বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা দিয়ে শুরু, এবার অমিত শাহের নীচে রবীন্দ্রনাথ

শৈলেন সরকার

 


গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

যাক এতদিনে বাংলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সোনার বাংলা তাহলে তৈরি হতে যাচ্ছে সত্যি। বাংলায় সোনার খনি নেই কোথাও। যা আছে বৌদি-মাসিমা-দিদিমাদের হাতে আর গলায়। অলঙ্কার হিসাবে। তারা তো আর একটা গোটা দেশকে মুড়ে ফেলার জন্য সোনা দেবেন বলে অলঙ্কার জমাননি। বড়জোর নিজের মেয়ে বা নাতনির বিয়েতেই তা দেওয়া যেতে পারে। অথচ বাংলার কবিরা কয়েকশো বছর ধরতে গানে আর কবিতায় ‘সোনার বাংলা-সোনার বাংলা’ লিখে লিখে হয়রান। রবীন্দ্রনাথ তো একেবারে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বলে এমন গান লিখে ফেললেন যে পাশের বাংলাদেশ তা একেবারে জাতীয় সঙ্গীত করে ফেলল। যে দেশে সোনার খনিই নেই কোনও, সে দেশের পক্ষে ‘আমার সোনার বাংলা’ বলা যে কত বড় বাতুলতা তা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন হীরক রাজের মন্ত্রী অমিত শাহ। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে নির্বাচনী প্রচারে এসে। আক্ষরিক অর্থে তিনি শুধু হীরক রাজের মন্ত্রী নন, দোসরও। আর দুজনেই হীরে কাটার রাজ্যের লোক। অতি সম্প্রতি ছ ফুটের বল্লভভাই প্যাটেলকে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে ছশো ফুটের বল্লভভাই বানিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁরা কোনও দেশকে সোনা দিয়ে গড়তে চাইতেও পারেন। আর বলতে কি, মহানুভবতা দেখুন, নিজের রাজ্যকে সোনা দিয়ে গড়তে না চেয়ে গড়তে এসেছেন বাংলাকে।

২০১১-১২তে অমিত শাহ আর তার দোসর নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে উইকিপিডিয়ায় লেখা ছিল, অমিত শাহ বিকম পাশ করে এক গ্রামীণ পত্রিকার সাংবাদিকতার কাজ করছিলেন, আর তখনই আলাপ নরেন্দ্রভাই মোদির সঙ্গে। নরেন্দ্রভাইয়ের উচ্চাকাঙ্খা ছিল রাজনীতি নিয়ে, আর অমিত শাহের বুদ্ধি। সেখানেই যাত্রা শুরু। এবং উত্থান একেবারে ঝড়ের বেগে, আর রাজনৈতিক নেতা হওয়ার সব যোগ্যতাই তাদের দ্রুত আয়ত্তে। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্রভাইয়ের বিরুদ্ধে তারই মন্ত্রীসভার ক্রীড়ামন্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ ছিল। হত ক্রীড়ামন্ত্রীর পরিবারের দিক থেকেই অভিযোগ করা হয়েছিল। কী আশ্চর্য উইকিপিডিয়ায় অমিত-মোদির সেই পরিচয় আর নেই। পালটে গেছে। অমিত শাহের বিরুদ্ধেও ইশরাত জাহান হত্যার অভিযোগ, গ্রেফতার। এরপর জামিনের আবেদন এবং আবেদন নাকচ এবং সেই বিচারপতি লোয়ার রহস্যজনক মৃত্যু। তাতে কার কী? বিচারব্যবস্থা আছে না? আছে সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, স— ব,  সবকিছুই আমাদের—। তোমরা আমার টিকিটিও—।

কদিন আগে নন্দীগ্রামের এক সভায় জনৈক শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন হীরক রাজ্যের আন-বান-শান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী—  না তাকে ভগবান বলেননি এখনও, বলেছেন, ‘আমার দাদা’। বলেছেন ‘দাদা’ অমিত শাহের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আজকের নয় যে, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ এলে দিলীপ ঘোষ নিজের দিকে ঝোল টানবেন। বলবেন, আমি সেই কবে থেকে হীরক রাজের দরবারে রাজা আর মন্ত্রীর নুন খাচ্ছি, আর কালকের যোগী কোন ‘অধিকারী’ পার্টিতে ঢুকে ‘ভাতেরে ক’বে পেস্যাদ’। সেই দিলীপ ঘোষের মুখের উপর জবাব দিতেই ‘অধিকারী’ মহাশয় বলে রাখলেন ‘আমি কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে দাদার সঙ্গে সঙ্গে আছি।’ হ্যাঁ, দাদাই ‘ওপেনলি’ পার্টিতে ঢুকতে বারণ করেছিল তখন। হ্যাঁ, ওপেনলি দাদার পার্টিতে না ঢুকে ‘সিক্রেটলি’ ফোপড়া করে দাও দিদির বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে। কমগুলি বছর তো নয়, টানা ছ বছর ‘সিক্রেটলি’। না, মীরজাফর বলে আমাকে খাটো করবেন না। মীরজাফর ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন স্রেফ যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহার না করে বিদেশি শক্তির জয়ের রাস্তা তৈরি করে দেওয়ার জন্য। তা যেমন মারাঠা সেনাপতি রঙ্গোজি প্রথম ভোঁশলের বিরুদ্ধে ১৭৪৭ সালের বাংলার আলিবর্দি খানের লড়াইয়ের সময়, তেমনি ঠিক ১০ বছর পর ১৭৫৭-র পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার লড়াইয়েও। ‘আমি কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে একের পর এক নির্বাচনে, বিশেষ করে ২০১৯-এর— বাংলার সরকারে থেকে হীরক রাজার মন্ত্রী ‘দাদা’কে গোপনে ‘দিদির’ সরকারের সব খবর, ‘দিদির’ দলের সব খবর জানিয়ে—। মানে দিদির বিশ্বাসযোগ্য পর্যবেক্ষক হওয়ার সুযোগ নিয়ে জেলায় জেলায় গোটা দলটাকেই দাদার কাছে—। ২০১৯-এর পশ্চিমবঙ্গে দাদার দলের একেবারে ভুশ্‌ করে জেগে ওঠা কি এমনি এমনি? খামোখাই দাদা নিজে তাঁর পাশে আমাকে দাঁড় করান? কত রিস্কে কতগুলি বছর ধরে চরবৃত্তি করে খেয়েছি বলুন। জেমস বন্ডও ধরা খেয়ে যেতেন। শেষে দাদার কথায় ‘প্রোমোশন’-এর ভরসা পেয়ে—।’

রবীন্দ্রনাথকে তাই নীচেই রাখুন। মানে আমাদের দিলীপ ঘোষ তো বলেই রেখেছেন, বাঙালি? বাঙালি আবার বাংলার ভালো করল কবে, করেছে তো বাংলার বাইরের লোকেরা। এই ধরুন গুজরাট, ইউপি, বিহার। রবীন্দ্রনাথকে তাই নীচে একেবারে হালকা রেখায় সেরে দিয়ে মাথার ওপর একেবারে কালারিং ‘দাদা’। হ্যাঁ এক্কেবারে রবীন্দ্রনাথের নিজের ঘর শান্তিনিকেতনেই। হ্যাঁ, মারবি তো মার একেবারে বাঘের ঘরে ঢুকেই। বিদ্যাসাগরকে মার বিদ্যাসাগর কলেজেই, আর রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতনে। তবে তো মজা!

শান্তিনিকেতনে র‍্যালিতে বা সভায় গণ্ডগোলের আশঙ্কায় দুই ছাত্র সোমনাথ সাউ আর ফাল্গুনী পানকে গৃহবন্দি রাখতে হল। তা গণতন্ত্রের জন্য এটা তো করতেই হয়। কেননা অশীতিপর কবি ভারভারা রাও-এর থেকেই যেখানে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে, বা অশীতিপর সমাজকর্মী অ্যালঝাইমার আক্রান্ত ফাদার স্ট্যানকেই যেখানে  জামিন দেওয়া যায় না, সেখানে দুটি ছাত্র তো জীবন্ত বোমাই একেবারে। কবি-লেখক-শিল্পী বা ছাত্রদের কাছ থেকে শুধুই মৃত্যুর আশঙ্কা। ব্যাটাদের ম্যানেজ করা কঠিন খুব। দিল্লির জওহারলাল নেহরু বা জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার বা কলকাতার যাদবপুরের ছাত্রদের নিয়েই—, ছাত্র মানে তো মাওবাদীই। আর বাংলায় তো এমনিতেই গিজগিজ মাওবাদীতে, তার উপর রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী বলে কথা, রিস্ক নেবে কে? বাংলার মানুষগুলির আবার সংস্কৃতি নিয়ে খুব জাঁক। এখানকার কবি-লেখক-শিল্পী-সমাজকর্মী-বুদ্ধিজীবীদের কেমন কায়দা করা যাচ্ছে না কিছুতেই। কিছু বাঙালি রাজাকার অবশ্য আশা দিয়েছে, হবে, সব হবে। রাজাকার বুঝলেন না? ওই যে ওপার বাংলার ’৭১-এর যুদ্ধে আগ্রাসী পাক-বাহিনীর সমর্থনে যে বাঙালিরা নিজেদের ভাই-বোন-মা-বাবা বা আপনজন বাঙালিদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরেছিল— তেমনি আর কি! ভাগ্যিস এরা সব দেশে সব কালেই থাকে ডুবে ডুবে। এই যেমন দিলীপ ঘোষ বা মুকুল, শুভেন্দু। কিছু অর্থ কিছু পদ হলেই—। এরাই বলছে হবে হবে সব হবে। আসবে সবাই। এখানেও হবে, একবার শুধু জাঁকিয়ে বসুন, দেখুন আপনাদের দুজনকে নিয়ে এরাই যাত্রাপালা লিখবে। পুরস্কারের প্রত্যাশায় গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেই গুজরাট গিয়ে আপনার নাতির বাজার করে দেবে। বঙ্গশ্রী উপাধি দেবে। সব হবে। এক বঙ্গসন্তান আমাদেরই আর এক ‘দাদা’ সৌরভ দিচ্ছে তো, অমিতভাইয়ের ছেলে জয়ভাইয়ের হাতে নাচছে কেমন দেখুন।

ভালো কথা, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পর মোদিজি কী বলেছিলেন মনে আছে? বলেছিলেন, এক্কেবারে একই জায়গায় বিদ্যাসাগরজির পঞ্চধাতুর মুর্তি বানিয়ে দেব। ‘পঞ্চধাতু’, মোদিজির মহত্ব কল্পনা করা যায়? ছিল তো সস্তা পাথর বা মাটির কিছু, সে জায়গায় পঞ্চধাতু। পঞ্চধাতু মানে কিছু সোনা তো থাকতই। কিন্তু বাঙালিকে বোঝাবে কে? সেই মাটি বা পাথর।

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ নিয়ে অমিতভাইয়ের বক্তব্যটা দেখুন। কী উদারতা! বললেন, রবীন্দ্রনাথকে নোবেল দিয়ে নোবেল পুরস্কারই তার মহত্ব বাড়িয়েছে। আহ্‌, এত বড় আর একেবারে ঠিকঠাক কথাটা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আগে কে কবে বলেছে বলুন? না না, অহেতুক বাত্রা সাহেবের কথা তুলে এই মুহূর্তে গণ্ডগোল পাকাবেন না, বা সুব্রাহ্মনিয়ম স্বামীর কথা এনে জল ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না। কী বলেছেন স্বামী? বলেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সঙ্গীতটি অর্থের দিক থেকে সঙ্কীর্ণ, ভারতের নবীন প্রজন্মের ইচ্ছা এটি পালটানো হোক। হ্যাঁ, উনি তো আমাদের পার্টির, ঠিকই,। কিন্তু পার্টির আসল মানে দুই দাদা আর বড় ভাই মোদি-শাহের কথাই বলছি— তাঁরা কী বলেছেন? বলেননি, মুখ ফুটে কিছুই বলেননি কিন্তু তাঁরা, বলেছে এক সুব্রাহ্মনিয়ম স্বামী। বা বাত্রা মানে দীননাথ বাত্রার কথাই ভাবুন, কী বলেছেন উনি? বলেছেন, না থাক আগে ওঁর পরিচয়টাই বরং দেওয়া যাক। উনি হলেন আমাদের মোদি-শাহ জুটির খুবই নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত— ওই বাংলার যেমন সংস্কৃতি সংস্কৃতি করা মানুষ—। উনি আবার আমাদের পালের গোদা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্বীকৃত ‘শিক্ষা সংস্কৃতি উত্থান ন্যাস’-এর প্রধান। কী বলেছেন উনি? বলেছেন মানে প্রস্তাব দিয়েছেন এনসিইআরটি-কে। দেশের স্কুল কলেজের টেক্সট বইগুলির অনেক কিছুই পাল্টাতে হবে। অনেক কিছুই মানে যা কিছু ‘বেসলেস অ্যান্ড বায়াস্‌ড’। প্রস্তাবগুলি শুধু রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নয়, প্রস্তাবে থেকে না থেকে আছেন অনেকেই। বাত্রা সাহেবের মতে, ‘বিপ্লবী কবি’ পাশ-এর কাব্য থেকে সব ইংরেজি, উর্দু, আরবি শব্দ বাদ দিতে হবে। বাদ দিতে হবে মির্জা গালিবের দুটি কবিতা, বাদ দিতে হবে শিল্পী এমএফ হুসেনের আত্মজীবনীর নির্বাচিত অংশ। আর বাদ দিতে হবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনার গোটাটাই। হ্যাঁ গোটাটাই। গোটা চিন্তাভাবনা বলতে তো বাত্রা সাহেব আড়াল করেননি কিছু। একজন কবি বা লেখকের কবিতা বা গল্প-উপন্যাসই তো তাঁর তাঁর চিন্তাভাবনার ফসল। হ্যাঁ, বাদ দিতে হবে গোটা রবীন্দ্রনাথকেই। এতে ধোঁয়াশা নেই কোনও। আর নজরুল? হ্যাঁ, ওই যে আর এক বিপ্লবী কবি পাশ-কে নিয়ে বলা কথাগুলি? বাদ দিতে হবে সব ইংরেজি-উর্দু-আরবি শব্দ, হ্যাঁ নজরুলের ক্ষেত্রে তো আর অন্য কিছু হবে না। অর্থাৎ ইংরেজি-উর্দু-আরবি শব্দ বাদ দিয়েই নজরুলের কবিতা পড়তে হবে, মানে স্পষ্ট করে বললে, বাদ। বাদ, বাঙালি বাদ। না এখন বলা যাবে না কিছু। সামনে ২০২১-এর নির্বাচন। চিন্তাভাবনার উদারতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা  বামপন্থী জ্ঞানচর্চার শেষ দূর্গ পশ্চিমবঙ্গের দখলদারী নিই আগে। তারপর শালাদের—। হ্যাঁ হ্যাঁ, এই বাঙালিদেরই, একেবারে টিপে টিপে মারব। সংস্কৃতি নিয়ে জাঁক বের করব। বিদ্যাসাগরের মুর্তি ভাঙা বা নির্বাচনী সফরে এসে ‘দাদা’র একেবারে পদতলে হালকা রেখায় বিশ্বকবিকে রাখা কি এমনি? যে পার বুঝে নাও। বিদ্যাসাগর কলেজেই ভাঙো বিদ্যসাগরকে, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনেই রবীন্দ্রনাথের ওপরে রাখো অমিত দাদাকে। হ্যাঁ, অমিত শাহ বা মোদীর তুলনায় রবীন্দ্রনাথ যে কত তুচ্ছ, এটা বোঝানোর জন্য দাদাকে কালারিং-এ এঁকে দাদার পায়ের নীচে রবি-কবিকে দাও হালকা রেখায়, যাতে দাদার তুলনায় কবির তুচ্ছতা স্পষ্ট হয়।  ব্যাটাদের জাঁক খুব সংস্কৃতি নিয়ে, শালাদের একেবারে নিজের ঘরে ঢুকিয়ে—। মানে বাংলাতেই।  মুকুল, দিলীপ, শুভেন্দুদের মতো কিছু জিনিস আমাদের হাতেই। কিছু অর্থ, কিছু পদ। ব্যস। রাজাকাররা সব যুগে, সব দেশে একেবারে তৈরিই থাকে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3050 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...