কৃষকদের পাশে থাকি, তাঁদের বিরুদ্ধে নয়— প্রজাতন্ত্রের এটাই লক্ষ্য হোক

জয়জিৎ দাস

 





‘ডাউন টু আর্থ’ পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক জয়জিৎ দাসের এই লেখাটি গত ২৭ জানুয়ারি ডাউন টু আর্থ-এ প্রকাশিত হয়।

 

 

 

 

২০২১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস এক বিস্ময় হয়ে দেখা দিল। দিল্লির রাজপথে প্যারেড যথাযথভাবে বর্ণময় এক পরম্পরাকে বহন করে সংঘটিত হলেও, দিল্লি সীমান্তে হাজার হাজার কৃষক জমায়েত হয়েছিল পূর্বনির্ধারিত ট্রাক্টর র‍্যালির জন্য। দুপুরের মধ্যে তাঁদের মধ্যে কেউ পরিকল্পিত পথনির্দেশ অগ্রাহ্য করে পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে মেতে মূল দিল্লিতে ঢুকে শেষমেশ কেউ কেউ লালকেল্লায় পতাকা পর্যন্ত টাঙিয়ে এলেন।

তারপর থেকেই গণমাধ্যম দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ফোকাস অন্য দিকে ঘুরে গেল। গত বছরে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের সময় কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি আইন বলবৎ করার প্রয়োজনীয়তা থেকে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিক্ষোভের যৌক্তিকতার দিকে বিষয়টি ঘুরে গেল।

বড় বড় তুলির টানে একটা পুরো জাতি এবং শ্রেণিকে একটি বিশেষ রঙে চিহ্নিত করে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকল এবং সেই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে কাউকে পৃথক করে অণুবীক্ষণের নিচে আনা হল। রাজধানীর রাস্তায় কিছু ঘণ্টার একটি অরাজক পরিস্থিতির জন্য জনমত সংগঠিত করার এক করাল ব্যবস্থায় এই প্রতিবাদকে ফেলে দেওয়া হল।

বেশ কিছু দশক ধরে কৃষকদের কথা বলে আসা দেশের এক বরিষ্ঠ সাংবাদিক প্রায়ই বলেন, ভারতে সবসময় ঘটনার পরম্পরায় কিছু হয়ে আসছে, প্রক্রিয়ার পরম্পরায় নয়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটল। কয়েকযুগ থেকে চলে আসা দেশের কৃষি সঙ্কটকে প্রায় আড়ালে রেখে দিল একটি শহরের মাত্র ছ ঘন্টার বিক্ষোভ। যুক্তি, যদিও ঠিক বিপরীত দিকই দাবি করে। ভারতের অর্থনীতির ভিত্তিমূল সমগ্র প্রাথমিক সেক্টর অর্থাৎ কৃষক, কৃষি শ্রমিক কৃষি ব্যবসায়ী ইত্যাদির সমস্যাকে অন্ধকারে রেখে দিল ২০২১-এর ২৬ জানুয়ারি।

একজন কৃষকের দিক থেকে অবস্থাটা কোথায় দাঁড়িয়েছে?

গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিডিপি দিয়ে আর্থিক সচ্ছলতাকে পরিমাপ করা খুব আকর্ষক একটি প্রবণতা, সন্দেহ নেই। এই বিশ্বজনীন প্রবণতা অনুসরণ করে ভারতের একটি প্রভাবশালী অংশ জিডিপি গ্রোথ নিয়ে বড়াই করে থাকে। কিন্তু যা আড়ালে রেখে দেয় তা হল, এই অসম বৃদ্ধিও কিন্তু সম্ভব হয়েছে কৃষি ও কৃষিসংক্রান্ত পেশাগত সেক্টরগুলি ভারতকে স্বনির্ভর করে রাখার ফলেই।

এই খাবারের উৎপাদক কারা? তাঁরা কিন্তু নিপীড়িত হয়েই আসছেন। তাঁদের সংখ্যাটাও ক্রমশ বাড়ছে— কৃষিতে জড়িত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১২০ মিলিয়ন এবং কৃষি শ্রমিক পরিবারও প্রায় ১৪৪ মিলিয়ন সংখ্যক। এব্যাপারে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দোষ দিয়ে কোনও লাভ নেই, কারণ তা কিন্তু স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। বরং বলা ভালো, ভবিষ্যতে কয়েক দশক পরে, কাজ করার জন্য যত হাত পাওয়া যাবে তার চেয়ে ভাত পৌঁছনোর জন্য মুখের সংখ্যা হবে অনেক বেশি।

কর্ষণ করার জন্য যে জমি তাঁদের আছে, অবশ্যই সেসব কোনওভাবে বাড়বে না। মালিকানার খণ্ডীভবনের অর্থ এটাই যে এঁদের প্রায় ৮৩ শতাংশ এখন ছোট চাষির মধ্যে পড়েন এবং দেশে মোট ৪২ শতাংশ জমির মালিকানায় এঁদের অধিকার আছে। গড়ে এই পরিমাণ মাত্র ১.০৮ হেক্টর।

একটি সমীক্ষা বলছে, এক হেক্টর থেকে ৭৬৩৯ টাকা পাওয়া যেতে পারে, যা ইঙ্গিত করছে একজন সাধারণ চাষি কতটা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন এদেশে। তাঁর আয় না বাড়লেও (বলা ভালো, ক্রমশ কমলেও) দ্রব্যমূল্য কিন্তু সেই চড়াই থেকে যাচ্ছে, যা তাঁদের বেঁচে থাকাকে ক্রমশ অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে।

যেটুকু আয় অর্জিত হচ্ছে, তা কিন্তু মূলত বড় চাষিদের জন্যই। সমাজের ৮৫ শতাংশের মতো একটা বিরাট অংশ লভ্যাংশের মাত্র ৯ শতাংশ পাচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হবে যদি নাও ধরা হয়, তাহলেও বর্তমান চিত্রতেই পরিষ্কার, যে প্রত্যেক সেকেন্ডে একজন করে কৃষক ঋণের আওতায় পড়ছেন, যা ক্রমশ এক ভিশিয়াস সার্কেলের মতো শেষমেশ জীবনটুকুই কেড়ে নিচ্ছে— নব্বইয়ের দশকের মাঝবরাবর থেকে কৃষক আত্মহত্যা আসলে কিন্তু ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

সরকারের দিক থেকে দেখলে ব্যাপারটা ঠিক কীরকম?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক অন্য ছবি আঁকার চেষ্টা করছেন। তিনি, তাঁর মন্ত্রিসভা, তাঁর সহকর্মীরা উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে উৎসব করছেন, ইজরায়েল কীভাবে ড্রিপ ইরিগেশন থেকে উপকৃত হচ্ছে ইত্যাদি জ্ঞানের বহর ফলাও করে প্রচার করছেন এবং বাজার কিভাবে সমস্ত উপলব্ধ সমস্যাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসবে সেসব ব্যাপারে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করছেন।

কিন্তু ঘটনা যা অবিকৃত থাকছে তা হল—

প্রতিটি পরিবার থেকে পাওয়া প্রকৃত আয়ের হিসেবে কৃষক আয়ের দ্বিগুণ হওয়ার তাঁর সেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সময়সীমা থেকে মাত্র এক বছর বাকি আছে।

সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র ছ হাজার টাকা করে পরিবার পিছু দেওয়ার মতো মৌখিক ফাঁপা আশ্বাস দিয়ে এই প্রতিশ্রুতি কোনওভাবেই কিন্তু পূরণ করা সম্ভব না।

প্রাথমিক সেক্টরের মতো মৌলিক একটি ক্ষেত্রকে অক্ষত না রাখতে পারলে, দেশের সমগ্র অর্থনীতিই কিন্তু তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।

মোদি অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করা বরাবরই পছন্দ করেন। তাঁর কিছু কিছু উন্নত দেশের অর্থনীতির দিকে তাকানো উচিত যাতে বোঝা যায় তারা কিভাবে আত্মনির্ভর হয়েছে। সুনীতা নারায়ণ যেভাবে তুলে ধরেছেন, তাঁর কলমেই লিখতে হয়, ‘জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ইত্যাদি ধনী দেশে ২০১৯ সালের মোট কৃষিজনিত আয়ের নিরিখে সরকার থেকে উৎপাদক শ্রেণিকে সাহায্যের পরিমাণ ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। এই হিসেবটিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যথাক্রমে ১২ ও ২০ শতাংশ।’

উন্নত পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে খাদ্যের সরবরাহকারীদের বাঁচাতেও যথেষ্ট উদ্যোগী হচ্ছে, সন্দেহ নেই। এটা তো শুধুমাত্র কোনও লোকদেখানো সেমিনারের বিষয়বস্তু নয়, বরং গোটা ভারতজুড়ে অসংখ্য গ্রাম, পরিবার, বাড়ি ধ্বংস করে উৎপাদন শেষ করে দিয়ে এক বিভীষিকা হয়ে দাঁড়ানোর মতো বাস্তবিকই এক ভয়ঙ্কর দিক। ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর হতে চলেছে এই ক্ষতির পরিমাণ।

এখানেই সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে। অটলবিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় বিখ্যাত হয়ে গেছিল একটি স্লোগান— ‘সেই শাসকই শ্রেষ্ঠ যে শাসক সবচেয়ে কম শাসন করে’। সেই স্লোগানটি কিন্তু কাজ করেনি। অন্তত বেসরকারি খাতে ক্রমশ ছেড়ে দেওয়া সেই সরকারের থেকে কোনওরকম সহযোগিতা না পাওয়া সমাজের সবচেয়ে নিপীড়িত অংশে একেবারেই কাজ করেনি এই গালভরা স্লোগান।

বরং আইন অন্তত কিছু সদর্থক দিক তুলে ধরেছিল, সে কর্মসংস্থান বা অরণ্যে আদিবাসীদের অধিকার বলবৎ করা, যাই হোক না কেন।

মঙ্গলকারী এক রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেখলে ছবিটা কী দাঁড়ায়?

ছবিটা এই নয় যে মঙ্গলবার কোন কৃষক কী করল, বরং ছবিটা এটাই হওয়া উচিত কীভাবে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো যায় যাতে তাঁরা নিজেদের কাজে ফিরে যেতে পারেন। সমাজের প্রতিটা অংশের মতো তাঁদেরও কিন্তু কাজ করে আয় করার অধিকার আছে।

অতিমারি নভেল করোনা ভাইরাসের সময় দেশজুড়ে লকডাউনকালীন পরিস্থিতিতে গত গ্রীষ্মে যে অর্ডিন্যান্সটি জারি করা হয়েছিল, তার মধ্যেই এই তিনটি কৃষি আইনের শিকড় প্রোথিত আছে। মজার কথা হল, কৃষিই কিন্তু একমাত্র সেক্টর যা এতদিন ধরে দেশকে নির্দিষ্ট এক উৎপাদন এবং বৃদ্ধি সরবরাহ করে এসেছে।

অর্ডিন্যান্সটি বলবৎ হওয়ার সময় কৃষি বিশেষজ্ঞরা শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন এবং দেশজুড়ে কৃষকেরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন। ভারতীয় অর্থনীতির মূলগত ভাবনাকে পুরো বদলে দেওয়া এই প্রস্তাবিত আইনগুলির ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা করার বদলে সরকার সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বিরোধীদের সরিয়ে দিতে থাকল। এমনকী, রাজ্যসভায় ভোটটুকুও করতে দেওয়া হল না।

সরকার দেশজুড়ে বিক্ষোভকে গুরুত্ব দিল না— এমনকী সুপ্রিম কোর্টকেও বলে দিল যে দক্ষিণ ভারতে নাকি কোনও বিক্ষোভই হয়নি এবং সমালোচকদের মিথ্যেবাদী পর্যন্ত দাগিয়ে দিতেও পিছপা হল না। যখন প্রতিবাদীরা দেশের রাজধানীতে ঢুকে গেলেন, তখন তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসেও কোনও সমাধান দিতে ব্যর্থ হল সরকার। কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র তোমর বললেন, তিনটি কৃষি আইন কিছুদিনের জন্য স্থগিত করা হলেও শেষপর্যন্ত বাতিল করার প্রশ্নই উঠছে না।

এসবে কিন্তু কিছুই হবে না শেষমেশ। বরং, প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক পা পিছিয়ে মূল কাঠামো নির্মাণ বা ড্রয়িং বোর্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। আসন্ন বাজেট অধিবেশন কিন্তু ক্ষত নিরাময়ের একটা দারুণ সুযোগ তৈরি করতে পারে, সাধারণ মানুষ বা কৃষি সমাজ এবং আইনকে আবার আয়ত্তের মধ্যে আনতে গেলে।

যা প্রয়োজন তা হল, কৃষক অধিকারের স্বপক্ষে একটি কার্যকরী সংগঠন নির্মাণ, পরিকল্পিত সাহায্য এবং আর্থিক কর্মসূচি তৈরি, যা দেশের কৃষকদের একসঙ্গে সামনের দিকে এগোতে সাহায্য করতে পারে। মান্ডি, সহায়ক মূল্য, সরকারি এসেনশিয়াল কমোডিটি সংক্রান্ত আইন ইত্যাদি খুব সামান্য টিকে থাকা আনুকূল্যও বন্ধ করতে চাওয়া সরকারের একপেশে পদক্ষেপে যা কোনওভাবেই সম্ভবপর হবে না।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3659 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...