বর্তমান কৃষক আন্দোলন হোক লড়াইয়ের নতুন ভাষা

সুমন সাধু   

 




কবি, গদ্যকার, সম্পাদক

 

 

 

চরম ফ্যাসিজম এবং অমানবিক ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ। এখানে দাঁড়িয়ে দু-বেলা খেটে খাওয়া আটপৌরে সাধারণ মানুষ। তাঁদের সিদ্ধান্ত রাজার সিংহাসন নড়িয়ে দেয় বৈকি! ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ধ্বজাটি নুইয়ে পড়ে চাষাবাদের নরম মাটিতে। জমি উর্বর হয়। আবার অনেকসময় কয়েকটা ভুল সিদ্ধান্তও মানুষকে পিছিয়ে দেয় বুনো আদিমের দিকে। ১৯২৭ সালের কথা। প্যারিসে বারব্যুস, রোমা রোল্যাঁর নেতৃত্বে প্রথম ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন। ভারত থেকে একমাত্র সই করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও বিশ্বশান্তি রক্ষা হয়নি। পশ্চিমের বাতাস আরও বিষিয়েছে। ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের পর রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ জানালেন কবিতায়। লিখলেন, ‘আফ্রিকা’।

এসো যুগান্তের কবি,/ আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে/ দাঁড়াও, ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;/ বলো ‘ক্ষমা করো’/ হিংস্র প্রলাপের মধ্যে/ সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।

জমিদারি দেখভালের সুবাদে রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষির উন্নতি হলেই দেশের উন্নতি ঘটবে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, কৃষির উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। ক্ষমতার শীর্ষে বসা জমিদারকে বলেছেন, ‘জমির জোঁক’, ‘প্যারাসাইট’ বা ‘পরাশ্রিত জীব’। শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে আয়োজন করেন ‘হলকর্ষণ’, ‘বৃক্ষরোপণ’, ‘নবান্ন’। আমরা কৃষিব্যবস্থা এবং কৃষকদের নিয়ে এই ভাবনাচিন্তার কথা ভুলব না। ভুলব না বলেই তো প্রতিটা যুগে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা। মনে করিয়ে দেওয়া, একমাত্র কৃষিই সমাজগঠনের কারিগর। তাই লড়াইমনস্ক মানুষ তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে হেঁটে চলে প্রতিটা শতকে।

মানুষ হাঁটছে। এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত৷ মানুষ কথা বলছে। প্রতিবাদ করছে। গান গাইছে। কবিতা লিখছে। ছবি আঁকছে। এ দেশে এখন শীতকাল। ঠান্ডায় জুবুথুবু হয়ে হাজার হাজার কৃষক প্রতিবাদ জানাচ্ছেন প্রকাশ্য রাস্তায়। চিৎকার করছেন এই বলে, “হেই সামালো ধান হো/ কাস্তেটা দাও শাণ হো/ জান কবুল আর মান কবুল/ আর দেব না আর দেব না/ রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো …”। এই গণ-আন্দোলনে ভয় পাচ্ছে ক্ষমতার সিংহাসন।

এ এক বিরাট জমায়েত। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই। ভারতবর্ষের অন্যতম বৃহৎ কৃষক আন্দোলন। ভিতের নিচে নরম মাটি। তাকে আরও আরও উর্বর করতে হবে। জান কবুল আর মান কবুল। কসম খাওয়া দেশের চিত্র। নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার সাফচিত্র। আর রক্তে বোনা ধান।

দিল্লিতে কৃষকদের এই আন্দোলনে দেখা গেল পাল্টে ফেলার মানচিত্র। এই পাল্টে ফেলা কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই সীমানা পেরনো। ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আগে থেকেই অনুমান করে নেওয়া, এবং সেই অনুমানকে কেন্দ্র করে ঘৃণ্য রাজনীতি। যেমন, কারও পোশাক দেখে বিচার করা তার জাত কী, কারও পাতে খাবার দেখে বিচার করা তিনি কি উচ্চবর্ণের নাকি দলিত! ড্রেন পরিষ্কার করা ছেলেটা বা টোটো চালানো মেয়েটাকে দেখে ধরে নেওয়া হচ্ছে তাঁর পুঁথিগত শিক্ষা কতদূর। বাবুমশাইরা ভুলে যান, এ দেশে শিক্ষার মান কতটা নিম্নমুখী। আন্দোলনরত কৃষকরা হাঁটছেন এই ‘অনুমান’ করে নেওয়ার বিপরীতে। তাঁরা গান গাইছেন, তাঁরা শায়েরি পাঠ করছেন, তাঁরা জিনস পরছেন, পিৎজা খাচ্ছেন, ইংরেজিতে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতা সেসব কিছুতেই মানতে চাইছে না। সামান্য কৃষক তাঁরা। এত শিক্ষা কোত্থেকে অর্জন করলেন! তাঁদের তো পিৎজা খাওয়ার কোনও অধিকারই নেই। অতএব তাঁদের মুখ বন্ধ করো, থামিয়ে দাও।

পারছেন। ফ্যাসিবাদের মুখে একরাশ করুণা ছড়িয়ে তাঁরা সোচ্চার হচ্ছেন। বলছেন, আমরাই পারি। আমাদের অবহেলা করলে দু-দিন পর খাবে কী? রবীন্দ্রনাথ একসময় বলেছিলেন, “ডাক দিয়ে যাই,/ দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে,/ প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।” কৃষকের রঙের নাম ফসল। কিন্তু সভ্যতা যত এগিয়েছে কৃষকদের শ্রেণিসংগ্রাম তত বেশি বেড়েছে। এই একবিংশ শতকেও তাই বেশি করে প্রাধান্য পাচ্ছে ঘেমো গন্ধের ওই তরতাজা শস্যগুলো। বারবার বলতে হচ্ছে, ওদের দিকে তাকাও। ওরাও তো মানুষ। কৃষকরা কারও করুণার পাত্র নন। কারণ ওরাই সমাজের ভিত। আর ভিত যখন নড়বড়ে হয়, শক্ত বাড়িও যে-কোনো সময় ভেঙেচুরে পড়তে পারে।

সেই মেঠো পথ। সেই জরাজীর্ণ আহত গাছ। আগুন ঘরানার গানে হিম হাওয়া। সেই ধুলোপড়া হাইওয়ে। দূরের বসতবাড়ি থেকে ভেসে আসা “ধরতি মাতা কি জয়”। এমনই ডিসেম্বরের দেহ। কী শীতল। আমাদের নিশ্বাস পৌঁছে যাচ্ছে তোমাদের গা-গতরে। এমনই রাতের স্বরবিতান। উঠে আসছে ছেঁড়া চুল, ছেঁড়া দাড়ি। আমাদের ভাইয়ের নাম কিসান। হাজার হাজারের গায়ে লেখা থাকছে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”।

কৃষক আন্দোলন হোক লড়াইয়ের নতুন ভাষা। যা আদর করে আপনার মুখে ভাত তুলে দেবে আজীবন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...