“আমি বিশ্বাস করি, এই আন্দোলন মোদি সরকারের নেমেসিস হিসেবে দেখা দিতে চলেছে”

অশোক ধাওয়ালে

 



সারা ভারত কিসান সভা (এআইকেএস)-এর সভাপতি অশোক ধাওয়ালের এই সাক্ষাৎকারটি গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২০-তে লেফট স্কোয়াড-এ ইংরাজিতে প্রকাশিত হয়।

 

 

 

 

 

কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষিত কী? কেন তাঁরা তিনটি কৃষি আইনের বিরোধিতা করছেন? কীভাবে এই বিশালাকার আন্দোলন সংঘবদ্ধ হল? এই আন্দোলন কীভাবে গড়ে তোলা হল, সে ব্যাপারে যদি কিছু বলেন।

আমি প্রথমে এই তিনটি আইন নিয়ে একটু বলে নিই। একটি আইন দেশের সমস্ত মান্ডিগুলি তুলে নিয়ে দেশের কৃষিক্ষেত্রকে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নেমেছে, যার অস্ত্র এপিএমসি অ্যাক্ট। দ্বিতীয় আইনটি দেশজুড়ে চুক্তিচাষ ব্যবস্থাকে বলবৎ করার লক্ষ্যে করা হয়েছে। তৃতীয় আইনটিকে এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্টের একটি সংশোধনী বলা যেতে পারে। এই আইনটির সাহায্যে খাদ্যশস্য, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ, চিনি ইত্যাদি জরুরি সামগ্রীগুলির কালোবাজারিকে উৎসাহিত করা হল।

তিনটি আইনই কৃষক এবং জন-স্বার্থবিরোধী। তাই কৃষক আন্দোলনের মূল কথাই হল এই যে, তিনটি আইন শুধুমাত্র কৃষকবিরোধী তাই নয়, বলা ভালো উপভোক্তা অর্থাৎ জনবিরোধী। মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সংখ্যালঘু ধনী ভারতীয় ও বিদেশি পুঁজিপটিদের হাত শক্ত করতে এই আইনগুলি আনা হয়েছে। এই কারণেই দেশজুড়ে কৃষক আন্দোলনে এই তিনটি আইনটির প্রবলভাবে বিরোধিতা করা হচ্ছে। এই বিরোধিতা কিছু ২৬ নভেম্বর শুরু হয়নি। ২০২০-র ৫ জুন যখন সরকার থেকে এই আইনগুলি কার্যকর করার লক্ষ্যে নামা হল, তখনই বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। তারপর সারা ভারত কিসান সংঘর্ষ সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে ৯ আগস্ট অর্থাৎ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের জন্য স্মরণীয় বিশেষ দিনে বিশাল প্রতিবাদের জন্য সভা ডাকা হয়। দেশের লাখ লাখ কৃষক ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামেন, অবরোধ ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদে মুখর হন।

সেপ্টেম্বরে, সংসদের বর্ষার অধিবেশনের সময়ে এই বিলগুলি অর্ডিন্যান্স থেকে শেষমেশ চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিকভাবে লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাশ করানো হয়। রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকার কারণে বিজেপি নানারকম কৌশল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। দুই কক্ষেই সংসদের নিয়মবিধি ভঙ্গ করে সরকার। রাজ্যসভার সিপিআইএম সদস্যরা, কমরেড কে কে রাগেশ, কিসান সভা ও এলামারাম করিমের যুগ্ম সচিব, সিটুর সহসভাপতি এবং কংগ্রেস সহ বিরোধী বহু সাংসদের পক্ষ থেকেই এই বিলটি যাতে পাশ না করা হয় তাঁর জন্য প্রবল প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক উপায়ে ধ্বনিভোটের সাহায্যে বিলটিকে পাশ করানো হয়। এই বিলগুলি পাশ করানোর সঙ্গে সঙ্গেই কর্পোরেট স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য চারটি শ্রমিক ও কৃষক বিরোধী লেবার কোড চালু করে সরকার।

২৩ সেপ্টেম্বর সিটু ও কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির ডাকে সারা দেশব্যাপী এই লেবার কোডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০টির বেশি কৃষক সংস্থা নিয়ে গঠিত এআইকেএসএসসির পক্ষ থেকে এই তিনটি আইন এবং লেবার কোডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামা হয়। ২৬ তারিখ ট্রেড ইউনিয়নগুলির পক্ষ থেকে সারা দেশজুড়ে হরতাল ডাকা হয়। খুব বড়সড় ধর্মঘট ছিল এটি। সংগঠিত ও অসংগঠিত সেক্টরের কোটি কোটি শ্রমিক এই হরতালে যোগ দেন।

ইতোমধ্যে আরও বহু কৃষক সংস্থা একসঙ্গে এসে সংযুক্ত কিসান মোর্চা (এসকেএম) গড়ে তোলে। এতে এআইকেএস, রাষ্ট্রীয় কিসান মহাসঙ্ঘ এবং ভারতীয় কিসান ইউনিয়নের বিভিন্ন কমিটি সমন্বিত মোট ২৫০টি কৃষক সংস্থা নিয়ে তৈরি পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষক সংগঠন এআইকেএসসিসি-র প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিল। এই সমস্ত সংগঠনগুলি, যাদের অনেকেরই গোটা ভারতে সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, একত্রে তৈরি করে সংযুক্ত কিসান মোর্চা, যার নেতৃত্বে আমরা ২৬ ও ২৭ নভেম্বর একদিকে সারা দেশজুড়ে রাস্তা অবরোধ ও প্রতিবাদের ডাক দিই, অন্যদিকে কৃষি আইন তিনটির বিরুদ্ধে চলো দিল্লি অভিযানেরও ডাক দিই। সারা দেশজুড়ে কৃষকদের থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছিল। চলো দিল্লি ডাক দিয়ে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকেরা দিল্লির দিকে ধাবিত হন। দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীন দিল্লি পুলিশ এবং হরিয়ানার বিজেপি সরকার কৃষকদের গ্রেপ্তারি, টিয়ার গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জ ইত্যাদির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানায়, যা ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পরিলক্ষিত হয়। তা সত্ত্বেও ট্রাক্টরে চেপে কৃষকেরা দিল্লির দুই সীমান্ত সিংঘু ও টিকরিতে এসে পৌঁছয়। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের দিকের চাষিরা অন্য আরেকদিকে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন এবং মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের দিকের চাষিরা আরেক দিক অবরোধ করেন। দিল্লির সঙ্গে বাকি ভারতের যোগাযোগকারী পাঁচটি জাতীয় সড়কের চারটিই বন্ধ করা হয়। পঞ্চম সড়ক অর্থাৎ জয়পুর-দিল্লি হাইওয়ে খোলা ছিল, তার একটাই কারণ রাজস্থানের সাধারণ নির্বাচন চলছিল ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রাজস্থান ও হরিয়ানার সংস্থা এআইকেএস নির্বাচনের পর কৃষকদের চালনা করে দিল্লির দিকে নিয়ে গেল। এখন সেই শেষ সড়কটিও বন্ধ আছে। কৃষকেরা এখন শীতের প্রচণ্ড কামড়ের মধ্যে জাতীয় সড়কের উপর পড়ে আছেন এবং বিজেপি সরকারের থেকে এটা আশা করা গেছিল যে তারা এই অবস্থায় কৃষকদের জন্য নিশ্চয়ই সদয় হয়ে আইন তিনটি তুলে নেবে। আন্দোলনটি কিন্তু দেশজুড়েই চলছিল। যতই সরকার শুধুমাত্র পাঞ্জাব, হরিয়ানার আন্দোলন হিসেবে এটিকে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক না কেন, আমাদের সবাই এটিকে দেশব্যাপী কৃষকদের আন্দোলন হিসেবেই চিহ্নিত করতে বদ্ধপরিকর ছিলাম, যা ৯ আগস্ট থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর ও ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে তাই ছিল। তাই আমরা পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে একটা সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের জন্য ৩ ডিসেম্বর সারা দেশজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিই।

সারা দেশজুড়েই এটি পালিত হয়। ৫ ডিসেম্বর, লেবার কোড এবং কৃষি আইনের হোতা গ্যাং অফ ফোর অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, আম্বানি এবং আদানি— এই চারজনের কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর জন্য ডাক দিই। এর মধ্যে সরকার ও এসকেএম-এর মধ্যে সমঝোতার রাস্তা খোলে না। সরকার বলে, তারা দুটি আইনের কিছু পরিবর্তন আনতে রাজি, কিন্তু এসেনশিয়াল কমোডিটিজ সংক্রান্ত আইনের কোনও বদল আনবে না। কৃষকদের সমস্ত সংস্থা একত্রে তাদের বলে যে যেহেতু তিনটি আইনই মূলগতভাবে ভুল এবং কৃষক-বিরোধী, তাই এই ধরনের আংশিক ওপর-ওপর সংশোধনে তাঁরা রাজি নন। তাঁরা এর সমূলে উৎপাটন ছাড়া আর কিছুই চান না। এটাই প্রথম দিন থেকে আজ অবধি কৃষকদের অবস্থান ছিল। ৪ ডিসেম্বর এসকেএম-এর ছাতার তলায় থাকা সমস্ত কৃষক সংগঠন একটা আলোচনায় বসে। সেদিন সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। যদিও এই হরতালগুলি সংগঠন করতে আমাদের তিনটি মাত্র দিন হাতে ছিল, তা সত্ত্বেও এগুলি সফল হয়েছিল সাংঘাতিকভাবে। কৃষক ও তাঁদের স্বার্থের প্রতি সমবেদনা ও সমর্থনই ভারত বন্ধে সাফল্য এনেছিল। পাঁচটি বাম দলই ভারত বন্ধ সমর্থন করে। ৫ ডিসেম্বর একটি বিবৃতিতে তারা সেকথা জানায়। তারপর আরও ২০টি দল সমর্থন করতে আসরে নেমে পড়ে। বিজেপি-র লেবার উইং বিএমএস ছাড়া বাকি সব কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন যেমন সিটু, এআইটিইউসি, আইএনটিইউসি, এইচএমএস ইত্যাদি বন্ধে সমর্থন করে। ছাত্র, যুবক ও মহিলাদের দলগুলি যেমন ডিওয়াইএফওয়াই, এআইডিডব্লুএ, এআইএডব্লুইউ ইত্যাদিও সমর্থন জানায়। ব্যবসায়ী সংস্থাগুলি ঝাঁপ বন্ধ করে, পরিবহন সংস্থাগুলি গাড়ি বন্ধ রাখে এবং দেশের ল-ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন বার কাউন্সিল থেকে রেজোলিউশন বের করে এই লড়াইকে সমর্থনের কথা বলা হয়। এতসবের ফলে ৮ ডিসেম্বর ভারত বন্ধ সফল হয়। সরকারের দেওয়াল লিখন পড়ে তখনই আইন তুলে নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসকেএম দলগুলিকে ডেকে আবার সেই একই অদ্ভুত কাজ করে বসলেন। তিনি পরের দিন বললেন, তাঁরা আইন তুলবেন না, কিন্তু কিছু সংশোধন করতে প্রস্তুত। এই কথা শুনে আলোচনা শিবিরের প্রতিনিধি এআইকেএস-এর জেনারেল সেক্রেটারি কমরেড হান্নান মোল্লা ও অন্যান্যরা একত্রে বললেন, তাঁরা এইসব কথায় ভুলতে রাজি নন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলা হল যে সমস্ত কৃষক সংস্থার পক্ষ থেকেই তাঁদের বক্তব্যে অনড় থাকা হচ্ছে এবং এই ব্যাপারে তাঁরা একই অবস্থানে থেকে যাবেন। কোনও আপত্তি ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত ব্যাপারে মিটমাট করা এবং কৃষি আইন প্রত্যাহার করার আগে পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন থেকে সরবেন না। এরপর তাঁরা ভবিষ্যৎ কর্মসূচির কথা জানিয়ে দিলেন।

এই কর্মসূচিতে ছিল—

১) দিল্লিতে এবং এর চারদিকে বিক্ষোভ বাড়াতে হবে। দিল্লির চারদিকে সবকটি রাজ্য যেমন পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, হিমাচল প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ থেকে আরও বেশি সংখ্যক কৃষক এসে দিল্লি মার্চের উদ্দেশে জড়ো হবেন এবং দিল্লি-জয়পুর রাস্তা অবরোধ করবেন। এর ফলে দিল্লি আসার পাঁচটি মূল সড়ক বন্ধ হয়ে যাবে। সিংঘু এবং টিকরিতে ইতোমধ্যেই লাখ লাখ কৃষক এসেছেন, এবং এখনও বহু কৃষক আসছেন।

২) দেশজুড়ে এই আন্দোলন ছড়াতে ব্যাপক প্রতিবাদ, ধর্না, ইত্যাদির মাধ্যমে জেলায় জেলায়, প্রতিটি তহসিলে ১৪ ডিসেম্বর থেকে আন্দোলন ছড়াতে হবে, যাতে আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

৩) যেহেতু এই আইন ও লেবার কোডের পেছনে কর্পোরেট সংস্থাগুলি আছে, কৃষকদের থেকে আদানি, আম্বানি ইত্যাদিদের বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। মোদি সরকারের কাছ থেকে গত ছ বছরে প্রচুর আর্থিক সুবিধে পাওয়া এই দুই কর্পোরেটকে আমরা বয়কটের ডাক দিই। কেন্দ্রীয় সরকারি অফিস পিকেটিং করা, টোল না দেওয়া ইত্যাদিও কর্মসূচিতে রাখা হয়। বিক্ষোভ চূড়ান্ত জায়গায় এসেছে যখন, সরকারি আর্জি উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলন গোটা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের এই অতিমারি ও লকডাউনের সময়েই এই আইন তিনটি পাশ করার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? আপনার কী মনে হয়?

সরকার লকডাউনের সময়ে ইচ্ছে করেই এই আইন তিনটি পাশ করল। তাঁরা ধরে নিয়েছিল, কৃষক ও শ্রমিকরা করোনা অতিমারির ভয়ে এই আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সাহস পাবে না। তারা এরকমই ভেবে নিয়েছিল। এই কারণেই সংসদের বর্ষা অধিবেশনে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে আইন তিনটি পাশ করানো হয়েছিল। বিজেপি ভয় পেয়ে গেল যখন এনডিএ শরিক দলগুলি এই আইনের বিরোধিতায় নামল। তারা চাইল যেভাবেই হোক দুই কক্ষে এই তিনটি আইন এবং লেবার কোডগুলি খুব তাড়াতাড়ি পাশ করাতে। তাঁরা এই ভাবনা নিয়ে ছিল যে কৃষক ও শ্রমিক কোনওভাবে এই স্বার্থবিরোধী আইন তিনটির বিরোধিতায় পথে নামবেন না। কিন্তু সরকারের দুর্ভাগ্য এবং মানুষের সৌভাগ্য যে দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা সরকারের এই ধারণা ভেঙে বেরিয়ে এল। খুব শীঘ্রই দেশের কোণায় কোণায় প্রতিবাদ সংগঠিত হল, যার ফলাফল ২৬ নভেম্বর সফল গণহরতাল এবং ২৬ ও ২৭ নভেম্বর দিল্লির দিকে কৃষকদের অভিযান। তাই, দেশের মেহনতি মানুষেরা সরকারের সমস্ত হিসেবকেই এভাবে উল্টে দিল। এবং গত ২০ দিন ধরে একটানা এই যে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শিত হচ্ছে, তা আসলে বিজেপি আরএসএস সরকারের গালে একটি সপাটে থাপ্পড়।

এই আন্দোলনকে ধনী কৃষকদের আন্দোলন বলে দাগিয়ে দেওয়াটা কি বিচক্ষণের মতো কাজ হবে? এই তিনটি কৃষি আইন কি শুধুমাত্র তাঁদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করবে? এগুলি ছোট চাষি বা ভাগচাষিদের কিভাবে সমস্যায় ফেলতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

এই তিনটি আইন শুধুমাত্র ধনী চাষিদের সম ফেলবে এমনটি বলা একদমই অনুচিত হবে। সবধরনের চাষিরই ক্ষতি হবে শেষমেশ। বরং, আমার তো মনে হয়, মাঝারি চাষি এবং ছোট চাষিদের আরও বেশি সমসয়ায় ফেলতে পারে এই আইন, কারণ তাঁরা আরও বেশি যাকে বলে ভালনারেবল জায়গায় রয়েছেন। যেমন, আপনি যদি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর কৃষক আত্মহত্যা সংক্রান্ত তথ্যগুলি দেখেন, দেখবেন যে ১৯৯১ সালে নয়া উদারনীতি আসার পর দেশে কৃষক আত্মহত্যা ভয়ঙ্কর হারে বেড়ে গেছে। ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত হিসেব নিলে দেখা যাবে যে এই পঁচিশ বছরে সারা দেশজুড়ে প্রায় ৪ লক্ষ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এই বিশাল সংখ্যক কৃষকের অধিকাংশ কারা? মূলত মাঝারি এবং ছোট চাষি। আত্মহত্যা করা ধনী চাষির সংখ্যা খুবই কম। এপিএমসি লঘুকরণ সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে তার জন্য ছোট চাষিরা ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। চুক্তি চাষের ক্ষেত্রেও ধনী চাষিরা তবু কিছু দূর পর্যন্ত লড়াই করতে পারবেন, কিন্তু বড় বড় কর্পোরেট শক্তির সঙ্গে ছোট এবং মাঝারি চাষিরা কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারবেন না। গত বছর গুজরাটে কী হয়েছিল নিশ্চয়ই মনে আছে আপনার। চারজন কৃষকের সঙ্গে পেপসিকো কোম্পানির একটি চুক্তি চাষ হয়েছিল, এবং ফসল যখন কাটার জন্য প্রস্তুত তখন কোম্পানি থেকে বলা হয় যে নাকি ফসলের গুণমান ভালো না হওয়ায় কৃষকেরা চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী চাষিদের বকেয়া অর্থ দিতেও অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, তার সঙ্গে তাঁরা চাষিদের কাছে এক কোটি টাকার জরিমানা দাবি করে বসেন। গুজরাটে গত বছর এই ঘটনাটি খুবই শোরগোল ফেলেছিল। ভাগ্যক্রমে, সেইসময়ে, অল ইন্ডিয়া কিসান সভা, এবং গুজরাটের খুব বড় কৃষক সংগঠন গুজরাট খেদুত সমাজ ইত্যাদি একযোগে চাষিদের পাশে দাঁড়ায়, যার ফলে পেপসিকো জরিমানা তুলে নিতে বাধ্য হয়। তাই মাঝারি চাষিরা ধনী চাষির চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আছে। আরেকটা কথা এর সঙ্গে যোগ করতে চাই। আপনি দেখবেন যে দেশের কোনও কৃষক সংগঠনই কিন্তু এই তিনটি আইনের স্বপক্ষে সওয়াল করছে না। আইনগুলি তৈরি হওয়ার আগে এঁদের কারও সঙ্গেই কোনওরকম আলোচনা করা হয়নি। বরং, দুটো বিল যেগুলি সংসদে পেশ করা হয়েছিল, রাজ্যসভায় সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে কমরেড কে কে রাগেশ এবং লোকসভায় রাজু শেট্টি কর্তৃক, সেগুলি দেশজুড়ে আলোচনার পর প্রাইভেট মেম্বার্ড বিল হিসেবে পেশ করা হয়। সরকার কিন্তু এই দুটি বিল নিয়ে একেবারেই আলোচনা করল না। প্রথম বিলটি ছিল স্বামীনাথন কমিশন অনুযায়ী দেশজুড়ে সমস্ত চাষি ফসলের উৎপাদন মূল্যের অন্তত দেড়গুণ বেশি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাবেন। ডক্টর স্বামীনাথন বলেছিলেন, কৃষি সমস্যা মোকাবিলা করতে গেলে, কৃষক আত্মহত্যা কমাতে গেলে গোটা দেশে সারা বছর জুড়ে সমস্ত ফসলের ক্ষেত্রে এই দেড়গুণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বজায় রাখতেই হবে। এই ফর্মুলাটি C2+50% নামে পরিচিত। তিনি আরও বলেছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার যেন এই হারেই ফসল কেনার ব্যবস্থা তৈরি করে। এমন একটি সরকারি ব্যবস্থা ছাড়া ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের কোনও অর্থই থাকবে না। বেসরকারি ব্যবসায়ীরা এই শব্দটি একেবারেই পছন্দ করে না। দেশের বৃহত্তর অংশে অবস্থাটা এমনই। পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা থেকে এত বিশাল সংখ্যক কৃষক কেন এসেছেন? কারণ সরকার মান্ডি থেকে তাঁদের ধান, গম কেনে এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য হারেই। এপিএমসি উঠে যাবে এই ভয়ে সবাই তটস্থ হয়ে আছেন। যদি সরকার থেকে কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, পুরো পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। যদি দেশের খাদ্য নিগম সংস্থা বা ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায় গুদামে ফসল নাই থাকে, গ্রাম এবং শহরের গরিব মানুষেরা কোথা থেকে খাবার পাবেন? এই ইস্যুটাই এখন বেশি করে সামনে আসছে। সংসদে এইধরনের ইস্যুকে সামনে আনা সেটিই ছিল প্রথম বিল, যা আমরা পেশ করেছিলাম। সরকার থেকে আইন করে এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি সাধুবাদ দেওয়া এবং পাশ করানো উচিত ছিল। তারা সেটা করল না। দ্বিতীয় বিলটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটি হল কেন্দ্রীয় সরকার থেকে দেশের সমস্ত চাষিদের একবার করে কৃষি ঋণে ছাড় দিতে হবে। কৃষক আত্মহত্যা আসলে ঋণ শোধ না করতে পারার কারণেই হয়। সরকার থেকে তাঁদের একবার করে ঋণে ছাড় এবং উৎপাদন মূল্যের দেড়গুণ দাম— এই দুটি সাহায্য করা ভীষণভাবেই উচিত। এইভাবেই কৃষি সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে। কিন্তু গোটা দেশের শয়ে শয়ে কৃষক সংগঠন কর্তৃক সমর্থিত এই বিল দুটি সরাসরি বাতিল করে দিল বিজেপি সরকার। যে সরকার প্রতি বছর কিছু কিছু কর্পোরেট সংস্থাকে হাজার হাজার কোটি টাকার কর মকুব করে দেয়, তারা তাদের চাষিদের কর মকুব করতে পারল না। অথচ কর্পোরেট সংস্থাগুলি চাইছে বলে একটিও কৃষক সংস্থার সমর্থন না পাওয়া আইনগুলি এখন তারা গিলিয়ে দিতে বাধ্য করছে। পুরো অবস্থাটার এটাই হল মজা। কৃষি সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার দিক থেকে আরও তিন চারটে দিক আছে। একটি হল ফসলের বিমা, কারণ গোটা বছর ধরেই দেশের বৃহত্তর অংশের চাষিরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন খরা, বন্যা, ঝড়, ঝঞ্ঝা, অনিশ্চিত বৃষ্টিপাত ইত্যাদিতে ভোগেন। ফসল বিমা সংক্রান্ত তাঁদের একটা কোনও নিরাপত্তা থাকা ভীষণভাবেই জরুরি। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা, যেটি দুতিন বছর আগে আনা হয়েছিল, সেটিও আসলে কর্পোরেট ইনস্যুরেন্স কোম্পানিদের সুবিধে করে দিচ্ছে, চাষিদের কোনও প্রয়োজনেই আসছে না। তাঁরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে একইরকমভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে এক্ষেত্রে সরকারের কর্পোরেট বিমা কোম্পানিদের স্বার্থ না দেখে আরও ব্যাপকভাবে চাষিদের স্বার্থপন্থী কাজ করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।

চতুর্থ বিষয় হল এমজিএনআরইজিএ সংক্রান্ত। কৃষিশ্রমিকেরা দেহের কৃষিব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগের ইউপিএ সরকারের বাম শরিক দলগুলির ক্রমাগত চাপের ফলেই, ২০০৫ সালে এই এমজিআরইজিএ পাশ হয়েছিল। যতক্ষণ ইউপিএ সরকার ছিল, এক যথাযথ ব্যবস্থা হিসেবেই এটি কাজ করেছিল, যদিও যতটা ভাবা হয়েছিল, ততটা একেবারেই হয়নি। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই এই এমজিআরইজিএ–র বরাদ্দ খাতে পঞ্চাশ শতাংশ কমিয়ে দিল। ফলত, যে কাজ দেওয়া হচ্ছিল এবং যে পারিশ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল সেখানেও ভয়ঙ্কর হ্রাস ঘটল। কাজ পাওয়া মানুষের সংখ্যাও কমে গেল লক্ষণীয়ভাবে। কৃষক আন্দোলন কিন্তু এই দিকগুলি লক্ষ করেও হচ্ছে, যদিও মূল বিচার্য বিষয় তিনটি কৃষি আইনই।

এর পরে আসে দেশজুড়ে অসংখ্য আদিবাসী চাষির কথা। এটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশজুড়ে প্রবল বিক্ষোভ এবং বামদলগুলির লাগাতার আন্দোলনের চাপে সরকার থেকে ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট ২০০৬ সালে কার্যকর করা হয়। ত্রিপুরার বাম সরকার এই আইনটি খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যকর করেছিল। কিন্তু অধিকাংশ রাজ্য প্রায় কিছুই করেনি। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল এবং ত্রিপুরার বাম সরকারগুলি এবং শেখ আবদুল্লার শাসনাধীন জম্মু ও কাশ্মিরে ভূমি সংস্কার যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়েছিল। বাকি সব জায়গাতেই ভূমি সংস্কারকে প্রায় ভুলেই বসে থেকেছে সরকার। কৃষি সঙ্কট মোকাবিলা করতে গেলে এই ভূমি সংস্কার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে, যার দিকে আমাদের ভবিষ্যতে নজর রাখা আশু কর্তব্য। অথচ, এর বিপরীতে যা হচ্ছে তা হল জমিকে কর্পোরেট ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের হাতে বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি সরকার থেকে এই প্রবণতা ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে যার পরিণামে কৃষকেরা তাঁদের জমির দখল হারাচ্ছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটিও সামনে আসছে। এবং এর পাশাপাশি জলসম্পদকেও দেশের কিছু অংশের কুক্ষিগত করা প্রবণতাও জড়িয়ে পড়ছে।

মোদির একটা টেফ্লন ইমেজ আছে। তিনি অপ্রতিরোধ্য। কিছুতেই তাঁকে দমানো যায় না। এই ভাবমূর্তিই সবজায়গায় দেখানো হয়। আপনার কি মনে হয় কৃষক আন্দোলন তাঁর সেই পরাজয়ের প্রথম ধাপ হবে?

অবশ্যই। আমি নিশ্চিত এই কৃষক আন্দোলন তাঁর ভরাডুবির কারণ হবে। শেষ ছ বছর আপনি যদি ভালো করে লক্ষ করেন, যে আন্দোলনই হোক না কেন, বিজেপি ও আরএসএসের পক্ষ থেকে তাকে প্রাদেশিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আন্দোলন হিসেবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন, সিএএ বিরোধী আন্দোলনকে বলা হয়েছে মুসলিম আন্দোলন। এবারও ঠিক তাই চেষ্টা করা হয়েছে। বিজেপি সংগঠন এই ব্যাপারে খুব পারদর্শী। পাঞ্জাবের লাখ লাখ আন্দোলনকারীকে খালিস্তানি বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এখন সিংঘু বা টিকরি সীমান্তে লাখ লাখ কৃষক প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, যাতে লেখা ‘আমরা কৃষক, উগ্রপন্থী নই’। মিডিয়া এই জিনিসটাকে ফলাও করে প্রচার করা করেছে, এবং আপনারা ভালোই জানেন এসব অবান্তর কথাবার্তা। আবার অন্যদিকে বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাওসাহেব ধানভে বলেছেন, কৃষক আন্দোলন নাকি পাকিস্তান ও চিন মদতপুষ্ট আন্দোলন। এসব অত্যন্ত হাস্যকর এবং অপমানকর কথাবার্তা এবং কেউই এসব কথাবার্তায় বিশ্বাস করবে না। এখন আবার তাঁরা কৃষকদের মাওবাদী বা নকশাল বলেও দাগিয়ে দিচ্ছে শুনলাম। এসবই আন্দোলনকে ছোট করার জন্য করা হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা এসব কোনওদিনই পারবে না কারণ বিপরীতে সংখ্যাটা এতটাই ব্যাপক। আরেকটি কারণ, ৫০০টি কৃষক সংস্থা এব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। তাঁদের মধ্যে কোনও মতানৈক্য নেই। তৃতীয় কারণ হল, এই কৃষকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসায় তাঁরা বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ। এঁদের ঐক্যকে কোনওরকম বিভাজনমূলক ছলাকলা দিয়ে ভেঙে দেওয়া মুশকিল। এইজন্যই আমরা বারবার বলে এসেছি, যদি সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়, তাহলে বৃহত্তর শ্রেণিসংগ্রামই এর একমাত্র পথ। তাই এখন, যখন উত্তেজনা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে, আমার মনে হয় না সরকারের আর কোনও পথ আছে বলে। গত ছ বছরে তাঁরা সমস্ত রকম আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা চালিয়েছে, তা সে জেএনইউ, যাদবপুর, জামিয়া মিলিয়া বা আলিগড় যাই হোক না কেন। তাঁরা ছাত্র আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করেছে, দিল্লিতে দাঙ্গা বাঁধিয়েছে। কিন্তু এখন কৃষকেরা প্রবলভাবে ঐক্যবদ্ধ। তাই এই ঐক্যকে ভাঙা খুবই মুশকিল। এভং আরেকটি বিষয় যেটা লক্ষ করার মতো, তা হল, এই আন্দোলন ভীষণভাবেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। সংযুক্ত কিসান সভা শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলে আসছে এবং কৃষকরাও সেই পন্থাই বেছেছেন। কৃষকদের পক্ষ থেকে কোনওরকম হিংসা সরকারের পক্ষে অস্ত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং আন্দোলনকে কলঙ্কিত করতে পারে। আন্দোলনে একটি গাড়ির কাচও ভাঙেনি। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থানই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমি দৃঢ় বিশ্বাসী সমাজের শ্রমিকশ্রেণি অন্যান্য প্রায় সমস্তরকম প্রতিনিধিই এই আন্দোলনকে সমর্থন করবেন। তাঁরা এখনও অবধি আমাদের সমর্থনেই আছেন। হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি, এই আন্দোলন মোদি সরকারের নেমেসিস হিসেবে দেখা দিতে চলেছে।

আমার শেষ প্রশ্ন, গত ৯ ডিসেম্বর ২৪টি রাজনৈতিক দলের ৫ জন প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে একটি স্মারক জমা দেন, যাতে এই আইন তিনটি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শেষ মুহূর্তে এতে যোগ দেয়নি এই বলে যে, তাঁদের ঠিকমতো জানানো হয়নি। এই ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদক্ষেপকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন আপনি?

তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম থেকে দু নৌকায় পা দিয়ে চলছে। কৃষক আন্দোলন নিয়েও তারা অনেক পরে সমর্থনে নেমেছে। কিন্তু আমরা জানতে পারি, তাঁরা হরতালকেও সমর্থন করেনি। অর্থাৎ তাঁদের পক্ষ থেকে খুব সন্দেহজনক খেলা খেলতে দেখা যায়। শিকার ও শিকারী দুজনেরই হয়ে কথা বলা খেলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহুদিন থেকেই পারদর্শী। ভুলে গেলে চলবে না, একসময় তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। কৃষক ও শ্রমিক নিয়ে তাঁর পদক্ষেপ বিজেপি সরকারের থেকে খুব বেশি আলাদা না। তাই হরতালের বিরোধিতা করে এই ধরনের নিমন্ত্রণ না পাওয়া, তথ্য না পাওয়া ইত্যাদি অজুহাতে সরে আসা এসবই চূড়ান্ত ভান ছাড়া আর কিছু নয় এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বুঝবেন কে তাঁদের স্বার্থের অনেক বেশি কাছাকাছি। বিজেপি সরকারের অগণতান্ত্রিক কাজকর্ম, লেবার কোড, কৃষি আইন সহ সমস্ত কাজকর্মের যদি কেউ সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করে, তারা হল বামপন্থীরাই। আমি শুনেছি পশ্চিমবঙ্গে এই হরতাল সাংঘাতিক সাড়া ফেলেছিল এবং লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে কৃষক ও শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এই হরতাল যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল কংগ্রেসের ভণ্ডামিকে প্রকাশ করল, তার উদাহরণ অতীতে নেই।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...