Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

জনগড় সিং শ্যাম: আত্মহত্যার অধিকার

দেবকুমার সোম

 


বিরসা মুন্ডার সার্ধশতবর্ষে লিখতে বসে জনগড় সিং শ্যামের কথা লিখলাম। সংসদে প্রতিকৃতি টাঙিয়ে, নানাভাবে বিরসার নামটাকে সরকারি করে তোলার অশ্লীল প্রয়াস দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল জনগড়কে

 

 

মানুষ কেন আত্মহত্যা করে?

এ-নিয়ে বিস্তর চর্চা এবং গবেষণা হলেও একমাত্র রাজনীতিক ও আর্থনৈতিক কারণে আত্মহত্যার কারণগুলোয় নিশ্চয়তা আছে। তাছাড়া বাকি সব আত্মহত্যা আমাদের সম্ভাব্যতার মুখে এনে দাঁড় করায়। যে কারণে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ নিয়ে বিস্তর আইনি জটিলতা তৈরি হয়। শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসে আত্মহত্যা বিরল। তাই এ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ চর্চা প্রায়ই চোখে পড়ে। এর মধ্যে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের বুকে রিভলবর ঠেকিয়ে তাৎক্ষণিক আত্মহত্যা যেমন আছে, তেমনই অমৃতা শেরগিল, সিলভিয়া প্লাথের মতো নিজেকে ধীরে ধীরে আত্মহননের রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার উদাহরণও পাওয়া যায়। জনগড় সিং শ্যামের আত্মহত্যা তেমন গোত্রের নয়। এ নিয়ে গত সিকি শতাব্দী বোদ্ধা এবং স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের নামী প্রকাশনা থেকে দামী ইংরেজি বই বহু প্রকাশিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ নিয়ে বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট রয়েছে। আমার বাংলায় লেখা এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ লেখাটি যুক্তিপূর্ণ কারণেই সেসবের থেকে বহু দূরে। তবুও যে দু-তিন জন পাঠক অনুগ্রহ করে এই লেখাটি পড়বেন, তাঁদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ: আপনারা এই লেখার শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকুন। কারণ জনগড় সিং শ্যামের আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায় কিঞ্চিৎ হলেও আমাদের ওপরেও বর্তায়।

বলে নেওয়া গেছে জনগড়ের আত্মহত্যার ময়নাতদন্ত এ-লেখা নয়। পঁচিশ বছরের ওপার থেকে এ-নিয়ে বাক্যব্যয়ও বৃথা। ফলে প্রথমেই আমাকে সংক্ষেপে বলে নিতে হবে জনগড়ের জীবনকথা।

 

জীবনকথা-১

জনগড় সিং শ্যামের জন্ম ১৯৬১ সালে মধ্যপ্রদেশের ডিনডোরি জেলার পাঠানগড় গ্রামে, এক পারধান আদিবাসী পরিবারে। ভারতের জনগণনায় পারধানদের গোন্ডদের থেকে আলাদা ভাগে দেখানো আছে। আমাদের দেশের স্বঘোষিত আদিবাসী বিশেষজ্ঞরা জনগড়কে গোন্ড আদিবাসী হিসেবে সর্বত্রই পরিচয় করিয়েছেন। এই সেই বিশেষজ্ঞরা, যাঁরা নিজেদের আদিবাসী সমাজের বন্ধু এবং প্রতিনিধি হিসেবে জাহির করে ডলারে মুখ মোছেন। জনগড় মোটেও গোন্ড ছিলেন না। ফলে তাঁর বা তাঁর অনুসারী শিল্পকে গোন্ড শিল্প বলে প্রচার করা আহম্মকি ছাড়া আর কিছু নয়।

বৃহৎ গোন্ড আদিবাসী, যারা এক সময় মধ্যভারত থেকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যাদের নামেই এই অংশের ভূগোলের নাম গন্ডোয়ানাল্যান্ড, পারধান গোষ্ঠী বর্ণবিভাজনে সমাজে তাদের নিচে অবস্থান করছে। যদিও দুই গোষ্ঠীর দেবতা, পুরাণকথা, সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে খালি চোখে বিশেষ কিছু ফারাক নেই। তবে গোন্ডদের সঙ্গে পারধানদের বিয়েসাদি হয় না। পারধানরা গোন্ডদের হাতের রান্না খেলেও গোন্ডরা পারধানদের ঘরে রান্না খায় না। তবে পারধানদের থেকে কাঁচা শাক-সবজি, মাছ-মাংস ইত্যাদি গ্রহণ করা যায়। আরও আছে। গোন্ডদের ক্ষেতে পারধানরা কাজ করে, তাদের বিভিন্ন উৎসবে নাচ, গান, রামলীলা এইসব প্রদর্শন করে থাকে। গোন্ডরা স্বভাবে ব্যবসায়ী; বিপরীতে পারধানরা সাঁওতালদের মতো নাচ-গান-দেওয়ালচিত্র এসব নিয়ে মেতে থাকে। জনগড় সিং শ্যাম এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে পারধান বলেই দাবি করেছেন। কিন্তু আমাদের স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞরা শুনলে তো?

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে: ‘Success has many fathers; failure is an orphan.’ জনগড়কে ডিনডোরির পাঠানগড় গ্রাম থেকে তুলে এনে ভোপালে ‘গোন্ড আর্টিস্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার বাপের সংখ্যা কিছু কম নেই। সেই বাপেদের কাছে জনগড় সিং শ্যাম এমন একটা ‘সাকসেসফুল’ উদাহরণ হয়ে উঠেছে যে, আরও বহু জনগড়কে ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে শহরে তুলে আনতে বাপেদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে গত তিন-চার দশক ধরে। জনগড়কে নিয়ে এই বাপেদের মধ্যে আকচাআকচি কিছু কম নয়। কেউ বলেন জনগড়কে তিনিই গ্রাম থেকে তুলে এনেছেন, কেউ আবার বলেন তাঁর অভিভাবকত্বেই শ্যামের পরিচিতি আন্তর্জাতিক। যাইহোক প্রামাণ্য তথ্য থেকে যেটুকু জানা যাচ্ছে তা হল ১৯৮০-৮১ সাল নাগাদ ভোপালের ভারত ভবন সেন্টারের অধিকর্তা জগদীশ স্বামীনাথনের নেতৃত্ব ট্রাইবাল আর্ট নিয়ে কর্মশালার সূচনা হয়। ভারত ভবন ভোপালের সরকারি আর্ট সেন্টার, যেখানে মধ্যভারতের বিভিন্ন ফোক এবং ট্রাইবাল আর্ট এবং ক্রাফট নিয়ে চর্চা এবং গবেষণা হয়। মনে রাখতে হবে যে সময়ের কথা হচ্ছে, সে-সময় কংগ্রেস সরকার ইন্দিরা গান্ধির একক ক্ষমতায় দেশ-শাসনে। তাঁর পেছনে উঁকি মারছেন রাজীব গান্ধি। সেই সময়কালে স্বামীনাথন তাঁর দল নিয়ে জনগড়ের গ্রাম পাঠানগড় পৌঁছান। তাঁর কাছে এই তথ্য ছিল যে পাঠানগড় আদিবাসী গ্রামে চিত্রশিল্পে আর্টের সম্ভাবনা রয়েছে। স্বামীনাথন পিকাসোর সেই কথাটা মনে রেখেছিলেন, যেখানে আফ্রিকার ট্রাইবাল আর্ট সম্পর্কে বলতে গিয়ে পিকাসো বলেছিলেন ট্রাইবাল আর্টকে আর্ট হিসেবে দেখতে হবে, ক্রাফট হিসেবে নয়। এ-প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছিলেন যে, প্রকৃত শিল্পের কোনও নির্দিষ্ট ভূগোল থাকে না। যে কারণে তাঁর কিউবিজ়মে আমরা দেখতে পাই আফ্রিকান ট্রাইবাল আর্টের প্রত্যক্ষ প্রভাব।

পাঠানগড়ে স্বামীনাথন একটি দেওয়ালচিত্র দেখে শিল্পীর নাম জানতে আগ্রহী হন। জানা যায় শিল্পীর নাম জনগড় সিং শ্যাম। বছর কুড়ির এক যুবক। জনগড় তখন পাশের গ্রামের জমিতে কাজ করছিলেন। তাঁর কাছে খবর গেলে তিনি নিজের গ্রামে চলে আসেন। স্বামীনাথন তাঁকে ভোপালে ভারত ভবনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। জনগড় সংসারী মানুষ। বিধবা মা, ভাই-আত্মীয়, বউ-বাচ্চা নিয়ে তাঁর সংসার নেহাত কম বড় নয়। রোজগার বলতে অন্যের জমিতে কাজ করা, জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করা ইত্যাদি। আমাদের দেশে একশো দিনের কাজের প্রকল্প তখনও আলোচনার স্তরে। জনগড় এই সামান্য রোজগারের পাশাপাশি লোকের বাড়ির দেওয়ালে ছবি আঁকেন। বন্ধু রাম সিংয়ের সঙ্গে রামলীলায় অংশ নেন। গান করেন। অর্থাৎ একজন আদর্শ পারধান আদিবাসী। জনগড় স্বামীনাথনকে জানালেন ভোপালে যেতে তাঁর আপত্তি নেই, তবে তাঁকে একটা চাকরি আর থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। স্বামীনাথনের ব্যবস্থাপনায় জনগড় ভোপালের ভারত ভবনে প্রিন্ট মেকিং সেকশনের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পেলেন। ভবনের পেছনদিকে টিনের চালাঘরে আশ্রয়। আর এভাবে জনগড় তাঁর জন্মভিটে থেকে চিরকালের জন্য বিবাগী হলেন।

ভোপাল অধ্যায়ে যাওয়ার আগে পাঠানগড় সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ তথ্য দেওয়া যাক। গ্রামদেশে জন্ম-মৃত্যুর হিসাব কে রাখে? কেনই বা রাখে? জ্যোতিন্দর জৈন, যিনি দিল্লিতে জনগড়ের ছবি প্রদর্শনের কিউরেটর থেকে ব্যক্তিজীবনে বন্ধু হয়ে ওঠেন, তাঁর কাছে জনগড় জানিয়ে গেছেন নিজের জন্মকাহিনি। সেদিন (১৯৬১ সালের কোনও এক দিন) ভারতের জনগণনা দপ্তর থেকে আধিকারিকরা পাঠানগড় গেছেন গ্রামের জনগণনায়। গ্রামের প্রধানের কাছে বসে তাঁরা সরকারি কাজকর্ম করছিলেন। সেই সময় কেউ একজন ছুটে এসে খবর দিলেন গ্রামে বাচ্চা জন্মেছে। সেই শুনে জনগণনা আধিকারিকরা নবজাতকের নাম রাখলেন জনগণনা, যা বিকৃত উচ্চারণে শেষে হয়ে দাঁড়ায় জনগড়।

 

জীবনকথা-২

ভোপাল রাজধানী শহর। ভারত ভবন সেই শহরের শিল্পকলার প্রথান ক্ষেত্র। সেখানেই একুশ বছরের জনগড়ের দ্বিতীয় শিল্পীজীবন শুরু। গোবর-লেপা খর্‌খরে মাটির দেওয়াল আর প্রাকৃতিক উপায় পাওয়া সামান্য কিছু রং নিয়ে আনন্দময় আদিবাসী শিল্পিত জীবন নয়, সাদা মসৃণ কাগজ, রং আর তুলির সমাহার। জনগড় সেই সময়কার অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, যেদিন তিনি প্রথম সাদা কাগজের ওপর তুলিতে পোস্টার কালারে টান দিয়েছিলেন, সেদিন তাঁর শরীরে শিহরণ জেগে উঠেছিল। কাগজের ওপর রংতুলির টানে আনন্দে চোখ ছলছল করে উঠত তাঁর।

ভারত ভবনের বিভিন্ন কর্মশালায় জনগড় জলরং, অ্যাক্রেলিক এসব শিখলেন। জানলেন ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন শিল্পীদের জীবনকথা। দেখলেন গ্রেট মাস্টারদের সৃষ্টির কপি। ধীরে ধীরে তাঁর ভুবন পালটে গেল। প্রিন্ট মেকিং ডিপার্টেমেন্টের সিকিউরিটি গার্ড ছিলেন, ফলে সেখানেও শিখে ফেললেন ছাপচিত্র, গ্রাফিক্স আর্ট, প্রিন্ট মেকিং। জনগড় সিং শ্যাম যে জন্মগত প্রতিভা এ নিয়ে আর কারও সংশয় রইল না।

স্বামীনাথন এবং তাঁর টিম লক্ষ করে দেখেছেন জনগড়ের ছবি ট্রাইবাল হয়েও কোথাও যেন আলাদা। জনগড় ছবিতে বিন্দু ব্যবহার করেন। তুলি উজ্জ্বল রঙে চুবিয়ে সাদা কাগজে বিভিন্ন প্যাটার্নে বিন্দু এঁকে ছবির জমি ভরাট করেন তিনি। জনগড়ের ছবিতে ভার্জিন সাদা অংশ প্রায় থাকেই না। আর একটা জিনিস চোখে পড়ে, তা হল গতিময়তা। ট্রাইবাল আর্ট স্থিরচিত্রের মতো। সেখানে কোনও মুভমেন্ট বা গতিশীলতা নেই। অথচ জনগড় কী এক আশ্চর্য প্রতিভায় তাঁর ছবিগুলোতে এনে দিতে পারেন গতির সন্ধান। ট্রাইবাল মোটিফ নিয়ে কাগজের ওপর জলরং কিংবা প্লেট মেকিংয়ে এক বর্ণীয় শিল্পকলাকে তাই শিল্পবেত্তা উদয়ন বাজপেয়ী নাম দিয়েছেন ‘জনগড় কলাম’। এভাবেই জনগরের আঁকাগুলোর নাম হল গোন্ড পেন্টিং।

ভোপালে জনগড়কে নিয়ে তাঁর বাপেদের টানাটানি কিছু কম ছিল না। একদল তাঁকে পরামর্শ দিতে লাগলেন জনগড় যেন ট্রাইবাল সমাজের বিষয় নিয়েই ছবি আঁকেন। কারণ বিদেশি গ্রাহকদের কাছে ট্রাইবাল আর্টের চড়া বাজার আছে। এর বিপরীতে অন্যপক্ষের দাবি জনগড় যেন আধুনিক বিষয় নিয়ে ছবি আঁকেন, যেখানে থাকবে আদিবাসী সমাজের মোটিফ। যেমনটা ভোপালে মধ্যপ্রদেশ বিধানসভার দেওয়ালে ম্যুরাল রচনায় তিনি দেখিয়েছেন। এভাবেই যুযুধান বিশেষজ্ঞ বাপেরা জনগড়কে ক্রমেই বাজার অর্থনীতির একজন উৎপাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেন।

বাপেদের নিজেদের মধ্যে দখলদারি যদি জনগড়ের ভোপাল জীবনের অবতল হয়, তবে অন্তর্নিহিত যাপনটা ছিল আরও কদর্য। যাঁরা জনগড়ের মতোই ভারত ভবনে শিক্ষনবীশ ছিলেন, তাঁরা উঁচু জাতের কারণেই জনগড়ের ছায়া মাড়াতেন না। তাঁকে চা এনে দিতে বলতেন। বলতেন তাঁদের এঁটো বাসনপত্র পরিষ্কার করতে, ইত্যাদি। ভোপালে এসে জনগড় শহুরে হয়েছিলেন। ডেনিম জিনস্‌ আর চেক শার্ট পরতেন। দিল্লির একজন শিল্প-ব্যবসায়ী জনগড়ের ছবির ব্রোশিওর তৈরি করার সময় তাঁর সেই পোশাক খুলিয়ে খালি গায়ে, মাথায় সাদা কাপড়ের পাগড়ি আর খাটো ধুতি পরিয়ে ছবি তোলেন। তাঁর যুক্তি ছিল শিল্পীর শার্ট-প্যান্টের পরিচিত ছবি দেখলে বিদেশি ক্রেতারা জনগড়ের কাজ কৃত্রিম বলে ঠাহরে কিনতে আগ্রহী হবে না। জনগড় চা খাওয়ার সময় মুখে শব্দ করতেন। কারণ গরম চা খেলে তাঁর জিভ পুড়ে যাবে এমন ভয় তাঁর থাকত। সেটা লক্ষ করে আর একজন দিল্লিবাসী শিল্পসংগ্রাহক জানিয়েছিলেন শব্দ করে চা খাওয়া ব্যাড ম্যানার্স, ওই অভ্যাসটি যেন জনগড় পরিহার করেন, নইলে ভদ্রসমাজে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা হবে।

ভারত ভবনে সে সময় পারধান শিল্পীদের পাশাপাশি ওরলি, ভিল আদিবাসী শিল্পীরাও আধুনিক চিত্রকলার পাঠ নিচ্ছিলেন। আবার মধুবনী, পান্ডোবানি ইত্যাদি ট্রাইবাল শিল্পকলা, বস্তারের ঘাড়ুয়া শিল্প বা টেরাকোটার কাজ নিয়ে চর্চা গবেষণা হত। এদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত খ্যাতি পান জনগড় সিং শ্যাম। তাঁর শিল্পপ্রতিভার কারণেই তিনি ছিলেন জগদীশ স্বামীনাথনের চোখে ব্লু-আইড বয়। ফলে প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত স্তরে তাঁকে অবমাননা, অপমানের মুখে পড়ত হত; তাঁর মধ্যে হত রক্তক্ষরণ। অবস্থা চরমে ওঠে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালের সন্ধেতে। সেদিন ভারত ভবনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্বামীনাথন তাঁর বাসভবনে একটা সান্ধ্যভোজের আসর বসিয়েছিলেন। সেখানে জনগড়কে নিয়ে অশান্তি এমন জায়গায় ওঠে যে, জনগড় সেই দণ্ডে তাঁর পোশাক খুলে ফেলে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় তাঁর গ্রাম পাঠানগড় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্বামীনাথন কোনওক্রমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

জনগড়ের সাফল্যে একদিকে যেমন আরও আদিবাসী শিল্পীরা দেশের বিভিন্ন কলা কেন্দ্রে এসে জুটতে লাগলেন, অন্যদিকে তেমন বাজার অর্থনীতির নিয়ম মেনে প্রচুর স্বঘোষিত শিল্পতাত্ত্বিক, ভুঁইফোড় কিউরেটর, ছদ্ম ট্রাইবাল-দরদি ব্যবসায়ীরা ময়দান দখল করতে নেমে পড়লেন। ট্রাইবাল আর ফোক আর্ট আস্বাদনের আহ্লাদে নাগরিক মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি মেধাজীবী, ফিল্মস্টার এঁরাও মাঠে নেমে পড়লেন। ফলে রাজনীতিকরাই বা কীভাবে দূরে থাকেন? শুরু হল মেলা; মোচ্ছব। পাঁচমুড়ার ঘোড়া থেকে ছৌ নাচের মুখোশ হয়ে শাড়ি-গয়নায় ট্রাইবাল মোটিফ বেশ ভালোরকম ডলার আমদানির পথ খুলে দিল। এসবে সবই হল। মেলা হল। মোচ্ছব হল। সেমিনার। টক শো। বেওসা। ভোট। সব সবকিছু। কিন্তু শিল্পীর কী হল? যে যুবক একুশ বছর বয়সে তাঁর গ্রাম ছেড়ে এসেছিলেন, তিনি আর সেখানে ফিরে যেতে পারলেন না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অর্ডারি মাল সাপ্লাই করে যেতে লাগলেন। সবটা না পেরে বউ, নাবালক ছেলে-মেয়েদেরও কাজে লাগালেন। ছবির নিচে নিজের সিগনেচার করতে জানলেন। জানলেন কীভাবে মুভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। আর তাঁর পরিশ্রমের সেসব বেচে বেচুবাবুরা টাকার মালিক হলেন। সমাজের কেষ্টবিষ্টু হলেন। কারও কারও ভাগ্যে পদ্মসম্মানও জুটে গেল। অথচ, জনগড়ের মতো শিল্পীরা ভারত ভবনের পেছনদিকের টিনের চালাঘরেই পড়ে রইলেন।

 

জীবনকথা-৩

১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দশ বছরে সাতবার জনগড়ের ছবির প্রদর্শন বিদেশে হয়েছে। মূলত ভারত উৎসবের অঙ্গ হিসেবে। আমলাতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র বেনেদের সঙ্গে মিলে ট্রাইবাল আর ফোক আর্টকে বিদেশে বেচার যে মহতী উদ্যোগ নিয়ে থাকে, তারই অনুষঙ্গে। এর মধ্যে ১৯৮৮ সালে তিনি জাপানে যান; জাপানের শিল্পকলার বৈভব এবং কর্মসূচি তাঁকে উদ্ভুদ্ধ করে। নিজের কন্যার নাম রাখেন ‘জাপানি’।

১৯৯৯ সাল থেকে তোকামাচির মিথিলা আর্ট মিউজিয়মের তরফ থেকে নিরন্তন প্রচেষ্টা ছিল জনগড়কে জাপানে নিয়ে যাওয়ার। মিথিলা মিউজিয়ম ভারতীয় ট্রাইবাল আর্টের সংগ্রহশালা সম্পন্ন করার জন্য এ-দেশ থেকে বিভিন্ন ট্রাইবাল শিল্পী এবং কারিগর ও-দেশে নিয়ে গিয়েছিল। এ-কাজে তাঁদের মিডিয়েটর ছিলেন বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিল্পবেত্তা বা এজেন্টরা। যেমন জনগড়কে জাপানে পাঠানোর মিডিয়েটর ছিলেন কলকাতার জনৈক ম্যাডাম।

এপ্রিলে তিন মাসের টুরিস্ট ভিসায় জনগড় জাপানে পৌঁছান। মিথিলা আর্ট মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ যেসব শিল্পকর্ম তৈরি করাতেন, তার একটা অংশ বিক্রি করে শিল্পীদের রাহাখরচ মেটাতেন। জনগড় মাসিক বারো হাজার টাকার চুক্তিতে জাপানে যান। কিন্তু মিথিলার পরিবেশে তিনি প্রথম থেকেই অস্বস্তিতে ছিলেন। ১৯৮৮ সালের সুখকর ভ্রমণস্মৃতির সঙ্গে দ্বিতীয়বারের অভিজ্ঞতার মিল ছিল না। দ্বিতীয়বারের পরিস্থিতি প্রথমবারের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিত ছিল। দ্বিতীয়বারে তাঁকে দিয়ে মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ যতটা সম্ভব বেশি কাজ করিয়ে নিতে চাইছিলেন, মূলত মুনাফার উদ্দেশ্যে। এসব কাজ একটানা করা যে-কোনও শিল্পীর পক্ষে অবমাননাকর। কারণ শিল্পীকে তার জীবনযাপনে, চিন্তায় স্বাধীনতা দিতে হয়। নইলে উৎকৃষ্ট ফল পাওয়া যায় না। জনগড় এ-দেশে যত বড়মাপের শিল্পী হিসেবে সম্মানিত, স্বাভাবিকভাবেই মিথিলার আন্তর্জাতিক পরিসরে মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ ততটা সম্মান তাঁকে দিতে চাননি; সেখানে তিনি একজন কারিগরের মতোই মুখ বুজে কাজ করে গেছেন।

ভেবেছিলেন মনের ইচ্ছার সঙ্গে অবিরত লড়াই করে তিন মাস ঠিক কাটিয়ে দেবেন। ভোপাল ছেড়ে তোকামাচি যাওয়াটা ছিল খানিক জোর করে। নম্র স্বভাবের জনগড় মুখের ওপর না বলতে পারেননি, বরং প্রথমদিকে মনকে প্রবোধ দিয়েছিলেন এই ভেবে যে, আন্তর্জাতিক একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু তিনি যেমনভাবে ভেবেছিলেন, তেমনটা হয়নি। তাঁর ওপর কাজের চাপ বাড়ছিল। আত্মীয়-পরিজনহীন বিদেশে একটানা কাজ করতে করতে জনগড় ক্রমেই মানসিক রোগী হয়ে পড়ছিলেন। বিশেষ করে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় যখন জানতে পারলেন মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ তাঁর ভিসা বাড়িয়ে আরও তিন মাস করে দিতে চাপ দিচ্ছেন। তাঁকে প্রথমদিকে যা কাজ দেওয়া হয়েছিল, সেসবের সঙ্গে তাঁরা আরও কাজ চাপিয়ে দিচ্ছেন। এসব মিলিয়ে জনগড়ের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিতে থাকে। যে উদ্বেগ তাঁকে এটাই বোঝায় যে, তিনি আর কোনওদিন দেশে ফিরতে পারবেন না। এরা তাঁকে সারাজীবনের জন্য বন্দি করে রেখেছে। এসব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে মানসিক অস্থিরতার জন্ম দেয়, যা এতটা প্রাণঘাতী যে ৩ জুলাই ২০০১ দুপুরে ওয়ার্কশপ থেকে ফিরে জনগড় সিং শ্যাম মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে গলায় দড়ি দেন।

 

আত্মহত্যা-সংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতি

স্বাভাবিকভাবেই জনগড়ের আকস্মিক আত্মহত্যার দায় কেউ নিতে চাননি। তাঁর তথাকথিত বাবারা, যাঁরা এক সময় জনগড় সিং শ্যাম তাঁদের আবিষ্কার ইত্যাদি বলে প্রচার করতেন তাঁরা এই নিয়ে শুরু করলেন বিতর্ক। সমালোচনায় বেরিয়ে এল অনেক ঘৃণ্য মানসিকতার উদাহরণ। সেসব বাদ থাক। কারণ সে-কথাগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে নামী ইংরেজি প্রকাশনাগুলো থেকে ঢাউস সব গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ পেয়েছে। বরং তথ্যগত অসঙ্গতিগুলো নিয়ে কথা বলা যাক।

মিথিলা মিউজিয়মের কর্তৃপক্ষের দাবি—

১) জনগড়ের কাজ সামান্যই বাকি ছিল। তাঁরা চেয়েছিলেন ভিসার মেয়াদ মাত্র পনেরো দিনের বৃদ্ধি। কিন্তু জাপানের বিদেশমন্ত্রক সাধারণভাবে যেমন টুরিস্ট ভিসা তিন মাস করে দেয়, তাঁর ক্ষেত্রেও সেটাই করা হয়েছিল। এর অর্থ এই নয় যে, তাঁকে আরও তিন মাস থেকে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

২) মিথিলা মিউজিয়ম বিমান বাংলাদেশে টিকিট রিজার্ভেশনের জন্য জানিয়েছিলেন। এছাড়া জনগড়ের শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওষুধ আনানোর ব্যবস্থাও তাঁরা করেছিলেন।

৩) মিথিলা মিউজিয়মের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিলেন ২৬-০৬-২০০১ তারিখে ভারত থেকে একটি ফ্যাক্সবার্তা আসে জনগড়ের কাছে, যেখানে লেখা ছিল শিল্পীর স্ত্রী নানকি বাইয়ের শারীরিক অবস্থা সংকটজনক। জনগড় পরদিনই ভারতে একটি ফ্যাক্সবার্তা পাঠান।

৪) ২৮-০৬-২০০১ তারিখ থেকে জনগড় উদভ্রান্তের মতো আচরণ শুরু করেন। ০১-০৭-২০০১ দেশে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। ০৩-০৭-২০০১ সকালে ব্রেকফাস্টের পরে ওয়ার্কশপে কাজ শুরু করেন। দুপুরে লাঞ্চের সময় রোজকারমতো নিজের ঘরে ফিরে যান। বেলা হয়ে গেলেও কাজে না ফেরায় তাঁর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায় জনগড় আত্মহত্যা করেছে।

৫) মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ তাদের ওয়েবসাইটে স্বীকার করে নিয়েছে জনগড়ের মানসিক অসুস্থতা সম্পর্কে তারা অবহিত ছিল না। এটা তাদের তরফে ত্রুটি।

জনগড়ের পরিবারে দাবি—

১) জনগড়ের জীবনের শেষ দুটো চিঠি। একটা ১৪-০৬-২০০১ সালে মাকে লেখা। দ্বিতীয়টা স্ত্রীকে লেখা মৃত্যুর ঠিক তিন দিন আগে। অর্থাৎ ৩০-০৬-২০০১। এই দুটো চিঠিতে এমন কিছু লেখা আছে, যা জনগড়ের শেষ সময়কার মানসিক স্থিতিকে তুলে ধরে। মাকে লেখা চিঠিতে মিথিলা মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষের আচরণ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। চিঠিতে জানিয়েছেন জাপানিরা তাঁর চিঠিপত্র খুলে পড়ে। ফলে মাকে বারবার সাবধান করে দিয়েছেন চিঠি ভালো করে আঠা দিয়ে লাগাতে। খামের মধ্যে অন্য কোনও জিনিস না দেওয়া হয় ইত্যাদি। মিউজিয়ম কর্তৃপক্ষ তাঁকে শীঘ্র ছাড়বে না। ফলে মাকে জানিয়েছেন চেনা-পরিচিতদের দিয়ে যেন আর্জি জানানো হয় তাঁকে দ্রুত জাপান থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। এই চিঠিতে উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা ধরা পড়েছে। চিঠির বয়ানে মনে হয় তাঁর বিরুদ্ধে মিউজয়মে বিরাট এক ষড়যন্ত্র চলছে বলে তাঁর সন্দেহ।

দ্বিতীয় চিঠিটা মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর মানসিক অবস্থানকে তুলে ধরেছে। স্ত্রীকে লেখা এই চিঠির ছত্রে-ছত্রে আছে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। তবে সেটা কী, স্পষ্ট নয়। চিঠির বয়ানে মাত্র দুটি কথা ঘুরে-ফিরে লিখেছেন। এক) মিউজিয়ামের সকলেই সন্দেহজনক, আর দুই) তাঁকে যেন তাঁর স্ত্রী যেমন করে পারেন দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্ত্রীর ওপর ভরসা রাখতে পারেননি, তাই যাঁর নাম মনে এসেছে তাঁকেই অনুরোধ করতে বলেছেন। সকলেই যেন জনগড়কে জাপান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই তালিকায় কে নেই? এমনকি তাঁর পুরো গ্রাম উঠে এসেছে। এই চিঠি পড়লে স্পষ্টত বোঝা যায় জনগড় তাঁর মানসিক স্থিরতা হারিয়ে মানসিক রোগী হয়ে গেছেন। হাতের লেখা এবং ভাষার ব্যবহারে মানসিক অসুস্থার তীব্র প্রকাশ। এই চিঠি জনগড়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর কাছে এসে পৌঁছায়। ততদিনে শিল্পী সব সাহায্যের বাইরে চলে গেছেন।

২) ০২-০৭-২০০১ রাতে জনগড় ভোপালে তাঁর বাড়িতে টেলিফোন করেছিলেন। সেদিন বাড়িতে কিছু উৎসব ছিল। খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি হচ্ছিল। জনগড় কিছুক্ষণ স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনও কথা বলতে পারেননি। কেবল রিসিভার ধরে কেঁদেছিলেন।

৩) জনগড়ের স্ত্রী নানকু বাই অসুস্থ ছিলেন না।

 

আত্মহত্যার অধিকার

আত্মহত্যার অধিকার আমাদের দেশে আইনস্বীকৃত নয়। অথচ হাস্যকর এই যে, রাষ্ট্র বেনে ও মুৎসুদ্দিদের দালালি করে বলেই কেউ-কেউ আত্মহত্যা করেন। ফলে আমার মতে রাষ্ট্রই প্রতিটা আত্মহত্যার প্ররোচক।

আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত মনে করি, মনে করি ‘সভ্য’, সেই শ্রেণির একটা দোষ হল পরোপকার। আমরা না-জেনে, না-বুঝেই কোনও ব্যক্তিমানুষ কিংবা গোষ্ঠী বা সমাজের উপকার করতে চাই। আর এই উপকারিতার কারণেই যার উপকার করতে গেলাম তার অপকারই হয়ে গেল। আমাদের দেশের লোকশিল্প এর সার্থক নমুনা। বাউলদের উপকার করতে গিয়ে তাকে রপ্তানি করায় এমন ঝোঁক দেওয়া হল যে, আজ আর আমাদের রাজ্যে বাউল বলে কেউ নেই। সকলেই মাইক্রোফোনে হ্যালো… চেক্‌… চেক্‌ বাউল। একইভাবে যদি ছৌ নাচের দিকে তাকানো যা্‌ তবে সেটা ঘর সাজানোর মুখোশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বোলপুরের খোয়াইয়ে শনিবারের হাটে গেলে এই উপকারের অশ্লীলতা কোন নিম্নস্তরে পৌঁছেছে তার বীভৎস নমুনা পাওয়া যায়। আর সল্টলেকের লোক উৎসব, মেলা-পার্বনের কথা নাইবা বললাম। ট্রাইবালদের উপকারের এই হিড়িকে সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক সরকার এবং তার আমলাতন্ত্র। এ-কারণে আমাদের দেশের আদিবাসী শিল্পকলা পাঁচতারার ফ্যাশন। রপ্তানিযোগ্য শিল্প। জনগড়দের মতো শিল্পীদের তাঁদের মাটি থেকে তুলে এনে নাগরিক শিল্পী করে তোলার উপকার প্রবৃত্তি প্রমাণ করে বুর্জ়োয়াশ্রেণির অস্মিতা। আমাদের অহঙ্কার। যেন ব্যাপারটা এমন, তোমাদের শিল্পকলা তোমরা বোঝো না, আমরাই বুঝি। আমরাই এর হকদার। জনগড় সিং শ্যাম কোমল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বলে এই বেনেবৃত্তি, বুর্জ়োয়া ছদ্ম উপকারের যূপকাষ্ঠে নিজেকে বলি দিয়েছিলেন। নাহলেও চিরকাল তিনি বাবুদের জন্য শিল্প উৎপাদক হিসেবেই থেকে যেতেন। এখন যেমন তাঁর স্ত্রী, মেয়ে-ছেলেরা করছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে আমাদের দেশজ শিল্পকলা, সঙ্গীত, নাচ, অভিনয় এসব চর্চা কি হবে না? কিংবা ট্রাইবাল অথবা ফোকশিল্পীরা কি বাকি দুনিয়ার শিল্প-সঙ্গীত ইত্যাদি থেকে উদ্বুদ্ধ হবেন না?

ঠিক প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নকে সামনে রেখে কাজ করেছেন মীরা মুখোপাধ্যায়। কাজ করেছেন মহাশ্বেতা দেবী। কাজ করেছেন বাবা আমতে। এখনও কাজ করে চলেছেন মেধা পটকর। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের বিজেপি সরকার যাঁদের পিঠে ‘আরবান নকশাল’ ছাপ মেরে দিয়েছে।

মীরা মুখোপাধ্যায় সেই মধ্যপ্রদেশের বস্তারে গিয়ে ঘাড়ুয়া শিল্পীদের সামনে বসে কাজ শিখেছেন। শিখেছেন নতজানু হয়ে। কলকাতায় ফিরে এসে ঘাড়ুয়াদের টেকনিকে বানিয়েছেন ভাস্কর্য, তবে তাতে ট্রাইবাল আর্টের মোটিফ চুরি করার নিম্ন মানসিকতা ছিল না। ট্রাইবাল কিংবা ফোক মোটিভকে নির্বিচারে ব্যবহারের মহামারির দায় তাই তাঁদেরকেই নিতে হবে যাঁরা সমাজসেবা হিসেবে জনগড়দের মতো শিল্পীদের জন্মভিটে থেকে তুলে এনে বাজারের মাঝখানে বসিয়ে দিই। যে শিল্পী জন্ম থেকে গোবর-লেপা খরখরে দেওয়ালে ছবি এঁকে তাঁর শিল্পীর স্বাধীনতা উপভোগ করেন, তাঁকে খ্যাতির লোভ দেখিয়ে শহরে নিয়ে আসা অপরাধ নয়, পাপ।

যেদিন জনগড় তাঁর পাঠানগড় গ্রাম ছেড়ে ছিলেন, সেদিন থেকেই তিনি আর ট্রাইবাল শিল্পী ছিলেন না। তাঁকে সামনে রেখে আর্থিক, সামাজিক, রাজনীতিক ফায়দা লোটা হয়েছে। আগামীদিনের আরও বহু জনগড় গড়ে তোলার জন্য আদিবাসী গ্রামগুলোকে উজাড় করে দেওয়া হয়েছে। সেমিনারে বহুজাতিক কোম্পানির বোতলের পানীয় জল গলায় ঢেলে যাঁরা ট্রাইবাল শিল্পকথা নিয়ে গালভরা বক্তব্য রাখেন, যাঁরা ট্রাইবাল আর্টের নামে ভুষিমাল পয়দা করতে শিল্পীদের বাধ্য করেন, যাঁরা দেশের নামী হোটেল, বড়লোক-বাড়ি কিংবা বিদেশের বিভিন্ন শিল্পকলা প্রতিষ্ঠানে ট্রাইবাল আর্ট বিক্রি করে পুঁজিপতি হয়ে ওঠেন, যাঁরা ভোটের রাজনীতির কারণে ট্রাইবাল সমাজের আবেগকে ব্যবহার করেন, যাঁরা ট্রাইবাল গ্রামগুলোকে ভ্রমণের নামে উৎপীড়ন নিকেতন বানিয়ে দেন, যাঁরা শনিবারের হাটে শরীর বেঁকিয়ে সাঁওতালনাচের ভিডিও বানান। আমরা সেই সকলেই জনগড় সিং শ্যামদের আত্মহত্যার প্ররোচক। তাঁর অকাল প্রয়াণের ভাগীদার।

 

শেষে একটি কথা।

বিরসা মুন্ডার সার্ধশতবর্ষে লিখতে বসে জনগড় সিং শ্যামের কথা লিখলাম। সংসদে প্রতিকৃতি টাঙিয়ে, নানাভাবে বিরসার নামটাকে সরকারি করে তোলার অশ্লীল প্রয়াস দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল জনগড়কে। পাঠক… মার্জনা করবেন।