দুর্ভিক্ষের সাক্ষী

শৈলেন সরকার

 

গোসাবার হজরত আমাকে মৈপীঠের কথা বলল। বলল, ‘আমাদের এদিকে সব চব্বিশ পরগনার, কিছু  বড়জোর দেশভাগের সময় যশোর-খুলনা থেকে আসা। মেদিনীপুরের লোক পাবেন আপনি পশ্চিমে। পশ্চিম মানে কুলতলি থেকে শুরু করে একেবারে কে-প্লট, এল-প্লট হয়ে সেই সাগরদ্বীপ পর্যন্ত। আর মেদিনীপুরেই তো সাংঘাতিক সেই ঝড়। ঝড়, নদী-গাঙের ঢেউ। একেবারে ত্রিশ-চল্লিশ হাতের উঁচু। একদিনেই হাজার হাজার লোক…।’ বলতে গেলাম, ‘আমি তো দুর্ভিক্ষের লোকগুলির…।’ মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ও জানাল, তারপরেই শুরু সেই দুর্ভিক্ষের। আকাল, মহামারি। এসব ও শুনেছে ওর শ্বশুরের কাছ থেকে। ওর শ্বশুররাও সব সেই মেদিনীপুরের। একেবারে তখনকার। হজরতের কথা শুনে আমি যখন মনে মনে ওর শ্বশুরের নাম হিসাবে ধরছি, তখন আমার মনের কথা যেন বুঝতে পারল ও, বলল, ‘শ্বশুরের জন্মই হয়নি তখন, উনি এসব শুনেছেন ওঁর আব্বার কাছ থেকে।’ হজরত বলল, ‘আপনি বরং ওখানে গিয়ে…।’

আমাকে বলা হয়েছিল ওদের নিজের মুখের কথা দিয়ে স্টোরি করতে। ওই যারা নাইন্টি আপ। পঁচাত্তর বছর আগে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ দেখেছে। সেই সব লোক যাঁরা এখন নব্বই পার করে, না ছুটছে তো আর বলা যাবে না, বলতে হবে হামাগুড়ি দিচ্ছে একশোর দিকে। বা যারা এর মধ্যে সেই সীমাও পার করে দিয়েছে। আমার এই চল্লিশ-বিয়াল্লিশে একশো কেন, সত্তরের কথাই ভাবতে পারি না তো নব্বই-পঁচানব্বই! বাবা পয়ষট্টি-ছেষট্টিতে মারা গেলেও আশি-পঁচাশির দাদুকে দেখেছি। বাবার বাবা। টিঁকে ছিলেন আমার মাধ্যমিকের বছর পর্যন্ত। শেষ দিন পর্যন্ত মাথা ঠিক ছিল লোকটার, আর সারাক্ষণ শুধু নিজের কথাই বকর-বকর…। সত্তর-পঁচাত্তর বছর আগেকার একেবারে তাঁর নিজের ছোটবেলার…। কখনও ঝড়-জল-বৃষ্টির, কখনও বা না খেতে পাওয়ার, কখনও বা মৃত্যুর। কিন্তু আমাদের তখন স্কুল, খেলার মাঠ, কোচিং। বড়দের অফিস, ঘর-গেরস্থালি। কে শোনে ওই বকর বকর? আমাকে এখন কিন্তু আমার সেই দাদুর বয়সি লোকগুলিকে বের করে তাঁদের কাছ থেকে দাদুর ছোটবেলার সেই দিনগুলির গল্পই শুনতে হবে। সেই সব, না খেতে পাওয়ার। ঝড়, বন্যা, ভিক্ষে বা নদী পার হওয়ার। এই নব্বই-একশোর জন্য হুগলি, নদিয়া, মেদিনীপুর, হাওড়া, চব্বিশ পরগনা করতে হচ্ছে। সেই পঁচাত্তর বছর আগেকার দুর্ভিক্ষ। কুড়ি থেকে তিরিশ লাখ লোকের নাকি মৃত্যু হয়েছিল। এমনিতে সেই দুর্ভিক্ষ নিয়ে জানার মধ্যে ওই ছোটবেলায় দাদুর বলা ভুলভাল কথাগুলিই। তাও ফিকে হতে হতে মিলিয়েই গেছে বলতে গেলে। আমরা এখন যেখানেই থাকি না কেন, সেই ছোটবেলা থেকে বাবা-কাকাদের মুখ থেকে জেনে এসেছি আমাদের দেশ মেদিনীপুর, গ্রাম যুগিবেড়। আমার সেই দাদু, দিদিমা।

গল্প করতে করতে অফিসে একদিন মেদিনীপুরের এক সুনীল সামন্তের কথা বলে ফেলেছিলাম। অনেক অনেক গল্পের মধ্যে একটা। সেবার কেন কে জানে আমার চণ্ডীপুরে যাওয়া। আলাপ হওয়া এক স্কুলটিচারের সঙ্গে। আর এরপর যা হয়, আতিথ্যের আমন্ত্রণ পাওয়া সেই টিচারের। ওদের বাড়ি যাওয়া। এক-আধ দিন থাকার মধ্য দিয়েই বাড়ির সবার সঙ্গেই একটা হৃদয়ের সম্পর্ক তৈরি করে নেওয়া। সেই টিচার অর্থাৎ সুশান্ত একদিন হঠাৎ করেই ওর বাবার মৃত্যুর খবর জানিয়ে যেতে বলল ওদের বাড়ি। শেষ কাজ। বলল, আপনাকে তো বাবা…। ঠিক। ওদিকে গেলে একবার অন্তত তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসতে হত। আমার সঙ্গে গল্প করতে উনি ভালোবাসতেন খুব। সেই সুনীল সামন্ত একেবারে প্রথম দিনের আলাপেই জাপানি বোমার কথা তুললেন। সেই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার। ব্ল্যাক আউট, সাইরেন। উনি তখন ঝড়, বন্যা, অনাহারের মেদিনীপুর থেকে পালিয়ে উল্টোডাঙা স্টেশনের কাছে এক চায়ের দোকানে। ‘আপনার বয়স কত ছিল তখন? ওই বয়সেই দেশ ছেড়ে একা ওই কলকাতায়?’ সে বয়সও উনি ঠিক করে বলতে পারলেন না, শুধু বললেন, ‘হাফ-প্যান্ট পরি তখন, এবার বুঝে নাও।’

সম্পাদকের কানে এই সুনীল সামন্তের গল্প কীভাবে গেল কে জানে, দিন কয়েক পর অফিসে গেলে ডেকে পাঠালেন আমাকে, বললেন, ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তরের এটা পঁচাত্তর বছর জানো তো?’ না জেনেই ঘাড় নাড়লাম। বললেন, ‘তোমার ওই সুনীল সামন্তের মতো লোক খুঁজে পাবে না আর?’ আমার মতো ভাউচারে টাকা নেওয়া জেলার লোককে উনি একেবারে অ্যাসাইনম্যান্ট দিয়ে বসলেন। বললেন, ‘মাসখানেকের মধ্যে করতে হবে কিন্তু, মোট কথা আমাদের আগে অন্য কেউ যেন—’

মকসুদা বিবিকে দিয়ে হল না কিছুই। সেটা ছিল আমার প্রথম কেস। হামিদের কথামতো চাপড়ায় আসা। এই মকসুদা বিবিকে দিয়ে শুরু করতে গিয়েই বুঝলাম, ভোগান্তি আছে অনেক। ভদ্রমহিলার মনেই নেই কিছু। ভুলে গিয়েছেন নিজের নামও। যা-ই জানতে চাই, তাকিয়ে থাকেন হাঁ করে। দাঁড়াতে পারছেন না, তা নিয়ে সমস্যা নেই কোনও। বয়সের কথায় ওঁর নাতবউ বলল, আটানব্বই। সেই নাতবউই শোয়া থেকে বসা করাল ভদ্রমহিলাকে। ঘরে আলগা ভিড় তৈরি হল একটা। কেন এসেছি? এটা বয়স্কদের জন্য আলাদা টাকা-পয়সার ব্যাপার নাকি কোনও? বা ঘর-বাড়ি। হামিদই অবশ্য সামলাল সেসব। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় বলল, অনেক দিন ধরে নাকি ও দেখেইনি আলিচাচার মাকে। এই মকসুদা বিবিকে। কেমন আছে আলিচাচার মা জানতই না হামিদ। ওঁর বয়সটার সম্বন্ধেই যা ধারণা ছিল ওর। হামিদ এবার ওর ঠিক করা বাকি দুজনের সম্বন্ধে খোঁজখবর শুরু করল। এক মুস্তাককে কোন এক বক্করের দাদির কথা জিজ্ঞেস করে তাঁর মাথা বা স্মৃতি সব ঠিকঠাক আছে কিনা জানতে চাইল। এরপর কোন পিন্টুর কাছে বামুনপাড়ার কালাবাবুর মা বেঁচে আছেন কিনা বা বেঁচে থাকলেও কেমন আছে ওঁর মাথা বা স্মৃতি। ফোনে ফোনেই। সব জেনে নিয়ে ও আশ্বস্ত করল আমাকে। দুটোই জেনুইন কেস। স্মৃতি বা মাথা সব ঠিকঠাক। বয়সও ভালো, একেবারে নিরানব্বই আর একশো।

কেউ একজন ‘অশনি সঙ্কেত’-এর কথা তুলল। ‘অশনি সঙ্কেত’-এর বীরভূম। এ ছাড়া দুই মেদিনীপুর, ২৪ পরগনা। কী করে বোঝাব, এত সময়ই নেই আমার। তা ছাড়া খরচ? অ্যাডভান্স পাব না তো কিছু। একেবারে ধারেকাছের জেলা থেকেই কাজ তুলতে হবে। দাদুর কথা মনে পড়ল। ইস, তখন যদি খেয়াল করে…। আকালের কথাই তো বলত লোকটা। খিদে, ফ্যান দ্যাও গো মা…, ভিক্ষে। মেদিনীপুর থেকে নদী পার হয়ে কাকদ্বীপ, কাকদ্বীপ থেকে—

চাপড়া শ্রীনগরের শেখ আব্দুলকে দিয়ে সত্যিকারের কাজ শুরু করতে গিয়েই বুঝলাম, কিছু পড়াশোনা অন্তত করে নেওয়া উচিত ছিল। লোকগুলিকে জিজ্ঞেস করব কী? কী জানতে চাইব? বা ওদের মাথা বা স্মৃতি যে ঠিকঠাক কাজ করছে তা বুঝতে গেলেও তো কী হয়েছিল বা কবে— এসব জানা জরুরি। শেখ আব্দুলের কথায়, ‘বন্যা হয়েছিল খুব। কদিন ধরে বৃষ্টি, মাঠঘাট সব—’ এরপর যেন হঠাৎ করে মনে পড়ল কিছুর কথা। বলল, ‘ঝড়ও হয়েছিল, একেবারে মারাত্মক ঝড়।’ না, সেচের তেমন ব্যবস্থা না থাকায়, চাষবাস এমনিতেই ভালো ছিল না তেমন। পাট হত, কিছু গম, বাজরা। না, ধান হত না। ‘আমাদের আবার জমি কোথায় তখন, যা আছে বড়লোক কয়েকজনের, আমরা কাজ করতাম ওদের জমিতে। হ্যাঁ, সেবার ঝড়-বৃষ্টি একেবারে মারাত্মকই ছিল, জমিতে যা কিছু ছিল…।’ লোকটার এককালে যে দাপট ছিল খুব, তা বোঝা যায়, এই বয়সেও ওর চেহারাতে ধরা পড়ে। চেহারা, কথাবার্তা। জমিদারদের হয়ে মারদাঙ্গার কাজ করত কিনা কে জানে?

এসব নিয়ে সুমিতার সঙ্গে কথা বলা যায় না কোনও। ওর আগ্রহই নেই। বোঝার ইচ্ছেও নেই। অথচ ভাবুন, ইতিহাসেরই স্টুডেন্ট ছিল এককালে। প্রথম যেদিন ওকে মন্বন্তরের কথা তুলে নব্বই-একশোর কথা বললাম, জানতে চাইলাম, ওর বাপের বাড়ির পাড়ায় আছে নাকি কেউ, ও বলে দিল, ‘ওখানে তোমাদের মতো ভিখিরি জাতের কোনও লোক থাকে না। তেমন কাউকে দেখিইনি কোনও দিন।’ ‘তোমাদের মতো’ কথাটা বেশ চিবিয়ে চিবিয়েই উচ্চারণ করল সুমিতা। ওকে যত আমি সেই পঁচাত্তর বছর আগেকার কথা বলে মন্বন্তর বোঝাতে চাই, তত ও ‘ভিখিরি’ শব্দটাকে আঁকড়ে আমার দিকে ছুড়ে দিতে থাকে। ও নাকি সেই প্রথম দিন এবাড়িতে এসেই বুঝেছে। ‘ভিখিরি মন’, ‘ভিখিরি প্রবৃত্তি’। ও আমার বাবার কথা তুলল— ওর শ্বশুর সুশীল মাইতি। লোকটার কিপটেমির কথা, এক ধুতি-শার্টে বছরের পর বছর বা ওর জন্য পুজোর সেই একটামাত্র শাড়ি বা বছরভর তেল-সাবানের কষ্টের কথা। বলল, ‘পাড়ার লোকজনদের কাছে তোমাদের দেশের বাড়ির কথা শুনেছি তো সব, তোমার দাদু সুভাষ মাইতির কথা। সতেরো ঘাটের জল খেয়ে…, এক পেটের ভাত জোগানোর ক্ষমতা নেই, তার আবার বিয়ের পর বিয়ে।’ সেই কোন যুগে মরে যাওয়া আমার দাদুর কথা তোলে। আমার প্রথম দিদা, মানে আমার বাবার মা নাকি খিদের জ্বালায় কোথায় পালিয়ে…। বাবা সেই মায়ের একমাত্র সন্তান। কাকারা সব আমার দাদুর দ্বিতীয় বিয়ের, সেই নতুন দিদার গর্ভের। আমার দাদু বা সেই পালিয়ে যাওয়া দিদা আদৌ ভিক্ষা করত কিনা, বা সেই দিদা গেলই বা কোথায়— এসব নিয়ে আমার কোনও ভাবনা না থাকলেও সুমিতা আমাকে যেন ভাবতে বাধ্য করবে। ওর কথায় ভিখিরির ছেলে তো ভিখিরিই হবে। ছেলে, নাতি বা একেবারে পরের পর…। ও তাই আমাদের সন্তানকে সামলে রাখবে। ঘেঁষতে দেবে না আমার ধারেকাছে। ভেবেছিলাম, ওকে হজরতের কথা তুলে সুন্দরবনের জল-জঙ্গলের কথা বলব। ওদিকে ক্যানিং, সোনাখালি বা গোসাবা-বাসন্তী গেলেও পশ্চিমের মৈপীঠ বা পাথরপ্রতিমার প্লটগুলিতে যাইনি এর আগে কোনও দিন। সাগরের একেবারে গায়ে লাগা দ্বীপ নাকি সব। দায়ে পড়লে মানুষ কী না পারে ভাবো! কোথায় তোমার মেদিনীপুর আর কোথায় এপাড়-ওপাড় দেখতে না পাওয়া মোহনার সেই হুগলি নদী পার হয়ে জল-জঙ্গলের দ্বীপ এলাকা। ওদের ভাষায় লাট। সেই মেদিনীপুর থেকে কাকদ্বীপ, কাকদ্বীপ থেকে নদী বেয়ে বেয়ে…।

এই নব্বই-একশো বছরের মানুষগুলির মধ্যে কত কী যে থাকে! হাওড়া শ্যামপুরের ইক্রামুল আলি শুরুতেই অদ্ভুত আবদার ধরল। বলল, ‘কথা বলতে পারি, কিন্তু শর্ত আছে।’ শর্তটা কী? না, উনি খুব গোপন কথা জানেন একটা, তা চিফ মিনিস্টারকে জানাতে হবে। অনেক দিন ধরেই নাকি উনি এই গোপন খবর চেপে বসে আছেন। কী সেই খবর? খবর হিটলার আর নেতাজি নিয়ে। উনি জানেন কীভাবে ব্রিটিশদের সেনা…। ওঁর সব কথা শুনলাম মনযোগ দিয়ে। এর মধ্যেই চা এল ভেতর থেকে। সঙ্গে বিস্কুট একটা। ছেলেরা চাষের কাজ করেন। বড় ছেলে ঘুরে গেলেন একবার। এটা সবজির সিজন। আমি শহরের লোক জেনে সবজির দাম নিয়ে হা হুতাশ করে জানাতে বললেন সরকারকে। ‘পাইকাররা নিজেদের মতো করে দাম ঠিক করছে করলা, উচ্ছে বা ঢ্যাঁড়শের—’ সায় দেওয়া ছাড়া আর কীই বা করার থাকে আমার। ইক্রামুল আলি কথা শুরু করলেন সেই ঝড় দিয়েই। ঈশান কোণ থেকে একেবারে সকালের দিকে শুরু হওয়া সেই ঝড় কেমন দিনভর দিক পাল্টাতে থাকে। ঈশান থেকে পুব হয়ে শেষে সন্ধ্যার দিকে নৈঋত থেকে— মাঝরাতের দিকে আকাশ থেকে গুমগুম ধ্বনি, ব্যস, এক কথায় ঝড় শেষ। ‘ওটা ছিল ভৈরবীর ডাক।’ ইক্রামুলের কথায়, ‘মায়ের এক ধমকেই—’। বন্যা হয়েছিল এখানেও, ইক্রামুলকেও ভিক্ষায় বের হতে হয়েছিল। না খেয়ে মরেছে এখানেও। কিন্তু মেদিনীপুরের মতো খাল থেকে ধেয়ে আসা জলের তোড় বা শোঁ-শোঁ আওয়াজ করে নদী থেকে ঢেউয়ের ছুটে আসতে থাকার গল্প এখানে নেই।

কদিন হল আমিও শোঁ-শোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছি খুব। রাতে লাইট নেভালেও ঘুম আসছে না কিছুতেই। কেবলই শোঁ-শোঁ করা একটা আওয়াজ। যেন সত্যিই জল ছুটে আসছে ঢেউ হয়ে। কখনও মনে হচ্ছে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। মনে হচ্ছে জানালা খুললেই ভিজিয়ে দেবে আমাকে। কখনও নেমেই পড়ি বিছানা থেকে। লাইট জ্বালাই না যদিও। জানালা না খুলে ভাল করে বুঝতে থাকি শব্দটাকে। কখনও জানালার গায়ে কান রেখে বুঝতে চাই। সত্যিই কি বৃষ্টি না কি ঝড়? একের পর এক ভিড় করে মানুষগুলি। সুনীল সামন্তের কথা মনে পড়ে। লোকটার হাসি। আর দেখাই হবে না কোনও দিন। ঝড় আর ঢেউয়ের দিন মামার বাড়ি ছিল লোকটা। সারা দিনের ঝড়ের আওয়াজে ওর নাকি মনে হয়েছিল এ ঝড়  আর শেষই হবে না। এমনকী বুড়ো বয়সেও রাত হলেই নাকি সেই শোঁ-শোঁ শব্দ ঢুকে পড়ত ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে। ঝড় শেষ হতে না হতেই খাল ভেঙে ছুটে আসতে থাকা ঢেউ। জলের গর্জন করতে করতে ছুটে আসা। কাঁথির সন্ন্যাসী মাইতির কথা মনে পড়ে। লোকটা নিজের বুড়ো আর অসুস্থ বাপকে নিয়ে ছুটতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আর অপেক্ষা করতে পারেনি। ঢেউ তখন একেবারে ঘরের দুয়ারে। একবার ‘বাবা’ বলে চিৎকার করেই আর পেছন ফিরে তাকাবার সুযোগ পাননি ভদ্রলোক। বা ভদ্রলোক কী করে বলি? সে তখন তো বড়জোর বছর সতেরো-আঠারোর কিশোরমাত্র। এতগুলি বছর পার করেও লোকটা…। সেদিন কাঁদল খুব। এই বিরানব্বই-তিরানব্বই বছর বয়সেও ভাঙা গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘আর দেখা হল না, বুঝলেন?’ এই কথাগুলি আমার বলতে ইচ্ছে করে খুব। ইচ্ছে হয় সুমিতাকে গল্প করি। ইচ্ছে হয় কেউ আমার গল্পগুলি শুনুক। আর গল্প তো নয়, সব তো সত্যি ঘটনাই। এমনকী নন্দীগ্রামের মহম্মদবাজারের ভীম সেনাপতির কথা ভাবো! তার এক ভাই নাকি খিদের ঠ্যালায় নিজের বউকে…। হ্যাঁ, বেচে দিয়ে এসেছে। ভীমের কথায়, তখন ওইসব নিয়ে কে ভাবে, বাঁচল তো দুজনই। এমনকী সেই বউ বেশ্যাপট্টিতে পাচার হলেও…। সুমিতা গ্রাহ্যই করে না এসব। কথা শুরু করতে গেলেই বলে, বুড়োদের দলে মিশে আমার নাকি বুড়োতে পেয়েছে। দিনরাত শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু। এত মরার গল্প কার ভালো লাগবে? তাছাড়া সবই তো একঘেয়ে। ঝড়, গাঙের ঢেউ, হাজার হাজার লাশ। এরপর খিদে, খিদে আর খিদে। ‘আরে বাবা খেতে না পেয়ে মরে তো এখনও, এতে অবাক হওয়ার কী আছে?’ বলার চেষ্টা করি, এক-দুজন তো নয়, একসঙ্গে হাজার হাজার…। ছেলের দিকে তাকাই। সারাদিনে ও অবশ্য আমার কাছে আসেই না খুব একটা। ছেলে ওর মায়ের দখলে। ঠিক করে বললে, ওর জন্মদানে নির্দিষ্ট একটা ভূমিকা ছাড়া কী এমন করেছি ওর জন্য? এই বয়সেও পাকা কাজ জোগাড় পারলাম না একটা। সুমিতা চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করে বলে, ‘জেলার সংবাদদাতা না বলে বরং বলো, জেলার ভিখিরি।’ খারাপ লাগে, খুবই খারাপ লাগে, কিন্তু ওর এই বিদ্রূপের প্রতিবাদই বা করি কী করে? সত্যি কথা বলতে, ভিক্ষাই তো করি, মাস গেলে হাজার তিন-চারের পেমেন্ট, তাও কবে পাব ঠিক নেই। দু মাসের টাকা ডিউ আছে এখনও। সুমিতার প্রাইমারি স্কুলের চাকরি না থাকলে কী হত ভাবলেই ভয় হয়। আমাকেও হাত পাততে হত। আর সত্যি কথা বলতে হাত কি পাতি না আমি? জেলার খবরের কী গুরুত্ব আছে ওদের কাছে? আমি নিজেও কি দয়া কামনা করি না? জলে ডোবার খবর বা বিষপানে মৃত্যু বা বধূহত্যা— এর বাইরে আমার অস্তিত্ব কোথায়? খবরের জন্য থানায় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা। আজ নেহাৎ এই দুর্ভিক্ষের কাজটা পাওয়া। তাও তো সম্পাদকের দয়াতেই। সেই সুনীল সামন্তের গল্পটা ওদের কেন ভালো লেগেছিল কে জানে?

মৈপীঠে কেস পেয়ে গেলাম অনেক। একেবারে জেনুইন। নব্বই, সাতানব্বই, একশো পাঁচ। দুজন মেয়ে, মানে মহিলা। সব কজনের কথাই নিলাম। সবারই মাথা ঠিক আছে পুরোপুরি। স্মৃতিও ভালোই। একজন তো বন্যার আগে ও পরে চালের দামও বলে দিল। আয়েষা বিবি নামের সাতানব্বইয়ের মহিলা আবার তখনকার প্রেগনেন্ট মা-দের কষ্টের কথা বলল। দুধ কোথায় তখন। মায়ের পেটেই নেই কিছু তো বুকের দুধ। শিশু মরল আগে, পরে মা। ওই মরা শিশুই কোলে নিয়ে মা দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে দয়ার আশায়। কোলের ওই মরা শিশু দেখে যদি কারও মনে জাগে কিছু। সেই মা অবশ্য মরবে ঘরে ফিরতে ফিরতে, রাস্তাতেই। এমনই নাকি হয়েছে। আট-দশ ঘন্টা হেঁটে যদিও বা ভিক্ষায় গেছে, কিন্তু কিছুই না পেয়ে ফেরার সময় রাস্তাতেই…

বাঁধের উপরকার রাস্তা ধরে যাচ্ছি। একদিকে নদী অন্যদিকে গ্রাম। শ্মশানঘাট পার হয়ে বাঁধের গা থেকে ডানদিকে বেরিয়ে রাস্তাটা চলে গেছে পঞ্চায়েত অফিসের দিকে। রাস্তার পাশে প্রায় হেলে পড়া একটি খড়ের চালার পাশে আমার চোখ আটকে গেল হঠাৎ। এক বুড়ি। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। বাঁধের ওপাশে নদীতে একটা ভুটভুটি যাচ্ছে কোথাও। হয়তো বড় গাঙের দিকেই। শব্দ হচ্ছে ভটভট-ভটভট। খড়ের চালার উপর দিয়ে কিচকিচ করতে করতে পাখির একটা ঝাঁক ঢেউ তুলল। হয়তো ঘরে ফিরছে জঙ্গল থেকে। বুড়ির বয়স মনে তো হচ্ছে পঁচানব্বইয়ের কম নয় কিছুতেই। এখানে আমার যে কটা কেস পাওয়ার ছিল পেয়ে গেছি। বাড়ি ফিরব। বাড়ি ফিরব বললেই তো তুমি ফিরতে পারবে না এখান থেকে। এখন নদী পার হয়ে মথুরাপুর স্টেশনে যাওয়ার অটো বা টাটা ম্যাজিক পাবে কোথায়? আমাকে তাই কাল সকালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বুড়িটাকে দেখে সঙ্গী হজরতের শ্বশুর কাশেম শেখকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এঁকে বাদ দিলেন কেন?’

মাথায় নাকি গণ্ডগোল হয়ে গেছে ওর। কাশেম শেখ ফিসফিস করে বলল, ‘বেশ্যা ছিল এককালে।’

বেশ্যা শুনেই আমার মাথায় প্ল্যান খেলে গেল একটা। জানতে চাইলাম, ‘বেশ্যা মানে সেই দুর্ভিক্ষের সময়ের?’

কেউ একজন ওকে নাকি বিক্রি করে দিয়েছিল কোন দালালের কাছে। ওর কম বয়সেই। বুঝতে পারা যাচ্ছিল খুবই ইন্টারেস্টিং স্টোরি। এখন বলতে গেলে সন্ধেই। আজ অন্তত একটু কথা বলে যাই, কাল নাহয় সকাল সকাল এসে…। ওর সামনে আমাদের দাঁড়াতে দেখে বুড়ি দেখি অবাক খুব। কিছু বললও বিড়বিড় করে। কাশেম শেখের কাছে জানতে চাইলাম, ‘কানে শুনতে পায় তো?’ পঞ্চায়েত অফিসের সামনে এসে ফোন করলাম সম্পাদকমশাইকে। বুড়ির কথা বলে বলা যায় ইমপ্রেস করতে চাইলাম একটু। ফোন পেয়েই উনি বললেন, ‘ঝড়, বন্যা, ভিক্ষে আর মৃত্যুর বাইরে আছে আর অন্য কিছু?’ বললাম বুড়ির কথা। এক স্বামীর একেবারে নিজের হাতে তরুণী স্ত্রীকে বেশ্যাপট্টির দালালের হাতে তুলে দেওয়া। এই বুড়ির কথা শুনেই বস যেন উত্তেজিত খুব। ‘একেবারে ফুল স্টোরি আসে যেন, সেই মেদিনীপুর থেকে কাকদ্বীপ, কাকদ্বীপ থেকে— বা বিক্রি হল কীভাবে, ভদ্রমহিলার নাম, তাঁর সেই স্বামীর নাম, পারলে বেশ্যাপট্টির…’

সুমিতাকে ফোন করেছিলাম। আসলে আমার সেই নতুনদিদার কাছ থেকে জানার ছিল কিছু। নতুনদিদা অর্থে, বাবার বেঁচে থাকা সৎমা।  আমার বাবা বা দাদুকে নিয়ে কিছু জানতে পারবে এক আমার এই নতুনদিদাই। রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় সুমিতা রেগে উঠল খুব, বলল, ‘তোমার দাদুর ডাকনাম বাবুলাল ছিল কিনা, তা জানার জন্য এত রাতে?’ বাবার সেই সৎমা, মানে আমি যাকে ছোটবেলা থেকেই নতুনদিদা বলে চিনি, থাকেন আমাদের সঙ্গেই। একতলার সিঁড়ি-ঘরের পাশেই। সুমিতা বলল, ‘এত রাতে ঘুম থেকে তুলব? তা ছাড়া কানেও তো শুনতে পায় না ঠিক করে।’ বললাম, ‘ঠিক আছে ডেকে তোলো তো আগে।’

একেবারে সৌজন্যের খাতিরে পঞ্চায়েত সভাপতির বাড়িতে যাওয়া। বয়স্ক মানুষ। না, নব্বই নয়, সত্তরের কোঠায়। চা খেতে খেতে ভদ্রলোককে সন্ধেবেলা খড়ের চালার পাশের সেই বুড়ির কথা জিজ্ঞেস করি। এই বুড়িকে দেখি চেনে সবাই। ভদ্রলোক ওঁর কমবয়সে তখনকার বয়স্কদের কাছ থেকে শোনা কথা বললেন, মানে ওর বাবা-কাকারা বা পাড়ার লোক…। মেদিনীপুরের যুগিবেড় থেকে হুগলি নদী পার হয়ে সেই কাকদ্বীপ দিয়ে সবাই যেমন এসেছে এও তেমনি। স্বামী ছিল। ‘যত দূর মনে পড়ে সুভাষ মাইতি, ডাকনাম বাবুলাল।’ তখন অভাবের যুগ। ভিক্ষায় বের হত দুজনই। এরপর বাচ্চাও হল, ছেলে। ওই অভাবের মধ্যেই। এর মধ্যেই হঠাৎ করে প্রীতিলতা উধাও। হ্যাঁ, প্রীতিলতাই ছিল বুড়ির নাম, মানে আছেও ঠিক। এবার ভদ্রলোক একটু থেমে বললেন, ‘কেমন বেমানান না? মানে বুড়ির এই প্রীতিলতা নামটা? সবাই অবশ্য ওকে বাবুলালের বউ বলেই—’ আর বাড়ির মেয়ে-বউদের এই পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা সেই অভাবের দিনে তেমন অস্বাভাবিক ছিল না নাকি মোটেই। এ রকম আকছার হচ্ছে তখন। কোনও বউ বা মেয়ে পালাচ্ছে, আবার কখনও বাবা বা স্বামীই নিজের মেয়ে বা বউকে দালালের হাতে গছিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন বেশ্যাপট্টিতে কাটিয়ে ফের গ্রামে ফিরে আসায় এই ‘বাবুলালের বউ’-এর গল্প কম-বেশি জানা সবারই। ভদ্রলোক বললেন, ‘খুব ইন্টারেস্টিং না?’

বুড়ির স্টোরি করা যাবে না শুনে আমার সম্পাদকমশাই রেগে গেলেন খুব। বললেন, “বাদ দাও তোমার ‘দুর্ভিক্ষের সাক্ষী’, এত ইন্টারেস্টিং একটা ক্যারেক্টার পেয়েও—” ওর রাগের মাত্রা দেখে বুঝলাম কপালে শনি আছে আমার। বধূহত্যা বা রেল অ্যাক্সিডেন্টের কপি ধরিয়ে মাসের শেষে ভিখিরির মতো…। বা গত বিশ-বাইশ দিন ধরে এইসব ঘোরাঘুরির পয়সা পাব কিনা কে জানে? ফোনের ওপাশ থেকে চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, ‘কেন বুড়ি কি মরে গেল একদিনের মধ্যেই?’

দাদুর সেই দুই নম্বর বউ, এখনও পর্যন্ত বেঁচে থাকা আমার নতুনদিদা আমাদের লাট অঞ্চল বলতে মৈপীঠের কথা মনে করতে পারলেও, দাদুর ডাকনামটাকে মনে করতে পারল না কিছুতেই। আমার হয়ে সুমিতাই জানতে চাইছিল ওর কাছে। শুধু তো দাদুর ডাকনাম নয়, দিদা মনে করতে পারল না বাবার পালিয়ে যাওয়া সেই সত্যিকারের মায়ের নামটাকেও। আর মৈপীঠের বুড়ি যদি আমার সব প্রশ্নের জবাবে শুধুই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, যদি শুধুই ওর ভাঙা গাল বেয়ে জল গড়াতে থাকে চোখের, তবে আমার কী করার থাকে? আমি তবুও সারাটা দিন অপেক্ষা করি। আরও একটা দিন সেই বুড়ির জন্য ধৈর্য ধরে নদীর এপাড়েই থেকে যাব বলে ঠিক করি। গল্পটা তুলতে পারব ভাবলে না হয় আরও দুটো দিন…। একেবারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওর তখনকার বয়স, স্বামীর বয়স, লোকটার নাম, সেই বেশ্যাপট্টি— একটা খুবই ইন্টারেস্টিং স্টোরি। আমি বুঝি, ঠিকঠাক করতে পারলে এই একটা স্টোরিই আমার জীবনটাকে… এমন একটা স্টোরিকে পেছনে ফেলে চলে যেতে ভয় হয় খুব। যদি অন্য কেউ…। কাশেম শেখ বলল, যা অবস্থা তাতে হয়তো বাড়ি ফিরে এখানে ফোন করলেই শুনবেন— তা বুঝি আমিও। চলে গেলেই হয়। আমি তবু নদী পার হতে পারি না। আমাদের দুর্ভিক্ষের শেষ সাক্ষীর মৃত্যুর জন্য নদীর এপারে বসে অপেক্ষা করতে থাকি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...