তুষার ধারা
দ্য ওয়ার-এর সাংবাদিক তুষার ধারা এসআইআর চলাকালীন দেড় মাস ধরে বিহারে ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, কথা বলেছেন বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে। তাঁর সেই অভিজ্ঞতা তিনি বললেন গত ১৫ নভেম্বর অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট আয়োজিত একটি আলোচনাসভায়। তাঁর সেই আলোচনাটিই এখানে প্রকাশ করা হল অল্টারনেটিভ ভিউপয়েন্ট-এর সহযোগিতায়
মিতুলদা যখন প্রথম এই আলোচনার কথা জানাল, তখন আমি কিছুটা আশঙ্কিতই হয়েছিলাম। তারপরে একটু চিন্তাভাবনা করতে কিছুটা উৎসাহী হলাম। কারণ, কলকাতায় কোনও গ্রুপের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলা— যেটাকে আড্ডা বলা হয়— সেটা কিন্তু বেশ লোভনীয় একটা বিষয়।
আমি আলোচনাটা তিন ভাগে করতে চাই। প্রথম ভাগে, গতকাল ভোটের যে ফল বেরোল, সে-নিয়ে কিছু কথা বলব। দ্বিতীয় ভাগে, বিহারে আমি যে দেড় মাস ধরে ঘুরছিলাম— পাটনাতে আমার ডেরা ছিল, কিন্তু আমি ঘুরে বেড়িয়েছি গোটা রাজ্যেই— সেখানে আমার যা যা পর্যবেক্ষণ, আমি যা যা দেখেছি, সে নিয়ে বলব। আর তৃতীয় ভাগে আমি এই পুরোটা একটা বড় ফ্রেমওয়ার্কে ধরার চেষ্টা করব।

নির্বাচনী ফলাফল
এখন তো সবাই জেনেই গেছেন বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল কী হয়েছে। এরকম একটা ফল কী করে হল, সে নিয়ে এখনও কারও কাছেই কোনও সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই। এনডিএ পেয়েছে ২০২টি আসন, যেটা ২০২০-তে ছিল ১২৫। চমকে দেওয়ার মতো উলটপুরাণ। মহাগঠবন্ধন পেয়েছে ৩৫টি আসন। তাদের ১১০টা আসন কমে গেছে। এটাও চমকে দেওয়ার মতো সঙ্কোচন।
দল ধরে ধরে ফলটা এরকম: ২০২০-তে বিজেপির আসন ছিল ৭৪টা, এবার হয়েছে ৮৯টা। জেডিপির ৪৩টা থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫টা। এলজেপি, মানে রামবিলাস পাসোয়ানের দলের ২০২০-তে ছিল ১টা আসন, এবারে হয়েছে ১৯টা। এইচএএম বা হিন্দুস্তানি আওয়াম মুভমেন্টের আসন ৪ থেকে ৫ হয়েছে। আরএলএম ২০২০-তে লড়েনি, এবারে ৪টে আসন পেয়েছে। এই গেল এনডিএর হিসাব। ইন্ডিয়া জোটে আরজেডির আসন ৭৫ থেকে ২৫ হয়েছে। কংগ্রেসের হয়েছে ৬, ছিল ১৯টা। লিবারেশন বা মা-লে ১২টার থেকে ২টো হয়েছে। আর এমআইএম-এর আগেরবারও ৫টা আসন ছিল, এবারও তাই রয়েছে।
শতাংশের পরিবর্তনের দিকে যদি তাকানো যায়— বিজেপির আসন বেড়েছে ২০ শতাংশ, জেডিইউ-র বেড়েছে ৯৭ শতাংশ, চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি-র বেড়েছে ১৮০০ শতাংশ— আসনসংখ্যা ১টার থেকে ১৯টা হয়েছে, এইচএএম— যারা আসলে অ-পাসোয়ান দলিতদের দল, যেমন মুশাহার ইত্যাদি— তাদের আসন বেড়েছে ২৫ শতাংশ। আসলে, এনডিএ জোটটা জাতপাতের সমীকরণ মাথায় রেখে এমনভাবে করা রয়েছে, যে সমস্ত পার্টিগুলো যেন আলাদা আলাদা জায়গায় লড়ে। চিরাগ পাসোয়ান, জিতেন রাম মাঝি বা দীপেন্দ্র কুশওয়াহা-র আরএলএফ— সবাই আলাদা লড়ে। কিন্তু সবার ভোটই এনডিএ-র ঝুলিতে জমা হয়। আরজেডির আসন কমেছে ৬৬ শতাংশ। কংগ্রেসের ৬৮ শতাংশ। মালে-র ৮০ শতাংশ।
দেখা যাচ্ছে বিজেপির আসন বেড়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। আরজেডি এবং কংগ্রেসের যে বিপুল আসন-হ্রাস হয়েছে তার ফায়দা তুলেছে জেডিইউ। মনে রাখা দরকার, ২০২০-তে কিন্তু একক পার্টি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন ছিল আরজেডির— ৭৪টা। জেডিইউ কিন্তু মাঝখানে বেশ দুর্বল হয়ে গেছিল। এর ফলে নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তাঁর দরকষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমে গিয়েছিল। এনডিএ জোটে প্রথম থেকেই নীতিশ কুমার কিন্তু মুখ্য চরিত্র। বিজেপিও সেটা মেনে নিয়েছিল। বিজেপি যেটা করেছিল, নীতিশের চারপাশে কয়েকজন অফিসার লাগিয়ে দিয়েছিল, যারাই প্রকৃতপক্ষে বিহারকে নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু জেডিইউ যখন কমে প্রায় বিজেপির কাছাকাছি চলে এসেছিল, তখন নীতিশ কুমারের দরকষাকষির ক্ষমতাও স্বভাবতই অনেক কমে গিয়েছিল। গত পাঁচ বছরে কিন্তু বিহারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনাও অনেক বেড়েছে। এর কারণও এটাই— নীতিশ কুমারের শক্তি কমা, এবং বিজেপির বাড়া। সেই হিসেবে বলা যায়, আগামী পাঁচ বছরে বিহারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা কিছু কমবে, কারণ নীতিশ কুমারের বাফার কিছুটা বাড়ল। আবার নীতিশ কুমারের যে ‘পাল্টুরাম’ ইমেজ আছে, সেটাও এবার কিছুটা সমস্যায় পড়ল, কারণ আরজেডি বা কংগ্রেসের আসন এতটাই কমেছে যে নীতিশ যদি আবার পাল্টিও খান, তাহলেও ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে সরকার গঠন করা যাবে না। ফলে নীতিশের ভবিষ্যৎ আপাতত এটাই— তাঁকে বিজেপির সঙ্গেই থাকতে হবে, এবং যেহেতু তাঁর বাফার বেড়েছে, ফলে তিনি সরকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা বাড়াতে পারেন। কিন্তু অতীতের মতো এবার আর তিনি সম্ভবত জোট ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন না।
৬৯টি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ৬২টিই পেয়েছে এনডিএ। এর মধ্যে মাল্লা-নিষাদ-অধ্যুষিত ২৩টি আসন— রাহুল গান্ধি যেদিকে খুবই নজর দিয়েছিলেন, নদীতে ডুবও দিয়েছিলেন, কারণ মাল্লারা পেশাগতভাবে মাঝি। এই ২৩টি আসনের মধ্যে ২১টিই এনডিএর দখলে গেছে। ইবিসি-দের ১৪১টি আসনের মধ্যে ১১৩টিই এনডিএ দখল করেছে। যাদব-অধ্যুষিত আসনগুলিতে ৭০ শতাংশ ভোট আরজেডি পেয়েছে— প্রত্যাশিতভাবেই। যেটা অপ্রত্যাশিত সেটা হল যাদবদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মানুষ আরজেডিকে ভোট দেননি, অন্য কাউকে, অর্থাৎ এনডিএকে দিয়েছেন। ফলে যেটা দেখা যাচ্ছে, দলিত, ওবিসিদের মধ্যেও নিম্নবর্গীয়রা, কুটনি-কৈরিরা, এবং অ-প্রাধান্যকারী অবস্থানে থাকা ওবিসিরা খুব শক্তভাবে এনডিএর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। শুধু মুসলিম আর যাদবরাই ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে থেকেছেন।
২০২০-তে কী হয়েছিল? ২০২০-তে এনডিএর এই যে আসনগুলো, এগুলো একটু ঘেঁটে গিয়েছিল। কারণ জেডিইউ, এলজেপি বাদে অন্য আর যেসব ছোট ছোট পার্টিগুলি রয়েছে, তারা আলাদা-আলাদাভাবে ভোটে লড়েছিল। ফলে এনডিএর তৈরি করা কোর ভোটবেস যেটা, সেটা অবিন্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমার অবশ্য আরও একটা তত্ত্ব রয়েছে। ২০২০-র বিহার নির্বাচন হয়েছিল মাইগ্র্যান্ট সংকটের ঠিক পর-পরই। কোভিডের সময় অভিবাসী শ্রমিকদের যে অভূতপূর্ব দুর্দশা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল, তার পরেই বিহারে ভোট হয়। আর সে নিয়ে বিহারবাসীর যে ক্রোধ তৈরি হয়েছিল সেটা পুরোটাই গিয়ে পড়েছিল নীতিশ কুমারের ওপর। আমার মনে হয়, সর্বস্বান্ত অভিবাসী শ্রমিকদের এবং তাঁদের পরিবারের এই ক্রোধের ফলেই জেডিইউ-এর আসন ব্যাপক কমে গিয়েছিল, যার ফায়দা তুলেছিল মালে, আরজেডি আর কংগ্রেস। এবারে আর সেই পরিস্থিতি ছিল না। ফলে বলা যায়, বিহারের রাজনীতি যেন আবার পুরনো নিয়মে ফিরে গেছে।
বিহারের রাজনীতিটা বোঝা দরকার। এখানে দুটো নির্দিষ্ট মেরু রয়েছে। এক হল বিজেপি, আরেক হল আরজেডি। এই দুই পক্ষের যাঁরা ভোটার, তাঁরা কিন্তু কোনও পরিস্থিতিতেই অপর পক্ষকে ভোট দেবেন না। বিজেপির ভোটার বেস মূলত উচ্চবর্ণ, কিছু ইবিসি এবং দলিত। আর আরজেডির মুসলিম এবং যাদবরা। বিহারের রাজনীতিতে এই দুই চরম বিপরীত মেরুর মধ্যে মধ্যবর্তী স্থিতিশীল উপাদানটি হলেন নীতিশ কুমার। তাঁর ভোটার-বেস হল এনডিসি, ইবিসি, অ-যাদব ওবিসি, দলিত এবং মহিলারা। মহিলাদের কিন্তু নীতিশ খুব সতর্কভাবে ব্যবহার করেছেন, এবং তাঁরা এবারের ভোটে একটা নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছেন। তাই নীতিশই হচ্ছেন এই দুই চরম মেরুর মধ্যেকার ভাসমান উপাদানটি। তিনি যেদিকে ঢলে পড়বেন, কুর্সিও সেই দিকেই ঢলে পড়বে। শেষবার ২০২০-তে আমরা দেখেছিলাম, বিজেপির মেরুটা একটু ঘেঁটে গিয়েছিল, নীতিশও তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন, অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সিও বেশ জোরদার ছিল। এবার আমরা দেখলাম, বিজেপি নিজেদের দিকে থাকা সব দলগুলিকে আবার নিজেদের দিকে নিয়ে এসে শিবির গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। মহিলাদের বিষয়টা বিশেষ করে উল্লেখ্য— বিহারের ইতিহাসে কিন্তু মহিলাদের ভোটদান এবারে রেকর্ড করেছে। মনে রাখতে হবে, এসআইআরে কিন্তু প্রচুর মহিলার নাম বাদ পড়েছে, তার পরেও।
ভোট শতাংশের বিচারে দেখলে এনডিএ ৬-৭ পার্সেন্টেজ পয়েন্টে এগিয়ে আছে। মহাগঠবন্ধন যেখানে পেয়েছে ৪০ শতাংশ ভোট, সেখানে এনডিএ পেয়েছে ৪৭ শতাংশের কাছাকাছি। প্রথম কথা হচ্ছে, এতে খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ গত লোকসভা ভোটেই এনডিএ বিহারের ৪০টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৩১টি, অর্থাৎ তিন-চতুর্থাংশ আসন জিতেছিল। রাজ্যসভাতে এনডিএ-র অনুপাত চার-পঞ্চমাংশ। ফলে এনডিএ-র সাফল্য এবারে একদম চরম সীমায় চলে গেলেও তাতে খুব বেশি অবাক হওয়ার নেই। অবাক হওয়ার বিষয় ছিল বরং মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানায়। এই রাজ্য দুটিতে লোকসভায় যে ফল হয়েছিল, অর্থাৎ যেখানে বিজেপি ভালো ফল করেনি, ছয় মাসের মধ্যে হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে তা প্রায় সম্পূর্ণ উলটে গেছিল। এটা অভূতপূর্ব। ভারতীয় রাজনীতিতে এরকম ঘটনা কখনও ঘটেছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। সেই হিসেবে আমি বলব, মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনের ফল অনেক বেশি আশ্চর্যজনক ছিল। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল বরং পূর্ববর্তী লোকসভা নির্বাচনের ফলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রসঙ্গ, এসআইআর
এসআইআর যে কোনও পার্থক্য করেনি সেটা কিন্তু বলা যাবে না। কারণ, বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল ভোটার সংযুক্তি, গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা এবং ভোটার তালিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিহারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন খুবই অস্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে। এসআইআরের প্রশ্নটি বরাবরই ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার্য। এমনকি যদি এই ভোটের ওপর এসআইআরের কোনও প্রভাব নাও থাকে, তাহলেও আদর্শগতভাবে ন্যায্যতার প্রশ্নটি তামাদি হয়ে যায় না। আমি কিছু রিপোর্ট দেখেছি— এখনও সেগুলির সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ পাইনি— তাতে দেখছি লোকজন বলছে, এসআইআরে যে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম কাটা গেছে, তাতে ভোটের ফলে ৩ শতাংশের বেশি হেরফের হওয়ার সুযোগ ছিল না। এখনও সেসব সংখ্যা নিয়ে কিছু বলছি না, কিন্তু আমার যেটা মনে হয় এনডিএর পক্ষে যেসব সূচকগুলি কাজ করেছে, তাদের মধ্যে এসআইআর অন্যতম একটি মাত্র। তাই শুধু এসআইআরকেই একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলে আমরা ভুল করে ফেলব। অন্য কারণগুলি আমাদের নজরের বাইরে চলে যাবে।
বিজেপির পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হল আসাম এবং পশ্চিমবাংলা। পরের বছর আসাম, পশ্চিমবাংলা, তামিলনাড়ু, কেরালা এবং পন্ডিচেরিতে ভোট আছে। আসাম ধরে রাখা এবং পশ্চিমবাংলায় জেতা— এগুলির মধ্যে এ-দুটোই বিজেপির মূল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তারপরও প্রকৃত বড় লড়াই আসছে উত্তরপ্রদেশে। ২০২৭-এ। কারণ যদি ২০২৭-এ উত্তরপ্রদেশ ধরে রাখা যায়, তবে ২০২৯-এ আবার লোকসভা ভোটে জেতার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিহারের ফল বেরোনোর পর থেকেই বিজেপির নেতা-কর্মীরা পশ্চিমবাংলা সম্পর্কে বেশ আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছেন। “বিহার তো ঝাকি হ্যায়/ওয়েস্ট বেঙ্গল আব বাকি হ্যায়”— এই জাতীয় স্লোগানও শোনা যাচ্ছে। এগুলি খুবই নিম্নরুচির কথাবার্তা এবং এতে তাদের ঔদ্ধত্য এবং ঘৃণাই প্রতিফলিত হচ্ছে। এই ঔদ্ধত্য এবং ঘৃণা শুধু যে বাংলা এবং বাঙালিদের জন্য তা-ই নয়; একজন দক্ষিণ ভারতীয় হিসেবে বলতে পারি, এই ঔদ্ধত্যের লক্ষ্য আমরাও। ফলে এখন আমাদের একজোট হয়ে দাঁড়ানোই একমাত্র রাস্তা।
এসআইআরের কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে এবার বলি। গত ২৪ জুন যখন এসআইআরের কথা ঘোষণা করা হল, তখন বিহারে ৭.৮৯ কোটি ভোটার ছিলেন। এর মধ্যে থেকে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হল। ৮ আগস্টে যে খসড়া প্রকাশ করা হল তাতে ভোটার-সংখ্যা দাঁড়াল ৭.২৪ কোটি। এর মধ্যে থেকেও অযোগ্য বলে ৩.৬৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হল, এবং ২১.৫৩ লক্ষ ভোটারের নাম যোগ করা হল যাদের প্রথম দফায় বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় মোট ভোটার-সংখ্যা দাঁড়াল ৭.৪২ কোটি। তাহলে মোট ৪৭ লক্ষ ভোটারকে এই প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া হল। এবার এই যে যাঁদের নাম বাদ পড়ল, বা পরে আবার জুড়ে দেওয়া হল, এই পুরো বিষয়টিতেই কোনওরকম স্বচ্ছতা ছিল না। কীভাবে এসব হল, কেউই ঠিকমতো জানে না, এবং নির্বাচন কমিশনও এ-বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। যদি এ-ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হয়, তবে তার একমাত্র রাস্তা ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করা— যেটা খুবই কঠিন একটি প্রক্রিয়া। আমার এরকম ডোর-টু-ডোর যাচাই করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে— ফলে নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সেটা বলতে পারি। মা-লে অভিযোগ করেছে তাদের জেতা একটি আসন সিতামারি থেকে ৩০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাঁরা তাদের সমর্থক। কিন্তু সে-ব্যাপারে কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? আপনাকে প্রতিটা ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে— যেটা, আগেই বললাম, খুবই কঠিন একটি প্রক্রিয়া। বিরোধী দলগুলির হয় সেই সংগঠন নেই, আর সংগঠন থাকলেও সেই শৃঙ্খলা নেই। ফলে বিহারে এই এসআইআরের হাল খুবই খারাপ। আমার আশা বাংলায় এতটা খারাপ হবে না, কারণ এখানে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল রয়েছে, যারা ক্ষমতায় আছে। মনে হয় তাদের সেই সাংগঠনিক শক্তি আছে, শৃঙ্খলা আছে কিনা সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই, তবে এটা আশা করা যেতে পারে যে এসআইআর নিয়ে বিহারে যা হয়েছে বাংলায় সেটা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
বিহারে আমি এসআইআরের একটা ইন্টারপ্রিটেশন শুনেছি— স্বাধীনতার পর, বা নির্দিষ্ট করে বললে ১৯৫০ থেকে ভারতে সর্বজনীন ভোটাধিকারের যে ব্যবস্থাটা চলছে, সেটা ভাঙার জন্য এই সব উদ্যোগ।
এসআইআর বিহারের ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ করেনি। এখনও বিহারের ভোটার তালিকায় প্রচুর গণ্ডগোল আছে, প্রচুর ভুলভ্রান্তি আছে। এরকমও অনেক কথা শোনা যাচ্ছে যে বিজেপির প্রচুর ভোটারকে ট্রেনে-বাসে করে নিয়ে আসা হয়েছে। যাই হোক, সে-সব ধরছি না। ধরে নিচ্ছি এঁরা অভিবাসী, এবং অভিবাসীরা ভোট দেওয়ার জন্য নিজেদের জায়গায় আসেন। ডাবল ভোটিং-এরও অনেক অভিযোগ আছে। অনেক ভোটার নাকি দু-তিন জায়গায় ভোট দিয়েছেন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এইসব অভিযোগ যেখানে জানানো যেতে পারে সেই আদালতও স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। ফলে এগুলি সব এরকম কাহিনি হিসেবেই থেকে যাবে। এইজন্যই এসআইআর এই বিধানসভা ফলে কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বলা খুব মুশকিল। কারণ বিহারে কারও কাছেই এই মুহূর্তে কোনও পরিসংখ্যান নেই। সে সিভিল সোসাইটিগুলি বলুন, বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি— কারও কাছেই সেই পরিসংখ্যানগুলি নেই যেগুলি দিয়ে পুরো বিষয়টা মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। বলা যেতে পারে যে, এসআইআরের ফলে এদের এত ক্ষতি হয়েছে, কি ওই পক্ষের এতটা লাভ হয়েছে। একটা জিনিস ভেবে দেখুন, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক বা হরিয়ানাতেও অসঙ্গতিগুলি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায়নি, বোঝা গেছিল ছ-মাস কি এক বছর পর। ফলে এসআইআরের সঠিক প্রভাব কতটা সেটা জানার জন্য আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
কোন কোন জেলায় সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে তার একটা তালিকা এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছেন পাটনা জেলায়— ৩.৯৫ লক্ষ, অর্থাৎ প্রায় ৪ লক্ষ। তার পরে পর পর আসছে গোপালগঞ্জ, মধুবনি, পূর্ব চম্পারণ, সীতামারি, পূর্ণিয়া, দ্বারভাঙ্গা ইত্যাদি। এবার পাটনাতে যে এতগুলো নাম বাদ পড়েছে— প্রায় চার লাখ— তারও কোনও সুনির্দিষ্ট ম্যাপিং, অর্থাৎ কোন জায়গায় কতজন বাদ পড়েছে তার হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। গোপালগঞ্জ, মধুবনি ইত্যাদি সমস্ত জেলার ক্ষেত্রেই এ-কথা সত্য। এখন, শুধু যে বিরোধীরা যেখানে শক্তিশালী সেই জায়গাগুলিতেই বেশি বেশি করে ভোটার বাদ পড়েছেন এরকম অভিযোগও করা যাচ্ছে না। কারণ আমরা জানি, অন্যান্য সমস্ত শহরাঞ্চলের মতোই পাটনা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। ফলে, যা বলছিলাম, বিজেপি-বিরোধী এলাকাগুলিতে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, এরকম বলে দেওয়াটাও একদমই ঠিক হবে না। আসলে এই সরকার খুবই ধূর্ত। তাদের কাজকর্ম নিয়ে ফেসবুক বা সোশাল মিডিয়ায় বিভিন্ন চর্চা হয়, নানান তত্ত্ব খাড়া করা হয় বটে— কিন্তু এসব সোশাল মিডিয়ায় চলতে থাকে। আসল কাজটা হল একদম গভীরে গিয়ে নিবিড় তথ্যানুসন্ধান করে দেখিয়ে দেওয়া যে এই জন্য এই হল। এসআইআরের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে কিছু বলা তাই একেবারেই অসম্ভব, অন্তত আমার মতে।
জাতপাতের সমীকরণ
এসআইআর ছাড়া অন্য যে বিষয়গুলি এনডিএর পক্ষে গেছে সেগুলি দেখা যাক। জাতপাতের সমীকরণ। পাসোয়ানরা চিরাগ পাসোয়ানকে ভোট দিয়েছে— যেটা আগেরবার হয়নি। অ-প্রাধান্যকারী অবস্থানে থাকা দলিতরা ভোট দিয়েছেন হিন্দুস্তানি আম মোর্চাকে। কুশওয়াহারা ভোট দিয়েছেন উপেন্দ্র কুশওয়াহাকে। এই যে ১০০০০ টাকা করে নীতিশ কুমারের সরকার দিল, সেটাকে আমার মতে রাজনৈতিক উৎকোচ বলা যেতে পারে। নির্বাচনী আচরণবিধি বলবৎ হয়ে যাওয়ার পরে এর বিতরণ হওয়াই তা প্রমাণ করে। নীতিশ কিন্তু আগে থেকেই একটা সুস্পষ্ট মহিলা ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছেন। এমন একটা মহিলা ভোটব্যাঙ্ক যাঁরা নিজেদের মতামত অনুসারে ভোট দেন। তাঁরা তাঁদের স্বামী বা ভাই বা অন্য কোনও পুরুষকে জিজ্ঞেস করেন না যে আমরা কাকে ভোট দেব। এই ১০০০০ টাকা যেন সেই কেকের ওপর আইসিং-এর কাজ করেছে। সরকারের বার্তা যেন— দেখো, আমরা গত ২০ বছর ধরে তোমাদের সঙ্গে রয়েছি, এই হল তার প্রমাণ। এর বাইরেও নীতিশ সরকার অনেক রকমের পেনশন, অনুদান, ভাতা, স্টাইপেন্ড ইত্যাদি চালু করেছে। এখন বিহারের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরে এগুলি কীরকম প্রভাব ফেলবে, সে ভিন্ন প্রশ্ন। এবার নীতিশের হাতে দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। ফলে আশা করা যায় তিনি কেন্দ্র থেকে বেশি টাকা আনতে পারবেন।
বিহারকে নিয়ে জঙ্গলরাজ-এর যে কথা চালু ছিল, সেটা অনেকটাই কাটিয়ে ফেলা নীতিশের একটা কৃতিত্ব। কিন্তু জঙ্গলরাজ-এর এই যে ভয়টা, যেটা ৯০ দশকে লালুপ্রসাদের আমলে যখন বিহারের ল অ্যান্ড অর্ডার পরিস্থিতি প্রায় ভেঙে পড়েছিল— শুধু ল অ্যান্ড অর্ডারই নয়, শিক্ষাব্যবস্থাও প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল— সেই স্মৃতি মানুষের মধ্যে থেকে গেছে। আরজেডিকে ফেরানো মানে আবার সেই সময়টা ফিরে আসবে— এরকম একটা ধারণা কিন্তু বিহারের গণমানসে যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। আমি নিজে অনেককে জিজ্ঞেস করেছি, যে আপনারা নীতিশ কুমারকে কেন ভোট দেন? এই ২০ বছর ধরে যে ওঁকে ভোট দিয়ে যাচ্ছেন— কেন? তাঁরা সেই সময়ের কথা তুলেছেন, বলেছেন, তখন আমরা সন্ধ্যা ৬টার পর বাইরে বেরোতে পারতাম না। সেই সময়ে কত কিডন্যাপিং, কত খুন হয়েছে সেসব মনে পড়ে যায় মানুষের। আমার কেমন মনে হয়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়াতে ৯০-এর দশকে যেরকম অরাজকতা দেখা গিয়েছিল, বিহারের ঘটনার সঙ্গে তার যেন অনেকটা মিল আছে। রাশিয়ার সেই অরাজক সময়ই ভ্লাদিমির পুতিনের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল। যিনি এখন একজন একনায়কে পরিণত হয়েছেন। বিহারকে আমি ঠিক সেরকম বলতে চাইছি না, কিন্তু ঘটনা হচ্ছে সেই সময়ের অরাজকতার আতঙ্ক ভোটারদের মনে এখনও ভালোই গেঁথে রয়েছে, এবং সেই কারণেই তাঁরা একজন শক্তিশালী কোনও নেতার কথা ভাবেন যিনি আইনের শাসন কায়েম করতে পারবেন।
উচ্চবর্ণের কথা বলা যাক। ব্রাহ্মণ, ভূমিহার, রাজপুত। বিহারে বানিয়ারা উচ্চবর্ণ নন, তাঁরা ওবিসি-তালিকাভুক্ত। ১৯৯০ সালে লালু যখন ক্ষমতায় এলেন, তিনি মূলত যাদব-মুসলিম সমীকরণ কাজে লাগালেও, তাঁর ক্ষমতায় আসা বিহারে গোটা পিছড়ে বর্গ বা নিম্নবর্ণের মানুষদের একটা উত্থান ছিল। তার পরে আরজেডি ধীরে ধীরে শুধু যাদব বা শুধু যাদব-মুসলিমদের প্রতিনিধি হয়ে গেল। তখন থেকে যেটা হল, অ-যাদব ওবিসি এবং দলিতদের ক্ষেত্রটা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেল। কারণ যাদবরা— এটা বলাটা হয়তো পলিটিক্যালি কারেক্ট হবে না— কিন্তু ঘটনা হল, যাদবরাও অন্য জাতদের ওপর অনেক ছড়ি ঘুরিয়েছে। নীতিশ আসার পর তিনি নতুন করে জাতবিন্যাস করলেন। অ-প্রাধান্যকারী ওবিসিদের তিনি নিয়ে এলেন এক্সট্রিমলি ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস বা ইবিসি-দের মধ্যে। কাহার, লোহিয়া, লোহার, ডাঙ্গি, বেলদার, নাই, ধানি এইরকম সব ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলি বিসি-১-এ অন্তর্ভুক্ত হল। আর বিসি-২-তে এল প্রাধান্যকারী অবস্থানে থাকা ওবিসিরা— যেমন, যাদব, কুর্মি, কুশওয়াহা এবং গুপ্তা-রা। এদের মধ্যেও যাদবদের বাদ দিয়ে কুর্মি, কুশওয়াহা এবং গুপ্তাদের দিকেও নীতিশ মনোযোগ দিলেন। ফলে বিসি-১, অর্থাৎ ইবিসি-রা নীতিশের সঙ্গে তো রইলই, বিসি-২-র মধ্যেও যাদব ছাড়া বাকিরা চলে এল নীতিশের সঙ্গে। এরপর দলিতদের মধ্যেও নতুন করে বিন্যাস করা হল। প্রাধান্যকারী দলিত, অর্থাৎ পাসওয়ানরা, যাঁদের দলিতদের মধ্যে ব্রাহ্মণ বলা হয়, তাঁদের বাদ দিয়ে অন্যান্য অ-প্রাধান্যকারী অবস্থানে থাকা দলিতদের তিনি ‘মহাদলিত’ গোষ্ঠীভুক্ত করলেন। এঁরাও অনিবার্যভাবেই নীতিশের পক্ষে এলেন। ফলে বিসি-১, যাদব বাদে বিসি-২, মহাদলিত, এবং মহিলা— এই মিলিয়ে তৈরি হল নীতিশের সামাজিক ভিত্তি বা ভোটব্যাঙ্ক। এর সঙ্গে বিজেপি নিয়ে এল উচ্চবর্ণদের। ভূমিহার, ব্রাহ্মণ, রাজপুতদের। এটা কিন্তু বেশ শক্তিশালী এবং সমীহ করার মতো জোট। এটা যদি পুরোপুরি ক্লিক করে যায়, তবে কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই একটা দুর্গের আকার নেবে।
এদিকে মুসলিমরা কিন্তু আবার কিছুটা এমআইএম-এর দিকে ঝুঁকেছেন— এ-নিয়েও বিস্তারে আলোচনা করব পরে। মুসলিমদের এই প্রবণতা শুরু হয়েছে ২০২০ থেকে, এবং এইবারেও অব্যাহত রয়েছে।
আমার আলোচনার প্রথম পর্বে শেষ যে বিষয়টা আমি উল্লেখ করব সেটা হল— গত এক দশক ধরে এই যে বিসি-১ যে গ্রুপটা, তারা প্রবলভাবে মুসলিম-বিরোধী হয়ে উঠেছে। এই বিষয়টাও কিন্তু বিহারের রাজনীতিতে একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
আমার বিহারবাসের অভিজ্ঞতা
এবার আমি আমার বিহারবাসের অভিজ্ঞতার কথা বলি। জুন মাসে এসআইআরের কথা ঘোষণা করা হয়, তখনই আমি বিহার যাওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করি। পরিকল্পনা করা শুরু করি, লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলা শুরু করি, লোকজনকে ডেকে ইস্যুগুলি নিয়ে খোঁজখবর করা শুরু করি, পড়াশোনা করাও শুরু করি। বিহার পৌঁছই জুন মাসের মাঝামাঝি। ওখানে গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। জানতে চেষ্টা করি, এসআইআর প্রক্রিয়া কেমন চলছে, বিহারের সমাজ, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির ওপর এর কীরকম প্রভাব পড়ছে। বিহারে সিভিল সোসাইটির অনেকগুলি গ্রুপ আছে। এই গ্রুপগুলি এসআইআর নিয়ে শহরের বস্তি-অঞ্চলগুলিতে নানারকম সার্ভিস দিচ্ছে। যেমন পিইউসিএল। বিহারে পিইউসিএল-এর বেশ লোকজন আছে। আমি প্রথমে তাদের সঙ্গেই গেলাম। এই সার্ভিস মানে শুধু যে আবেদন করা, সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা— তা-ই নয়, এরা তথ্য সংগ্রহও করছে। একটা কোশ্চেনেয়ার বানানো হয়েছে। যেমন— এসআইআরের ফর্ম ভরেছেন কিনা; বিএলও আপনার বাড়িতে এসেছিল কিনা; ইত্যাদি। বিহারে বিএলও-রা এনুমারেশন পর্বেই ডকুমেন্ট সংগ্রহ করছিলেন, সেটা কিন্তু বাংলায় হচ্ছে না। বাংলায় এই ডকুমেন্ট জমা দিতে বলা হয়েছে হিয়ারিং-এর সময়ে। বিহারে কিন্তু এই ডকুমেন্টগুলি বিএলওরা প্রত্যেকের কাছ থেকে সংগ্রহ করছিলেন। ফলে অনেক রকম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। বিএলওরা বুঝতে পারছিলেন না যে ১১টি ডকুমেন্টের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে কতগুলি নিতে হবে; যাঁদের কাছে ওই ১১টির কোনওটিই নেই, তাঁদের থেকে আধার নেওয়া যাবে কি না— ইত্যাদি। এই প্রেক্ষিতেই পিইউসিএল-এর ওই সমীক্ষা করা হচ্ছিল। এই সমীক্ষায়, আমি দেখেছি, এক-একটা বাড়িতে প্রায় পনেরো মিনিট করে সময় লাগছিল। বিএলও এসেছিলেন কিনা, ফর্ম ভরেছেন কিনা, ডকুমেন্ট দিয়েছেন কিনা, কী কী ডকুমেন্ট দিয়েছেন— ইত্যাদি জানার জন্য। এই সমীক্ষা থেকে, আমি লক্ষ করছিলাম, কিছু ডিজাইন ফুটে উঠছিল। আমি ওঁদের বলেওছিলাম সেটা। কিন্তু ওঁরা আসলে শুধুই টেকনিক্যাল ডেটা সংগ্রহ করছিলেন সুপ্রিম কোর্টে যদি মামলা করা হয় সে জন্য।
আমি তখন, পাটনা শহরের কেন্দ্রস্থলে একটা রাস্তা আছে— এমন একটা রাস্তা, যেখানে সমস্ত পার্টির অফিস আছে, আরজেডি, জেডিইউ, বিজেপি, কংগ্রেস, সবারই— সেখানে একটা বস্তিতে আমি কিছু সময় কাটালাম। ওই বস্তিতে দুটো ভাগ। একটা হিন্দু বস্তি, একটা মুসলিম বস্তি। আমি সেই সন্ধেটা হিন্দু বস্তিতে কাটালাম। ওঁরা ওঁদের সার্ভে করছিলেন, আমি ভাবলাম আমি তাঁদের সঙ্গে আলাদা করে একটু সময় নিয়ে কথা বলে দেখি। দেখলাম, তাঁরা সবাই বিজেপির ভোটার। আসলে বিষয়টা হচ্ছে যদি আপনি শুধুই তাঁদের নাম-ধাম-ফর্মফিলাপ ইত্যাদি টেকনিক্যাল ডেটাই সংগ্রহ করেন পরে সুপ্রিম কোর্টে কাজে লাগবে বলে, আপনি কিন্তু তাঁদের মনোভাবটা ধরতে পারবেন না। ওখানেই আমার প্রথম চমকটা লাগে। আমি ৩-৪টে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। এবং আমি বুঝেছিলাম যে তাঁদের মধ্যে কিন্তু খুব একটা উদ্বেগ নেই। কাগজপত্রের যাই গণ্ডগোল থাকুক, তাদের ভাবটা অনেকটা এরকম— ও ঠিক আছে, হয়ে যাবে।
বিহার নিয়ে কিন্তু প্রচুর ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন ওখানে মারামারি খুনজখম খুব বেশি। আবার বিহার খুবই রাজনৈতিক রাজ্য, ওখানকার মানুষদের রাজনৈতিক সচেতনতা বেশি— এই সব। এই ধারণাগুলি আসলে বিচ্ছিন্নতার ফল। ভেবে দেখুন, বিহারিরা যদি এতই রাজনীতি-সচেতন হবেন, তাহলে এই এসআইআরের বিরুদ্ধে তাঁরা কেন কোনও প্রতিবাদ করলেন না? প্রতিবাদের কোনও ঘটনা কিন্তু আমার নজরে পড়েনি। এমনকি তাঁরা উদ্বিগ্নও নন। বিচ্ছিন্নতার প্রথম নমুনা আমার এটাই মনে হয়েছে।
পরের দিন আমি মুসলিম বস্তিটিতে গেলাম। সেখানে উদ্বেগ অনেক বেশি। যেটা অনেকটাই প্রত্যাশিত। ফলে প্রথম লক্ষণীয় বিষয় এইটিই— বিহার খুব রাজনীতি-সচেতন রাজ্য, যদি বিহারবাসীর রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করা হয় তাহলে তাঁরা রাস্তায় নেমে পড়েন— এই ধারণাগুলি ঠিক নয়। এবং আমার মনে হয় এই বিষয়ে আরও অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন।
আমি পাটনার বিভিন্ন দিকে ঘুরলাম। উত্তর পাটনায় গেলাম। এখানে বলা দরকার, পাটনা ওপর-ওপর বেশ ঝকঝকে হলেও ভেতরে ঢুকলেই প্রচণ্ড নোংরা। ফলে নীতিশের সুশাসনের যে মিথটাও প্রচারিত হয়েছে, সেটাও সত্যি নয়।
তবে বিহার কিন্তু অ-নিরাপদ নয়। আমি অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরেছি রাস্তায়। কখনও নিজেকে অ-নিরাপদ মনে হয়নি। দেখেছি, মহিলারাও অনেক রাত অবধি রাস্তায় থাকছেন। লখনৌ বা দিল্লিতে অ-নিরাপত্তার যে বোধটা তাড়িত করে, বিহারে সেটা নেই। হ্যাঁ, দিল্লিও বিহারের তুলনায় যথেষ্ট অ-নিরাপদ।
যখন সার্ভে করতে গিয়েছিলাম, একটা চায়ের দোকানে একটু দাঁড়িয়ে আমি আমাদের সার্ভে টিমটা আসার অপেক্ষা করছিলাম। আমি দেখলাম একজন প্রকাশ্যেই দাঁড়িয়ে গাঁজা পাকাচ্ছে। আমি খুবই অবাক হয়ে গেছিলাম। ভারতের কোথাও এরকম দৃশ্য আমি দেখিনি— কেউ এরকম প্রকাশ্য দিবালোকে গাঁজা বানাচ্ছে। তারপর সে সেটা ধরিয়ে টানতে লাগল। কেউ কিছুই বলছে না, অবাকও হচ্ছে না। পরে আমি জেনেছিলাম, বিহারে মদের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে মানুষ এখন প্রকাশ্যে গাঁজা খাচ্ছে। বিহারে এটা চলে। আমি পাটনাতে ঘুরলে প্রতিটা জায়গায় গাঁজার গন্ধ পাবেন। নীতিশ কুমার মদে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। যেটাকে একটা নারী-মুখী পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। এবং এভাবে তিনি একটি মহিলা ভোটব্যাঙ্কও তৈরি করেছেন। এই কাজ আগেও ভারতে অনেক রাজ্যে হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে এনটিআর ১৯৯৪ সালে মদ্যপানে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিলেন কারণ মহিলাদের দাবি ছিল সেটা। বিহারেও সেটাই হয়েছে। কিন্তু গোপন বিষয়টা হল, এখানে মদের ব্যবসাটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত যাদবরা। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে নীতিশ এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। মহিলাদের মন জয়ের পাশাপাশি এর মাধ্যমে যাদবদের অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল করে দেওয়া গেছে। বিহারে এটিএমসি মান্ডি ছিল ২০ বছর আগেও। এই এটিএমসি মান্ডিগুলিরও মিডলম্যান ছিল যাদবরা। সেগুলিকেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে যাদবদের বাস্তবিকই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এবং আরজেডির টাকা তোলার জায়গাগুলোর ওপরেও বড়সড় আঘাত নেমে এসেছে। আর এর অনিবার্য পরিণতিতেই গাঁজার এমন রমরমা। প্রকাশ্যেই গঞ্জিকাসেবন চলছে সর্বত্র। পুলিশও কিছু বলে না। কারণ তারাও বোঝে যে জোর করে কোনও কিছু বন্ধ করলেই মানুষ অন্য বিকল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিহারেও তাই হয়েছে। মদের পরিবর্তে গাঁজা জাঁকিয়ে বসেছে।
পাটনাতে এসআইআরের বিষয়ে ওই সার্ভেটা চলেছে ২১ জুলাই-এর আশেপাশে সময়ে। মানুষ নিজেদের নানারকম সমস্যার কথা জানাচ্ছিলেন— আমরা তো মজদুর, দিন আনি দিন খাই, প্রতিদিনই কাজে যেতে হয় আমাদের, এত ডকুমেন্ট কোথায় পাব, কীভাবে জমা দেব, ইত্যাদি। বিচারপতি ভাবিনা প্রকাশ, নন্দিনী সুন্দর, জঁ দ্রেজ এঁরা সব ছিলেন এই সার্ভে করাতে, যোগেন্দ্র যাদবের ভারত জোড়ো যাত্রা-ও এই সার্ভের অন্যতম সংগঠক ছিল। আমার অন্যদিক থেকেও খবরাখবর নেওয়ার ছিল, তাই আমি ঠিক করলাম এই সমীক্ষা যেমন চালাচ্ছেন ওঁরা, চালান, আমি নিজে একটু ঘুরে দেখব। তা পাটনার বাইরে নভিলপুর নামে একটা জায়গায় গেলাম। ওখানে মুশাহারদের বাস। আমি এসআইআর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখলাম, তাঁরা একেবারে অস্তিত্বসংকটের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। একটা মানুষের জীবনযাত্রার মান যতটা খারাপ হতে পারে বলে আপনি ভাবতে পারেন, এই মুশাহার দলিতদের অবস্থা সেটাই। আমি এসআইআর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখি, তাঁরা আদৌ বুঝতেই পারছেন না আমি কী নিয়ে কথা বলছি। তাঁদের অবস্থান এতটাই প্রান্তিক, স্রেফ বেঁচে থাকার সংগ্রাম এতটাই তীব্র যে তাঁরা এসব এসআইআর-টেসাইআর আদৌ জানেনই না। আমি কিছু ওবিসি এবং ইবিসি মহিলাদের সঙ্গেও কথা বলেছিলাম। মানে খুব নিবিড়ভাবে আলোচনা। ধরুন একটা চাতাল-মতো জায়গায় জনা কুড়ি মহিলার সঙ্গে বসে এক ঘন্টা-দেড় ঘন্টা ধরে কথা বলেছি আমি। তাঁরা বলছিলেন এই বিএলওরা সব উচ্চবর্ণের। তাঁরা ওঁদের বাড়িতে আসেন না। এলাকার স্কুলে এসে বসেন। ওঁদের কাজকর্ম ছেড়ে তাঁদের কাছে যেতে হয়। বাংলায় যেমন পাড়া আছে, বিহারে সেগুলিকে বলে টোলা। ব্রাহ্মণটোলা, ভূমিহারটোলা, দলিতটোলা— এমন সব। নিচুজাতের মানুষ উচ্চবর্ণের টোলাগুলিতে ঢুকতে পারে না। যদিও এখন কিছু শিথিল হয়েছে, কিন্তু আগে এসব খুবই কঠোরভাবে মানা হত। কিন্তু শিথিল হলেও জাতপাতের বিচার খুবই প্রবল বিহারে— এখনও।
পাটনা থেকে গ্রামীণ বিহার
এর পরে আমি পাটনা ফিরে সুপল-এ গেলাম। সুপল বিহারের একটা জেলা। নেপাল থেকে উৎপন্ন হওয়া কোশি নদী এই জেলা দিয়েই বয়ে গেছে। ১৯৫০-এর দশকে সরকার এই কোশি নদীতে দুটো বড় বাঁধ দিয়েছিল। এই বাঁধ দিয়ে কোশি নদীকে এর ভেতরেই আটকে দেওয়া হয়। নেপাল সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই বাঁধগুলো। এটাকে কাটবান্ধ বলে। এই কাটবান্ধের ভেতর দশ লক্ষ মানুষের বাস। কোশি কিন্তু খুব চঞ্চল নদী। প্রতি ২০ বছত অন্তর অন্তর সে গতিপথ পালটায়। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে এখানে যে মানুষগুলি আছেন, যেসব টোলা আছে, সেগুলিও কাটতে থাকে। ঠিক যেমন এখানে মালদা-মুর্শিদাবাদের দিকে গঙ্গার ভাঙনে দেখা যায়। ওখানেও তাই— প্রতি বছরই বন্যা হয়, মানুষকে পালাতে হয়। তার মধ্যেই তাঁরা তাঁদের কাগজপত্র বাঁচাতে চেষ্টা করেন। আমি ওখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাঁরা বলছিলেন, আমরা আগে আমাদের কাগজ বাঁচাই, তারপর প্রাণ বাঁচাই। বুঝে দেখুন, ডকুমেন্ট এখন কতটা মূল্যবান হয়ে গেছে। নাগরিকত্বের প্রমাণ, নিজেদের অধিকারের প্রমাণ— আপনি বিহারি, না বাংলাদেশি, না রোহিঙ্গা—এসব মানুষের মনোজগতে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে যে এখন মানুষ, বিশেষ করে মুসলিমরা, নিজের জানের চেয়েও বেশি করে ডকুমেন্ট রক্ষা করছেন।
আমি ওখানে গিয়ে মুসলিমদের সঙ্গে কথা বলেছি, নিম্নস্তরের ওবিসি-ভুক্ত যে নিষাদ সম্প্রদায়ের বাস ওখানে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি— এবং সবাইকেই খুব উদ্বিগ্ন দেখেছি। তাঁরা আশঙ্কায় ছিলেন সরকার তাঁদের ডকুমেন্ট গ্রহণ করবে কি না। তাঁরা বলছিলেন, নির্বাচন কমিশন বলছে আধার চলবে না। কিন্তু আধার দিয়ে যে রেশন কার্ড বানানো হচ্ছে, বা অন্যান্য ডকুমেন্ট— সেসব চলবে। এটা কী হচ্ছে? আধার চলবে না, কিন্তু সেসব ডকুমেন্ট সরকার মেনে নেবে সেগুলি তৈরিই হয়েছে আধার দেখিয়ে!
আমি কোশি থেকেই আমার প্রথম লেখাটা লিখি। যেদিন ওই লেখাটা প্রকাশিত হয় সেদিনই সুপলের জেলা প্রশাসন তাদের ফেসবুক পেজে একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। তাতে বলা হয়েছিল, আমার লেখাটা ভিত্তিহীন, সঠিক নয়, ইত্যাদি। আমার কাগজের অফিস থেকে আমার কাছে ফোন এল। “অভিনন্দন! অভিনন্দন!” আমি বললাম, কেন কী হল? তারা জানাল, আমার লেখাটার বিরুদ্ধে সুপলের জেলা প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে এসব ভিত্তিহীন খবর। তারা কিন্তু আমার তথ্যগুলির বিরুদ্ধে কোনও যুক্তি দেয়নি, প্রশ্নগুলোরও উত্তর দেয়নি।
সুপলের পর আমি গেলাম আরারিয়ায়। আরারিয়া সীমাঞ্চলে। সীমাঞ্চলে চারটি জেলা আছে। গোটা সীমাঞ্চলে সামগ্রিকভাবে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও জেলা হিসেবে একমাত্র কিষাণগঞ্জই মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাকি তিন জেলা আরারিয়া, পূর্ণিয়া আর কাটিহারে মুসলিম জনবসতি ৪০ শতাংশের আশেপাশে। এই অঞ্চলের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত থাকায় এসব জায়গায় প্রচুর নেপালি আছেন। এখান দিয়েই নেপাল এবং বিহারের মধ্যে প্রচুর যাতায়াত চলে। প্রচুর নেপালি মহিলা এই পথে এসে উত্তর বিহারের এই আরারিয়া, সিতামারি এসব জেলায় থেকে গেছেন। একইভাবে প্রচুর ভারতীয়ও নেপালে বিয়ে করে গেছেন। ওখানে এক মহিলার সঙ্গে আমার দেখা হয়। মঞ্জু পাসোয়ান। তিনি আদতে নেপালি। অর্জুন পাসোয়ানকে বিয়ে করে তিনি ২৫ বছর আগে ভারতে এসেছেন। ভোটারতালিকায় তাঁর নাম উঠেছে, তিনি ভোট দেন, তাঁর আধার আছে, রেশন কার্ড আছে— সবকিছুই আছে। একটাই সমস্যা, তিনি এখনও প্রথাগতভাবে ভারতের নাগরিক নন। কিন্তু এসব হাজার বছর ধরে চলছে। আন্তর্জাতিক সীমানার বয়স তো বেশি নয়। আমি ওঁদের নিয়ে একটা স্টোরি করি। নাম বদলে দিয়েছিলাম, মঞ্জুর নাম যমুনা করে দিয়েছিলাম, অর্জুনের নামও পালটে দিয়েছিলাম। কারণ আমি চাইনি ওঁরা চিহ্নিত হয়ে যান। ওঁর সমস্যা হল ওঁকে তথ্যের জন্য নেপাল যেতে হবে। নেপালিগঞ্জে। কিন্তু সেখানে এখন আর ওঁদের কেউ থাকেন না। মঞ্জু বাবা-মার সঙ্গে সেখান থেকে ভারতে চলে এসেছিলেন। তাঁর চিন্তা, এসআইআরে তাঁর নাম থাকবে কিনা। কারণ তাঁকে তো বাবার দিকের তথ্য দিতে হবে। তাঁর তো নেপালে গিয়ে সেসব তথ্য নিয়ে আসা সম্ভব নয়।
একটা বিষয়, আমি কিন্তু মুসলিম ধর্মাবলম্বী এরকম কোনও নেপালি পাইনি। হয়তো তাঁরা আরও বেশি সতর্ক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মঞ্জুর নাম ভোটার তালিকায় উঠল কীভাবে? যে-পঞ্চায়েতে আমি গেছিলাম, সেটা একটা পাসোয়ান পঞ্চায়েত, অর্থাৎ সেখানে পাসোয়ানরা সংখ্যাগুরু। ওখানে ২০ বছর আগে কী হত? মুখিয়া যিনি থাকতেন তাঁর জানা থাকত তাঁর পঞ্চায়েতে কে নতুন এসেছে, কতজন জন্মেছে বা কতজন মারা গেছে। তিনি অমুক-অমুক-অমুক নতুন এসেছে বলে তাদের ব্যবস্থা করে দিতেন। কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে এসব ছিল না— এসব সিটিজেনশিপ, এনআরসি ইত্যাদি নিয়ে এত শোরগোল। মঞ্জুদেবীও পাসোয়ান, এটাও পাসোয়ান এলাকা, একই জাতের, ফলে তাঁর কোনও সমস্যা হয়নি। জানা ছিল উনি নেপাল থেকে এসেছেন, ভারতীয় নাগরিক নন, ফলে তার জন্য যা যা করার স্বাভাবিকভাবেই করে দেওয়া হয়েছিল সে-সব। বিহারে জাতের বিষয়টা খুবই গুরুত্ব রাখে। কোনও মানুষ নিজেদের জাতের, না অন্য জাতের— এই দিয়েই অনেক কিছু ঠিক হয়ে যায়। হ্যাঁ, পাসোয়ানদের মধ্যেও কিন্তু মুসলিম-বিরোধী মনোভাব আমি অনুভব করেছি।
আরারিয়া থেকে আমি গেলাম কিষাণগঞ্জে। কিষাণগঞ্জ বিহারের সবচেয়ে পূর্বপ্রান্তের জেলা। এখানকার মানুষদের প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম। আগে হিন্দু-মুসলিমের কিছুটা সমতা ছিল। প্রায় ৫০-৫০। এখানকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এই জেলা খুবই অপরাধপ্রবণ। কারণ এখান দিয়ে নেপাল, বিহার, উত্তরপূর্ব ভারত, মায়ানমার, বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ— সব জায়গাতেই যাওয়া যায়। যত পাচারের কাজ হয় এইসব এলাকার মধ্যে— ভারতে বা ভারত থেকে— সবই কিষাণগঞ্জের মধ্যে দিয়ে হয়। কিষাণগঞ্জ রেলস্টেশনে আপনি সবসময় স্থানীয় এনজিওদের দু-তিনটে দল দেখতে পাবেন যারা শিশুপাচার হচ্ছে কিনা সেই নজর রাখছে। সর্বক্ষণ। দিনের যে-কোনও সময়ে। যখনই কোনও ট্রেন আসে এবং দেখা যায় কেউ একজন, সঙ্গে তিন-চারটে বাচ্চা, তাঁরা গিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন— এই বাচ্চারা কারা, কোত্থেকে আসছে, আপনি এদের কে হন, ইত্যাদি। ওখানে এরকম প্রচুর ধরা পড়েছে। এসব থেকেই বোঝা যায় অপরাধের মাত্রাটা কিষাণগঞ্জে কী বিপুল। কিষাণগঞ্জে ভারতের নিরাপত্তারক্ষীও প্রচুর। এর কারণ বোধহয় সেই ৭০-৩০ অনুপাত।
এখানকার মানুষদের মূলত তিনটে ভাগ। একটা হল সূর্যাপুরী। এঁরা স্থানীয়। এঁদের দাবি, এঁরাই কিষাণগঞ্জের আদি বাসিন্দা। এঁরা মূলত হিন্দু, তবে এঁদের মধ্যে মুসলিমও আছে। এরপর শেরশাবাদি। আমি জানি না কতজন এই শেরশাবাদি গোষ্ঠীর কথা শুনেছেন। মনে হয়, কেউ শোনেননি। এটা আমায় বেশ অবাক করেছে। শেরশাবাদিরা আসলে হচ্ছেন বাঙালি মুসলিম। এই শেরশাবাদি শব্দটা উত্তর বিহার এবং উত্তরবঙ্গে চলে। এছাড়া আর যাঁরা আছেন তাঁদের বলা হয় পশ্চিমা। এঁদের মধ্যে বাইরে থেকে আসা সবাই পড়েন। কিষাণগঞ্জের বাইরে থেকে হিন্দু-মুসলিম যাঁরাই এসে রয়েছেন এখানে সবাই পশ্চিমা।
এখানে শেরশাবাদিদের নিয়ে একটা ভীতি কাজ করে। বলা হচ্ছে গত ২০ বছরে এই শেরশাবাদি বা বাঙালি মুসলিমদের সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে গেছে। এঁরা ভারতীয় বাঙালি না বাংলাদেশের সেটা কেউ জানে না। স্থানীয় উর্দুভাষী মুসলিমরাও— সূর্যাপুরী বা পশ্চিমারা— এই শেরশাবাদিদের কিছুটা সন্দেহের চোখে দেখেন। তাঁদেরও বক্তব্য, এদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, এদের বের করে দেওয়া উচিত। বিষয়টা আমার কাছে খুবই আশ্চর্যের ঠেকেছে। বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক হিন্দুও কিন্তু রয়েছেন ওখানে। তাঁদের ব্যাপারে বলা হয়— এদের কে বের করবে! এদের কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। গোটা বিহারের গণমানসে এই ধারণা বেশ বদ্ধমূল যে যদি আপনার হিন্দু নাম থাকে, তবে আপনার কোনও ভয় নেই, কোনও ডকুমেন্ট দেখাতে হবে না, ভোটার তালিকায় আপনার নাম ঠিকই উঠে যাবে। উল্টোদিকে মুসলিমরা ভাবছেন, যে ১১টা ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে আমরা যদি তার সবগুলোও দিই, ওরা খালি আমাদের নাম দেখবে, আর কেটে দেবে। দুই সম্প্রদায়ের মানসিক অবস্থাটা এইরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমার সঙ্গে একজন আরএসএস সমর্থকের দেখা হয়েছিল। তিনি সম্ভবত বাঙালি-বিহারি। অর্থাৎ বাংলার লোক, বাংলাদেশি হিন্দুও হতে পারেন, কিন্তু বিহারে থাকেন। উনি প্রথমে আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম তুষার। তিনি আশ্বস্ত হলেন যে আমি হিন্দু, এবং তারপর আমার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলতে লাগলেন। এখানে তো সবই বিক্রি হয়ে গেছে… আমাদের হিন্দুদের সমানে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে… সব মিডিয়া বিকিয়ে গেছে… এনজিওগুলো বিকিয়ে গেছে…। উনি খুব শ্লাঘার সঙ্গেই নিজেকে সংঘের প্রচারক বলে আমাকে বললেন। উনি সম্ভবত এলআইসি বা মিউচুয়াল ফান্ড কিছুর একটা এজেন্টের কাজ করেন। তাই তাকে স্কুটারে করে কিষাণগঞ্জের আশেপাশে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরতে হয়। বলছিলেন, এই শেরশাবাদিদের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেছে… সবাই ঢুকে পড়ছে… এই সব বাংলাদেশি… গত ২০ বছরে এদের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেছে এখানে… যেন জনবিস্ফোরণ হয়েছে… আমাদের সব জমিগুলো এদের হাতে চলে যাচ্ছে…। সত্যি সত্যি তিনি আমাকে স্কুটারে করে নিয়ে গেলেন। দেখাচ্ছিলেন— এই দেখুন, এই দেখুন… এই গ্রামটা দেখুন… ওই গ্রামটা দেখুন… কিচ্ছু ছিল না এখানে ২০ বছর আগে… এখন সব এরা ভরে গেছে…।
এটাই সেই জায়গা যেখান থেকে এমআইএম ৫টা আসন জিতেছে। কিষাণগঞ্জ থেকে ৩টে আর পূর্ণিয়া থেকে ২টো। একটা অদ্ভুত চরিত্র এইসব অঞ্চলের। পাটনাতেও আমাকে অনেকে বলছিলেন, এই যে সীমাঞ্চল— যার সঙ্গে বাংলার সীমানা রয়েছে, দিনাজপুর জেলার— এই অঞ্চলে শেরশাবাদি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে অনেক হিন্দুও আছে, এবং তাঁরাও ওঁদের প্রতি বিরূপ। এই অঞ্চলে ২০২০-তে কী হয়েছিল? সেই সময়ে এনআরসি-সিএএ-র বিষয়গুলো সবে সামনে এসেছে। ২০১৯-এ সিএএর বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়। সেই সময়ে সীমাঞ্চলের মুসলিমরা খুবই আতঙ্কে ছিলেন। বাংলাদেশ আর নেপাল সীমান্তের মধ্যে তাঁদের বাস। বস্তুত সে-জন্যই এই অঞ্চলের নাম সীমাঞ্চল। আমার মনে হয়, এই আতঙ্ককেই ২০২০-তে কাজে লাগিয়েছিল এমআইএম। যদি সিএএ এসে যায়, তবে এখানকার মুসলিমদেরই সবচেয়ে বেশি বিপদ— এসব তারা প্রচার করেছিল। তার ফলেই তাদের এই অঞ্চলে— যেখানে পরিচয়ের সংকট সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল— ৫টি আসনে জয়। এবারেও তারা সেই ৫টি আসন ধরে রেখেছে। এবার এই আসনগুলি আরজেডির খুব একটা কাজে আসবে না। কারণ আরজেডির আসন এবার মাত্র ৩০-এর আশেপাশে।
আমি কিষাণগঞ্জের একদম প্রান্তীয় অঞ্চল, যেটা প্রায় বাংলার সঙ্গে লাগোয়া, সেখানেও গিয়েছিলাম। জায়গাটার নাম ঠাকুরগঞ্জ। শিলিগুড়ি ওখান থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার। ওখানে চা বাগান আছে। চা বাগান বাংলাতেই আছে মূলত। তবে কিষাণগঞ্জের চারটি ব্লকে বিহার সরকার ২০ বছর আগে চা বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তার জন্য ভর্তুকি দিয়েছিল, পুঁজি দিয়েছিল। কারণ এখানকার আবহাওয়া অনেকটাই উত্তরবঙ্গের মতো। ওখানে চা বাগানে যাঁরা শ্রমিক তাঁরা সাঁওতাল। চা বাগানগুলি তৈরি হওয়ার আগেই এঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে কাজের সন্ধানে এসেছিলেন। এঁদের কাছে কোনও কাগজ-ফাগজ ছিল না। কাজের সন্ধানেই তাঁরা দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। ২০ বছর আগে এই অঞ্চলে চা বাগান পত্তন হওয়ার পর এঁদের হাতে নিয়মিত কাজ এসেছে, অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন এঁদের কাছে কাগজ আছে, হাতে পয়সা এসেছে, ওখানে তাঁরা ভালো ভালো ঘর বানিয়েছেন। এই ছবিটা কিছুটা বৈপরীত্যের— কারণ আমরা সাধারণভাবে জানি চা বাগানে শ্রমিকশোষণ ভয়াবহ। বস্তুত, নকশালবাড়ির আন্দোলন শুরু হওয়ার এটা সম্ভবত একটা অন্যতম কারণ। এমনকি শ্রীলঙ্কার চা বাগানগুলিতেও তামিল শ্রমিকদের ভয়াবহভাবে শোষিত হওয়ার খবর আমরা জানি। কিন্তু এখানে যেন একটা উল্টো গল্প। প্রকৃতপক্ষে, চা বাগান হওয়ার পর এই মানুষগুলির উন্নতি হয়েছে। এই বিষয়টা কিন্তু গবেষণার দাবি রাখে। এখানকার চা বাগানগুলির বয়স বেশি নয়। ২০— বড়জোর ২৫ বছর। তা সেখানে এরকম ঘটনা কীভাবে ঘটল সেটা নিয়ে গবেষণা হওয়ার দরকার। আমার নিজেরও এ-নিয়ে একটা স্টোরি করার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আর করা হয়ে ওঠেনি।
এর পরে আমি আবার পাটনায় ফিরে এলাম। ১ আগস্ট খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হল। আমি সে নিয়ে একটা স্টোরি করলাম আর নাগরিকত্ব নিয়ে কিছু রিসার্চ করলাম। ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়া যায় জন্মসূত্রে, বিবাহসূত্রে, জাতীয়তা নথিবদ্ধকরণের মাধ্যমে, এবং কোনও এলাকা ভারতরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত হলে। শেষটার উদাহরণ হল, যেমন সিকিমকে ১৯৭৫ সালে ভারতরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করে নেওয়া হয়। তখনই সমস্ত সিকিমবাসী ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যান। ১৯৮৭ আর ২০০৩-এ দুটি অ্যামেন্ডমেন্ট হয়। এগুলি সবাই জানেন, ফলে আর বলছি না। আমার মনে হয় না কোনও একটা ডকুমেন্ট দিয়ে নিশ্চিতভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সম্ভব। পাসপোর্ট সবচেয়ে কাছাকাছি আসতে পারে, কিন্তু পাসপোর্ট দিয়েও হয় না। একমাত্র যাঁরা জাতীয়তা নথিবদ্ধকরণের মাধ্যমে ভারতের নাগরিক হয়েছেন তাঁরা ছাড়া। যেমন জঁ দ্রেজ, অক্ষয় কুমার— অক্ষয় কুমার আগে কানাডার নাগরিক ছিলেন। ফলে যদি এনআরসি হয়, তবে ওই জঁ দ্রেজ আর অক্ষয় কুমার ছাড়া আমরা কেউই ভারতের নাগরিক থাকব না। একমাত্র ওঁরাই থাকবেন, কারণ ওঁদের কাছে নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট আছে। বাকি আমাদের কারও কাছেই সেটা নেই। তাহলে প্রশ্নটা হচ্ছে যদি বিজেপি সরকার সত্যিসত্যিই এনআরসি করে তবে কেমন করে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যাবে? জানি না তখন কোন কোন ডকুমেন্ট গ্রহণযোগ্য হবে। তবে মনে হয় জমির কাগজপত্র খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি আপনি দেখাতে পারেন যে কোনও জমির মালিকানা আপনার নামে আছে, বা ১৯৪৭ বা তারও আগে থেকে তিন পুরুষ ধরে কোনও জমি আপনাদের নামে ছিল বা এখনও আছে। এখানেই জমির দলিলপত্রের গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। আর এখানেই আসছে নাগরিকত্বের প্রশ্নে জমির রাজনীতি। কারণ জমিকে এখন দেখা হচ্ছে নাগরিকত্ব প্রমাণের এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে। আমার পূর্বপুরুষরা অন্ধ্রের গুন্টুরের একটা অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। গত বছর আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই বাড়িটা বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই বাড়িটা ১৯২৩ বা ১৯২৮ সালের। আমি বাবাকে বলেছিলাম আসল দলিলটা যেন রেখে দেন। কারণ যদি এনআরসি হয়, তবে আমরা প্রমাণ করতে পারব যে ১৯২৩ সাল থেকে আমরা অন্ধ্রে আছি। এটাই ব্যাপার। ফলে বোঝা যাচ্ছে, সবার মনেই এখন এরকম চিন্তা কাজ করবে।
এসআইআর বিরোধিতা
যাই হোক, আমি পাটনাতে আসার পরপরই ৫ আগস্ট পাটনাতে ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর ন্যাশনাল কনভেনশন হয়। এর জন্য বিহার ছাড়াও ঝাড়খণ্ড, বাংলা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, দক্ষিণ ভারত— অর্থাৎ সারা দেশ থেকেই অনেক লোক এসেছিলেন। আমি একটা জিনিস অনুধাবন করলাম— এসআইআর সম্পর্কে বোঝাপড়াটা কেমন হবে তা নিয়ে নাগরিক সমাজের কাছে কোনও ক্লু নেই। বস্তুত, নাগরিক সমাজের সেই ক্ষমতাটাই নেই। আমি জানি না বাংলার পরিস্থিতি কীরকম। তবে যে কোটি কোটি মানুষকে এ নিয়ে জাগিয়ে তুলতে হবে, তাঁদের মোবিলাইজ করতে হবে— সেটা নাগরিক সমাজ পারবে না। এটা কেবল রাজনৈতিক বিরোধীরা— অর্থাৎ কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষেই করা সম্ভব। এবং এই লড়াইটাও রাজনৈতিক। এই লড়াইটা রাজনৈতিক পরিসরেই করতে হবে, কোনও রাজনৈতিক দলকেই নেতৃত্ব দিতে হবে, এবং রাস্তায় নেমে লড়তে হবে। এর জন্য আপনাকে লাখ লাখ লোককে পথে নামাতে হবে। ২০০-২৫০ লোক দিয়ে এটা সম্ভব নয়। এবং এই ক্ষমতাটা নাগরিক সমাজের নেই— তাঁরা সেটা জানেনও। তাঁরা এ-ও বলছিলেন যে বিহারের মানুষ রাস্তায় নামছে না। কেন নামছে না? গ্রামাঞ্চলে দলিতরা বলছেন এসআইআর বাংলাদেশি-নেপালিদের তাড়াবে। বিজেপি বা আরএসএস এই ন্যারেটিভটা মানুষের মজ্জায় মজ্জায় ওরা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে যে এই এসআইআর হচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানোর জন্য। এইসব ধারণা এতটাই গভীরে ঢুকে গেছে যে এগুলি উৎখাত করে মানুষকে পথে নামানো— এ নাগরিক সমাজের ক্ষমতার বাইরে। এ দায়িত্ব অবশ্যই কোনও রাজনৈতিক দলের।
আমি জানতে পেরেছিলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের দুটো কাজ চলছিল বিহারে। একটা করছিল আরজেডি— রাঘবপুরে। কেন রাঘবপুর? রাঘবপুর হল তেজস্বী যাদবের আসন। আরজেডি নিশ্চিত হতে চাইছিল যে ওখানে কোনও গণ্ডগোল হয়েছে কিনা, তেজস্বীর জিততে কোনও সমস্যা হবে কিনা। তাহলে দেখুন। একটা রাজনৈতিক দল কেবলমাত্র নিজের নেতার আসন নিয়ে চিন্তিত। দ্বিতীয়টা করছিল মা-লে— আরা-তে। আমি আরা গেছিলাম। ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। ওঁদের নেতা পঙ্কজের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমি যখন শুনলাম যে ওঁরা ওখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভেরিফিকেশনের কাজ করছেন, বললাম যে, আমি একজন সাংবাদিক, যে-ভাবেই হোক আমি ওখানে যেতে চাই। তা ওঁরা ব্যবস্থা করলেন এবং আমি আরা গেলাম। মা-লের সাংগঠনিক কাজ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। বিহারে মা-লের সাংগঠনিক কাঠামো সত্যি অপূর্ব। সত্যি কথা বলতে বিহারে প্রকৃত অর্থে সাংগঠনিক কাজ এই দুটো সংগঠনেরই আছে— বিজেপি আর মা-লে। আর কারও কোনও সাংগঠনিক কাজ নেই। আরজেডি, জেডিইউ— কারও। তাদের হয়তো গণ-ভিত্তি আছে, কিন্তু সাংগঠনিক কোনও কাঠামো নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মা-লের শক্তি খুব ছোট জায়গায় সীমাবদ্ধ। ওদের পলিটব্যুরো থেকে আরা জেলার সংগঠনের কাছে নির্দেশ এসেছিল আমাকে যেন একা ছেড়ে না দেওয়া হয়। ফলে ওঁরা সারাক্ষণই একজনকে আমার সঙ্গে দিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তাঁকে ছেড়ে বেরোতে পারিনি।
এক সকালে আমি তাঁদের সঙ্গে গেলাম বাড়ি-বাড়ি সমীক্ষার সময়ে। ওঁরা বলছিলেন ওঁদের কাছে অনেকগুলি ভোটার-তালিকা এসেছে। ওঁরা সেগুলি নিয়ে আরা শহরের একটু বাইরে এক জায়গায় বসেছিলেন। তাঁরা ভোটার তালিকা মিলিয়ে দেখছিলেন। দেখা গেল একটা ঠিকানায় ২৪ জন ভোটারের নাম। এটা কীভাবে হতে পারে? একজন ব্রাহ্মণ আর একজন রাজপুত একই ঠিকানায় থাকে, ভূমিহার আর কুশওয়াহার একই বাড়ি— এটা কীভাবে সম্ভব? বিহারে এটা অসম্ভব— অকল্পনীয়। কিন্তু এটাই হয়েছে। বিভিন্ন জাতের ২৪ জনের নাম এক ঠিকানায়। এটা প্রকৃতপক্ষেই বিরাট গরমিল। ওঁরা আমাকে নিয়ে গেছিলেন সেখানে— মা-লের চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে গিয়ে দেখেও এসেছি সেই ঠিকানা। কিন্তু আমি নিজে নিজে স্বাধীনভাবে করতে পারিনি। এটা আমি মোটের ওপর সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই দেখেছি— সে মা-লে, বিজেপি, আরজেডি, কংগ্রেস যে-ই হোক— তারা নিজেরা যেটা দেখাতে চেয়েছে আমাকে সেটাই দেখিয়েছে। ফলে আমার স্টোরিগুলোতে এটা বলে দিতে হয়েছে যে আমি নিজে যাচাই করে দেখতে পারিনি, ওঁরা আমাকে এটা বলেছেন। যাই হোক, বিহারে একটা সুবিধা ছিল, আমি ভাষাটা জানতাম। বাংলায় আমার সেই সুবিধাটাও নেই। কিন্তু আমি মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালোবাসি।
আরা-তে, আরা-র একটু বাইরে, খোপিয়া বলে একটা গ্রামে গেছিলাম আমি। এটা রামেশ্বর সিং-এর গ্রাম, রামেশ্বর রণবীর সেনার প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৪-তে এই খোপিয়া গ্রামেই রণবীর সেনা তৈরি হয়। ওখানে মা-লের নেতৃত্বে দলিতদের ভূমিহারদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটা ইতিহাস আছে। অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এসব জানেন সবাই। বস্তুত দক্ষিণ বিহারের এইসব জেলায়— ভোজপুর, আরা, জেহানাবাদ, বক্সার, গয়া, ঔরঙ্গাবাদ এইসব অঞ্চলে— জাতপাত নিয়ে যে রক্তাক্ত হানাহানি হয়েছে, যে তীব্র হিংসাত্মক সব ঘটনা ঘটেছে— আমার মনে হয় ভারতের অন্য কোনও রাজ্যে তেমন হয়নি। যে-কোনও গ্রামে যান, শহরের যে-কোনও পাড়ায় যান— চার-পাঁচটা স্ট্যাচু আপনার নজরে পড়বে। জিজ্ঞেস করুন— এঁরা কারা? উত্তর আসবে— এঁরা জাতের জন্য লড়াই করেছিলেন, লড়াই করতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন। প্রতিটা গ্রামে পাবেন এরকম। কম করে ২০-২৫ জন লোক পাবেন যাঁরা সে-সব লড়াই করেছে, এবং কম করে ৬-৭টা স্ট্যাচু। এগুলি দেখে আমার কেমন একটা হয়ে গেছিল। প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা মোড়ে এরকম স্ট্যাচু। আপনারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায় বা স্বামী বিবেকানন্দ… এঁদের স্ট্যাচু দেখতে অভ্যস্ত। বিহারের এইসব অঞ্চলে আপনি দেখতে পাবেন সেখানে যাঁরা জাতের জন্য লড়াই করেছে তাঁদের স্ট্যাচু। ৭০-৮০-৯০-এর দশকে এঁরা নিজেদের জাতের জন্য লড়েছেন, ভূমিহারদের অত্যাচার সয়েছেন, তারপর পালটা মেরেছেন, এরকম নয় যে তাঁরা খালি মার খেয়েছেন, এবং সেই লড়াইয়ে শহিদ হয়েছেন। ওখানে গেলে আপনাকে এই বিষয়টা অনুভব করতে হবে। এই অনুভূতিটা আমি ঠিক বর্ণনা করতে পারব না।
রামেশ্বর সিং-এর কথা বলছিলাম। রামেশ্বর সিং-এর ৭০ একর জমি ছিল। আমি অন্ধ্রের লোক। অন্ধ্রপ্রদেশে দেখেছি অনেক মাঝারি কৃষকেরও ১০০ একরের বেশি জমি রয়েছে। দক্ষিণ ভারতে অনেকেরই এরকম ১০০-১৫০ একর জমি আছে। কিন্তু রামেশ্বর ৭০ একর জমির মালিক হয়েই একজন ওয়ারলর্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল— কী পরিমাণ ত্রাস ছড়িয়েছিল। পূর্ব-ভারতের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ভূমি-সম্পর্কটা যে আলাদা সেটাও এগুলো থেকে বোঝা যায়।
বিহারে আমি এমন একটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম যেটা আমি বিহারের বাইরে কোথাও দেখিনি। একটা ধাবাতে গিয়ে আমি একটা থালি অর্ডার দিয়েছিলাম। থালি ৫০ টাকা। ওর সঙ্গে দুটো লিট্টিও অর্ডার দিয়েছিলাম। লিট্টি ১০ টাকা করে। আর একটা চা ১৫ টাকা। সোজা হিসেব। ৫০ প্লাস ১০ ইন্টু ২ প্লাস ১৫, ৮৫ টাকা। আমি খেয়েদেয়ে ধাবা-মালিককে ১০০ টাকার নোট দিলাম। তাহলে তিনি আমাকে ১৫ টাকা ফেরত দেবেন, তাই তো? আমাকে কিন্তু ২৫ টাকা ফেরত দেওয়া হল। এটা আমার সঙ্গে সপ্তাহে দু-তিনবার করে হত। মানে সাধারণ হিসেবটাও করতে ওঁদের সমস্যা হয়। ২০ প্লাস ৩০ প্লাস ৪৫— এই ধরনের সাধারণ হিসেব। আমি খুবই বিস্মিত হতাম। আক্ষরিক অর্থেই কিন্তু বিষয়টা খুবই শকিং। এর কারণ কী হতে পারে? বিহারের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরা সবাই জানি— কিন্তু লোকজন একদম প্রাথমিক স্তরের হিসাব, যেসব হিসেব বেঁচে থাকার প্রতি পদে কাজে লাগে, সেটুকুও করতে পারছেন না— এতে বোঝা যায় অবস্থাটা কতটা খারাপ।
শিক্ষার দুরবস্থা যদি প্রথম কারণ হয়, দ্বিতীয় সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটা হতে পারে অপুষ্টি। মানে মস্তিষ্কের স্বাভাবিকভাবে কাজ করার জন্য যে ন্যূনতম খাবার লাগে, বিহারের সাধারণ জনগণ সেটা পান না। তৃতীয় কারণটা হতে পারে পেমেন্টের ধরন। কিন্তু সেটা কারণ হলে তো সেই সমস্যা কলকাতা, বাংলা, মহারাষ্ট্র— যে-কোনও জায়গাতেই হতে পারত।
বলা হয় যে আরজেডি বিহারের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। হতে পারে। আমি জানি না। কিন্তু নীতিশ কুমারের ২০ বছরের সুশাসন তাহলে কী করল? ২০ বছর ধরে তো বিজেপি এবং নীতিশবাবু ক্ষমতায় রয়েছেন বিহারে! এখন সেটা ২৫ বছর হয়ে যাবে। তা এদের যে দাবি— বিহারে সুশাসন কায়েম হয়েছে, উন্নয়ন হয়েছে, এই হয়েছে, ওই হয়েছে— হয়নি। কেউ বলে সামাজিক ন্যায় কায়েম হয়েছে, কেউ বলে জঙ্গলরাজ ধ্বংস হয়েছে— এগুলি-সম্পর্কেও আমার দ্বিমত আছে। বিহারের জনগণের যে মধ্যবর্তী স্তর, তাঁরা এতটাই পিছিয়ে আছেন, যে সবাই তাঁদের টেকেন ফর গ্রান্টেড করে নিয়েছে। যেন একটা চতুর্থ স্তরের ম্যাচ! তাঁদের কিছুই নেই। মানুষ হিসেবে বাঁচার জন্য যে মৌলিক দক্ষতাগুলির দরকার হয়— সেগুলিও নেই। এটা আমাকে খুবই বিস্ময়াহত করেছিল। ভারতের মধ্যে বোধহয় একমাত্র উত্তরপ্রদেশের তুলনা মাথায় আসে— কিন্তু আমার মনে হয় উত্তরপ্রদেশের শিক্ষার অবস্থাও বিহারের চেয়ে কিছুটা ভালো।
মা-লের বিষয়ে বলতে গেলে তারা সবকিছুই শ্রেণির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। দলিতদের সংগঠন নয়, ওরা বলে থাকে— এঁরা ভূমিহীন কৃষক আর অন্যদিকে জমিদাররা। এটা একটা শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বিহারের পরিপ্রেক্ষিতে এটা খাপ খায় না। ভোটের সময়ে এই মানুষগুলি যাকে খুশি ভোট দেন, শুধু মা-লে বাদে। মা-লের দৃষ্টভঙ্গি এবং কাজের ধরন খুবই প্রশংসনীয়— তাদের সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে, তারা ভূমিহীন কৃষকদের পক্ষে দাঁড়ায়— কিন্তু বিহারে বিশেষ করে, আপনি জাতপাতকে বাদ দিতে পারেন না। যদি আপনি জাতের প্রশ্নকে ভুল দৃষ্টিকোণ বলে পাশে সরিয়ে রেখে শ্রেণি-দৃষ্টিকোণ নিয়ে আসতে চান, তবে আর যা-ই হোক আপনি ভোট পাবেন না। আমার মনে হয়েছে, শুধু বিহার নয়, গোটা ভারতের সামাজিক কাঠামোর ভিত্তিতেই শ্রেণির চেয়ে জাতপাতের প্রশ্নে বিচার করাটা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। আমি এখন ‘শিলা’ নিয়ে একটা বই লেখার চেষ্টা করছি। আমি এটা উপলব্ধি করেছি যে ভারতে জাতপাতকে অগ্রাহ্য করা যাবে না।
শেষ প্রসঙ্গ হিসেবে কংগ্রেস-আরজেডি যে যাত্রা করেছিল, তার কথা বলি। আমি সেটাতে যেতে চেয়েছিলাম, প্রথম দিন গেছিলামও। সাসারাম থেকে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমি একটা ট্রেনে পাটনা থেকে সাসারাম যাই। এত বিশৃঙ্খল সেই যাত্রা যে আমি প্রথম দিনের পরেই রণে ভঙ্গ দিয়েছিলাম এবং পাটনা ফিরে এসেছিলাম। কানহাইয়া কুমার, যিনি এখন কংগ্রেসে, তিনি সেদিন মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছিলেন। ওটা আসলে রাহুল গান্ধি আসার প্রস্তুতি চলছিল। সেদিন জন্মাষ্টমী ছিল। তা কানহাইয়া কুমার বলছিলেন— আজ জন্মাষ্টমী। আমার নামও কানহাইয়া। আরে ভাই, তুমি যখন কমিউনিস্ট ছিলে, এসব তো বলতে না! আর তারপরে দেখলাম কংগ্রেসের মঞ্চের রাজনীতি। মানে লোকজন রীতিমতো কান্নাকাটি করছিল, যে আমাকে মঞ্চে উঠতে দিল না। এটাই আসলে কংগ্রেস পার্টি। এবং সেই বড়সড় মঞ্চের যারা গেটকিপার ছিল, তারা মঞ্চে ওঠানোর জন্য পয়সা নিচ্ছিল। আমি একজন কংগ্রেস নেত্রীর কাছে গেছিলাম তারপর। তিনি তখন দলের আরও কিছু কর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ। বলছিলেন— পয়সা নিচ্ছে… এরা পয়সা নিচ্ছে… আমি তো খুব গালাগাল করেছি…। বিহারি স্ল্যাংগুলো কিন্তু খুব মজার হয়।
তো নির্যাস এটাই— বিরোধীদের এ-ই হল অবস্থা। তাদের কোনও ভিশন নেই। ভোটচুরিটা বিহারে কোনও ইস্যুই নয়। বা ইস্যু হলেও সেটা ভোটারদের মনে কোনও স্পন্দন তৈরি করছে না। এটা গোটা ভারতের ক্ষেত্রেই আমার মনে হয়। এরপরে রাহুল গান্ধি এলেন এবং চলেও গেলেন। কলম্বিয়া গেলেন। ভগবান জানে, কী করতে গেলেন! কলম্বিয়ার একটাই বিখ্যাত জিনিস আছে, এবং সেটা যে কী আপনারা সবাই জানেন। কিন্তু সব মিলিয়ে অমিত শাহ-নীতিশ কুমারের শক্তিশালী জোটের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য এ-সবই খুব দুর্বল প্রয়াস। এর মাঝে আবার প্রশান্ত কিশোরও তাঁর কিছু খেল দেখিয়ে দিয়েছেন। এইভাবে এদের হারানো সম্ভব ছিল না।
শেষ কথা
অনেকদিন হয়ে গেছিল বিহারে। লিট্টি-চোকা খেয়ে খেয়ে হাঁপিয়ে গেছিলাম। এবার ফিরব। তা ফেরার আগে দুদিনের জন্য বোধগয়া গেছিলাম। আসলে পাটনায় আমার বন্ধুরা বলছিল আরএসএস নাকি সমস্ত শিক্ষাস্থানগুলোর দখল নিচ্ছে। বাংলায় যেমন শান্তিনিকেতনে তাদের নজর আছে, বিহারে তেমনি বোধগয়ায়। ওখানে মহাবোধি মন্দির আছে। আমি সেখানে গেলাম, একজন সাধুর সঙ্গে দেখা হল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি ভীম আর্মির লোক? আমি বললাম, না না। আরএসএস ওখানকার দখল নিতে চাইছে, কিন্তু দলিতরাও প্রতিযোগিতায় আছে খবর পেয়েছিলাম। দলিতদের ভীম আর্মি বিভিন্ন জায়গায় আরএসএসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে— কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্রে একটা ঘটনা ঘটেছে। তবে ওখানে বেশ একটা আধ্যাত্মিক পরিবেশ। বস্তুত বৌদ্ধদের উপাসনাস্থলগুলিতেই এটা দেখা যায়। একটা শান্তি বিরাজ করে। ওঁরা বোধিবৃক্ষের তলায় এসে বসেন, ধ্যান করেন। এইরকম একটা পরিবেশেও সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ওখানে গয়া থেকে ট্রেনে পাটনা ফিরলাম, এবং পাটনা স্টেশনে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার পকেটমারি হল। ওই দিনটাই আমার ওই দফায় বিহারে শেষ দিন। দেড় মাস টানা থাকলাম এখানে। মনে মনে অভিজ্ঞতাগুলো সাজাচ্ছিলাম। এই ট্রেনে আসতে আসতেই ভাবছিলাম বিহারিরা এখনও কত সরল রয়ে গেছেন, আর প্ল্যাটফর্মে নামতেই পকেটমারি হয়ে গেল। এই হল আমার বিহারের অভিজ্ঞতা। আমি ওখানে গেছিলাম অনেক আগে-থেকে-ভেবে-রাখা ধারণা নিয়ে। আর বিহার ছাড়লাম একটাই ধারণা নিয়ে, যে রাজ্যটা ধ্বংস হয়ে গেছে। এবং এটা একদম স্বচ্ছ ধারণা। এই ধারণাটা আমি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই পেয়েছি। এই বাংলাতেও গর্গ চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনিও বিহারিদের সম্পর্কে বিষোদ্গার করছিলেন। এ-ব্যাপারটা গোটা দেশেই সত্য। মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, দক্ষিণ ভারত— সব জায়াগাতেই বিহারিদের সম্পর্কে এমন কথা আপনি শুনতে পাবেন। এবং কিছুটা হলেও এরকম একটা ধারণা আমার মধ্যেও তৈরি হয়েছে। এই যে আমি ঘুরেছি বিহারে, যে যে অঞ্চলে গেছি, সেগুলো না গেলে আমার ধারণা তৈরি হত না বা ভাঙত না।
আগেই বলেছি, নাগরিক সমাজের ক্ষমতা নেই এসআইআরের বিরুদ্ধে কোনও সদর্থক আন্দোলন গড়ে তোলার। এরপরে যদি এনআরসি আসে, তখনও নাগরিক সমাজ কতটা কী করতে পারবে সে নিয়ে আমি সন্দিহান। এগুলি অবশ্যই রাজনৈতিক দলের কাজ— যাদের গণভিত্তিও আছে এবং সংগঠনও আছে। লড়াইটা রাজনৈতিক, এবং লড়াইটা লড়তে হবে রাস্তায়।
দ্বিতীয়ত, বিহারে সিভিল সোসাইটি গ্রুপগুলি আদালতে লড়াই করার চেষ্টা করছে। সুপ্রিম কোর্টে পিআইএল ফাইল করা, তার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা— ইত্যাদি করছে। এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে— কারণ আদালত নির্বাচন কমিশনেরই পক্ষ নিয়েছে। এর আগে আধারের বিষয়েও আমরা দেখেছি আদালতের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত ভ্রান্ত। আদালত বিষয়টাকে যথোচিত গুরুত্বই দেয়নি, এবং ১০ দিন পর-১৫ দিন পর খালি ডেট দিয়ে গেছে। ফলে লড়াইটা রাজনৈতিক, আইনি লড়াই নয়। আটাকে আইনি লড়াইয়ে পরিণত করতে চাওয়া আসলে লড়াইটাকে হারিয়ে দেওয়ার সামিল। কারণ আদালত, সিবিআই— যা-ই বলুন, সবই সরকারের। এই পরিস্থিতিতেই এখানে টিএমসি সরকার কী করে সেটা দেখার। বাংলার পরিস্থিতি বিহারের মতো নয়, এখানে একটা শক্তিশালী বিরোধী রয়েছে যারা আবার ক্ষমতায় আছে। ফলে দেখতে হবে বাংলায় কী হয়।
তৃতীয়ত, ভারতীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষা বদলে যাচ্ছে। আগে যেটা বিভিন্ন অধিকারের প্রশ্ন ছিল— তথ্যের অধিকার, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অধিকার, জঙ্গলের অধিকার, এনরেগা— সেসবের জায়গা নিচ্ছে এখন নাগরিকত্ব, এনআরসি, ভোটার তালিকা, ইত্যাদি। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সংখ্যালঘু-বিরোধী মানসিকতা। আমার মনে হয় এই পরিবর্তনটা এখনও সেভাবে পরিলক্ষিতই হচ্ছে না। নাগরিক সমাজের অনেক গ্রুপই ভাবছে যে এখনও সেই এনরেগা-জাতীয় রাজনৈতিক অর্থনীতিই চলছে, এবং ফলত তারা এই নতুন ভাষ্যের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারছে না। সিভিল সোসাইটির লোক— যেমন, আমরা— আমরা ফ্যাসিবাদ নিয়ে পড়াশোনা করি, কীভাবে কী ঘটেছিল সেসব জানি— কিন্তু আমাদের ভারতীয় প্রেক্ষিতে ফ্যাসিবাদকে বুঝতে হবে। আমাদের পড়াশোনাগুলো আমাদের গাইডের কাজ করতে পারে, কিন্তু সেগুলিকেই সব ধরে নিলে হবে না। আমাদের নিজস্ব তত্ত্ব বানাতে হবে। শুধুই গ্রামশি এবং অন্যান্য তাত্ত্বিকদের ওপর নির্ভর করাটা যথেষ্ট নয়।
রাজনৈতিক দলগুলিও সংসদীয় গণতন্ত্রের ইস্যুগুলিকে অবহেলা করেছে। ঠিক সংসদীয় গণতন্ত্র বলব না, বরং ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিষয়গুলিকে, এবং ভোটার তালিকা, নাগরিকত্বের বিষয়গুলির সঙ্গে এর সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়নি। ফলে আমরা সবসময়েই আরএসএস-বিজেপির পেছনে থেকে গেছি। আমরা সবসময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। কখনওই ধারণা করতে পারিনি যে ওদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে চলেছে। ওরা কিছু একটা করেছে, আর আমরা তার পরে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। এবং সেই প্রতিক্রিয়াগুলিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল স্ট্র্যাটেজি দ্বারা পরিচালিত।
বিহার ঘুরে এবং এসআইআর দেখে এই যা আমার মনে হল।

