বোকা বুড়োর কথা

প্রবীর মুখোপাধ্যায়

 




প্রবন্ধকার, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

 

সম্ভবত সেটা ছিল ১৯৫৭ সাল— সিউড়ি থেকে কলকাতায় এসে সবে ভর্তি হয়েছি স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস নাইনে। তখন চালু হল ‘নয়া পয়সা’— আগে ছিল চার পয়সায় এক আনা, ষোলো আনায় এক টাকা অর্থাৎ চৌষট্টি পয়সায় এক টাকা। এখন নতুন চালু ‘মেট্রিক সিস্টেম’-এ একশো পয়সায় এক টাকা। নতুন পুরনো দুরকম মুদ্রাই চালু ছিল, প্রায় সকলেরই পকেটে থাকত নতুন পুরনো মুদ্রা বিনিময় তালিকা। কিছুদিনের মধ্যে পুরনো মুদ্রা বাজার থেকে তুলে নেওয়া হল, লেনদেন সবই হতে লাগল নতুন মুদ্রায়। ‘নয়া’ বিশেষণ উঠে গেল ক্রমে ক্রমে।

এর পরে কবে থেকে যে বিভিন্ন মাপের ক্ষেত্রে মেট্রিক সিস্টেম চালু হয়ে ‘মিটার’, ‘গ্রাম’ আর ‘লিটার’ চালু হয়েছে মনে পড়ছে না। তবে এসব ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিময় ততটা প্রাত্যহিকতার পর্যায়ে পড়ত না মুদ্রার ক্ষেত্রে যতটা ছিল। আস্তে আস্তে সাময়িক অসুবিধা কাটিয়ে এগুলিতেও আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম।

আগে দূরত্বের ক্ষেত্রে আমার এই ব্যক্তিগত অসুবিধা খুব বেশিই ছিল। ‘মাইল’ বললে কতটা দূরত্ব সেটা যত সহজে আন্দাজ করতে পারতাম ‘কিলোমিটার’ বললে তত সহজে পারতাম না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই অসুবিধা কীভাবে কাটিয়ে উঠেছি সেই কথা বলতেই এই ভূমিকার অবতারণা।

গ্রামের পথে হেঁটে চলেছি, সঙ্গে একজন গ্রামবাসী ‘বুড়ো’ বন্ধু, পেশাগতভাবে কৃষক, প্রথাগত শিক্ষা সম্ভবত প্রাথমিকের পর্যায়ও অতিক্রম করেনি। সেই কারণে ‘শহুরে’ ‘শিক্ষিত’ আমার মত যুবকের কাছে আমার তুলনায় অনেকটাই ‘কম’ শিক্ষিত, ‘বোকা বুড়ো’ আর কি। কতদূর আর যেতে হবে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানালেন আরও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতে হবে। কিলোমিটার দূরত্বটা ঠিক বুঝতে পারি না বললাম। সঙ্গে সঙ্গে ‘বোকা বুড়ো’ জবাব দিলেন পাঁচ কিলোমিটার মানে এই মাইল তিনেক। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কী করে হিসাব করলেন? জবাব এল “খুব সোজা। ঐ পুরনো পয়সা আর নয়া পয়সার হিসেব। পুরনো ৬৪ পয়সায় নতুন ১০০ পয়সা— পুরনো ৬৬ মাইলে নতুন ১০০ কিলোমিটার। তাই হিসেবটা একই রকম, শুধু পঞ্চাশের বেশি হলে এক আর একশোর বেশি হলে দুই বাড়িয়ে দিলেই হিসেব নিখুঁত।” অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ‘কী হল?’ দাঁড়িয়ে পড়লে কেন জিজ্ঞেস করল ‘বোকা বুড়ো’ বন্ধুটি। তাৎক্ষণিক কোনও জবাব আসেনি আমার মুখে— ভাবছিলাম কে সত্যিই ‘বেশি’ শিক্ষিত— আমি না এই ‘বোকা বুড়ো’?

সেই একই প্রশ্ন আজ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক অনেক তত্ত্বকথা এতদিন বলে এসেছি— কিছু বুঝে, অধিকাংশই না বুঝে। অনেক ‘থিওরি’ কপচেছি কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় এসব নিয়ে। আসলে প্রশ্নগুলোই ঠিক করতে পারিনি, উত্তর তো দূরের কথা। আজ রাজধানী দিল্লির পথে দাঁড়িয়ে গ্রামের কৃষকেরা সেইসব প্রশ্ন পরিষ্কারভাবে সামনে এনে দিয়েছে— জবাব আমাদের সবাইকে দিতে হবে।

কী কী সব প্রশ্ন?

ভারতীয় সংস্কৃতি আর জীবনধারার বহুমুখিনতা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনই অনস্বীকার্য ভারতের ভৌগোলিক বিভিন্নতা। কৃষি এমনই একটি কাজ যেটি একান্তভাবে পরিবেশ-নির্ভর। সেই কারণে দেশের বিভিন্ন অংশে কৃষিকাজ বিভিন্নধর্মী, তা সে কৃষিপণ্য হোক বা পদ্ধতিই হোক। আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে কৃষিপণ্যের বিপনন ব্যবস্থা। সেখানেও আঞ্চলিক বিভিন্নতা লক্ষণীয়। এক আইনের আওতায় এদের আনা যায় না, আনা উচিতও নয়। সংবিধান-প্রণেতারা এই কারণেই কৃষিব্যবস্থাকে রাজ্য-তালিকায় রেখেছেন। রাজ্য তার এলাকাভিত্তিক বৈচিত্র্য অনুধাবন করে কৃষিসংক্রান্ত আইন-কানুন তৈরি ও প্রয়োগ করবে। কৃষিক্ষেত্রে সঙ্ঘীয় [‘কেন্দ্রীয়’ শব্দটির পরিবর্তে সচেতনভাবে ‘সঙ্ঘীয়’ শব্দটি ব্যবহার করছি] সরকারের ভূমিকা খুবই সীমিত। কিন্তু যারা আজ সঙ্ঘীয় শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তারা ভারতীয় জীবনধারার বহুমুখিনতাকে অস্বীকার করে এককেন্দ্রিক সমসত্ত্ব এক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর সেই কাজে যে কোনও সুযোগ তারা ব্যবহার করছে। যখন দেশের সকল শক্তি একজোট করে করোনা অতিমারির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা ঠিক সেই সময়ে মহামারি প্রতিরোধ আইনের সুযোগ নিয়ে নতুন কৃষি আইন নিয়ে এসেছে এই সরকার সেকথা আমরা সবাই জানি। প্রথমে ‘অধ্যাদেশ’, তারপর লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগে অনুমোদন আর শেষ পর্যন্ত ‘ধ্বনিভোট’-এ রাজ্যসভায় পাশ করানো হল এই আইনগুলি। এই সব আইন পাশ করাতে সরকার কতটা সংবিধান-বিরোধী কাজ করেছে, বা এই সব আইনের কোন কোন ধারা কৃষকের স্বার্থ বিঘ্নিত করবে এসব প্রশ্ন নিয়ে শহরের শিক্ষিত আইন-জানা আমরা আলোচনায় ব্যস্ত আর মুখর। কিন্তু গ্রামের ‘বোকা বুড়ো’ ভূমিপুত্রেরা নিজেদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে ধরে ফেলেছে এই আইন কেন নিয়ে এসেছে সরকার। তাই সদলবলে এমনকি কেউ কেউ সপরিবারে চলে এসেছে দিল্লির পথে— দাবী একটাই— এই আইনগুলি হটাও!

আজও কৃষিব্যবস্থায় উৎপাদনের মাধ্যম ‘জমি’ আর উৎপাদিত পণ্য ‘ফসল’-এর ওপর অধিকার আছে বিরাট সংখ্যক সাধারণ কৃষকের। ‘মহামারি আইন’-এর সুযোগ নিয়ে কৃষকের সেই অধিকার কেড়ে নিয়ে পুঁজির মালিকের হাতে জমি আর ফসলের অধিকার তুলে দিতে বদ্ধপরিকর এই সরকার। সেই কারণে যে এই আইনগুলি সেটা আমরা বুঝতে না পারলেও ‘মাটির সন্তান’ কৃষকদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাদের একমাত্র দাবী এই সব আইন বাতিল করতে হবে, কোনও তথাকথিত সংশোধন/পরিবর্তন চলবে না, সব আইনগুলি বাতিল করতে হবে।

আজকে দেশের কৃষিব্যবস্থা যেমন আছে তাতে ব্যাপক সংস্কার যে প্রয়োজন সেকথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু তার একটা সময় আছে, এই অতিমারির সময়ে সেটা করা কি একান্ত প্রয়োজন? আসলে এই সরকার আগে থেকেই পুঁজিপতিদের সঙ্গে ব্যবস্থা করে রেখেছিল। নইলে বলুন তো হরিয়ানা আর বিহারে আদানি কোম্পানি কেন কৃষিপণ্য মজুতের বড় বড় গুদাম তৈরি করে রেখেছে আর তৈরি করে চলেছে?

সবাই জানে কৃষিজ পণ্যের মরশুমি চরিত্র। ভৌগোলিক ঋতুচক্রের সঙ্গে এর যোগ নিবিড়। এক একটি ফসল বিশেষ এক সময়েই উৎপন্ন হয়— অথচ তার চাহিদা থাকে সারা বছর। সেইজন্য এই সব বিশেষভাবে গুদামজাত করতে হয়, মজুত করতে হয়, কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে এদের রক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হয়। ফসল যখন ওঠে তখন জোগান থাকে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সেই কারণে বিশেষ করে ছোট কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় তার ফসল। সেই ফসল কিনে নিয়ে মজুত করে রাখে মজুতদারেরা, পরে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা কামায়। এই ব্যবস্থায় রাশ টানার জন্যে অবশ্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে মজুতের পরিমাণ নির্দিষ্ট সীমায় বেঁধে রাখার যে আইন করা হয়েছিল সেটা এই মুহূর্তে তুলে নেওয়ার কি প্রয়োজনীয়তা আছে? একটাই কারণ, আর সেটা হল মজুতদারদের পকেটে অতি-মুনাফার ব্যবস্থা করে দেওয়া আর সরকার ঠিক সেটাই করল। ‘বুদ্ধিমান’ আমরা বুঝতে না পারলেও গ্রামের ‘বোকা বুড়োরা’ কিন্তু বুঝে গেল আর তাই আওয়াজ তুলেছে নতুন ঐ আইনের সংশোধন নয়, আইনটিই বাতিল করতে হবে।

অনেক আন্দোলনের ফলে কিছু কিছু কৃষিজাত পণ্যের ন্যূনতম দাম সরকার প্রতি বছর ঘোষণা করে। এটাই এমএসপি। বলা হয়েছিল কৃষক যদি বাজারে এই দামে তার ফসল বিক্রি করতে না পারে তাহলে সরকার তার কাছ থেকে এই দামে ঐ ফসল সরাসরি কিনে নেবে। তার জন্য সরকার ‘মান্ডি’ বা ফসল ক্রয়ের বাজার স্থাপন করবে যাতে করে কৃষক এসে এখানে নিজের ফসল এমএসপি-তে বিক্রয় করতে পারে। প্রধানত ধান আর গমের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। সরকার কিনে নেওয়া এই পণ্য রেশনব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে বিক্রয় করবে। নিঃসন্দেহে জনকল্যাণমুখী এই কাজটি প্রশংসার দাবী রাখে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এই ব্যবস্থা শুধু পাঞ্জাব আর হরিয়ানা, আর কিছুটা মধ্যপ্রদেশে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। সেখানেও সরকার কতটা কিনবে তার সীমা বেঁধে দেওয়া হল। ফলে চাষিরা কম দামে খোলা বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হতে লাগল। এবারে নতুন আইনের মাধ্যমে এমএসপি কথাটাই ‘ভ্যানিশ’ করে দেওয়া হল, যদিও সরকার বলছে কিন্তু লিখে দিচ্ছে না যে এমএসপি বজায় থাকবে। আর খোলা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে দিল, মজুত করার সীমা আর থাকবে না। সহজে বলতে গেলে কৃষিপণ্যের বিপণনে ‘উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়ন’ প্রক্রিয়া চালু করার ব্যবস্থা পাকা করা হল। প্রধানমন্ত্রী গলা ফুলিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলতে লাগলেন যে ভারতের কৃষক এখন যেখানে বেশি দাম পাবে সেই বাজারে ফসল বিক্রি করতে পারবে, ফলে তার আয় বেড়ে যাবে। শিক্ষাব্যবস্থায় বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বেসরকারিকরণের ফল কী হয়েছে সে কি আমাদের অজানা? কিন্তু আমরা আজও এর প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু ‘বোকা বুড়ো’রা খেলাটা প্রথম রাউন্ডেই বুঝে গেছে। তাই দাবী করছে এমএসপি-র আইনি স্বীকৃতি। আইন করতে হবে যে সহায়ক মূল্যের কম দামে কৃষিজ পণ্য কেনা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য করতে হবে। বেসরকারিকরণের ছুতোয় সরকারি মান্ডি ব্যবস্থা তুলে দেওয়া চলবে না।

এবার আসে চুক্তিচাষের প্রসঙ্গ। সেই নীলচাষের সময় থেকে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কৃষকেরা লড়াই করে চলেছে। এমনকি সাম্প্রতিককালে এর খপ্পরে পড়ে কত কৃষক আত্মহননের পথে যেতে বাধ্য হয়েছে আমাদের কাছে সেটা খবরের কাগজের হাজারটা খবরের মধ্যে একটা খবর মাত্র। আমরা আজকে যারা শহরে বহুতল ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা তারা কখনই মনে করি না সেই গরীব কৃষকটির কথা যার জমি কিনে নিয়ে আমার বাসস্থান এই বহুতল তৈরি হয়েছে। আর কৃষক হয়েছে দিন-আনা-দিন-খাওয়া শ্রমিক। হাইওয়ে দিয়ে যখন একশো কিলোমিটারের বেশি স্পিডে গাড়ি চালিয়ে আত্মতুষ্টিতে মগ্ন হয়ে উন্নয়নের জয়গান গাই তখন কিন্তু একবারও মনে পড়ে না সেই কৃষকের কথা যাকে নামমাত্র অর্থ দিয়ে এই জমি দখল করে তাকে পেশাচ্যুত অধিকারচ্যুত করা হয়েছে। আসলে বর্তমান ব্যবস্থায় উন্নয়ন মানেই মূলবাসী-আদিবাসীদের মালিকানা কেড়ে নিয়ে পুঁজিপতিদের হাতে মুনাফার অধিকার তুলে দেওয়া। কিন্তু ভূমিপুত্রদের কাছে এই আইন যে তার জমি কেড়ে নেওয়ার, তাকে মালিক থেকে শ্রমিকের পর্যায়ে নামিয়ে আনার এক প্রক্রিয়া সেটা বুঝতে ভুল হয়নি। ‘বোকা বুড়ো’রা তাই এই আইন সরাসরি বাতিল করার আওয়াজ তুলেছে।

পাহাড় যে একদিনে সরানো যাবে না সেটাও এই ‘বোকা বুড়ো’রা খুব ভালভাবে জানে আর বোঝে। সংসদীয় রাজনীতির খোঁয়াড়ে আটকে থাকা ‘জনপ্রতিনিধি’-দের ক্ষমতাও কতটা সেটাও এরা বুঝতে পারছে। আর বাজার অর্থব্যবস্থায়, যেখানে জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্রও কেনা-বেচা হয়, সেখানে যে সবার ওপরে মুনাফা সত্য এটাও বোঝা যাচ্ছে। সুতরাং ঐ আইন-কানুন, রীতি-নীতি, বিচার-শাসন সবই ক্রয়যোগ্য পণ্যমাত্র। পাহাড় সরাতে হলে নিজেদেরই এগিয়ে এসে কোদাল হাতে কাজে লাগতে হবে এটা ‘বোকা বুড়ো’র দল বুঝে গেছে। আমরা বুঝব কবে সেটাই এখন প্রশ্ন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2947 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...