মিডিয়ার অপপ্রচার এবং উদাসীনতার জবাব দিতে ‘ট্রলি টাইমস’ কৃষকদের

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

ভারতের ইতিহাসে এরকম নির্লজ্জ মিথ্যাচারী প্রধানমন্ত্রী আগে কখনও আসেনি। এ-কথাটা বলতে গলায় আর কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখা সমীচীন নয়।

মধ্যপ্রদেশে ভাষণ দিলেন। কৃষকদের উদ্দেশ্যে। মধ্যপ্রদেশের বরেলি শহরে। এই মধ্যপ্রদেশই সেই রাজ্য যেখানে (মন্দসৌরে) বিক্ষোভরত কৃষকদের ওপর গুলি চালিয়ে ৫ জনকে হত্যা করা হয়েছিল বছর দুই আগে। কী বললেন প্রধানমন্ত্রী এখানে দাঁড়িয়ে? বললেন সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) তুলে দিতে চাইছে— এ দাবি সর্বৈব মিথ্যা। বললেন সরকার নাকি স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ হিসেবে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেওয়া ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে।

পড়গুম্মি সাইনাথের একটি সাক্ষাৎকার বাংলায় তর্জমা করে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের অক্টোবর মেল ট্রেনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে সাইনাথ এই স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা প্রসঙ্গে দেখিয়েছিলেন— ২০১৪ সালে ভোটের আগে বিজেপি বলেছিল ক্ষমতায় এলে ১২ মাসের মধ্যে কার্যকর করবে; ২০১৫-তে সুপ্রিম কোর্টে এফিডেবিট দিয়ে সরকার জানায় যে সে এটা করতে পারব না; ২০১৬-তে বলে এটা অপ্রাসঙ্গিক দাবি— এরকম কোনও প্রতিশ্রুতিই নাকি তারা কখনও দেয়নি; ২০১৭-তে বলে মধ্যপ্রদেশ স্বামীনাথন কমিশনে যা বলা হয়েছে তার চাইতেও অনেক ভালো করছে; ২০১৮-’১৯-এর বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়ে গেছে! আর এখন এই ২০২০-তে কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমরাই একমাত্র দল যারা স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশগুলির পক্ষে দাঁড়িয়েছি, সুপারিশগুলি কার্যকর করেছি। আমরাই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিয়েছি।”

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে এই ধারাবাহিকতাতেই দেখা বাঞ্ছনীয়। বাগাড়ম্বরে কারও চেয়ে কম যান— এ অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী সম্বন্ধে তাঁর অতি বড় শত্রুও করতে পারবে না।

সেই কথাটাই বলেছেন মধ্যপ্রদেশের কৃষক নেতা শিব কুমার শর্মা ওরফে কাকাজি। বলেছেন:

ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের অর্ধেক দামে যে সমস্ত কৃষকরা তাঁদের ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা এসব শুনে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কী ভাববেন? যে বরেলিতে তিনি এসব বক্তিমে করলেন সেখানকার কৃষকরাই দু বছর আগে বিক্রি করা ছোলার দাম পাননি এখনও!

 

এর আগে তিনদিন অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে। সরকার সেসবের ওপর সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে। হাজারেরও ওপর কৃষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু কৃষকরা দমছেন এমন কোনও খবর নেই। আগামী ২৯ ডিসেম্বর ডাক দেওয়া হয়েছে মহামিছিলের। থাঞ্জাভুরে। গোটা রাজ্যের— বিশেষ করে বদ্বীপ অঞ্চলের জেলাগুলির কৃষকরা দলে দলে নামবেন সেদিন পথে। এই বদ্বীপ অঞ্চল রাজ্যের শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত।

দিল্লি পাঞ্জাব বা হরিয়ানা না। তামিলনাড়ুর কথা বলছি। এ শুধু পাঞ্জাব বা হরিয়ানার কৃষকদের আন্দোলন বলে মাঝেমাঝেই যে টক ঢেকুরটা তোলা হচ্ছে, তার নিরাময়ার্থে তথ্যটা দিয়ে রাখা গেল।

সেই সঙ্গে এগুলোও শুনুন:

দিল্লিতে আজ লোকে মোদি-আদানির কথা বলছে। আমরা এদের হাড়ে হাড়ে চিনি। মোদিজি কচ্ছের অত মূল্যবান জমি আদানিকে দিয়ে দিয়েছিলেন মাত্র ১ টাকা প্রতি মিটার দরে। আদানি সেখানে এসইজেড ইত্যাদি কি কি না বানিয়েছে!…

এই যে মোদিজি প্রতিটি রাজ্যে ঘুরে ঘুরে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার কথা বলে বেড়াচ্ছেন, কই একবার নিজের রাজ্যে এসে বলুন দেখি! এই একই স্কিম এখানে রাজ্য সরকার বাতিল করেছে এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০২০-২১-এ এই স্কিম লাগু করা হবে না!

কথাগুলি গুজরাট কিসান সভার সভাপতি দয়াভাই গাজেরার। গুজরাটের বিজেপি সরকার শুধু এটুকুই করেনি, রাজ্যের কোনও কৃষকের আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, বলেছে গ্রেপ্তারি সহ আরও নানারকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কেউ এই প্রতিবাদ আন্দোলনে যোগ দিলে। কিন্তু যথারীতি ঠেকানো যাচ্ছে না। গুজরাটের কৃষকরা রাজস্থান-হরিয়ানা বর্ডারের শাহজাহানপুরে যেখানে প্রতিবাদী কৃষক সংগঠনগুলি ক্যাম্প করেছে সেখানে কম্বল, লেপ, জলের বোতল জাতীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিয়েছেন।

 

সরকারের মিথ্যাচারিতা বা ছলচাতুরি কৃষকরা তো ধরতে পারছেন, বলছেনও, কিন্তু, এটা বোধহয় কৃষকদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের এক অন্যতম সাফল্য বলে বিবেচিত হবে, ধরতে পারছে সুপ্রিম কোর্টও। না, ধরতে পারছে কথাটা বোধহয় ঠিক হল না। ধরতে কি আর আগে পারত না? বলত না। এই কৃষক আন্দোলন সুপ্রিম কোর্টকে দিয়ে সেই কথাগুলো বলিয়ে নিল। সর্বোচ্চ আদালতের কণ্ঠে আমরা অনেকদিন পর আবার স্পষ্ট সরকারবিরোধী উচ্চারণ শুনলাম।

সর্বোচ্চ আদালত জানিয়েছে:

কোনও সম্পত্তি বা জীবনহানির আশঙ্কা না-থাকলে প্রতিবাদ করা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সরকারকে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

সওয়াল-জবাবের একটা আকর্ষণীয় অংশ তুলে দিই:

প্রধান বিচারপতি সিএ বোবদে বলেন: আমরা আইনে স্থগিতাদেশ দিচ্ছি না, অ্যাটর্নি জেনারেল মহাশয়, আপনি সরকারের তরফে আদালতকে এটুকু আশ্বস্ত করুন, যে যতক্ষণ না আদালত সমস্ত পক্ষের কথা শুনছে, ততদিন সরকার আইনটি প্রয়োগ করবে না।

অ্যাটর্নি জেনারেল বেণুগোপাল বলেন, সেটা সম্ভব নয়। কারণ তাহলে কৃষকরা আরও উদ্ধত হয়ে উঠবেন। তাঁদের সঙ্গে আর আলাপ-আলোচনা চালানো যাবে না।

প্রধান বিচারপতি তার উত্তরে বলেন, কৃষকরা তো মনে করছেন সরকারই ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে!

ফলে, এই হচ্ছে পরিস্থিতি। সরকার আপাতত সব দিক দিয়েই নগ্ন। দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের জন্য কৃষকরা প্রস্তুত।

প্রতিজ্ঞা প্রস্তুত ঘরে ঘরে…

 

এবং ট্রলি টাইমস।

যদি দু-একটা বীজ ভিজে ওঠে’-তে সীমন্তিনী ঘোষের লেখায় আমরা জেনেছিলাম দিল্লি সীমান্তে অবস্থানরত কৃষকরা মিডিয়ার লোকেদের সন্দেহের চোখে দেখছেন। কেউ গিয়ে ছবি তুললে বা কথা বলতে চাইলে আগে জিজ্ঞাসা করছেন মিডিয়ার লোক কিনা। কারণ তাঁরা জানেন, এবং অত্যন্ত সঠিকভাবে জানেন, যে মূলধারার মিডিয়াতে তাঁদের ঐতিহাসিক আন্দোলন নিয়ে যতটা করা সম্ভব ততটা নীরবতা পালন করা হচ্ছে। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলছেন, ছবি তুলতে দিচ্ছেন। সীমন্তিনী লিখেছিলেন:

যখন শুনছেন আমরা মিডিয়া নই, বলছেন, কথা বলুন, ছবি তুলুন, ভিডিও তুলুন, ফেসবুকে ইউটিউবে দিন।

 

অতএব ট্রলি টাইমস। কৃষকদের নিজস্ব কাগজ। থাকবে শুধু আন্দোলনেরই খবর। দ্বিভাষিক। গুরুমুখী এবং হিন্দি। চার পাতার প্রথম সংখ্যায় রয়েছে সারা ভারত কিসান মহাসভার নেতা পুরুষোত্তম শর্মার একটি নিবন্ধ— কৃষি আইনগুলি সম্বন্ধে; ছাত্রদের পরিপ্রেক্ষিত থেকে প্রাক্তন জেএনইউ সভাপতি হরিয়ানার গীতা কুমারীর একটি নিবন্ধ; রাজস্থান, হরিয়ানা, গুজরাটের কৃষকরা কীভাবে সংগঠিত হচ্ছেন সেই নিয়ে তরুণ কর্মী রাহুলের একটি লেখা। কাগজের শেষ পাতাতে কলকাতাবাসী এক ডিজাইনারের ইলাস্ট্রেশন। পরের সংখ্যা থেকে গাজিপুর এবং শাহজাহানপুরের অবস্থানের খবরও থাকবে। বস্তুত, কাগজটি দ্বিভাষিক রাখা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যেই। দিল্লির দুই শিল্পী থুকরাল এবং টাগরা বিনা পয়সায় মাস্টহেড ডিজাইন করে দিয়েছেন দুই ঘন্টার মধ্যে।

শুক্রবার সকালে সিংঘু এবং টিকরি সীমান্তের কৃষকরা হাতে পেয়ে গেছেন তাঁদের এই নিজস্ব মুখপত্র ট্রলি টাইমস। যার হেডলাইনে গুরুমুখীতে জ্বলজ্বল করছে—

জুঢ়েঙ্গে। লড়েঙ্গে। জিতেঙ্গে।


ছবি: ইন্টারনেট, টুইটার

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...