আজকের রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চল— বিপন্ন মানুষ, বিপন্ন পরিবেশ

শৈলেন ভট্টাচার্য

 


হাজার হাজার বছর ধরে ধারাবাহিক কৃষি উৎপাদন ও ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল মানুষেরা প্রতিনিয়ত উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের চিরাচরিত জীবন-জীবিকা থেকে। উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকেও। সবচেয়ে মারাত্মকভাবে উৎখাত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ওই সব কৃষিজমি ও ভূ-প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল শ্রমদানকারী ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, বর্গাদার-ভাগচাষি ও অন্যান্য পেশার মানুষ। তাঁরা কোনও ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প জীবিকা পাচ্ছেন না; অথচ উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের পুরনো জীবিকা থেকে। এদের পঁচানব্বই শতাংশই তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষ

 

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের পাশেই পূর্ব-পশ্চিমে কাজোরা থেকে বরাকর হয়ে ঝাড়খণ্ডের মগমা-রাজমহল, আর উত্তর-দক্ষিণে পাণ্ডবেশ্বর থেকে সাঁকতোড়িয়া, বাঁকুড়া-কালীদাসপুর— রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে যে-কোনও স্থানে ভ্রমণ করলেই রাস্তার দু-পাশে চোখে পড়বে পাহাড়প্রমাণ মাটি-পাথরে স্তূপীকৃত বিশাল বিশাল ঢিবি। তার পাশেই দেখা যাবে বিরাট বিরাট ব্যাসার্ধের তিনশো–চারশো ফুট গভীর গর্ত। কোথাও জলে ভর্তি বিশাল হ্রদ, কোথাও আবার উঁচু-নিচু গর্তে ভরা অসমান, রুক্ষ ভূমি। এর সঙ্গে বাতাসে রয়েছে বিপজ্জনক পরিমাণ কয়লার গুঁড়ো আর ধুলো, যা স্বাভাবিক মানুষের শ্বাসকষ্টের জন্য যথেষ্ট। এটাই আজকের রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলের বাস্তব চিত্র। যদিও ভারতের সমস্ত খনি অঞ্চলের অবস্থা কমবেশি একই, তবুও আমাদের আলোচ্য বিষয় পশ্চিমবঙ্গের কয়লাখনি, বিশেষ করে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস-এর এলাকা।

ভারতের কয়লাখনির দুশো বছরের ইতিহাসে রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চলই সর্বপ্রথম। এই অঞ্চলে প্রথমে ব্রিটিশ ও জমিদাররা খনি থেকে কয়লা তোলার কাজ শুরু করে, যা এই শতকের প্রথমদিকে দামোদর উপত্যকার রানিগঞ্জ-বরাকর অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করে। এই কয়লা তোলার কাজে নিযুক্ত করা হয় বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও উত্তরপ্রদেশ এবং স্থানীয় গ্রামাঞ্চলের তফসিলি জাতি/জনজাতি ও অন্যান্য পশ্চাদপদ শ্রেণির মানুষদের— এক ধরনের বন্ডেড লেবার সিস্টেম-এর মাধ্যমে।

১৯০১ সালে Mines Act প্রণীত হলেও ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত খনি-নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে তেমন কোনও সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন না থাকায় কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে যথেচ্ছভাবে যত্রতত্র খননের ফলে যেমন বহু দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের জীবনহানি ঘটেছে, তেমনি বহু অঞ্চলের ভূগর্ভ তখন থেকেই শূন্য হয়ে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই রানিগঞ্জ-বরাকর অঞ্চলে বহু জনবসতিপূর্ণ এলাকা ধসপ্রবণতায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে অথবা ভূগর্ভে বিস্ফোরক আগুন বহন করে চলেছে।

১৯৪৭ সালের পর অন্য শিল্পের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কয়লা উত্তোলনের কাজ বৃদ্ধি পায় ও ঘনীভূত হতে থাকে। অবশেষে এই কয়লার চাহিদাকে সামনে রেখে এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বিনিয়োগের সুবিধার্থে কয়লাশিল্পকে একটি কেন্দ্রীভূত শিল্পে পরিণত করার জন্য ১৯৭৩ সালে তা জাতীয়করণ করা হয়। খনি জাতীয়করণের ফলে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও শ্রমিকদের একটি বড় অংশের— বিশেষ করে পশ্চাদপদ শ্রেণির— কোনও সামাজিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হয়নি। এখনও সমস্ত শ্রমিকের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল, আলো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও উপযুক্ত বাসগৃহের ব্যবস্থা করা হয়নি। প্রতিটি কয়লাখনিতে বস্তি ও ধাওড়ার অস্তিত্বই তার প্রমাণ।

জাতীয়করণের পর স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অনুপ্রবেশ অনেক বেশি বেড়েছে, এবং তা মূলত ঘটেছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি থেকে যথেচ্ছ প্রযুক্তি আমদানির মাধ্যমে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই প্রযুক্তির গুণাগুণ ও আমাদের দেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থায় ভূগর্ভস্থ কয়লার স্তর এবং পাথরের ছাদ (stone roof)— এগুলির অবস্থান, গভীরতা ও প্রকৃতির সঙ্গে তার কোনও সাযুজ্য ও উপযোগিতা আছে কি না, সে বিষয়ে আদৌ বিচার করা হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির নামে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের বিরাট অংশ অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে এবং কয়লাশিল্পে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়েছে।

জাতীয়করণের পরেও বেপরোয়া খনননীতি একইভাবে অব্যাহত থেকেছে। অনেক ক্ষেত্রেই তা মাইনস অ্যাক্ট ও সেফটি রুলস-কে কাঁচকলা দেখিয়ে অবৈজ্ঞানিকভাবেও পরিচালিত হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন ক্রমাগত দুর্ঘটনায় অসংখ্য শ্রমিকের জীবনহানি ঘটেছে, তেমনি এই কয়লাখনি অঞ্চলের মানুষের চিরাচরিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন, ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজমি ও পরিবেশ দারুণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জাতীয়করণের পরে উচিত ছিল ব্যক্তিমালিকানার সময়ের ক্ষয়ক্ষতির প্রতিকার করা এবং আমাদের দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিকভাবে কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা। সেই অনুযায়ী বাগচী কমিটি, প্রসাদ কমিটি এবং অ্যাপেক্স মনিটরিং কমিটির মতো একাধিক কমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এগুলি মূলত সমস্যাগুলি চিহ্নিত করা ছাড়া, সেগুলি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কোনও গবেষণালব্ধ কার্যকর প্রতিষেধক ব্যবস্থার সুপারিশ করতে পারেনি।

বিপরীতে জাতীয়করণের পরেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকে কোনও গুরুত্ব না দিয়েই আরও বেশি কয়লা উৎপাদনকেই একমাত্র লক্ষ্য করে জোর দেওয়া হয়েছে বড় বড় খোলামুখ কয়লাখনি বা OCP এবং তারপরেই লংওয়াল (Long Wall) প্রযুক্তির উপর। এই প্রযুক্তি মূলত অত্যাধুনিক অটোমেশন ও বিশাল ভারী ভারী যন্ত্রনির্ভর, যার প্রায় নব্বই শতাংশই আমদানি করা হয়। রাশিয়া, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড প্রভৃতি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে অচল অবস্থায় পড়ে থাকা OCP ও লংওয়াল প্রযুক্তিকেই মাধ্যম করে কার্যত জাতীয়করণের পর থেকে আমাদের দেশের কয়লাশিল্পকে ইউরোপ-আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি তাদের দেশের জনগণের আন্দোলনের চাপে বাতিল হওয়া অথবা অচল প্রযুক্তি চড়া দামে বিক্রি করা ও পুঁজি খাটানোর এক মুক্তবাজারে পরিণত করে ফেলেছে।

 

খোলামুখ কয়লাখনি বা OCP পদ্ধতি অগভীর কয়লাস্তর থেকে কয়লা তোলার জন্য আগেও অবলম্বন করা হত এবং তা ছিল মানুষের দৈহিক শ্রমের উপর নির্ভরশীল। ফলে প্রচুর মানুষ কাজ পেত। কিন্তু বর্তমানে অনেক গভীর স্তরের কয়লাও OCP পদ্ধতির মাধ্যমে তোলা হচ্ছে। এতে ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রাগলাইন, শোভেল, ওভারবার্ডেন রিমুভার বা এক্সকাভেটর, আর্থ রিমুভারের মতো বিশাল অত্যাধুনিক ভারী মেশিন, যা হাজার হাজার কোটি টাকা বিশ্বব্যাঙ্ক বা বিদেশি ঋণ নিয়ে বিদেশ থেকেই কিনতে হয়।

এই পদ্ধতিতে গভীর স্তরের কয়লা দ্রুত তুলে নেওয়া সম্ভব হলেও তার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি ও গোচারণভূমি। বাগান, পুকুর, দীঘি, নালা-সহ সমস্ত ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করে বিপুল এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে। শেষ করে দিচ্ছে ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভের স্বাভাবিক জলের প্রবাহ।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলিতে ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সেখানকার কয়লাখনি অঞ্চলের জনগণের (coalfield community) আন্দোলনের ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলি OCP বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে অথবা এই পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন করেছে, যার ফলে সেখানে OCP চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীলতার কারণে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিকেই শুধু গুরুত্ব দেওয়া নয়, কার্যত একমাত্রিক পদ্ধতিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছে।

এর পরেই কয়লা উত্তোলনের জন্য যে পদ্ধতিটির উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল, তা হল লংওয়াল পদ্ধতি ও প্রযুক্তি। এই পদ্ধতির প্রযুক্তিও ইউরোপ–আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত। এই পদ্ধতিও পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর এবং অত্যন্ত পুঁজিনির্ভর। পদ্ধতিটি হল পাওয়ার সাপোর্ট বা শিল্ড সাপোর্ট (chock shield) লাগিয়ে কয়লাস্তরের উপরের ছাদকে ধরে রেখে বিশাল আয়তন জুড়ে শিয়ারার (shearer) নামে স্বয়ংক্রিয় কয়লা-কাটা বিরাট যন্ত্রের সাহায্যে একসঙ্গে খুব দ্রুত বিপুল পরিমাণ কয়লা কেটে তুলে নেওয়া। আর কয়লা কেটে নেওয়া ওই ফাঁকা অঞ্চলকে ভরাট না করে পরিকল্পিতভাবে ধস নামিয়ে দেওয়া হয়।

 

ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক গভীর স্তর থেকে কয়লা তুলে পরিকল্পিত ধস নামানো হয় বলে ভূ-পৃষ্ঠের উপরিস্তরে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে অগভীর কয়লাস্তরেও এই লংওয়াল পদ্ধতিতে কয়লা কেটে ধস নামানোর ফলে ভূ-পৃষ্ঠের উপরিস্তরের কৃষিজমি, বাস্তুভূমি, পুকুর, বাগান, খাল-বিল-দীঘি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। কোথাও গর্ত, কোথাও বিরাট বিরাট ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই OCP-র মতো লংওয়াল পদ্ধতিতেও নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি ও ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদ; সার্বিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

যেহেতু বাইরের দেশ থেকে আমদানিকৃত লংওয়াল প্রযুক্তিটি আমাদের দেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে গড়ে ওঠেনি, তাই যান্ত্রিকভাবে এই প্রযুক্তিকে আমাদের খনিতে প্রয়োগ করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নানাবিধ ভূ-তাত্ত্বিক জটিলতার সৃষ্টি হয়, যা অনিবার্য ব্যর্থতাকেই ডেকে আনে।

শীতলপুর কোলিয়ারি, মেনধেমো কোলিয়ারি, চিনকুড়ি কোলিয়ারি, ঝাঁঝড়া কোলিয়ারি এবং খোট্টাডি কোলিয়ারি— এই পাঁচটি জায়গায় বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতায় লংওয়াল পদ্ধতি শুরু হয়েছিল। উপরোক্ত পাঁচটি ক্ষেত্রেই এই প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।

খোট্টাডি প্রকল্প নিয়েই আলোচনা করা যাক। খোট্টাডি প্রকল্পে প্রোডাকশন গ্যারান্টির ভিত্তিতে ফ্রান্সের CDF সংস্থার লংওয়াল প্রযুক্তি আনা হয়েছিল। এখানে পাওয়ার সাপোর্টগুলিই ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ক্ষমতাসম্পন্ন এবং অত্যন্ত নিম্নমানের। আমাদের দেশের CMRI ও CMRS প্রভৃতি সংস্থার খনি-বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী এখানকার ভূগর্ভের কয়লাস্তর ও ভূ-তাত্ত্বিক গঠন অনুসারে যেখানে ৮০০-১০০০ টন ওজন ধরার ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল, সেখানে ফ্রান্সের CDF সংস্থা স্তরের উপরের পাথরের ছাদ (stone roof)-এর প্রতি বর্গমিটারের ভুল হিসাব দেখিয়ে নিম্নমানের ৪৭০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার সাপোর্ট দিয়েই তাদের প্রযুক্তি বিক্রি করে দেয়। তারা যে উৎপাদন দেখাতে পেরেছিল, তাও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম ছিল।

 

এরপর প্রকল্প শুরু হওয়ার দেড় বছরের মাথায়, ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাসে, প্রায় সমস্ত পাওয়ার সাপোর্ট পাথরের চাপে বসে গিয়ে এক বিশাল দুর্ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন শ্রমিক নিহত হন এবং সাতজন মারাত্মকভাবে আহত হন। পুরো শিয়ারার মেশিন-সহ পাওয়ার সাপোর্টগুলি খনিগর্ভে পাথরের নিচে চাপা পড়ে। সেগুলি কোনওরকমে উদ্ধার করা গেলেও সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে যায়। খনির এই পরিত্যক্ত ফেসটিতে প্রায় ১৫০,০০০ মেট্রিক টন কয়লা ছেড়ে দিতে হয়।

এই অবস্থায় পুরনো বোর্ড অ্যান্ড পিলার পদ্ধতিতে উৎপাদন চালানোও সহজ ছিল না। ফলে খোট্টাডিতে নতুন করে অন্য কোনও পদ্ধতি খুঁজতে ও ভাবতে হয়। এইভাবে ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেডে একের পর এক লংওয়াল পদ্ধতি ব্যর্থ হওয়ায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো যায়নি। অথচ বারবার উল্টোপাল্টা পরিকল্পনা করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অকেজো যন্ত্রপাতি বসানো হয়, যার ফলে কয়লাশিল্পে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির ফলেই ইসিএলকে একসময় অলাভজনক সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং সংস্থাটিকে BIFR-এর দরজায় দাঁড়াতে বাধ্য হতে হয়।

ইসিএল এই অলাভজনক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের যে আশিটি ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি জাতীয়করণ করা হয়েছিল, তার মধ্যে চৌষট্টিটি ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একই সঙ্গে ইসিএল BIFR-এর কাছে প্রস্তাব দেয়— সংস্থাকে লাভজনক করতে হলে সতেরোটি প্যাচেস প্রাইভেট মাইনারদের দিয়ে খনন করানো হবে; তাতেই ইসিএল লাভের মুখ দেখবে।

প্যাচেস বলতে বোঝায় ছোট কয়লার সিম, যা উত্তোলন করতে মাত্র দশ-বারো বছর সময় লাগে। তাই মাইনস প্ল্যান ইসিএলের, ব্লাস্টিংও ইসিএলের; কিন্তু কয়লা মেশিন দিয়ে উত্তোলন করে ডিপো পর্যন্ত পৌঁছে দেবে কোনও প্রাইভেট মাইনিং কোম্পানি। এটি একটি মারাত্মক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত।

 

পাঁচবারের বিধায়ক, তিনবারের সাংসদ এবং সিটু নেতা হারাধন রায় এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর মত ছিল— এভাবেই ইসিএল ধীরে ধীরে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু তৎকালীন সিটু, বামফ্রন্ট সরকার এবং সর্বোপরি সিপিএম পার্টি এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। ফলে ইসিএল BIFR থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

কিন্তু হারাধন রায়ের কথা আজ সত্যে পরিণত হয়েছে। একের পর এক আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনস বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, বড় বড় লাইফটাইম খোলামুখ কোলিয়ারি প্রাইভেট মাইনিং কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি চিনাকুড়ির মতো আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনসও প্রাইভেট মাইনিং কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

হারাধন রায়

 

এইভাবে ইসিএল এলাকায় সরকার ও খনি কর্তৃপক্ষ অত্যাধুনিক OCP ও লংওয়াল পদ্ধতির মাধ্যমে ইউরোপ–আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি থেকে প্রযুক্তি আমদানি করে যে বেপরোয়া কয়লা উত্তোলনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে খোট্টাডিহি, শোনপুর, ঝাঁঝড়া, পরাশিয়া, জামবাদ, তপসী, বাঁশরা, সাতগ্রাম, কালীদাসপুর, মুগমা–রাজমহল প্রভৃতি বিস্তীর্ণ কয়লাখনি অঞ্চলের জনজীবন ভয়ঙ্করভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই দুই পদ্ধতিতে খুব দ্রুত কয়লা তুলতে গিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে ব্যাপক এলাকার হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি, যার পরিমাণ প্রায় ২০,০০০ হেক্টর।

ফলে হাজার হাজার বছর ধরে ধারাবাহিক কৃষি উৎপাদন ও ভূ-প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল মানুষেরা প্রতিনিয়ত উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের চিরাচরিত জীবন-জীবিকা থেকে। উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবন থেকেও। যদিও নথিভুক্ত জমির মালিকরা এখনও দুই একর জমি পিছু একটি চাকরি ও জমির সামান্য দাম পাচ্ছেন, কিন্তু তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছেন শুধুই শূন্যতা ও নিঃস্বতা।

সবচেয়ে মারাত্মকভাবে উৎখাত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ওই সব কৃষিজমি ও ভূ-প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল শ্রমদানকারী ক্ষেতমজুর, দিনমজুর, বর্গাদার–ভাগচাষি ও অন্যান্য পেশার মানুষ। তাঁরা কোনও ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প জীবিকা পাচ্ছেন না; অথচ উৎখাত হচ্ছেন তাঁদের পুরনো জীবিকা থেকে। এদের পঁচানব্বই শতাংশই তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষ। উৎখাত হওয়া মানুষের সংখ্যা শুধু ইসিএল এলাকাতেই চার লক্ষের বেশি।

 

এই সব উৎখাত মানুষ জীবিকাহীন হয়ে কখনও কয়লা–লোহা চুরি করতে বাধ্য হচ্ছেন, না হলে রোজ প্রতি ২৫০-৩০০ টাকায় ঠিকা শ্রমিকের কাজ করছেন। আর এই সব প্রকল্পে স্থায়ী শ্রমিকের পরিবর্তে ঠিকা শ্রমিক দিয়ে স্থায়ী ধরনের কাজ করিয়ে এলাকাগুলিকে সস্তা শ্রম লুণ্ঠনের বাজারে পরিণত করা হচ্ছে।

এছাড়া জাতীয়করণের পর থেকেই ক্রমাগত OCP ও লংওয়াল পদ্ধতির উপর সমস্ত নিয়োগকে ঘনীভূত করতে গিয়ে খনির আন্ডারগ্রাউন্ড বা পিট মাইনস, ইনক্লাইন প্রভৃতি প্রচলিত পদ্ধতির অসংখ্য খনিকে মারাত্মকভাবে অবহেলা করা হয়েছে। ফলে সংস্থার দৈনন্দশা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে ওইসব খনির জন্য দুটো নাট-বোল্ট কেনার পয়সাও নেই। ওইসব খনির শ্রমিকদের জন্য টুপি (হেলমেট), জুতা, ঝোড়া, বেলচা প্রভৃতির অভাব দেখা দিচ্ছে এবং শ্রমিকদের কল্যাণমূলক (welfare) সমস্ত সুযোগ–সুবিধা সাংঘাতিকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। সর্বোপরি, প্রচলিত খনিগুলির শ্রমিকদের কাজের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

এইভাবে, পুরনো আমল থেকে আজ পর্যন্ত উৎপাদন বাড়ানোর উন্মত্ততায় কয়লা উত্তোলনের সমস্ত নিয়ম উল্লঙ্ঘন করার ফলে ভূগর্ভের কয়লাস্তরে আগুন লাগা, ছাদ ধসে পড়া ইত্যাদি সমস্যাগুলি ধারাবাহিকভাবে ঘটছে।

এখনই, রানিগঞ্জ-আসানসোল খনি অঞ্চলে এই বেপরোয়া খনন নীতির ফলে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিম্নরূপ:

১। ধসের জন্য বিপন্ন অঞ্চল:

ক. ৪৫টি অঞ্চলকে ধসের জন্য বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৫০টির বেশি অঞ্চলে ধসজনিত দুর্ঘটনা ঘটেছে।
খ. রানিগঞ্জের বেশ কিছু অঞ্চল এবং বরাকরের বৃহৎ অঞ্চল-সহ ১৪টি অঞ্চলকে বিপন্ন অবস্থার থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

২। পরিকল্পিত ধস নামানোর জন্য জমি ও কৃষির উপর প্রভাব:

ক. এখনও পর্যন্ত ৩০,০০০ হেক্টর জমি নষ্ট হয়েছে, যার মধ্যে পঞ্চাশ শতাংশই কৃষিজমি। ফলে এই অঞ্চলের কৃষিজমির ৬০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাবে।
খ. জমির জলধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
গ. ক্ষেতমজুর ও বর্গাদাররা পেশাহীন হয়ে পড়েছে, এবং ছোট ছোট কৃষিজীবীরাও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

৩। ভূমির উপরিভাগ এবং ভূগর্ভস্থ জলের অবস্থা:

ক. খনির কাজে ভূগর্ভ থেকে প্রতিদিন ১০০ গ্যালনেরও বেশি জল তোলার কারণে ভূগর্ভস্থ জলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং কয়লাখনি অঞ্চলে সর্বত্র জলের অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এর ফলে প্রয়োজনের তুলনায় ২০০ মিলিয়ন গ্যালনেরও বেশি জলের অভাব দেখা দেবে।
খ. স্থানীয় এলাকায় কুঁয়ো, পুকুর এবং নদীর জল তেল ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থের দ্বারা এমনভাবে দূষিত হচ্ছে যে তা পান ও সেচের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে।
গ. এগুলির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষ, এমনকি তাঁদেরকে দূষিত জলই পান করতে হচ্ছে।

৪। পেশা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা:

ক. পশ্চিমবঙ্গের কয়লাখনিতে শ্রমিকের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমে প্রায় ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
খ. জমি দেওয়া ছাড়া কয়লাখনিতে কোনও নিয়োগনীতিই নেই (No recruitment policy)।
গ. কয়লাখনির সঙ্গে যুক্ত কোনও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে না।
ঘ. দূষিত জলের কারণে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পেটের রোগ দেখা দিচ্ছে।
ঙ. বাতাসে ধুলো, ধোঁয়া ও কয়লার গুঁড়োর বিপজ্জনক পরিমাণ-বৃদ্ধির কারণে হাঁপানি, সিলিকোসিস, নিউকোমোনাইটিস এবং টিবি রোগের প্রকোপ বেড়েছে।
চ. এই অঞ্চলের ২৫ শতাংশ শিশু ও মেয়েরা রক্তাল্পতায় ভুগছে। গ্যাসট্রোএনট্রাইটিস এবং শ্বাসকষ্টও ব্যাপক।

কয়লাখনি শিল্পের মতোই, কিছু বড় বড় বাঁধ ও অন্যান্য শিল্পপ্রকল্পের জন্যও ব্যাপক সংখ্যক কৃষিজীবী, বিশেষ করে তফসিলি জাতি ও জনজাতির মানুষ, তাঁদের জীবন–জীবিকা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তাঁদের সংখ্যা প্রায় চার কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ইসিএল এলাকাতেই এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ।

এঁদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ইসিএল অঞ্চলের ইউনিয়নগুলির তরফে যে খসড়া প্রস্তাব দেওয়া হয় তার মূল দিকগুলি হচ্ছে:

১. কোনও একটি প্রকল্প তৈরি হলে শুধুমাত্র জমি বা বাস্তুজমির মালিকরাই উচ্ছেদ বা উৎখাত হয় না; বরং এই জমির উপর নির্ভরশীল চাষি, ভাগচাষি, ক্ষেতমজুর এবং কৃষির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পেশা ও ব্যবসায় জড়িত লোকরাও উচ্ছেদ হয় এবং পেশা থেকে উৎখাত হয়। তাই এই উচ্ছেদটি হল সমগ্র পদ্ধতিটির উচ্ছেদ, এবং অধিগ্রহণের ফলে যে ক্ষতি হয়, তা অনেক বেশি।

২. পুনর্বাসন শুধুমাত্র টাকায় ক্ষতিপূরণ এবং জীবিকার ব্যবস্থা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটিকে বহুমুখী হতে হবে। এর মধ্যে থাকবে সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, পেশাগত, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত ও ভূ-প্রাকৃতিক সকল দিক। এছাড়াও, প্রোজেক্টের মূল বিনিয়োগের সঙ্গে এর খরচও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

৩. উদ্বাস্তুদের চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়ায় জমি-ঘরবাড়ি ইত্যাদি থেকে প্রত্যক্ষভাবে উৎখাত হওয়াদের সঙ্গে বর্গাদার, ক্ষেতমজুর, গ্রামীণ কারিগর ও হস্তশিল্পী এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকেও চিহ্নিত করতে হবে।

প্রস্তাবে এই ক্ষতিগ্রস্তদের শুধুমাত্র প্রোজেক্টে কাজ দেওয়া নয়, বরং বিভিন্ন স্বনিয়োজিত প্রকল্প এবং অন্যান্য মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জীবিকা সৃষ্টির কথাও বলা হয়েছে।

এই খসড়া প্রস্তাবে CIL সম্মতি জানিয়েছে। কিন্তু এ-বিষয়ে কয়লা মন্ত্রক বা ইসিএল কর্তৃপক্ষের কোনও কার্যকরী ভূমিকা দেখা যায়নি।

তাই আমরা কয়লাখনি অঞ্চলের পরিবেশরক্ষা এবং সমস্ত ধরনের উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সার্বিক পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাবিত নিম্নোক্ত দাবিগুলি নিয়ে, অনুমোদনসাপেক্ষে, সমগ্র ইসিএল এলাকায় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই।

প্রস্তাবিত দাবিসমূহ:

১. রানিগঞ্জ কয়লাখনি এলাকায় ধস, গ্যাস, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও এলাকা নিয়ে হারাধন রায়ের করা সুপ্রিম কোর্টের মামলার জাজমেন্ট অনুযায়ী, সমস্ত ধসপ্রবণ এলাকা থেকে সমস্ত মানুষকে সম্পূর্ণ পুনর্বাসন করতে হবে। যতদিন পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না, ততদিন ধসপ্রবণ এলাকাগুলোর মানুষের সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য খনি ধসবিমা (Mines Subsidence Allowance) চালু করতে হবে।

২. ধস নামানো নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত ধসের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্তরের উপরিভাগ ভরাট করা ও OCP-র গর্ত ভর্তি করে জমি পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করতে হবে।

৩. এই ভরাটের কাজ বাধ্যতামূলক করার জন্য বন্ড ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকতে হবে। খনি কর্তৃপক্ষ এই কাজ না করলে রাজ্য সরকার বন্ডের টাকা ব্যবহার করে সেই কাজ সম্পন্ন করবে।

৪. পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা, প্রোজেক্ট-পূর্ববর্তী বিশ্লেষণের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিবেশের উপর প্রোজেক্টের প্রভাব কতদূর পড়বে সঠিকভাবে তার বিচার করে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রোজেক্টের মোট বিনিয়োগের মধ্যে পুনর্বাসন ও পরিবেশ রক্ষার খরচ ধরতে হবে।

৫. রানিগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র এক জনবহুল এলাকা। এইরকম জনবহুল এলাকায় বড় বড় OCP নিষিদ্ধ করতে হবে।

৬. প্রোজেক্ট অনুমোদনের আগেই এই কাজে জনগণের অংশগ্রহণের অধিকারকে গ্যারান্টি দিতে হবে।

৭. প্রোজেক্টের কাজে ব্যাপক জমি ও গ্রামাঞ্চল অধিগ্রহণের ফলে কৃষি ও অন্য জীবিকা থেকে উৎখাত হওয়া সমস্ত ধরনের মানুষকে বিকল্প জীবিকা-সহ সার্বিক পুনর্বাসন দিতে হবে।

৮. খনির জন্য উৎখাত হওয়া মানুষের আঞ্চলিক ভিত্তিতে তালিকা প্রকাশ করতে হবে।

৯. যে-কোনও নতুন প্রোজেক্ট শুরু হলেই তার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম বা কর্মীর পঞ্চাশ শতাংশ চাকরি স্থানীয় মানুষকে দিতে হবে।

১০. খনির উৎপাদনের জন্য সরকার প্রদেয় সেস-এর টাকার অর্ধেক অংশ খনি অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে হবে।

১১. পেট্রোলিয়ামের মতো কয়লা-নির্ভর নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হবে।

১২. কৃষিকে সম্পূর্ণ বিদায় দিয়ে কোনও শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। তাই কয়লা তোলার পরেই ক্ষতিগ্রস্ত জমিকে পুনরুদ্ধার করে কৃষি-উপযোগী করে তুলতে হবে। জলাধার ও পুকুরগুলো ব্যবহার-উপযোগী করে তুলতে হবে।

১৩. যেখানে জমিকে কৃষিকাজের উপযোগী করা যাবে না, সেখানে স্থানীয় মানুষের অবস্থা অনুযায়ী ফলের বাগান, মাছচাষ ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বিকল্প জীবিকা সৃষ্টি করতে হবে।

১৪. রুগ্ন শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প এবং অন্যান্য শিল্পকে কয়লার সঙ্গে যুক্ত করে বিকশিত করতে হবে।

১৫. কয়লা খনন ও উত্তোলনের কাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি ও মেরামতির জন্য এমএএমসি-র মতো প্রতিষ্ঠানকে পুনর্জীবিত করতে হবে।

১৬. আমাদের দেশের খনিগর্ভের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বৈজ্ঞানিকভাবে আধুনিকীকরণ করে ভূগর্ভস্থ কয়লাখনি মাধ্যমে কয়লা উত্তোলন করতে হবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5247 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...