আমরা ওরা

অনিমিখ পাত্র

 




কবি, গদ্যকার

 

 

 

 

তখনও আমাদের দেশে করোনাভাইরাস ঢোকেনি। গতবছর মোটামুটি এরকম সময়েই সদ্য পাশ হওয়া সিএএ এবং প্রস্তাবিত এনআরসি-র বিরুদ্ধে দিল্লিতে লাগাতার আন্দোলন-ধর্না চলছে। সরকারের মাথাব্যথার কারণ যে হয়ে উঠেছে তা সেটা তাদের প্রতিক্রিয়া এবং ট্রোলবাহিনি, আইটি সেল ও পুলিশের কাজকর্মেই বোঝা যাচ্ছিল। সেই সময় কোনও একটা দিন আমার এক শিক্ষক সহকর্মী বিদ্যালয়ের স্টাফরুমে হঠাৎই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ‘এক্ষুণি চাবকে ওদের তুলে দেওয়া উচিত’— তার গলায় তীব্র আক্রোশ। পাশে বসা আমি শুনলাম, আহত ও বিপন্ন বোধ করলাম, কিন্তু আশ্চর্য হলাম না। বরাবর বামপন্থী দলকে ভোট দিয়ে আসা এই মানুষটির মতের ও পথের পরিবর্তন আমি অনেককাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। আমি সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে, কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্যাসিস্ত কাজকর্মের বিরুদ্ধে আমার ঘোষিত অবস্থান। কিন্তু আমি জানি, এই উত্তেজনার মুখে আমার মত আমল পাবে না, তর্ক চালিয়ে যাওয়ার মতো গলার জোরও আমার নেই, শরীরও ক্লান্ত। আমি শান্তভাবে কিন্তু স্পষ্ট করে বললাম, ‘আমি ওই ওদেরই একজন। আমি এই আন্দোলনের পক্ষে। তাহলে আপনি বরং আমাকেই মারুন।’  আমার সহকর্মী তথা একপ্রকার বন্ধুটি একটু থমকে গেলেন। সরাসরি এইরকম ঘোষণায় হয়তো বা সৌজন্যবশতই ঝাঁঝ কমিয়ে আনলেন গলায়।

ঘটমান বর্তমানে সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে অভূতপূর্ব কৃষক বিদ্রোহ, স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে তার কোনও দ্বিতীয় উদাহরণ মেলা দুষ্কর। কৃষকদের এই আন্দোলন যেমন আমাদের অনেকদিন মরে থাকার পর অনেকখানি সঞ্জীবনী মন্ত্র দিচ্ছে, বুকে বল আনছে অনেকদিন পর— তেমনই থেকে থেকেই এক বৃহৎ ভয়ের দিকে চলে যাচ্ছে আমার মন। উপরের ঘটনাটুকরোটি সেই ভয়ের একটা ধরতাই। এই যে বললাম, কৃষক বিদ্রোহে আমরাও যেন জেগে উঠছি নতুন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস বাড়ছে আমাদের— এই ‘আমরা’ আসলে কারা? যারা দেশ বলতে দেশের মানুষ, তার ভালোমন্দ বুঝি? চাই, সমাজের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফুটুক। জিনিসপত্রের দাম কমুক। উঁচু-নীচু ব্যবধান ঘুচে যাক। সবাই স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলবার জায়গা পাক। এই তো? এখন প্রশ্ন হল, এইসব কে চায় না? মানে, এর উল্টোটা চান এরকম কোনও সাধারণ মানুষ আছেন নাকি? সাধারণভাবেই, উত্তর হয়— না। তবুও কী অদ্ভুত, আমি আর আমার সহকর্মী যুযুধান দুই পক্ষ হয়ে দাঁড়াই। এই ‘আমরা’ যদি সবাই হত তবে নিশ্চয়ই এত মার, হিংস্রতা, ট্রোল ইত্যাদির দেখা মিলত না। তবে কি এই ‘আমরা’র বাইরে যারা তারা সবাই চাড্ডি, সবাই খারাপ? হ্যাঁ, অনেকেই, তবে সবাই নন। লোকাল ট্রেনে শহর থেকে গ্রাম-মফস্বলে দীর্ঘপথ যাতায়াত এবং সমাজের নানান স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশবার সুযোগে আমার এই প্রতীতি হয়েছে যে আমার সহকর্মীর মতো বেশিরভাগ মানুষই (তাদের মধ্যে আবার বেশিরভাগই তথাকথিত প্রাক্তন বাম সমর্থক। কেউ কেউ প্রাক্তন পদাধিকারীও।) একটি গণ-সম্মোহনের শিকার। আমি ভালো করে খেয়াল করে দেখেছি এর সাম্প্রতিক শুরুয়াতটা হয়েছে ২০১৬-র নোটবন্দির ঘোষণা থেকে। যদিও এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হচ্ছিল পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের আর্থিক দুর্নীতি এবং নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির সপ্রতিভতার পাশে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাহুল গান্ধির আমতা-আমতা করা উপস্থিতিতে। ২০১৪-য় সরকারে এসে দু বছর ওষুধপত্রের দাম বাড়িয়ে ও সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ, বছরে ২ কোটি কর্মসংস্থান ইত্যাদি নির্বাচনী বাগাড়ম্বর পূরণে ব্যর্থ হয়ে তারা সরকার চালাচ্ছিলেন খোঁচা দেওয়া ব্যাটসম্যানের মতো। রানও উঠছিল না। এমতাবস্থায় এল সেই মধ্যরাতের ধামাকা! বড়লোকগুলো খুব টাইট হবে, কালো টাকা উদ্ধার হয়ে সুদিন ফিরবে— এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে অনেক মানুষই ভেবেছিলেন অবশেষে এমন একটা সরকার এসেছে যে আমাদের কথা ভাবে। এর স্বপক্ষে সেদিন কত না যুক্তি, কতশত হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ড। মোহগ্রস্ততার সেই শুরু। গেরুয়াপক্ষ জানতেন এই ভাঁওতাবাজি একদিন ধরা পড়ে যাবে, তাই তারা দ্রুত নামালেন তাদের তুরুপের তাস— ‘হিন্দু-মুসলমান’ ঘৃণার চাষ। এক্ষেত্রে স্বীকার করে নিতেই হবে যে আমাদের মনের ভেতরে এই পারস্পরিক ঘৃণার বীজ আগে থেকেই ছিল, বিজেপি তাতে সার জল ঢেলেছে মাত্র। আর এর কারণ হয়তো বা পড়শি হয়েও একে অন্যের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলা, যেমনটা বহুকাল আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে ইঙ্গিত করেছিলেন। মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মনে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে নানান অমূলক ধারণা, বিকৃত তথ্য। তুমি ও তোমার জাতি বিপদে রয়েছ— লাগাতার এরকম বাণী প্রচার করে সংখ্যাগুরুকে উসকে দেওয়া হয়েছে। ঠিক যেমনটি নাৎসি পার্টি করেছিল গত শতাব্দীর জার্মানিতে। হিটলার ঠিক এরকমভাবেই ধ্বংস করেছিলেন নিজেরই দেশ জার্মানি এবং ইউরোপের বৃহৎ অংশকে। সম্প্রতি অস্কারপ্রাপ্ত মুভি ‘জোজো র‍্যাবিট’-এ ঠিক যেমনটা আমরা দেখি— কীরকম সুচারুভাবে দে্শেরই একটি বড় অংশের মানুষকে ‘অপর’ বা ‘ওরা’য় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল নাৎসিরা। ইহুদিদের সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করা হয়েছিল এমন যে এমনকি শিশুরাও ভাবতে শুরু করে যে ওরা বুঝি মানুষ নয়, দৈত্য বা রাক্ষসের মতো কিছু। ওদের মাথায় বুঝি অদৃশ্য শিং। অথচ ওই ওদের মধ্যেই আছে ছোটবেলার বন্ধু, কর্মক্ষেত্রের কলিগ, এমনকি প্রিয় তারকারাও। এইভাবে ভাবতে ভাবতে মানুষের চিন্তাশক্তি, বিচারবুদ্ধি হয়ে পড়ে অসাড়। মাদকাসক্ত, নেশাচ্ছন্নের মতো হয়ে ওঠে তার মন। তার সামনে দশেরার রাবণবধের মতো রক্তমাংসের প্রকট শত্রু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ‘অপর’ সম্প্রদায়। রাবণকে লক্ষ্য করে তীর মারার মতোই যেন ওই সম্প্রদায়কে হেনস্থা করতে পারলেই আমাদের জীবন হয়ে উঠবে সুজলা সুফলা। এই ভাবনানেশায় আচ্ছন্ন, চিন্তাচেতনাকে বন্ধক দিয়ে ফেলা এই অনেক মানুষের মধ্যে তখন মসীহা হয়ে দেখা দেন মোদি-শাহ। ঠিক যেমনভাবে প্রাক্ বিশ্বযুদ্ধের জার্মানিতে কিছু অংশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন অ্যাডলফ হিটলার।

অথচ মতান্তর সত্ত্বেও একথা প্রত্যেক সাধারণ মানুষ জানেন ও মানেন যে আমাদের দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতারা দুর্নীতিপরায়ণ, তারা আমাদের বোকা বানাতে সিদ্ধহস্ত। তবু, ওই পূর্বোক্ত মোহ এসে যখন ধরে তখন এই বোধটুকুও সাময়িক লোপ পেয়ে যায়। নইলে কী করে ভুলে যাই নোটবন্দির ধাপ্পার কথা? কালো টাকা ফেরেনি, কালোটাকাওয়ালারা জেলে যায়নি। গরীব মানুষের জয় তো দূরের কথা ক্রমাগত ভারী হয়েছে তাদের কাঁধের জোয়াল। জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া, রান্নার গ্যাসের দাম প্রতিমাসে বাড়ে, কেনা দাম কমলেও পেট্রল ডিজেলের দাম কেবলই বাড়ে, টাকার দাম পড়ে যায়। তবু, মনমোহন সরকারকে আমরা সে প্রশ্নে বিদ্ধ করেছি, কিন্তু মোদিজিকে ছাড় দিয়ে দিই। বারবার ঠকে গিয়েও, আবার নতুন ধামাকায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। প্রধানমন্ত্রীর কৃত্রিম আবেগকম্পিত ভাষণ, ট্রিম করা দাড়ি আর ডিজাইনার পোশাক কি জাদু করে কিছু? তাই বারবার দেখতে হয় যে এই ‘আমরা’র মধ্যে আমার সহকর্মী বন্ধুদের মতো অনেকেই পড়ছেন না! অথচ, কী আশ্চর্য, স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মধ্যবিত্ত হিসেবে তাদেরও তো এই ঠকে যাওয়ার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলারই কথা ছিল! অথচ পরমাশ্চর্য এই যে, তাদের বারবার দাঁড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে ছাত্রদের বিরুদ্ধে, বিদগ্ধ মানুষজনের বিরুদ্ধে আর এখন এমনকি অন্নদাতা কৃষকদের বিরুদ্ধেও! আন্দোলনরত কৃষকেরা বড়লোক কৃষক হোন বা ক্ষুদ্র চাষি, কেন তারা এই ঠান্ডায় যাবতীয় ভয় ও শাসানিকে উপেক্ষা করে রাস্তায় আছেন তা ভাবার বদলে তারা বিশ্বাস করে ফেলছেন সরকারপক্ষ থেকে পরিকল্পনামাফিক চারিয়ে দেওয়া ‘ওরা সবাই জঙ্গি’— এই অলীক তত্ত্বে। অথচ কৃষকেরা অনেকদিন ধরেই বিপদসীমার কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন। সারা ভারত কৃষকসভা সহ বহুসংখ্যক বাম ও অবাম কৃষক সংগঠন কমন বিপদের মুখে একজোট হয়েছেন। এর আগেও বেশ কয়েকবার কৃষকদের লং মার্চ হয়েছে। সেইসব মহামিছিলে ছিলেন যেসব কিসান কিসানী তারা যেখান থেকে আসছেন সেখানে কিন্তু বামদলগুলির ভোটের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এ থেকে প্রমাণ হয় তাদের এই পথচলাটি খাঁটি। এবং আজ দিল্লিতে মূলত পঞ্জাব হরিয়ানার কৃষকদের দেখা গেলেও এইসব লং মার্চে কিন্তু হেঁটেছেন মহারাষ্ট্র রাজস্থান ইত্যাদি রাজ্যের খেটে খাওয়া মানুষেরা। তাদের নিশ্চয়ই খালিস্তানি বলা যাবে না? আমরা প্রশ্ন করি না যখন যেখানে যাঁরাই বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছেন সকলেই জঙ্গি বিচ্ছিন্নতাবাদী— এই সরলীকরণ আদপেই হাস্যকর কিনা! তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাওয়া যেত যে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনও বিরোধিতার বিরোধিতা করতে করতে আসলে আমরা, এই সাধারণ মধ্যবিত্ত, দাঁড়িয়ে পড়ছি আমাদেরই বিপক্ষে। দাঁড়িয়ে পড়ছি আদানি আম্বানির পক্ষে। বড়লোকের ও সুবিধাভোগী শ্রেণির পক্ষে। আমার ধারণা, এই গণ সম্মোহনের অন্যতম রহস্য লুকিয়ে আছে ওই ধর্মান্ধতাতেই, ওই ‘আমরা-ওরা’র শ্রেণিকরণেই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ধর্মের বেশে মোহ এসে যারে ধরে/ অন্ধ সে জন, মারে আর শুধু মরে’। কয়েক প্রজন্ম ধ্বংসের মধ্য দিয়ে জার্মানরা ভুলের মূল্য চুকিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, আমাদের চারপাশে এরকম মোহগ্রস্ত অনেক মানুষের মধ্যেই ভালোমানুষি এখনও বেঁচে আছে। আজ অথবা কাল তারা ফের মানুষের পাশেই এসে দাঁড়াবেন, পড়শির হাত ধরবেন, রুটি রুজির প্রশ্ন ভুলিয়ে দেওয়া নেতাদের চাল তারা ধরে ফেলবেন। দিল্লির কৃষক বিদ্রোহই হয়তো হুঁশ ফেরাবে তাদের। সব জেনেও যদি কেউ অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ান তাহলে ভাবতে হবে তিনি হয় বোকা নয়তো শয়তান। আমার চারপাশের মানুষদের এই দ্বিতীয় প্রকারের ভাবতে সত্যিই এখনও যে ইচ্ছে করে না!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...