এই আগুন থেকে যে ফিনিক্স পাখিদের জন্ম হচ্ছে

দেবব্রত শ্যামরায়

 



রাজনৈতিক ভাষ্যকার

 

 

 

 

বিলকিস দাদি। সফুরা জারগার। নোদীপ কৌর। দিশা রভি।

যারা নানা সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত চোখ বোলান, এই চারটে নাম তাদের কাছে আজ আর অজানা নয়। অজানা না হলেও, এঁদের পরিচয় সকলের কাছে একইরকমভাবে ধরা দেয়নি। দেশের শাসক ও শাসকের অঙ্গুলিহেলনে চালিত মিডিয়ার কাছে এই চার নারীর পরিচয় একেবারে একরৈখিক। ভারত রাষ্ট্রের চোখে এঁরা অবাধ্য নাগরিক, মাত্রাভেদে রাষ্ট্রদ্রোহী।

বিপরীতদিকে, এদেশে যেকোনও ক্ষমতাতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বা নিদেনপক্ষে দাঁড়াতে চাওয়া ও চেয়েও না পারা বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের কাছে এই চারজন নারী বিরাট বিপুল আশা-আকাঙ্খার প্রতীক।

প্রথমজন, ৮২ বছরের তরুণী বিলকিস বানো, শাহিনবাগের দাদি, যিনি ২০১৯-এর শেষে দক্ষিণ দিল্লির শাহিনবাগে সিএএ-এনআরসি-বিরোধী অবস্থানে অংশ নিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো কোনও গণআন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, এবং যা তাঁর ও তাঁরই মতো অন্য অনেকের জীবনকে বরাবরের মতো বদলে দিয়েছিল।

দ্বিতীয়জন, সফুরা জারগার একজন কাশ্মিরি। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া স্নাতকোত্তর স্তরের এই ছাত্রীটি সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। নির্বাচিত সরকারকে গদি থেকে তুলে ফেলে দেওয়ার মতো কোনও ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার গন্ধ পেয়ে সফুরাকে ১০ এপ্রিল ২০২০ তে গ্রেফতার করে তিহার জেলে বন্দি করা হয়। তখন সফুরা কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দীর্ঘ টালবাহানার পর ২৪ জুন প্রমাণাভাবে সফুরাকে জামিন দেওয়া হয়। ‘প্রমাণাভাবে’ এই চাবিশব্দটি আমরা এই লেখায় আরও দু-একবার শুনব।

আমরা অবশ্য আজ শেষের দুজনের কথা একটু বেশি করে বলব। কারণ নোদীপ ও দিশা, দুজনেই দিল্লির উপকণ্ঠে দুশো দিনের বেশি সময় লাগাতার ধরে ঘটে চলা কৃষক অবস্থানের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

নোদীপ কৌর, দলিত শ্রম অধিকার রক্ষা আন্দোলনের কর্মী, এবং মজদুর অধিকার সংগঠনের (MAS) নেতা। এমএএস মূলত কুণ্ডলি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করত। গত ১২ই জানুয়ারি সিংঘু সীমান্তে আন্দোলনরত কৃষকদের অবস্থান থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সে তখন আর পাঁচটা আন্দোলনকারীর মতোই কৃষক আন্দোলনের পক্ষে ও শাসকের বিরুদ্ধে গা-গরম করা স্লোগান দিচ্ছিল। অথচ নোদীপকে গ্রেফতারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের দায়ের করা অভিযোগগুলি ছিল খুনের চেষ্টা, ভয়ঙ্কর অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে দাঙ্গা লাগানো, অবৈধ জমায়েত, এক সরকারি আমলাকে হেনস্থা করা, ভয় দেখানো ইত্যাদি ইত্যাদি৷। চোখের পড়ার মতো ঘটনা, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে একমাত্র ধর্ষণের অভিযোগ ছাড়া বাকি প্রায় সমস্ত অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন নোদীপ।

অভিযোগগুলি নিঃসন্দেহে তদন্তসাপেক্ষ ও বর্তমানে বিচারব্যবস্থার এক্তিয়ারে। কিন্তু নোদীপ তাঁর জামিনের আবেদনে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে তাঁকে নির্মমভাবে মারা হয়েছে। নোদীপের উকিল জানাচ্ছেন নোদীপের শরীরের বিশেষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাতের চিহ্ন আছে। নোদীপের ভাই অভিযোগ এনেছেন নোদীপকে জেলে যৌন অত্যাচারও করা হয়েছে। এছাড়াও নোদীপ তাঁর নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কারণ গ্রেফতারির পর জেলের মধ্যে তাঁর কোনও মেডিকাল চেক-আপ করা হয়নি। এই কদিনে নোদীপের জামিন দুবার নাতিল হয়েছে। নোদীপের বিরুদ্ধে শাসকের এই প্রতিহিংসা তাঁর সমাজকর্মী পরিচয়ের পাশাপাশি দলিত ও নারী পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত কিনা— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে।

নোদীপ জামিন পাননি। দিশা রভি পেলেন।

দিশা ২২ বছর বয়সী কর্নাটক-নিবাসী একজন জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী। এমাসে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে দিল্লি পুলিশ তাঁকে ‘টুলকিট’ মামলায় গ্রেফতার করে। এক্ষেত্রে ‘টুলকিট’ ডিজিটাল মাধ্যমে সঙ্কলিত নানা তথ্যের সমাহারে লিখিত একটি ডকুমেন্ট যার মাধ্যমে দিশা বহির্বিশ্বের নজর দিল্লির কৃষক আন্দোলনের দিকে নিয়ে আসে। এই টুলকিট, দিল্লি আদালতে অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেলের বয়ান অনুযায়ী অর্থাৎ পক্ষান্তরে কেন্দ্র সরকারের মত অনুযায়ী স্রেফ টুলকিট নয়, বরং ভারতবর্ষকে সারা পৃথিবীর সামনে অপমান করার ও দেশে অশান্তি ও হিংসার পরিবেশ তৈরি করার ঘৃণ্য প্রয়াস।

আদালতে নিজের জামিনের আবেদনে এইসব অভিযোগের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে আজ যেসব উত্তর দিয়েছেন সদ্য স্কুল পেরোনো মেয়ে দিশা, তা শাসকের কানে নিশ্চয়ই শ্রুতিমধুর লাগেনি৷

দিশা বলেছেন—

“যদি কৃষক আন্দোলনকে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসা দেশদ্রোহ হয়, হ্যাঁ আমি তা করেছি, এবং সেক্ষেত্রে আমার জেলে থাকাই ভালো।”

দিশা কোনওরকম ভণিতা না করে মেনে নিয়েছেন কৃষক আন্দোলনের পক্ষ নিয়ে প্রচার করায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে৷ কিন্তু তা কি অপরাধ? তা কি ভারত-বিরোধী কাজ? কৃষকদের যদি প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে, তাদের স্বপক্ষে কথা বলা ও আরও সমর্থন জোগাড় করার কাজটা দেশবিরোধী হয় কী করে?

অকাট্য যুক্তি।

এক্ষেত্রে দিশাকে যথাযথ সাহায্য করেছেন তাঁর উপযুক্ত আইনজীবী— সিদ্ধার্থ আগরওয়াল। সিদ্ধার্থ কোর্টে বললেন— টুলকিট ডিজিটাল ধর্মঘটের কথা বলে, শারীরিকভাবে কোনও দূতাবাস, বা আদানি-আম্বানির অফিস ঘেরাও করার কথা বলেনি, পাথর ছুঁড়তে বলেনি, তাহলে টুলকিটের মাধ্যমে হিংসায় প্রশ্রয় দেওয়া হল কীভাবে? দেশের কোথাও যদি আইন মেনে কোনও শান্তিপূর্ণ মিটিং, মিছিল বা প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে আরও বেশি মানুষকে যোগ দিতে বলাটাও কি দেশদ্রোহের শামিল? সেক্ষেত্রে দিশা রভি অবশ্যই দেশদ্রোহী!

দিশা ও তাঁর আইনজীবীর নিশ্চিদ্র যুক্তিতর্কের সামনে দৃশ্যত দিল্লি পুলিশের খুব বেশি কিছু বলার ছিল না। বিচারপতি ধর্মেন্দ্র রানা সরাসরি পুলিশকে প্রশ্ন করেন, দিশার টুলকিট যে সরাসরি ২৬ জানুয়ারি দিল্লির কৃষক আন্দোলনে হিংসার ঘটনায় মদত দিয়েছে, তার প্রমাণ কী? এমনকি যারা হিংসার ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের সঙ্গে যে দিশার সরাসরি যোগাযোগ আছে, তারই বা প্রমাণ কোথায়?

আবার সেই প্রমাণাভাব! দিল্লি পুলিশ আদালতকে ওই ধরনের কোনও প্রমাণ তো দেখাতে পারেইনি, বরং গ্রেটা থুনবার্গের বিরুদ্ধে এফআইআর-এর হাস্যকর ঘটনার মতোই দিশার ঘটনাতেও তাদের মুখ পুড়ল। এমনকি আজ দিশা রভির জামিনের ঘোষণা মিথ্যে অভিযোগে জেলে আটকে থাকা সিএএ-বিরোধী বিপুল সংখ্যক আন্দোলনকারীকে ভরসা যোগাবে। দিশার যদি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে, তাহলে দেবাঙ্গনা কলিতা, ইশরাত জাহান, গুলফিশা ফতিমা, নাতাশা নরওয়াল এবং সফুরা জারগার প্রমুখের সিএএ আইনের বিরুদ্ধাচারণ করার গণতান্ত্রিক অধিকার কেন থাকবে না?

এই মুহূর্তে আমাদের দেশ এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করেও শাসকগোষ্ঠী প্রায় অনুরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। সামান্যতম বিরুদ্ধাচারণ দেখলেই বিরোধীর কণ্ঠরোধ করছে শাসক। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে গত কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক অর্জনগুলিকে। কিন্তু এই নরকের আগুনের মধ্যে থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো বেরিয়ে আসছে সফুরা জারগার, দিশা রভি, উমর খলিদের মতো নতুন প্রজন্মের অকুতোভয় ছেলেমেয়েরা। আর কে না জানে একমাত্র ছাত্রছাত্রীদের কোনও শ্রেণি হয় না! তাই জামিয়া থেকে জেএনইউ, যাদবপুর থেকে ওসমানিয়া— এই নির্ণায়ক লড়াইয়ে সঠিক পক্ষ বেছে নিতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তাঁদের। আমরা অর্থাৎ গোটা দেশ তাঁদের দিকেই তাকিয়ে আছি।

আর তাকিয়ে আছি দিল্লি সীমান্তে ঠায় বসে থাকা ওই বোকা বুড়োগুলোর দিকে…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3172 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...