সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে…

বিবেক দেব

 

সমাজভাবুক, অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক

অদ্ভুত এক আঁধার এসেছে।

মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ আর কতখানি অধঃপতনকে সহ্য করবে। কতখানি মনুষ্যত্ব হারিয়েও সে নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দেবে। কতখানি শিরদাঁড়া বিকিয়েও সে নিজেকে মেরুদণ্ডী বলে চিহ্নিত করবে। জনৈক মার্কিন গায়িকা কেবল সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন করেছিলেন, ভারতবর্ষের কৃষক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে, যে “এই নিয়ে কেন আমরা আলোচনা করবো না?” তিনি কোনও পক্ষের প্রতি সমর্থন জানাননি। কেবল ‘আলোচনা চেয়েছিলেন’। কেবল সেই চাওয়াটুকুর মধ্যে দিয়েই তিনি বিশাল এই দেশের ‘জাগ্রত বিবেক’কে সহসা পুনঃ(?)জাগরিত করেছেন। সেই ‘যৌনগন্ধী’ গায়িকার বক্তব্যের উপর, মহান ভারতবর্ষের মহাশক্তিধর বিদেশমন্ত্রালয় অবধি বিবৃতি জারি করে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহির্শক্তির অনুপ্রবেশ’-এর বিরুদ্ধে ‘কড়া প্রতিক্রিয়া’ জানিয়েছে।

আড়াই মাসের কাছাকাছি সময় অতিক্রান্ত, কৃষক-জনতা এই শীতার্ত রাতগুলোয় খোলা আকাশের নীচে তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন। দেড়শোর উপরে কৃষক শহীদ হয়েছেন। একাধিক বার তাঁরা কেন্দ্রীয় শাসক দলের নিষ্ঠুর আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন। কই, তখন তো এই ‘জাগ্রত বিবেক’-এর সাড়া পাওয়া যায়নি? আজ, জনৈক মার্কিন গায়িকার ‘আলোচনার প্রস্তাব’ তাঁদের কাছে এতটাই অরুচিকর মনে হল যে, ‘নারীবাদী’, পদ্ম-সম্মানে ভূষিতা, নারীর ক্ষমতায়নের স্বঘোষিত আইকন জনৈকা বলিউডি অভিনেত্রী সেই গায়িকার সম্পর্কে ‘যৌনগন্ধী’র মতো বিশেষণ ব্যবহারেও পিছপা হলেন না। সামাজিক মাধ্যমে কুৎসিত কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ির মধ্যে দিয়ে আমাদের মহান দেশের মহান সংস্কৃতির যে অসামান্য রূপটি উন্মোচিত হল, সেই বিষয়ে কিছু লিখতে গেলেও আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। কুৎসিত ব্যক্তিগত আক্রমণে আমাদের ‘নারীবাদী’ (শাসকপন্থী) নেতৃত্ব যে কতখানি সিদ্ধহস্ত তার প্রমাণ পেতে গেলে পদ্মশ্রী কঙ্গনা রনৌতের কয়েকটি মাত্র ট্যুইট দেখলেই বিষয়টি জলের চেয়েও পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিশোরী পরিবেশ-কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ (২০২১ সালের নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য যার নাম আজ বিবেচিত হচ্ছে), তাকেও কেন্দ্রীয় শাসকনেতাদের যে কুৎসিত আক্রমণের মুখে পড়তে হল তাতে বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা যে কতখানি হেঁট হল তা বুঝবার মতো মস্তিষ্ক আমাদের নেতৃমণ্ডলীর বোধহয় নেই। গ্রেটা অবিশ্যি তারপরেও ট্যুইট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, শত ব্যক্তিগত আক্রমণ সত্ত্বেও সে কৃষক আন্দোলনের প্রতি সমর্থন থেকে পিছু হটছে না। শিরদাঁড়া-বিহীন ক্রিকেটারদের লজ্জিত হওয়া উচিত।

সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে…

আজ এই কবিতার লাইনগুলোকেই মনে পড়ছে খুব। কিছুকাল আগে অবধি, কেন্দ্রীয় শাসকদলের ‘আইটি সেল’-এর কর্মীরা যখন এক নাগাড়ে একই ট্যুইট-বক্তব্য অন্ধের মতো শেয়ার করে চলতেন, আমরা তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি করতাম। আমরা অবাক হয়ে তখন দেখেছি, ‘আইটি সেল’-এর কর্মীরাই একেকসময়ে নিজেদেরকে দল বেঁধে ‘দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান’ বলে পরিচয় দিচ্ছেন। হাজার হাজার কর্মী যেন কোন মন্ত্রবলে, ‘ছপাক’-এর মতো ‘দেশবিরোধী’ সিনেমার ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের একই হলের এই সংখ্যার টিকিট কেটেছেন, এবং সেই টিকিটকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন— এমন সমস্ত দারুণ কমেডি-নাটককে আমরা ট্যুইটারের পর্দায় জমিয়ে উপভোগ করেছি। কিন্তু রিহানার ট্যুইট-কাণ্ডে যে আশ্চর্য হাস্যকর পরিস্থিতির আমরা সম্মুখীন হলাম তার বোধহয় আর কোনও দ্বিতীয় উদাহরণ পাওয়া যাবে না। #ইন্ডিয়াএগেনস্টপ্রোপাগান্ডা বক্তব্যে, হুবহু মিলে যাচ্ছে অভিনেতা অক্ষয় কুমার এবং এ্যাথলিট সাইনা নেহওয়ালের বক্তব্য। লতা মঙ্গেশকর এবং শচীন তেন্ডুলকরের মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বকেও মাথা নোয়াতে হয়েছে ‘সর্বশক্তিমান’-এর ইচ্ছার কাছে।

মানুষ বলছে, যত যাই হোক— আসলে তো তিনি ‘মুম্বাই ইন্ডিয়ানস’-এর বেতনভুক কর্মচারী মাত্র। হ্যাঁ মাননীয় তেন্ডুলকর সাহেব, অনেকের মতো আপনিও আমার আইডল ছিলেন। কিন্তু, যে আইডল— হাথরস পরবর্তীতে, গৌরী লঙ্কেশ পরবর্তীতে, কুলদীপ সেঙ্গার পরবর্তীতে, রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ হয়েও ‘আমি ক্রিকেটার মাত্র’ এই যুক্তিতে কোনওরকমের কোনও বিবৃতি দেওয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন, আজ জনৈক ‘যৌনগন্ধী’ গায়িকার ট্যুইটের তাড়নাতে সহসা তাঁর বিবেকও কেমন জাগ্রত হয়ে উঠল। আমাদের ভাবতেও লজ্জা হয়। আমাদের বলতেও লজ্জা হয় যে, বিশ্বখ্যাত একটি সংবাদপত্রে রিহানা-প্রমুখের বিরুদ্ধে ভারতীয় ‘সেলিব্রিটি’দের এই নজিরবিহীন আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হয়েছে যে, “ভারতবর্ষের মোদি-ভক্ত চিত্তবিনোদনকারীরা (পড়ুন ‘এন্টারটেনার’রা) রিহানা-প্রমুখের বক্তব্যের বিরুদ্ধে ট্যুইটারে সরব হয়েছেন।”

সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে …

একটা সময় অবধি ভাবতাম গৌরী লঙ্কেশ অথবা মহম্মদ আখলাক— আমার দেশ নয়। তারা ব্যতিক্রম। আমার দেশের মাটিতে গণপিটুনির ঘটনাকে ব্যতিক্রম ভাবতে ভালো লাগত তখন। বাবরিকে ব্যতিক্রম বলে ভাবতে ভালো লাগত। কিন্তু ক্রমশ তারপরেও, বয়স যত বেড়েছে— অবাক হয়ে দেখেছি গজাল পোঁতা হয়েছে দিল্লির রাজপথে— যেন ‘সেনা-সমাবেশ’ ঘটেছে রাজধানীর সীমান্তে, কৃষক আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াতে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে, প্রজার বিরুদ্ধে রাজার এই সশস্ত্র অভিযান। কুৎসা, অপপ্রচার, নিপীড়ন, সরকারি সমস্ত সংস্থাকে নির্লজ্জ ব্যবহার, সংবাদমাধ্যমের উপরে নির্মমতম আক্রমণ। আর কতখানি অধঃপতন দেখব? আর কতবার শুনতে হবে জেলবন্দি অশীতিপর সমাজকর্মীকে হাত কাঁপে বলে জলের গেলাস ও স্ট্র ব্যবহারের অনুমতি চাইতে দিনের পর দিন কোর্টের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে? মানবাধিকার! বাকস্বাধীনতা! বিরোধীকণ্ঠের প্রতি উদার মনোভাব! বৃহত্তম গণতন্ত্রের উদযাপন!

আমার দেশ আজ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানবাধিকারের কথা ভুলে গিয়ে মানুষ, এমনকি স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত গুণীজনেরাও অন্ধ দলদাসত্বের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, অথবা নামতে বাধ্য হয়েছেন। এই সময় এক অন্ধকার সময়।

দেড়শোর উপরে কৃষক শহীদ হয়েছেন। ৭০দিন অতিক্রান্ত। সিংঘু সীমান্তে, গাজিপুর-গাজিয়াবাদের সীমান্তে লাখো কৃষকের সমাবেশ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। দেশের রাজধানীর উপকণ্ঠে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এর ফলে অসুবিধেয় পড়েছেন, তবু কৃষক আন্দোলনের প্রতি তাদের সহমর্মিতাকে ক্ষুণ্ণ করা যায়নি। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতবর্ষের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এমন একটা সময়ে, স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, বরিষ্ঠ গুণীজন যাঁরা, তাঁদের নীরবতাও বরং ভালো ছিল বোধহয়। শিরদাঁড়াকে বিকিয়ে দেওয়ার এমনতরো নির্লজ্জ উদাহরণ, বিশ্বের দরবারে তাঁরা আজ না স্থাপন করলেই পারতেন। এর চেয়ে তাঁদের নীরবতাও শোভন ছিল।

“সবাই দেখছে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে …”— একজনও এমন কেউ নেই, যে বলবে, “রাজা তোর কাপড় কোথায়!” যারা বলতে পারত তাদেরকে ব্যারিকেডে ঘেরা হয়েছে, গজালে আটকানো হয়েছে। কেবল শত-শহীদের ঘাম-রক্ত-অশ্রুতে সাজানো রাজপথে অক্ষরে উৎকীর্ণ হয়েছে লিখন:

যাকে তুমি মৃত্যু বলো, যাকে তুমি বলো শেষ, সমূল পতন,
আমি তার গভীরে লুকোনো বিশ্বাসী বারুদের চোখ দেখে বলি,
এইসব মৃত্যু কোনো শেষ নয়, কোনো বিনাশ, পতন নয়…

এই সব মৃত্যু থেকে শুরু হয় আমাদের সূর্যময় পথ,
এই ফাঁসির মঞ্চ থেকেই আমাদের যাত্রার শুরু।

[‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’, রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লাহ, ১০ই জুলাই, ১৯৭৭]

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...