিল্পে সমান পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ হলেও শিল্পে মুনাফার হার সবসময় কৃষিতে মুনাফার হারের থেকে বেশি। কারণ কৃষি হল একটি জৈবিক পদ্ধতি (Organic Process)। সূর্যের আলোকশক্তিকে জৈব-রাসায়নিক শক্তিতে রুপান্তরিত করে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটে এবং সঠিক সময়ে তা ফসলের চেহারা নেয়। এই বৃদ্ধির হার যেহেতু একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে তাই ইচ্ছেমতো এই প্রক্রিয়াটি বাড়ানো কমানো সম্ভব নয়। এখানেই কাজ করে সীমাবদ্ধতা। তাই জমিতে পুঁজি দ্বিগুণ বা তিনগুণ হারে বিনিয়োগ করলেও উৎপাদন দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায় না। ফলত মুনাফার হারও বেড়ে যায় না। এখন কৃষিতে কম মুনাফার হারের কারণে পুঁজির শিল্পে বিনিয়োগ হওয়ার প্রবণতা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে তাহলে ফল হবে মারাত্মক। প্রথমত, উৎপাদন কমে গিয়ে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে যার প্রভাব সমাজের সকল স্তরের মানুষের ওপর পড়বে, শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি পাবে— টান পড়বে মুনাফায়। দুই, কৃষিতে উৎপাদন কমে গিয়ে দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত ঘটতে পারে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে পুঁজির বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতেই সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। এটা সরকারের কোনও দানখয়রাত বা মহানুভবতার পরিচয় নয় বরং পুঁজির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের সমাধান।

ইন্দিরা গান্ধি প্রধামন্ত্রী থাকাকালীন ভারতীয় পুঁজিবাদে একটি দ্বন্দ্ব দেখা যায়, রাষ্ট্রের অধীনে পুঁজির অস্তিত্ব না মুক্ত বাজারের অধীনে পুঁজির বিকাশ ঘটবে। ইন্দিরা গান্ধির মৃত্যু এবং সমসাময়িক আঞ্চলিক বুর্জোয়াদের উত্থানের মধ্যে দিয়ে এই দ্বন্দ্বই প্রতিফলিত হয় সেইসময়কার কংগ্রেসে। মূলত কংগ্রেসের একটি অংশের মদতে ধীরুভাই আম্বানি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পরিচয় থেকে ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠান হিসাবে উঠে এলেন। পরবর্তীকালে রাজীব গান্ধিকে পরাজিত করার জন্য ভিপি সিং-কে আঞ্চলিক দলগুলি সমর্থন দেয়। এই দলগুলোর প্রশ্রয়ে বুর্জোয়াদের বিকাশ ঘটছিল। তখন রাজনৈতিক পার্টিগুলিকে অর্থের জোগান দিত চিনি ও টেক্সটাইলের কারবার করা বড় বড় কর্পোরেট, কো-অপারেটিভ সংস্থা, কনট্রাকটর, শস্য ব্যবসায়ী, জমির দালাল, বিল্ডার এবং খনি মালিকেরা। এরা সকলেই ছিলেন আঞ্চলিক বুর্জোয়া। ফলত একটি বিকেন্দ্রীভূত ক্রনি পুঁজিবাদের (decentralised crony capitalism) জন্ম হল— যেখানে প্রত্যেকটি পার্টি নিজেদের পছন্দের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সরকারি সাহায্য করত।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে উদ্যোক্তা পুঁজিবাদের (entrepreneurial capitalism) জন্ম হল। মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হওয়ার পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্থার নামে ব্যক্তি-পুঁজির জন্য নতুন নতুন শিল্পের দরজা খুলে দেওয়া হয়। ধনী চাষিদের স্বার্থকে সুরক্ষিত করার জন্য এমএসপি চালু করা হল। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় অতিরিক্ত চাল গম উৎপাদনের ফলে ফসলের দাম পড়ে গেলে সরকার তা কিনে নিয়ে রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং মিড-ডে মিলের মধ্যে দিয়ে ভোগের ব্যবস্থা করল। অন্যদিকে, সরকারি ক্ষেত্রগুলিতে শেয়ার বেচে বা বিক্রি করে ব্যক্তিপুঁজি প্রবেশের পথ প্রশস্ত করা হল। ২০১৪ সালের পর কেন্দ্রে শক্তিশালী সরকার আসায় জায়গা নিল একচেটিয়া পুঁজি। সম্প্রতি GVK মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেচেছে আদানি গ্রুপকে। নবযুগ কোম্পানির কৃষ্ণপত্তনম জাহাজবন্দরও কিনেছে এরা। আজ টেলিকম, এয়ারলাইন্স, স্টিল, সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম থেকে সিন্থেটিক ফাইবার, পলিমার, চাল ও বিস্কুটের মতো শিল্পে তিনটের মধ্যে দুটো হলেও একচেটিয়া কোম্পানি দখল করে আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন শাখায় দখলদারি কায়েম করেছে, যেমন রিলায়েন্স (পেট্রো কেমিক্যাল টেলিকম এবং খুচরো ব্যবসা), টাটা (স্টিল, বাণিজ্যিক, গাড়ি, নুন এবং আইটি), আদিত্য বিড়লা (সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম) এবং আদানি (পাওয়ার, ভোজ্য তেল এবং বিমান বিমানবন্দর)।

আদানির ভবিষ্যৎ পুঁজির আঁতুড়ঘর

একচেটিয়া পুঁজির শোষণ ও শাসনকে ধরে রাখার সঙ্গতিপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করে রাখার জন্য আজ কেন্দ্রীয় সরকার হিন্দুত্ববাদকে সামনে এনে দেশে ফ্যাসিবাদী একচেটিয়া রাজনৈতিক শাসন কায়েম করতে চলেছে। তারই পদক্ষেপে হিসেবে NRC, GST, শ্রম-আইন পাল্টে শ্রমিক বিরোধী শ্রম আইন তৈরি করা, নয়া শিক্ষানীতির আড়ালে কর্পোরেট স্বার্থকে অক্ষুণ্ণ রাখার জবরদস্তি পরিকল্পনা। আজ কৃষকের যেটুকু সুরক্ষা ছিল এমএসপির মধ্যে দিয়ে তাকে তুলে দিয়ে কর্পোরেটদের পুঁজি বাড়ানোর অবাধ ক্ষেত্র বানাতে চাইছে এই কৃষি আইন।

কর্পোরেটরা আজ ভারতীয় কৃষিকে Global Value Chain ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে মুনাফার হারকে আরও বাড়িয়ে নিতে চাইছে। কৃষি মজুরের উৎপাদিত সস্তা পণ্যকে বিদেশের চড়া মূল্যের বাজারে বিক্রি করতে চাইছে। তাই Jiomart গড়ে তুলে রিলায়েন্স শেয়ার বেচেছে আমাজন ও Future কোম্পানিকে।

১৯৯৬ সালের কথা। ভয়ানক হয়ে দেখা দিয়েছিল কৃষিপ্রধান দেশের উপর দখলদারির প্রবণতা। ভারতে শুরু হয়েছিল বিটি তুলোর চাষ। ‘দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব’কে লক্ষ করে চুক্তি। মূল কথা হল জিনপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জেনেটিক বীজের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে দেওয়া। বিটি বেগুন, বিটি শসা, বিটি চালও বাজারে আসতে শুরু করল। জিন পরিবর্তিত ফসলের চাষ শুরু হওয়ায় নষ্ট হল ফসলের বৈচিত্র্য। উঠে গেল প্রচলিত বীজের চাষ। কৃষি হয়ে দাঁড়াল এমনই ব্যয়বহুল যে কৃষকের জমি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকল না। শুরু হল কৃষক আত্মহত্যা। বায়োটেকনোলজি আর জিনপ্রযুক্তির চকচকে আবরণে নিজেদের ঢেকে হানা দিল কর্পোরেট হাঙররা। পাঞ্জাব থেকে নেসলে কোম্পানি দৈনিক সাড়ে ছ কোটি লিটার দুধ তুলে নিল। সুগন্ধী বাসমতি চালের জন্য প্রায় লক্ষ একর জমি নিল সৎনাম ওভারসিজ, ডিডি ইন্টারন্যাশনাল। মনসান্টো ঢুকল জিন-বদলানো বীজ নিয়ে। বিল গেটস শুধু মহান প্রযুক্তিবিদই নন বিনিয়োগকারী হিসেবেও তার সুযোগসন্ধানী প্রতিভা সমুজ্জ্বল। তিনি জানিয়েছিলেন, বিহারের একটি গ্রাম তিনি পোষ্য নেবেন। অনুমান করাই যায় এক্ষেত্রে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য। যদিও এর প্রস্তুতি চলছিল ১৯৯১ সাল থেকে। ধীরে ধীরে কৃষির নিবেশে (INPUT) সার, বীজ, কীটনাশকের উপর ভর্তুকি তুলে নেওয়া এবং ২০০‍‌৩ সালে কৃষি, বিদ্যুতে ভর্তুকি তুলে নেওয়া এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। এখন এমএসপি তুলে দিয়ে কৃষিব্যবস্থায় শেষ পেরেকটি মারার লক্ষ্যেই কৃষিবিল তড়িঘড়ি সংসদে পাশ করিয়ে নেওয়া।

ফলত, প্রান্তিক ও মধ্য কৃষকরা দ্রুত কর্পোরেট পুঁজির ভূমিদাসে পরিণত হবে। হারাতে বাধ্য হবে তাদের শেষ সম্বল জমিটুকু।

এতদিন সরকারি ভর্তুকির মধ্যে দিয়ে পাঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশ-মহারাষ্ট্র-মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্যে যে ধনী চাষিরা বিকাশ লাভ করেছিল আজ কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে তাদের বিরোধ দেখা দিচ্ছে। তাই এমএসপির দাবি এত জোরালো হয়ে সামনে আসছে। আবার প্রান্তিক চাষি ও মধ্যচাষিদের কাজে এমএসপি একধরনের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ছিল যদিও গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে খরচ বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত ছিল। তারা আর কতদিন জমির মালিকানা ধরে রাখতে পারবে তা এখন প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি। আগামীর দিনগুলোয় সস্তা মজুরে পরিণত হতে চলেছে দেশের কৃষকেরা।

কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে চুক্তি চাষের ভেতর দিয়ে আস্তে লাভজনক ফসলের চাষ হবে। খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের চেয়ে অর্থকরী ফসলের চাষ বেশি প্রাধান্য পাবে। ব্যবহার বাড়বে জমিতে আরও বেশি বেশি করে সার, কীটনাশকের। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর এই কীটনাশকের প্রভাবে ভারতে  ৬৬০০ কৃষক মারা যান, গোটা পৃথিবীতে সংখ্যাটা ১১০০০। অতএব কৃষক মৃত্যুর ৬০ শতাংশই ভারতে। প্রাকৃতিক নিয়মমাফিক মাত্র ১৮-৩০ শতাংশ গাছ গ্রহণ করে, বাকি অব্যবহৃত রাসায়নিক নদী-নালার জলকে বিষাক্ত করবে। বিষাক্ত হবে সমুদ্রের জল। ইতিমধ্যেই ২০ লক্ষ উপকারী ব্যাকটিরিয়া মারা গেছে, আরও উপকারী অণুজীবের মৃত্যু ঘটবে। বাড়বে আলগাল ব্লুম (algal bloom) এবং বাড়বে ডেড জোনের সংখ্যা। দেখা দেবে সামুদ্রিক জীবের মৃত্যুমিছিল। এর সঙ্গে হ্রাস পাবে জমির উর্বরতা। বাড়বে আরও বেশি করে কৃত্রিম সারের ব্যবহার। এভাবেই দেশীয় প্রথায় গড়ে ওঠা কৃষি-পদ্ধতি বিলুপ্ত হবে, কর্পোরেট আগ্রাসন মানবসভ্যতাকে রীতিমতো খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করাবে। এখানেই শেষ  নয়, পরিসংখ্যান বলছে কৃষি প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে ভারতে সাত কোটি কৃষক প্রভাবিত হতে চলেছে। বলা বাহুল্য, এই প্রযুক্তির মালিকানা  মুনাফাখোর কর্পোরেটদের হাতেই এবং কৌশলে উন্নয়নের বুলি  আওড়ে কৃষকদের  ব্রাত্য করে সস্তা শ্রমিকে পরিণত করাই তাদের লক্ষ্য। 

তাই কর্পোরেট পুঁজি যেভাবে সমাজের আনাচকানাচ দখল করতে সর্বশক্তি নিয়ে হানা দিচ্ছে, তাকে রুখে দিতেই কিন্তু এই কৃষক আন্দোলন। সমাজের অন্যান্য অংশও ক্রমশ যুক্ত হয়ে আন্দোলন বিস্তার পাচ্ছে। জাতিসংঘও কৃষকদের পক্ষে! জাতিসংঘ ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে কৃষকদের প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া ভুল হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন যে কৃষকদের শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলার অধিকার রয়েছে এবং তাদের এ থেকে বাধা দেওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে আমেরিকার কয়েকটি শহরে এই আন্দোলনের পক্ষে বিক্ষোভ চলছে। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন থেকেও এর সমর্থনে বিবৃতি জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনের ৩৬ জন আইনপ্রণেতা কৃষি-আইনকে ডেথ ওয়ারেন্ট বলেছে। পাঞ্জাব-হরিয়ানা শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা তাদের গান-কবিতা নিয়ে হাজির হয়েছে। কৃষির সঙ্গে যুক্ত পরিবহণ শিল্পের শ্রমিকরাও এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে ধর্মঘটে শামিল হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যান্য প্রদেশের কৃষকরাও দিল্লি যাওয়ার জন্য জোট বাঁধছে। যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও।

এই আন্দোলন মানবিক অস্তিত্বকে বজায় রাখার এবং পরোক্ষভাবে প্রকৃতি বিপর্যয়ের  বিরুদ্ধে একটি মজবুত হাতিয়ার। এর ভিত যেন কোনওভাবেই দুর্বল হয়ে না পড়ে তার প্রতি আমাদের সকলের নজর রাখা দরকার তন্নিষ্ঠ মনে। তাই এখনই শ্রেষ্ঠ সময় মিছিলে যোগ দেওয়ার। আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, সকল প্রান্তে  ছড়িয়ে দিতে সাধ্যমতো নিজেকে শরিক করে ‘মানুষ’ শব্দটির প্রকৃত মর্যাদা রাখার সময় এখনই।  

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...