Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

গাজা হসপিটাল

শৈলেন সরকার

 

আচ্ছা, মুসলিম মেয়েরা এত সুন্দরী হয় কীভাবে বলতে পারেন?

সুরাইয়াকে দেখার পর এই একটি প্রশ্নই পাক খাচ্ছিল খুব। এটা নিয়ে অবশ্য জিজ্ঞেস করা যায়নি কাউকেই। যাকে বলব সে হয়তো বলবে, এখানে আবার মুসলিম মেয়ে কোথায় পেলি তুই? সত্যিই, আমাদের একেবারে পাশের পাড়াটা যে এককালে মুসলিমপাড়া ছিল তা কে আর মনে রেখেছে। বা, সেখানে একটা অন্তত মুসলিম পরিবার যে টিকে আছে এখনও সে খবরটা বা কে রাখে? কেউ রাখলেও সে হয়তো বলবে, ওই হাসানসাহেবের ঘর তো, ওরা কি আছে নাকি এখনও, চলে গেছে কবে! কোথায় গেছে কে জানে?

হাসানসাহেব বললেন, প্যালেস্তাইনে আমরাই কিন্তু থাকতে দিয়েছিলাম ওদের। আমরা বলতে উনি মুসলিমদের কথাই বললেন। ভদ্রলোকের ইতিহাসের জ্ঞান বেশ টনটনে। বললেন, সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের আগে থেকে ওদের অনেকেই ইউরোপ ছেড়ে প্যালেস্তাইনে আশ্রয় নিচ্ছে, আর ওখানকার মুসলিমরা কিন্তু একেবারে অতিথির মতোই গ্রহণ করছিল ওদের। আর এখন?

অর্থাৎ হাসানসাহেব আছেন এখনও। আমাদের পাশের সেই জেলেপাড়াতেই। সঙ্গে ওঁর স্ত্রী, ছেলে সুজাউদ্দিন, মেয়ে—। আমি অবশ্য সুরাইয়ার জন্য অপেক্ষা করি। একটিবার আসবে না? বা অনেক বেলা হয়ে গেছে বলে হাসানসাহেবকে গা-ধোয়ার কথা মনে করাবে না? বা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে হাসবে না একবার আমার দিকে তাকিয়ে? ঠিক হাসিও নয়, আমার দিকে একবারের আড়চোখে তাকানোতেই যেন কত কথা বলে দিয়ে যায় মেয়েটি। আমার গায়ে মাথায় ওর সুবাস বয়ে যেতে থাকে।

সত্যি কথা বলতে কি প্যালেস্তাইনের ইতিহাস তো দূরের কথা, ওখানকার যুদ্ধ নিয়েই বা কতটুকু জানি আমি। খবরের কাগজে দিনে একবার চোখ বোলালেও, সেখানে মোদি-মমতা আর বিরাট কোহলি বা শাহরুখ। কখনও কেউ বলে অবশ্য গাজার কথা। গাজা, হামাস। মানে প্যালেস্তাইনেরই। ইজরায়েলের বোমায় হাজার হাজার মুসলিম—। বলতে কি মুসলিমদের মৃত্যুতে সুখ পাই খুব। মরুক ব্যাটারা। ইজরায়েলের বোমা নাকি শহরের পর শহর একেবারে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ধুলো বানিয়ে দিয়েছে।

এক-একদিন সুরাইয়া বলে বসে, আব্বু খেয়ে যেতে বলল আপনাকে। আর কী আশ্চর্য চলে যাওয়ার জন্য ওদের গেটের মুখে টাঙানো পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়েছি, ঠিক তখনই ডেকে বসবে ও। অর্থাৎ ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াবে। সুরাইয়ার তখন সালোয়ার কামিজ ওড়না। কপালে ছড়ানো ওর এলোমেলো চুল। ওর চোখ, ওর নাক, ঠোঁট।

মনে হচ্ছে আমি বুঝি রোজই আসি এই হাসানসাহেবের বাড়ি, তাই না? ঠিক রোজ নয় কিন্তু, তবে আসি। এই ধরুন টিউশন নেই বা কাজ নেই তেমন হঠাৎ করেই মনে হল ঘুরে আসি একবার। সুজাউদ্দিনের কল্যাণে জীবনে প্রথম কোনও মুসলমানের বাড়ি আসা। গোটা জেলেপাড়া বলে নয়, বলতে পারেন আমাদের গোটা তল্লাটেই এই একটা মাত্র বাড়ি। হ্যাঁ, মুসলমানের বাড়ি। হাসানসাহেবদের পাড়ার নাম জেলেপাড়া হওয়ার মানে এটা জেলেদের পাড়াই ছিল হয়তো একসময়, বোঝাই যায়। তাছাড়া নদীর পাড় যখন। এই বছর দশেক আগে নাকি আরও দু-ঘর ছিল এখানে। এখন ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, কোনওটা ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা। মুসলমানদের ছেড়ে যাওয়া ঘরবাড়িগুলিতে যারাই থাকুক তারা নিশ্চিত দখলদার ছাড়া অন্য কিছু নয়। ঘরগুলির আর ছিরিছাঁদ নেই কোনও। সারাই করার কারও কোনও দায় আছে বলে তো মনে হয় না।

আমাদের স্কুল-যাওয়ার দিনগুলিতে এদিকটাতে আসার তেমন দরকার পড়ত না। বাড়ির বড়রাও অবশ্য পছন্দ করত না। জানতাম মুসলমানেরা থাকে ওখানে। জেলেপাড়ায় মসজিদ আছে একটা, ওইটুকুই। মসজিদ মুসলমানদের। কিন্তু মসজিদে কী হয়, বা কেমন দেখতে হয়— তা নিয়েও ধারণা ছিল না কোনও।

তাহলে হঠাৎ করে হাসানসাহেবের বাড়ি ঢুকলে কী করে তুমি? সে আর এক ভুলে যাওয়া জীবনের গপ্পো। ভুলে যাওয়া বলতে আপনি আবার অনেক অনেক যুগ আগেকার কিছু ভাবতে যাবেন না যেন। গপ্পো সেই ছেলেবেলার। ছেলেবেলা কেমন হঠাৎ করেই চলে যায় না? হঠাৎ করেই কেউ আপনার নাকের নিচে হালকা গোঁফের রেখা আবিষ্কার করে বসল। হঠাৎ করেই একদিন আপনার শরীরে—। কত নতুন নতুন ঘটনা যে তখন আপনার ওইটুকু শরীরে ঘটতে থাকে! আপনি তখন আপনার শরীর নিয়েই ব্যস্ত সারাদিন। কত নতুন কিছু আবিষ্কার করছেন। এইভাবে হঠাৎ করেই একদিন বড় হয়ে গেলেন আপনি। আর পেছনের দিনগুলিকে ভুলতে শুরু করে দিলেন। বা স্কুলের দিনগুলিকে ভুলেই গেলেন পুরোপুরি। হয় কিন্তু এরকম।

সুজাউদ্দিন ছিল আমার স্কুলের বন্ধু। বন্ধু ওই নামেই। এক ক্লাসেই পড়তাম আর কি! তো ক্লাস এইটে ফেল করার পর স্কুল পালটে অন্য স্কুলে গিয়ে আগেকার স্কুলের সব স্মৃতিই মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম কখন। বা, নিজের ইচ্ছেয় হয়তো ফেলিনি, বলা যায় নিজের থেকেই আগেকার স্কুলের সব গল্প, সব ক্লাসরুম বা মাস্টারমশায় বা ক্লাসের ছেলেরা কখন যেন ঝরে পড়ে গেল। আমার ঝেড়ে ফেলে দেওয়া ছোটবেলার সেই আগেকার স্কুলের ক্লাস এইটের সুজাউদ্দিন একদিন হঠাৎ করেই আমার বড়বেলায় এসে হাজির হল। বলল, চিনতে পারছিস, আমি সুজাউদ্দিন?

তার মানে মুসলমান। আন্দাজের উপরই বললাম, জেলেপাড়ার?

সুজাউদ্দিন বলল, জেলেপাড়া কেন বলছিস, আমরা একই ক্লাসে পড়িনি?

এতক্ষণে মনে পড়ল। বলল, প্রায়ই দেখি তোকে, ভাবতাম ভুলেই গেছিস হয়তো। আয় না একদিন আমাদের বাড়ি।

হাসানসাহেব সেই প্রথমদিনই আমাকে বললেন সুজাউদ্দিন নাকি ওঁর কাছে আমার গল্প করত। বলত, একজনই মাত্র হিন্দু ছেলে কথা বলত ওর সঙ্গে।

আমি? হ্যাঁ, সুজাউদ্দিন নাকি তাইই বলেছে। এই বড়বেলায় এসে অবাক লাগে খুব। শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে ওর সঙ্গে নাকি মিশতেই চাইত না কেউ? আর ঠিক করে বললে, আমিই বা ওর এমন কী বন্ধু ছিলাম? ওর কথা আজ এই মুহূর্তে আলাদা করে মনেই তো পড়ছে না কিছু। সুজার কথায়, আমি আর ও নাকি স্কুল পালিয়েছিলাম একদিন একসঙ্গে, বা ও একবার ঈদের পরে টিফিন হিসেবে নিয়ে যাওয়া ওর সিমুই খাইয়েছিল আমাকে। আমি অবশ্য ওর বা ওর বাবার কথায় সায় দিই। হতেই পারে বলছে যখন। আর আমার এই সবকিছু ভুলে যাওয়া বুঝতে দেব না বলে হেসেও উঠি সায় দিয়ে।

হাসানসাহেবদের জমি অনেকটাই। একটা পুকুর। এখন অবশ্য বেশিরভাগটাই ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে। একটা সময় এই জঙ্গুলে জমি চোখেই পড়ত না কারও। এখন চারপাশের সব পিচঢালা বা ঢালাই রাস্তা। স্টেশন থেকে টোটো আসছে সরাসরি। আমাদের পাড়াটাই পালটে গেছে কত। আগেকার সেইসব টিন বা টালির বাড়ি আর কোথায়? প্রোমোটারদের হাতে পড়ে সবই এখন চার কি পাঁচতলা বিল্ডিং। মাঝখানে এই জেলেপাড়াটাই অন্ধকারে ডুবে আছে শুধু।

কত বয়স হবে হাসানসাহেবের কে জানে! পঞ্চাশ-ষাট বা সত্তর। চেহারা দেখে বয়সের তুমি কী বুঝবে? কাঁচাপাকা চুল, লম্বা দাড়ি। মুসলমানদের শুনেছি বিয়ে হয় অনেক। সুজাউদ্দিন বা সুরাইয়া হাসানসাহেবের কত নম্বর বউয়ের ছেলেমেয়ে জানা না থাকলে বয়সের মাপজোক করা কঠিন। হাসানসাহেবের কথায়, ওঁর ছেলেবেলায় এত ঘরবাড়ি ছিলই না কিছু। আমাদের পাড়াটা সেই পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের দখলে গেছে ওঁর আব্বার আমলে। আব্বার কাছ থেকেই ওঁর এসব শোনা। কোন এক জমিদারের বাগানবাড়ি ছিল ওখানে। জেলেপাড়ায় তখনও পঁচিশ-ত্রিশ ঘর মুসলমান। মসজিদে আজান উঠত মাইকে, নামাজ হত। ঈদের দিনে ইফতার করত সবাই দল বেঁধে। বকরি ঈদে—। বকরি ঈদের কথা সম্পূর্ণ না করতেই কী যেন মনে পড়ে যায় ওর। সুজাকে ডেকে নাস্তা দিতে বলেন আমাকে। বললাম, বকরি ঈদে গরু জবাই হত না আপনাদের? প্রশ্নটা করেই মনে হল, এটা জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হল না আমার। উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই জানতে চাই, মসজিদ তো শুনি ভেঙেচুরে নষ্টই হয়ে গেছে কবে, এখন নামাজ পড়তে যান কোথায়?

শুক্রবারের নামাজের জন্য টোটোতে করে যান সেই কামারহাটিতে। ওটা তো মুসলিমদেরই এরিয়া, মসজিদ আছে তিনটে। উনি যান ছাইগাদা ময়দানের মসজিদেই। অন্যদিন ওই বাড়িতেই। বললাম, আমাদের যেমন দুর্গাপুজো আপনাদের তো ঈদ উল ফেতর, মানে খুশির ঈদ। এখানে চারপাশে সব হিন্দুর মধ্যে অসুবিধা হয় না?

—অসুবিধে তো হবেই। দুঃখ বা আনন্দ যাই হোক না কেন, পাশে আর লোক না থাকলে ভালো লাগে? দুঃখের কথাই ভাবো, ধরো বাবা মারা গেল তোমার, আর তোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই পাশে, অসহায় লাগবে না? কতক্ষণ না থেমে কাঁদতে পারবে? অর্থাৎ চারপাশে গাদাগুচ্ছের হিন্দু পরিবারের মধ্যে একটা মাত্র মুসলিম পরিবার থাকার অসুবিধা অনেক। তার ওপর হিন্দুরা আমাদের কী যে ভাবে কে জানে, মিশতেই চায় না কেউ ভালো করে।

মনে মনে ভাবি, একটা মাত্র মুসলিম ফ্যামিলির জন্য আমাদেরও কি কম অসুবিধা নাকি, বিশেষ করে এই জেলেপাড়ার দিকটায়। ভাড়াটে হলে বলবে, থাক দাদা, দেখি একটু, পরে জানাব। দুটো-একটা কথার পরপরই লোকটা বলতে শুরু করবে, একটা মাত্র মুসলিম ফ্যামিলি এতটা জায়গা নিয়ে বসে, ভাবুন তাহলে মুসলিমরা…। এরপরই শুরু করবে কোন সালের মধ্যে মুসলিমরা ভারতে সংখ্যায় বেশি হয়ে উঠবে। বা, মুসলিমদের তাড়ায় বাপ-ঠাকুর্দাদের মতো আমাদেরও একদিন পালাতে হবে এ দেশ ছেড়ে।

পার্টির রঞ্জিতদা বেশ পছন্দ করে আমাকে। জানতে চায় ওই হাসানসাহেবের বাড়িতে কে আছে তোর? সুজাউদ্দিনের কথা বললাম। বলল, ওরা কি যাবে না এখান থেকে? খবর নিতে পারবি? হাসানসাহেবের জায়গাটার জন্য নাকি খুব আটকে গেছে রঞ্জিতদারা। বলল, বাকি দখল হওয়া ঘরবাড়িগুলির সমস্যা নেই কোনও, আজ বললে কালই দৌড় লাগাবে, কিন্তু সমস্যাটা হাসানসাহেবের বাড়ি নিয়ে। সমস্যাটা মুসলমান হওয়াতেই। মুসলমান না হলে অনেকদিন আগেই নাকি তুলে দিতে পারত। অর্থাৎ জমির কথাই ভাবছে লোকটা। বলল, ব্যাটাদের ওপর জোর করতে গেলেই হাজার কথা উঠবে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে। কাগজে লেখালেখি হলে বদনাম হবে পার্টির।

সুরাইয়া ক্রমে বেশ সাহস অর্জন করেছে, এক-একদিন আমার পাশের চেয়ারে এসে বসবে। শুনবে আমাদের কথা। বা, ওর আব্বু-আম্মুর দিক থেকে সায় পেয়েছে হয়তো। আব্বু-আম্মুর সায় না পেলে আমার পাশে এসে বসা সম্ভব হত না কিছুতেই। এনআরসি নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম একদিন, বললাম, ভয় করে না আপনাদের? তাড়িয়ে দেয় যদি। সুজাউদ্দিন উলটে হেসে উঠল, বলল, কয় বছরের কাগজ চাও তুমি? পঞ্চাশ-একশো-দেড়শো? ওদের নাকি দেড়শো বছরের পুরনো কাগজ আছে। সুরাইয়া বলল, এই বাড়ির ওপর আব্বুর দেড়শো বছরের টান। আব্বুর আব্বু, তার আব্বু, তার আব্বু— , সব্বাই, সব আব্বু-আম্মুরা নাকি শুয়ে আছে এখানে। আপনারা তাড়ালেও আপনাদের হাসানসাহেব যাবেন না কিছুতেই।

বললাম, আপনারা মানে আমি কি—।

—কেন নয়, আপনি তো হিন্দুই, আর কেনই বা তাড়াতে চাইবেন না, আপনাদের আব্বু বা দাদারা তো মুসলমানদের তাড়া খেয়েই পাকিস্তান থেকে—। সত্যিমিথ্যে জানি না, শুনি তো কত নাকি মার্ডার, রেপ—। সুযোগ পেলে বদলা নেবেন না আপনি?

সুরাইয়া কলকাতার কলেজে ভর্তি হয়েছে এবার। রাস্তায় বের হলে বোরখা না থাকলে কে মুসলিম আর হিন্দু তুমি বুঝবে কীভাবে? না, হিজাব চড়ায় না সুরাইয়া। বলল, একেবারে হিন্দুপাড়া তো, সবাই তাকিয়ে থাকবে হাঁ করে। তারপর কী বলতে কী বলবে।

সুরাইয়াদের তাহলে এ-পাড়া ছেড়ে চলেই যাওয়া উচিত অন্য কোথাও। অন্য কোথাও মানে মুসলমানরা থাকে যেখানে। সেখানে তুমি হিজাব চড়াবে, বোরখা পড়বে, তোমার বাবা ঈদের নামাজ পড়বে মসজিদে গিয়ে। আজান উঠবে মাইকে। বকরি ঈদে গরু জবাই দেবে। মোট কথা চলে যাওয়াই তো ভালো। রঞ্জিতদার কথা মনে রেখে কথাগুলি বলব ভেবেও অবশ্য বলা হয় না কিছুতেই।

—হসপিটালের ওপর বোমা মারে কেউ? ভাবতে পারো?

হঠাৎ করে এমনি একটা কথা শুনে অবাক হলাম খুব।

একদিন শুধু সুরাইয়ার জন্যই আসা। ওর জন্মদিন। না, জন্মদিনে আমাদের মতো ওই মোমবাতি জ্বালিয়ে আদিখ্যেতা করার অভ্যাস নেই ওদের। সুরাইয়া অবশ্য বলেনি কথাটা। মানে আদিখ্যেতা। ওর মায়ের কথায় ইসলামে বারণ আছে। বললাম, খাওয়াতে তো বারণ নেই। সুরাইয়ার আম্মু বিরিয়ানি করবে। বললাম, বিরিয়ানিতে মাংস কিসের, গরু নাকি?

—কেন গরু হলে কী হবে, খাবেন না?
—খাব না মানে অভ্যাস নেই তো।

সুরাইয়ার মা বলল, গরু চাইলেও পাবে কোথায় এখানে, মুরগিই, ভয় নেই। মুরগি শুনে সুরাইয়ার বাবার কথায় ফিরি।

বললাম, হসপিটালে বোমা মারার নিয়ম নেই তো। কোনও যুদ্ধেই মারে না কেউ। সুরাইয়ার বাবার কথায় শুধু মেরেছে না মারছে। হসপিটালের পর হসপিটাল। হামাসদের মারতে গিয়ে সবকিছুর সঙ্গে হাসপাতালগুলিও একেবারে গুড়িয়ে দিচ্ছে।

সত্যি বলতে কি প্যালেস্তাইনের লোকগুলি মরতে থাকায় আমার খারাপ লাগছিল না মোটেই। এবার যখন হসপিটালের ওপরও বোমা মারছে তখন ইজরায়েলিরা ব্যাটাদের একেবারে শেষ করে ছাড়বে। একেবারে ভিটেমাটি ছাড়ার ব্যবস্থা করবে। সুরাইয়ার বাবার সামনে অবশ্য দুঃখই প্রকাশ করি। না, এটা মেনে নেওয়া যায় না কিছুতেই। সুজাউদ্দিন বলে, এটা তোমার কথা, কিন্তু হিন্দুদের তো দেখি আনন্দ খুব। ওরা চায় গাজা একেবারে ধুলোয় মিশে যাক।

আমাকে তাহলে এবার প্যালেস্তাইন যুদ্ধ নিয়ে জানতে হয় কিছু। প্যালেস্তাইন, গাজা, ইজরায়েল। এর মধ্যে আবার হামাস আসে কীভাবে? সুজাউদ্দিন বলল, হামাস একটা বিপ্লবী গোষ্ঠী, বাইরে থেকে অস্ত্র জোগাড় করে লড়ছে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। ওই আমাদের দেশের ক্ষুদিরাম, মাস্টারদাদের মতো।

দুর্গাপুজো শেষ। সামনে লক্ষীপুজো। আমার কাজ বলতে দুটো টিউশনি আর চাকরি-বাকরির খোঁজ রাখা। হঠাৎ করেই সুজাউদ্দিনের ফোন। সন্ধের দিকেই। বলল, আসতে পারবে একটু আজ? গেলাম। শুনি কোত্থেকে নাকি লোক এসেছিল কজন। হাসানসাহেব বললেন, উঠে যেতে বলছে এখান থেকে। বলছে ভালোই দাম দেবে জমির। বলছে এমনকি কামারহাটি বা জগদ্দল বা যে-কোনও মুসলিম এলাকায় জমি বা ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দেবে ওরা। বললাম, ভালোই তো, চারপাশে সব মুসলিম থাকবে, মসজিদ থাকবে, সুবিধাই তো হবে আপনাদের। বলার পরই মনে হল, এ কী বললাম আমি? ওরা তো আর এ বাড়ি ছাড়তে চাইছে না কিছুতেই। মানে হাসানসাহেব। সুরাইয়ার কথায় এই মাটিতেই ওর আব্বুর আব্বু-আম্মু, ওঁর দাদা-দিদি, ওদের দেড়শো বছরের ইতিহাস। এই মাটির নিচেই শুয়ে আছে সবাই, এই মাটি ছেড়ে, মাটির নিচে শুয়ে থাকা সবাইকে ছেড়ে হাসানসাহেব অন্য কোথাও যাবেন কীভাবে?

সুজাউদ্দিন বা সুরাইয়া দেখি তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হাসানসাহেব বললেন, চারপাশের হিন্দুদের মধ্যে তো তোমার সঙ্গেই যা—। আমার ওপর ওদের এত ভরসার মধ্যে কী করে বলি যে আমার—, আমার কোনও ক্ষমতাই নেই কাউকে বুঝিয়ে বলার। হাসানসাহেবকে বললাম, ভয় পাবেন না, আমি তো আছি।

রাশিয়ার ইউক্রেনের যুদ্ধে হঠাৎ করে ইউক্রেন রাশিয়াকে পালটা দেওয়া শুরু করায় গাজার খবর কেমন চাপা পড়ে যাচ্ছে। রাশিয়া কি অ্যাটম বোম ব্যবহার করবে? আমেরিকা কী করবে? তাহলে কি আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ?

রঞ্জিতদা ধরল আমাকে, কি রে বলল কিছু ওরা? যাবে কবে কিছু শুনলি? এই রঞ্জিতদার মুখেই উঠে এল হামাসের কথা। শালারা কি এমনি এমনি মার খায়? গিয়েছিল ইজরাইলে ঢুকে ছিঁচকেমি করতে। হাজার খানেক লোক মেরে কিছু লোক তুলে নিয়ে ভাবল জিতে নিয়েছে ইজরাইলকে। বোঝ এবার বদলা কাকে বলে। বছর তিনের ইজরাইলি হামলায় মরেছে নাকি অন্তত ষাট হাজার। ষাট হাজার? হ্যাঁ, ইজরাইলিরা কি হিন্দুদের মতো ভোদাই নাকি? পাকিস্তানে মুসলমানেরা মারতে শুরু করল আর দলে দলে পালিয়ে—। আর পালিয়ে তোর-আমার বাপ-ঠাকুর্দা উঠল কোথায়? উঠল এই জেলেপাড়ার মুসলমানদের কোলে। মুসলমানদের তাড়া খেয়ে ফের মুসলমানদের গা-ঘেঁষে। পুরো জেলেপাড়াটার দখল নে না তক্ষুনি। তোর ওই হাসানসাহেবের বাপেরা পালানোর সুযোগ পেত? ওরা তাড়াল কোন হিন্দু জমিদারকে। জমিদারের বাগানবাড়ির চেয়ে গোটা জেলেপাড়াটা খারাপ কী ছিল? ভাব একবার, তখনও আজান হচ্ছে মসজিদে, গরু কুরবানি হচ্ছে বকরি ঈদে, কী করে সহ্য করল বল তো আমাদের বাপ-ঠাকুর্দারা? আর এখন একটামাত্র মুসলমান ঘরের জন্য কেমন আটকে আছে সব? চারদিকে বিল্ডিং-এর পর বিল্ডিং-এর মধ্যে ওই একটুকরো অন্ধকার। জমির দাম ভাব তো!

কী যে আটকে আছে বুঝতে পারলেও সাড়া দিই না কোনও।

—তুই আবার ওই মুসলমান মেয়েটার প্রেমে-ট্রেমে পড়িসনি তো? নাম কী রে মেয়েটার? ওর রসুন খাওয়া মুখে চুমু খেতে পারবি? বিয়ে করতে চাইলে হিন্দু থেকে মুসলমান হতে হবে কিন্তু। খত্‌না করতে হবে তোর।

বেশ কিছুদিন সুজার ফোনের জন্য অপেক্ষা করি। ওরা কি বাড়ি ছাড়ার কথা ভাবছে? আমিই বা কেন মুসলমান কোনও পাড়ায় গেলে ওদের সুবিধার কথা বললাম। হাসানসাহেব হয়তো আমাকে ওদের লোকই ভেবে বসল। হয়তো ভাবল হিন্দুরা সব দল বেঁধে তাড়াতে চাইছে ওদের। তাড়াতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু আমিও কি—। সুরাইয়া সেদিন বদলার কথা বলছিল। বলছিল, আপনি তো হিন্দুই, আর কেনই বা তাড়াতে চাইবেন না, আপনাদের আব্বু বা দাদারা তো মুসলমানদের তাড়া খেয়েই পাকিস্তান থেকে—। সুযোগ পেলে বদলা নেবেন না আপনি?

গেলাম এবার নিজের থেকেই। ওই আগে যেমন হঠাৎ হঠাৎ করে গিয়ে উঠতাম ওখানে। দেখি শুধু সুজাউদ্দিন নয়, সুরাইয়া বা ওদের আম্মিও হাসানসাহেবের ঘরে বসে। সুজা বলল, আসিসনি কেন রে এতদিন? ঈদ গেল, ভাবলাম আসবি ঠিক।

—ঈদ গেল, বললি না তো। ফোন তো করতে পারতিস।
—বলতে হবে কেন, জানতিস না তুই?

ঠিকই, জানা উচিত ছিল আমার। ওদের এত বড় উৎসব। কথা ঘোরাবার জন্য ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলি। বলি, কী কী হল শুনি তোদের?

না, ওরা নাকি সেই কামারহাটিতে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছুই করেনি। ঈদ-উল-ফেতর ছিল এটা। খুশির ঈদ। নতুন জামা-কাপড় কেনার ঈদ। উপহার দেওয়ার ঈদ। না, উপহারের জন্য ওরা এবার কেনেনি কিছুই। শুধু শিমুই আর লাকচা, ওই যতটুকু না করলে নয়।

—কেন?

এবার হাসানসাহেবই শুরু করলেন, বললেন, হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম মরছে, আকাশে শুধুই বোমার প্লেন, লাখো মুসলিম একবার পুব থেকে পশ্চিম আর পশ্চিম থেকে পুব করছে, ওরা তো ভাইই আমাদের, বলো, আনন্দটা আসবে কোত্থেকে? মাটিতে মিশে যাচ্ছে সব ঘরবাড়ি, আশ্রয় নেওয়ার সব ছাদ, স্কুল-কলেজ-হসপিটাল। এবার আমার রাগ ওঠে খুব। বললাম, পুরো গাজা জুড়ে মাটির তলায় মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ তৈরি করে কী করছিল ওরা? ওরাই বা প্রথমে ইজরাইলি এলাকায় গিয়ে—। তাছাড়া হসপিটালে বম্বিং না করেই বা কী করবে, ওদের সবকটা সুড়ঙ্গের শুরু আর শেষ তো হসপিটালের নিচেই। সবকটা লোকই জঙ্গি ওখানে।

কথাগুলি শুনে হাসানসাহেব তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। যেন আমার মুখে কথাগুলি শুনে উনি অবাক খুব। হাসানসাহেব বললেন, তুমিও বলছ এই কথা? সবকটা লোক জঙ্গি?

সুরাইয়া উঠে গিয়েছে কখন। হাসানসাহেব বললেন, ইজরায়েলের হাতে কত প্যালেস্তাইনি বন্দি আছে ধারণা আছে তোমার? বছরের পর বছর ধরে কত প্যালেস্তাইনিকে ওরা খুন করেছে? যাদের আমরা থাকতে দিলাম, যারা ইওরোপের দেশে দেশে ঘুরে মরছিল, হিটলারের হাতেই যাদের ষাট লক্ষ—, সেই ইহুদিরা আমাদের নিজেদের দেশ থেকেই তাড়াতে চাইছে আমাদের, হাজারে হাজারে লোক মারছে আর দুনিয়াশুদ্ধু লোক দেখছে চুপ করে। আমাদের ক্ষোভ-দুঃখ থাকতে পারে না? রাগ থাকতে পারে না? রাগের চোটে মানলাম হামাসরা কিছু ইহুদিকে মেরেছে, তাই বলে বদলার সীমা থাকবে না কোনও? গোটা জাতিটাকে ধ্বংস করে ফেলতে হবে? শিশু-নারীনির্বিশেষে হাজার হাজার লোককে খুন করতে হবে? সব দেশ দেখবে চুপ করে? ওই সব শিশু বা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা তো আর অপরাধ করেনি কোনও? ওরাও কি জঙ্গি নাকি সব?

হাজার হাজার কিন্তু সত্যিই হাজার হাজার। খবর পড়লে বোঝা যায়। কোনও ছবিতেই কোনও বিল্ডিং আর আস্ত নেই। কারেন্ট নেই জল নেই, ওষুধ নেই, হসপিটাল নেই, ছাদ নেই মাথার ওপর।

গাজার শিশু বা কিশোরদের এত কিছু নেই জেনেও আমার দুঃখ হয় না এতটুকু। মনে মনে কোথাও খুশির একটা ভাবই জেগে ওঠে। আর শিশু বা কিশোর আবার কী, সবকটা বড় হলে তো জঙ্গিই।

হাসানসাহেব বলে যাচ্ছেন তখনও, জিজ্ঞেস করো তোমাদের বাপ-ঠাকুর্দাদের কলোনি তৈরির সময় কারা দাঁড়িয়েছিল ওদের পাশে। দিনের পর দিন যখন জমিদারের পুলিশ তোমাদের বাপ-ঠাকুর্দাদের ঘর ভেঙে দিচ্ছিল কারা আশ্রয় জুগিয়েছিল, কারা তোমাদের বাপ-ঠাকুর্দাদের ঘরের মা-বোনদের নিজের ঘরে ঠাঁই দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করো? চারপাশে তখন লোক কোথায়, হিন্দু বলতে যারা ছিল এখানে, সেই ঘটিরা তো তোমাদের বাপ-ঠাকুর্দাদের ‘বাঙাল’ বলে ঘেন্না করত। ফিরেও তাকায়নি রিফিউজিদের দিকে। আমাদের ছোটবেলায় স্কুলেই দেখতাম তো, আমরা নাহয় ছিলাম মুসলিম, কিন্তু তোমার বাপ-ঠাকুর্দারা তো উদ্বাস্তু হলেও হিন্দুই, এদেশি হিন্দুরা কলোনির ছেলেদের সঙ্গে মিশতেই চাইত না। ওদের মা-বাবাদের ভাষায় তোমাদের বাপ-ঠাকুর্দারা ছিল ছোটলোক। তখন আমরাই, মানে আমাদের আব্বা-দাদারাই—।

 

এক একদিন এমন হয় কিন্তু, পর্দা সরিয়ে হাসানসাহেবের ঘরের দরজায় টোকা দিতেই সুরাইয়া বলে উঠবে, বাড়িতে নেই কেউ। অর্থাৎ যেই আসুক ও দরজা খুলবে না। ঠিকই, নিরাপত্তার একটা ব্যাপার থাকেই। বিশেষ করে একটাই মাত্র মুসলমান ফ্যামিলি যেখানে। সুরাইয়ার কথা শুনে আমি আর বলি না কিছু। অর্থাৎ নিজের কথা জানিয়ে বলতে চাই না, দরজা খোলো, আমি, ভয়ের কিছু নেই। ওর কথা শুনে কিছুই না বলে চুপচাপ বেরিয়ে আসি। কোনওদিন ভাবি, সুরাইয়া একবার জানলার ফাঁক দিয়ে দেখেও তো নিতে পারে কে এল।

আজ কিন্তু পর্দা সরিয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়েই আমার চলে যাওয়া উচিত ছিল। অন্ধকার। তার মানে নেই কেউই। তাহলে ঘরের বাইরে তালা মারাই নিশ্চিত। এতসব না দেখে চলে আসছি, হঠাৎ শুনি সুরাইয়ার গলা।

—চলে যাচ্ছেন যে?
—ভাবলাম কেউ নেই বাড়িতে, অন্ধকার—
—বাড়িতে কেউ নেই মানে আমিই আছি শুধু। আব্বু আম্মুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। আর তক্ষুনি বলতে গেলে কারেন্টও নেই। ভেতরে আসুন, ভয় করছে খুব।
—না না থাক, পরে আসব।
—বলছি ভয় করছে।

জানলা ফাঁক করে কথা বলছিল সুরাইয়া। এবার দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দ। আমাকে ঘরে ঢুকতে দিয়ে দরজার ছিটকিনি আটকে দিল ও। বলল, যা ভয় করছিল এতক্ষণ। জানলা ফাঁক করে আমি কিন্তু আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, ভাবছিলাম, আসতেও তো পারেন।

ঘরের ভেতরে একটা মোম জ্বালিয়েছে সুরাইয়া। আর দরজার গায়ে দাঁড়িয়ে আছে পর্দা জড়িয়ে। বললাম, বসবে না?

ওই একটি মাত্র কথাই। হালকা ওই মোমের আলোয় সুরাইয়াকে দেখি। দেখতেই থাকি। বা হয়তো একটি কোনও মুহূর্তের জন্যই ছিল আমার সেই দেখা। বলল, আপনার কি ভয় করছে?

—কেন, ভয় করবে কেন? তোমার?
—ভয় করলেই বা, আপনি তো আছেন।

খবরের কাগজে দেখা গাজার ছবির কথা মনে পরে। সেখানে শব্দ নেই কোনও। শুধুই ধ্বংসস্তূপ। আর হাসপাতাল। হাসপাতালের নিচে সুড়ঙ্গপথে লুকিয়ে থাকা কেউ। ম্লান আলো। সিঁড়ি। কিন্তু কেউ তো আছেই। গোপন সন্ত্রাসী, ছদ্মবেশী জঙ্গি। অনেক ফিসফিস, নিঃশব্দের হাঁটা, বদলার গোপন পরিকল্পনা। ঘৃণা। আর হাজার হাজার মৃত্যু।

দেখি সুরাইয়া তাকিয়ে আমার দিকে। ফিসফিস করে বললাম, আমার কিন্তু কোনও ক্ষমতাই নেই তোমাকে বাঁচানোর। সুরাইয়া আমার কথাগুলি হয়তো শুনতেই পায়নি ঠিক করে ভেবে, ফের বললাম, কোনও উপায়ও নেই আমার।

হালকা সেই মোমের আলোয় মনে হল, ও যেন ম্লান হাসল আমার দিকে তাকিয়ে, সেটা অবশ্য ভুলও হতে পারে। এবার সুড়ঙ্গের বাইরে গিয়ে যেন কোনও শব্দ না পৌঁছতে পারে, এমন সতর্কতা নিয়েই সুরাইয়া বলল, আমারও।

মৃতের সংখ্যা নাকি ষাট হাজার ছাড়িয়েছে। গাজা-ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক। ভাঙা বাড়ি, গাড়ি। মাঝে মধ্যেই মিসাইলের আলোতে চমকে ওঠে আকাশ। এ-দিক থেকে ও-দিক ফালাফালা করে চলে যায় কেউ। প্লেনের শব্দ ভাঙতে থাকে। অনেক দূরের দিক থেকে আসছে কেউ। আজ কোন হাসপাতালের পালা কে জানে? চারপাশে ঝড় উঠবে ধোঁয়ার। ধোঁয়া কেটে গেলে মৃতের সংখ্যা হয়তো কিছু বাড়বে। ধ্বংস হওয়া সুড়ঙ্গে দুটো-একটা বডি তো থেকেও যেতে পারে। ষাট হাজার মৃত্যুর তুলনায় তা অবশ্য গণনার যোগ্য থাকে না।