অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান

কবীর সুমন

 




গীতিকার, সঙ্গীতকার, গায়ক, সাংবাদিক, প্রবন্ধকার

 

 

প্রথমত, দুটি মেয়াদে যে কেন্দ্র সরকার দিল্লিতে রাজত্ব করছেন, তাদের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপ, তাদের প্রণীত প্রতিটি আইন, তাদের প্রতিটি উচ্চারণ ও কাজ ভারতবর্ষ নামে এই দেশটা যে মূল নীতি-সমূহের বুনিয়াদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে— তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। যেমন, ভারত একটি সেকুলার গণতান্ত্রিক দেশ। এই বিজেপি সরকার আমাদের দেশের সেকুলারিজমের জায়গাটায় শুধুমাত্র আঘাত-ই করেন না, তাকে প্রতি নিয়ত অপমান করে আনন্দে থাকেন।

আগামী ১৬ই মার্চ আমার বাহাত্তর বছর পূর্ণ হবে, তিয়াত্তরে পড়ব। অনেকদিন বাঁচলাম। অনেককিছু দেখলাম। শুনলাম। তারপরে আমার এটাই মনে হচ্ছে যে এই সরকার আজ অবধি কোনওকিছু করতেই পিছপা হননি। ক্ষমতায় আসার আগে যা যা কথা দিয়েছিলেন তার একটাও রাখেননি। যেমন ধরুন চাকরি… চাকরি এমন মুখের কথায় তো হয় না। চাকরি বানাতে গেলে সরকারের নীতিটাই অন্যরকম হতে হয়৷ একসময় যে নেহেরুভিয়ান অর্থনীতি ছিল, সেখানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে সরকার লোকসান করবে এবং চাকরি দেবে। সরকার লাভ করবে, ব্যবসা করবে আর একইসঙ্গে চাকরি গজাবে— এটা তো হতে পারে না৷ এই সরকার একের পর এক মিথ্যে কথা বলেছেন, সত্যের অপলাপ করেছেন। দেশের নাগরিকদের এমনভাবে অপমান করা হয়েছে ও হচ্ছে, যা ভাবা যায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন— “আমাদের দেশে যেসব বিদেশি লোক বাস করছেন তাদের আমি বেছে বেছে খুঁজে খুঁজে বের করব। তাদের বিতাড়ন করা হবে।” এই ‘তারা’ কারা? শাসকের আচরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তাঁরা মুসলমানদের কথা বলছেন৷ এখানকার মুসলমানেরা নাকি সব বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, নাকি পাকিস্তান থেকে এসেছেন, নাকি আজারবাইজান থেকে এসেছেন, নাকি চাঁদ থেকে তা ভগবানই জানেন। মজার কথা হচ্ছে, অনেক লোকে এসব কথায় বেশ নাচতে শুরু করে দিল। অথচ এটা দেখাই যাচ্ছে যে নাগরিকপঞ্জি কার্যকর করে দেশের লোকের চাকরি হওয়া সম্ভব নয়। মধ্যবিত্তশ্রেণির লোক ভেবে নিল যে মুসলমানদের তাড়াতে পারলে চাকরি হবে। আমি ভেবে নিলাম, আমার ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনির চাকরি হবে। ভাবতে তো আর টাকাপয়সা লাগে না!

অন্যদিকে অবশ্য আমরা ক্রমশ দেখতে পেলাম যে ভারতের শ্রেষ্ঠীকুল, তাদের ধনবৃদ্ধি হচ্ছে। আর ভারতের কৃষকশ্রেণি, শ্রমিকশ্রেণি তাদের অবস্থার ক্রমাবনতি হচ্ছে। আমাদের দেশে কৃষকশ্রেণির মধ্যে অবশ্য নানা ভাগ আছে। এদের মধ্যে ধনী, বিত্তশালী কৃষক যেমন আছেন, তেমনি ভাগচাষিও আছেন, খেতমজুর আছেন। দিন আনেন, দিন খান— এমন কৃষিকর্মীও আছেন৷ ফলে আমাদের দেশের কৃষক একটা বড় পরিসরের বিচিত্র ক্ষেত্র। সেদিক থেকে শ্রমিকশ্রেণি দুটি পরিষ্কার ভাগে বিভক্ত— দক্ষ আর অদক্ষ। কিন্তু এই সরকার একধার থেকে কৃষক-শ্রমিক সকলের ওপর স্টিম রোলার চালানো শুরু করেছেন। এতদিন কৃষিপণ্যের ওপর একটা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ধার্য ছিল। এই সরকারের লক্ষ্য হল প্রথমেই সহায়ক মূল্যটাকে ধ্বংস করা। সাত-তাড়াতাড়ি অর্ডিন্যান্স জারি করে এই আইন তারা কার্যকরী করলেন। অথচ তার আগেই দেখা গেল শাসকগোষ্ঠীর প্রিয় শ্রেষ্ঠীকূল ভারতের একাধিক জায়গায় সাইলো বা বিশাল ভাঁড়ার তৈরি করে ফেলেছেন৷ সেখানে বিপুল পরিমাণ শস্য জমা করা হবে৷ অতএব এটা ধরে না নেওয়ার কোনও উপায় নেই যে এই আইনটা যে প্রণয়ন করা হয়েছে তা কৃষক নয়, বরং বিজেপি সরকারের প্রসাদধন্য যেসকল শ্রেষ্ঠীশ্রেণি— তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হয়েছে৷

এখন কৃষকরা খুব সরাসরি আন্দোলনে নেমেছেন৷ তাদের একটাই দাবি— আইন বাতিল করো। সরকার তা করবেন না। সরকাররা কিন্তু সচরাচর এরকমই হন৷ তারা হঠাৎ করে কিছু বাতিল করেন না। উত্তর ভারতের এই প্রবল শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে পথে, খোলা আকাশের নিচে অবস্থান বিক্ষোভ করছেন কৃষকরা— নানা বয়েসের, বৃদ্ধ, শিশু, স্ত্রী, পুরুষ সবাই। কতজন মারা গেলেন। এই একটা দেশ, আমাদের ভারতবর্ষ, যেখানে মৃত্যু যেন একটা ছেলেখেলা। যেন— মৃত্যু তো হতেই পারে। সত্যিই তো— আফরাজুল, আখলাক, গৌরী লঙ্কেশ ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যক্তির মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা দেখেছি যে মানুষের মৃত্যু ভাবার মতো কোনও বিষয়ই নয়। এ তো হতেই পারে। তেমনি নাগরিকপঞ্জিতে নাম ওঠানো নিয়ে যে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছেন এ দেশের কেন্দ্রীয় সরকার তা অবর্ণনীয়। কতজন আত্মহত্যা করেছেন এই ভয়ে যে আমায় বুঝি এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। অথচ আমরা যদি সকলে সৎভাবে নিজেদের গোষ্ঠীর খতিয়ান নিই তাহলে বিপদে পড়ে যেতে হবে কারা এদেশের আদত নাগরিক। কিন্তু সরকার এই যে ছেলেখেলাটা করে চলেছেন তার জন্য তাদের কোনও শাস্তি পেতে হচ্ছে না।

এইবারে তারা কৃষকদের নিয়ে পড়েছেন৷ আসলে শয়তানি এমন একটা জিনিস যে করতে করতে অভ্যেস হয়ে যায়। আর দেশজুড়ে প্রতিবাদ বা বিক্ষোভও সেরকম দেখা যাচ্ছে না। যেমন ২০১৯ সালে শেষে ও ২০২০ সালের প্রথমে শাহিনবাগ আন্দোলন কেন্দ্র সরকারকে মহা অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল। কিন্তু বিজেপি সরকারকে যা বাঁচিয়ে দিয়েছিল, তা হল কোভিড। কোভিড পরিস্থিতি যদি না তৈরি হত তাহলে ঘটনাটা যে কোথায় গড়াত, তা আগে থেকে বলা মুশকিল।

প্রসঙ্গত বলা দরকার, আমি নিজে একবার মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি সেখানে গিয়ে দেখেছি যে দেশের রাজনীতিটা খুব বেসিক একটা লাভ-লোকসানের ওপর ভিত্তি করেই চলে। আমরা যখন সাংসদ হই তার পরেই আমরা ভুলে যাই কারা আমাদের নির্বাচন করেছেন। এটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার। পার্লামেন্টে আমাদের মতো ধূমপায়ীদের জন্য আলাদা একটা ঘর ছিল— স্মোকিং রুম। এখন শুনছি সেসব তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বসে সিগারেট খাওয়ার সময় সাংসদদের নিজেদের মধ্যে যে কথাবার্তা হত, সেখানে আমি কোনওদিন এই দেশটাকে নিয়ে কোনও কথা হতে শুনিনি।

এই প্রসঙ্গে আরও কতগুলো কথা বলা দরকার। আমি তো রাজনীতির লোক নই, হ্যাঁ আমি পলিটিকাল লোক, কিন্তু পলিটিক্সের লোক নই। আমি একসময় গণসংগ্রামে ছিলাম। একটা জরুরি জায়গায় অনেক মানুষ ছিলেন, আমি ছিলাম, জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন৷ তিনি নিজেই বলেছেন— “কবীরদাকে আমরা হাতেপায়ে ধরে ভোটে দাঁড়াতে রাজি করিয়েছি৷ আমি বলেছি— কবীরদা, তুমি দাঁড়াও, যাদবপুরটা আমায় দাও।” আমি দাঁড়িয়েছিলাম এবং আমার বিজ্ঞানী বন্ধুরা ভেবেছিলেন ওই বড় গোল বাড়িটায় গিয়ে আমি তাদের মুখপাত্র হব। কাঁচকলা! কিন্তু ওখানে গিয়ে আমি কী দেখলাম সেটা বলা এই মুহূর্তে খুব জরুরি। আমি বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের একটি ছেলে, এখন একজন লোক, ২০০৯ সালে সেই লোকটা ভোটে জিতে গেল। সত্যিই কি সে জিতেছে? না। সিপিআইএম হারল। আমি কবীর সুমন, আমি অন্তত আমার কথা বলতে পারি, যে আমি জিতিনি। জিতেছেন তাপসী মালিক, জিতেছেন সুপ্রিয়া জানা, জিতেছেন শেখ সেলিম, জিতেছেন সেইসব হাজার হাজার মানুষ যাদের উপর নির্যাতন করেছিলেন সিপিআইএম তথা বামফ্রন্ট সরকার৷ আমি আজ সেসবের খুঁটিনাটি জায়গায় যাব না, কিন্তু জিতেছেন এঁরাই, আমি নই। যাই হোক, এবার আমি প্রথম দিনের একটা ঘটনা বলি। আমাকে ও অন্যান্য সাংসদদের একটি হোটেলে রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে ফেরি বা বাস সার্ভিস রয়েছে আমাদের পার্লামেন্টে অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য৷ প্রথমত, সেই গাড়িতে শুধু সাংসদদের যাওয়ার কথা, প্রত্যেকের পাঁচ টাকা করে টিকিট। কিন্তু দেখলাম সে গাড়িতে দিব্যি সাংসদদের বাড়ির লোকেরা যাচ্ছেন৷ সাংসদদের প্রত্যেকের পরনে ধপধপে সাদা পোশাক, পায়ে দামি কায়দার জুতো, সেটাও সাদা। চারপাশ থেকে একেবারে ঠিকরে বেরোচ্ছে তাদের পোশাকের সাদা রংখানা। পুরো বাসে আমিই একমাত্র লোক যার পরনে একটা জিনস ও একটা জামা, শীতকাল হলে গায়ে একটা জ্যাকেট বা পুলোভার আর পায়ে শু বা কেটস৷ আর গাড়িতে উঠে প্রথম যে মধুর আলাপটা শুনতে পেলাম তা হল একজন নিটোল শ্বেতবস্ত্রপরিহিত সাংসদ আরেকজন নিটোল শ্বেতবস্ত্রপরিহিতকে বলছেন, “আরে, আপকা কনস্টিটুয়েন্সি মে চামার কিতনে হ্যায়?” সংসদে যাওয়ার পথে এই কথাটা আমি বাংলার একজন সাংসদ হিসেবে শুনলাম। এই ধরনের কথা শুনে আমরা তো অভ্যস্ত নই। কিন্তু ওখানে এটা খুব স্বাভাবিক একটা কথা। তোর ওখানে কটা চামার আছে রে? কটা চাঁড়াল আছে? তো এইভাবে ভারতের সংসদ সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতালাভ শুরু হল।

তা আমি গুণে গুণে পাঁচ টাকা হাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। পার্লামেন্টে পৌঁছে সবার শেষে বাস থেকে নামলাম, দরজা বন্ধ করলাম, ড্রাইভার সাহেবকে আমার ভাড়া পাঁচটি টাকা দিয়ে তাঁকে নমস্কার করলাম। দেখলাম, ওখানে কেউ ভদ্রভাবে গাড়ির দরজাও বন্ধ করে না, অধিকাংশ লোক যারা দরজা বন্ধ করেন, তারাও তা করেন পা দিয়ে, আর গাড়ির চালককে সম্মান দেখানোর তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না। পরেরদিন ওই চালক আমাকে ধরলেন পার্লামেন্টে। আমি তখন বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম। উনি এসে আমাকে বলেন— আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল। আমি যদিও হিন্দি ভালো বুঝি না। বললাম— হ্যাঁ, বলুন। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন— আপনি কি ফার্স্ট টাইম এমপি? আমি বললাম— আজ্ঞে হ্যাঁ। উনি বললেন— আপনি না একটু থাকবেন। আপনার মতো মানুষকে এখানে দরকার। আমি জিজ্ঞেস করলাম— কেন বলুন তো? উনি বললেন— কাল আপনি ছিলেন একমাত্র মানুষ যিনি বাস থেকে নামার পর আমাকে নমস্কার করেছেন। আপনি ঠিক করে দরজাটা বন্ধ করেছেন। আপনি আমার মুখের ওপর টাকাটা ছুড়ে দেননি।

অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, নিশ্চয়ই সব সাংসদ এমন নন, তবে সংসদের বড্ড বেশি লোকই এরকম। এই ঘটনাগুলি থেকে বোঝা যায় দেশের মানুষদের আমরা কী চোখে দেখি। একবার পার্লামেন্টে গেলে বোঝা যায় আমাদের যারা ভোট দিয়ে ওখানে পাঠান, আমরা ওখানে পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁদের কথা আর ভাবি না। মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে পাঠাচ্ছেন, কিন্ত আমরা আইন প্রণয়ন করছি কাদের জন্য? কাদের কথা ভেবে? আমরা কি সেই মানুষগুলোর কথা ভেবে আইন প্রনয়ণ করছি? যদি তাই করতাম, তাহলে এই কৃষি আইনটা কার্যকর হতে পারত না।

আমি কিন্তু কোনও প্রেম দরদ দেশাত্মবোধ ইত্যাদি আবেগের জায়গা থেকে কথাগুলো বলছি না। আমি খুব বেসিক একটা লজিকের কথা বলছি। যেমন ধরুন, বাটখারা আইন চালু হল। আমরা সে সময় যে সরকারের মধ্যে ছিলাম তারাই এই আইন চালু করছেন। আমি ‘নো’ বলে ফেলেছিলাম, কারণ আমি মানি না। আশেপাশে কংগ্রেসের কয়েকজন বন্ধু ছিলেন, তাঁরা বলে উঠলেন, “নো নো, ডোন্ট সে দ্যাট।” কারণ বাটখারা থাকবে কি থাকবে না, সেই সিদ্ধান্তটা কয়েকজন এমপি ওখানে বসেই ঠিক করে নিয়েছেন। কিন্তু আমাকে তো কয়েকজন লোক ভোট দিয়ে জিতিয়ে পাঠিয়েছে। রাষ্ট্রের কি উচিত ছিল না আমাকে আবার তাঁদের কাছে ফেরত পাঠানো? তোমার ওখানে গিয়ে মিটিং করে দেখো তো লোকে কী চাইছে? গণতন্ত্র কাকে বলে? গণতন্ত্র তো এটাকেই বলে, তাই না? নাকি আমরা সাংসদরা দিল্লিতে থাকব এবং সেখানকার আরামদায়ক জীবনযাপন করতে করতে একদিন সকালে হাত তুলে ‘আই’ বা ‘নো’ বলে সবকিছু ঠিক করে ফেলব? অথবা যদি ওটা ইলেকট্রনিক ব্যালট হয়, তাহলে বোতাম টিপে? আমার নির্বাচনী এলাকায় অনেকেই কৃষিজীবী ও খামারজীবী। তাঁরা কিন্তু দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করেন। নতুন আইনে তাঁদের ইলেকট্রনিক দাঁড়িপাল্লা বা ওজনযন্ত্র কিনতে হবে। এই কথাটা তাঁরা জানবেন না? তাঁরা সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নেবেন না? এমনকি যিনি আমাকে ভোট দেননি তাঁরও অধিকার আছে এ বিষয়ে নিজের মত দেওয়ার। কাজেই আমি ভারতের একজন আয়করদাতা প্রবীণ নাগরিক এবং এক প্রাক্তন সাংসদ হিসেবে কোনও বৈপ্লবিক কথা বলছি না। খুব বুনিয়াদি সংজ্ঞার জায়গা থেকে বলছি— ভারতে কোনও গণতন্ত্র আছে বলে আমার মনে হয় না। আবার যা আছে সেটাও একধরনের একটা গণতন্ত্র বটে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ জিনিসটা যে একটা বায়বীয় ব্যাপার সেটাই আমি বারবার বলতে চাইছি।

আর বর্তমান সরকারের কথা বলতে গেলে এই সরকার তো এমনিতেই জনবিরোধী। সে যে বরাবর কার পক্ষে, তা কারও জানতে বাকি নেই। পাঁচশো টাকার নোটগুলো কয়েক ঘণ্টার নোটিসে বাতিল করে দেওয়া হল। তারপরে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে মানুষ মরে গেল। কারও কোনও মায়ামমতা নেই! কারা মরল? যেসব সাধারণ লোক পাঁচশো-দুহাজার টাকার নোট জমিয়ে রেখেছিল, তারা মারা গেল। আমার তেমন কোনও ক্ষতি হল না, আপনাদেরও হয়তো না। আমার বন্ধুবান্ধব যারা তাদের মোটেও কোনও ক্ষতি হল না তেমন। কাদের হল? ওই যে পাঁচশো-দুহাজার টাকা যে জমিয়েছিল, যে দিদিটা, তার হল। আমরা কিন্তু সব দেখেশুনে কিছুই করলাম না। আমার খুব অবাক লেগেছিল আমাদের বন্ধুবান্ধব বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন, তারাও কিন্তু খুব একটা চেঁচামেচি করলেন না। আশ্চর্যজনকভাবে, সকলে চুপ। আর আজ যখন এই কৃষি আইন কার্যকরী হল, বোঝাই যাচ্ছে কেন হচ্ছে, তা নিয়েও এ রাজ্যের বামপন্থীদের তেমন হেলদোল নেই।

আমি যেখানে থাকি, অর্থাৎ বৈষ্ণবঘাটা বাই লেন, আমাদের এখানে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ভাঙড় থেকে দুই যুবক রোজ আসেন। এতটা পথ এসে সাইকেল ভ্যানে করে তাঁরা সবজি বিক্রি করে যান। ওঁরা কিন্তু আর বেশিদিন এ কাজ করতে পারবেন না। বেশিরভাগ আনাজ এমনকি চাল, সমস্তটাই বাইরে থেকে আমদানি করা হবে। অথবা আমাদের জমিতে মধ্য আমেরিকার বানানা রিপাবলিকের মতো আনারসের চাষ হবে। অথবা আবাদী জমিতে টোম্যাটো চাষ হবে। একই জিনিস কিন্তু উত্তরবঙ্গে শুরু হয়েছিল, বামফ্রন্টের আমলে। এই জিনিস যদি চালু থাকে, তাহলে তো কৃষকদের সর্বনাশ হবেই বা ইতিমধ্যেও হচ্ছে, তাই তাঁরা আজ সরাসরি লড়াই করছেন। এবং এই লড়াইটা আমি এখন ওপারে যাওয়ার তোড়জোর করনেওয়ালা একজন বুড়ো  নাগরিক হিসেবে সমর্থন করি। কারণ আমি এমন একজন মানুষ যে কিনা আশা করা ছাড়া আর কিছুই জানে না। আমি চাইব যেন কৃষকেরা এর শেষ না দেখে না ছাড়েন। অন্তত বিষয়টা যেন এমন একটা জায়গায় পৌঁছয় যাতে আমরা সবাই একদিন রাস্তায় নামতে বাধ্য হই।

কিন্তু আপাতত আমরা বাধ্য হচ্ছি না। আমাদের  ফেসবুক জুড়ে এখন নানা রান্নার বিবরণ, খাবারের ছবি৷ আমি দেখছি আমার পরিচিত অনুজ বন্ধুবান্ধবরা বিয়ে করছেন, তার আগে সেজেগুজে তাদের প্রি-ম্যারিটাল ফটোসেশন চলছে। আমি কিন্তু এর নিন্দে করে বলছি না, আমি শুধু ঘটনাটা বলছি। আমাদের আনন্দে কোথাও কোনওকিছু কম পড়েনি। শহীদ কাদরির একটা কবিতায় ছিল— ‘কোথাও কোনও ক্রন্দন নেই।’ আমাদের কারও কিছু যায় আসে না। কিন্তু ব্যাপারটা অত সরল নয়। একদিন ঠিকই আসবে, যাবে। আমার হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত কবিতার কটি লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!
………….
বিধাতার রুদ্ররোষে
দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে
ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।

এটা কিন্তু অবশ্যম্ভাবী হতে চলেছে। তার মধ্যে দিয়ে হয়তো অন্যান্য ফোর্স তৈরি হবে, যে ফোর্সগুলো প্রগতিশীল, যারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা ভাবে। শেষ করার আগে শুধু আরেকটা কথা বলি। আমি খুব খোলামেলাভাবে জনযুদ্ধের সমর্থক ছিলাম। এর জন্য আমাকে কেউ অ্যারেস্ট করবে কি করবে না, আমি জানি না। এখন যদি আমায় কেউ জিজ্ঞেস করেন যে আমি কী, আমি তাহলে কিছু বলতে পারব না। আমি তো জানি না এখন কে কোথায় কী করছেন! তবে ওরা যে একটা বাহিনীর কথা বলতেন তা আমার খুবই ভালো লেগেছিল। কোবাড গান্ধী ওদের একজন তাত্ত্বিক। অসামান্য ধীশক্তিসম্পন্ন একজন মানুষ, মেধাবী মানুষ, শিক্ষিত মানুষ। উনি ইংল্যান্ডে চার্টাড আ্যকাউন্টেসির পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। উনি একটা খুব জরুরি কথা বলেছিলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রেখে এমন কোনও সরকারকে ভোটে জিতিয়ে আনা সম্ভব নয় যে সরকার জনগণকে সম্মান করবেন। আমি এই কথাটায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাস নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাব? আমি তো আর কিছুদিন পরে চলে যাব। আমি কি এই বিশ্বাসটা চুষতে চুষতে চাটতে চাটতে হাত বুলোতে বুলোতে মারা যাব? আমি জানি না।


*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3088 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...