কৃষি-বিল, কৃষক, প্রতিরোধ

কৌশিক দত্ত

 



চিকিৎসক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার

 

 

 

 

গোটা দেশ কৃষক আন্দোলন নিয়ে উত্তাল, কিন্তু যতটা উত্তাল হওয়া উচিত ছিল, ততটা হল কোথায়? শীতের জলকামানের সামনে তাঁদের বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, দিল্লির ঠান্ডায় বত্রিশ বছরের যুবকের মৃত্যু, সরকারি অফিসারদের সামনে মৌন অবলম্বন করে “হ্যাঁ”/”না” প্ল্যাকার্ড তুলে ধরা নিয়ে নিরাপদ ও রোম্যান্টিক ভাবালুতা আমরা উপভোগ করছি, অথবা পিজা খাওয়ার রসালো গল্পে জিভে জল আসছে, কিন্তু আন্দোলনের প্রেক্ষিত নিয়ে যতটা মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল, তা কি হলাম? ওরা লড়ে যাচ্ছে, আমরা বাহবা দিচ্ছি বড়জোর। যেন আমাদের লড়াইগুলো “ওরা” লড়ে দেবে… অন্য কেউ, যেমন দেয়। অন্যেরা লড়বে আর আমাদের মধ্যবিত্ততা নিরঙ্কুশ থাকবে। এই নিশ্চিন্ততা প্রমাণ করে, লড়াইটা এখনও আমাদের উঠোনের বাইরে আছে। সংগ্রাম এখনও আমাদের নয়।

আজ হঠাৎ কৃষি বিল আর কৃষক আন্দোলনের আবহে আমরা কৃষকদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়েছি। এতদিন কি আদৌ ভেবেছি কৃষকদের নিয়ে বা কৃষি নিয়ে? আমার মতো অনেকেই কৃষি বা গ্রামীণ অর্থনীতি সম্বন্ধে কিছুই জানার চেষ্টা করিনি কখনও, কারণ এগুলো আমাদের পেশাগত চর্চার বিষয় নয়। এসবের সঙ্গে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এমন কথা আগে স্পষ্ট অনুভব করিনি। এমনকি হাজার হাজার কৃষকের আত্মহত্যার পরেও ফেসবুকের স্যাড ইমোটিকন পেরিয়ে ভাবার বা অনুসন্ধান করার পরিশ্রম এড়িয়ে গেছি। তাই হয়ত আজ আমাদের অনেকের মনে হচ্ছে সমস্যা হঠাৎ জন্মাল কৃষি সংক্রান্ত সরকারি বিলে, আর বিলটি বুজিয়ে দিতে পারলেই সব কুমির মরে যাবে। এই অতিসরলীকরণ আমাদের মতো অকৃষক মধ্যবিত্ত মেধাব্যবসায়ীদের আরাম দিতে পারে, কিন্তু কৃষকদের আরাম অত সহজে হবে না, যদিও বিলটি নিয়ে সরকার পিছিয়ে গেলে তাঁরা ঘনিয়ে আসা মৃত্যুর হাত থেকে অন্তত সাময়িকভাবে বাঁচতে পারবেন। সামগ্রিকভাবে কৃষি, প্রকৃতি ও মানবসভ্যতাও অত সহজে বাঁচবে না। বাঁচতে হলে সেই বাঁচার লড়াইয়ে আমাদের সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে, পরিশ্রম লগ্নি করতে হবে।

কৃষকদের দুরবস্থার ইতিহাস মাত্র মাস তিনেকের নয়। কৃষির ইতিহাস অন্তত দশ হাজার বছরের। কৃষিজীবী মানুষ পুরোপুরি কৃষি-নির্ভর হবার পর থেকে বস্তুত ফসল আর জমির দাসত্ব করে চলেছেন। আগেকার শিকারি ও সংগ্রহকারী যাযাবরেরা দৈনিক যতটা পরিশ্রমে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারতেন, তার চেয়ে গড়ে অনেক বেশি সময় পরিশ্রম করতে হত কৃষকদের। তার ফলে যে বেশি পুষ্টি জুটত, তাও বলা যায় না। আহারের জন্য নিজের উৎপাদিত শস্যটির উপরেই মূলত নির্ভরশীল হয়ে যাবার ফলে কৃষকদের খাদ্যের বৈচিত্র্য কমে যায় এবং তার ফলে পুষ্টিও, কারণ পুষ্টি শুধুমাত্র আহারের পরিমাণের উপর নির্ভর করে না, বৈচিত্র‍্যের উপরেও নির্ভর করে। খরা বন্যায় ফসল নষ্ট হলে তো কথাই ছিল না। সুতরাং কৃষি আবিষ্কার কৃষকের ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে ক্ষতিই করেছে বেশি। লাভ হয়েছে সামগ্রিকভাবে সমাজের, কারও একজনের উৎপাদিত শস্য অন্যেরা খেতে পেরেছে এবং পেরেছে বলেই খাদ্য সংগ্রহের চিন্তা ছেড়ে অন্যান্য চর্চায় মন দিতে পেরেছে। কেউ করেছে বিজ্ঞান, শিল্প, দর্শন বা পদ্যচর্চা, কেউ গেছে বাণিজ্যের পথে, আবার কেউ নিরাপত্তাপ্রদান ও খবরদারি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে যোদ্ধা বা রাজা-গজা হয়েছে। ব্যক্তিগত মালিকানা, শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি, নিজে উৎপাদন না করেও খেতে পাওয়া তত্ত্বজ্ঞ এলিট সম্প্রদায়… সবকিছুরই মূল হল কৃষি। বলাই চলে যে আধুনিক মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে কৃষকের লোকসান আর সমাজের লাভের উপর।

আজকের কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আরেকটা ছোট্ট ইতিহাস মনে রাখা দরকার। কৃষি আবিষ্কারের আগেও মানুষে-মানুষে গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে মারামারি হত। যে দল হেরে যেত, তারা পালিয়ে অন্যত্র চলে যেত। এমনকি পশুপালকদের পক্ষেও নিজেদের কিছু পশু সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু কৃষকের পক্ষে জমি-বাড়ি বগলদাবা করে পালানো সম্ভব নয়। জমি আর ফসল হারানোর সঙ্গে মৃত্যুর তফাৎ খুব বেশি ছিল না কৃষকদের চোখে, তাই শত্রুকে তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিতেন এবং সহজে পালাতেন না। কৃষকসমাজ তাই চরিত্রগতভাবে অনেক বেশি মরিয়া। তাঁদের হত্যা না করে পরাজিত করা চিরকালই কঠিন ছিল।

বাণিজ্যের হাত ধরে ফসল ক্রমশ পণ্য হয়েছে। এর প্রয়োজন অবশ্যই ছিল। এই মিথষ্ক্রিয়ার ফলে কৃষকও নিজের লাঙল বা পরণের জামা-কাপড় থেকে শুরু করে বিবিধ অকৃষিজ দ্রব্য কিনতে পেরেছেন। আবার বাণিজ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ না হওয়ার ফলে এই আদানপ্রদানে কৃষক শোষিতও হয়েছেন যুগযুগ ধরে। বিভিন্ন দেশে একসময় ভূমিদাস হিসেবে অন্যের অধীনে কাজ করতেও হয়েছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে ব্যাপারটি অন্য মাত্রা পায়। কৃষি ক্রমশ প্রযুক্তিনির্ভর হতে থাকে এবং কৃষিজমি তথা কৃষিব্যবস্থার উপর ধনী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের নজর পড়ে আরও বেশি করে, কারণ প্রযুক্তি আর অর্থের যোগান দিয়ে এবং কৃষকের গুরুত্ব কমিয়ে তাঁরা কাজটির দখল নিতে সক্ষম হয়ে উঠেছেন ক্রমশ। আজ বিজেপি সরকার এদেশে কৃষির যে কর্পোরেটায়ন ঘটাতে চাইছে, তা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, কোভিড-১৯-এর মতোই এক বিশ্বব্যাপী প্রক্রিয়ার অংশমাত্র। হ্যাঁ, এই কৃষি বিল যে কৃষি ও কৃষিনির্ভর বাণিজ্য মূলত কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্যই, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই এবং তা বিশ্বের অর্থনৈতিক গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে কার কতটা লাভ বা ক্ষতি হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু এই কর্পোরেটায়নের প্রাথমিক লক্ষ্য সম্বন্ধে দ্বিধা থাকার প্রশ্ন নেই।

ভারতীয় কৃষক বলতে একটি সমসত্ব আর্থসামাজিক গোষ্ঠী বোঝায় না, একথা সবাই জানেন। সম্পন্ন চাষি (যাঁদের অনেকে ক্ষমতাশালী কৃষি ব্যবসায়ীও বটেন) থেকে ভূমিহীন খেতমজুর… অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাত্রাটি বিশাল। এঁদের জীবনসংগ্রাম পরস্পরের সঙ্গে জড়িত হলেও ভিন্ন এবং পারস্পরিক টানাপোড়েন নগণ্য নয়। আপাতত আগ্রাসী তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের ফলে বিভেদ মুছে গিয়ে সম্পর্কের যোগসূত্রটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং সেই সুতোটা আঁকড়ে ধরা ছাড়া উপায় নেই। তবু হয়ত ফাটলগুলো, বিশেষত বিভিন্ন রাজ্যের কৃষকদের বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্যগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়নি সবার চোখে। তাই পাঞ্জাব হরিয়ানার কৃষকদের যেভাবে আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে, অন্যদের অংশগ্রহণ ততটা সোচ্চার নয়। অবশ্য এই পিছিয়ে থাকা বিভিন্ন রাজ্যে শক্তিশালী কৃষক সংগঠনের অনুপস্থিতির সূচকও হতে পারে। এই সাংগঠনিক শক্তির অভাবই কিন্তু এই বিলটির ক্ষতিকর প্রভাবের সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে, অর্থাৎ সংগঠিত হতে না পারাই বড় ব্যবসায়ী সংস্থার সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ছোট কৃষকদের বিপদে ফেলবে। সুতরাং বলা যেতে পারে, যেখানে কৃষক সংগঠনের জোর যত কম, সেখানকার কৃষকদের তত বেশি বিচলিত হওয়া উচিত বিলটি নিয়ে এবং সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য। কিন্তু শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া তাঁরা ঝাঁপিয়েই বা পড়বেন কী করে? পাঞ্জাব হরিয়ানার কৃষকদের যতটা সঞ্চয় বা পুঁজি আছে, বাঙলা বিহারের কৃষকদের তা নেই। জমি ফেলে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের জন্য “দিল্লি চলো” হাঁক দিলে পরবর্তী বছরে তাঁদের জীবনধারণ করার মতো আহার্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগান দেবে কে, যদি শক্তিশালী সংগঠনের মদত না থাকে?

এই বিল হওয়ার আগেও ভারতের কৃষিপণ্য বিপণন ক্ষেত্রে ছোট চাষিদের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, ভূমিহীন খেতমজুরদের দুরবস্থার কথা বলাই বাহুল্য। এদেশে অত্যাবশ্যক পণ্য আইন ছিল, কিন্তু তা যতটা ভোক্তার সুরক্ষার জন্য, ততটা কৃষকের স্বার্থে নয়। ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরেও অন্য প্রায় সব সরকারি সংস্থার মতোই দুর্নীতি প্রবেশ করায়, কারও স্বার্থই শেষ অব্দি সম্পূর্ণ রক্ষিত হত কিনা, তা তর্কসাপেক্ষ। দেশে “Agricultural produce market committee” (APMC) সংক্রান্ত বিধি ছিল এবং রাজ্য সরকারগুলির তত্ত্বাবধানে APMC গঠিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দেশের বেশিরভাগ জায়গাতেই APMC-গুলোর ভূমিকা আশানুরূপ ছিল না। হতাশ হয়ে বিহার দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে ২০০৬ সালে APMC তুলেই দিয়েছিল মুক্তবাজারের ওপর ভরসা রেখে। ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রদানের নীতিও বলবৎ ছিল, কিন্তু বাস্তবে মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক এই সুবিধা পেতেন (মূলত পাঞ্জাব হরিয়ানা অঞ্চলের কৃষকরা)। বাকিরা এর চেয়ে কম দামে স্থানীয় বাজারে ফসল বেচতে বাধ্য হতেন।

কৃষিপণ্যের বিপণন হয় অনেক হাত ঘুরে। মান্ডিগুলোতে কেবলমাত্র কিছু নথিভুক্ত ট্রেডারই ব্যবসা করতে পারেন, যা একধরনের লাইসেন্স রাজ বা মনোপলি প্রতিষ্ঠা করেছে। এঁরা ফসল বিক্রেতা কৃষকের কাছ থেকে ৬ শতাংশ এবং ক্রেতাদের (পাইকারি ব্যবসায়ী) কাছ থেকে ৬ শতাংশ কমিশন আদায় করেন। এই ১২ শতাংশ লভ্যাংশ থেকে ২.৫ শতাংশ তাঁরা মান্ডি সমিতিতে দেন, বাকিটা নিজেদের। বেশিরভাগ কৃষক (বিশেষত ক্ষুদ্র চাষিরা) সরাসরি মান্ডিতে ফসল বিক্রি করতে আসেন না। তাঁরা স্থানীয় দালালদের কাছে ফসল বিক্রি করেন এবং সেখান থেকে মান্ডি ট্রেডারদের কাছে তা আসে। মান্ডি থেকে ফসল কেনেন পাইকারি বিক্রেতারা (যেমন আমাদের কোলে মার্কেট), তাঁদের কাছ থেকে খুচরো ব্যবসায়ীরা এবং সেখান থেকে সাধারণ ক্রেতারা। এত হাত ঘুরে উপভোক্তার কাছে পৌঁছনোর পথে ফসলের দাম অনেকটাই বেড়ে যায়, কিন্তু তার সামান্য অংশই কৃষকেরা পেয়ে থাকেন। ফলন খারাপ হলে বা ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে না পারলে কৃষকের অবস্থা হয় শোচনীয়। আজ পানিপথে একশো একর জমিতে আদানিদের বিশাল হিমঘর নির্মাণ দেখে আমরা আতঙ্কিত, কিন্তু একথাও অনস্বীকার্য যে সংরক্ষণের উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে প্রচুর ফসল নষ্ট হয় এবং লোকসানের ভার বইতে হয় কৃষকদেরই। অর্থাভাবে ঋণের বোঝায় চাপা পড়ে বহু সহস্র কৃষকের আত্মহত্যা এই ব্যবস্থাটির সমস্যা প্রমাণ করে। এই পরিস্থিতি সংশোধনের আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল না, এমন কথা বললে তা সৎ উচ্চারণ হবে না। অসত্যের উপর ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় না। সুতরাং স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে নতুন কৃষি আইন তিনটি পাশ হওয়ার আগেও সমগ্র ব্যবস্থাটি কৃষকবান্ধব ছিল না।

পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রয়োজন যে অনেকেই অনুভব করছিল, তার অন্যতম বড় প্রমাণ এই যে কংগ্রেসের ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন-পূর্ববর্তী ইস্তেহারেও APMC Act বাতিল করার কথা বলা হয়েছিল। তাহলে কি বিজেপির এই কৃষি আইন সঙ্কটমোচনার্থে শুভ পদক্ষেপ? তাও নয়।

বলা হচ্ছে এই নতুন আইনের বলে কৃষকরা সরাসরি সারা ভারতে নিজেদের ফসল বিক্রি করতে পারবেন, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। মদনপুরের ছোট চাষি নিশ্চয় ঝুড়ি মাথায় মুম্বাইয়ের বাজারে সবজি বিক্রি করতে যাবেন না, সুতরাং তাঁদের ফসল বিক্রি করতে হবে ব্যবসায়ীদের কাছেই। APMC-র মনোপলি উঠে গেলে বর্তমান মান্ডি ট্রেডার আর ফড়েদের আধিপত্য ঘুচবে ঠিকই, কিন্তু বড় ব্যবসায়ীরা স্থানীয় দালালদের তুলনায় কৃষকদের প্রতি বেশি সদয় হবেন, এমনটা ধরে নেওয়া খুবই ভাববাদী চিন্তার পরিচয় হবে। অবশ্যই বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলে কৃষকেরা যেখানে সর্বোচ্চ মূল্য পাবেন, সেখানেই ফসল বেচবেন, কিন্তু বাস্তবে ক্রেতার সংখ্যা অসীম নয় এবং ব্যবসায়ীরা যেখানে সর্বনিম্ন মূল্যে ফসল পাবেন, সেখান থেকেই জিনিস কিনবেন। সরকারি মান্ডিগুলো যদি পুরোদমে কাজ করে এবং ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য যদি দৃঢ়ভাবে বলবৎ থাকে, তাহলে ব্যবসায়ীরা সেই দাম অথবা তার থেকে কিছু বেশি দিয়ে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য থাকবেন, কিন্তু সরকার ক্রমশ কৃষি থেকে হাত গুটয়ে নিলে, মান্ডিগুলোর ঝাঁপ বন্ধ হলে এই প্রতিযোগিতার চাপ কমে যাবে এবং ব্যবসায়ীরা খুবই কম দাম দেবেন কৃষকদের। তেমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় দালালদের সঙ্গে যেটুকু দরাদরি কৃষকের পক্ষে করা সম্ভব, বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সেটুকু করার জোরও থাকবে না। কিছু সংস্থা হয়ত মোটামুটি ভালো দামে ফসল কিনবেন মূলত বড় চাষিদের কাছ থেকে, অর্থাৎ যেখান থেকে একটি চুক্তির ভিত্তিতে অনেকটা ফসল কেনা সম্ভব, কিন্তু দুই বিঘা জমির চাষিদের তাঁরা পাত্তা দেবেন না। এই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের তখন ফসল বেচতে হবে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে হাতজোড় করে যেকোনও দামে। মান্ডি ব্যবস্থা উঠে গেলে হয়ত মান্ডি ট্যাক্স হারানোর ফলে পাঞ্জাব হরিয়ানায় রাজ্য সরকারের স্বার্থে বেশি ঘা লাগবে বাংলার তুলনায়, হয়ত অর্থের অঙ্কে পাঞ্জাব হরিয়ানায় সম্পন্ন কৃষকদের লোকসান হবে বেশি (মূলত মান্ডি ট্রেডিং-এর উপার্জন নষ্ট হবার ফলে), তবু তাঁরা নতুন ব্যবস্থায় টিকে থাকতে সক্ষম হবেন বড় চাষি বলেই। বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন আমাদের ছোট চাষিরাই। আঞ্চলিক ফড়েরা আর খবরদারি করতে পারবে না, এ ভারি আনন্দের কথা, কিন্তু একটু অন্যভাবে দেখলে আসলে রোজগার হারাবেন অজস্র ছোট মাপের দালাল, যাঁরা এই মধ্যস্থতার কাজটি করে পেট চালাতেন। সেই টাকা কিন্তু কৃষকদের পকেটে যাবে না, বদলে যোগ হবে বড় ব্যবসায়ীর মুনাফায়। APMC তুলে দিলেই যদি কৃষকদের মুক্তি হত, তাহলে গত চোদ্দ বছরে বিহারের কৃষকদের ভাগ্য ফিরে যাবার কথা ছিল। বাস্তবে হয়েছে তার বিপরীত।

চুক্তিভিত্তিক চাষের স্বপক্ষে বলা হচ্ছে যে এর ফলে চাষের রসদ জোগাড় করা বা ফসলের ক্রেতা খোঁজার জন্য কৃষকদের হন্যে হতে হবে না। আপাতদৃষ্টিতে বেশ সুখের ব্যাপার, কিন্তু এসব চুক্তির সময় সমবায়হীন ছোট চাষিরা দুর্বল অবস্থানে থাকবেন। চুক্তি হবে কর্পোরেটের ইচ্ছানুসারে। মনস্যান্টোর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি তুলোচাষিদের কী পরিণতি হয়েছিল। তাছাড়া এভাবে কিছু নির্দিষ্ট অর্থকরী এবং উচ্চফলনশীল ফসলের চাষই উৎসাহিত হবে, যার ফলে ফসলের বৈচিত্র্য অবশ্যই নষ্ট হবে। আঞ্চলিক প্রথাগত চাষ শেষ হয়ে যাবে। তখন কিছু নির্দিষ্ট সার এবং কৃত্রিম ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করা ছাড়া কৃষকদের উপায় থাকবে না। প্রকৃতি সদয় না হলেও টিকে থাকতে পারে যেসব জাতের শস্য, সেগুলো ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যাবার ফলে আকষ্মিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়বে। ফসল কম হলে বা চুক্তি অনুসারে অর্থ না পেলে বৃহৎ কর্পোরেটের সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা ছোট চাষির নেই। এরকম ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর বন্দোবস্ত আছে, সেখানে কাজ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট, কিন্তু আদালতে যাওয়ার রাস্তা নেই।

অত্যাবশকীয় পণ্য আইনের পরিবর্তন করে শস্য মজুত করার ঊর্ধ্বসীমাও তুলে দেওয়া হয়েছে। ফসলের অপচয় রোধ করার জন্য পর্যাপ্ত হিমঘরের ব্যবস্থা প্রয়োজন, অর্থাৎ ফসল মজুত করার ব্যবস্থা, কিন্তু সেটা সরকারি বা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগে হলে ভালো হত। বদলে বেসরকারি ক্ষেত্রে পণ্য মজুতের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে ফসল বিপণনের ক্ষেত্রে কর্পোরেট মনোপলির পথ সুগম করা হল। মজুতের খেলায় ছোট আড়তদারেরা বড় কর্পোরেটের সঙ্গে পারবে না এবং কিছু বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থা বিপুল পরিমাণ ফসল মজুত করে বাজারকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন। তখন কৃষক কী দাম পাবেন আর উপভোক্তা কত দামে চাল-ডাল-আলু কিনতে বাধ্য থাকবেন, তা তাঁরাই ঠিক করবেন। অর্থনীতির স্কুলপাঠ্য যুক্তিতে মনে হতেই পারে যে বিপুল পরিমাণ ফসল বয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন তা মজুত করার খরচ বিপুল, তাই ক্ষমতা থাকলেও তেমন ভুল কর্পোরেট মালিকেরা করবেন না। তাছাড়া বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে ক্রয় ও বিক্রয়ের মূল্য কেউ এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। “মুক্ত বাজার” নামক ঈশ্বরে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁরা এই যুক্তিতে শান্তি খুঁজছেন। বাস্তবে বাজার এই সরল যুক্তি অনুসারে চলে না। অসম প্রতিযোগীদের হঠাৎ করে একসঙ্গে মাঠে ছেড়ে দিলে প্রতিযোগিতা বিলুপ্ত করার জন্য শক্তিশালীরা নানা কৌশল অবলম্বন করতে পারেন।  বড় কর্পোরেটের হাতে যে পরিমাণ অর্থবল আছে, তাতে বাজার দখলের জন্য দু-চার বছর তাঁরা অনায়াসে লোকসানে ব্যবসা করতে সক্ষম। ছোট আড়তদার, খুচরো ব্যবসায়ীরা ততদিন এই লোকসান বহন করে টিকতে পারবেন না। স্থানীয় বাজারগুলো বন্ধ হলে দেশজুড়ে খাদ্য বিপণনকারী হয়ে দাঁড়াবে কিছু বড় কর্পোরেট। বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হাতে পেলে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এই সংস্থাগুলোর হাতেই চলে যাবে। তখন আপনি আজকের তুলনায় তিনগুণ দামে যে খাদ্যবস্তু কিনতে বাধ্য থাকবেন, চাষিরা সেই বস্তুর জন্যই হয়ত পাবেন আজকের অর্ধেক অর্থ।

এর বিকল্প কি ছিল না? ছিল। কৃষকদের ক্ষমতায়ন ঘটানোর বিভিন্ন রাস্তা ছিল। যে ৬ শতাংশ কৃষক ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পান, তাঁরা বস্তুত বিশ্ববাজারের ন্যূনতম মূল্যের প্রায় দেড়গুণ সরকারের কাছ থেকে পাচ্ছেন। এর বিপরীতে ৯৪ শতাংশ কৃষক কিছুই পাচ্ছেন না। এই অসাম্য দূর করার চেষ্টা করা যেত। সবচেয়ে বেশি করে নজর দেওয়া উচিত ছিল ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষি আর ভূমিহীন খেতমজুরদের দিকে। এঁরাই ভারতের কৃষকদের ৮৬ শতাংশ প্রায়। তাঁদের ভর্তুকি দেওয়ার বিকল্প রাস্তাও ভাবা যেত। সারা দেশের সব জেলা বা মহকুমা বা ব্লক স্তরে কৃষকদের সমবায় গড়ে তোলা যেত। (পাশাপাশি কৃষকদের শক্তিশালী সংগঠনও জরুরি, যা গঠন করা অবশ্যই সরকারের কাজ নয়।) সমবায়গুলোর মাধ্যমে দালালদের এড়িয়ে গ্রামের কৃষকেরা গঞ্জ বা শহরাঞ্চলের বাজারে নিজেদের ফসল সরাসরি বিক্রি করতে পারতেন। প্রতিটি মফস্বল শহর এবং বড় গ্রাম এলাকায় কৃষক বাজার গড়ে তোলা যেত। যেসব জায়গায় হাট বসে, সেসব জায়গাকে চিহ্নিত করা যেত, কারণ এসব জায়গায় অনেক ক্রেতা নিয়মিত আসেন, সুতরাং কৃষক বাজারেও তাঁরা আসতে পারবেন। সমবায়গুলো থাকলে কর্পোরেট প্রবেশ করার পরেও চুক্তি-চাষ বা ফসল বিক্রির দরদাম নিয়ে তারাই একজোট হয়ে একটা পক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারত, ফলে ব্যক্তি কৃষক একা এবং দুর্বল হয়ে কর্পোরেটের হাতের পুতুলে পরিণত হতেন না৷ বর্তমান APMC আইনের আওতাতেই পরিকাঠামোর খোল-নলচে বদলে প্রতিটি ব্লক স্তরে মান্ডি আর হিমঘর নির্মাণ করা যেত। তাতেও কৃষকদের ক্ষমতায়ন হত। সরকারের কাছে এর ব্যয়ভার বেশি মনে হলে কৃষক সমবায়গুলোর সঙ্গে যৌথ মালিকানায় কাজ করা যেত। প্রতি বছর কিছু অর্থ সরকারকে দিয়ে সমবায়গুলো ক্রমশ এইসব পরিকাঠামোর আংশিক মালিকানা কিনে নিতে পারত এবং প্রয়োজনীয় মেরামতির ব্যয়ভারও বহন করত।

এরকম কোনও একটা পথে বা এর চেয়েও উন্নত বিকল্প পথে হাঁটার জন্য প্রয়োজন ছিল সদিচ্ছা, পরিশ্রম এবং কিছুটা সময়। সেগুলো বর্তমান ভারত সরকারের নেই, বদলে আছে কর্পোরেট ভারত নির্মাণের তাড়না। এই তাড়নার কারণেই সাধারণ মানুষ বা কৃষকদের পক্ষে সরকারের উপর আস্থা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চাপে পড়ে মুখে তাঁরা মুখে যতই বলুন যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা মান্ডি তুলে দেওয়া হবে না, চাপ কমে গেলেই যে তাঁরা এগুলো তুলে দিয়ে কর্পোরেটদের বিজয়পথের কাঁটা সরাবেন, তা মোটামুটি সবাই জানে। মহামারিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা আলোচনা এড়িয়ে তড়িঘড়ি এমন আইন করার মধ্যেও ফুটে উঠছে তেমন অসদিচ্ছারই ছবি। অতীতে সরকার বহুবার কথা রাখেননি এবং কথা বদলেছেন। এই সরকারের প্রতিশ্রুতির বাজারদর তাই তলানিতে ঠেকেছে।

যেটা হবে, তা হল একদিকে উপভোক্তা উচ্চ মূল্যে জিনিস কিনতে বাধ্য থাকবেন, অন্যদিকে বহু কৃষক, খুচরো ব্যবসায়ী, ছোট আড়তদারকে কর্পোরেট আগ্রাসনের সামনে টিকতে না পেরে কৃষি ও কৃষিজ বিপণনের কাজ ছেড়ে চলে যেতে হবে। কোথায় যাবেন? বিকল্প স্বাধীন ব্যবসা বা চাকরির সুযোগ কি আছে? এমনিতেই বেকারের সংখ্যা ৭% ছাড়িয়েছে, তাঁদেরই ব্যবস্থা হচ্ছে না, আবার নতুন লোক! এঁরা বেরিয়ে গেলে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা একদিনে ধসে পড়বে, এমন ভাবার কারণ নেই। সনাতন কৃষি ব্যবস্থায় নব্বই শতাংশের বেশি মানুষ কৃষিকাজ করতেন আর তাঁদের উৎপাদনে পেট চলত বাকি পাঁচ থেকে দশ শতাংশের। শিল্পায়নের পর প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বহু উন্নত দেশে পাঁচ শতাংশের কম মানুষ (কোথাও এক শতাংশের মতো) কৃষিকাজ করেন। সুতরাং কৃষির সম্পূর্ণ কর্পোরেটায়ন হলে বিপুল কর্মসঙ্কোচনের পরেও উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব, কিন্তু দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবেন। পাশাপাশি শুধুমাত্র বাজারের স্বার্থে যাবতীয় নীতি পরিচালিত হলে ফসলের বৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির যে ক্ষতি হবে, তাও অপূরণীয়।

কৃষ্ণগহবরের খুব কাছাকাছি চলে গেলে তাকে এড়িয়ে পালানো অসম্ভব, এমনকি আলোও পারে না। বিলুপ্তির জন্য অপেক্ষা না করে যথেষ্ট সময় থাকতেই অভিমুখ বদলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা উচিত। সময় খুব বেশি নেই। শেষ সুযোগ এখনই।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...