তেভাগা বিদ্রোহ এবং সাম্প্রতিক কৃষকবিক্ষোভ: দোদুল্যমান মধ্যবিত্ত সম্পর্কে দু-তিনটি কথা

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 



সাহিত্য-গবেষক এবং দাবা-প্রশিক্ষক

 

 

 

 

 

“ইয়ে টিয়ে সব বাকসে, ব্যাগে ভাগ করে রেখেছ তো? গ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, ওদিকে চাষারা খুব উৎপাত করছে”— এক ভদ্রলোক দেশভাগের পরে শান্তাহার-নওগাঁর ট্রেনে চেপে ‘ইন্ডিয়া’তে পালিয়ে আসার সময়ে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন। ‘চাষাদের উৎপাত’ বলতে, তেভাগার দাবিকে সর্বাত্মক কৃষক বিদ্রোহে পরিণত করে সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বিপদাপন্ন, তাঁর ভিটে-মাটি চাঁটি হয়ে গেছে ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসে, দীর্ঘদিনের উপনিবেশিত পরিসরে তাঁর আর্থ-সামাজিক অবস্থান চরম অনিশ্চিত, বছর চারেক আগের খাদ্যসঙ্কটের তিনিও ভুক্তভোগী; তবুও কৃষকবিদ্রোহ তাঁর কাছে উৎপাতের, বিরক্তির, অপ্রয়োজনীয়। তার মানে অবশ্যই এই নয় যে, তিনি জোতদার-মহাজনের সমর্থক, তার মানে এও নয় যে তিনি ব্রিটিশদের অধীনে স্বচ্ছন্দ। আসলে, তিনি শান্তিপ্রিয়, তিনি স্থিতাবস্থাকামী এবং তিনি ভদ্রলোক! তৎকালীন সর্বাধিক বিক্রিত সংবাদপত্রগুলিতে “মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপদাপন্ন” এবং কৃষকেরা “আইনভঙ্গকারী ও আনুগত্যহীন”— এই খবর প্রকাশিত হতে থাকে তেভাগা বিদ্রোহের সময়। সংবাদপত্রগুলি যে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত-ভদ্রলোক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করত, তাদের প্রত্যক্ষ দায় ছিল না তেভাগাকে সমর্থন বা বিরোধিতা করার; বরং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে তাদের জীবনের ‘স্বাভাবিকত্ব’ বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। আর, সমাজ সম্পর্কে যাবতীয় তত্ত্ব-কচকচির ভান তো তারাই করে এসেছে; সেই এজেন্সিকে প্রতিস্পর্ধা জানিয়ে, তত্ত্ব-মোলায়েম ছকবাঁধা গণ্ডি ভেঙে কৃষকেরা সশস্ত্র দ্রোহ শুরু ক’রে দিলে ভদ্রলোকের তত্ত্বের মান থাকে কি? ১৯৪৬-এ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভার দ্বারা প্রকাশিত পুস্তিকাতেও এই ‘মধ্যবিত্তের স্বার্থরক্ষাকারী’ তথা তেভাগাবিরোধী পত্রিকাগুলির বয়ান এবং তার বিরোধিতা প্রকাশিত হয়, “তেভাগার দাবি মধ্যবিত্তকে ধ্বংস করার চক্রান্ত; “কৃষকের অবস্থা বরং ভাল, মধ্যবিত্তের অবস্থাই আজ শোচনীয়”— জনশত্রুর দল আজ এইসব বুলি আওড়াইতে শুরু করিয়াছে।”

ততদিনে ধর্মীয় বিচ্ছেদ, স্বাতন্ত্র্যের খোঁজ এবং হিন্দু-মুসলমান বাইনারি প্রবল সক্রিয় হয়ে উঠেছে; দেশভাগের পিনিক উঠেছে ভদ্রলোক হিন্দুদের পরিসরে। ‘মিল্লাত’ পত্রিকা নিয়মিত তেভাগার সমর্থনে সওয়াল করে চলেছে মুসলিম লিগের প্রগতিশীল অংশের সমর্থন আদায়ের জন্যে। ‘মিল্লাত’-এ ভাগচাষির শোষণের ইতিবৃত্ত ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। আধিয়ারের পাশাপাশি ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। বদরুদ্দীন উমর লিখছেন, ভূমিহীন কৃষকেরা দুই প্রথায় জমির মালিককে খাজনা দেয় “প্রথম প্রথার নাম আধি, বরগা বা ভাগচাষ এবং দ্বিতীয় প্রথার নাম টংক, গুলা, সাঁজাভাগ, খাড়াফাগ ইত্যাদি।” বাংলার বিশেষত উত্তরবঙ্গের কৃষকদের চরম দুর্দশা-দারিদ্র্যের সময়ও বাঙলার ‘প্রথম সারির পত্রিকা’ ও সাহিত্যপত্রগুলি মধ্যবিত্তের সঙ্কট আর কংগ্রেস-মুসলিম লিগ-হিন্দু মহাসভা এই তিনটির পারস্পরিক বিবাদ নিয়েই ব্যস্ত ছিল। মুসলিম লিগের প্রগতিশীল অংশ কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষকসভার দ্বারা সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করেই ‘বঙ্গীয় বর্গাদার সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বিল (১৯৪৭)’-র খসড়া প্রকাশ করে। কিন্তু, কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ দুয়েরই নেতৃত্বভিত্তি ও খুঁটির জোর ছিল উচ্চবিত্ত আর উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং নৈতিক পরিসরের প্রচারভূমি ছিল শিক্ষিত-মধ্যবিত্তের স্বার্থে। তাই, তেভাগার বাস্তবায়ন তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষকসভার যে প্রচারপত্র ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয়, তাতে মধ্যবিত্তের তেভাগা-বিমুখতাকে উদ্দেশ্য করে অনেক কথা ছিল। ‘চাষাদের আন্দোলন’ সম্পর্কে মধ্যবিত্তের সন্দেহ নিরসন করে আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়। আর্থ-সামাজিক সঙ্কটে আধিয়ার থেকে কেরানি-চাকুরিজীবী সকলেই যে শোষিত যুক্তি-তথ্য দিয়ে তা প্রকাশ করে লেখা হয়,

বাংলার গৌরবময় মধ্যবিত্ত-সন্তানের দল, আসুন, আধিয়ারের ন্যায্য দাবী, কৃষকের ন্যায্য দাবী, মজুরের ন্যায্য দাবী, মধ্যবিত্তের ন্যায্য দাবীর জন্য যুক্ত সংগ্রামে নির্ভয়ে আগাইয়া আসুন… আসুন আমরা সকলে মিলিয়া শেষবারের মত মৃতপ্রায় সাম্রাজ্যবাদের বুকে চরম আঘাত করি, তাহারই ধ্বংসস্তূপের উপর মজুর, কৃষক, মধ্যবিত্তের নূতন বাঙলা গড়িয়া তুলি।

বিদ্রোহী কৃষকেরা চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন তাঁদের মূল শত্রুকে। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে প্রায় বিশ লাখ আবাদী জমি থাকলেও, অল্প সংখ্যক জোতদার-জমিদারের অধীনে ছিল প্রায় এক কোটি একর আবাদী জমি। তাই, “মধ্যবিত্তের প্রকৃত শত্রু কৃষক নয়, শত্রু হল বড় জমিদার-জোতদার, আমলাতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ” এই ঘোষণা ছিল কৃষকসভার।

জোতদার শরাফতের বড় ছেলে ও শিক্ষিত আশরাফশ্রেণির প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ ভয় পেয়েছিল অস্তিত্বের, “কিন্তু চাষাদের বাড়াবাড়ি সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে, টাউন হয়ে করতোয়া পেরিয়ে ঐ দাপাদাপি এই পুব এলাকায় আসতে আর কতক্ষণ?… জমি তো আর হেঁটে হেঁটে জোতদারের বাড়ি এসে হাজির হয় না… এক এক ছটাক জমি করতে মানুষের শরীরের এক এক পোয়া রক্ত নুন হয়ে বেরিয়ে যায়, সে খবর রাখো? জাহেল চাষার গোঁ আব্দুল আজিজ দেখে খিয়ার এলাকায়। সেই গোঁ এখানকার চাষার শরীরে চাগিয়ে উঠতে কতক্ষণ?”

চাষাদের গোঁ মেনে নিতে পারেনি মুসলিম লিগের নেতা এবং চাকুরিজীবী আজিজ। আধিয়ার আর ক্ষেতমজুরদের দাবি আইনি ন্যায্যতা পেয়ে গেলে তার পারিবারিক পেশা ও স্থায়ী আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠা প্রশ্নের মুখে পড়ত। হিন্দু-মুসলিম দু ধর্মের মৌলবাদীরা শাসকের প্রত্যক্ষ মদতে দাঙ্গা বাঁধাতে সফল হয়েছিল ওই একই সময়ে। কিছু স্থানে সেই বিভেদের ফলে তেভাগার দাবিকে দাবিয়ে দিতে সক্ষমও হয় তারা। কিন্তু, কৃষকদের দাপট যেখানে ছিল বেশি, জোতদার-পুলিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দ্রোহের মাত্রা ছিল প্রবল, সেই সমস্ত এলাকায় বানচাল হয়ে যায় শাসকের সব চেষ্টা। যশোদারানী সরকার, মাঝি সরেন, চিয়ার সাই শেখ, হাজরাপদ মণ্ডল— লিঙ্গ-বর্ণ-ধর্মের প্রভেদ মুছে দিয়ে শ্রেণির ধারণাই হয়ে ওঠে মূল ভিত্তি। এই শ্রেণিভিত্তি মধ্যবিত্তের দোদুল্যমান অবস্থান থেকে পাওয়া যায়নি। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গে মধ্যবিত্তের কিছু অংশ (মূলত ছাত্র ও শিল্পীরা) কৃষকদের অভ্যুত্থানে জড়িয়ে ছিলেন, নিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু, বৃহৎ মধ্যবিত্তের সামনে তখন ‘ধর্মীয় বিভেদ’ আর দাঙ্গার প্রতর্ক নির্মাণ করে দিয়েছে শাসকশ্রেণি। অনিশ্চয় ভবিষ্যতের খাঁড়া আর ‘দেশভাগই স্বাধীনতার সমাধান’ এইসব তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে মধ্যবিত্তের সঙ্কট আর নিম্নবর্গের সঙ্কটকে আলাদা করে দিতে পেরেছে। দিল্লির সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময়ও ভারত জুড়ে অনিশ্চিত জীবন (এনআরসি-সিএএ) আর ধর্মীয় সন্ত্রাস (আরএসএসের মতাদর্শ) ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে শাসকশ্রেণি। মধ্যবিত্তের সঙ্কটে জুড়ে গেছে উত্তর-নব্বই আর্থ-সামাজিক সঙ্কট। বেকারত্ব, বেসরকারিকরণ, ছাঁটাই, উত্তর-লকডাউন অনিশ্চয়তা, সঞ্চয়প্রকল্প হ্রাস ইত্যাদি হাজার সমস্যা। কৃষিক্ষেত্র ভারতের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়েও শতকব্যাপী সর্বাধিক শোষিত এবং বিগত দু-তিন দশকে বহুজাতিক-আধিজাতিক সংস্থাগুলির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে জর্জরিত। কিন্তু, মধ্যবিত্তের সঙ্কট যে কৃষক আত্মহত্যা আর কৃষকের সঙ্কটের থেকে আলাদা তা সামাজিক বয়াননির্মাণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এতদিনে। ভারতে কত মিনিট অন্তর একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন আর নতুন কৃষি আইন ভবিষ্যতে সেই ‘অন্তর’-এর ব্যবধান কতটা কমিয়ে আনবে, তা বৃহৎ মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন বৃত্তের বাইরেই থেকে গেছে। ‘খোয়াবনামা’-র আব্দুল আজিজদের বিবর্তন ঘটেছে বিগত সাত দশকে; ‘সবুজ বিপ্লব’ সংক্রান্ত সরকারি পাঠ্যপুস্তক-বয়ান থেকে বেরোলে বোঝা যাবে যে, এদেশে ১৯৪০ দশকের মতো এই ২০২০তেও আধিয়ার বর্গাদারদের বিপন্নতা কাটেনি। আব্দুল আজিজরা কেউ এখন নব্যধনী শহুরে উচ্চবিত্ত হয়ে গেছে কেউ বা জোতজমি আর সুদের কারবার বাড়িয়ে নিয়েছে আরও। কিন্তু, তমিজ, সমিরুদ্দীন, শিবরাম, চ্যারকেটু, বসাইদের বিপন্নতা বেড়েছে বই কমেনি। কৃষক আন্দোলন শুধুমাত্র দিল্লির নয়, সারা ভারতের। কৃষি আইন ২০২০ শুধুমাত্র পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকদের সর্বনাশ করবে না বরং আগামী দিনে ভারতজুড়ে আরও বড় বিপর্যয় নামিয়ে আনবে। এই সামান্য প্রতর্কটুকু এখনও কি ভারতীয় মধ্যবিত্ত চেতনায় আঘাত করেছে?

যে আন্দোলন ছিল আধিয়ারদের, তা অচিরেই হয়ে উঠেছিল ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদেরও আন্দোলন। কৃষকসভার কমিউনিস্ট নেতা অবনী লাহিড়ীর স্বীকারোক্তি ছিল, “যখন তেভাগা আরম্ভ হয়, ভূমিহীনরা ও দিনমজুরেরা ব্যাপকভাবে যোগ দিয়েছিল, অথচ এই শ্রেণিটির রাজনৈতিক দাবি আমাদের প্রত্যক্ষ কর্মসূচিতে বিশেষ কিছু ছিল না। আমরা, এমন কি আধিয়ারেরাও ভাবতে পারেনি দিনমজুরেরা এভাবে জঙ্গি মনোভাব নেবে।” ১৯৪৭ সালের ৪ঠা জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সমিরুদ্দীন আর শিবরাম, তেভাগা বিদ্রোহের প্রথম শহীদ তাঁরা। সমিরুদ্দীন ছিলেন ক্ষেতমজুর আর শিবরাম ছিলেন সাঁওতাল আধিয়ার। ‘অপারেশন? বসাই টুডু’-তে বসাইয়েরও অভিযোগ ছিল যে, কৃষকসভা ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের দাবিগুলির প্রতি উদাসীন থেকেছে। আর, আদিবাসী ক্ষেতমজুরদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি বা মিনিমাম ওয়েজও অমিল ছিল। “ক্ষেতমজুরের হক কম্‌নিস কিষাণ ফরন্ট দেখল নাই। কমনিস্‌ কিষাণসভা যাদের ল্যিয়ে, তারা মধ্যম চাষী, লয়? তারাও ক্ষেতমজুর লাগায়, লয়? তারাদের হক্‌ চোট খায়, লয়?… খেতমজুরের হকরে কুন-অ কিষাণসভা মদত দিল না।” কিন্তু, বসাইয়ের তবু ‘বুক ফাটি গিছু’ অনুভূতি হয়েছিল কিষাণসভার দ্রোহভূমিকায়। কারণ, চরম লড়াই জোতদারের সঙ্গে এবং প্রশাসন-আইনের সঙ্গে; আর, সেই লড়াইয়ে কিছু দাবি আদায় হলে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরেরও সুরাহা হয় কিছু। টংক, হাজং ইত্যাদি আন্দোলনে আধিয়ার আর ক্ষেতমজুরের লড়াই একত্রে মহাজন-জোতদারের বিরুদ্ধে। “ক্ষেতমজুর ভাগচাষী লয়। কিন্তুক যায় নাই ক্ষেতমজুর? মরে নাই গুলিতে? লঢ়াই করাছি, লঢ়াই!” বাজে-আদায়, হাট-তোলা, গদি সেলামী, ছেলে পড়ানি, ঝাড়ানি সহ অন্যান্য বাজে আদায় বন্ধ করার হুঙ্কারে আধিয়ার ও ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জোটবদ্ধ শ্রেণিস্বার্থ ছিল।

১৯৫১ সালে ভারতে মোট ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের সংখ্যা ছিল ২৭.৩ মিলিয়ন। আর, ২০১১ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৪.৩ মিলিয়নে। ২০১৭ সালে সরকারি তথ্যানুযায়ী, “the absolute number of households engaged in agriculture in 2011 (119 million) outpaced those in 1951 (70 million).”[1] ২০১১ সালে আর্থ-সামাজিক ও বর্ণশুমারি অনুযায়ী গ্রামীণ ভারতের ৫৬.৪১ শতাংশ পরিবারের হাতে কোনও জমি নেই। গ্রামীণ ভারতে মাত্র ৪.১০ শতাংশ পরিবারে কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় তিন বা চার চাকার যন্ত্র রয়েছে এবং মাত্র ৯.৮৩ শতাংশ পরিবারের হাতে সেচের জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বন্দোবস্ত রয়েছে[2]। ২০১৭ সালে ‘কৃষকদের দ্বিগুণ আয়বৃদ্ধি’-র রিপোর্টে চারটি ভিত্তির ওপরে জোর দেওয়া হয়, যথা— উৎপাদনের ধারাবাহিকতা, কৃষকদের উৎপন্ন পণ্যের অর্থনীতিকরণ, কৃষি-সংযুক্ত পরিষেবাকে পুনঃশক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতাকে মেপে নিয়ে কৃষিকে এক ‘এন্টারপ্রাইজ’ হিসেবে গণ্য করা। ২০২০ কৃষিবিল এই উদ্দেশ্যেই কৃষি বিপণন বাড়াতে অবাধ বাণিজ্যের রাস্তা খুলে দিতে চাইল এবং চুক্তি-ভিত্তিক চাষকে আইনি প্রতিষ্ঠা দিতে চাইল। কিন্তু, আপাতভাবে সরকারের ‘শুভ উদ্দেশ্য’-র পেছনেই নিহিত রয়েছে সর্বগ্রাসী ধান্দা। ভারতীয় কৃষিব্যবস্থার মূল সমাধান তো নয়ই বরং সমস্যা জটিলতর হবে অদূর ভবিষ্যতে। চুক্তি-ভিত্তিক বাণিজ্যিক চাষে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের লাভের ভাঁড়ার শূন্য, আধিয়ারদের ওপরে আধিপত্য করবেই ফড়ে বা কৃষিদালালরা এবং অন্তত ছোট কৃষকের (যাঁর অল্প কিছু জমি আছে) ক্ষেত্রে কর্পোরেটের কাছে ঋণে-সুদে-ধনেপ্রাণে বিকিয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁদের অন্য পথ থাকবে না। হিমঘরের নতুন আইন বলবৎ হলে তাতে কর্পোরেট এবং তাদের সঙ্গে আইনি চুক্তিকারী অতিবৃহৎ কৃষকের লাভ বাড়বে, কিন্তু ক্ষেতমজুর ও আধিয়ারদের লভ্যাংশ কিছুমাত্র বাড়বে? “কর্পোরেট সারা দেশে অবাধে ব্যবসা করতে পারে আর ব্যাঙ্কের সহায়তায় তাদের মূলধনেরও কমতি নেই। ফলে আখেরে এই বিলগুলির মাধ্যমে ভারতের কৃষি বহুজাতিক সংস্থা ও বড় বড় কর্পোরেটের অধীন হয়ে পড়বে … ফড়ের জায়গায় এ বার কোটপ্যান্ট পরা রাঘববোয়াল ফড়েরা আসবেন, পয়সা ঢালবেন, দাদন দেবেন, মাল কিনবেন আর ব্র্যান্ডিং করে গ্রাহকের কাছে অনেক বেশি দামে বিপণন করে লাভের সব গুড়টুকু নিয়ে চলে যাবেন।[3]” উৎপাদন থেকে বিপণন কৃষিব্যবস্থার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে কর্পোরেট ও কৃষি-হাঙররা। পুঁজিই নিয়ন্ত্রণ করবে সমস্ত ব্যবস্থা আর, বৃহৎ পুঁজির বিনিয়োগের কাছে ক্রমশঃ ছোট পুঁজি আর পুঁজিহীনতা যে টিঁকতে পারে না তা বিগত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় অপরিষ্কার নয়। কিন্তু, ভারতের বৃহৎ মধ্যবিত্তের তাতেই বা কী এসে যায়? হ্যাঁ, যায়। ‘কৃষকরাই অন্নদাতা’- এই বাক্য ক্লিশে শোনালেও চিরন্তন ও সর্বজনীন। আর, ‘কৃষকদের আচ্ছে দিন আসবে’ এই কুমীরছানা দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার পাশ করিয়ে নিল ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সংশোধনী কানুন’ চাল-ডাল-তৈলবীজ-আলু-পেঁয়াজ ইত্যাদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আর রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন নয় এবং এগুলি উৎপাদন বা বিক্রির ওপরে আর কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। পচনশীল দ্রব্যের দাম ৫০ শতাংশ বাড়লে তবেই কেন্দ্রীয় সরকার ভূমিকা নেবে বা ‘নিতে পারে’! কৃষিজ উৎপাদনের সঙ্গে মধ্যবিত্তের (বিশেষত ক্রমবর্ধমান মেট্রোসিটির শহুরে মধ্যবিত্তের) সরাসরি যোগ নেই; কিন্তু এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিল তো সরাসরি আঘাত করবে তাকে। চেনা আয় আর অচেনা ব্যয়ের ভেতর ওই মাপা সঞ্চয় বিপন্ন তো হবেই!

বসাই টুডু, দোপ্‌দী মেঝেনদের স্বরে শোনা যায়, ১৯৭৬ সালে ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের পরে বয়স্কদের ক্ষেত্রে দিনমজুরির হার আট টাকা দশ পয়সা ক’রে ধার্য হয় এবং মাস মজুরির বেসিক আশি টাকা ষাট পয়সা। কিন্তু, জমির মালিক কোনওদিনই ক্ষেতমজুরদের নিয়মমাফিক মজুরি দেয়নি; মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করলে তার চাষের বন্দোবস্ত পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং না খেতে পেয়ে মরার আশঙ্কা। ২০২০ সালের ১লা এপ্রিল প্রকাশিত নতুন নির্দেশনামায় কৃষিক্ষেত্রে ‘ক্যাটেগরি-এ’তে অদক্ষ মজুর পাবে ৪০০টাকা এবং অতিদক্ষ মজুর পাবে ৫২৬ টাকা। কৃষকদের থেকে ফসল ক্রয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম সাহায্য মূল্য দেওয়ার ঘোষণা সরকারের অনেকদিনের। কিন্তু, এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ কৃষক এই ন্যূনতম মূল্যের কথাই জানেন না এবং প্রায় ৬৪ শতাংশ কৃষক এই মূল্যে খুশি নন[4]। NABARD-র ২০১৬-৭ রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৪ শতাংশ কৃষিপরিবার বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তায় বা অনাবৃষ্টির জন্যে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, ২৮ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কীটমাকড়ের জন্যে এবং ১৮ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শস্যদামের আচমকা পতনে। এরপরে তাঁরা ঋণ নিয়েছেন বিভিন্ন উৎস থেকে। ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ভিত্তি কৃষিব্যবস্থার এক খণ্ডচিত্র এই তথ্যগুলি। উৎপাদন থেকে বিপণন কর্পোরেট তথা বৃহত্তম পুঁজিসমষ্টির মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে চলে গেলে এই সমস্যাগুলির সমাধান কোথায় হবে?

ভারতের কৃষিব্যবস্থার বহুধাবিভক্ত রূপ এই সামান্য প্রবন্ধ পরিসরে আঁটানো যায় না। অতিসামান্য কিছু বিষয় বলা যায় মাত্র। তেভাগা আন্দোলন, যা ভারতের মুক্তিসংগ্রামে সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক ছিল, তা একই সঙ্গে সামন্তবাদের মুখাগ্নির অগ্নিশলাকাও হতে পারত। কিন্তু, মধ্যবিত্তের দোদুল্যমানতা ও বিমুখতা তা হতে দেয়নি। অন্যদিকে, বিদ্রোহ যতটা আধিয়ারদের ছিল, ততটাই ছিল ক্ষেতমজুরদেরও; কিন্তু, ক্ষেতমজুর ভূমিহীন কৃষকদের সঙ্কট উপেক্ষিতই থকে গেছিল। সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে বহু স্থানে সাফল্য এলেও, কৃষকসভার নেতৃত্ব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে একটা পর্যায়ের পরে। বিশেষত ১৯৪৭-এর ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে সেই দোদুল্যমানতা নব্য শাসকশ্রেণিকে সুবিধে করে দেয় সমাজকাঠামো অপরিবর্তিত রাখতে। সাম্প্রতিক ভারতের কৃষক আন্দোলন ইতিহাসের এই পাঠগুলিকে মনে রাখুক। কৃষি আইন বাতিলের দাবি শুধুমাত্র পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকদের নয়, রাজধানীতে বিক্ষোভরত কৃষকদের নয়, বরং সারা ভারতের। শ্রমিকের। দোদুল্যমান মধ্যবিত্তেরও। কারণ, সঙ্কট অস্তিত্বের। ডান হাত মুখে তোলার। ফ্যাসিবাদী সরকার জাতীয়তাবাদের সিডেটিভ গিলিয়ে কৃষি আইন ২০২০ বলবৎ করতে চাইবেই। কৃষকেরা অনড় থাকছেন তা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে। আধা-সামন্ততান্ত্রিক, আধা-ঔপনিবেশিক ভারতে এই প্রতিবাদ ক্রমশ প্রতিরোধে পরিণত হোক পুরনো ত্রুটিবিচ্যুতিকে সারিয়ে। কৃষিকে অক্ষ করে আগামীদিনে এই বিক্ষোভ বিপ্লবে পরিণত হবে কিনা, তা সময় বলবে। আমরা যেন অন্তত ‘চাষাদের উৎপাত’ বলে তা এড়িয়ে না যাই, কারণ, ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপদাপন্ন’ এবং সেই বিপদ ফ্যাসিস্ত সরকার, কর্পোরেট পুঁজি আর মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া আঁতাতের বাস্তবতা।

[1] Report of the Committee on Doubling Farmers’ Income, Document prepared by the Committee on Doubling Farmers’ Income, Department of Agriculture, Cooperation and Farmers’ Welfare, Ministry of Agriculture & Farmers’ Welfare, August 2017
[2] Socio Economic and Caste Census 2011, Department of Rural Development, Ministry of Rural Development, Government of India
[3] “কৃষিতে এ বার ছাপোষা ফড়েদের জায়গা নেবেন রাঘববোয়ালরা!”, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০।
[4] “India’s deepening farm crisis: 76% farmers want to give up farming, shows study”, Down to Earth, 12th March, 2018

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3165 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...